মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্ব
-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*


عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِىِّ قَالَ إِنَّ اللَّهَ وَضَعَ عَنْ أُمَّتِى الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ.

অনুবাদ : ইবনু আব্বাস h হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল a বলেছেন, ‘নিশ্চই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ভুল করা, ভুলে যাওয়া ও জবরদস্তিমূলক কাজের শাস্তি ক্ষমা করে দিয়েছেন’।[1]

ব্যাখ্যা : মুসলিম উম্মাহর বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং পরিষ্কার। এই পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলা বহু জাতি-গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছেন। আদম থেকে মুহাম্মাদ পর্যন্ত অনেক নবী-রাসূলের আগমন ঘটেছে। তিনি প্রত্যেক জাতি ও গোত্রকে অবস্থান ও মর্যাদাগত ভিন্নতা দান করেছেন আর শেষ নবীর উম্মতের বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রশংসায় বলেন,﴿وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا﴾ ‘এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি যাতে করে তোমরা মানবমণ্ডলীর জন্য সাক্ষ্যদাতা হতে পারো এবং যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষ্যদাতা হতে পারেন’ (আল-বাক্বারা, ২/১৪৩)

বর্ণিত প্রমাণের আলোকে মুসলিম উম্মাহ সমগ্র পৃথিবীতে কর্তৃত্বের আসনে থাকার কথা। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক ক্ষমতার উৎস তাদের হাতে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন,﴿لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ﴾ ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে উত্তম আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছি অতঃপর তাকে আমি সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দিয়েছি’ (আত-তীন, ৯৫/৪-৫)। অর্থাৎ মানুষকে সুন্দর আকৃতি, গঠন ও অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর তাকে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলার মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের অর্থ এটা নয় যে, মানুষ জন্মগতভাবে আদর্শবান হয়ে জন্ম নিবে। প্রকৃত আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য তাকে সাধনা করতে হবে ও চেষ্টা করতে হবে। পাপ থেকে বিরত থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا﴾ ‘যে নিজেকে পবিত্র করেছে, সেই সফলকাম’ (আশ-শামস, ৯১/৯)

পূর্ববর্তী উম্মতকে তাদের ভুলের জন্য জবাবদিহি করতে হতো, তাদেরকে প্রত্যেক কাজের জন্য হিসাব দিতে হতো, অজ্ঞতা অথবা ভুলবশত কোনো অন্যায় সংঘটিত হলে তাদের জন্য সুপারিশের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাদের সংঘটিত ভুলগুলো বিনা হিসাবে ছেড়ে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু ভুলবশত কোনো পাপ সংঘটিত হলে বা ভুলে কোনো অন্যায় করে ফেললে বা জোরপূর্বক কোনো কাজ করতে বাধ্য হলে, এই উম্মতের জন্য ক্ষমা করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কারণ, এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এ উম্মতের প্রতি বিশেষ রহমত। যেমন মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে আল্লাহ! আমরা যদি ভুলবশত কোনো কাজ করি বা ভুলে যাই আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের উপর এমন বোঝা চাপিয়ে দিবেন না যেমন পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন আর আপনি আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করবেন না যা পালনের ক্ষমতা আমাদের নেই’ (আল-বাক্বারা, ২/২৮৬)। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,﴿وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا﴾ ‘ভুলবশত কোনো কিছু করলে তোমরা গোনাহগার হবে না, তবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করে তবে তার শাস্তি ভোগ করতে হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহশীল, দয়ালু’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫)

আলোচ্য হাদীছটি শেষ নবী মুহাম্মাদ a-এর উম্মতের উপর থেকে ভুলত্রুটি ইত্যাদির শাস্তি উঠিয়ে নেওয়ার অন্যতম প্রমাণ। হাদীছটি শরীআতের অনেক বিধিবিধানকে শামিল করে। যেমন ইমাম নববী p বলেছেন, ‘হাদীছটি শরীআতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও মাসআলা-মাসায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করে’।[2] এই হাদীছের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো একত্রিত করলে দেখা যায় হাদীছটি শরীআতের অর্ধেক মাসআলা-মাসায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করে।

ইমাম নববী p এই ক্ষেত্রে যথার্থই বলেছেন। কেননা আমরা যখন মানুষের কাজকর্ম সম্পর্কে ভাবী তখন সেগুলোর দুইটি অবস্থা দেখতে পাই— ১. আদায়কারীর ইচ্ছা ও স্বাধীনতায় কাজটি সংঘটিত হয়েছে। এমন ইচ্ছাকৃত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হিসাব নেওয়া হবে, তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। ২. কাজটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছা ও স্বাধীনতায় সংঘটিত হয়নি। এই প্রকার কাজ অনিচ্ছায়, ভুলবশত ও বাধ্যকৃত কাজের মধ্যে পড়ে। আর এগুলো এমন কাজ যার বর্ণনা এই হাদীছে এসেছে।

‘খাত্বা’-এর সংজ্ঞা : এমন কাজ যা করার ইচ্ছা করা হয়, কিন্তু কাজটি ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। এমন অবস্থায় শরীআতের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাকড়াও করার ক্ষেত্রে অবকাশ প্রদান করা হয়েছে এবং তাকে জবাবদিহিতা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।

এ সম্পর্কিত একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টান্ত ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। এটি বিখ্যাত ছাহাবী আমের ইবনু আকওয়া c-এর খায়বার যুদ্ধের ঘটনা। তিনি জনৈক মুশরিকের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলেন। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ পরিচালনা করলেন। কিন্তু তরবারির আঘাত তাঁর নিজের উপর পতিত হলো। ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। একদল ছাহাবী বিষয়টি রাসূল a-কে অবহিত করে বললেন, নিশ্চয়ই আমের নিজেই নিজেকে হত্যা করেছেন; কাজেই তাঁর সকল আমল বাতিল হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় তাঁর ভাই সালামা ক্রন্দনরত অবস্থায় আল্লাহর রাসূল a-এর নিকট উপস্থিত হলেন। আল্লাহর রাসূল a তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? তিনি আল্লাহর রাসূল a-কে বললেন, যে তারা (একদল ছাহাবী) বলেছেন, আমের এর সকল আমল বাতিল হয়ে গেছে। আল্লাহর রাসূল a বললেন, কে একথা বলেছে? তিনি আল্লাহর রাসূল a-কে বললেন, একদল ছাহাবী এই কথা বলেছেন। আল্লাহর রাসূল a বললেন, তারা মিথ্যা বলেছে। বরং সে দ্বিগুণ নেকী পাবে। ১. একজন মুশরিককে হত্যার ইচ্ছাপোষণ এবং ২. শহীদের মর্যাদা।[3] এই ঘটনায় এই ছাহাবী নিজেকে হত্যা করতে চাননি বরং তিনি মুশরিককে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভুলবশত তাঁর তরবারি নিজের উপর পতিত হলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহর রাসূল a এমন ভুলকে ক্ষমাযোগ্য ভুল বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে এর অর্থ এটা নয় যে, ভুলকারী ব্যক্তির উপর থেকে ভুলের প্রায়শ্চিত্তের শাস্তি সম্পূর্ণরূপে উঠে যাবে। বিশেষ করে যেগুলো মানুষের অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট। এই জন্য একজন মুসলিম ভুলবশত হত্যাকারী মুসলিমের নিকট রক্তমূল্য ও ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘কোনো মুমিনের জন্য উচিত নয় যে, কোনো মুমিনকে হত্যা করে; কিন্তু ভুলক্রমে। যে ব্যক্তি ভুলবশত কোনো মুমিনকে হত্যা করবে সে একজন মুমিন ক্রীতদাস আযাদ করবে এবং তার স্বজনদের নিকট রক্তমূল্য সমার্পণ করবে; তবে যদি তারা ক্ষমা করে দেয়। আর যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে (শুধু) কৃতদাস মুক্ত করবে আর যদি সে তোমাদের চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তার স্বজনদেরকে রক্তমূল্য প্রদান করবে এবং একজন মুমিন ক্রীতদাস আযাদ করবে। অতঃপর যে ব্যক্তি অক্ষম হবে, সে আল্লাহর নিকট তওবাস্বরূপ ধারাবাহিক দুই মাস ছওম পালন করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়’ (আন-নিসা, ৪/৯২)। আর ‘ভুলে যাওয়া’ সম্পর্কে শরীআত স্পষ্ট করে বলেছে, এটি ক্ষমাযোগ্য অপরাধ। এর প্রমাণে আল্লাহ আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا﴾  ‘হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না’ (আল-বাক্বারা, ২/২৮৬)

এছাড়াও অন্যান্য বিধান এর সাথে যুক্ত হবে। যেমন— কেউ ছালাত আদায় করতে ভুলে গেলে যখনই তার মনে পড়বে তখনই সে ক্বাযা আদায় করে নিবে। আর যদি কোনো ব্যক্তি ওযূ করতে ভুলে যায় অতঃপর ছালাত আদায় করে নেয়, তবে তাকে ওযূ করে পুনরায় ছালাত আদায় করতে হবে।

এর তৃতীয় অবস্থা হচ্ছে কাউকে হারাম কাজ করতে বাধ্য করা। যেমন— মানুষকে এমন কাজ করতে বাধ্য করা যা সে করতে চায় না; এক্ষেত্রে উক্ত কর্মের প্রতিফল তার উপর বর্তাবে না। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,﴿مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ ﴾ ‘যে ব্যক্তি ঈমান আনার পরে আল্লাহকে অস্বীকার করবে (সে শাস্তি ভোগ করবে)। তবে ঐ ব্যক্তি নয়, যার উপর জবরদস্তি করা হয় অথচ তার অন্তর দৃঢ় বিশ্বাসে অটল থাকে’ (আন-নাহল, ১৬/১০৬)। এর উদাহরণ হলো আম্মার ইবনু ইয়াসির c-এর ঘটনা। যখন মুশরিকরা তাঁকে আল্লাহকে অস্বীকার করতে বাধ্য করেছিল। এর কারণে তাঁকে শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে যদি কেউ ইসলামবিরোধী কাজ করতে বাধ্য হয়; তবে এই আয়াতের আলোকে তার অপরাধ ক্ষমাযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে বিদ্বানগণ কিছু বিধিবিধানকে এই ক্ষমার আওতার বাইরে রেখেছেন। যেমন— কাউকে যদি নিষ্পাপ শিশু হত্যা করতে অথবা ব্যভিচার করতে বাধ্য করা হয় তবে তার উচিত হবে তা পালন করা থেকে বিরত থাকা এবং জীবনের ঝুঁকি তথা মৃত্যুকে প্রাধান্য দেওয়া।

মোটকথা হলো, ইসলাম একটি উদার, সহজ, কল্যাণকর ও সার্বজনীন জীবনবিধান। ইসলামে অনেক বিধিবিধানকে হালকা ও সহজ করে দেওয়া হয়েছে যা অন্যান্য উম্মতের জন্য কঠিন ও কষ্টসাধ্য ছিল। আলোচ্য হাদীছে বর্ণিত সুযোগ-সুবিধা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কেননা এই উম্মত মর্যাদার বিচারে অন্যান্য উম্মতের চাইতে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মহান নেয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন। তাইতো সকল প্রশংসা একমাত্র তাঁর জন্য। আল্লাহ আমাদের তাঁর শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন! ছুম্মা আমীন!!


[1]. ইবনু মাজাহ, হা/২০৪৩, হাদীছ হাসান; বায়হাক্বী কুবরা, হা/১৫৯০।

[2]. শারহু মাতনিল আরবাঈনান নাবাবিয়্যা লিন নাবাবী, পৃ. ১২৯।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৪৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮০২।