মুসলিম পরিবার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

মূল : শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ছলেহ আল-উছায়মীন
অনুবাদ : ড. আব্দুল্লাহিল কাফী
পিএইচ. ডি., মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব। 

(পর্ব-২)

প্রশ্ন : আমরা জানি, মাহরাম পুরুষের (যে সব পুরুষের সাথে নারীর চিরকাল বিবাহ হারাম) সামনে মুখ খোলা রাখা যায়। আর চাচা হচ্ছেন, মাহরামদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কোনো নারীর সাথে তার আপন চাচা যদি অশ্লীল রসিকতা করে, তাহলে কি ঐ নারী তার চাচার থেকে দূরে থাকবে বা মুখ ঢেকে রাখবে?

উত্তর : এমতাবস্থায় চাচার নিকটে আসা এবং তার সামনে মুখ খোলা রাখা ভাতিজীদের উচিত নয়। কেননা যে সকল বিদ্বান মাহরাম পুরুষের সামনে মুখ খোলা রাখা বৈধ বলেছেন, তারা কোনরূপ ফিতনার আশঙ্কা না থাকাকে শর্তারোপ করেছেন। আর প্রশ্নে উল্লেখিত অশ্লীল রসিকতাকারী ব্যক্তির (চাচা) ক্ষেত্রে ফিতনার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব, ফিতনার উপকরণ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য।

যদি কোনো নারীকে নিয়ে মাহরাম পুরুষের যৌনাকাক্সক্ষা জাগে, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা যদি কুরআনের ভাষাশৈলীর দিকে খেয়াল করি, তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَنكِحُواْ مَا نَكَحَ ءَابَآؤُكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَۚ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةٗ وَمَقۡتٗا وَسَآءَ سَبِيلًا ‘নারীদের মধ্যে তোমাদের পিতৃপুরুষ যাদেরকে বিয়ে করেছে, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না; তবে পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে (সেটি ক্ষমা করা হলো) নিশ্চয় তা ছিল অশ্লীল, মারাত্মক ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট পন্থা’ (নিসা, ২২)। যিনার ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি বলেন, وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلزِّنَىٰٓۖ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةٗ وَسَآءَ سَبِيلٗا ‘তোমরা যিনার ধারেকাছেও যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ’ (বানী ইসরাঈল, ৩২)।

উপর্যুক্ত দু’টি আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মাহরাম নারীদের বিবাহ করা যিনার থেকে নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য কাজ।

মোদ্দাকথা, ভাতিজীদের উচিত তাদের ঐ চাচা থেকে দূরে থাকা এবং তার সামনে মুখ না খোলা। কেননা চাচার অশ্লীল রসিকতা যথেষ্ট সন্দেহজনক।

প্রশ্ন : অমুসলিম নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন নয়, বরং স্বামীকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে একজন নারী কি আধুনিক পদ্ধতিতে চুলের ডিজাইন করতে পারে?

উত্তর : আমি যতটুকু জানি, আধুনিক পদ্ধতিতে চুলের ডিজাইন করা অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার, যা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। আমি মুসলিম নারীদেরকে এ বিষয়ে নছীহত করব, তারা যেন এরকম বিলাসিতা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে এবং স্বামীদের জন্য রূপসজ্জার বিষয়ে মিতব্যয়ী হয়। কেননা রাসূল (ছা.) সম্পদ অপচয় করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

 

প্রশ্ন : কোনো কোনো নারীকে বাজার থেকে ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিনতে দেখা যায়। যদিও এসব ফ্যাশন এবং পশ্চিমাদের অনুকরণ তাদের উদ্দেশ্য নয়, তবুও কি তা অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন বলে গণ্য হবে? অবশ্য অনেক মহিলা পশ্চিমাদের তৈরি পোশাক এবং অন্যান্য পণ্য ব্যাপকহারে ব্যবহার করছে।

উত্তর : এরকম অনেক ম্যাগাজিন আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে, যেগুলো নোংরা, অশ্লীল ও উলঙ্গ ছবিতে পরিপূর্ণ। সঊদী আরবের মতো দেশে এমন ম্যাগাজিন কখনোই মানানসই নয়। কারণ, শরী‘আতের বিধি-বিধান এবং উত্তম চরিত্র সংরক্ষণে এই দেশের কোনো তুলনা হয় না।

আমাদের দেশের বাজার এবং টেইলার্সে এসব ম্যাগাজিন দেখে অনেক বিস্মিত হই। ম্যাগাজিনগুলোর ছবি প্রকাশিত খবরের থেকে বেশি অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ। নারী হোক বা পুরুষ হোক কারও জন্যই এসব ম্যাগাজিন ক্রয় করা অথবা সেগুলো দেখা বা পড়া উচিত নয়। কারণ, এগুলো ফিতনা বৈ অন্য কিছুই নয়।

কোনো ব্যক্তি হয়তো এসব ম্যাগাজিন কেনার সময় মনে করতে পারে, সে এসবের অনুকরণ করা থেকে নিরাপদে থাকবে। কিন্তু তার কুপ্রবৃত্তি ও শয়তান তাকে এসব পোশাক ক্রয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ফ্যাশন ম্যাগাজিন থেকে সে এমন একটি পোশাক বাছাই করে, যেটি ইসলামী পরিবেশে অনুপযোগী।

আমি নারীদেরকে এবং সাথে তাদের কর্তাদেরকেও এসব ম্যাগাজিন বাড়ীতে রাখা থেকে সাবধান করছি! কারণ, এগুলো আমাদের দ্বীন ও চরিত্র রক্ষার ক্ষেত্রে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

 

প্রশ্ন : আমরা জানি, মুখ ঢাকার জন্য নারীরা যে নিকাব ব্যবহার করে তার কয়েকটি স্তর রয়েছে। প্রশ্ন হলো, মুখ ঢাকার জন্য কয় স্তরের নিকাব ব্যবহার করা অপরিহার্য?

উত্তর : নারীর উপর কর্তব্য হলো, বেগানা পুরুষের সামনে মুখমণ্ডল এমনভাবে ঢেকে রাখবে, যাতে তার ত্বকের রং বুঝা না যায়, চাই এক স্তরের নিকাব ব্যবহার করে হোক, অথবা দুই বা ততোধিক স্তরের নিকাব ব্যবহার করে হোক।

যদি কাপড়টি এমন পুরু হয় যে, তার ত্বক বুঝা যাবে না, তাহলে এক স্তরই যথেষ্ট। আর যদি এক স্তর দিয়ে ভালোভাবে না ঢাকে, তাহলে দুই, তিন, চার স্তর পর্যন্ত ব্যবহার করতে হবে। মোদ্দাকথা, এমনভাবে ঢাকতে হবে, যাতে তার রং প্রকাশ না পায়। আর যদি রং বুঝা যায়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়, যেমনটি কোনো কোনো নারীরা করে থাকে। মুখের উপর কোনো কিছু দিলেই চলবে, এমনটি উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো, বেগানা পুরুষের সামনে ভালোভাবে মুখণ্ডল ঢেকে রাখা, যাতে কোনোকিছুই প্রকাশিত না হয়।

মুসলিম নারীরা যেন নিজেদের এবং সমাজের অন্যান্য নারীর বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করে। কোনো নারী যদি সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল খোলা রেখে অথবা নামে মাত্র সামান্য অংশ ঢেকে বাইরে বের হয়, তাহলে তাকে দেখে আরেকজন অনুসরণ করবে। এভাবে একজন দুইজন করতে করতে সকল নারী মুখ খোলা রেখে বাইরে বের হওয়া শুরু করবে। রাসূল (ছা.) বলেন,  مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً، فَعَلَيْهِ وِزْرُهَا، وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْئًا ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ প্রথা চালু করবে, তার জন্য তার গুনাহ তো রয়েছেই, উপরন্তু সে খারাপ প্রথার যারা অনুসরণ করবে, তাদের সমপরিমাণ গুনাহও তার জন্য রয়েছে। অবশ্য তাদের গুনাহ বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না’।[1]

আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের এ ভূখণ্ডে (সঊদী আরব) ইবাদত, আখলাক্ব, পারস্পরিক লেনদেন তথা সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিধান বাস্তবায়িত হচ্ছে। যে ভূখণ্ড থেকে ইসলামের আলো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে এবং শেষ যুগে সেখানেই আবার ফিরে আসবে, সে ভূখণ্ডের অবস্থা এমনটিই হওয়া কাম্য। অতএব, আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে দ্বীনের বিধি-নিষেধ মেনে চলা এবং উত্তম চরিত্রে ভূষিত হওয়া। আর তবেই আমরা হতে পারব সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদেরকে মহান আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।

নবাগত প্রতিটি বিষয়কে গ্রহণ করা আমাদের জন্য সমীচীন নয়, বরং ভালোভাবে তা যাচাই-বাছাই করা উচিত। তাতে যদি আমাদের সার্বিক কল্যাণ থাকে এবং শারঈ কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকে, তাহলে আমরা সেটি গ্রহণ করব। পক্ষান্তরে যদি সেটিতে শারঈ নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাহলে আমরা তা বর্জন করব এবং আমাদের সমাজ থেকে বিতাড়ন করব, যাতে আমরা আমাদের দ্বীন, আখলাক্ব ও পারস্পরিক সুসম্পর্কের উপর দৃঢ় থাকতে পারি।

 

প্রশ্ন : অনেক নারী তাদের জামার পিছন খোলা রেখে চেইন বা বোতাম ব্যবহার করে। যখন জামা পরে, তখন চেইন খুলে দেয়, যাতে পরতে সুবিধা হয়। আবার জামা খোলার সময় একই কাজ করে। প্রশ্ন হলো, এমন জামা ব্যবহারের হুকুম কী?

উত্তর : এরকম পোশাক ব্যবহারে কোনো আপত্তি নেই। তবে অমুসলিম নারীদের অনুকরণ করা উদ্দেশ্য হলে ভিন্ন হুকুম। অবশ্য বর্তমানে মুসলিম নারীরা এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে, বিশেষ করে ছোটরা।

ইবাদত ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে শরী‘আতের মূলনীতি হচ্ছে, বৈধতা, যতক্ষণ না কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়। যেমন- বিভিন্ন রীতি-নীতি, পারস্পরিক লেনদেন, খাবার-পানীয় ইত্যাদি। পক্ষান্তরে ইবাদতের ক্ষেত্রে শরী‘আতের মূলনীতি হচ্ছে- নিষিদ্ধতা, যতক্ষণ না কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা বৈধতা সাব্যস্ত হয়।

প্রশ্ন : অনেক নারী মসজিদে হারামে মুখ খোলা রাখার হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। কেননা কারও কাছ থেকে তারা শুনেছে যে, মসজিদে হারামে এবং উমরাহ অবস্থায় নারীদের মুখ খোলা রাখা বৈধ। এ বিষয়ে সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর : সঠিক কথা হলো, কোনো স্থানেই নারীদের মুখ খোলা রাখা বৈধ নয়, চাই তা মসজিদে হারামে হোক অথবা বাজারে হোক অথবা অন্য কোনো মসজিদে হোক; বরং বেগানা পুরুষের সামনে মুখ ঢেকে রাখা নারীদের উপর ওয়াজিব। কেননা নারীর মুখমণ্ডল আওরাতের (গোপনাঙ্গ) অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআন, ছহীহ সুন্নাহ এবং নির্ভুল গবেষণার ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বেগানা পুরুষের সামনে নারীরা অবশ্যই মুখ ঢেকে রাখবে। কেননা তাদের সামনে মুখ খোলা রাখলে ফিতনা এবং কাম প্রবৃত্তি জাগ্রত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যেসব নারী তাদের মুখমণ্ডল, চুল, ঘাড়, বুকের উপরিভাগ, দুই হাত সম্পূর্ণরূপে খোলা রেখে বাজারে বাজারে বেহায়াপনা করে বেড়ায়, তাদের দ্বারা সতী-সাধ্বী নারীরা যেন প্রভাবিত না হয়। তারা এমনভাবে বাজারে চলাফেরা করে, যেন বাড়ীতেই অবস্থান করছে।

নারীদের উচিত, সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা। রাসূল (ছা.) বলেন, ‘পুরুষের জন্য নারী জাতি অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে গেলাম না’।[2]

কোনো নারী হজ্জ বা উমরার জন্য ইহরাম বাঁধলে, ঘরে বা তাঁবুতে মুখ খোলা রাখা তার জন্য বৈধ। তবে পাশে কোনো বেগানা পুরুষ থাকলে মুখ ঢেকে রাখা অপরিহার্য, চাই সে মসজিদে অথবা অন্য কোনো স্থানে থাকুক।

প্রশ্ন : কোনো কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে নারীদেরকে ফ্রক পরতে দেখা যায়, যা হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে থাকে। এমনকি অনেকে হাঁটুর উপরেও উঠিয়ে নেয়। শরীআতে এ জাতীয় পোশাক পরিধানের হুকুম কী? যেসব নারীরা পর্দার বিধানকে অবহেলা করে, তাদের প্রতি আপনার নছীহত কী?

উত্তর : বেগানা পুরুষের সামনে পায়ের নলা বের করে রাখা নিঃসন্দেহে হারাম। তবে মুখ খোলা রাখা তার থেকে গুরুতর অন্যায়। কেননা পায়ের নলার তুলনায় মুখ দেখে পুরুষরা বেশি আকৃষ্ট হয়। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ দ্বারা পর্দার অপরিহার্যতা সাব্যস্ত হয়েছে। আমি ‘রিসালাতুল হিজাব’ নামক একটি পুস্তিকায় বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি। নারীদের মুখ খোলা রাখার বৈধতা প্রমাণের জন্য যে সমস্ত হাদীছকে দলীল হিসাবে পেশ করা হয়, সেগুলোর জবাব প্রথমে সংক্ষিপ্তভাবে এবং পরে বিস্তারিতভাবে দিয়েছি।

যেসব নারী হাঁটু পর্যন্ত অথবা হাঁটুর উপরিভাগ পর্যন্ত ঝুলিয়ে ফ্রক পরে, তারা যেন সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে এবং এ নিকৃষ্ট প্রথা সমাজে চালু হওয়ার কারণ না হয়। রাসূল (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ প্রথা চালু করবে, তার জন্য তার গুনাহ তো রয়েছেই, উপরন্তু সে খারাপ প্রথার যারা অনুসরণ করবে, তাদের সমপরিমাণ গুনাহও তার জন্য রয়েছে। অবশ্য তাদের গুনাহ বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না’।[3]

 

প্রশ্ন : রাসূল (ছা.) বলেন, صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا، قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ، وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتٌ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَاজাহান্নামীদের মধ্যে দুই শ্রেণির মানুষকে আমি এখনো বাস্তবে দেখিনি। এক. ঐ সমস্ত মানুষ, যাদের নিকট গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকজনকে অন্যায়ভাবে প্রহার করবে। দুই. ঐ সমস্ত মহিলা, যারা পোশাক পরা সত্ত্বেও তাদের নগ্নতা প্রকাশ পায়, আকর্ষণকারিণী ও আকৃষ্টা। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের উঁচু কুঁজের ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি এত-এত দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। আমার প্রশ্ন, হাদীছে বর্ণিত مُمِيلَاتٌ শব্দের অর্থ কী? যেসব নারী এমনভাবে চুল আঁচড়ায়, যাতে পুরুষরা আকৃষ্ট হয়, مُمِيلَاتٌ দ্বারা কি তাদেরকে বুঝানো হয়েছে? নাকি পুরুষদের প্রতি আকৃষ্টা নারীরা এখানে উদ্দেশ্য?

উত্তর : উক্ত হাদীছে রাসূল (ছা.) জাহান্নামের দুই প্রকার মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, ‘ঐ সমস্ত মহিলা, যারা পোশাক পরা সত্ত্বেও তাদের নগ্নতা প্রকাশ পায়, আকর্ষণকারিণী ও আকৃষ্টা। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের উঁচু কুঁজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি এত-এত দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়’।

আমভাবে مَائِلَاتٌ বলতে পোশাক, চলাফেরা, কথাবার্তা ও অন্যান্য বিষয়ে সহজ-সরল পথ থেকে বিচ্যুত সবকিছুকে বুঝায়। আর مُمِيلَاتٌ হচ্ছে ঐ সমস্ত নারী, যারা অন্যদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এমন কিছু ব্যবহার করে, যা মূলত ফিতনা সৃষ্টি করে। পুরুষদের জন্য আকর্ষকভাবে চুল আঁচড়ানোও এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অতএব, এভাবে নারীদের চুল আঁচড়ানো উচিত নয়। কারণ, এতে হাদীছে বর্ণিত বিশেষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়ে শিথিলতা করা কোনোক্রমেই নারীদের জন্য শোভনীয় নয়। সকল প্রকার সন্দেহযুক্ত বিষয় পরিত্যাগ করা একজন মানুষের জন্য কল্যাণকর ও নিরাপদ। চুল আঁচড়ানোর অনেক বৈধ পন্থা রয়েছে। অতএব, হারাম পন্থা অবলম্বনের কোনো সুযোগ নেই।

প্রশ্ন : কোনো কোনো ব্যক্তি তার কন্যাদেরকে বেগানা ড্রাইভারের সাথে স্কুল-কলেজ বা অন্যান্য স্থানে পাঠায়। কিন্তু তারা এর ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে একটুও ভাবে না। এ বিষয়ে আপনার নছীহত কামনা করছি।

উত্তর : এর দু’টি অবস্থা হতে পারে: (১) কয়েকজন নারী এক সাথে থাকা। এ অবস্থায় বাসা থেকে নিকটে কোথাও গেলে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ, রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন অন্য নারীর সঙ্গে নিভৃতে অবস্থান না করে’।[4] অতএব, কয়েকজন নারীর সাথে একজন পুরুষ থাকলে সেটিকে নির্জনতা বলার সুযোগ নেই। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, ড্রাইভার যেন বিশ্বস্ত হয়। ড্রাইভার যদি বিশ্বস্ত না হয়, তাহলে কয়েকজন নারী একসাথে থাকলেও ঐ ড্রাইভারের সাথে কোথাও বের হওয়া অনুচিত।

(২) শুধুমাত্র একজন নারীর ড্রাইভারের সাথে বের হওয়া। এটি এক মিনিটের জন্যও বৈধ নয়। কারণ, এটি স্পষ্ট নির্জনতা, যা থেকে রাসূল (ছা.) সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কোনো পুরুষ যেন অন্য নারীর সঙ্গে নিভৃতে অবস্থান না করে’।[5] কারণ, শয়তান তাদের মধ্যে তৃতীয়জন হয়ে তাদেরকে অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে।

অতএব, বেগানা ড্রাইভারের সাথে কন্যাদেরকে একাকী কোথাও পাঠানো অভিভাবকদের জন্য জায়েয নেই। সাথে সাথে মাহরাম ছাড়া একাকী ড্রাইভারের সাথে যাওয়াও একজন নারীর জন্য হারাম। কারণ, এটি রাসূল (ছা.)-এর নাফরমানী। আর যে রাসূল (ছা.)-এর নাফরমানী করে, সে মূলত আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানী করে। মহান আল্লাহ বলেন, مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ‘যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল’ (নিসা, ৮০)। তিনি আরও বলেন, وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল, সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো’ (আহযাব, ৩৬)।

অতএব, হে মুসলিম ভায়েরা! আমাদের উপর কর্তব্য হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছা.)-এর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর অনুগত হওয়া। আর এতেই রয়েছে আমাদের জন্য মহাকল্যাণ এবং উত্তম প্রতিদান। আমরা যেন আমাদের স্ত্রী-সন্তানদের এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হই। তাদের নিয়ে খেলা করার জন্য শয়তানকে সুযোগ না করে দেই। কারণ, শয়তান সর্বদা ভ্রষ্টতা ও ফিতনার দিকে নিয়ে যায়।

আমি মুসলিম ভাইদেরকে অনুরোধ করবো, তারা যেন দুনিয়ার চাকচিক্যের মোহে অন্ধ ও উদাসীন না হয়ে যায়। আমরা মহান আল্লাহর  নিম্নোক্ত বাণীগুলো স্মরণ করবো, তিনি বলেছেন, وَأَصْحَابُ الشِّمَالِ مَا أَصْحَابُ الشِّمَالِ – فِي سَمُومٍ وَحَمِيمٍ – وَظِلٍّ مِنْ يَحْمُومٍ – لَا بَارِدٍ وَلَا كَرِيمٍ – إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُتْرَفِينَ – وَكَانُوا يُصِرُّونَ عَلَى الْحِنْثِ الْعَظِيمِ ‘আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে। আর কালোবর্ণের ধোঁয়ার ছায়ায়, যা শীতল নয়, আরামদায়কও নয়। ইতোপূর্বে তারা তো ছিল ভোগ-বিলাসে মত্ত। আর তারা অবিরাম লিপ্ত ছিল ঘোরতর পাপকাজে’ (ওয়াক্বি‘আহ, ৪১-৪৬)। তিনি আরও বলেন, وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ – فَسَوْفَ يَدْعُو ثُبُورًا – وَيَصْلَى سَعِيرًا – إِنَّهُ كَانَ فِي أَهْلِهِ مَسْرُورًا ‘পক্ষান্তরে যার আমলনামা তাকে পিছন দিক থেকে দেওয়া হবে। ফলে সে মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এই ব্যক্তি দুনিয়ায় স্বীয় পরিজনের মধ্যে সানন্দে ছিল’ (ইনশিক্বাক, ১০-১৩)।

প্রশ্ন : নারীদের মাথার চুল কাটা কি বৈধ না অবৈধ? জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর : নারীরা যদি হজ্জ বা উমরাহ করে তাদের মাথার চুল কাটে, তাহলে সেটি ইবাদত হিসাবে গণ্য হবে এবং ছওয়াবও লাভ করবে। কেননা নারীরা হজ্জ বা উমরাহ করলে আঙ্গুলের অগ্রভাগ পরিমাণ প্রত্যকটি চুল কাটা অপরিহার্য হয়ে যায়।

কিন্তু হজ্জ বা উমরাহ ছাড়া কোনো নারী যদি এমনভাবে চুল ছোট করে, যাতে পুরুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়, তাহলে এটি হারাম এবং কাবীরাহ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, পুরুষের বেশধারী নারীকে এবং নারীর বেশধারী পুরুষকে আল্লাহর  রাসূল (ছা.) অভিশাপ দিয়েছেন।[6]

তবে কোনো নারী যদি তার মাথার চুল কোনো এক পাশ থেকে সামান্য কাটে, যাতে তার মাথার আকৃতির কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে হাম্বালী মাযহাবের ফক্বীহগণ এটিকে মাকরূহ বলে সাব্যস্ত করেছেন। অতএব আমি বলবো, হজ্জ বা উমরাহ ছাড়া কোনো নারী যেন তার মাথার চুল না কাটে।

প্রশ্ন : নারীরা কি পিছন দিক থেকে কাঁধ পর্যন্ত চুল ছোট করতে পারবে?

উত্তর : হজ্জ বা উমরাহ ছাড়া নারীদের মাথার চুল কাটাকে বিদ্বানগণ মাকরূহ বলেছেন। হাম্বালী মাযহাবে এটিই প্রসিদ্ধ মত। কোনো কোনো বিদ্বান এটিকে স্পষ্ট হারাম বলেছেন। আবার কেউ কেউ শর্ত সাপেক্ষে বৈধ বলেছেন। শর্ত হলো, চুল এমনভাবে কাটবে, যাতে অমুসলিম নারীদের অথবা পুরুষদের সাদৃশ্যপূর্ণ না হয়। পুরুষদের সাদৃশ অবলম্বন করা নারীদের জন্য হারাম, বরং কাবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা পুরুষের বেশধারী নারীকে এবং নারীর বেশধারী পুরুষকে আল্লাহর রাসূল (ছা.) অভিশাপ দিয়েছেন।[7] অতএব, কোনো নারী যদি তার মাথার আকৃতি পুরুষের মাথার অনুরূপ করে, তাহলে সে অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হবে।

অন্যদিকে অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন সম্পর্কে রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করল, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হলো’।[8]

অতএব, সামনের দিক থেকে হোক বা পিছনের দিক থেকে হোক নারীরা যেন কোনক্রমেই মাথার চুল না কাটে। আমাদের নারী সমাজ বাইরের দেশ থেকে আসা ভালো-মন্দ প্রত্যেক রীতিকে গ্রহণ করবে, এটি আমি ভালো মনে করি না। আমরা যদি এতই উদার হই যে, বাইরের সবকিছু গ্রহণ করব, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। দেখা যাবে, অন্যান্য জায়গার মতো আমাদের নারীরাও মুখ খোলা রেখে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়াচ্ছে, যেটি শরী‘আতে হারাম।

(চলবে)

[1]. মুসলিম, হা/১০১৭।

[2]. বুখারী, হা/৫০৯৬।

[3].  মুসলিম, হা/১০১৭।

[4]. বুখারী, হা/৩০০৬।

[5]. বুখারী, হা/৩০০৬।

[6]. বুখারী, হা/৫৮৮৫।

[7]. বুখারী, হা/৫৮৮৫।

[8]. আবুদাঊদ, হা/৪০৩১।