মুসলিম পরিবার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

অনুবাদ : ড. আব্দুল্লাহিল কাফী
পিএইচডি, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
সঊদী আরব।

(পর্ব-৫)

প্রশ্ন : মাহরাম পুরুষ এবং নারীদের সামনে টাইট পোশাক পরার হুকুম কী?

উত্তর : যে টাইট পোশাক  নারীদের শরীরের স্পর্শকাতর স্থানগুলোকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, সে পোশাক পরা হারাম। কেননা নবী (ছা.) বলেছেন,

صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا، قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ، وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ، مَائِلَاتٌ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا

‘দুই শ্রেণির জাহান্নামী মানুষ রয়েছে। যাদেরকে আমি এখনো দেখিনি। এক. ঐ সমস্ত মানুষ, যাদের নিকট গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে। এর দ্বারা তারা লোকজনকে অন্যায়ভাবে প্রহার করবে। দুই. ঐ সমস্ত মহিলা, যারা পোশাক পরা সত্ত্বেও তাদের নগ্নতা প্রকাশ পায়, আকর্ষণকারিণী ও আকৃষ্টা। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের উঁচু কুঁজের ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, এমনকি জান্নাতের সুঘ্রানও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি এতো এতো দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়’।[1]  হাদীছে বর্ণিত كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, তারা এমন খাটো পোশাক পরবে যে, তাদের লজ্জাস্থান পুরোপুরি ঢাকবে না। আবার কেউ কেউ বলেন, তারা এমন পাতলা পোশাক পরবে যে, তাদের শরীর দেখতে কোনো অসুবিধা হবে না। আবার অনেকেই বলেন, তারা এমন টাইট পোশাক পরে যে, তাদের শরীর দেখা না গেলেও তাদের স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। অতএব, স্বামী ছাড়া অন্য কারও সামনে টাইট পোশাক পরে নিজের লজ্জাস্থান প্রকাশ করা যাবে না। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে লজ্জাস্থান বলে কিছু নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা অবৈধ কাম-প্রবৃত্তি হতে নিজ লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে। কিন্তু নিজ স্ত্রীগণ এবং শরী‘আতসম্মত নিজ দাসীগণ ব্যতীত। কেননা এক্ষেত্রে তাদেরকে দোষারোপ করা হয় না’। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি এবং রাসূল (ছা.) একসাথে এক পাত্র থেকে ফরয গোসল করতাম। পাত্র থেকে পর্যায়ক্রমে তিনি একবার পানি নিতেন, আমি একবার নিতাম’।[2]   বুঝা গেল, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে লজ্জাস্থান বলে কিছু নেই।

কিন্তু নারী যখন মাহরাম পুরুষ এবং অন্যান্য নারীর মাঝে থাকবে, তখন লজ্জাস্থান ভালোভাবে ঢেকে রাখবে। সে কারণে অতিরিক্ত টাইট পোশাক মাহরাম পুরুষ কিংবা অন্যান্য নারীদের সামনেও পরা যাবে না।

প্রশ্ন : কিছু কিছু দেশে মুসলিম নারীদেরকে পর্দা পরিহার করতে বাধ্য করা হয়। বিশেষ করে মাথার স্কার্প পরা নিষিদ্ধ থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, নারীদের জন্য এ অবস্থায় পর্দা পরিহার করা কি বৈধ হবে? জানা আবশ্যক যে, কোনো নারী যদি পর্দা করে, তাহলে তাকে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হওয়াসহ নানা শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়।

উত্তর : এ সমস্যাটি কিছু কিছু দেশে দেখা যায়, যা মূলত বান্দার জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। মহান আল্লাহ বলেন,

الم – أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ – وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ

 ‘আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি ধারণা করেছে যে, তারা এ কথা বলে পরিত্রাণ পেয়ে যাবে, আমরা ঈমান এনেছি, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদের পূর্বের সম্প্রদায়কেও পরীক্ষা করেছিলাম। সুতরাং আল্লাহ জানতে পারবেন কে সত্য বলেছে এবং কে মিথ্যারোপ করেছে’ (আনকাবূত, ১-৩)।

আমি মনে করি, এ সমস্ত দেশে বসবাসরত নারীদের উপর কর্তব্য হলো, শরী‘আত বিরোধী এ আদেশে শাসকের আনুগত্য না করা। কেননা অন্যায় ক্ষেত্রে শাসকের আনুগত্য বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো তোমাদের শাসকগণের’ (নিসা, ৫৯)। আপনি যদি মহান আল্লাহর এ বাণী নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন (أَطِيعُوا) ক্রিয়াটি শাসকগণের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি করা হয়নি। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে, শাসকের আনুগত্য আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের অনুগামী। শাসকের নির্দেশ যদি আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর নির্দেশের পরিপন্থী হয়, তাহলে তাদের আনুগত্য চলবে না। রাসূল (ছা.) বলেন,

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ

‘স্ররষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য চলবে না’।[3]

নারীরা পর্দা করার কারণে যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তাতে ধৈর্যধারণ করা অপরিহার্য। সাথে সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, তিনি যেন ধৈর্যধারণ করার তাওফীক্ব দান করেন। আমরাও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এসব শাসককে সত্যের পথে পরিচালিত করেন। আমি মনে করি, নারীরা বাড়ি থেকে বের হয় বলে তাদের উপর এমন কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। তারা বাড়িতে অবস্থান করলে এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। তারা ইচ্ছা করলে বাইরে বের না হয়ে নিজেদেরকে নিরাপদে রাখতে পারে। যে শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে কুরআন-হাদীছের অবাধ্য হতে হয়, সে শিক্ষা অর্জন করা বৈধ নয়। ঐ সমস্ত নারীদের উচিত, দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করা। আর এটি অধিকাংশ সময় বাড়িতে বসেই অর্জন করা সম্ভব এবং যথেষ্টও বটে।

প্রশ্ন : নিঃসন্দেহে আপনি জানেন, নারীদেরকে নিয়ে যে ফিতনা হয়, তা মূলত তাদের দেহ কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। যদি তাদের দেহ উন্মুক্ত থাকে, তাহলে ফিতনা সৃষ্টি হয় এবং অনিষ্ট ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, নারীরা তাদের দেহের কতটুকু অংশ বের করে রাখতে পারবে? একজন নারী কি আরেকজন নারীর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতে পারবে?

উত্তর : শরীরের সর্বাংশ আবৃত করে এমন শারঈ পোশাক পরিধান করা একজন মুসলিম নারীর উপর অপরিহার্য। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াসহ আরও অনেক বিদ্বান বলেছেন, বাড়িতে অবস্থানকালে নারী ছাহাবীদের পোশাক ছিল হাতের কব্জি থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত। আর বাইরে বের হলে তার থেকে লম্বা পোশাক পরিধান করতেন, যা তাদের পা থেকে এক বিঘত পরিমাণ দীর্ঘ ছিল। রাসূল (ছা.) তাদেরকে এক হাত পরিমাণ লম্বা করার অনুমতি দিয়েছেন, যাতে করে পা সম্পূর্ণ ঢেকে যায়। এভাবে পোশাক পরিধান করলে একজন নারী পূর্ণ পর্দানশিন হিসাবে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে যে নারী খাটো পোশাক পরবে, সে অর্ধনগ্ন হিসাবে গণ্য হবে।

একজন নারীর জন্য অন্য নারীর লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো বৈধ নয়। অর্থাৎ তার নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত দেখতে পারবে না। যেমন- কোনো নারী যদি পায়খানা বা পেশাবরত অবস্থায় থাকে, তাহলে অন্য নারী তার দিকে তাকাতে পারবে না। কেননা তার দিকে তাকালে তার লজ্জাস্থানের দিকে চোখ পড়বে। তবে নাভির উপরের অংশ এবং হাঁটুর নিচের অংশ যদি কোনো কারণে বের হয়ে যায়, যেমন- কাদামাটিতে চলার সময় অথবা পায়ের নলা ধোয়ার জন্য কাপড় উপরে উঠায়, আর সেখানে অন্য কোনো নারী থাকে, তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। এমনিভাবে সে যদি বাচ্চাকে দুধ পান করানোর জন্য অন্য নারীদের সামনে তার স্তন বের করে, তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। তবে আমার এ কথা থেকে কেউ যেন এমন না বুঝে যে, যেমনটি কোনো কোনো অজ্ঞ মহিলা বলে থাকে, অন্যান্য নারীর সামনে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকবে, এমন একটি পায়জামা পরলেই চলবে। এটি স্পষ্ট ভুল ধারণা। কুরআন, সুন্নাহ, আল্লাহ প্রেরিত বিধি-বিধান এবং সালাফে-ছালেহীন সম্পর্কে ভুল ধারণা। এটি কি কোনো মুসলিম নারীর পোশাক হতে পারে? কখনই না।

হাতের কব্জি থেকে শুরু করে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকে এমন পোশাক পরিধান করা একজন নারীর উপর অপরিহার্য। কিন্তু কোনো কারণে সে যদি পোশাক খুলে, তাহলে অন্য নারীরা তার বুক এবং হাঁটুর নিচের অংশ দেখতে পারে, কিন্তু নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত দেখতে পারবে না।

(চলবে)

[1]. মুসলিম, হা/২১২৮।

[2]. বুখারী, হা/২৬১; মুসলিম, হা/৩২১।

[3]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৯৫।