‘মূর্তি বিড়ম্বনার ইসলামি আঙ্গিক শীর্ষক প্রবন্ধের পর্যালোচনা

-আহমাদুল্লাহ*


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

হাদীছ-৬ : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, একদা তাকিয়ে দেখেন যে, তাঁর খাটের নিচে একটি কুকুরের বাচ্চা। তিনি বললেন, হে আয়েশা! এটি কখন এখানে প্রবেশ করল? আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি জানি না। তখন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটি বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং সেটাকে বের করে দেওয়া হলো। অতঃপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এলেন। তখন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  তাকে বললেন, আপনি আমাকে ওয়াদা দিয়েছিলেন। সে মতে আমি বসেছিলাম। কিন্তু আপনি এলেন না।*উত্তরে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার ঘরের কুকুর আমাকে বাধা দিয়েছিল। কারণ আমরা ঐ ঘরে প্রবেশ করি না, যেখানে কুকুর অথবা ছবি থাকে’।[1]

উপরিউক্ত হাদীছগুলো দ্বারা প্রতীয়মান হলো, ছবি, ভাস্কর্য, মূর্তি সবই হারাম। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর একটি হাদীছ গ্রহণ করে তার বাকি হাদীছগুলো বর্জন করার কারণটি বোধগম্য নয়। এছাড়াও এখানে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দয়ার প্রমাণ মেলে। তিনি চাইলে ধমক মেরে খেলতে নিষেধ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

৬. হাসান সাহেব লিখেছেন, সহি বুখারির ব্যাখ্যা শুনুন। হাদিসটার ফুটনোটে ‘ফতহুল বারি’র লেখক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানীর উদ্ধৃতি: ‘পুতুল ও একই রকম ইমেজ অবৈধ কিন্তু ইহা বৈধ করা হইয়াছিল তখন আয়েশার (রা.) জন্য। কারণ তিনি ছিলেন ছোট বালিকা, তখনও তিনি বয়স্কা হননি’। (ফতহুল বারি, পৃষ্ঠা ১৪৩, ১৩ খণ্ড)

নবী (সা.) পুতুল বৈধ করেছিলেন এটাই আসল কথা। কী কারণে করেছিলেন সেটা ইমামের জানা সম্ভব নয়। কারণ তিনি রাসুলের (সা.) ৮০০ বছর পরের হাজার মাইল দূরে মিসরের লোক, রাসুলের (সা.) সঙ্গে তাঁর দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি। ওটা তাঁর ব্যক্তিগত মত মাত্র।

জবাব : হাসান সাহেবের এমন কথা শুনে যে কেউ বুঝবেন যে, এটা তার জ্ঞানের অভাব।

প্রথমত, ইবনে হাজারের কথাগুলো তার নিজের মত নয়; বরং তিনি সকল হাদীছ পর্যালোচনা করেই বলেছেন। আমরা উপরে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ৬টি হাদীছ দেখেছি। যেগুলো প্রমাণ করে, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর পরবর্তী সময়ে পুতুল তো দূরে থাক; ছবিযুক্ত কাপড়ও রাখার অনুমতি পাননি।

দ্বিতীয়ত, ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) ছহীহ বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’র গ্রন্থের শুরুতে এর সনদ বা সূত্র উল্লেখ করেছেন।[2] এটা মোট ১৪টি বৃহদায়তন খণ্ডে সমাপ্ত শ্রেষ্ঠতম একটি ব্যাখ্যা গ্রন্থ, যা গোটা বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত আল-হামদুলিল্লাহ। আগ্রহী পাঠকগণ সনদটি সেখান হতে দেখে নেওয়ার জন্য অনুরোধ রইল। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় আমরা এখানে তা উল্লেখ করলাম না।

৭. হাসান সাহেব লিখেছেন, তখন কাবার দেয়ালে ৩৬০টি মূর্তি (বুখারি ৩য় খণ্ড – ৬৫৮) ও অনেক ছবির সঙ্গে ছিল হযরত ঈসা (আ.) ও মাতা মেরির ছবিও। উদ্ধৃতি দিচ্ছি, ‘রাসুল (সা.) হযরত ঈসা (আ.) ও মাতা মেরির ছবি বাদে বাকি সব ছবি মুছিয়া ফেলিতে নির্দেশ দিলেন’। (সিরাত (ইবনে হিশাম/ইবনে ইশাক-এর পৃষ্ঠা ৫৫২)

জবাব : (১) ইবনু ইসহাকের লেখক মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) ১৫১ হিজরীতে মারা গিয়েছেন। তিনি এ ঘটনাটি কীভাবে পেয়েছেন তার কোনো বিশুদ্ধ সূত্র (সনদ) হাসান সাহেব দেননি। অতএব, এটা অপ্রমাণিত একটি ঘটনা। আমাদের হাতে থাকা এই গ্রন্থদ্বয়ে ঘটনাটির কোনো ছহীহ সনদ নেই।

এখানে হাসান সাহেব ‘ইবনে ইশাক’ লিখেছেন। এটাও তার ভুল বানান। কেননা এ নামে কোনো গ্রন্থ নেই। (২) ইবনে হিশামের নামও তিনি কোনোরূপ যাচাই-বাছাই ব্যতীত উল্লেখ করেছেন। ইবনে হিশামের মধ্যেও এই ঘটনাটি নেই। তাছাড়া ইবনে হিশামের লেখক ২১৩ হিজরীতে মারা গিয়েছেন। তিনি কীভাবে এটা পেলেন? আশা করি, হাসান সাহেব এর জবাব প্রদান করবেন। সারাংশ হলো, এটা অপ্রমাণিত; বাতিল কথা।

৮. হাসান সাহেব লিখেছেন, ‘দুনিয়ার প্রায় এক চতুর্থাংশ জয় করেছিলেন মুসলিমরা। সবই অমুসলিমের দেশ এবং সেখানেও নিশ্চয়ই অনেক প্রতিমা-ভাস্কর্য ছিল, সেগুলোর তো সবই ভেঙে দেওয়ার কথা। কিন্তু সেখানেও আমরা তেমন দলিল পাই না। ৭১০ সালে হিন্দু রাজা দাহিরের দেশ সিন্ধু জয় করার পর কয়টা মূর্তি ভেঙেছিলেন মুহম্মদ বিন কাশেম? ভাস্কর্য-মূর্তি তো দূরের কথা কোনো প্রতিমাও ভেঙেছেন বলে জানা যায় না’।

জবাব : মুসলিমরা প্রতিমা ভাঙেননি। কারণ তারা অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান রাখেন। যখন কোনো অমুসলিম তার ঘরে বা স্বীয় উপাসনালয়ে প্রতিমা, ভাস্কর্য রাখেন, তখন সেটা ভাঙা হারাম। ইসলাম এর কোনো অনুমতি প্রদান করেনি। কিন্তু মুসলিমরা নিজেদের কাছে কখনোই প্রতিমা, ভাস্কর্য বা মূর্তি রাখতে পারবে না। মুসলিমরা ইসলামের হুকুম মানতে বাধ্য, অমুসলিমরা নয়। তবে অমুসলিমরা চাইলে ইসলামের বিধি-নিষেধ পালন করতে পারবেন। এটা তাদের ইচ্ছাধীন।

৯. হাসান সাহেব লিখেছেন, ‘রাসুলের (সা.) অজস্র ছবি স্বচক্ষে দেখতে চাইলে ইরানে চলে যান। দেখবেন দেয়ালে ঝুলানো সুদৃশ্য কার্পেটে আছে মা আমিনার কোলে শিশু নবী (সা.), সাহাবি পরিবেষ্টিত নবীজি (সা.), আসমানে বোরাখে উপবিষ্ট নবীজি (সা.) ইত্যাদি’।

জবাব :

প্রথমত, এগুলো নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর ছবি নয়। সবই পরবর্তীতে বানানো হয়েছে। কোনো ছাহাবী, তাবেঈ এমন কোনো ছবি অঙ্কন করেননি। দ্বিতীয়ত, ইরান কোনো দলীল নয় মুসলিমদের জন্য। তৃতীয়ত, হাসান সাহেব কীভাবে বুঝলেন যে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছবি এগুলো। আমরা তাকে অনুরোধ করছি, তিনি যেন এটা প্রমাণ করেন যে, এগুলো নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছবি। যদি তিনি প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে যেন প্রকাশ্যে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং এমন ভুল প্রচার হতে বিরত থাকেন।

১০. হাসান সাহেব এরপর লিখেছেন, ‘গুগল করলেই পেয়ে যাবেন– সবই কাল্পনিক ছবি অবশ্য– হাজার বছর ধরে আছে ওগুলো’।

জবাব : যাক তিনি স্বীকার করেছেন যে, এগুলো কাল্পনিক ছবি। কাল্পনিক ছবি দিয়ে তিনি ইসলামের একটি হারামকে হালাল করতে চাইছেন। কী চমৎকার তার গবেষণা! আর একটি কথা হলো যে, গুগল কোনো দলীল নয়। দলীল হলো কুরআন-হাদীছ। কেউ যদি কুরআন-হাদীছের নামে ভুল তথ্য গুগলে দিয়ে দেয়, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

১১. তিনি লিখেছেন, ‘এবারে সাম্প্রতিক কাল। ছবি তো ছবি, নবীজির (সা.) আট ফুট উঁচু, ১০০০ পাউণ্ড ওজনের মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যও ছিল দীর্ঘ ৫৩ বছর। ১৯০২ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ২৫ নং স্ট্রিট ম্যাডিসন এভিনিউতে অবস্থিত ম্যাডিসন পার্কের মুখোমুখি নিউইয়র্ক আপিল বিভাগের কোর্ট দালানের ছাদে। ইতিহাসের আরও নয়জন আইনদাতাদের সঙ্গে নবীজির (সা.) আট ফুট উঁচু মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যও রাখা ছিল সসম্মানে’।

জবাব : হাস্যকর যুক্তি দেখিয়ে তিনি নিজের অজ্ঞতাকে যাহির করছেন বারবার। যারা এই ভাস্কর্য বানিয়েছেন, তারা কারা? ইসলামী স্কলারগণ তাদের এই অপকর্মকে সমর্থন করেননি। কেউ পরবর্তীতে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর ভাস্কর্য বানালেই সেটা হালাল হয়ে যাবে না। যেখানে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের জীবদ্দশায় এমন কিছু বানাতে অনুমতি দেননি, সেখানে তাঁর পরে কোনো ব্যক্তি যদি এমনটি করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না; নিশ্চিতরূপে হবে না।

১২. তিনি আরও বলেছেন, গুগলে ‘এ স্ট্যাচু অব মুহাম্মদ’ সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন। মুসলিম সমাজ ও দেশগুলোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে ওটা সরানো হয়েছে।

জবাব : গুগলে পাওয়ার দরকার নেই; বরং কুরআন এবং হাদীছই আমাদের জন্য যথেষ্ট। মজার বিষয় হলো, লেখক সাহেব এখানে স্বীকার করেছেন যে, মুসলিম সমাজ এবং দেশগুলোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে সেটা সরানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যদি ইসলামে এটা বৈধ হয়েই থাকে, তবে মুসলিম সমাজ এবং ইসলামী দেশগুলো এটা সরাতে বলবেন কেন?

১৩. হাসান সাহেব স্বীয় অজ্ঞতা যাহির করে বলেছেন, ‘হাঙ্গামা করার আগে বাংলাদেশের ইমামদের ভেবে দেখা দরকার কেন মধ্যপ্রাচ্যের ইমামেরা ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে নন। সৌদি আরবেও বহু ভাস্কর্য আছে। গুগল করুন ‘স্ট্যাচু ইন মুসলিম ওয়ার্ল্ড’ কিংবা ‘স্ট্যাচু ইন সৌদি আরব’– রাস্তার মোড়ে মোড়ে উটের, কবজি থেকে হাতের আঙুলের, মুসলিম বীরদের এবং আরও কত ভাস্কর্য। সেখানকার মওলানারা জানেন কোরান ও রাসুল (সা.) সুস্পষ্টভাবে প্রতিমাকে নিষিদ্ধ করে মূর্তি ও ভাস্কর্যকে বৈধ করেছেন। তাই তাঁরা মুসলিম বিশ্বে অজস্র মূর্তি ও ভাস্কর্যকে অস্বীকৃতি জানানন’।

জবাব : সঊদী আরবের আলেমগণ এগুলোর চরমবিরোধী। তারা এগুলোর হারাম হওয়া সম্পর্কে ফতওয়াও প্রদান করেছেন একাধিকবার। সঊদীতে থাকলেই সেটি হালাল হয়ে যায় না। সঊদীতে দাড়ি মুণ্ডনকারী লোকের অভাব নেই। তার মানে এই না যে, সেখানকার আলেমগণ দাড়ি মুণ্ডন করাকে হালাল বলেছেন। বরং বাস্তবতা এই যে, তারা দাড়ি মুণ্ডন করাকে সরাসরি হারাম বলেছেন। এছাড়াও সেখানে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা টাখনুর নিচে স্বীয় প্যান্ট-পায়জামা ঝুলিয়ে রাখেন। তার মানে এই না যে, সেখানকার আলেমগণ এটাকে জায়েয বলেছেন। বরং সেখানকার আলেমগণ এর হারাম হওয়া সম্পর্কে বারবার জনগণকে সর্তক করে আসছেন। আমাদের দলীল হলো কুরআন এবং সুন্নাহ। সঊদী আরব বা কোনো দেশ বা কোনো গোষ্ঠী মুসলিমের জন্য দলীল নয়। তাছাড়া সেখানে আদৌ প্রাণীর ভাস্কর্য আছে কিনা লেখক হলফ করে বলতে পারবেন কি?

সঊদী আরবে আরও অনেক কিছুই রয়েছে। লেখক কি সেগুলো মানবেন? যেমন (১) সেখানে নারীকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বসানো হয় না। (২) সেখানে গণতন্ত্র নেই। বরং রাজতন্ত্র আছে। এখন সম্মানিত লেখক কি রাজতন্ত্রকে গ্রহণ করবেন? কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কোনো পুরুষকে নিয়োগ দিতে বলবেন?

১৪. হাসান সাহেব লিখেছেন, এবারে কোরান। কোরানে সুস্পষ্ট বলা আছে: (ক.) মূর্তিপূজা শয়তানের কাজ (মায়েদা ৯০) এবং (খ.) ‘এই মূর্তিগুলো কী, যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ?’ (আম্বিয়া ৫২)।

জবাব : কুরআনের ব্যাখ্যা বুঝতে হলে নবীর শরণাপন্ন হতে হয়। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যা করে গিয়েছেন দীর্ঘ ২৩ বছর যাবৎ। তিনি হাতে কলমে প্রতিটি আয়াতে তার ছাহাবীগণকে শিক্ষা দিয়েছেন। এখানে তিনি দুটি আয়াত উপস্থাপন করেছেন। প্রথমটি হলো সূরা আল-মায়েদার ৯০ নং আয়াত। এখানে الْأَنْصَابُ শব্দটি আছে। অর্থ : ‘প্রতিমা, মূর্তি’ ইত্যাদি।[3] তাহলে হাসান সাহেবের দেওয়া আয়াতটিতে এর প্রমাণ আছে যে, প্রতিমা, মূর্তি নিষিদ্ধ। আর হাসান সাহেব এখানে ভাস্কর্য এবং মূর্তিকে সমার্থক ধরেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন,  আরাধনা করলে সেটা হয় প্রতিমা আর না করলে হয় ভাস্কর্য (মূর্তি)। ইসলাম প্রতিমার বিরুদ্ধে, ভাস্কর্য ও মূর্তির বিরুদ্ধে নয়। ইসলাম ভাস্কর্য এবং মূর্তির বিরুদ্ধে নয়- এই কথাটিকে তিনি নিজেই খণ্ডন করেছেন। কেননা তার দেওয়া সূরা মায়েদার ৯০ নং আয়াতটিতে প্রতিমা, মূর্তি সবই শয়তানের কাজ বলে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

হাসান সাহেবের দেওয়া পরের আয়াতটি কিন্তু এটা প্রমাণ করছে না যে, অনর্থক মূর্তি বানানো যাবে। কাজেই এটি কোনো দলীল নয় ভাস্কর্য বানানোর পক্ষে। বরং এখানে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে এটা বলা হয়েছে।

১৫. হাসান সাহেব লিখেছেন, এখানে আমরা অবাক হয়ে দেখব কোরান সুস্পষ্ট ভাষায় ভাস্কর্যের অনুমতি দেয়। উদ্ধৃতি: ‘তারা সোলায়মানের (আ.) ইচ্ছানুযায়ী দূর্গ, ভাস্কর্য, হাউযসদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির উপর স্থাপিত বিশাল ডেগ নির্মাণ করত’। (সুরা সাবা, আয়াত ১৩)

জবাব :

প্রথমত, আমরা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শরীআত পালন করতে বাধ্য। তার পূর্বের কোনো নবীর আদেশ-নিষেধ আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাদের শরী‘আতের যেসব ব্যাপারে আমাদের শরী‘আত অনুমোদন দেবে, সেগুলো আমরা গ্রহণ করব। আর যেগুলো আমাদের শরী‘আত সমর্থন করবে না, সেগুলো আমরা প্রত্যাখ্যান করব। তাছাড়া তারা একটি নির্দিষ্ট কালের জন্য এসেছিলেন। তবে তাদেরকে নবী-রাসূল হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা, যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা আমাদের জন্য ফরয। দ্বিতীয়ত, এখানে যে শব্দটির অর্থে ‘ভাস্কর্য’ করা হয়েছে, সেটির আরবী হল وَتَمَاثِيلَ সঊদী আরব হতে প্রকাশিত এবং পরিবেশিত তাফসীরে বলা হয়েছে, ‘এর অর্থ, ছবি, নকশা, আকৃতি। প্রাণী ব্যতীত অন্য বস্তসমূহের ছবি বানানো হতো। কতিপয় বলেছেন যে, নবীগণ, সৎ ব্যক্তিদের ছবিসমূহ বানিয়ে মসজিদে রাখা হতো। যেন তাদেরকে দেখে লোকেরাও ইবাদাত করেন। এই মর্মটি তখনই বিশুদ্ধ হবে যখন এটা স্বীকার করা হবে যে, সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর শরীআতের মধ্যে প্রাণীর ছবি বানানোর অনুমতি ছিল, যা বিশুদ্ধ (প্রমাণিত) নয়। তদুপরি ইসলামে অত্যন্ত কঠোরতার সাথে এর নিষেধাজ্ঞা তো রয়েছেই’।[4]

কাজেই এটা দলীল নয় ভাস্কর্য রাখার পক্ষে। ব্যাখ্যা না বুঝেই স্রেফ অনুবাদ দেখেই কুরআনের মর্ম বুঝার চেষ্টা করাও এক প্রকারের গোমরাহী। আমাদেরকে কুরআনে কারীমের প্রতিটি আয়াতের অনুবাদ করার সময়ে ব্যাখ্যার দ্বারস্থ হতে হবে, যেন বিষয়টি বিশুদ্ধভাবে প্রতীয়মান হয়।

১৬. হাসান সাহেব লিখেছেন, ‘তাই হয়তো অতীত বর্তমানের কিছু ইমাম সরাসরি মূর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, প্রতিমা ও ভাস্কর্যের পার্থক্য উপেক্ষা করছেন’।

জবাব : তিনি এখানে ইমাম বলতে কাদেরকে বুঝিয়েছেন? নাম এবং তাদের অবদানসহ উল্লেখ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতো। মূলত রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তার ছাহাবীগণ হতে বর্ণিত হাদীছ মানতে মুসলিমরা বাধ্য। কোনো ইমামের ব্যক্তিগত মতামত ভুলও হতে পারে। যদি কোনো ইমামের কোনো ফৎওয়া কুরআন এবং হাদীছের সাথে মিলে যায়, তবে মানতে হবে নতুবা বাতিল হবে।

১৭. তিনি শেষের দিকে লিখেছেন, ‘ইমামেরা প্রতিমার বিরুদ্ধে বলুন অসুবিধা নেই, কিন্তু ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সেটা কোরান-রাসুলের (সা.) বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হয় কি না, তাঁরা ভেবে দেখতে পারেন’।

জবাব : আল-হামদুলিল্লাহ, আমরা ভেবে দেখেছি এবং প্রমাণসহ বিষয়টির হারাম হওয়া উল্লেখ করেছি। তাছাড়াও লেখক নিজেই সূরা মায়েদার ৯০ নং আয়াত দিয়ে মূর্তি, প্রতিমাকে শয়তানের কাজ বলে নিজের দাবীকে খণ্ডন করেছেন। এরপরও কেন মানতে অসুবিধা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। সম্মানিত লেখককে আমরা আবারও ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ করছি। মুহতারাম লেখকের বক্তব্যের পর্যালোচনা এখানেই শেষ।

ছবি, মূর্তি, ভাস্কর্য, প্রতিমা নিষিদ্ধ হওয়ার দলীল :

দলীল-১ : ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বলেছেন, ‘হে আমার পালনকর্তা, এ শহর (মক্কা)-কে তুমি শান্তিময় করো এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের তুমি মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখো! এই মূর্তিগুলো বহু মানুষকে বিপথগামী করেছে। অতএব যে আমার অনুসারী হবে, সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হবে, নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল, দয়াবান’ (ইবরাহীম ১৪/৩৫-৩৬)

দলীল-২ : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ القِيَامَةِ المُصَوِّرُونَ ‘নিশ্চয়ই ছবি প্রস্তুতকারীরা আল্লাহর নিকটে সর্বাধিক শাস্তিপ্রাপ্ত হবে’।[5] যাবতীয় ছবি, ভাস্কর্য, প্রতিমা, মূর্তি এই হাদীছে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যে কোনো উদ্দ্যেশেই নির্মিত হোক না কেন তা হারাম।

দলীল-৩ : আবূ তালহা আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ঐ ঘরে (রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করে না, যে ঘরে কুকুর বা (প্রাণীর) ছবি থাকে’।[6] এ বিধানের মধ্যে ঐসব ফেরেশতা অন্তর্ভুক্ত নন, যারা মানুষের দৈনন্দিন আমলের হিসাব লিখেন কিংবা মানুষের হেফাযতে নিয়োজিত থাকেন অথবা বান্দার রূহ ক্ববয করার জন্য আসেন। অনুরূপভাবে শিকারী কুকুর, ফসল ও বাড়ি পাহারা দেওয়ার কুকুর, যুদ্ধ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত কুকুর উক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়।[7]

দলীল-৪ : আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، وَيُقَالُ لَهُمْ أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ ‘এইসব ছবি প্রস্তুতকারীগণ কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি পাবে। আর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যা সৃষ্টি করেছিলে, তাতে জীবন দাও’।[8]

দলীল-৫ : আবূ জুহায়ফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,نَهَى عَنْ ثَمَنِ الدَّمِ، وَثَمَنِ الكَلْبِ، وَكَسْبِ الأَمَةِ، وَلَعَنَ الوَاشِمَةَ وَالمُسْتَوْشِمَةَ، وَآكِلَ الرِّبَا، وَمُوكِلَهُ، وَلَعَنَ المُصَوِّرَ ‘রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষেধ করেছেন রক্ত বিক্রয় করে তার মূল্য নিতে, কুকুর বিক্রয়ের মূল্য নিতে, যৌন উপার্জন নিতে এবং তিনি লা‘নত করেছেন সূদ গ্রহীতা, সূদ দাতা, (হাতে ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে) উল্কিকারিণী ও উল্কি প্রার্থিনী মহিলা এবং ছবি অঙ্কন বা প্রস্তুতকারী ব্যক্তির উপরে’।[9]

মাথাবিহীন ছবির হুকুম : প্রাণীর মাথাবিশিষ্ট ছবি সর্বাবস্থায় হারাম। তবে মাথাবিহীন ছবি রাখা হারাম নয়।[10] উল্লেখ্য, পাসপোর্ট, ভিসা, আইডেন্টিটি কার্ড, লাইসেন্স, প্রবেশপত্র, আসামী ধরা, গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রাখার জন্য ইত্যাদি বাধ্যগত ও জরুরী কারণে ছবি তোলা যাবে।

ছবি-মূর্তির অপকারিতা : (১) ছবি-মূর্তি শিরকের বাহন। তাই এগুলো থেকে বিরত থাকা ফরয। (২) এগুলো তৈরিতে কোটি কোটি টাকা নষ্ট হয়, যার সবই জনগণের কষ্টার্জিত উপার্জন হতে ব্যয় হয়।

জহুরীর মন্তব্য : বিখ্যাত লেখক জহুরী (রাহিমাহুল্লাহ) মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে অত্যন্ত চমকপ্রদ আলোচনা রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘মূর্তি বা ভাস্কর্য গড়ার কলাকৌশল একই। মূর্তি নামে যা গড়া হয়, তার মধ্যে মুখ্য থাকে ধর্মীয় মনোযোগ আর বিশ্বাস। আর ভাস্কর্য গড়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মনোযোগ বা বিশ্বাস মুখ্য থাকে না বটে, কিন্তু একেবারে যে বাদ যায় তাও বলা যায় না। ভাস্কর্যে যখন ভাস্করের বা বিশেষ মহলের অথবা উদ্যোক্তাদের প্রিয় ব্যক্তির প্রতিকৃতি খোদাই হয়ে দর্শকদের সামনে ভাসে আর তাতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, তখন আর একে ভাস্কর্য বলা যায় না, সেটা মূর্তি হয়ে যায়। এমনকি যে ছবির ফ্রেমের উপর তারকাটা বসিয়ে জন্ম ও মৃত্যু দিবসে ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়, সে ছবিটিও মূর্তির চরিত্র ধারণ করে। আমরা সাধারণত জানি, দেব-দেবীর মূর্তি হয়। কিন্তু শত শত বছর ধরে এ ধারণাও প্রত্যাখ্যাত। কারণ একটাই, আর তা  হচ্ছে, দেব-দেবীদের অস্তিত্ব আছে কি-না সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, কেউ কি কখনো দেব-দেবীদের দেখেছেন? কেউ দেখেননি। কোনো শিল্পীর নযরে তাদের ছায়াও পড়েনি। এখন প্রশ্ন, তাহলে তাদের চেহারা একমাত্র কল্পনায় রূপ দেওয়া ছাড়া কি সম্ভব? সুতরাং বলা যায়, কাল্পনিক হোক বা বাস্তব হোক, সবই মূর্তি। আর এ মূর্তিগুলোর অধিকাংশেরই নতুন নামকরণ হয়েছে ভাস্কর্য। নর্তকীর নতুন নাম যেমন নৃত্যশিল্পী’।[11]   

উপসংহার :

উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হলো যে, ছবি, প্রতিমা, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদি সবই একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। এখানে ভুল বুঝার কিছু নেই। পাঠকদের অনুরোধ করব নিরপেক্ষ মানসিকতা নিয়ে বিষয়টি অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার জন্য।


  * সৈয়দপুর, নীলফামারী।                                                                                          [1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১০৪। [2]. ফাতহুল বারী, ১/৫-৭। [3]. আল-মুজামুল ওয়াফী, পৃ. ১০৬৯। [4]. আল-মুজামুল ওয়াফী, পৃ. ১২০২। [5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৫০। [6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৪৯। [7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৪৮১, ৩৩২৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৭৪, ১৫৭১; মিশকাত, হা/৪০৯৮, ৪১০১। [8]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৫৭। [9]. ছহীহ বুখারী, হা/২২৩৮। [10]. তিরমিযী, হা/২৮০৬। [11]. জহুরী, অপসংস্কৃতির বিভীষিকা, ২/৩৪।