মূর্খদের সাথে বিতর্ক : শরীআত কী বলে?
-অধ্যাপক ওবায়দুল বারী বিন সিরাজউদ্দীন*



(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

(৮) খেয়াল রাখবেন, মানুষের সাথে আপনার কথাবার্তা এবং আলাপ-আলোচনার উদ্দেশ্য যেন হয় সত্যে উপনীত হওয়া। সত্য আপনার মাধ্যমে উন্মোচিত হোক আর অন্য কারো মাধ্যমেই উন্মোচিত হোক, কার দ্বারা উন্মোচিত হলো সেটা বড় করে দেখবেন না। এক্ষেত্রে সত্যে উপনীত হওয়াটাই বড় কথা।

(৯) অন্যকে ছোট করা এবং অন্যের উপর জয়লাভ করার উদ্দেশ্যে অনর্থক তর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকুন। অকারণে তর্কে লিপ্ত হওয়া বিপথগামিতার লক্ষণ। এ থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহ কাউকে পথ দেখালে সে বিপথগামী হয় না কিন্তু তারা বিনা কারণে তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হয়’। আপনি নিজে সঠিক হলেও বিতর্ক পরিহার করুন। আবূ দাঊদের একটি হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সঠিক হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বিনা কারণে তর্ক করা বন্ধ করে, আমি জান্নাতে তার জন্য একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি’।[1]

(১০) আপনার কথা হবে স্পষ্ট, সহজবোধ্য ও দুর্বোধ্য শব্দ হতে মুক্ত। প্রয়োজন না হলে বাগ্মিতা পরিহার করুন এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কিছু বলা থেকে বিরত থাকুন। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ধরনের কথা অপছন্দ করতেন। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যাদেরকে আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি এবং যারা কিয়ামতের দিন আমার থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে, তারা হলো সেই সব লোক যারা অনর্থক কথা বলে, যারা অন্যকে ছোট করে এবং যারা কথা বলার সময় নিজেদের (পাণ্ডিত্য) যাহির করে’।[2]

(১১) আপনার কথা হবে শান্ত প্রকৃতির, পরিষ্কার, শ্রুতিগোচর এবং সর্বসাধারণের নিকট বোধগম্য। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকলের বুঝার সুবিধার্থে একটি কথা তিন বার পুনরাবৃত্তি করতেন। তাঁর কথা ছিল সহজ যা সকলেই বুঝতে পারতেন।

(১২) কথাবার্তায় আন্তরিক হোন। অযথা কৌতুক করবেন না। কথাবার্তায় হাস্যরস আনতে চাইলে সেইভাবে আনুন যেভাবে নবী মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা করতেন।

(১৩) অন্যের কথায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবেন না। কেউ কিছু বলতে চাইলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং তাকে তার কথা শেষ করতে দিন। তার কথা শোনার পর যদি আপনার পক্ষ থেকে ভালো এবং প্রকৃত অর্থেই প্রয়োজনীয় কিছু বলার থাকে তবেই সেটা বলুন। শুধু বলতে চাওয়ার স্বার্থেই অনর্থক কথা বলবেন না।

(১৪) কথা বলুন আর তর্কই করুন, তা করতে হবে উত্তম পন্থায়। এতে করে যেন কারও ক্ষতি না হয়, মানসিকভাবে কেউ যেন আঘাত না পায়, কাউকে খাটো করা না হয় বা কারও প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ প্রকাশ না পায়। সকল নবীর মাধ্যমেই মানুষকে সুন্দরভাবে কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যখন মূসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর ভাই হারূন (আলাইহিস সালাম)-কে ফেরাউনের কাছে প্রেরণ করেছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে বলে দিয়েছিলেন, فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى ‘তার সঙ্গে তোমরা নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা (আল্লাহকে) ভয় করবে’ (ত্ব-হা, ২০/৪৪)

বলাই বাহুল্য যে, আমরা কেউই মূসা (আলাইহিস সালাম) এবং হারূন (আলাইহিস সালাম)-এর থেকে উত্তম নই। আর আমরা যে লোকটির সাথে কথা বলছি সেই লোকটিও ফেরাউনের থেকে নিকৃষ্ট নন।

(১৫) অন্যদের কথাবার্তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করবেন না, বিশেষ করে যখন দেখবেন যে, তারা যা বলছে তার মধ্যে যেমন ভুল বা মিথ্যা রয়েছে, তেমনি কিছু পরিমাণ সঠিক বা সত্য তথ্যও রয়েছে। কারণ সঠিক অংশটুকু প্রত্যাখ্যান করা মোটেও উচিত হবে না, যদিও তা ভুলের সাথে মিশিয়ে উপস্থাপন করা হয়। আপনাকে সঠিক ও সত্যটি গ্রহণ করতে হবে; ভুল ও মিথ্যাটি ত্যাগ করতে হবে। এটিই হলো ন্যায়বিচার এবং ইনছাফ যা করার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।

(১৬) মানুষের সামনে নিজের প্রশংসা করবেন না, নিজেই নিজেকে বাহবা দেবেন না। কারণ এমনটি করা উদ্ধত আচরণের পরিচায়ক, যা করতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذْ أَنْشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَإِذْ أَنْتُمْ أَجِنَّةٌ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى

‘যারা বিরত থাকে বড় বড় পাপ আর অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে ছোট-খাটো দোষ-ত্রুটি ছাড়া; বস্তুত তোমার প্রতিপালক ক্ষমা করার ব্যাপারে অতি প্রশস্ত। তিনি তোমাদের সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানেন যখন তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন আর যখন তোমরা তোমাদের মায়েদের পেটে ভ্রুণ অবস্থায় ছিলে। কাজেই নিজেদেরকে খুব পবিত্র মনে করো না। কে তাক্বওয়া অবলম্বন করে তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। অতএব তোমরা নিজেদের সাফাই গেয়ো না। তিনিই ভালো জানেন মুত্তাক্বী কে’ (আন-নাজম, ৫৩/৩২)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘কেউ হেদায়েতের দিকে আহ্বান করলে যত জন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান ছওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের ছওয়াবে কোনো কমতি হবে না’।[3]

সভ্য মানুষ অন্যকে গালি দেয় না। অশ্রাব্য ভাষায় কারো সঙ্গে কথা বলে না। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হলেও মার্জিত শব্দ ব্যবহার করে। ভদ্র ও সংযতভাবে শোকজ করে। কিন্তু কিছু মানুষ রাগের আতিশয্যে হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অন্যকে অশ্লীল ও শ্রুতিকটু বাক্যবাণে নাজেহাল করে। গাল-মন্দ করে নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করে।

ইসলামে অন্যকে গালি দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। যেকোনো কারণেই হোক কাউকে গালি দেয়ার অনুমতি নেই। হাসি-কৌতুক ও ঠাট্টাচ্ছলেও অন্যকে গালি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অশোভনীয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿

وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا

‘যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৮)

যার মধ্যে চারটি অভ্যাস আছে, তাকে হাদীছে মুনাফিক্ব বলা হয়েছে। এগুলোর কোনো একটি পাওয়া গেলেও সে মুনাফিক্ব হিসেবে ধর্তব্য হবে। হাদীছের আলোকে সেগুলো হলো- ‘যখন তাকে বিশ্বাস করা হয় সে বিশ্বাস ভঙ্গ করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে এবং বিবাদ-বিতর্কে উপনীত হলে অন্যায় পথ অবলম্বন করে।[4] অন্য হাদীছে আছে, ‘মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীলভাষী ও গালিগালাজকারী হয় না’।[5] আরেক হাদীছে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেক্বী (আল্লাহর অবাধ্যাচরণ) এবং তার সঙ্গে লড়াই ঝগড়া করা কুফরী’।[6] হাদীছে আরো এসেছে, ‘কবীরা গুনাহগুলোর একটি হলো নিজের বাবা-মাকে অভিশাপ করা’। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মানুষ নিজের বাবা-মাকে কীভাবে অভিশাপ করে? তিনি বললেন, ‘যখন সে অন্যের বাবাকে গালিগালাজ করে, তখন সে নিজের বাবাকেও গালিগালাজ করে থাকে। আর যে অন্যের মাকে গালি দেয়, বিনিময়ে সে তার মাকেও গালি দেয়’।[7] আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার (কোনো মুসলিম) ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করেছে অথবা কোনো বিষয়ে যুলুম করেছে, সে যেন আজই (দুনিয়াতে) তার কাছে (ক্ষমা চেয়ে) মিটিয়ে করে নেয়, ওই দিন আসার আগেই যেদিন দীনার ও দিরহাম কিছুই থাকবে না। তার যদি কোনো নেক আমল থাকে, তবে তার যুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী তা থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো নেক আমল না থেকে, তবে তার সঙ্গীর পাপরাশি তার (যালেমের) উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে’।[8]

আল্লাহ তাআলা আমাদের গালমন্দ ও অশ্লীল বাক্যবিনিময় থেকে রক্ষা করুন। মার্জিত ভাষা ও শ্রুতিমধুর শব্দ ব্যবহারের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


 

* পিএইচডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. আবূ দাঊদ, হা/৪৮০০, হাদীছ হাসান।

[2]. তিরমিযী, হা/২০১৮, হাদীছ ছহীহ।

[3]. তিরমিযী, হা/২৬৭৪, হাদীছ ছহীহ।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮, ৫৯।

[5]. তিরমিযী, হা/১৯৭৭, হাদীছ ছহীহ।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৭৬; তিরমিযী, হা/১৯৮৩।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৭৩; তিরমিযী, হা/১৯০২।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯, ৬৫৩৪।