মূর্তি বনাম ভাস্কর্য ইস্যু : উত্তেজনা, বিতর্ক ও আন্দোলন

-জুয়েল রানা*


ভূমিকা : দেশে এখন মূর্তি ও ভাস্কর্য নিয়ে উত্তেজনা চলছে। ঢাকার ধোলাইরপাড় চত্বরে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য তৈরির পরিকল্পনার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই দেশ বরেণ্য শীর্ষ আলেমগণ সেই পরিকল্পনার বিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছেন। একজন ব্যক্তিমানুষের অবিকল অবয়বে প্রস্তুতকৃত মূর্তি ব্যক্তিটির স্মৃতিকে ধারণ এবং শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশে প্রস্তুত করে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন স্থান যেমন- সড়কদ্বীপ, ভবনের সামনের চত্বর, ভবনের অভ্যন্তর প্রভৃতিতে স্থাপন করা হয়। ব্যক্তিকে উপলক্ষ্য করে নির্মিত মূর্তি দেবমূর্তি না হলেও কোনো বিশেষ দিন যেমন- ব্যক্তিটির জন্ম অথবা মৃত্যু দিবস অথবা ব্যক্তিটির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশে ব্যক্তিমূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণপূর্বক কিছু সময় এর সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যায়। ব্যক্তিমূর্তির প্রতি এভাবে শ্রদ্ধা জানানো অন্যান্য ধর্মে নিষিদ্ধ না হলেও ইসলাম ধর্মে এটি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আবার অনেক সময় দেখা যায় এরূপ ব্যক্তির প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ইসলাম যেকোনো প্রতিকৃতিতে এরূপ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো অনুমোদন দেয় না।

মূর্তি ও ভাস্কর্য পরিচিতি : মূর্তি ও ভাস্কর্য উভয়ই বিশেষ্য। মূর্তির সমার্থক হলো প্রতিমা, আকার, আকৃতি, দেহ, চেহারা প্রভৃতি। অপরদিকে ভাস্কর্যের সমার্থক হলো প্রতিমা বা কাষ্ঠ, প্রস্তর, মর্মর, তাম্র, মৃন্ময়, মণি প্রভৃতির মূর্তি। মূর্তির ইংরেজি statue, body, incarnation. embodiment, image, form, shape, figure, idol, appearance প্রভৃতি আর ভাস্কর্যের ইংরেজি sculpture.[1]

মূর্তি হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রাণীর খোদাইকৃত অথবা ছাঁচে ঢালা অবয়ব, যা ব্যক্তি বা প্রাণীর আকৃতিসম অথবা বৃহদাকৃতির। এটি সচরাচর ত্রিমাত্রিকরূপে উপস্থাপন করা হয়। সহজে বহনযোগ্য মূর্তিগুলোকে বলা হয় ক্ষুদ্রাকৃতির মূর্তি। পৃথিবী বিখ্যাত মূর্তিগুলোর অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ইতালির মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ডেভিড, ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোর ক্রিস্ট দ্য রিডিমির এবং মিসরের গ্রেট স্ফিনিক্স অব গিজা। 

ভাস্কর্য মাটি, পাথর, ধাতু প্রভৃতিতে খোদাই বা লেপনের মাধ্যমে দ্বিমাত্রিক অথবা ত্রিমাত্রিক প্রতিনিধিত্বমূলক বা বিমূর্তভাবে উপস্থাপনকৃত শিল্পকর্ম। যেসব ভাস্কর্যে মানুষ অথবা প্রাণীর বহিঃপ্রকাশ থাকে, সেগুলোকে বলা হয় মূর্তি। অপরদিকে যেসব শিল্পকর্ম মূর্তিহীন বা ভাবনামূলক বা অনবয়ব, সেগুলো হলো ভাস্কর্য। সব মূর্তিকে ভাস্কর্যরূপে আখ্যায়িত করা গেলেও সব ভাস্কর্যকে মূর্তিরূপে আখ্যায়িত করা যায় না।

যেসব মূর্তিকে সামনে রেখে পূজা-অর্চনা করা হয়, সেগুলোকে বলা হয় দেবমূর্তি। দেবমূর্তি বিভিন্ন দেব-দেবীর কল্পিত অবয়ব। পাথরে খোদাইকৃত বা ধাতব বস্তুর মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত দেবমূর্তি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়। মাটি লেপনের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত দেবমূর্তি বিশেষ ধরনের পূজা উপলক্ষ্যে প্রস্তুত করা হয় এবং পূজা সমাপনান্তে তা পুকুর, নদী বা সমুদ্রের পানিতে বিসর্জন দেওয়া হয়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, মাটি দিয়ে প্রস্তুতকৃত দেবমূর্তি বিভিন্ন উপাসনালয়ে বা গৃহে পরবর্তী পূজার আগমন অবধি সংরক্ষণ করা হয়।

আমাদের দেশে ভাস্কর্যের প্রতিনিধিত্বমূলক ও বিমূর্ত উভয় ধরনের উপস্থাপন রয়েছে। যেমন- মুজিবনগরে সাত বীরশ্রেষ্ঠের অবিকল অবয়বের প্রতিনিধিত্বমূলক উপস্থাপনের মাধ্যমে যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে, তা সমভাবে ভাস্কর্য ও মূর্তি। আবার স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ একটি স্মারক স্থাপনা ও ভাস্কর্য। এ ভাস্কর্যটিতে সাতটি ত্রিভুজাকৃতির মিনারের শিখর যথা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্ন, আটান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিটি এক ভাবব্যঞ্জনায় প্রবাহের বহিঃপ্রকাশ দেখানো হয়েছে, যা ভাস্কর্যের বিমূর্ত উপস্থাপন। অনুরূপ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মধ্যস্থলের সুউচ্চ কাঠামো স্নেহময়ী মায়ের আনত মস্তক এবং এর দু’পাশের দু’টি করে ক্রমহ্রস্বতর কাঠামো সন্তানের প্রতীকস্বরূপ স্মারক স্থাপনা ও ভাস্কর্যের বিমূর্ত উপস্থাপন। 

মূর্তি ও ভাস্কর্যের সূচনা ও বিকাশ : শুধু পূজার জন্য নয়; মৃত ব্যক্তির স্মারক হিসাবেও মূর্তি নির্মাণ আরব জাহেলী সংস্কৃতির একটা অংশ ছিল। মৃত ব্যক্তির কবরের উপর তারা স্মারক স্তম্ভ নির্মাণ করত। কোনো  কোনোটাতে মৃত ব্যক্তির ছবিও অঙ্কন করা হতো। আবার কিছু কিছু স্মারক ভাস্কর্য আকারেও তৈরি করা  হতো। সেসব স্তম্ভের গায়ে মৃতের নামধাম ইত্যাদি লিখিত থাকত।

আরবের অন্ধকার যুগের বিখ্যাত একটি মূর্তি হলো ‘লাত’। এই মূর্তি ও তার মন্দির তায়েফ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, যে স্থানে মূর্তি ও মন্দির স্থাপিত হয়, সেটা মূলত এক ব্যক্তির সমাধি। ধর্মীয়ভাবে তার গুরুত্ব ছিল। ‘লাত’ তারই উপাধী। মৃত্যুর পর তার সমাধির উপর ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।[2]

মূর্তি সম্পর্কে জাহেলী কুসংস্কার এত ব্যাপক ও গভীর ছিল যে, তাদের চেতনা-বিশ্বাস এবং কর্ম ও উপাসনা সবকিছু একে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। এই মূর্তিগুলোকে বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করা হতো। আয়ু, সুস্থতা, বিপদাপদ থেকে মুক্তি, বৃষ্টি, ফল-ফসল ইত্যাদি তাদের কাছে প্রার্থনা করা হতো। এদের নামে মানত করা হতো এবং পশু বলি দেওয়া হতো।

এমনকি মূর্তির নামে মানব বলির রেওয়াযও ওই সংস্কৃতির অংশ ছিল। হিরা অঞ্চলের শাসকরা মূর্তির নামে মানুষ জবাই করত। ইতিহাসে এসেছে, আরবের বিখ্যাত মূর্তি ‘ওয্যা’র নামে মুনযির ইবনে মাউস সামা চারশ’ পাদ্রীকে জবাই করেছিল।[3]

মূর্তি ও ভাস্কর্যের সঙ্গে মিথ্যার সম্পর্ক : মূর্তি বা  ভাস্কর্যের সঙ্গে মিথ্যার সম্পর্কটা অত্যন্ত গভীর। বিগত হাজার বছরে এই সত্য অসংখ্যবার প্রমাণিত হয়েছে। মূর্তিপূজক সম্প্রদায় সম্পর্কে কুরআন মাজীদ যে স্পষ্ট ও পরিষ্কার ধারণা দান করেছে, তাতে এই সত্যই প্রতিভাত হয়।

আরবের মূর্তিপূজারী সম্প্রদায় তাদের মূর্তিপূজার যৌক্তিক ভিত্তি অন্বেষণ করতে গিয়ে বলত, ‘আমরা এদের উপাসনা শুধু এজন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে’। অর্থাৎ মূর্তির প্রতি ভক্তি নিবেদনের পিছনে আমাদের উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ। তা হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ। বলাবাহুল্য, এটা এক নির্জলা মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন কুসংস্কার। কেননা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য অন্য কোনো কিছুর মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। এটা এক অসার যুক্তি, যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য নয়; বরং মূর্তিপূজার যৌক্তিক বৈধতা অন্বেষণের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

তদ্রূপ মূর্তিপূজার দিকে যারা অন্যদের আহ্বান করেছে দেখা যায়, তারাও মিথ্যারই আশ্রয় নিয়েছে। কুরআন মাজীদে মূসা (আলাইহিস সালাম) -এর ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি যখন ‘তাওরাত’ গ্রহণের জন্য তূর পাহাড়ে গেলেন, তখন সামেরী একটা স্বর্ণের গো-বৎস প্রস্তুত করল এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) -এর ক্বওমকে আহ্বান করে বলল, ‘এটাই হচ্ছে তোমাদের এবং মূসার উপাস্য, কিন্তু মূসা তাকে বিস্মৃত হয়ে অন্যত্র অন্বেষণ করে চলেছেন’।

ইসলামপূর্ব আরবের অন্ধকার যুগে বিভিন্ন মূর্তি ও সেগুলোর পূজা-অর্চনার যে ইতিহাস পাওয়া যায়, তাতেও দেখা যায় যে, এগুলোর প্রতিষ্ঠা ও প্রচলনের ক্ষেত্রে মিথ্যারই আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মোটকথা, মূর্তিভিত্তিক সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ক্ষেত্রে মিথ্যা ও প্রতারণা এবং বিভ্রান্তি ও কুসংস্কারই হচ্ছে প্রধান নিয়ামক।

বর্তমানেও মুসলিম সমাজে ভাস্কর্য প্রীতির আবহ সৃষ্টির যে অপপ্রয়াস পরিচালিত হচ্ছে, তাতেও অপরিহার্যভাবেই মিথ্যাচার ও কপটতার  চর্চাই প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্যথা কে না জানে যে, শিল্পচর্চার পক্ষে মূর্তি ও ভাস্কর্য কোনো অপরিহার্য উপাদান নয়? অথচ এ কথাটাই খুব জোরে-সোরে প্রচার করা হচ্ছে এবং এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, মূর্তির প্রতি নমনীয় হওয়া ছাড়া শিল্পচর্চাই সম্ভব নয় এবং মূর্তি ও শিল্প এ দুটো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত! বলা বাহুল্য, এটা এক জঘন্য মিথ্যাচার। আর এ মিথ্যাচারও কপটতাপূর্ণ। শিল্পের প্রতি প্রেম নয়; বরং একটি বিশেষ সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকেই এর উৎপত্তি।

কুরআন মাজীদের উপরিউক্ত আয়াতে আল্লাহবিমুখ সম্প্রদায়ের মূর্তিপ্রেমের অন্যতম প্রধান কারণটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইসলামী আদর্শের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধতা সৃষ্টি এবং তা অক্ষুণ্ণ রাখার পক্ষে মূর্তি হলো অন্যতম প্রধান উপকরণ। অতএব, এক্ষেত্রে বাহ্যত শিল্প রক্ষা, প্রগতিশীলতা রক্ষা ইত্যাদি যতকিছুই বলা হোক, প্রকৃত বিষয়টা ইসলামী আদর্শের প্রতি অনীহা ও ইসলামী আদর্শের বিরোধিতা থেকেই উৎসারিত। এজন্য ইসলামী আদর্শের প্রতি যারা আস্থাশীল, এই বিষয়ে তাদের কোনো বিভ্রান্তি থাকা উচিত নয়।

আলোচিত প্রসঙ্গে এ পর্যন্ত যেসব প্রচার-প্রচারণা হয়েছে, তাতে দু’ধরনের প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে : (১) শিল্পকলার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ। (২) ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলাম বিরোধী নয় বলে ধারণা দানের অপচেষ্টা। এই দু’টো প্রয়াসের সততা পরীক্ষা করা কঠিন কিছু নয়। শিল্পকলার প্রতি সহানুভূতিই যদি সরকারের ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার মূল কারণ হয়ে থাকে, তবে সরকার ওই স্থানে এমন কিছু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা হবে এ দেশের সাধারণ জনগণের ঈমান, আক্বীদা এবং বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আর একই সঙ্গে নির্মাণশিল্পেরও সুন্দর দৃষ্টান্ত। এরপরও যদি তারা বিরোধিতা করেন, তবে বুঝতে হবে, শিল্পকলার কথাটা বাহ্যিক আচরণ মাত্র এবং এই দেশকে মুসলিমের দেশ হিসেবে পরিচয় দিতেই তারা অনাগ্রহী।

ভাস্কর্য ও মূর্তিপূজার নেপথ্যে : আইয়ামে জাহেলিয়াতের পতন ঘটিয়ে যেহেতু ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেহেতু ক্বিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের প্রধান শত্রু জাহেলিয়াত বা অজ্ঞানতা তথা একত্ববাদী ধর্মমতের প্রতিকূলে মূর্তিপূজা। এই কারণে গত চৌদ্দশ বছর ধরে তামাম দুনিয়ার মুসলিমরা একসাথে সিংহের মতো গর্জন করে ওঠেন যখন তারা দেখেন, ইসলাম এবং মুসলমানিত্বের বেশ ধরে সুকৌশলে মহল বিশেষ মূর্তিপূজাকে পুঁজি করে সেই আবু জাহলের বংশধরদের মতো অপচেষ্টা চালায়।

জাহেলী যুগের মূর্তিপূজা নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের মতে, কেবল স্বার্থসিদ্ধি এবং ধান্দাবাজির জন্য গোত্রগুলো মনগড়া মূর্তি উদ্ভাবন করত। মূর্তিকে কেন্দ্র করে নানা অলৌকিক গল্প ফাঁদা হতো এবং ভেলকিবাজি করে কিছু চালাক লোক যারা গোত্রপতিদের খয়ের খাঁ ছিল, তারা সাধারণ মানুষকে বেকুব বানাত। মূর্তির মাথা থেকে ক্ষণে ক্ষণে আগুন বের হওয়া অথবা গভীর রাতে মূর্তির নড়াচড়া বা উড়ে বেড়ানোর মতো জাদুর কৌশল জানা লোকজনকে ভাড়া করে এনে গোত্রপতিরা সাধারণ মানুষকে প্রথমে মূর্তি সম্পর্কে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলত এবং বলত, মূর্তিকে ইলাহ মেনে পূজা না করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। অশিক্ষিত বেদুঈনরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই গোত্রপতিদের ফাঁদে ধরা পড়ত এবং নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পত্তির বিরাট অংশ মূর্তিপূজায় ব্যয় করত, যা অলক্ষ্যে গোত্রপতিদের পকেটেই চলে যেত।

মহাকালের মূর্তিসংক্রান্ত ধান্ধাবাজি স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেশ, কাল, সমাজকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার নির্যাসের একটি বিরাট অংশ শুষে নেয়। রাজনীতি-অর্থনীতি, প্রেম-ভালোবাসা, যৌনতা থেকে শুরু করে যুদ্ধ-বিগ্রহ এমনকি আনন্দ-উল্লাসেও ধান্দাবাজরা মূর্তিপূজাকে ঢুকিয়ে দেয়।

সারা দুনিয়ায় সেই অতীতকাল থেকে আজ অবধি মূর্তি নিয়ে যত আদিখ্যেতা এবং অনাসৃষ্টি হয়েছে, তা অন্য কিছু নিয়ে হয়নি। মূর্তির জন্য যত যুদ্ধ হয়েছে অথবা মূর্তির জন্য যত মানুষ মরেছে তা কোনো সাধারণ যুদ্ধ কিংবা কোনো ভয়ংকর মহামারী-রোগবালাই অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হয়নি। মূর্তিকে কেন্দ্র করে যত অপরাজনীতি, যত অপসংস্কৃতি এবং যতরকম অবৈধ লেনদেন হয়েছে, তা অন্য কোনো পাপাচারের সাথে তুলনীয় নয়। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি অনেকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাম্প্রতিককালে মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি ব্যঙ্গচিত্রকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে ফ্রান্সের যে ক্ষতি হয়েছে, তা ‘ওয়াটার লু’র যুদ্ধের ক্ষতির চেয়েও বেশি বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

এ কারণে সর্বকালের সেরা ধর্ম ইসলাম যেকোনো মূর্তির বিষয়েই অত্যন্ত কঠোর। এই ধর্মের অনুসারীরা যখন দেখেন যে, কোথাও আশরাফুল মাখলূকাতরূপী জীবন্ত মানুষের পরিবর্তে মাটি-পাথর বা কোনো ধাতুর তৈরি পুতলিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, পুতলির কাছে মাথা নত করা হয়, পুতলির গলায় মালা পরিয়ে সেই দানব জড় পদার্থের চতুর্দিকে কিছু ধড়িবাজ মানুষ ধান্ধা হাসিলের উদ্দেশ্যে নাচন-কুর্দন করে এবং জাহেলি যুগের মতো বিশ্বজাহানের মালিকের ঐশী নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায় তখন তারা আপন ধর্মের লোকদেরকে সতর্ক করার জন্য বলে ওঠে, হুঁশিয়ার! সাবধান! শিরক করো না।[4]

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য কিংবা মূর্তি নিয়ে যে এক শ্রেণির চাটুকাররা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় স্বার্থ হাসিল করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমে  চাউর হয়েছে। অনেকে মূর্তিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ বলে দাবি করতে চায় এবং তার বিরোধিতাকারীদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী ট্যাগ দিতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে প্রথম মূর্তি নির্মাণ হয় ১৯৭৩ সালে গাজীপুরে। মানে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই বছর পর। যেই মূর্তি নির্মাণ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই বছর পর, সেটা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ হয়, তা আমার মাথায় আসে না।

বঙ্গবন্ধু যখন দেবতা : কেউ কেউ দাবি করছে, মূর্তি আর ভাস্কর্য নাকি এক জিনিস না। তাদের দাবি, মূর্তিকে দেব/দেবী মেনে পূজা-অর্চনা করা হয়। পক্ষান্তরে ভাস্কর্যকে পূজা-অর্চনা করা হয় না। তাদের দাবি যদি মেনেও নিই, তারপরও কি তারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে পূজা করা হবে না? কখনোই না। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে অনেকেই দেবতা মনে করে পূজা-অর্চনা ও ভক্তি করে থাকে। যেমন : বরিশালের বানারীপাড়ার কাজলাহার গ্রামের বাসিন্দা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৭৯ বছর বয়সী সুখরঞ্জন ঘরামী পেশায় আইনজীবী সহকারী। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সাধারণ মানুষ মনে করেন না। বঙ্গবন্ধুকে তিনি মুক্তির দেবতা মনে করেন।

তার বিশ্বাস, দ্বাপর যুগে পাশবিক শক্তি যখন সত্য, সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই অসুন্দর, অসুর ও দানবীয় পাশবিক শক্তিকে দমন করে মানবজাতিকে রক্ষা এবং শুভশক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিল। একইভাবে পাকিস্তানী হানাদারদের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে রক্ষা করতে এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন বঙ্গবন্ধু। তিনিই ছিলেন বাঙালি জাতির উদ্ধার কর্তা। তাই বঙ্গবন্ধুকে তিনি দেবতার আসনে বসিয়েছেন। প্রতিদিন ভগবান শ্রী কৃষ্ণের আরাধনা ও পূজা করেন। এরপর পূজা দেন বঙ্গবন্ধুর ছবিতে। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সুখরঞ্জন ঘরামী বঙ্গবন্ধুর ছবিতে পূজা দিচ্ছেন। সুখরঞ্জন ঘরামী বলেন, বঙ্গবন্ধু আমার কাছে মুক্তির দেবতা।[5] ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো তিনিও শুভশক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শুধু কি তাই? ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কীভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পূজা করে, তা বিশ্বাস না হলে প্রদত্ত লিংকটিতে ভিজিট করে নিজ চোখে দেখে আসতে পারেন।[6]

মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য করা চরম ভুল : কেউ কেউ মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে বিধানগত পার্থক্য দেখাতে চান। এটা চরম ভুল। ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোই  পরিত্যাজ্য। কোনো প্রাণীর মূর্তি নির্মাণ করা ইসলামী শরীআতে কবীরা গুনাহ ও হারাম। মূর্তি সংগ্রহ, মূর্তি সংরক্ষণ এবং মূর্তির বেচাকেনা ইত্যাদি সকল বিষয় কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। মূর্তিপূজার কথা তো বলাই বাহুল্য, মূর্তি নির্মাণেরও কিছু কিছু পর্যায় এমন রয়েছে, যা কুফরী।

কুরআন মাজীদ ও হাদীছে এ প্রসঙ্গে যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোকেই নির্দেশ করে। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদের স্পষ্ট নির্দেশ,فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْاَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوْا قَوْلَ الزُّورِ ‘তোমরা পরিহার করো অপবিত্র বস্তু অর্থাৎ মূর্তিসমূহ এবং পরিহার করো মিথ্যাকথন’ (আল-হজ্জ, ২২/৩০)। এই আয়াতে পরিষ্কারভাবে সব ধরনের মূর্তি পরিত্যাগ করার এবং মূর্তিকেন্দ্রিক সকল কর্মকাণ্ড বর্জন করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আরও লক্ষণীয় বিষয় এই যে, উপরের আয়াতে সকল ধরনের মূর্তিকে ‘রিজস’ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘রিজস’ অর্থ নোংরা ও অপবিত্র বস্তু। বোঝা যাচ্ছে যে, মূর্তির সংশ্রব পরিহার করা পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত রুচিবোধের পরিচায়ক। অন্য আয়াতে কাফের সম্প্রদায়ের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে এভাবে,وَ قَالُوْا لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَ لَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّ لَا سُوَاعًا وَّ لَا یَغُوْثَ وَ یَعُوْقَ وَ نَسْرًا ‘আর তারা বলেছিল, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে এবং কখনো পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসরকে’ (নূহ, ৭১/২৩)

এখানে কাফের সম্প্রদায়ের দুটো বৈশিষ্ট্য উল্লেখিত হয়েছে : (১) মিথ্যা উপাস্যদের পরিত্যাগ না করা। (২) মূর্তি ও ভাস্কর্য পরিহার না করা। তাহলে মিথ্যা উপাস্যের উপাসনার মতো ভাস্কর্যপ্রীতিও কুরআন মাজীদে কাফেরদের বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত। অতএব,  এটা যে ইসলামে গর্হিত ও পরিত্যাজ্য তা তো বলাই বাহুল্য।

উপরের আয়াতে উল্লেখিত মূর্তিগুলো সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এগুলো হচ্ছে নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায়ের কিছু পুণ্যবান লোকের নাম। তারা যখন মৃত্যুবরণ করেছে, তখন শয়তান তাদের সম্প্রদায়কে এই কুমন্ত্রণা দিয়েছে যে, তাদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোতে মূর্তি স্থাপন করা হোক এবং তাদের নামে সেগুলোকে নামকরণ করা হোক। লোকেরা এমনই করল। ওই প্রজন্ম যদিও এসব মূর্তির পূজা করেনি, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রকৃত বিষয় অস্পষ্ট হয়ে গেল এবং পরবর্তী প্রজন্ম তাদের পূজায় লিপ্ত হলো।[7]

কুরআন মাজীদে মূর্তি ও ভাস্কর্যকে পথভ্রষ্টতার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক আয়াতে এসেছে,رَبِّ اِنَّهُنَّ اَضْلَلْنَ كَثِیْرًا مِّنَ النَّاسِ ‘হে রব! এরা (মূর্তি ও ভাস্কর্য) অসংখ্য মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে’ (ইবরাহীম, ১৪/৩৬)। অন্য আয়াতে এসেছে,وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا – وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيرًا ‘আর তারা বলেছিল, তোমরা পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদের এবং পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুওয়াকে, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসরকে। অথচ এগুলো অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে’ (নূহ, ৭১/২৩-২৪)। কুরআন মাজীদে একটি বস্তুকে ভ্রষ্টতার কারণ হিসাবে  চিহ্নিত করা হবে, এরপর ইসলামী শরীআতে তা বৈধ ও গ্রহণযোগ্য থাকবে- এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কী হতে পারে।

কুরআনের ভাষায় মূর্তি ও ভাস্কর্য হলো বহুবিধ মিথ্যার উৎস। আল্লাহ তাআলা বলেন, اِنَّمَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ اَوْثَانًا وَّ تَخْلُقُوْنَ اِفْكًا ‘তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত শুধু মূর্তিপূজা করছো এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছো’ (আনকাবূত, ২৯/১৭)

মূর্তি ও ভাস্কর্য যেহেতু অসংখ্য মিথ্যার উদ্ভব ও বিকাশের উৎস, তাই উপরের আয়াতে একে ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার জানা যাচ্ছে যে, মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোই সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। হাদীছেও নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে পরিষ্কার বিধান দান করেছেন।

(১) নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রেরণ করেছেন আত্মীয়তার সর্ম্পক বজায় রাখার, মূর্তিসমূহ ভেঙে ফেলার এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো কিছুকে শরীক না করার বিধান দিয়ে’।[8]

(২) আবুল হাইয়াজ আসাদী বলেন, আলী ইবনে আবূ তালেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমাকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে ওই কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে কাজের জন্য নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা এই যে, তুমি সকল প্রাণীর মূর্তি বিলুপ্ত করবে এবং সকল সমাধি-সৌধ ভূমিসাৎ করে দিবে’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, …আর সকল চিত্র মুছে ফেলবে’।[9]

(৩) আলী ইবনে আবূ তালেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মদীনায় যাবে এবং যেখানেই কোনো প্রাণীর মূর্তি পাবে তা ভেঙে ফেলবে, যেখানেই কোনো সমাধি-সৌধ পাবে, তা ভূমিসাৎ করে দিবে এবং যেখানেই কোনো চিত্র পাবে, তা মুছে দিবে?’ আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হলেন। এরপর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে কেউ পুনরায় উপরিউক্ত কোনো কিছু তৈরি করতে প্রবৃত্ত হবে, সে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি নাযিলকৃত দ্বীনকে অস্বীকারকারী’।[10]

এই হাদীছগুলো থেকে স্পষ্ট জানা যাচ্ছে, যে কোনো প্রাণীর মূর্তিই ইসলামে পরিত্যাজ্য এবং তা বিলুপ্ত করাই হল ইসলামের বিধান। আর এগুলো নির্মাণ করা ইসলামকে অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য।

(৪) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, إِنَّ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُوْنَ ‘প্রতিকৃতি তৈরিকারী (ভাস্কর, চিত্রকর) শ্রেণি হলো ওই সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে ক্বিয়ামত দিবসে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে’।[11]

(৫) আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَيُقَالُ لَهُمْ : أَحْيُوْا مَا خَلَقْتُمْ ‘ওই লোকের চেয়ে বড় যালেম আর কে যে আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করার ইচ্ছা করে। তাদের যদি সামর্থ্য থাকে, তবে তারা সৃজন করুক একটি কণা এবং একটি শষ্য কিংবা একটি যব’।[12]

এই হাদীছটি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যখন ভাস্কর-চিত্রকর, এমনকি গল্পকার ও ঔপন্যাসিকদেরকে পর্যন্ত ‘স্রষ্টা’ বলতে এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘সৃষ্টি’ বলতে সামান্যতমও দ্বিধাবোধ করা হয় না। কোনো কোনো আলোচকের আলোচনা থেকে এতটা ঔদ্ধত্যও প্রকাশিত হয় যে, যেন তারা সত্যি সত্যিই স্রষ্টার আসনে আসীন হয়ে গিয়েছেন!

ছহীহ বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) লেখেন, এই ভাস্কর ও চিত্রকর সর্বাবস্থাতেই হারাম কাজের মধ্যে লিপ্ত। আর যে এমন কিছু নির্মাণ করে যার পূজা করা হয়, তার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। আর যে স্রষ্টার সামঞ্জস্য গ্রহণের মানসিকতা পোষণ করে, সে কাফের’।[13] 

(৬) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  ও আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ خَلْقًا كَخَلْقِيْ؟ فَلْيَخْلُقُوْا ذَرَّةً وَلْيَخْلُقُوْا حَبَّةً أَوْ لِيَخْلُقُوْا شَعِيْرَةً

‘এই প্রতিকৃতি নির্মাতাদের (ভাস্কর, চিত্রকরদের) ক্বিয়ামত দিবসে আযাবে নিক্ষেপ করা হবে এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, যা তোমরা ‘সৃষ্টি’ করেছিলে তাতে প্রাণসঞ্চার করো!’[14]

(৭) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে কেউ দুনিয়াতে কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করে, ক্বিয়ামত দিবসে তাকে আদেশ করা হবে, সে যেন তাতে প্রাণসঞ্চার করে অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না’।[15]

(৮) আউন ইবনে আবু জুহায়ফা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূদ ভক্ষণকারী ও সূদ প্রদানকারী, উল্কি অঙ্কনকারী ও উল্কি গ্রহণকারী এবং প্রতিকৃতি প্রস্তুতকারীদের (ভাস্কর, চিত্রকরদের) উপর লা‘নত করেছেন।[16]

এই হাদীছগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, ভাস্কর্য নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কবীরা গুনাহ। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কুফরীরও পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মূর্তি ও ভাস্কর্যের বেচাকেনাও হাদীছে সম্পূর্ণ হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে।

(৯) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় থাকা অবস্থায় এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মদ ও মূর্তি এবং শূকর ও মৃত প্রাণী বিক্রি করা হারাম করেছেন’।[17]

(১০) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অসুস্থতার সময় তার জনৈক স্ত্রী একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)  ইতোপূর্বে হাবাশায় গিয়েছিলেন। তারা গির্জাটির কারুকাজ ও তাতে বিদ্যমান প্রতিকৃতিসমূহের কথা আলোচনা করলেন। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শয্যা থেকে মাথা তুলে বললেন, ওই জাতির কোনো পুণ্যবান লোক যখন মারা যেত, তখন তারা তার কবরের উপর ইবাদতখানা নির্মাণ করত এবং তাতে প্রতিকৃতি স্থাপন করত। এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকৃষ্টতম সৃষ্টি’।[18]

(১১) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘(মক্কা বিজয়ের সময়) নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন বায়তুল্লায় বিভিন্ন প্রতিকৃতি দেখলেন, তখন তা মুছে ফেলার আদেশ দিলেন। প্রতিকৃতিগুলো মুছে ফেলার আগ পর্যন্ত তিনি তাতে প্রবেশ করেননি’।[19]

দৃষ্টান্তস্বরূপ ১১টি হাদীছ পেশ করা হলো। আলোচিত প্রসঙ্গে ইসলামী বিধান বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কুরআন মাজীদে যে কোনো ধরনের মূর্তির সংশ্রব ও সংশ্লিষ্টতা পরিহারের যে আদেশ মুমিনদেরকে করা হয়েছে, সে সম্পর্কে একটা বিস্তারিত ধারণাও উপরোক্ত হাদীছগুলো থেকে জানা গেল।

কুরআন ও সুন্নাহর এই সুস্পষ্ট বিধানের কারণে মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ইত্যাদি সকল বিষয়ের অবৈধতার উপর গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

স্বার্থান্বেষী মহলের বিভ্রান্তি ও অপচেষ্টা : শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ (হাফিযাহুল্লাহ)-এর  ভাস্কর্যবিরোধী কড়া বক্তব্যে একটি মহল বেশ বেজার! কিন্তু তাদেরকে একটি বিচ্ছিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের বেশি কিছু মনে হচ্ছে না। তারা একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টাও করছে। সেটি হলো, ভাস্কর্য তথা মূর্তির বিরোধিতাকে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা হিসাবে চিত্রিত করা। এরা চাচ্ছে সরকারকে ইসলামের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে। এরা এই সংঘাতকে সারা দেশেও ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে। আমি একটি কথা খুব পরিষ্কার ভাষায় বলছি যে, হাদীছের আলোকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুর মূর্তি/ভস্কর্য তৈরির কারণে তার কবরে আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব হতে পারে। লক্ষ করছি, যারা প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তাদের মনে কথাটি দাগ কাটছে। তাদের মন ব্যথাতুর হচ্ছে। তারা সত্য বুঝতে পারছে। এটা মূর্তিপ্রেমীদের কাছে মোটেই ভালো লাগার কথা না। আমরা কখনোই হঠকারিতার পথে পা বাড়াবো না ইনশাআল্লাহ! তবে সরকার যদি ভাস্কর্য নামে মূর্তিসংস্কৃতি এভাবেই ছড়িয়ে দিতে থাকে, ক্ষমতার জোরে যদি ইসলামী ঐতিহ্যকে এভাবেই ধ্বংস করতে থাকে, তাহলে বহু কাঠখড়ি পুড়িয়ে ইসলামী মহলের সাথে যতটুকু দূরত্ব কমিয়েছে, ভাস্কর্য ইস্যুতে সরকারের মনোভাব অনড় থাকলে সেই  দূরত্ব আরও বাড়বে।

আমাদের সচেতনতা ও করণীয় : মূর্তিকেন্দ্রিক শিল্প আর নাচ-গানকেন্দ্রিক সংস্কৃতি আর যাই হোক মুসলিমের শিল্প-সংস্কৃতি হতে পারে না। শিল্প ও সংস্কৃতির মতো এত ব্যাপক বিষয়কে কেন একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী এত সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ করে দেন, তা খুব সচেতনভাবে ভেবে দেখা দরকার। যে ভূখণ্ডের মানুষ এক লা-শরীক আল্লাহর প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শিক্ষা ও আদর্শের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল, তাদের শিল্প-সংস্কৃতির উপর এই আরোপিত সংজ্ঞা শুধু কলমের জোরে চাপিয়ে দেওয়া হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক। তথাপি এই বিষয়কে ইস্যু বানিয়ে বিধর্মী ও নাস্তিক্যবাদী শক্তি একজোট হয়ে গিয়েছে। কিছু দৈনিক পত্রিকা দেশ ও জাতির অন্য সব সমস্যা শিকেয় তুলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা এই বিষয়ে বরাদ্দ করে চলেছে।

বিষয়টা আমরা সবাই জানি যে, শরীআতে যে বিষয়গুলো হারাম করা হয়েছে, সেগুলো পরিহার করা ফরয এবং ওই হারামকে হারাম বলে বিশ্বাস করা হলো আরও গুরুত্বপূর্ণ ফরয। হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার ফলে মানুষ অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু ইসলামের গণ্ডি থেকে সে খারিজ হয়ে যায় না। কিন্তু হারামকে হালাল মনে করলে, কিংবা শরীআতের কোনো বিধানের প্রতি কটাক্ষ করলে সে কাফের হয়ে যায়। বর্তমান সময়ে শরীআতের বিধি-বিধানের প্রতি এই কুফরী মনোভাব সৃষ্টি করার অপচেষ্টা অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। তাই মুমিনের প্রথম কর্তব্য হলো, নিজের ঈমান রক্ষায় সচেষ্ট হওয়া এবং দ্বিতীয় কর্তব্য হলো, এসব অপপ্রয়াসের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করা।

ইসলামে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর তার সামর্থ্যের মধ্যে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি আনিল মুনকার অর্থাৎ করণীয় বিষয়ে আদেশ এবং বর্জনীয় বিষয়ে নিষেধ করা ফরয করা হয়েছে। আর অন্তর থেকে হারামকে হারাম মনে করাকে বলা হয়েছে ঈমানের সর্বনিম্ন পর্যায়।

আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী শরীআত বিরোধী অপতৎপরতা প্রতিরোধে সচেষ্ট হওয়া, অন্তত মৌখিকভাবে বা লেখনীর মাধ্যমে তার প্রতিবাদ জানানো। যদি এদেশের এক-দশমাংশ ঈমানদারও ইসলাম বিরোধী কাজকর্মের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সংকল্পবদ্ধ হন, তাহলেই প্রমাণ হয়ে যাবে যে, ইসলাম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা পোষণকারী লোকগুলো সংখ্যায় কত নগণ্য। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং দেশের নীতিনির্ধারণী স্থানগুলোতেও অনেক ঈমানদার মানুষ রয়েছেন। তাদের কর্তব্য সচেতনভাবে এই ইসলাম বিরোধী অপতৎপরতাগুলো প্রতিরোধ করা। হতে পারে এ প্রসঙ্গে কোনো একটি পদক্ষেপ নাজাতের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর দেশের শিক্ষিত ও উদ্যোগী শ্রেণির পক্ষে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের সাহায্য  নেওয়া কঠিন  কিছু নয়; প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, আন্তরিকতা এবং উদ্যোগ।

উপসংহার : আমাদের দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম বিধায় তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন যেকোনো কিছু পরিহার দেশ ও জাতির উন্নতি, সমৃদ্ধি, শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য অত্যাবশ্যক।


* খত্বীব, গছাহার বেগ পাড়া জামে মসজিদ (১২ নং আলোকডিহি ইউনিয়ন), গছাহার, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

[1]. Bangla Academy English-Bengali Dictionary (33rd Reprint : Magh 1416/January 2010), P. 685.

[2]. আদ্দুররুল মানছূর, ৬/১২৬।

[3]. আল-মুফাসসাল, ৬/২২৮, ২৩৭, ২৩৮, ২৪৭।

[4]. উপসম্পাদকীয় : জাহেলি যুগের মূর্তি পূজার নেপথ্যে, (সাবেক সংসদ সদস্য) গোলাম মাওলা রনি, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৭ নভেম্বর ২০২০।

[5]. https://www.jagonews24.com/amp/623811.

[6].https://tbsnews.net/bangladesh/mujib-year/modi-pays-tribute-bangabandhu-birth-anniversary-57619.

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯২০।

[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮৩২।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৬৯।

[10]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৫৭।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৫০।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৫৩।

[13]. ফাতহুল বারী, ১০/৩৯৭।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৫৭, ৭৫৫৮।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৬৩।

[16]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৬২।

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/২২৩৬।

[18]. ছহীহ বুখারী,  হা/১৩৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫২৮; নাসাঈ, হা/৭০৪।

[19]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৫২।