মৃত্যুর প্রস্তুতি

-কাযী ফেরদৌস করীম (মুন্নি)

আজকে মৃত্যু সম্পর্কে লিখতে বসে আমার পরলোকগত বাবার (আল্লাহ ইয়ারহামুহু) কথা মনে পড়ে গেল। উনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন অফিসার ছিলেন। একদিন আমার বাবা অফিস ছুটির পরে ঘরে আসলেন; দেখলাম, উনি বেশ চিন্তিত। বললাম, আব্বা! কী হয়েছে? আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? আব্বা বললেন, আর বলিস না আমার কলিগ সে আমাকে প্রায়ই আমার ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে হাসিঠাট্টা করে। তো আমি কিছু মনে করি না, তাকে ধর্মীয় গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সে সব সময়ই নিজেকে সবজান্তা জ্ঞানী মনে করে। আজকে আমার রুমে এসে আমার মাথার টুপিটা খুলে নিল ও বলল, এনায়েত করীম ছাহেব, আপনি এই যে ধর্ম-কর্ম করছেন কষ্ট করে, মরে গিয়ে যদি দেখেন সেখানে কোনো শাস্তি বা পুরস্কার নেই, আপনি মাটির সাথে মিশে গেছেন, তখন কী করবেন? আমি তার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম এই ভেবে যে, মানুষ এতো বোকা হয় কী করে! আমি উত্তরে বললাম, আপনি তো কোনো ইবাদত-বন্দেগী করেন না, আপনি মরে গিয়ে যদি দেখেন সেখানে শাস্তি ও পুরস্কার দুটোই আছে, তখন আপনি কী করবেন? উল্টো প্রশ্নটা নিজেকেই করুন উত্তরটা পেয়ে যাবেন। কারণ আমিতো আল্লাহকে বিশ্বাস করে তার ইবাদত করছি। ইনশাআল্লাহ শাস্তি বা পুরস্কার না থাকলেও আমার তো কোনো কিছু হারানোর ভয় নেই। আমি ভাবছি আপনার মতো বোকাদের কী পরিণতি হবে। আল্লাহ যদি গ্রেফতার করেন তখন তো দুনিয়ায় আসার সব পথ বন্ধ থাকবে, কারও সাহায্যও পাবেন না।

শয়তান তাদেরকে এভাবেই বিভ্রান্ত করে জাহান্নামের পথিক বানাচ্ছে। আল্লাহ হেফাযত করুন এমন করুণ পরিণতি থেকে।  দুনিয়ায় যে কেউ যে জিনিসকে বেশি ভালোবাসবে সে জিনিসের উপর তার মৃত্যু হবে। আর তাইতো আমরা দেখতে পাই, রেসলার রেসলিং ভালোবাসে সে তা করতে করতে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে যেমন, একজন এন্টি গ্রেরেরো। আবার ফুটবলার ফুটবল ভালোবাসে, সে ফুটবল খেলতে খেলতেই মরছে। আবার গায়ক গান ভালোবাসে, সে গান গাইতে গাইতে মৃত্যুবরণ করছে। অভিনয়কারী অভিনয় ভালোবাসে, সে তা করতে করতে মরছে। আবার যে ছালাত আদায় করতে ভালোবাসে, সে ছালাতের মধ্যে মৃত্যুবরণ করছে। যে আল্লাহকে সিজদা করতে ভালোবাসে, সে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদায় মৃত্যুবরণ করছে। যে কালেমা পড়তে ভালোবাসে, সে কালেমা পড়তে পড়তে মরছে। প্রতিদিন এই দুনিয়ায় চেনা-অচেনা, আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, দেশী-বিদেশী কেউ না কেউ মৃত্যুর পথযাত্রী হচ্ছে আমাদেরই চোখের সামনে। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের সকলকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে’ (আম্বিয়া, ৩৫)। আর এই মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। সুতরাং যেভাবেই হোক মৃত্যুবরণ করতেই হবে। এই মৃত্যুই কিন্তু জীবনের শেষ নয়; এটা পরকালের জীবনের শুরু এবং এই শুরুর কোনো শেষ নেই। এরপর মানুষ আর কোনোদিনই দুনিয়ার জীবনে ফিরে আসতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে তখন সে বলে, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় দুনিয়াতে প্রেরণ করুন যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনোই নয় এতো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম এবং যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে, তারা দোযখেই চিরকাল বসবাস করবে। আগুন তাদের মুখম-ল দগ্ধ করবে এবং তারা তাতে বীভৎস আকার ধারণ করবে। তোমাদের সামনে কি আমার আয়াতসমূহ পঠিত হত না?  তোমরা তো সেগুলোকে মিথ্যা বলতে। তারা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা দুর্ভাগ্যের হাতে পরাভূত ছিলাম এবং আমরা ছিলাম বিভ্রান্ত জাতি। হে আমাদের পালনকর্তা! এ থেকে আমাদেরকে উদ্ধার করো আমরা যদি পুনরায় তা করি, তবে আমরা গোনাহগার হব। আল্লাহ বলবেন, ধিকৃত অবস্থায় এখানেই পড়ে থাকো এবং আমার সাথে কোনো কথা বলো না’ (মুমিনূন, ৯৯-১০৯)।

সুতরাং এই অবাঞ্চিত সফরের প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ কেউ কোথাও সফর করতে চাইলে তাকে যেভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, ঠিক সেভাবেই এই মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া আমাদের কর্তব্য।  আল্লাহর  বান্দা হিসাবে আল্লাহ আমাদের জন্য সেটা বোঝা সহজ করুন- আমীন!

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাতে তখন আর কাউকে এমন বলতে না হয় হায়! আমি তো আল্লাহ তা‘আলার শানে অনেক অবহেলা দেখিয়েছি। আমি তো ছিলাম ঠাট্টাকারীদের অন্তর্ভুক্ত। অথবা যেন কাউকে এমনও বলতে না হয় আল্লাহ তা‘আলা যদি আমাকে সঠিক পথ দেখাতেন, তাহলে সত্যিই আমি মুত্তাক্বী হয়ে যেতাম। অথবা শাস্তি প্রত্যক্ষ করে যেন কাউকে এমনও বলতে না হয় আহ! যদি আমি দুনিয়াতে ফিরে যেতাম, তাহলে আমি সৎকর্মশীল হতাম। ক্বিয়ামত তো সত্যিই অতি সন্নিকটে। তবে কারও জানা নেই যে, তা কখন হবে। একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই সে সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখেন’ (যুমার, ৫৩-৫৮)।

আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (ছাঃ)-কে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন সত্য প্রচারের জন্য। আর রাসূল (ছাঃ) দুনিয়ার মাটিতে এমন কল্যাণ রেখে যাননি, যা তার উম্মতকে বলেননি এবং এমন কোনো অকল্যাণ রেখে যাননি, যে সম্পর্কে তার উম্মতকে সতর্ক করেননি। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-ই সর্বশেষ নবী। আর আমরাই সর্বশেষ উম্মত। আর আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতকেই ক্বিয়ামতের নিদর্শনসমূহ দেখাবেন। তাই চৌদ্দশ’ বছর পূর্বেই নিজ মুখে রাসূল (ছাঃ)-এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে গেছেন। কারণ তার পরে তো আর কোনো নবী আসবে না, যিনি বিশ্ববাসীকে এ সম্পর্কে সতর্ক করবেন।

মানুষের ধ্যান-ধারণা একেবারেই সীমাবদ্ধ। তাই সে এই জীবনের পরে যে চিরস্থায়ী পরকালের জীবন রয়েছে, সে সম্পর্কে মোটেই ভাবতে চায় না। বরং দুনিয়ার ভোগ বিলাস নিয়ে মত্ত হয়ে পরজীবনের জন্য কিছুই করতে চায় না। তাই আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের কিছু নিদর্শন পাঠিয়ে মানুষকে সতর্ক করেন যে, ক্বিয়ামত অবশ্যম্ভাবী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় অত্যাসন্ন; অথচ তারা উদাসীনতায় বিভোর হয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে’ (আম্বিয়া, ১)।

আর তাই প্রত্যেকেরই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বে পরকালের জীবনের জন্য কিছু পুঁজি আহরণ করা উচিত। কারণ মানুষের জীবনে মৃত্যুই হচ্ছে প্রথম ক্বিয়ামত, আর তা এসে গেলে আফসোসের কোনো শেষ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা তো ঐ দিনকে সুদূর মনে করে আর আমি তো দেখছি তা অতি সন্নিকটে’ (মা‘আরিজ, ৬-৭)।

আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়াত করুন এবং এই আসন্ন অনিবার্য রূঢ় সত্যকে উপলব্ধি করে জীবন থাকতে এই অনিবার্য সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করে মহান আল্লাহর  সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

মহান আল্লাহ বলেন, ‘সে দিন আমলনামা উপস্থিত করা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে আমলনামায় লিখিত অপরাধ দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হতে দেখবে। তারা তখন বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! ছোট-বড় কিছুই তো বাদ রাখল না বরং সবই হিসাব করেছে। তখন তারা তাদের সকল কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। আর তোমার প্রভু তো কারও প্রতি যুলুম করেন না’ (কাহফ, ৪৯)।

যে ব্যক্তি পরকালে সত্যিকারের বিশ্বাসী নয়, সে তো সর্বদা দুনিয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কীভাবে দুনিয়ার সম্পদ কত উপার্জন করবে, কত জমাবে, এই চিন্তায় সে অস্থির থাকে। দুনিয়াতে সে কাউকেই সহজে লাভ দিতে চায় না। সে দুনিয়াবী ছোট-বড় সমস্ত বিষয়কে নিজ স্বার্থের আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে। কাউকে কোনো ফায়দা দেওয়ার পূর্বে নিজের ফায়দার কথা ভালোভাবে যাচাই করে নেয়। তার দৃষ্টি শুধু দুনিয়াবী চাওয়া-পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পরকালের প্রতি তার বিন্দুমাত্র উদ্যোগ, উৎকণ্ঠা বা চিন্তা-ভাবনা নেই। কারণ সে পরকালকে অনেক দূরে মনে করে। সে তার মৃত্যুকেও অনেক দূরে মনে করে।

মহান আল্লাহ এদের সম্পর্কে বলেন, ‘তারা বলে, পার্থিব জীবনই প্রকৃত জীবন (এরপর আর কোনো জীবন নেই) এবং আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে না’ (আন‘আম, ২৯)।

আর এ কারণে এরা কখনোই মরতে চায় না। দুনিয়াকে ভোগ করার জন্য হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকতে চায়। আর তাই পরকাল সম্পর্কে অসতর্কতার কারণে হঠাৎই একদিন গ্রেফতার হয়ে যায় আল্লাহর  কঠিনতম শাস্তির দ্বারা। যেখান থেকে পালানোর বা আত্মরক্ষার কোনো উপায় নেই। তখন তার অন্যায়-অবিচার, যুলুম দ্বারা সঞ্চিত সম্পদ তার শাস্তির বড় কারণ হয়ে যায়। তখন তার সম্পদ, তার সন্তান তার কোনো কাজে আসবে না।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্তুতি কোনো উপকারে আসবে না। কিন্তু যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর  কাছে আসবে জান্নাতে আল্লাহভীরুদের নিকটবর্তী করা হবে এবং বিপথগামীদের সামনে উন্মোচিত করা হবে জাহান্নাম’ (আন‘আম ৮৮-৯০)।

এখানে বলা হয়েছে, একমাত্র সেই মুক্তি পাবে, যে লোভ-লালসা, দুনিয়ার মোহ, শিরক, কুফরী, নাফরমানী ও নিফাকমুক্ত সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর  দরবারে হাযির হবে।

আর ক্বিয়ামতের বিচার ও পুনরুত্থানে অবিশ্বাসী লোক, আল্লাহর  শাস্তি সম্পর্কে অবিশ্বাসী লোকেরাই তাদের কুফরির কারণেই গ্রেফতার হবে মৃত্যু ও শেষ বিচারের দিন। কারণ মৃত্যু হচ্ছে ব্যক্তিগত। ক্বিয়ামত আর বিচার দিবস হচ্ছে বিশ্ব মানবের সম্মিলিত ক্বিয়ামত। বুদ্ধিমান হলো সেই ব্যক্তি, যে পাপাচার পরিত্যাগ করে আল্লাহর  ভয়ে আল্লাহর  দিকে তওবা করে ফিরে আসে। আর তাই জীবনের আয়ু শেষ হওয়ার পূর্বে তওবা করুন। আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করুন ও মাগফিরাত দান করুন- আমীন!