যৌবনের ইবাদত

জাবির হোসেন*


[ক]

প্রথমে একটি ঘটনা বলি, ঘটনাটি সত্য। এক গ্রামে বাস করত দুই ভাই। দুজনেই মাতাল। বিকেলবেলা পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরা তাদের দৈনন্দিন ঘটনা। তাদের মধ্যে যে বড়, সে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে চিৎকার-চেঁচামেচি, গালাগালি এক কথায় মাতলামি করে গাঁ মাতিয়ে তুলতো। সকলকে জানান দিত যে, সে মদ খেয়েছে। ছোট ভাই ছিল তার বিপরীত। সে মদ খেয়ে সোজা বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ত। কোনোরকম মাতলামি ছাড়াই।

সেই গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে তালগাছ ও খেজুর গাছ। গ্রামেরই কিছু মানুষ গরমের সময় তালগাছ ও শীতের সময় খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে; তা থেকে তালগুড় ও খেজুরগুড় প্রস্তুত করে। সেই গুড় তারা নিজেরা খায় আবার বিক্রিও করে।

একদিনের ঘটনা, আর কয়েকজনের মতো গরমের সময় বড় ভাই তালগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে, তালের গুড় তৈরি করত। একদিন মদ খেয়ে মাতালাবস্থায় তাল গাছের মাথায় চড়েছে। কিন্তু সেদিন যে তার জন্য দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে—তা কি সে জানে? মাতালাবস্থায় গাছে চড়ে টাল সামলাতে না পেরে উপর থেকে নিচে পড়ে যায় সে। আঘাত গুরুতর হওয়ায়, সে মারা যায়।

এই ঘটনা ছোট ভাইয়ের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত ঘটায়। ছোট ভাই অনুশোচনাপূর্বক মদ খাওয়া ছেড়ে দেয়। শুধু মদ খাওয়া পরিত্যাগ করেই ক্ষান্ত হয়নি সে। বরং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়ে অভ্যস্ত হয়। ইসলামের রীতি-নীতির ব্যাপারেও সজাগ হয় এবং দীর্ঘদিন মসজিদের একনিষ্ঠ খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। প্রিয় নবীজি a-এর অনুকরণে দাড়ি রাখে সে। আযানের আগেই মসজিদে গিয়ে উপস্থিত হয়। অবশেষে একদিন মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে, কোনোরূপ রোগ-ব্যাধি, কষ্ট-ক্লেশ ছাড়াই এই দুনিয়া ত্যাগ করে পরলৌকিক জীবনে পদার্পণ করে।

[খ]

উপরিউক্ত ঘটনাটি উপস্থাপন করার মূল উদ্দেশ্য হলো, সেই সমস্ত উদাসীন হতভাগ্য যুবক-যুবতী, যারা ধর্মীয় অনুশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুনিয়াতে চলাফেরা করে। যারা মুসলিম সমাজে বসবাস করেও আধুনিকতার দোহায় পেড়ে মদ, জুয়া, গান-বাজনা, সিনেমা, নাটক প্রভৃতিতে আসক্ত। যারা প্রগতির জোয়ারে ভাসমান হয়ে অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার নামে ব্যভিচারে লিপ্ত। যারা শিরক ও বিদআতসহ হাজারো হারাম কাজে জড়িত থেকে সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

যে সমাজের অধিকাংশ মানুষের ধারণা, ‘বয়স বেশি হলে ইবাদত করতে হবে’। এরই বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয় সমাজে। মসজিদের এক কাতার মুছল্লীর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন যুবক; বাকি সবাই বয়স্ক। গ্রামে-গঞ্জে যুবকদের মুখের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে, বেশিরভাগেরই মুখে দাড়ি নেই অথচ বয়স্ক লোকদের অধিকাংশেরই তা রয়েছে।

এর কারণ কী? অনেক যুবককে প্রশ্ন করলে একটা কমন উত্তর আসে, ‘বয়স হোক ভাই— তারপর নামায, রোযা করব’। হে যুবক! তোমাকেই বলছি— বয়স হলে তুমি কেন ইবাদত করবে? আর কার জন্যই-বা করবে? যদি উত্তর দাও, ‘না করলে সমাজ কী বলবে’; তাহলে তোমার এই লেখাটি পড়ার আর দরকার নেই। কিন্তু তুমি যদি উত্তর দাও, ‘মহান আল্লাহর জন্য, জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য বা জান্নাতে যাওয়ার জন্য’, তাহলে কিছু কথা বলি, একটু শোনো।

(১) যে আল্লাহর জন্য তুমি বয়স্ককালে ইবাদত করবে, সেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন কি তোমাকে যৌবনে ইবাদত করার জন্য তাগিদ দেননি?

(২) তোমার ধারণা অনুযায়ী, বয়স্ককালীন ইবাদতে মহান আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করবেন; কিন্তু একথাও তোমাকে মনে রাখতে হবে যে, যৌবনকালের ইবাদত পরিত্যাগের জন্য তিনি শাস্তিও দিতে পারেন? তুমি কি পারবে কয়েক মিনিটের জন্যে জাহান্নামের শাস্তি উপভোগ করতে? —না বন্ধু! আমরা এক মাইক্রো সেকেন্ড সামর্থ্য রাখি না জাহান্নামের শাস্তি উপভোগ করার। তাইতো প্রতি ছালাতের তাশাহহুদে রাসূলুল্লাহ a জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন। হাদীছে আছে, আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন ছালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠ শেষ করবে, তখন সে যেন আল্লাহর নিকট চারটি বস্তু হতে আশ্রয় প্রার্থনা করে। তা হলো: জাহান্নামের আযাব হতে, কবরের আযাব হতে, জীবন ও মৃত্যুর ফেতনা হতে এবং মাসীহ দাজ্জালের অনিষ্ট হতে’।[1]

(৩) যে মানুষের পরবর্তী নিঃশ্বাসের নিশ্চয়তা নেই, সে কি করে বলতে পারে যে, বয়স্ককালে ইবাদত করার সুযোগ লাভ করবে। এমনও তো হতে পারে, তুমি কোনো রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অথবা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চিরদিনের মতো এ জগৎ ছেড়ে না ফেরার দেশে হাজির হবে।

[গ]

হে যুবক! তোমাকেই বলছি, তোমার ভাবনা— এই যৌবনে একটু রঙ্গ-রসে ঘোরাফেরা করি। একটু মস্তি করি। কিন্তু তুমি কি সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী— নাস্তিক? —না, তুমি নাস্তিক নও। তুমি কি তাহলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি সন্দেহ পোষণকারী—অ্যাগনোস্টিক? —না, তুমি তাও নও। তাহলে কি তুমি কাফের? —না তুমি কাফের নও। তুমি মুসলিম। তুমি নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ কর। তবুও কেন তোমার পোশাক-আশাক, চালচলন অবিশ্বাসীদের মতো হবে? তুমি কি রাসূলুল্লাহ a-এর সেই হাদীছ শোনোনি। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে’।[2]

বন্ধু আমার! মহান আল্লাহকে ভয় করো। এই যৌবন আল্লাহর অবাধ্যতায় অতিবাহিত করার জন্য তোমাকে দেওয়া হয়নি। এই যৌবনকাল হলো শক্তি-সামর্থ্য ও কর্মের সময়কাল। এসময় তুমি যেভাবে ইবাদত করতে পারবে, বার্ধক্যের দুর্বল শরীরে তুমি তা নাও করতে পার। তবুও কি তুমি মুখ ফিরিয়ে থাকবে?

বন্ধু! এ বয়সের মর্যাদা আছে। স্মরণ করো, কিয়ামতের মাঠে লোকদের অবস্থা যখন সঙ্গিন হবে এবং সূর্য মাথার এক মাইল দূরে এসে উপস্থিত হবে, তখন মহান আল্লাহ যে মানুষগুলোকে সম্মানের সহিত তাঁর আরশের নিচে ছায়া দান করবেন, তাদের মধ্যে একশ্রেণির মানুষ হবে সেই যুবকদল, যারা তাদের যৌবনকাল আল্লাহর আনুগত্যে অতিবাহিত করেছে।[3]

বন্ধু! তুমি ভাবছ, বয়স্ককালে ইবাদত করব। কিন্তু তুমি কি রাসূল a-এর এই হাদীছ শোনোনি— ইবনু মাসঊদ হতে বর্ণিত, নবী করীম a বলেন, ‘কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আদম সন্তানকে স্ব-স্ব স্থান থেকে এক কদমও নড়তে দেওয়া হবে না। যথা : (১) সে তার জীবনকাল কীভাবে অতিবাহিত করেছে, (২) যৌবনকাল কোথায় ব্যয় করেছে, (৩) ধনসম্পদ কীভাবে উপার্জন করেছে, (৪) কোন পথে তা ব্যয় করেছে, (৫) সে দ্বীনের কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে এবং অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী সে আমল করেছে কিনা’।[4]

তাহলে তুমি এই জিজ্ঞাসার জবাবে কী বলবে? চিন্তা কর! চিন্তাই তোমাকে মুক্তি দিতে পারে।

[ঘ]

হে যুবক! তোমাকেই বলছি, তুমি বয়সকে অজুহাত বানিয়ে পরকাল ধ্বংস করো না। তুমি ফিরে এসো তোমার প্রভুর পথে। অনুতাপ করো। অনুতাপই হলো তওবা। আর খবরদার আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা তোমার প্রতিপালক বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের উপর যুলম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করবেন সকল গুনাহ। বস্তুত, তিনি পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’ (আয-যুমার, ৩৯/৫৩)

বন্ধু! তুমি কি দেখোনি, তোমার চোখের সামনে কত যুবক পরকালে পাড়ি জমালো? কত যুবকের জানাযার ছালাতে তুমি শরীক হয়েছো? তোমার চোখের সামনে কত দুর্ঘটনায় কতজন মারা গেল? মাতালাবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্টে স্পট ডেড হয়েছে— এ ঘটনা তো বিরল নয়। এ ঘটনা অহরহ ঘটছে, তবুও তা তোমার অন্তরে রেখাপাত ঘটায় না! তবে অন্যদের দেখে কি তুমি শিক্ষা গ্রহণ করবে না? —হ্যাঁ! তোমাকে শিক্ষা গ্রহণ করতেই হবে। কারণ, একটি দুর্ঘটনা কারো জন্য হতে পারে শাস্তি, কারো জন্য হতে পারে পরীক্ষা, আবার কারো জন্য সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে দেখানো নিদর্শন।

সুতরাং রাসূল a-এর এই হাদীছকে মূল্যায়ন করো, আমর ইবনু মায়মূন আল-আওদী c বলেন, রাসূলুল্লাহ a জনৈক ব্যক্তিকে উপদেশস্বরূপ বলেন, ‘পাঁচটি বস্তুর পূর্বে পাঁচটি বস্তুকে গনীমত মনে করো। যথা : (১) তোমার বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে, (২) পীড়িত হওয়ার পূর্বে সুস্বাস্থ্যকে, (৩) দরিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে, (৪) ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং (৫) মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে’।[5]

সবশেষে বলি এতদিন যা হয়েছে, যা করেছ তার জন্য অনুতপ্ত হও। তওবা করো। তোমার প্রভু তোমাকে ডাক দিয়ে বলছেন, ‘ঘোষণা করে দাও (আমার এ কথা), হে আমার দাসগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলম করেছ, তারা আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ মাফ করে দেবেন। নিশ্চয় তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমাদের নিকট শাস্তি আসার পূর্বে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করো; শাস্তি এসে পড়লে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের ওপর অতর্কিত শাস্তি আসার পূর্বে তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের তরফ থেকে যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ অবতীর্ণ করা হয়েছে, তার অনুসরণ করো। যাতে কাউকেও বলতে না হয়, হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি তো শৈথিল্য করেছি। আর অবশ্যই আমি ঠাট্টা-বিদ্রূপকারীদের একজন ছিলাম। অথবা কেউ না বলে, আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই সাবধানীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। অথবা শাস্তি প্রত্যক্ষ করলে যেন কাউকেও বলতে না হয়, হায়! যদি একবার পৃথিবীতে আমার প্রত্যাবর্তন ঘটত, তাহলে আমি সৎকর্মপরায়ণ হতাম। (আল্লাহ বলবেন) প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, আমার নিদর্শনসমূহ তোমার নিকট এসেছিল; কিন্তু তুমি ঐগুলোকে মিথ্যা বলেছিলে এবং অহংকার করেছিলে। আর তুমি ছিলে অবিশ্বাসীদের একজন। যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, তুমি কিয়ামতের দিন তাদের মুখ কালো দেখবে। অহংকারীদের আবাসস্থল জাহান্নাম নয় কি?’ (আয-যুমার, ৩৯/৫৩-৬০)


 * এম. এ. (বাংলা), কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

[1]. আবূ দাঊদ, হা/৯৮৩, হাদীছ ছহীহ।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১, হাসান ছহীহ।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬০।

[4]. তিরমিযী, হা/২৪১৬, হাসান।

[5]. তিরমিযী, হা/২৩৩৩, হাসান; মিশকাত, হা/৫১৭৪।