রাবী পরিচিতি : লাইছ ইবনু আবী সুলাইম (রাহঃ)

আল-ইতিছাম ডেস্ক

 

ভূমিকা :

রাবীগণ হলেন হাদীছের সনদ ও মতন বর্ণনাকারী। যাদের মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পবিত্র বরকতময় হাদীছগুলো পেতে সক্ষম হয়েছি। রাবীগণ বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকেন। যেমন ছিক্বাহ, যঈফ, কাযযাব ইত্যাদি। আমাদের আলোচ্য নিবন্ধে আমরা একজন রাবী সম্পর্কে জানবো। তিনি হলেন লাইছ ইবনে আবী সুলাইম (রাহঃ) :

নাম : লাইছ ইবনে আবু সুলাইম ইবনে যুনাইম (রাহঃ)।[1]

উপনাম : আবুবকর ও আবু বুকাইর।[2]

উপাধি : আল-কুরাশী।[3]

তার কিছু উস্তাদের নাম : তাঊস, মুজাহিদ, ‘আতা, ইকরিমা, নাফে‘, আবু ইসহাক আস-সাবীঈ, আবুয যুবায়ের আল-মাক্কী (রাহঃ) প্রমুখ।[4]

কিছু ছাত্রের নাম : সুফিয়ান ছাওরী, শু‘বাহ ইবনুল হাজ্জাজ, যায়েদা ইবনে কুদামা, শারীক (রাহঃ) সহ আরো অনেকে।[5]

ইমামদের মন্তব্য : তার সম্পর্কে রিজাল শাস্ত্রবিদগণের অভিমত :

(ক) যারা সমালোচনা করেছেন :

(১) ইয়াহ্ইয়া ইবনে মাঈন (রাহঃ) (মৃ. ২৩৩ হি.) তাকে যঈফ বলেছেন।[6]

(২) জাওযাজানী (রাহঃ) (মৃ. ২৫৯ হি.) বলেছেন,ليث بن أبي سليم يضعف حديثه ليس بثبت ‘লাইছ ইবনু আবী সুলাইমের হাদীছকে দুর্বল বলা হয়। তিনি মযবূত রাবী নন।[7]

(৩) ইমাম নাসাঈ  (রাহঃ) (মৃ. ৩০৩ হি.) তাকে যঈফ এবং পরিত্যক্ত রাবীদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[8]

(৪) ইবনে হিববান (রাহঃ) (মৃ. ৩৫৪ হি.) বলেছেন,وَكَانَ من الْعباد وَلَكِن اخْتَلَط فِي آخر عمره حَتَّى كَانَ لَا يدْرِي مَا يحدث بِهِ فَكَانَ يقلب الْأَسَانِيد ‘তিনি ইবাদতগুযার ছিলেন। কিন্তু শেষ বয়সে মস্তিস্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তিনি বুঝতেন না কি বর্ণনা করেছেন। আর তিনি সনদসমূহ উলট-পালট করে ফেলতেন’।[9]

(৫) ইবনে আদী হাতেম (রাহঃ) (মৃ. ৩৬৫ হি.) তার সম্পর্কে একাধিক নির্ভরযোগ্য ইমামের ‘জারহ’ (সমালোচনামূলক বক্তব্য) লিপিবদ্ধ  করেছেন।[10]

(৬) হাফেয ইবনে শাহীন (রাহঃ) (মৃ. ৩৮৫ হি.) তাকে যঈফ এবং মিথ্যুকদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[11]

(৭) ইবনুল জাওযী (রাহঃ) (মৃ. ৫৯৭ হি.) ‘লাইছ’-কে যঈফ বলেছেন।[12] তিনি তাকে যঈফ এবং পরিত্যক্ত রাবীদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[13]

(৮) আবুল হাসান ইবনুল কাত্তান (রাহঃ) (মৃ. ৬২৮ হি.) বলেছেন,وَلم يكن بِالْحَافِظِ، وَهُوَ صَدُوق ضَعِيف  ‘তিনি (হাদীছের) হাফেয ছিলেন না। তিনি সত্যবাদী, যঈফ।[14]

(৯) ইবনে আব্দুল হাদী (রাহঃ) (মৃ. ৭৪৪ হি.) রচিত ‘তানকীহুত তাহক্বীক্ব’ গ্রন্থে তাকে দুর্বল বলা হয়েছে।[15]

(১০) হাফেয যাহাবী (রাহঃ) (মৃ. ৭৪৮ হি.) ‘মীযানুল ই‘তিদাল’ গ্রন্থে তার একাধিক ‘জারহ’ তুলে ধরেছেন।[16]

(১১) যায়লাঈ (রাহঃ) বলেছেন, (মৃ. ৭৬২ হি.) مُتَكَلَّمٌ فِيهِ ‘তাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে বা তিনি বিতর্কিত’।[17]

(১২) হাফেয হায়ছামী (রাহঃ) (মৃ. ৮০৭ হি.) বলেছেন, لَكِنَّهُ مُدَلِّسٌ ‘কিন্তু তিনি মুদাল্লিস রাবী’।[18]

(১৩) হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহঃ) (মৃ. ৮৫২ হি.) বলেছেন, صَدوقٌ اختَلَطَ جِدّاً ولَم يَتَمَيَّز حَديثُهُ فَتُرِكَ ‘তিনি সত্যবাদী। (তার) মস্তিষ্ক ভীষণভাবে পরিবর্তন হয়ে হয়েছিল। তার শুদ্ধ-অশুদ্ধ হাদীছ পার্থক্য করা যায়নি। সেজন্য তিনি পরিত্যক্ত’।[19] তিনি অন্যত্র লিখেছেন, ضَعَّفَهُ الجمهور ‘জমহূর বিদ্বানগণ তাকে যঈফ বলেছেন’।[20]

(১৪) আলবানী (রাহঃ) (মৃ. ১৪২০হি.) তাকে যঈফ বলেছেন।[21]

(খ) যারা প্রশংসা করেছেন :

(১) ইমাম মুসলিম (রাহঃ) (মৃ. ২৬১ হি.) তাকে দ্বিতীয় স্তরের রাবী হিসাবে উল্লেখ করেছেন।[22]

(২) ইজলী (রাহঃ) বলেছেন, (মৃ. ২৬১ হি.) جَائِز الحَدِيث ‘তিনি জায়েযুল হাদীছ’।[23]

ফায়সালা :

যারা প্রশংসা করেছেন, তাদের প্রশংসা জমহূরের বিপরীত হওয়ার কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়াও ইখতিলাতের পূর্বে তার ব্যাপারে প্রশংসাবাণী থাকলেও ইখতিলাতের পর আর তেমন কোন তা‘দীল বা তাওছীক্ব তথা প্রশংসাবাণী পাওয়া যায় না। সুতরাং জমহূরের মতানুসারে তিনি একজন যঈফ রাবী। যা উপরের আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে।

তার বর্ণিত হাদীছ সমূহ :

হাদীছ-১ :

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ مُصَرِّفٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَسَحَ مُقَدَّمَ رَأْسِهِ حَتَّى بَلَغَ الْقَذَالَ. مُؤَخَّرُ الرَّأْسِ مِنْ مُقَدَّمِ عُنُقِهِ

ত্বালহা ইবনে মুছাররিফ তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে দেখেছি তিনি মাথার অগ্রভাগ মাসাহ করতেন। এমনকি তিনি ‘ক্বাযাল’ পর্যন্ত হাত পৌঁছাতেন। (‘ক্বাযাল’ হল) ঘাড়ের অগ্রভাগ হতে মাথার শেষ ভাগ।[24]

হাদীছ-২ :

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ قَالَ النُّفَيْلِيُّ قَالَتْ  كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَمُرُّ بِالْمَرِيضِ، وَهُوَ مُعْتَكِفٌ، فَيَمُرُّ كَمَا هُوَ، وَلَا يُعَرِّجُ يَسْأَلُ عَنْهُ

রাবী আন-নুফায়লী বলনে, আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, নবী করীম (ছাঃ) ই‘তিকাফে থাকা অবস্থায় রোগীর নিকট গমন করতেন। এরপর তিনি যেভাবে থাকতেন, সেভাবে গমন করতেন এবং তার (রোগীর) নিকট দন্ডায়মান না হয়ে তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতেন।[25]

হাদীছ-৩ :

عَنْ لَيْثِ بْنِ أَبِي سَلِيمٍ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ : قِيلَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنَّ مَيْسَرَةَ الْمَسْجِدِ تَعَطَّلَتْ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ عَمَّرَ مَيْسَرَةَ الْمَسْجِدِ كُتِبَ لَهُ كِفْلَانِ مِنَ الْأَجْرِ

ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ)-কে বলা হলো, মসজিদের বাম দিক খালি হয়ে গেছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মসজিদের বাম দিকের খালি জায়গা পূর্ণ করবে, তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার লিপিবদ্ধ করা হয়’।[26]

মৃত্যু : তিনি ১৪৩ হিজরীতে এই নশ্বর দুনিয়া হতে পরকালে পাড়ি জমান।[27] আল্লাহ তাকে রহম করুন। তাকে জান্নাতুল ফেরদাঊস দান করুন।

উপসংহার :

উপরের আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, লাইছ ইবনু আবী সুলাইম সমালোচিত ও যঈফ রাবী। তাঁর বিরুদ্ধে যেসব সমালোচনা রয়েছে, সেগুলো তার চরিত্রের ভিত্তিতে করা হয়নি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মন্দ মানুষ ছিলেন এমনটা ধারণা করা যাবে না। কেননা মেধা ও হিফয শক্তিতে দুর্বলতা থাকার মানে এই নয় যে, তার চরিত্রও খারাপ ছিল। সুতরাং এ সকল জারহ অধ্যয়ন করে কেউ যেন তার উপর ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে। বরং কেবলমাত্র হাদীছের রাবী হিসাবে তার মেধা ও আয়ত্ত্ব শক্তির উপর সমালোচনা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ছাত্র ক্লাসের পড়া শুনে মুখস্থ কম করতে পারে। ক্লাসের পড়া লিখতে গিয়ে ভুল করে। এতে তার মেধাহীনতা প্রমাণিত হয়। কিন্তু এতে তার চরিত্র খারাপ তা প্রমাণিত হয় না। আলোচ্য রাবীর বিষয়টিও অনুরূপ।

[1]. ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহঃ), তাহযীবুত তাহযীব, রাবী নং ৮৩৫; তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৫৬৮৫।

[2]. ইমাম মুসলিম (রাহঃ), আল-কুনা ওয়াল আসমা, রাবী নং ৩১৩।

[3]. তাহযীবুত তাহযীব, রাবী নং ৮৩৫।

[4]. তাহযীবুত তাহযীব, রাবী নং ৮৩৫।

[5]. প্রাগুক্ত।

[6]. তারীখে ইবনে মাঈন, দারেমীর বর্ণনা, রাবী নং ৭২০।

[7]. আহওয়ালুর রিজাল, রাবী নং ১৩২।

[8]. আয-যু‘আফাঊল মাতরূকীন, রাবী নং ৫১১।

[9]. আল-মাজরূহীন, রাবী নং ৯০৬।

[10]. আল-কামিল, রাবী নং ১৬১৭।

[11]. তারীখে আসমাঊয যু‘আফা ওয়াল কাযযাবীন, রাবী নং  ৫৩১।

[12]. আত-তাহক্বীক্ব ফী মাসাইলিল খিলাফ, হা/১৩১৫।

[13]. আয-যু‘আফাঊল মাতরূকীন, রাবী নং ২৮১৫।

[14]. বায়ানুল ওয়াহমি ওয়াল ঈহাম ফী কুতুবিল আহকাম, ৫/২৯৫।

[15]. তানকীহ, ৩/২৩৪।

[16]. মীযানুল ই‘তিদাল, রাবী নং ৬৯৯৭।

[17]. নাসবুর রায়াহ, ২/৪৭৫; ৪/৩৩০।

[18]. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হা/ ৬৩৬৪।

[19]. ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহঃ), তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৫৬৮৫।

[20]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ইতহাফুল মাহরাহ, হা/২৭৬০।

[21]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৫৪।

[22]. ছহীহ মুসলিমের ভূমিকা ১/৫ পৃঃ।

[23]. আছ-ছিক্বাত, রাবী নং ১৪৩১।

[24]. শারহু মা‘আনিল আছার, হা/১২৯; যঈফ আবুদাঊদ, হা/১৫।

[25]. আবুদাঊদ, হা/২৪৭২, হাদীছটি যঈফ। বিসত্মারিত দ্রষ্টব্য : যঈফ আবুদাঊদ, হা/৪২৪।

[26]. ইবনে মাজাহ, হা/১০০৭; যঈফুল জামে‘, হা/২৬৪।

[27]. খলীফা ইবনে খাইয়্যাত, আত-তাবাকাত, রাবী নং ১২৫৯।

1 মন্তব্য

  1. মা-শা-আল্লাহ।
    শাইখকে আরো নেশি করে লেখার জন্য তৌফিক দান করুন আমিন।
    আবু হানিফা রহঃ হাদীস শাস্ত্রে কতটুকু নির্ভরশীল না যোগ্য রিজালের মাধ্যমে জান্তে চাই