রামাযান মাসে কতিপয় বিদআত ও সুন্নাহ বিরোধী কার্যক্রম : একটি পর্যালোচনা
 সাজ্জাদ সালাদীন*


ছিয়ামের সংজ্ঞা : ছওম বা ছিয়াম ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয়। رَمَضَانُ শব্দটি رَمَضَ শব্দ হতে নির্গত। এর অর্থ পুড়িয়ে ফেলা। ছিয়াম রাখলে গুনাহ মাফ হয়। রামাযান গুনাহকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দেয়। তাই এর নাম রামাযান। ছিয়াম শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে, বিরত থাকা। তাইতো চুপ বা নিস্তব্ধ থাকাকে ছিয়াম বলে। আর যে ব্যক্তি চুপ থাকে, তাকে ছায়েম বলে।

ااَلصِّيَامُ-এর আভিধানিক অর্থ হলো, সাধারণভাবে বিরত থাকা। অর্থাৎ সহবাস, কটু কথা, খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত থাকা। صَوْمٌ অথবা صِيَامٌ শব্দদ্বয়صَامَ -يَصُوْمُ মাছদার হতে উৎপন্ন। আল্লামা রাগেব ইসপাহানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, صَوْمٌ শব্দের অর্থ হলো, কোনো কাজ হতে বিরত থাকা। এজন্য যে ঘোড়া চলা হতে বিরত থাকে, তাকে ‘ছায়েম’ বলা হয়। কোনো কোনো আলেম এর প্রমাণে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত উপস্থাপন করেন, إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنْسِيًّا ‘আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে ছিয়ামের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না’ (মারইয়াম, ১৯/২৬)

আলোচ্য আয়াতে صَوْمٌ শব্দটি কথা-বার্তা হতে বিরত থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লামা হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) صَوْمٌ এর শারঈ ও পারিভাষিক অর্থ এভাবে করেছেন,

إِمْسَاكٌ مَخْصُوْصٌ فِىْ زَمَنٍ مَخْصُوْصٍ مِنْ شَيْءِ مَخْصُوْصٍ بِشَرَائِطَ مَخْصُوْصَةٍ

‘নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট শর্তাবলির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কতিপয় বস্তু হতে বিরত থাকার নাম ছিয়াম’।[1] 

শরীআতের পরিভাষায় ছিয়াম হলো, ফজর তথা সূর্যোদয়ের পূর্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী সঙ্গমসহ যাবতীয় ছিয়াম নষ্টকারী কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করা। কারণ প্রিয় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই ছিয়াম নয়, বরং অসারতা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার নামই হলো (প্রকৃত) ছিয়াম।

সুতরাং যদি তোমাকে কেউ গালাগালি করে অথবা তোমার প্রতি মূর্খতা দেখায়, তাহলে তুমি (তার প্রতিকার বা প্রতিশোধ না নিয়ে) তাকে বলো যে, আমি ছিয়াম রেখেছি, আমি ছিয়াম রেখেছি।[2] 

ছিয়ামের ঐতিহাসিক পটভূমি : যুগে যুগে তাক্বওয়া অর্জনের সুযোগ ও চেষ্টা বিদ্যমান ছিল। তাই আমরা দেখি, অন্যান্য আসমানী কিতাবের অনুসারীদের উপরও ছিয়াম ফরয ছিল। একথাই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِنْ قَبلِكُمْ ‘যেমন করে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছিল’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৩)। 

হিজরী দ্বিতীয় সনে ছিয়াম ফরয হয় : প্রথমে কোন ছিয়াম ফরয ছিল এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, ১০ মুহাররম অর্থাৎ আশূরার ছিয়াম ফরয ছিল, আবার কারও কারও মতে, ‘আইয়ামুল বীয’ অর্থাৎ প্রত্যেক চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ছিয়াম ফরয ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মদীনায় হিজরত করলেন, তখন আইয়ামুল বীযের ছিয়াম রাখতেন। হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরীতে উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য ছিয়াম ফরয করা হয়। এ মাসেই নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং হক্ব ও বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে ছিয়াম পালন করে। তবে কেউ রোগাক্রান্ত হলে অথবা সফরে থাকলে এ সংখ্যা অন্য সময় পূরণ করবে। আল্লাহ চান তোমাদের জন্য যা সহজ তা, আর তিনি চান না তোমাদের জন্য যা কষ্টকর তা, যেন তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করো এবং আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো, তোমাদের সৎপথে পরিচালিত করার জন্য এবং যেন তোমরা শোকর করতে পারো’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৫)

উক্ত আয়াতটি নাযিলের পর আশূরার ছিয়াম অথবা আইয়ামুল বীযের ছিয়াম পালনের ফরযিয়াত (আবশ্যকীয়তা) মানসূখ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় হিজরত করার পর হিজরী দ্বিতীয় সনে ছিয়াম ফরয হওয়ার আগ পর্যন্ত দু’ধরনের ছিয়ামের প্রচলন ছিল: (ক) আইয়ামুল বীয অর্থাৎ প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ছিয়াম রাখা। (খ) আশূরার দিন অর্থাৎ ১০ মুহাররমের দিন ছিয়াম রাখা। হিজরী দ্বিতীয় সনে ছিয়াম ফরয হওয়ার পর থেকে উম্মাতে মুহাম্মাদী দীর্ঘ এক মাসব্যাপী ছিয়াম পালন করে আসছে। পবিত্র রামাযানের ছিয়ামের ক্ষেত্রে পাঁচটি পালনীয় দিক রয়েছে: (১) চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখা, (২) সকাল হওয়ার আগে ছিয়ামের জন্য নিয়্যত করা, (৩) পানাহার ও জৈবিক বিশেষ করে যৌন চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকা, (৪) ইচ্ছাকৃত বমি করা থেকে নিবৃত্ত থাকা ও (৫) ছিয়ামের পবিত্রতা রক্ষা করা।

রামাযান মাসে কতিপয় বিদআত ও সুন্নাত বিরোধী কার্যক্রম : রামাযান মাসে সমাজে একাধিক বিদআত প্রচলিত রয়েছে। যেগুলো এক জায়গায় এক রকম, অন্য জায়গায় আরেক রকম। এক দেশের লোকাচার অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। নিম্নে আমাদের দেশে প্রচলিত এ সংক্রান্ত কিছু বিদআতী কাজের চিত্র তুলে ধরব-

(১) রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত এরূপ বিভক্তিকরণ শরীআতে নিষিদ্ধ : রামাযানের প্রথম ১০ দিন রহমত, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাত এবং তৃতীয় ১০ দিন নাজাত বলে মাসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যাবে না, যা শরীআতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনুরূপ রামাযান মাসে একটি সুন্নাত আমল করলে অন্য মাসে ফরয আমল করার মতো নেকী হয় এবং একটি ফরয আমল করলে ৭০টি ফরয আমল করার মতো নেকী হয়। এ বক্তব্যগুলো সঠিক নয়। উক্ত মর্মে যে হাদীছটি সমাজে প্রচলিত আছে, তা যঈফ ও অগ্রহণযোগ্য।[3] হাদীছটি নিম্নরূপ :

شَهْرُ رَمَضَانَ أَوَّلُهُ رَحِمُهُ وَ أَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ وَ آخِرُهُ عِتْقٌ مِنَ النَّارِ

‘রামাযান মাসের প্রথম অংশ রহমত, মধ্যম অংশ মাগফিরাত ও শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তির’। এ হাদীছ মুনকার।[4] বরং পুরো মাসই রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস। কেননা ছিয়ামের কোনো বিকল্প হয় না। মূলত ছিয়ামের নেকীর সাথে অন্য কোনো ইবাদতের তুলনা হয় না। আর তাই এর প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে দিবেন।

এ প্রসঙ্গে হাদীছ রয়েছে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহর মর্জি হলে আদম সন্তানের প্রতিটি সৎকাজের প্রতিদান ১০ গুণ থেকে ৭ শত গুণ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তবে ছিয়াম ব্যতীত, তা আমার জন্যই (রাখা হয়) এবং আমিই তার প্রতিদান দিব। সে তার প্রবৃত্তি ও পানাহার আমার জন্যই ত্যাগ করে। ছিয়াম পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দ- একটি আনন্দ তার ইফতারের সময় এবং আরেকটি আনন্দ রয়েছে স্বীয় প্রভু আল্লাহর সাথে তার সাক্ষাতের সময়। ছিয়াম পালনকারীর ব্যক্তির মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরীর ঘ্রাণের চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়।[5]

(২) রামাযানের নতুন চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে বিদআত : রামাযানের নতুন চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু লোক চাঁদের দিকে হাত উঁচু করে শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করে থাকে। এটা বিদআত। কেননা কুরআন-সুন্নাহতে এর কোনো ভিত্তি নেই। তবে নতুন চাঁদ দেখলে নিম্নোক্ত দু‘আটি পাঠ করা সুন্নাত :

اللَّهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ وَالإِيمَانِ وَالسَّلاَمَةِ وَالإِسْلاَمِ رَبِّيْ وَرَبُّكَ اللهُ

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! এ চাঁদকে আমাদের মাঝে বরকত, ঈমান, শান্তি-নিরাপত্তা ও ইসলামের সাথে উদিত করো। আমার ও তোমার রব আল্লাহ’।[6]

(৩) সাহরীর আযান ও সাহরী সংক্রান্ত বিদআত : দেখা যায়, রামাযান মাসে শেষ রাতে মুআযযিনগণ মাইকে উচ্চ আওয়াযে কুরআন তেলাওয়াত, গযল, ইসলামী সঙ্গীত ইত্যাদি গাওয়া শুরু করে। অথবা টেপ রেকর্ডার চালিয়ে বক্তাদের ওয়ায, গযল বাজাতে থাকে। সেই সাথে চলতে থাকে ভায়েরা আমার, বোনেরা আমার, উঠুন, সাহরীর সময় হয়েছে, রান্না-বান্না করুন, খাওয়া-দাওয়া করুন ইত্যাদি বলে অনবরত ডাকাডাকি। অথবা কোথাও বা কিছুক্ষণ পরপর উঁচু আওয়াযে হুইশেল বাজানো হয়। এর থেকে আরো আজব কিছু আচরণ দেখা যায়। যেমন : এলাকার কিছু যুবক রামাযানের শেষ রাতে মাইক নিয়ে এসে সম্মিলিত কণ্ঠে গযল বা কাওয়ালী গেয়ে মানুষের বাড়ির দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে চাঁদা আদায় করে। অথবা মাইক বাজিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে। এ ছাড়াও এলাকা ভেদে বিভিন্ন বিদআতী কার্যক্রম দেখা যায়। আমাদের জানা উচিত, শেষ রাতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিচের আসমানে নেমে আসেন। এটা দু‘আ কবূলের সময়। আল্লাহ তাআলার নিকট এ সময় কেউ দু‘আ করলে তিনি তা কবুল করেন।

মুমিন বান্দাগণ এ সময় তাহাজ্জুদের ছালাত পড়েন, কুরআন তেলাওয়াত করেন, মহান আল্লাহর দরবারে রোনাযারী করে থাকেন। সুতরাং এ সময় মাইক বাজিয়ে, গযল গেয়ে বা চাঁদা তুলে এ মূল্যবান সময়ে ইবাদতে বিঘ্নিত করা নিঃসন্দেহে গুনাহের কাজ। এতে মানুষের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানো হয়। যার ফলে অনেকের সাহরী এমনকি ফজরের ছালাত পর্যন্ত ছুটে যায়। এই কারণে অনেক ছিয়াম পালনকারী সাহরীর শেষ সময় পর্যন্ত বিলম্ব না করে আগে ভাগে সাহরী শেষ করে দেয়। এসবগুলোই গুনাহের কাজ। তাহলে আমাদেরকে জানতে হবে    এ ক্ষেত্রে সুন্নাহ কী? প্রকৃতপক্ষে সুন্নাহ হচ্ছে, সাহরীর জন্য দুটি আযান দেওয়া।

দুটি আযান দেওয়া রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত ছিল। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,إِنَّ بِلاَلاً يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ فَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يُؤَذِّنَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ ‘বেলাল রাতে আযান দেয়। অতএব, তোমরা বেলালের আযান শুনলে পানাহার করতে থাকো যতক্ষণ না ইবনু উম্মে মাকতূম (ফজরের) আযান দেয়’।[7] সুতরাং এর বেশি কিছু করতে যাওয়া বিদআত ছাড়া অন্য কিছু নয়। এজন্যই উলামায়ে কেরাম বলেছেন, যখন একটি সুন্নাত উঠে যায়, তখন সেখানে একটি বিদআত স্থান করে নেয়’। আমাদের অবস্থাও হয়েছে তাই। সুন্নাত উঠে গিয়ে সেখানে নিজেদের মনগড়া পদ্ধতি স্থান দখল করে নিয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে পুনরায় সুন্নাতের দিকে ফিরে আসার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন।

(৪) সাহরী খাওয়ার সময় মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করা বিদআত : সাহরী খাওয়া একটি ইবাদত। আর যে কোনো ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য নিয়্যত অপরিহার্য শর্ত। সুতরাং ছিয়াম রাখার কথা মনের মধ্যে সক্রিয় থাকাই নিয়্যতের জন্য যথেষ্ট। ইসলামী শরীআতে কোনো ইবাদতের নিয়্যত মুখ দিয়ে উচ্চারণের কথা আদৌ প্রমাণিত নয়। অথচ আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ওযূর নিয়্যত, ছালাতের নিয়্যত, সাহরী খাওয়ার নিয়্যত ইত্যাদি চর্চা করা হয়। ছালাত শিক্ষা, ছিয়ামের মাসায়েল শিক্ষা ইত্যাদি বইতে এসব নিয়্যত আরবীতে অথবা বাংলা অনুবাদ করে পড়ার জন্য জনগণকে শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, দ্বীনের মধ্যে এভাবে নতুন নতুন সংযোজনের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে আমাদের এই দ্বীনে এমন নতুন কিছু তৈরি করল যা তার অন্তর্ভুক্ত নয় তা পরিত্যাজ্য’।[8]

আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে যে, কেউ কেউ নিয়্যত করার পরিবর্তে নিয়্যত পড়েন এবং আরবীতে نَوَيْتُ أَنْ أَصُوْمَ غَدًا ‘নাওয়াইতু আন আছূমা গাদান’ বলে আরবীতে নিয়্যত শুরু করেন এমন করলে কি ছওয়াব বেশি হবে? মূলত নিয়্যত কখনই পড়তে বলা হয়নি; করতে বলা হয়েছে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাহাবায়ে কেরাম এবং চার মাযহাবের ইমামগণ কেউই মুখে মুখে নিয়্যত পড়েননি। কাজেই যারা নিয়্যত পড়েন, মুখে মুখে বলেন এটা শুদ্ধ নয়। আর ছওয়াব বেশি হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। বিশুদ্ধ পদ্ধতি হলো, মনে মনে কল্পনা করে নিয়্যত করা।

নাওয়াইতু আন’ বলে নিয়্যত শুরু করার প্রচলনটা কীভাবে হলো? : কারো কারো ধারণা কায়েদা বাগদাদীর লেখক নিজে থেকে বানিয়ে এটা শুরু করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অন্যান্য বইয়ের লেখকেরা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের বইগুলোতেও এগুলো পেশ করেছেন। এগুলোর কোনো অস্তিত্ব বা দলীল কুরআন-হাদীছে কোথাও নেই।

(৫) তারাবীহর ছালাত সংক্রান্ত বিদআত : অনেক মসজিদে দেখা যায়, তারাবীহর ছালাতের প্রতি দুই বা চার রাকআত শেষে মুছল্লীগণ উঁচু আওয়াযে ‘সুবহানা যিল জাবারূতে ওয়াল মালাকূতে…’ দু‘আটি পাঠ করে থাকে। অথচ এটা স্পষ্ট বিদআত। অনুরূপভাবে অন্য কোনো দু‘আ এক সাথে উঁচু আওয়াযে পাঠ করাও বিদআত। কারণ, এ ব্যাপারে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কোনো ছহীহ হাদীছ নেই, বরং ছালাত শেষে যে সকল দু‘আ ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো পাঠ করা সুন্নাত। যেমন- তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ, একবার আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়ামিনকাস সালাম, তাবারক্তা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ ইত্যাদি। তারাবীহর ছালাতে খুব তাড়াতাড়ি কুরআন তেলাওয়াত করা বা তাড়াহুড়া করে ছালাত পড়া। অনেক মসজিদে রামাযানে তারাবীহর ছালাতে খুব তাড়াতাড়ি কুরআন তেলাওয়াত করা বা তাড়াহুড়া করে ছালাত শেষ করা হয়, যার কারণে তেলাওয়াত ঠিক মতো বুঝাও যায় না। ছালাতে ঠিকমতো দু‘আ-যিকিরও পাঠ করা যায় না। এটা নিঃসন্দেহে সুন্নাত পরিপন্থী। কেননা, আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রাতের ক্বিয়ামুল লায়ল হতো অনেক দীর্ঘ এবং ধীরস্থিরভাবে।

(৬) বদর দিবস পালন করা বিদআত : প্রতি বছর রামাযানের ১৭ তারিখে এ ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করার জন্য লোকজন একত্রিত হয়ে কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। তারপর বদরের বিভিন্ন ঘটনা, ছাহাবীদের সাহসিকতা ইত্যাদি আলাচনা কর হয়। এভাবে প্রতি বছর এই দিনে ‘বদর দিবস’ পালন করা হয়। যদিও আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে এটির প্রচলন তেমন নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের কিছু ইসলামী সংগঠন প্রতি বছর বেশ জোরেশোরে সাংগঠনিক কার্যক্রম হিসেবে এই বিদআত পালন করে থাকে। অথচ উম্মাতে মুহাম্মাদীর সর্বোত্তম আদর্শ ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং আতবাউত তাবেঈন থেকে এ জাতীয় অনুষ্ঠান পালনের কোনো ভিত্তি নেই। বদরের এ ঘটনা নিঃসন্দেহে মুসলিমদের প্রেরণার উৎস। এ সম্পর্কে জ্ঞান অজর্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এভাবে দিবস পালন করা শরীআত সম্মত নয়।

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)  বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুঅত জীবনে রয়েছে অনেক বক্তৃতা, সন্ধি, চুক্তি এবং বিভিন্ন বড় বড় ঘটনা, যেমন- বদর, হুনাইন, খন্দক, মক্কা বিজয়, হিজরত মুহূর্ত, মদীনায় প্রবেশ, বিভিন্ন বক্তৃতা যেখানে তিনি দ্বীনের মূল ভিত্তিগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও তিনি তো এ দিনগুলোকে আনন্দ-উৎসব হিসাবে পালন করা আবশ্যক করেননি। বরং এ জাতীয় কাজ খ্রিষ্টানরা করে। তারা ঈসা (আলাইহিস সালাম) -এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে উৎসব হিসেবে পালন করে থাকে। অনুরূপভাবে ইয়াহূদীরাও এমনটি করে। ঈদ বা উৎসব হলো শরীআতের একটি বিধান। আল্লাহ তায়ালা শরীআত হিসেবে যা দিয়েছেন তা অনুসরণ করতে হবে। অন্যথা এমন নতুন কিছু আবিষ্কার করা যাবে না, যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[9] সুতরাং শরীআত যে কাজ করতে আদেশ করেনি, তা হতে দূরে অবস্থান করে রামাযান মাসে অধিকহারে কুরআন তেলাওয়াত করা, নফল ছালাত আদায় করা, যিকির-আযকার এবং অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী বেশি বেশি করা দরকার। কিন্তু মুসলিমদের অন্যতম সমস্যা হলো শরীআত অনুমোদিত ইবাদত বাদ দিয়ে নবাবিষ্কৃত বিদআতী আমল নিয়ে ব্যস্ত থাকা। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন- আমীন।

(৭) ই‘তিকাফ সংক্রান্ত ভুল ধারণা : ই‘তিকাফ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি রামাযানের শেষ ১০ দিন ই‘তিকাফ করতেন। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের দেশে মনে করা হয় যে, সমাজের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তিকে অবশ্যই ই‘তিকাফে বসতে হবে, তা না হলে সবাই গুনাহগার হবে। কিন্তু এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। বরং এটি ব্যক্তিগত ইবাদত।

(৮) জুমআতুল বিদা পালনের বিদআত : আমাদের দেশে দেখা যায়, রামাযানের শেষ শুক্রবারে জুমআতুল বিদা পালন করা হয়। এ উপলক্ষ্যে জুমআর ছালাতে প্রচুর ভিড় পরিলক্ষিত হয়। অথচ কুরআন-সুন্নাহয় এ ব্যাপারে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। আমাদের কর্তব্য প্রত্যেক জুমআকে গুরুত্ব দেওয়া। শেষ জুমআর বিশেষ কোনো ফযীলত আছে বলে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর এ ধরনের প্রথা উদ্ভাবন করা মানেই বিদআত প্রচলন করা। যেমন এ প্রসঙ্গে  হাদীছ এসেছে। হাদীছটি নিম্নরূপ :

فَإِنَّ خَيْرَ الأُمُورِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرَ الْهَدْىِ هَدْىُ مُحَمَّدٍ وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ.

‘সবচেয়ে ভালো বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। আর সবচেয়ে ভালো নিয়ম হলো মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিয়ম। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হলো (দ্বীনের ব্যাপারে) বিদআত বা নতুন কিছু সৃষ্টি করা। আর প্রতিটি বিদআত (নতুন সৃষ্টিই) হলো ভ্রষ্টতা। এরপর তিনি বলতেন, ‘আমি প্রতিটি মুমিনের জন্য তার নিজের চাইতেও উত্তম’।[10]

উক্ত হাদীছের আলোকে বলা যায় যে, জুমআতুল বিদা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে ছিল না। আর ছিল না বলেই এটা বিদআত। এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে আমাদেরকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকভাবে সঠিক পদ্ধতিতে ইবাদত করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন।

(৯) ফিত্বরা প্রদানের ক্ষেত্রে সুন্নাতের বরখেলাপ : খাদ্যদ্রব্য না দিয়ে টাকা দিয়ে অথবা কাপড় কিনে ফিত্বরা দেওয়া সুন্নাতের বরখেলাপ। কারণ, হাদীছে ফিত্বরা হিসাবে খাদ্যদ্রব্য প্রদান করার কথাই বর্ণিত হয়েছে। যেমন ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

فَرَضَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى كُلِّ حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى ، مِنَ الْمُسْلِمِينَ

‘রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসলিমদের প্রত্যেক স্বাধীন, দাস, পুরুষ অথবা নারী সকলের উপর এক ছা‘ (প্রায় আড়াই কেজি) পরিমান খেজুর অথবা যব যাকাতুল ফিত্বর হিসাবে আবশ্যক করেছেন’।[11]  এখানে খাদ্যদ্রব্যের কথা সুস্পষ্ট। তাছাড়া নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগেও দীনার-দিরহামের প্রচলন ছিল, কিন্তু তিনি অথবা তার কোনো ছাহাবী দীনার-দিরহাম দ্বারা ফিত্বরা আদায় করেছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। তাই সুন্নাত হলো আমাদের দেশের প্রধান খাদ্যদ্রব্য (যেমন- চাউল) দ্বারা ফিত্বরা আদায় করা। আরেকটি বিষয় হলো, হাদীছে বর্ণিত এক ছা‘-এর পরিবর্তে আধা ছা‘ ফিত্বরা দেওয়াও সুন্নাতের বরখেলাপ। যেমনটি উপরিউক্ত হাদীছে স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়েছে। যদিও আমাদের সমাজে আধা ছা‘ ফিত্বরা দেওয়ার মাসআলাই দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা সকল ক্ষেত্রে তার নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতকে যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক্ব দান করুন এবং সকল বিদআত ও সুন্নাত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে হেফাযত করুন- আমীন।

(১০) ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আযহা তিন দিন কথাটা কতটুকু শরীআত সম্মত? : ঈদুল ফিত্বর শুধু এক দিন। সে দিনটি হলো শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। হাদীছে এসেছে, আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আযহার- এ দুদিনে ছিয়াম রাখতে নিষেধ করেছেন এবং এমনভাবে পুরুষের জন্য এক প্রস্থ কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন, যাতে হস্তপদ পাথরের মতো নিশ্চল থাকে এবং তিনি সকাল হবার পর (দুই রাকআত সুন্নাত ব্যতীত অন্য ছালাত) এবং আছরের পরে ছালাত পড়তে নিষেধ করেছেন।[12]

অতএব, উক্ত দলীলের ভিত্তিতে ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আযহা হলো এক দিন। সেদিন ছিয়াম রাখা শরীআতে হারাম। তাই শাওয়াল মাসের দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিন ছিয়াম রাখা হারাম নয়। তাই সে দুটি দিনে রামাযানের ক্বাযা রাখা, নফল ছিয়াম রাখা তথা শাওয়াল মাসের ৬টি ছিয়াম রাখা জায়েয রয়েছে।

উপসংহার : রামাযান হলো খালেছ ইবাদতের মৌসুম। তাই এ মাসের সময়গুলো যতটা শুধু আল্লাহর সাথে কাটানো যায় ততটাই কল্যাণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে রামাযান ও ছিয়ামের ফযীলত লাভ করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন।


* এম. এ., ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

[1]. ফাতহুল বারী, ৪/১৩২।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৯৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৫৯; আবূ দাঊদ, হা/২৩৬৩।

[3]. বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান, হা/১৮৩৯, সনদ ছহীহ।

[4]. উকায়লী, কিতাবুয যুআফা, ২/১৬২; ইবনু আদী, আল-কামেল ফী যুআফায়ির রিজাল, ১/১৬৫; ইবনু আবি হাতেম, কিতাবু ই‘লালিল হাদীছ, ১/২৪৯; আলবানী, সিলসিলাতিল আহাদীছুয যঈফা ওয়াল মাওযূআ, ২/২৬২ ও ৪/৭০।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৯৪, ১৯০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫১।

[6]. মুসনাদে আহমাদ, ৩/৪২০; তিরমিযী, ‘চাঁদ দেখার সময় কী বলবে?’ অধ্যায়, আল্লামা আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)  বলেন, হাদীছটি ছহীহ।

[7]. ছহীহ বুখারী, ‘ফজরের আগে আযান দেওয়া’ অনুচ্ছেদ; ছহীহ মুসলিম, ‘ফজর উদিত হলে ছিয়াম শুরু হবে…’ অনুচ্ছেদ।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮, ৪৫৯০।

[9]. ইকতিযাউয ছিরাতিল মুস্তাক্বীম, পৃ. ২/৬১৪ ও ৬১৫।

[10]. ইবনু মাজাহ, হা/৪৫; নাসাঈ, হা/১৫৭৮, ১৯৬২; আবূ দাঊদ, হা/২৯৫৪; আহমাদ, হা/১৩৭৪৪; দারেমী, হা/২০৬।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৪।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৯২; আবূ দাঊদ, হা/২৪১৭।