রামাযান মাস, বন্দী শয়তান, তবুও আমরা খারাপ কাজ করি কেন?
জাবির হোসেন*


আজ থেকে শুরু পবিত্র রামাযান মাস। সন্ধ্যাবেলা পশ্চিমাকাশে চাঁদ দেখা গেছে। সময় এগিয়ে চলেছে দ্রুত। দেখতে দেখতে এক বছর পেরিয়ে আবার রামাযান মাস এসে উপস্থিত। আল-হামদুলিল্লাহ! মুসলিমদের কাছে রামাযান মাসের গুরুত্বই আলাদা। এই মাস বহু মাহাত্ম্যপূর্ণ মাস— রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। এই মাস ত্যাগের মাস, আত্ম-সংযমের মাস, ক্ষুধিতের ক্ষুধা উপলব্ধির মাস।

এই মাসেই নাযিল হয়েছে পবিত্র কুরআন। যে পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য হেদায়াতস্বরূপ। ভেবে আনন্দিত হচ্ছি যে, আবার আরো একবার অত্যাধিক ছওয়াব সম্বলিত একগুচ্ছ ইবাদতে শামিল হয়ে প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনে প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ! সাহারী, ইফতার, তারাবীহ, ই‘তিকাফ, যাকাতুল ফিতর ও ঈদের ছালাতসহ আরো কত ইবাদত।

স্থানীয় একটি মসজিদ থেকে এশা ও তারাবীর ছালাত আদায় করে ঘরে ফিরলাম।

মসজিদে এখন মুছল্লীর উপস্থিতি লক্ষণীয়। আজ পর্যন্ত মাগরিবের ছালাতে এক কাতারও মুছল্লী ছিল না; কিন্তু এশা ও তারাবীর সালাতে প্রায় তিনগুণ বেশি। —মাশাআল্লাহ! তবে এই গতি মন্থর হতে হতে আবার একই জায়গাতে চলে আসবে। ঠিক যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখানে। হয়তোবা দুয়েকজন নতুন যুক্ত হতে পারে। বিগত কুড়ি বছরে এর ব্যতিক্রম আমার দৃষ্টিতে পরিলক্ষিত হয়নি।

আজ মেসে রান্না হয়নি। রাতের খাবার হোটেল থেকে নিয়ে এসেছি। সাহারীর জন্য এখনই খাবার কিনে নিয়েছি।

আমরা একসঙ্গে মোট পাঁচজন খেতে বসেছি আমাদের ঘরেই। আমি, আহমাদ ছাড়াও সঙ্গে আছে পাশের ঘরের ফাহিম, সাইফুল ও শফীকুল।

খেতে খেতে সাইফুল আহমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আহমাদ! প্রতিবছর তো মুসলিমরা ছিয়াম পালন করছে, কিন্তু মুসলিম সমাজের পরিবর্তন আমার চোখে পড়ছে না কেন? রামাযান মাস চলে যেতে না যেতেই আবার সেই মদ, জুয়া, ঘুস, হিংসা-বিদ্বেষ, গান-বাজনা, যৌতুক, আত্মসাৎ, দাম্পত্য-কলহসহ আরও কত শত পাপ কর্মে লিপ্ত’।

সাইফুলের কথা শেষ হতে না হতেই শফীকুল বলল, ‘আরে বাবা! রামাযানের পরের কথা ছাড়, এই মাসেও কি এই কাজগুলো ছেড়েছে? —এই মাসে নাকি শয়তান শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে, তারপরও কেন মানুষ খারাপ কাজ করে?’

ফাহিম শফীকুলকে সমর্থন জানিয়ে বলল, ‘আমার তো মনের মধ্যে অনেক দিন থেকে এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল। সত্যিই তো, খারাপ কাজের জন্য যে দায়ী, সেই শয়তানকে মহান আল্লাহ বন্দী করে রেখেছেন; তাহলে খারাপ কাজ ঘটবে কেন? —যে উনুনে আগুন নাই, সেখানে কি রান্না হয়? আর যেখানে আগুনই নেই, সেখানে ধোঁয়া আসবে আবার কোথা থেকে?’

আমিও মনে মনে ভাবলাম, যাক আমারও অনেক দিনের সংশয় আজ ক্লিয়ার হতে পারে ইনশাআল্লাহ।

আমি আহমাদের দিকে তাকালাম। আহমাদের চোখে আমার চোখ পড়ল। আহমাদ এক পলক সকলের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘তাহলে এখন এই বিষয়ের উপরই আলোচনা হয়ে যাক— তাই তো!’

আমরা সকলে এক বাক্যে সায় দিলাম।

আহমাদ বলতে শুরু করল, ‘এটি একটি কমন প্রশ্ন। যখন আলোচনা করা হয় যে, রামাযান মাসে শয়তানকে বন্দী করা হয়, তখন সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে এই একই প্রশ্নই চলে আসে। যদি সত্যিই শয়তান বন্দী থাকে, তাহলে কীভাবে মানুষ পাপ কাজ করতে পারে?

এ ব্যাপারে একটি হাদীছ আছে।— এক সেকেন্ড! আমি হাদীছটি দেখাচ্ছি’।

এই বলে আহমাদ তার পকেট থেকে স্মার্ট ফোনটি বের করল। তারপর ‘বাংলা হাদিস’ অ্যাপস থেকে একখানা হাদীছ বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, জোরে জোরে পড়ে সকলকে শোনা।

আমি মোবাইলটি হাতে নিয়ে স্ক্রিনে থাকা হাদীছটি সশব্দে পড়তে লাগলাম। আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘রামাযান আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর শয়তানকে শিকল বন্দী করে দেওয়া হয়’।[1]

ফোনটি আমার হাত থেকে নিয়ে আহমাদ বলল, ‘এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে হলে, প্রথমে দুটি বিষয় জানতে হবে। প্রথমত, শয়তানের পরিচয় ও তার কাজ সম্পর্কে এবং দ্বিতীয়ত, মানুষ পাপ কাজ করে কেন?’।

আহমাদের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, মানুষ আবার কেন পাপ কাজ করে, কারণ শয়তান তাকে পাপ কাজ করায় তাই— এই আর কী।

আমার কথা শুনে আহমাদ বলল, ‘এই ধারণার জন্যই তো আমাদের মনে আলোচ্য প্রশ্নটি উত্থিত হয়— বন্ধু! কিন্তু জেনে রাখা ভালো, কুরআন ও হাদীছের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের পাপের জন্য শয়তান এককভাবে দায়ী নয়’।

আমি বললাম, ‘আমরা তো ছোটবেলা থেকেই একথা জেনে এসেছি। —ঠিক আছে, তাহলে তুই বল মানুষ কী কারণে পাপ করে?’

‘ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ পাপ করে, কারণ— প্রথমত, শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দেয় এবং তার কুমন্ত্রণায় সাড়া দিয়ে অনেকে গুনাহ করে। দ্বিতীয়ত, মানুষ তার কু-প্রবৃত্তির কারণে পাপ করে থাকে। যেমন পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, আল্লাহ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম; কিন্তু আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিনি; তোমাদের উপর তো আমার কোনো আধিপত্য ছিল না, তবে এতটুকু যে, আমি তোমাদের আহ্বান করেছিলাম, আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে; সুতরাং তোমরা আমার প্রতি দোষারোপ করো না, তোমরা তোমাদের নিজেদের প্রতিই দোষারোপ করো’ (ইবরাহীম, ১৪/২২)

এই আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, শয়তান মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে পাপ করায়। শয়তান আমাদের মাঝে এসে কুমন্ত্রণা দেয়, আর আমরা শয়তানের কুমন্ত্রণায় সাড়া দিয়ে পাপ কাজ সংঘটিত করি’। —আহমাদ বলল।

ফাহিম বলল, ‘শয়তানের কুমন্ত্রণাতে আমরা খারাপ কাজ করি বটে, তবে শয়তানের পরিচয় কী?’

আহমাদ হাতের ইশারা করে বলল, ‘ওয়েট, মাই ফ্রেন্ড! এবার তো আমি শয়তানের পরিচয় সম্পর্কে বলব।

আরবী ভাষায় ‘শয়তান’ অবাধ্য বা বিদ্রোহীকে বলা হয়। যেহেতু সে নিজ প্রতিপালকের প্রতি অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ প্রদর্শন করেছে, তাই তাকে শয়তান বলা হয়।[2]

পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, ‘আর এমনিভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য বহু শয়তানকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি, তাদের কতক শয়তান মানুষের মধ্যে এবং কতক শয়তান জিনদের মধ্য হতে হয়ে থাকে’ (আল-আন‘আম, ৬/১১২)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীর ইবনে কাছীরে উল্লেখ আছে, ক্বাতাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘জিনদের মধ্যেও শয়তান আছে এবং মানুষের মধ্যেও শয়তান আছে’।[3]

আমি বললাম, ‘তাহলে তুই বলতে চাচ্ছিস যে, শয়তান দুই প্রকার। মানব শয়তান ও জিন শয়তান’।

‘একজ্যাক্টলি, কুরআন তো তাই বলছে। এরই সমর্থনে একটি সূরা আছে’। —আহমাদ বলল।

‘কোন সূরা?’ —শফীকুল বলল।

‘সূরা আন-নাস। পবিত্র কুরআনের ১১৪ নম্বর সূরা। যেখানে উল্লেখ আছে, ‘বলো, আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির ও মানুষের মা‘বূদের। আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে। যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। জিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে’।

তাহলে বুঝতে পারা যাচ্ছে, এই সূরাতে— কোন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। আমরা কীভাবে শয়তান থেকে রক্ষা পাব বা হেফাযত চাইব। শেষ দুই আয়াতে আরো স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান— মানুষ ও জিন উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই আছে’।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মানুষ কি শুধু শয়তানের কুমন্ত্রণাতে পড়ে গুনাহ করে’।

‘না’।

‘তাহলে?’

‘পবিত্র কুরআন বলছে, ‘তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে?’ (আল-জাছিয়া, ৪৫/২৩)। এই আয়াত স্পষ্ট করছে যে, মানুষ নিজ কুপ্রবৃত্তির দ্বারাও অন্যায় করে। এজন্যই প্রিয় নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই বলে দু‘আ করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি মন্দ স্বভাব, আমল ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে’।[4]

পাপ কেবল শয়তানই ঘটায় না। বরং মন্দ কাজে আসক্ত মানুষের মনের ভুমিকা এক্ষেত্রে কম নয়। শয়তানের প্রভাব হ্রাস পেলে বা বন্ধ হয়ে গেলেও শয়তানের কুমন্ত্রণা দ্বারা প্রভাবিত মন খুব সহজেই পাপে জড়িয়ে পড়ে। এটি হলো মানুষের ‘নাফসে আম্মারা’। যে নাফস বা মন শয়তানের প্রতিনিধি হয়ে পাপকর্ম সংঘটিত করে থাকে’।[5]

আমি আহমাদকে বললাম, ‘নাফসে আম্মারা’ কী একটু বুঝিয়ে বল?

আহমাদ একটু কশে বলতে লাগল, নাফসে আম্মারা হলো— কুপ্রবৃত্তি বা মন্দ কাজে বার বার প্ররোচনা দানকারী আত্মা। আমর মানে হুকুম। আম্মারা মানে হুকুমকারী। হুকুমদাতা নাফস সবসময় দাবী জানাতেই থাকে। অবিরাম হুকুম করতে থাকে— এটা চাই, ওটা দাও, এখনই চাই। নাফসের যেহেতু নৈতিক চেতনা নেই, সেহেতু সে মন্দ কাজের হুকুম দিতেই থাকে। যেমন : সূরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াতে আছে, ‘আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দকর্ম প্রবণ; কিন্তু সে নয়, যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। এককথায়, মন্দ কাজের হুকুম করাই এই নাফসের স্বভাব।[6]

মহান আল্লাহ আমাদেরকে প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে। যেমন : সূরা আন-নিসা ১৩৫, সূরা আল-আন‘আম ১৫০ ও সূরা ছোয়াদ ২৬ নম্বর আয়াতে’।

সাইফুল আহমাদকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল, ‘ফ্রেন্ড, আই হ্যাভ এ কোশ্চেইন?’

—‘বল’।

‘মানুষ প্রথমত পাপ করে শয়তানের কুমন্ত্রণাতে— রাইট। কিন্তু শয়তানকে কে কুমন্ত্রণা দেয়?’

‘গুড কোশ্চেইন’। —আহমাদ বলল।

—এর উত্তর হলো, সে নিজেই আপন কুপ্রবৃত্তির দ্বারা খারাপ কাজ করে। কেউ কাউকে কুমন্ত্রণা দিয়ে কোনো কাজ করাতে বাধ্য করতে পারে না। মানুষ ও জিন উভয়ই মূলত নিজ প্রবৃত্তির দ্বারা খারাপ কাজ করে। যার কারণে তারা শাস্তির যোগ্য হয়।[7]

সাইফুল, ‘হুমমম’।

আহমাদ পুনরায় বলতে শুরু করল, ‘এবার মূল কথায় আসা যাক। শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মানুষ কীভাবে খারাপ কাজ করে?

এখানে একটি বিষয় আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, শয়তান যদিও শিকল দিয়ে বাঁধা, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে শয়তান একেবারে ডেড বা শেষ; বরং শয়তান অ্যালাইভ বা জীবিত। তারা মরে যায়নি; তাদের ক্ষমতা রোধ হয়েছে মাত্র। বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে একটি উদাহরণ দিলে :

—আচ্ছা, তোরা কখনও কোনো চিড়িয়াখানা গিয়েছিস?’

আমি বললাম, হ্যাঁ, গত বছর ‘কলকাতা আলিপুর জু’ গিয়েছিলাম।

শফীকুল ও সাইফুল দুজনেই বলল, ‘হ্যাঁ’।

ফাহিম মনমরা হয়ে অপ্রস্তুতভাবে জবাব দিল, ‘আমি এখনও চিড়িয়াখানা দেখলাম না’।

সাইফুল বাম হাতে ফাহিমের পিঠে মৃদু আঘাত করে বলল, ‘ডোন্ট ওয়ারি! এবার কলকাতা গেলে তোকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তারপর, আলিপুর জু, বোটানিক্যাল গার্ডেন, নিকো পার্ক, অ্যাকোয়াটিকা, ভিক্টোরিয়াসহ আরো অন্যান্য জায়গা ঘুরিয়ে দেখাব— কেমন?’

আহমাদ বলল, ‘আমরা যে বিষয়ে কথা বলছিলাম এবার সেদিকে আসি—

চিড়িয়াখানায় গিয়ে তোরা নিশ্চয়ই বাঘ দেখেছিস?’

‘ইয়েস’। —আমরা মাথা নাড়ালাম।

‘চিড়িয়াখানায় তোরা যে বাঘ দেখেছিস, সেটা কিন্তু একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে; যেখান থেকে দেখলে বাঘ তোদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

কর্তৃপক্ষ কিন্তু নিরাপত্তার জন্য বাঘকে বন্দী করে রেখেছে। এখন কেউ যদি নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে, কর্তৃপক্ষের নির্দেশকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, সিকিউরড জায়গা ক্রস করে বাঘের নিকটবর্তী হয়; তাহলে বাঘ তাকে আক্রমণ করবে— এটি স্বাভাবিক ঘটনা। উপরন্তু, তাকে হত্যাও করতে পারে।

অর্থাৎ বাঘ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বন্দী আছে। আমরা এক নিরাপদ জায়গা থেকে সেটি দেখছি; ফলে সে আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারছে না। তবে আমাদের এই নিরাপত্তা নির্ভর করছে, বাঘ হতে কত দূরে আমরা অবস্থান করছি। একইভাবে, রামাযান মাসে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে। আমরা যদি নিজে শয়তান থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকি, তবে শয়তান আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, শয়তান এখন কিন্তু মৃত নয়। আমরা যদি নিজে শয়তানের কাছাকাছি যায়, তাহলে তো তার সুযোগ থাকছে আমাদের আক্রমণ করার।

এজন্যই তো মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় শয়তানকে প্রকাশ্য শত্রুরূপে চিহ্নিত করে তার পদাঙ্ক অনুসরণ না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন : ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (আল-বাক্বারা, ২/২০৮)

আহমাদ বোতল থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে তিন ঢোক পান করে পুনরায় বলতে লাগল, ‘আরেকটি কারণ হলো, যদিও শয়তান রামাযান মাসে বাঁধা থাকে, কিন্তু বাকি এগারো মাস সে মুক্ত থাকে। ঐ এগারো মাস মানুষের অন্তরে সর্বদা কুমন্ত্রণা দিয়ে তাকে পাপে জড়ানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেই প্রভাব রামাযান মাসেও থাকে। এর একটা উদাহরণ দিই— ভারতে জিও[8] সিম যখন মার্কেটে প্রথম লঞ্চ করে, তখন 4G ফুল স্পিড ফ্রি ডাটা দিয়েছিল প্রায় ছ’মাস। তখন অনেক 2G গ্রাহক সরাসরি ফ্রি ইন্টারনেটের জন্য 4G সিম করে জিও-তে পোর্ট করেছিল। —মনে আছে নিশ্চয়ই তোদের! অনেকে বলেছিল, ছয় মাস তো ফ্রি চালিয়ে নিই, তারপর বন্ধ করে দেব’।

ফাহিম এক গাল হেসে বলল, ‘আর সে কথা বলিস নে ভাই! তখন আমাদের গ্রামে জিও’র নেটওয়ার্ক থাকত না বলে আমি প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে হাই রোডের কাছে গিয়ে ইন্টারনেট এক্সেস করেছি’।

আহমাদ বলল, ‘তোরা কেউ বলতে পারবি ছয় মাস বা এক বছর 4G ফুল স্পিডে ফ্রি ইন্টারনেট চালিয়ে কতজন আবার 2G-তে ফিরে গেছে। এখন প্রতি মাসে মিনিমাম রিচার্জ প্যাক কত— বলতো; তারপরও সবাই রিচার্জ করে চলেছে ইন্টারনেট পরিষেবার জন্য।

—কারণ কী জানিস?

—আসক্তি।

—কোম্পানি ভালো করে জানত যে, প্রথমে কোটি কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট করে ফ্রি পরিষেবা দিলে; তারপর যখন তাদেরকে আসক্তি গ্রাস করবে, তখন যত টাকার প্যাকেজ করা হোক না কেন, তারা রিচার্জ না করে থাকতে পারবে না’।

‘হ্যাঁ, আজকে আমরা ভাবতেও পারি না যে, 4G ছেড়ে নিচের দিকে যাব’। —ফাহিম বলল।

‘অনুরূপভাবে, শয়তান এগারো মাস কুমন্ত্রণা দিয়ে আমাদের মনে পাপের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করেছে। তাই শয়তান এখন বন্দী থাকলেও আমাদের পাপ বন্ধ হয়নি।

—আরেকটা উদাহরণ শোন। যেমন : একটি চলন্ত ফ্যানের সুইচ অফ করা হলো, তারপরও কিছুক্ষণ ফ্যানটা ঘুরতে থাকে; ঠিক তেমনি আমাদের অবস্থা।

—আমাদের গ্রামে এক মাওলানা থাকতেন। আব্বার মুখে শুনেছি, তিনি রামাযান মাসে এই বিষয়টি বোঝাবার জন্য জুমাআর খুৎবায় একটি উপমা দিতেন। উপমাটি হলো, যারা সাইকেলিং করে তারা নিশ্চয় জানে, সাইকেলের প্যাডেল কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিলেও সাইকেল কিছুদূর এগিয়ে যায় বিনা প্যাডেলে।

—ঠিক একই অবস্থা আমাদের। এই মাসে শয়তান উপস্থিতি না থাকলেও যারা এগারো মাস শয়তানের প্রতি আসক্ত; শয়তানকে খোঁজার আগ্রহ তাদের মাঝে প্রবল থাকে’।

একটু থেমে আহমাদ পুনরায় বলতে শুরু করল, ‘এর তৃতীয় যে কারণ তা হলো, অনেক আলেম বলে থাকেন যে, পবিত্র রামাযান মাসে বড় বড় শয়তানদের বেঁধে রাখা হয়, কিন্তু ছোট ছোট শয়তানেরা মুক্ত থাকে এবং তারাই মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়।[9] আবার আমরা পূর্বেই দেখেছি যে, কুমন্ত্রণা প্রদানকারী শয়তান মানব ও জিন উভয় জাতির মধ্যে থেকে হয়ে থাকে। এখানে হয়তো মহান আল্লাহ জিন জাতির শয়তানকে বন্দি করেন; কিন্তু মানব জাতির শয়তান মুক্ত থাকে, ফলে মানুষ খারাপ কাজের দিকে ধাবিত হয়’।

আহমাদ থামল। জোরে শ্বাস ছাড়ল।

ফাহিম সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তার মানে কনক্লুশন এটাই যে, রামাযান মাসে শয়তান বন্দী, তবে তারা মৃত নয়। কেউ যদি নিজে থেকে শয়তানি করতে শয়তানের কাছে যায়, তাহলে শয়তান তাকে পেয়ে বসে। আবার এগারো মাসের পাপের আসক্তি থেকেও পাপ করে। আবার মানুষরূপী শয়তানেরা বন্দী থাকে না, যারা বন্দী থাকে তারা হলো জিন শয়তান। সর্বোপরি, মানুষ শুধুমাত্র শয়তানের কুমন্ত্রণাতেই পাপ করে না। আপন কুপ্রবৃত্তির বশবর্তী হয়েও পাপ করে থাকে, যেখানে শয়তানের উপস্থিত থাকা জরুরী নয়’।

আহমাদ বলল, ‘অ্যাবসলিউটলি রাইট।

—তবে, সামগ্রিকভাবে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখতে পাব, রামাযান মাসে অন্য মাসের তুলনায় পাপের পরিমাণ কম হয়। মুসলিমদের ধার্মিকতা বৃদ্ধি পায়। যারা ছিয়াম পালন করে, তাদের উপর শয়তানের কুমন্ত্রণা, নাফসে আম্মারার প্ররোচনা কার্যকর হয় না। এটাই মহান আল্লাহর হিকমত। আমরা যদি বিশুদ্ধ নিয়্যতে ছিয়াম পালনে অভ্যস্ত হই, ইসলামের গাইডলাইনগুলো ফলো করি; তাহলে নিশ্চিতভাবে শয়তান আমাদেরকে প্ররোচিত করতে পারবে না।

—আর একথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সকল শয়তানকে বন্দী করা হলেও খারাপ কাজ বা পাপ কাজ একেবারে না ঘটা অনিবার্য নয়। কেননা শয়তান ছাড়াও অন্যান্য কারণেও পাপ কাজ ঘটে থাকে। যেমন : কলুষিত অন্তরগুলোর কারণে, খারাপ অভ্যাসের কারণে এবং মানুষরূপী শয়তানগুলোর কারণে’।[10]

আমরা প্রত্যেকে একে অপরের দিকে চেয়ে আছি। খাওয়া অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। আলোচনা শুনতে শুনতে এঁটো হাত শুকিয়ে গেছে। থালারও একই অবস্থা।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে, থালা পরিষ্কার করে ঘুমিয়ে পড়। আবার শেষ রাতে সাহারীর জন্য উঠতে হবে। জিনরূপী শয়তান তো বন্দী হয়েছে, কিন্তু মানুষরূপীগুলো তো ছাড়া। নিজেদেরকেই সতর্ক থাকতে হবে। না হলে…’।


* এম. এ. (অধ্যয়নরত), বাংলা বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৯৯।

[2]. আব্দুল হামীদ মাদানী, জ্বিন ও শয়তান জগৎ (তাওহীদ প্রকাশনী-বর্ধমান), পৃ. ৯।

[3]. ড. মুহাম্মাদ মুজীবুর রহমান, তাফসীর ইবনে কাছীর (অনুবাদ), পৃ. ১৬৬।

[4]. সুনানে তিরমিযী, হা/৩৫৯১।

[5]. আব্দুল হামীদ মাদানী, রমযানের ফাযায়েল ও রোজার মাসায়েল (তাওহীদ প্রকাশনী-বর্ধমান), পৃ. ১৯।

[6]. অধ্যাপক গোলাম আযম, নাফস রূহ কালব (কামিয়াব প্রকাশন লিমিটেড, তৃতীয় মুদ্রণ : জানুয়ারি ২০১০), পৃ. ১৩।

[7]. মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান মিনার, আল্লাহ কেন শয়তান সৃষ্টি করলেন? (‘ইসলাম বিরোধীদের জবাব’ Apps)।

[8]. ‘জিও’ হলো একটি ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা। এটি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকানাধীন।

[9]. https://youtu.be/fKCZWDWkMyg.

[10]. https://islamqa.info/amp/bn/answers/12468.