রামাযান শেষে
জাবির হোসেন*


রামাযান মাস শেষ হয়েছে এক সপ্তাহ হলো। আফতাব সাহেব বিকেলবেলা বাজারে এসেছিলেন। ফেরার পথে, হঠাৎ ঘন মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। ঝিরঝির বৃষ্টির ফোঁটা ঝরতে লাগল। আবহাওয়া যে এরকম হতে পারে, তিনি আগে আঁচ করতে পারেননি। তাহলে সঙ্গে করে বর্ষাতিটা নিয়ে আসতেন। উপায় নেই দেখে, তিনি জোরে মোটরবাইকটি চালাতে লাগলেন। কিছুদূর যেতে না যেতেই মুষলধারায় বৃষ্টি নেমে এলো। আকাশে বিদ্যুতের চমকানি। মেঘের গর্জনে কান পাতা দায়। অগত্যায় আফতাব সাহেব মোটরবাইকটিকে পাকা রাস্তার উপরে রেখে, সামনে একটি মাটির বাড়ির খড়ের ছাউনির বারান্দায় উঠে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথা মুছতে মুছতে রাস্তার দিকে চোখ মেলে চাইলেন। দেখলেন, অবিরাম ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। সামনের ইলেকট্রিক তারে দুটি কাক বসে বৃষ্টিতে ভিজছে। বজ্র বিদ্যুতের ঝলমলে আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় তার।

মাথা মুছতে মুছতে আফতাব সাহেব দেখলেন, তার মতো আরও একজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে আছে।

‘আরে আফতাব, কোথায় গিয়েছিলি?’— জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

‘আরমান— তুই। কী ব্যাপার! বাজারে গিয়েছিলাম’। —জবাব দিলেন আফতাব সাহেব।

‘আমিও বাজারে গিয়েছিলাম। এইতো বৃষ্টিতে আটকে গেছি’। —আরমান বলল।

আফতাব আর আরমান দুই বন্ধু। সেই ছোটবেলা থেকে। একই গ্রামে বাস। সাংসারিক জীবনে এসে যদিও আগের মতো দেখা-সাক্ষাৎ হয় না, তবুও মাঝেমধ্যে হয়। আফতাব প্র্যাক্টিসিং মুসলিম। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে। আরমান এর বিপরীত। নিয়মিত ছালাত আদায় করে না। শুধু জুমআর ছালাত, জানাযার ছালাত আর দুই ঈদের ছালাত আদায় করে। গতানুগতিক মুসলিমরা যা করে— তাই আর কী!

বৃষ্টিভেজা বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু নানারকম গল্প করে। তাদের সাংসারিক জীবনের গল্প, রাজনীতির গল্প, মোড়ল-মাতব্বরদের গল্প— বাদ যায় না কোনো কিছু। এক সময় আফতাব বলে, ‘কী ব্যাপার আর তোকে মাসজিদে দেখতে পাচ্ছি না যে!’

আরমান এই রামাযানে ছালাত শুরু করেছিল। এক মাস পাঁচ  ওয়াক্ত  ছালাত  মাসজিদে  এসে  জামাআতের  সাথে আদায় করেছে। ৩০ দিন ছিয়াম পালনও করেছে। কিন্তু ঈদের ছালাতের পরদিন থেকে আর মসজিদমুখো হয়নি।

আফতাবের জিজ্ঞাসার জবাবে সে আমতা আমতা করে বলল, ‘না মানে, ইয়ে…!’

আফতাব বলল, ‘কত সুন্দর দেখাচ্ছিল, তুই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামাআতে পড়ছিলি। —এমন কী তুই, আমার আগেও জামাআতে এসে হাযির হচ্ছিলি। কিন্তু ঈদের পর হঠাৎ তোর কী হলো বল তো?’

‘আমাদের তো ছালাত আদায় করা উচিত। কিন্তু সময়…’ —ঢোক গিলে আরমান বলল।

আরমানের কথা শেষ হবার আগেই আফতাব বলল, ‘এগুলো তোর অজুহাত মাত্র। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র এক ঘণ্টা সময় বের করা কোনো ব্যাপারই নয়। যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্তের মুছল্লী, তারা কত কাজের মধ্য হতেও ছালাতের জন্য ঠিকই সময় বের করছে। আর তুই…!’

আফতাব পুনরায় বলতে লাগল, ‘শোন, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? —আচ্ছা বলত, তুই এই এক মাস কেন ছালাত-ছিয়াম আদায় করলি?’

‘আল্লাহর জন্য। তিনি আমাদেরকে এই ইবাদতগুলো করতে বলেছেন— তাই’। —আরমানের চটপট জবাব।

আফতাব বলল, ‘যে আল্লাহর জন্য এই এক মাস কষ্ট করে এই ইবাদত পালন করেছিস, সেই আল্লাহ কি সারা বছর ইবাদত পালনের নির্দেশ দেননি? —আচ্ছা, তুই বলত, ছিয়াম কেন ফরয করা হয়েছে?’

আরমান উত্তর দিতে সংকোচবোধ করছে দেখে আফতাব তাকে বলল, ‘ভাই! গুগলে সূরা আল-বাক্বারার ১৮৩ নম্বর আয়াত সার্চ দে। তারপর আমাকে পড়ে শোনা’।

আরমান নিজের অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনটি পকেট থেকে বের করে, গুগলে সার্চ দিয়ে সশব্দে আয়াতটি পড়তে লাগল, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ফরয করা হলো, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়ার অধিকারী হতে পার’।

আফতাব বলল, ‘রামাযানের ছিয়াম পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো— তাক্বওয়া অর্জন। এখন প্রশ্ন হলো, তাক্বওয়া কী?

—সাধারণ অর্থে আল্লাহভীতিকে তাক্বওয়া বলা হয়। তাক্বওয়া হচ্ছে হারাম কাজ পরিত্যাগ করার নাম। ব্যাপক অর্থে, তাক্বওয়া হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশিত বিষয় বাস্তবায়ন করা, তাঁর নিষেধ থেকে দূরে থাকা।

—এই এক মাস ছিয়াম রেখে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে। মিথ্যা কথা, ঝগড়াঝাঁটি, গান-বাজনা ইত্যাদি থেকে বাঁচতে। প্রচণ্ড তেষ্টায় গলা ফেটে যাচ্ছে, তবুও আমরা একফোঁটা পানি পান করিনি। লুকিয়ে পান করলে কেউ দেখতে পেত না। কিন্তু আমরা তা করিনি— কারণ, মানুষকে ধোঁকা দেওয়া যায়, কিন্তু আল্লাহকে ধোঁকা দেওয়া যায় না।

—রামাযানে এভাবেই আমাদের তাক্বওয়া অর্জিন হয়। আর রামাযানের অর্জিত তাক্বওয়ার প্রতিফলন আমাদেরকে সারা বছর ধরে রাখতে হয়’।

একটু থেমে আফতাব আবার বলতে লাগল, ‘শুনেছি তোর ছেলে ডিফেন্সে চান্স পেয়েছে?’

‘হ্যাঁ। এই কদিন তো হলো। এখন ট্রেনিং চলছে’। —আরমান বলল।

আফতাব বলল, কোনো ব্যক্তি আর্মিতে জয়েন করার পর, একটি নির্দিষ্ট সময় ট্রেনিং পিরিয়ডে যোগদান করতে হয়। সেখানে তাকে সময়ানুবর্তিতা, নেতার আনুগত্য, অস্ত্রচালনা, শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করার কৌশল, নিজেকে ও দেশকে রক্ষা করার নানান বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যেমন তোর ছেলে এখন ট্রেনিং পিরিয়ডে আছে। ট্রেনিং শেষ করে, তারপর পোস্টিং পাবে।

—এখন এইরকম কোনো ট্রেনিংপ্রাপ্ত আর্মি, যদি দেশের বর্ডারে পোস্টিং পেয়ে, শত্রু পক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই না করে, মদ, গাঁজা, গানবাজনা আর জুয়ার আড্ডায় মেতে থাকে এবং শত্রুপক্ষের গুলির বিরুদ্ধে নিজের অস্ত্র প্রয়োগ না করে যদি মারা যায়, তাহলে তাকে কী বলা হবে?’

আরমান বলল, ‘বেওকূফ’।

‘হ্যাঁ, তাকে বেওকূফই বলা হবে’। —আফতাব আরমানের কথাতে সমর্থন দিয়ে পুনরায় বলতে লাগল, ‘সরকার তাকে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল নিজেকে ও দেশকে রক্ষা করতে। যদি সে সঠিকভাবে তা প্রয়োগ করে মারা যেত, তাহলে তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হতো। আর যদি বিজয়ী হতো, তাহলে সে গাজীর মর্যাদা পেত। সে কখনো ব্যর্থ নয়, তাঁর বাঁচা ও মরা উভয়ই মর্যাদার।

অনুরূপ স্রষ্টার ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য রামাযান মাস হলো আমাদের জন্য ট্রেনিং পিরিয়ড। এই পিরিয়ডে আমাদের শত্রু শয়তানকে বন্দি রেখে তার বিরুদ্ধে কীভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করতে হবে, তার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা না খেয়ে ও যৌনকর্ম থেকে বিরত থেকে সংযমের যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে, তাতে ১১ মাস শয়তানের হাজারো প্রলোভনে সে কখনোই প্রতারিত হবে না‌। শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে প্রতিহত করা তাঁর জন্য খুবই সহজ হয়ে যাবে‌। সে সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করতেই থাকবে নিরবিচ্ছিন্নভাবে।

শয়তানকে প্রতিহত করার মোক্ষম অস্ত্র হলো— তাক্বওয়া। যেটা ছিয়াম পালনে অর্জিত হয়। যার হৃদয়ে তাক্বওয়া যত বেশি, তাঁর আখলাক, আমল তত বেশি স্বচ্ছ। যার হৃদয় তাক্বওয়াশূন্য— তার হৃদয় শয়তানের ঘাঁটি। সুতরাং যে অস্ত্র দ্বারা শয়তানকে প্রতিহত করা যাবে, সেই শিক্ষা যেহেতু রামাযান মাসে অর্জিত, তাই বাকি ১১ মাস সতর্ক থেকে শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে নিজেকে ডিফেন্স করতে হবে। এই তাক্বওয়া শিক্ষার প্রতিফলন নিজেদের জীবনে আনতে হবে।

ইবাদত নিরবচ্ছিন্ন। মহান আল্লাহর ঘোষণা, ‘মৃত্যু আসা অবধি তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকো’ (আল-হিজর, ১৫/৯৯)

আফতাব একটু থেমে আরমানের পিঠে হালকা থাপ্পড় দিয়ে বলল, ‘তোকে যে আল্লাহ রামাযান মাসে নির্দেশ দিয়েছিল, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় ও এক মাস ছিয়াম পালন করার, সেই আল্লাহ সারা বছরই তাঁর ইবাদতে অভ্যস্ত হতে বলেছেন। বলেছেন, মৃত্যু পর্যন্ত তার ইবাদত করতে। তাহলে রামাযান বিদায় নিয়েছে বলে তুই ইবাদতে অলসতা করছিস কেন? রামাযানে এত কষ্ট করে ছালাত-ছিয়াম পালন করে, এখন…!’

আফতাবের কথা শেষ হবার আগেই আরমান আফসোসের সুরে ভাবতে লাগল, হ্যাঁ— সত্যিই, এত কষ্ট করে আমি ছিয়াম পালন করলাম। ছালাত আদায় করলাম। অথচ ঈদের পরেই আবার আমি আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছি! আমি ইবাদতে উদাসীন হয়ে পড়ছি! ঠিক যেমন মনে হচ্ছে, কষ্ট করে আগুনের কাছে থেকে রান্না করে, সেই রান্না না খেয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। তাহলে কী লাভ হলো রান্না করে! কী লাভ হলো এত কষ্ট করে! না, না! এভাবে শয়তানকে সুযোগ দিলে হবে না! আমার অন্যায় হচ্ছে! আমি চেষ্টা করব মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত করার। না জানি, কবে মৃত্যু এসে যায়। পরবর্তী রামাযান ভাগ্যে জুটবে কিনা কে জানে। রামাযানের কয়েকদিন আগে তার বন্ধু শামীমের কথা মনে পড়ে। একসাথে কত হাসি-ঠাট্টা, আড্ডা-ইয়ার্কি করেছে। কিন্তু আজ সে কবরে। রেকলেস ড্রাইভিং করতে গিয়ে এন.এইচ-৩৪ রোডে বাইক অ্যাক্সিডেন্টে স্পটে মারা যায় সে। ছালাত পড়ব পড়ব করেও তার আর ছালাত পড়া হলো না।

ভাবতে ভাবতে চোখে পানি চলে আসে আরমানের। হায়রে দুনিয়া! মরে গেলে কেউ তো আর মনে রাখবে না। একে একে সবাই ভুলে যাবে আমাকে। কিন্তু কবরের জীবনে একাকী থাকতে হবে আমাকে। তখন…!

ছলছল চোখে আরমান আফতাবকে জানাই, ‘ভাই, তুই ঠিকই বলেছিস। রামাযানের শিক্ষা সারা বছর ধরে রাখতে হবে আমাদের। ইনশাআল্লাহ, আমি আর ছালাত ছাড়ব না। দু‘আ কর আমার জন্য।

বৃষ্টি থেমে গেছে। দুই বন্ধু বারান্দা থেকে নেমে নিজ যানবাহনের কাছে এগিয়ে যায়। আরমান মোটরবাইকটি স্টার্ট দিয়ে আগে চলে যায়।

আরমানের চলে যাওয়ার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকে আফতাব। আরমানের চোখে-মুখে আবেগের ছাপ স্পষ্ট বুঝতে পারে সে। মহান আল্লাহর কাছে দু‘আ করে, ‘আল্লাহ গো, তুমি আমাদেরকে হেদায়াত দান করো’।


* এম. এ. (বাংলা), কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, মুর্শিদাবাদ, ভারত।