রাসূল (ছাঃ)-কে কটূক্তিকারীর বিধান

মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দীন

শিবগঞ্জ, বগুড়া।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (ছাঃ)। তাঁর আগমনে বিশ্ববাসী পেয়েছে সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও আলোর সন্ধান। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে দেখিয়েছে মুক্তি ও কল্যাণের পথ। তাঁর দর্শনতন্ত্রের মূলমন্ত্র ছিল হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক্ব আদায় করা ও হাক্কুল ইবাদ বা আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি কর্তব্য পালন করা। রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনদর্শন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকা- নয়; বরং আল্লাহপাক প্রদত্ত ঐশীবাণীরই বাস্তব রূপায়ণ। কেবল মহানবী (ছাঃ) তাঁর মহান কর্মের গুরুদায়িত্ব সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। তিনি একাধারে পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মহাবিপ্লবের মাধ্যমে রাব্বুল আলামীনের নির্দেশিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিলেন। এসব দায়িত্বের মূলে ছিল আল্লাহ তা‘আলার প্রতি আত্মসমর্পণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানকে প্রতিষ্ঠিত করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সমস্ত বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ পাঠানো হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,  وَمَا اَرْسَلْنَاكَ اِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِيْنَ ‘হে নবী! আমি তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি’ (আম্বিয়া, ১০৭)।

রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ) মহান চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, وَاِنَّكَ لَعَلٰى خُلُقٍ عَظِيْمٍ ‘তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী’ (কালাম, ৪)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সমস্ত মানুষের মাঝে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি বলেন, اِنَّمَا بُعِثْتُ لِاُتَمِّمَ صَالِحَ الْاَخْلَاقِ ‘নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রসমূহকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য’।[1]

পৃথিবীতে সর্বাধিক চর্চা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নিয়ে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ ‘আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি’ (ইনশিরাহ, ৪)।

রাসূলুল্লাহ ধ সমগ্র পৃথিবীর লোকদের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ ‘হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)! তুমি ঘোষণা করে দাও, হে মানবম-লী! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহ্র রাসূল হিসাবে প্রেরিত। সমস্ত আসমান, যমীন তাঁরই রাজত্বে, একমাত্র তিনি ব্যতীত আর সত্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন’ (আ‘রাফ, ১৫৮)।

আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে অসংখ্য নে‘মত দান করেছেন। যার মধ্যে পরকালের এ দু’টি নে‘মতও অন্তর্ভুক্ত: হাশরের ময়দানে হাউযে কাওছার ও জান্নাতে কাওছার নামক ঝর্ণা, ِنَّا اَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ‘নিশ্চয় আমি তোমাকে কাওছার দান করেছি’ (কাউছার, ১)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সমস্ত মানুষের চেয়ে উত্তম এবং মর্যাদাবান। যেমন হাদীছে এসেছে,

عَنْ اَبِىْ ذَرٍّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ ، قَالَ : قُلْنَا : يَا رَسُوْلَ اللهِ ، كَيْفَ عَلِمْتَ اَنَّكَ نَبِىٌّ ؟ قَالَ : مَا عَلِمْتُ حَتَّى اُعْلِمْتُ ذَلِكَ يَا اَبَا ذَرِّ ، اَتَانِىْ مَلَكَانِ وَاَنَا بِبَعْضِ بَطْحَاءَ مَكَّةَ ، فَقَالَ اَحَدُهُمَا : اَهُوَ هُوَ ؟ قَالَ : فَزِنْهُ بِرُجَلٍ ، فَوُزِنْتُ بِرَجُلٍ فَرَجَحْتُهُ ، قَالَ : فَزِنْهُ بِعَشَرَةٍ ، فَوَزَنَنِىْ بِعَشَرَةٍ فَوَزَنْتُهُمْ ، ثُمَّ قَالَ : زِنْهُ بِمِائَةٍ ، فَوَزَنَنِىْ بِمِائَةٍ فَرَجَحْتُهُمْ ، ثُمَّ قَالَ : زِنْهُ بِاَلْفِ فَوَزَنَنِىْ بِاَلْفٍ فَرَجَحْتُهُمْ ، ثُمَّ قَالَ اَحَدُهُمَا لِلْاٰخَرِ : لَوْ وَزَنْتَهُ بِاُمَّتِهِ رَجَحَهَا.

আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি কীভাবে জানতে পেরেছেন যে, আপনি নবী? তিনি বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে জানানো হয়নি ততক্ষণ আমার এ ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল না। আমি বাত্বহায় (মক্কার একটি স্থানের নাম) একপাশে ছিলাম, তখন আমার নিকট দু’জন ফেরেশতা আসল, তাদের মধ্যে একজন বলল, এটাই কি ঐ ব্যক্তি? তখন তাদের মধ্যে থেকে একজন ফেরেশতা বলল, তাঁকে একজন লোকের সাথে ওযন করো, তখন আমাকে একজন লোকের সাথে ওযন করা হলো, তার চেয়ে আমি ভারী হলাম। ফেরেশতা বলল, তাঁকে দশজন লোকের সাথে ওযন করো, তখন তারা আমাকে দশজন লোকের সাথে ওযন করল, তখনও আমি তাদের চেয়ে ভারী হলাম। তখন ফেরেশতা বলল, তাকে হাজার লোকের সাথে ওযন করো, তখন আমাকে হাজার লোকের সাথে ওযন করা হলো। আবারও আমি তাদের চেয়ে ভারী হলাম। তখন তাদের মধ্যে থেকে একজন অপর জনকে বলল, যদি তাকে তার সমস্ত উম্মতের সাথে ওযন করা হয়, তাহলে তাঁর ওযনই বেশি হবে’।[2]

অন্যান্য নবীদের তুলনায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ৬টি বৈশিষ্ট্যে মর্যাদাপূর্ণ। হাদীছে এসেছে,

عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ فُضِّلْتُ عَلَى الْاَنْبِيَاءِ بِسِتٍّ اُعْطِيْتُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ وَنُصِرْتُ بِالرُّعْبِ وَاُحِلَّتْ لِىَ الْغَنَائِمُ وَجُعِلَتْ لِىَ الْاَرْضُ طَهُوْرًا وَمَسْجِدًا وَاُرْسِلْتُ اِلَى الْخَلْقِ كَافَّةً وَخُتِمَ بِىَ النَّبِيُّوْنَ..

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমাকে (অন্য নবীগণের তুলনায়) ছয়টি বিষয়ে মর্যাদাবান করা হয়েছে- (১) আমাকে ব্যাপক অর্থবোধক কথা দেওয়া হয়েছে (২) শত্রুকে ভীত-সস্ত্রস্ত করার মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে (৩) আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হয়েছে (৪) সমগ্র পৃথিবী আমার জন্য পবিত্র এবং ছালাতের স্থানে পরিণত করা হয়েছে (৫) আমাকে সমস্ত সৃষ্টিজীবের প্রতি রাসূল করে পাঠানো হয়েছে (৬) আমার মাধ্যমে নবুঅতের দরজা বন্ধ করা হয়েছে’।[3]

ক্বিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সর্বাধিক আলোক উজ্জ্বল এবং উঁচু মিম্বারে আসীন হবেন। হাদীছে এসেছে,

عَنْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اِنَّ لِكُلِّ نَبِىٍّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْبَرًا مِنْ نُوْرٍ وَاِنِّىْ لَعَلِىُّ اَطْوَلِهَا وَاَنْوَرُهَا.

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীর জন্যই ক্বিয়ামতের দিন নূরের মিম্বার থাকবে আর আমি এ মিম্বারসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সর্বোচ্চ মিম্বারে থাকব’।[4]

ক্বিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তান রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নিজেদের সরদার হিসাবে মেনে নিবে ও প্রশংসার পতাকা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাতে থাকবে আর সমস্ত নবী তাঁর পতাকা তলে থাকবেন। হাদীছে এসেছে,

عَنْ اَبِىْ سَعٍيْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اَنَا سَيِّدٌ وَلِدَ اٰدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا فَخْرَ وَبِيَدِىْ لَوَاءُ الْحَمْدِ وَلَا فَخَرَ وَمَا مِنْ نَبِىٍّ يَوْمَئِذٍ اٰدَمُ فَمَنْ سَوَاهُ اِلَّا تَحْتَ لِوَائِىْ وَاَنَا اَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُّ عَنْهُ الْاَرْضُ وَلَا فَخَرَ.

আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের সরদার হব, এতে আমার কোন অহংকার নেই। আমার প্রশংসার পতাকা থাকবে, এতেও আমার কোনো অহংকার নেই, আদমসহ সমস্ত নবী আমার পতাকা তলে থাকবেন। আর আমি এমন ব্যক্তি, যার কবর সর্বপ্রথম উন্মুক্ত হবে, এতেও আমার কোনো অহংকার নেই’।[5]

ক্বিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সমস্ত নবীর নেতা এবং তাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন।

عَنْ اُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ عَنْ اَبِيْهِ عَنِ النَّبِىِّ ﷺ قَالَ اِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ كُنْتُ اِمَامَ النَّبِيِّيْنَ وَخَطِيْبَهُمْ وَصَاحِبَ شَفَاعَتِهِمْ غَيْرُ فَخْرٍ..

উবাই ইবনে কা‘ব (রাঃ) কর্তৃক তার পিতা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন আমি সমস্ত নবীর সরদার ও তাদের মুখপাত্র হব এবং তাদের সুপারিশকারী হব, এতে আমার কোনো অহংকার নেই’।[6]

আমরা উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বুঝতে পারলাম যে, রাসূল (ছাঃ)-এর মর্যাদা কত উপরে। তারপরও মুসলিম নামধারী কিছু নাদান, মূর্খ ও অমুসলিমরা রাসূল (ছাঃ)-এর শানে অবমাননামূলক কথা ও কটূক্তি করে। রাসূল (ছাঃ)-কে কটূক্তিকারীদের পরিণতি নিম্বে বর্ণনা করা হলো :

রাসূল (ছাঃ)-কে কটূক্তি করার মহাশাস্তি :

নবী করীম (ছাঃ)-কে অবজ্ঞা করা, তুচ্ছ জ্ঞান করা, তাঁর শানে বেয়াদবী করা অর্থাৎ তার প্রতি অবমাননাকর কোনো উক্তি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রসিদ্ধ আলেম ক্বাযী ইয়ায (রহিঃ) বলেন,

أجمعت الأمة على قتل متنقصه من المسلمين و سابه و كذلك حكي عن غير واحد الإجماع على قتله و تكفيره

উম্মতের ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, রাসূল (ছাঃ)-কে গালি দেওয়া বা তাকে অসম্মান করার শাস্তি হচ্ছে তাকে হত্যা করা। এ ব্যাপারে সকলের ইজমা‘ হয়েছে যে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে গালি দিবে বা তাঁর অসম্মান করবে সে কাফের হয়ে যাবে এবং তার শাস্তি মৃত্যুদ-’। [7]

রাসূল (ছাঃ)-কে কটূক্তি অনৈতিক কাজ :

মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর কর্মময় জীবনে সদা ব্যস্ত ছিলেন কীভাবে মানুষের কল্যাণ করা যায়। তাঁর সারাজীবন ছিল মানবকল্যাণে নিবেদিত। অপরের কষ্ট সহ্য করতেন না তিনি। কুরআনে কারীমে এসেছে,

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَاعَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ

‘অবশ্যই তোমাদের মধ্যে হতেই তোমাদের নিকট এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে সেটা তার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু’ (তওবাহ, ১২৮)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে কটূক্তির পরিণাম ও শাস্তি :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অবমাননা এবং তাঁকে বিদ্রূপ করার অধিকার কারও নেই। যে রাসূল (ছাঃ)-কে কটূক্তি ও বিদ্রূপ করবে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এ সম্পর্কে নিম্বে বর্ণনা করা হলো :

(১) দুনিয়াতে আল্লাহর লানতপ্রাপ্ত ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে :

যে রাসূল (ছাঃ)-এর অবমাননা করবে সে দুনিয়াতে আল্লাহর লা‘নতপ্রাপ্ত ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

اِنَّ الَّذِیْنَ یُؤْذُوْنَ اللّٰهَ  وَ رَسُوْلَہ  لَعَنَهُمُ  اللّٰهُ  فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ  وَ اَعَدَّ لَهُمْ  عَذَابًا مُّهِیْنًا

‘যারা আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে অভিসম্পাত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি’ (আহযাব, ৫৭)। আর রাসূল (ছাঃ)-কে অবমাননা এবং তাঁকে বিদ্রূপ করার মাধ্যমে তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেওয়া হয়। এ বিষয়ে হাদীছে এসেছে, আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নাছারা ছিল সে ইসলাম গ্রহণ করল এবং সূরা আল-বাক্বারাহ ও আলে ইমরান শিখল। সে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট কেরানির কাজ করত। সে পুনরায় নাছারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগল, আমি যা লিখি মুহাম্মাদ তাই বলে, এর বাইরে সে আর কিছুই জানে না। এরপর সে মারা গেল, তখন তার সাথিরা তাকে দাফন করল, সকালে উঠে দেখল তার লাশ বাহিরে পড়ে আছে, তখন নাছারারা বলতে লাগল, মুহাম্মাদের সাথিরা এই কাজ করেছে। কেননা সে তাদের ধর্ম ত্যাগ করেছিল। তখন তারা আরো গভীর করে কবর খনন করে তাকে আবার দাফন করল, আবার সকালে উঠে দেখল তার লাশ বাইরে পড়ে আছে। তখন তারা বলল, এটা মুহাম্মাদ এবং তার সাথিদের কাজ। কেননা সে তাদের ধর্ম ত্যাগ করে এসেছিল। তখন তারা আবার আরও গভীর করে কবর খনন করল এবং তাকে দাফন করল, আবার সকালে উঠে দেখল তার লাশ আবার বাইরে পড়ে আছে, তখন তারা বুঝল, এটা কোনো মানুষের কাজ নয়, তখন তারা তার লাশ বাইরেই পড়ে থাকতে দিল।[8]

(২) কাফের ও মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে :

যে রাসূল (ছাঃ)-এর অবমাননা করবে সে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী এবং কাফের হিসাবে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,

قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ – لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ

‘বলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা দোষ স্খলনের চেষ্টা করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছো। তোমাদের মধ্যে কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দিব, কারণ তারা অপরাধী’ (তওবাহ, ৬৪-৬৬)।

ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে কেউ মুরতাদ তথা নাস্তিক হয়ে গেলে অথবা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্পর্কে কটূক্তি করলে ইসলামে তার শাস্তি হল মৃত্যুদ-। আল্লাহ আরও বলেন,

إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِيْنَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوْا أَوْ يُصَلَّبُوْا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيْهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلاَفٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيْمٌ.

‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, আর ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি (ফিতনা) সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে। অথবা একদিকের হাত ও অপরদিকের পা কেটে ফেলা হবে, অথবা নির্বাসনে পাঠানো হবে। এটা তো ইহলোকে তাদের জন্য ভীষণ অপমান, আর পরকালেও তাদের জন্য ভীষণ শাস্তি রয়েছে’ (মায়েদাহ, ৩৩)।

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উম্মে মারওয়ান নামের এক মহিলা মুরতাদ হয়ে গেলে রাসূল (ছাঃ) আদেশ দেন যে, তার কাছে ইসলাম পেশ করতে, যদি সে ফিরে আসে তাহলে ভালো, নতুবা তাকে হত্যা করা হবে।[9]

আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ)  তাকে ইয়ামানের গভর্নর বানিয়ে পাঠালেন। তারপর মু‘আয ইবনে জাবাল (রাঃ)-কে পাঠালেন। তিনি যখন সেখানে পৌঁছলেন, তখন তিনি ঘোষণা করলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে দূতস্বরূপ। সেসময় আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ)-এর জন্য একটি চেয়ার দিলেন, যেন তিনি তাতে বসেন। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এলো। যে ব্যক্তি প্রথমে ইয়াহূদী ছিল। তারপর মুসলিম হয়েছে। তারপর আবার ইয়াহূদী হয়ে গেছে। তখন মু‘আয ইবনে জাবাল (রাঃ) বললেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত বসব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না এ লোককে হত্যা করা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর এটাই ফায়ছালা। এ কথা তিনি তিনবার বললেন। তারপর যখন তাকে হত্যা করা হলো, তখন তিনি বসলেন।[10]

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন,مَنْ سَبَّ نَبِيًّا فَاقْتُلُوهُ وَمَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَاضْرِبُوهُ ‘যে ব্যক্তি নবীকে গালি দেয়, তাকে হত্যা করো। আর যে ছাহাবীকে গালি দেয়, তাকে প্রহার করো’।[11]  রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,  مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ ‘কেউ যদি দ্বীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে’।[12]  অন্যত্র তিনি বলেন,

لاَ يَحِلُّ دَمُ رَجُلٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَنِّى رَسُولُ اللهِ إِلاَّ بِإِحْدَى ثَلاَثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِى وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ.

‘ঐ মুসলিমের রক্ত হালাল নয়, যে এরূপ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। তবে তিনটি কারণে মুসলিমের রক্ত প্রবাহিত করা হালাল- (১) যদি কোনো বিবাহিত ব্যক্তি যিনা করে (২) যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তবে এর বিনিময়ে হত্যা করা এবং (৩) যে ব্যক্তি দ্বীন ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলিম জামা‘আত থেকে বেরিয়ে যায়’। [13]

আলোচ্য হাদীছে তিনটি কারণে কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা বৈধ প্রমাণিত হয়- ১. বিবাহিত ব্যভিচারী ২. হত্যার পরিবর্তে হত্যা ও ৩. ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হওয়া।

শুধু ইসলামে নয়, তাওরাতের ভাষায় মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদ-। বলা হয়েছে, দুনিয়ার এক সীমানা থেকে অন্য সীমানা পর্যন্ত তোমার কাছে বা দূরের লোকেরা যে দেব-দেবীর পূজা করে, যারা তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষদের অজানা সেই সব দেব-দেবীর দিকে যদি তোমার নিজের ভাই কিংবা তোমার ছেলে বা মেয়ে কিংবা প্রিয় স্ত্রী কিংবা তোমার প্রাণের বন্ধু তোমাকে একা পেয়ে বিপথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘চলো আমরা গিয়ে দেব-দেবীর পূজা করি’, তবে তার ডাকে সাড়া দিয়ো না বা তার কথায় কান দিয়ো না। তাকে কোনো দয়া দেখাবে না। তাকে রেহাই দিবে না। কিংবা তাকে রক্ষা করবে না। তাকে হত্যা করতেই হবে। তাকে হত্যা করার কাজে তুমি নিজের হাতেই শুরু করবে। তারপর অন্য সবাই যোগ দিবে। যিনি তোমাকে মিশর দেশের গোলামী থেকে বের করে এনেছেন তোমার সেই মা‘বূদ আল্লাহর দিক থেকে সে তোমাকে ফিরানোর চেষ্টা করেছে বলে বলে তাকে তুমি পাথর ছুড়ে হত্যা করবে। তাতে বনী ইসরাঈলরা সকলে সেই কথা শুনে ভয় পাবে এবং তোমাদের মধ্যে কেউ আর এই রকম খারাপ কাজ করবে না।[14]

খ্রীস্টান ধর্মেও মুরতাদের শাস্তি হল মৃত্যুদ-। বলা হয়েছে, মুরতাদ হওয়া ক্ষমার অযোগ্য গোনাহ, হত্যা এবং যিনাকারীর স্থলাভিষিক্ত।[15]

ইংল্যান্ডে এক খ্রীস্টান পাদ্রি ইয়াহূদী এক মহিলাকে বিয়ে করার জন্য স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করার কারণে অক্সফোর্ডে তাকে ১২৩২ ঈসায়ীর ১৭ এপ্রিলে প্রকাশ্যে জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়।[16]

[1]. আহমাদ, হা/৮৯৫২, ৮৯৩৯।

[2]. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৮ম খ-, হা/১৩৯৩১।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৯৫, ৫২৩।

[4]. ইবনু হিব্বান, ১৪/৪০০।

[5].  তিরমিযী, হা/৩১৪৮।

[6].  তিরমিযী, হা/৩৬১৩।

[7]. তিরমিযী, হা/৩৬১৩।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬১৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৮১।

[9]. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী, হা/১৬৬৪৩; সুনানে দারাকুৎনী, হা/১২২।

[10]. নাসাঈ, সুনানে কুবরা, হা/৩৫২৯।

[11]. জামেঊল আহাদীছ, হা/২২৩৬৬; জামঊল জাওয়ামে‘, হা/৫০৯৭; দায়লামী, ৩/৫৪১, হা/৫৬৮৮; আস-সারেমুল মাসলূল, ৯২।

[12]. ইবনু মাজাহ, হা/২৫৩৫; নাসাঈ, হা/৪০৫৯, সনদ ছহীহ।

[13]. আবুদাঊদ, হা/৪৩৫২; ইবনু মাজাহ, হা/২৫৩৪; তিরমিযী, হা/১৪০২, সনদ ছহীহ।

[14]. বাংলা কিতাবুল মুকাদ্দাস, ২৪২, তৌরাত, ২য় বিবরণ, ১৩: ৬-১।

[15]. ইনসাইক্লোপেডিয়া, রিলিজিওন অধ্যায়, ইন্ডিয়া এডিশন, ৬ নং খ-।

[16]. ইনসাইক্লোপেডিয়া, রিলিজিওন অধ্যায়, ইন্ডিয়া এডিশন, ৬/৬৪৪।