রাসূল (ছা.)-এর জন্মতারিখ : একটি পর্যালোচনা

-মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দীন
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

মুহাম্মাদ (ছা.) সর্বশেষ নবী। দুনিয়ার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব। পৃথিবীতে সংস্কারক হিসাবে যাদের আবির্ভাব হয়েছে, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ মুহাম্মাদ (ছা.)। বিশ্বের বহু খ্যাতিমান পুরুষ মুহাম্মাদ (ছা.)-এর জীবনী নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং এককথায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, তিনি একমাত্র সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক। পৃথিবীতে তাঁর অবদানের কোনো বিকল্প নেই। তিনি যে বার্তা নিয়ে এ ধরায় প্রেরিত হয়েছিলেন, এটিই শ্রেষ্ঠ বার্তা, মানবের জন্য চির কল্যাণকর গাইডলাইন। এই গাইডলাইনের মধ্যেই বিশ্বমানবতার শান্তি নিহিত। এটি অস্বীকার করার কারও কোনো সুযোগ নেই। আর সেই রাসূল (ছা.)-এর জন্মের দিন ও মাস নির্দিষ্ট করা নিয়ে সীরাত প্রণেতা ও ঐতিহাসিকগণ মতানৈক্য করেছেন। এ মতানৈক্যের যৌক্তিক কারণও রয়েছে। যেহেতু কারও জানা ছিল না যে, এ নবজাতক ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? অন্য নবজাতকের জন্মকে যেভাবে নেওয়া হতো, তার জন্মকেও সেভাবে নেওয়া হয়েছে। এজন্য কেউ রাসূল (ছা.)-এর জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেননি। ড. মুহাম্মাদ তাইয়্যেব আন- নাজ্জার (রাহি.)-বলেন, ‘সম্ভবত এর রহস্য হলো, যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার থেকে কেউ এমন বিপদ আশঙ্কা করেনি। এজন্যই জন্মলগ্ন থেকে নবুঅত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত সময়ে আলোচনায় আসেননি। ৪০ বছর বয়সে যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে রিসালাতের দাওয়াত পৌঁছানোর নির্দেশ প্রদান করেন, তখন থেকে মানুষ এ নবী সংক্রান্ত তাদের স্মৃতিতে গেঁথে থাকা ঘটনাগুলো স্মরণ করতে থাকে এবং একে অপরকে তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি সব ইতিহাস জিজ্ঞেস করতে থাকে। এ বিষয়ে তাদেরকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছে বুঝবান হওয়ার পর থেকে নিজের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর বর্ণনা যে ঘটনাগুলো তিনি পার করেছেন অথবা তাঁর উপর দিয়ে পার হয়েছে। অনুরূপভাবে তার ছাহাবীগণের বর্ণনা ও এসব ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের বর্ণনা। এভাবে মুসলিমরা তাদের নবী (ছা.)-এর ইতিহাস সংক্রান্ত শ্রুত সব ঘটনা সংগ্রহ করা আরম্ভ করেন, যেন ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য তা বর্ণনা করে যেতে পারেন’।[1]   

রাসূল (ছা.)-এর জন্মদিন : রাসূল (ছা.)-এর জন্মদিন সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আবু ক্বাতাদা আল-আনছারী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে সোমবারে ছিয়াম রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমি নবুঅত প্রাপ্ত হয়েছি’।[2]   ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছা.) সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন, সোমবারে নবুঅত লাভ করেন, সোমবারে ইন্তিকাল করেন, সোমবারে মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনার পথে রওয়ানা করেন, সোমবারে মদীনা পৌঁছান এবং সোমবারেই তিনি হাজারে আসওয়াদ স্থাপন করেন’।[3]   

রাসূল (ছা.)-এর জন্মবছর : হাদীছে এসেছে, ক্বাইস ইবনে মাখরামা (রা.) তার পিতা হতে, তার পিতা তার দাদা হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি ও রাসূল (ছা.) হস্তির বছরে (আবরাহার বাহিনী ধ্বংসের বছর) জন্মগ্রহণ করি। তিনি বলেন, ইয়া‘মুর ইবনু লাইছ গোত্রীয় কুবাছ ইবনু আশইয়ামকে ওছমান ইবনু আফফান (রা.) প্রশ্ন করেন, আপনি বড় নাকি রাসূলুল্লাহ (ছা.)? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) আমার চাইতে অনেক বড়, তবে আমি তাঁর আগে জন্মগ্রহণ করি। রাসূলুল্লাহ (ছা.) হাতির বছর জন্মগ্রহণ করেছেন। আমার মা আমাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে গিয়ে আমি পাখিগুলোর  মলের রং সবুজে বদল হয়ে যেতে দেখেছি। আবু ঈসা (তিরমিযী) বলেন, এ হাদীছটি হাসান গরীব। আমরা শুধু মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্বের সূত্রেই এ হাদীছটি জেনেছি।[4] 

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহি.) বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাসূলুল্লাহ (ছা.) মক্কার অভ্যন্তরে হস্তিবাহিনীর বছর জন্মগ্রহণ করেন’।[5]   

হস্তিবাহিনীর ঘটনা : আবরাহা সাবাহ হাবশী (সে সম্রাট নাজ্জাশী হাবশের পক্ষ হতে ইয়ামানের গভর্নর ছিল) যখন দেখল যে, আরববাসী কা‘বা ঘরের হজ্জ পালন করছে এবং একই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজন সেখানে আগমন করছে, তখন সান‘আয় সে একটি বিরাট গির্জা নির্মাণ করল এবং সেই গির্জাকে কেন্দ্র করে হজ্জ পালন করার জন্য আরববাসীকে আহ্বান জানালো। কিন্তু বনু কেনানা গোত্রের লোকজন যখন এই সংবাদ অবগত হলো, তখন তারা এক রাতে গোপনে গির্জায় প্রবেশ করে তার সামনের দিকে ‘মল’-এর প্রলেপন দিয়ে একদম নোংরা করে ফেলল।

উক্ত ঘটনায় আবরাহা ভয়ানক ক্রোধান্বিত হয় এবং প্রতিশোধ গ্রহণার্থে কা‘বা ঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে প্রায় ৬০ হাজার অস্ত্রসজ্জিত সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হয়। সে নিজে একটি শক্তিশালী হাতির পিঠে আরোহণ করে।

আবরাহা ইয়ামান হতে অগ্রসর হয়ে ‘আল-মাগাম্মাস’ নামক স্থানে পৌঁছল এবং সেখানে তার সৈন্য বাহিনীকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করে মক্কায় প্রবেশের উদ্দেশ্যে সামনে অগ্রসর হলো। অতঃপর যখন মুযদালিফা এবং মিনার মধ্যবর্তী স্থান ওয়াদিয়ে মুহাসসারে পৌঁছল, তখন আবরাহার হাতিটি মাটিতে বসে পড়ল। কা‘বা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য কোনোভাবেই তাকে উঠানো সম্ভব হলো না। অথচ উত্তর, দক্ষিণ কিংবা পূর্বমুখে যাওয়ার জন্য তাকে উঠানোর চেষ্টা করলে সে তৎক্ষণাৎ উঠে দৌঁড়াতে শুরু করছিল। এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা এক ঝাঁক ছোট পাখি প্রেরণ করলেন। কুরআন মাজীদে সেই পাখিগুলোকে ‘আবাবীল’ বা ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই পাখিগুলো পাথরের ছোট ছোট টুকরো বয়ে এনে সৈন্যদের উপর নিক্ষেপ করতে লাগল।  কঙ্করগুলো শরীরের যেখানে লাগছিল, ফেটে গিয়ে সেখান থেকে  রক্ত প্রবাহিত হতে হতে সে মরে যাচ্ছিল।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের অভিমত হচ্ছে, উক্ত ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর জন্মগ্রহণের মাত্র ৫০ কিংবা ৫৫ দিন পূর্বে মুহাররম মাসে। এই প্রেক্ষিতে এটা ধরে নেওয়া যায় যে, ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ৫৭১ ঈসায়ী সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ ভাগে কিংবা মার্চ মাসের প্রথম ভাগে।[6]  কিছু কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, রাসূল (ছা.)-এর জন্ম হস্তিবাহিনীর ১০/২৩/৪০ বছর পর। তবে উক্ত বর্ণনাগুলো দূর্বল।[7]

রাসূল (ছা.)-এর জন্ম তারিখ : রাসূল (ছা.)-এর জন্ম তারিখ নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। যেমন:

১.  রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর জন্ম তারিখ ১০ রবীউল আউয়াল। এই মতটি হুসাইন (রা.)-এর পৌত্র মুহাম্মাদ ইবনে আলী আল-বাকের (১১৪ হি.) থেকে বর্ণিত। দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ আমর ইবন শারাহীল আশ-শা‘বী (১০৪ হি.) থেকেও এই মতটি বর্ণিত। ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ওমর আল-ওয়াকেদী (২০৭ হি.) এই মত গ্রহণ করেছেন। ইবনে সা‘দ তার বিখ্যাত ‘আত-ত্ববাকাতুল কুবরা’য় শুধু দুইটি মত উল্লেখ করেছেন, ২ তারিখ ও ১০ তারিখ’।[8]

২. ইবনে কাছীর (রাহি.) বলেন, ‘কেউ বলেছেন, ৮ রবীউল আউয়াল। হুমাইদী এ বর্ণনাটি ইবনে হাযম থেকে বর্ণনা করেন। আর মালেক, উক্বাইল ও ইউনুস ইবনে ইয়াযীদ প্রমুখ এটি বর্ণনা করেন যুহরী থেকে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতঈম থেকে। ইবনে আব্দুল বার বলেন, ঐতিহাসিকগণ এ মতটিকে সঠিক বলেছেন। হাফেয মুহাম্মাদ ইবনে মূসা আল-খাওয়ারেযমী এ তারিখের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। ইবনে দিহইয়াহ ‘আত-তানবির ফী মাওলিদিল বাশিরীন নাযীর’ গ্রন্থে এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন’।[9]

৩. কারও মতে, রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর জন্ম তারিখ ১২ রবীউল আউয়াল। এই মতটি হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক্ব (১৫১ হি.) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছা.) হস্তির বছরে রবীউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন’।[10]

এখানে লক্ষণীয় যে, ইবনে ইসহাক্ব সীরাতুন্নবীর সকল তথ্য সাধারণত সনদসহ বণর্না করেছেন, কিন্তু এই তথ্যটির জন্য তিনি কোনো সনদ উল্লেখ করেননি। কোথা থেকে তিনি এই তথ্যটি গ্রহণ করেছেন তাও জানাননি বা সনদসহ প্রথম শতাব্দীর কোনো ছাহাবী বা তাবেঈ থেকে মতটি বণর্না করেননি। এজন্য অনেক গবেষক এই মতটিকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।[11]

৪. অন্যমতে, তিনি রামাযান মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। ৩য় হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জুবাইর ইবনে বাক্কার (২৫৬ হি.) থেকে এই মতটি বর্ণিত। তাঁর মতের পক্ষে যুক্তি হলো, রাসূলুল্লাহ (ছা.) সর্বসম্মতিক্রমে রামাযান মাসে নবুঅত পেয়েছেন। তিনি ৪০ বৎসর পূর্তিতে নবুঅত পেয়েছেন। তাহলে তাঁর জন্ম অবশ্যই রামাযানে হবে।[12]

৫. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাতে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ ও  আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত ১৮ রবীউল আউয়াল।[13]

৬. আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) মক্কার বিখ্যাত বনু হাশেম বংশে ৯ রবীউল আউয়াল হস্তির বছর সোমবার দিন রাতের মহাসন্ধিক্ষণে ছুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজি পঞ্জিকা মতে, তারিখটি ছিল ৫৭১ ঈসায়ী সালের ২০ অথবা ২২ এপ্রিল। এ বছরটি ছিল বাদশাহ নওশেরওয়ার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার ৪০তম বছর। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মুহাম্মাদ সুলায়মান সালমান (রাহি.) এবং মাহমূদ পাশা ফাল্কীর অনুসন্ধানলব্ধ সঠিক অভিমত হচ্ছে এটাই।[14]

৭. আরবের গবেষক সৌরবিজ্ঞানী আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম (মৃ. ১৪১৬ হি.) লিখেছেন, ‘বিশুদ্ধ রেওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (ছা.)-এর জন্ম হয় ২০ এপ্রিল ৫৭১ ইংরেজিতে আমুল ফিল’-এ। সুতরাং তাঁর জন্ম-মৃত্যুর দিন খুব সূক্ষ্মভাবে বের করা সম্ভব এর ভিত্তিতে। বর্ণনার বিচারে ও যুক্তির আলোকে রাসূল (ছা.)-এর জন্ম তারিখ হলো ৯ রবীউল আউয়াল হিজরী পূর্ব ৫৩ সন মোতাবেক ২০ এপ্রিল, ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ।[15]

ছহীহ হাদীছসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূল (ছা.)-এর জন্ম সোমবারে হয়েছে। কোন তারিখ সেটা বলা নেই। অতএব সোমবার ঠিক রাখতে গেলে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব মতে ৯ রবীউল আউয়ালই সঠিক জন্ম তারিখ হয়; ১২ রবীউল আউয়াল নয়, যা প্রসিদ্ধ আছে।[16]

রাসূল (ছা.)-এর জন্ম সংশ্লিষ্ট ভিত্তিহীন কথা : তাঁর জন্মের কাহিনীতে প্রসিদ্ধ আছে যে, (১) রাসূলুল্লাহ (ছা.) খাৎনাকৃত ও নাড়ী কাটা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হন। (২) কেউ তার লজ্জাস্থান দেখেনি। (৩) শৈশবে বক্ষবিদারণের দিন জিবরীল (আ.)  তাঁর খাৎনা করেন।[17]  (৪) জান্নাত থেকে আসিয়া ও মারইয়াম নেমে এসে ধাত্রীর কাজ করেন। (৫) আবু লাহাব মৃত্যুর পরে তার পরিবারের কোনো একজনকে স্বপ্ন দেখান। তাকে বলা হয়, আপনার অবস্থা কী? তিনি বলেন, আমি জাহান্নামে। তবে প্রতি সোমবার আমার আযাব হালকা করা হয় এবং আমার এই দুই আঙুল থেকে পানি চুষে পান করি। আর এটা এ কারণে যে, নবী (ছা.)-এর জন্মের সুসংবাদ দানের ফলে আমি আমার দাসী ছুয়াইবাহকে মুক্ত করে দিই এবং সে নবী (ছা.)-কে দুধ পান করায়। উল্লেখ্য, আবু লাহাব ২য় হিজরীতে সংঘটিত বদর যুদ্ধের সপ্তাহকাল পরে মারা যায়। আব্বাস তখন কাফের ছিলেন এবং ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম হন। (৬) রাসূল (ছা.) প্রসবের সময় তার মা বলছেন যে, আমার লজ্জাস্থান দিয়ে ‘নূর’ অর্থাৎ জ্যোতি বিকশিত হয়, যা শামে প্রাসাদসমূহকে আলোকিত করেছিল, উম্মাহাতুল মুমিনীন যা স্বচক্ষে দেখেছিলেন। এটি ছিল ভবিষ্যতে শাম এলাকা ইসলামের আলোকে আলোকিত হওয়ার অগ্রিম সুসংবাদ। (৭) পারস্যের কিসরা রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠেছিল এবং তার ১৪টি চূড়া ভেঙে পড়েছিল। আর এটি ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ নবী হওয়ার অগ্রিম সুসংবাদ। (৮) এ সময় মাজূসীদের পূজার আগুন নিভে গিয়েছিল। (৯) ইরাকের সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল এবং তার পার্শ্ববর্তী গির্জাসমূহ ধ্বসে পড়েছিল ইত্যাদি।[18]  (১০) ঐ সময় কা‘বাগৃহের ৩৬০টি মূর্তি ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে’। বলা বাহুল্য, উপরে বর্ণিত সকল বর্ণনাই ভিত্তিহীন কল্পকথা মাত্র।[19]

ইসলামে জন্মদিন পালন বলতে কিছু নেই। বছরের যে দিনটিতে কেউ জন্মগ্রহণ করেছে, সেই দিনকে  তার জন্য বিশেষ কোনো দিন মনে করা বা এই উপলক্ষ্যে আনন্দ-ফুর্তি করা অথবা কোনো আমল করার বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর কোনো দলীল পাওয়া যায় না। ছাহাবী ও তাবেঈনের যুগে জন্মদিন পালনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। যদি জন্মদিন বলতে ইসলামে কোনো কিছু থাকত, তাহলে হাদীছ ও ইতিহাসের কিতাবগুলোতে ছাহাবী ও তাবেঈনের জন্মদিন পালনের কোনো না কোনো ঘটনা থাকত। অথচ তাদের জন্মদিন পালনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি জন্মদিনের বিশেষ কোনো গুরুত্বই তাদের কাছে ছিল না।

[1].  আল-ক্বাওলুল মুবীন ফী সীরাতে সায়্যিদিল মুরসালীন, পৃ. ৭৮।

[2]. ছহীহ মুসলিম (মিসর : দারুল এহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যাহ, তা.বি.),  ২/৮১৯।

[3]. আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ (মিসর : দারুল মা‘আরিফ, ১৯৫০), ৪/১৭২-১৭৩, হা/২৫০৬, বিশ্লেষক আহমদ শাকির সনদ আলোচনা করে  বলেছেন, হাদীছটির সনদ ছহীহ।

[4]. জামে‘ আত-তিরমিযী, হা/৩৬১৯।

[5]. আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ, ১/৭৬।

[6]. আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর রাহীকুল মাখতূম (ঢাকা : পিস পাবলিকেশন), পৃ. ৯১-৯২।

[7]. আস-সীরাতুন নাবাবিয়াহ আছ-ছাহীহাহ, ১/৯৭।

[8].  ইবনে সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা (বৈরূত : দারুল এহইয়াইত তুরাছিল আরাবী), ১/৪৭।

[9]. প্রাগুক্ত।

[10]. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়াহ (মিসর : দারুর রাইয়ান, ১ম সংস্করণ, ১৯৭৮), ১/১৮৩।

[11]. আহমাদ মাহদী রিযকুল্লাহ, আস-সীরাতুন নাবাবিয়াহ, পৃ.  ১০৯।

[12]. ইবনে সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১০০-১০১; আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাসতালানী, আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া  (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলিময়া, ১ম সংস্করণ ১৯৯৬), ১/৭৪-৭৫;  আল-যারকানী, শরহুল মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, ১ম সংস্করণ ১৯৯৬), ১/২৪৫-২৪৮।

[13]. আবুল ফিদা হাফিয ইমাদুদ্দীন ইবনে কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (মিসর: দারুর রাইয়ান লিত তুরাস, ১ম প্রকাশ ১৪০৮ হি./১৯৮৮), ১/২৪২।

[14]. আর-রাহীকুল মাখতূম, পৃ. ৯৭।

[15]. তাকবীমুল আযমান, পৃ. ১৪৩।

[16]. সুলায়মান ইবনে সালমান মানছূরপুরী, রহমাতুল্লিল ‘আলামীন (উর্দূ), (দিল্লী : ১৯৮০ খ্রি.), ১/৪০।

[17]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৬২৭০।

[18]. আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী, মুখতাছার সীরাতুর রাসূল (ছা.) (রিয়াদ: ১ম সংস্করণ ১৪১৪/১৯৯৪ খ্রি.), পৃ. ১৮-২০; মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতূম, (কুয়েত : ২য় সংস্করণ ১৪১৬/১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ৫৪।

[19]. ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালীব, সীরাতুর রাসূল (ছা.) (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), পৃ. ৫৬-৫৭-এর টীকা দ্রষ্টব্য।