রাসূল a-এর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব
-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*


عَنْ أَنَسٍ t قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

সরল অনুবাদ : আনাস c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a এরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছে আমি তার পিতা, সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হব’।[1]

ব্যাখ্যা : রাসূল a এর প্রতি ছাহাবীদের যে ভালোবাসা ছিল, তা ছিল আবেগময়, হৃদয়স্পর্শী ও অকৃত্রিম। তা ছিল গভীর ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান পাওয়া অপূর্ব নিদর্শন; তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

এ ভালোবাসা ছিল নিখাদ, এ ভালোবাসা ছিল হৃদয় নিংড়ানো। ভালোবাসা ছিল সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত, দুধের ন্যায় সাদা, স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ, ইস্পাতের ন্যায় কঠিন, পর্বতশৃঙ্গের ন্যায় সুউচ্চ। এ ভালোবাসা স্রেফ আবেগনির্ভর কিংবা কৃত্রিম আবেশের ছোঁয়ায় আবর্তিত নয়, এ ভালোবাসা দুনিয়াবী জীবনের তুচ্ছ প্রাপ্তি কিংবা লোভ-লালসার উপর ভিত্তিতে হয়নি।

ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত ইলাহী প্রেমে সিক্ত ছিল এ ভালোবাসা। এ ভালোবাসার সুধায় সিক্ত ব্যক্তি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে কিংবা জীবন বিসর্জন দিতে কিংবা অসাধ্য সাধনে আত্মনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করে না। ভয়াবহ সংকট, প্রচণ্ড আঘাত, অঙ্গহানী কিংবা ক্রমাগত বিপর্যয় এ ভালোবাসায় ফাটল সৃষ্টি করে না; বরং আরও দৃঢ়, নিবিড় ও গভীর হয়। আল্লাহকে পাওয়ার সুধায় পরিতৃপ্ত হওয়ার আশা এই ভালোবাসাকে লালন করে, তাঁকে দর্শনে মুগ্ধ হওয়ার সুপ্ত স্বপ্ন এ ভালোবাসাকে প্রতিপালন করে। যে ভালোবাসা জীবনের সকল প্রাপ্তির উৎস; যে ভালোবাসা জীবনের সকল সাফল্যের মূলমন্ত্র।

এ ভালোবাসার ক্ষেত্রে উমার c-এর মতো বিচক্ষণ ছাহাবী ভুল করায় আল্লাহর রাসূল a তাঁকে সতর্ক করেন। উমার c আল্লাহর রাসূল a-কে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল a! আপনি আমার কাছে আমার জীবন ব্যতীত সবকিছুর চেয়ে প্রিয়। তখন রাসূল a বলেছিলেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয় হব। তখন উমার c বলেন, হে রাসূল a! আল্লাহর কসম! আপনি এখন আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়। অতঃপর রাসূল a বলেন, হে উমার! এখন তোমার ঈমান পরিপূর্ণ হয়েছে।[2]

তাঁরা আল্লাহর রাসূল a-কে এত বেশি ভালোবাসতেন যে, তাঁর উপর সম্ভাব্য যে কোনো বিপদ বা সমস্যাকে প্রতিহত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতেন। এক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রাখতেন। তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা জীবন উৎসর্গের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। আল্লাহর রাসূল a ঘনিষ্ঠ ছাহাবী আবূ বকর c মাসজিদে হারামের এক কোণে বসে আছেন, এমন সময় কুরাইশদের অন্যতম নেতা উক্ববা ইবনে আবূ মুইত্বকে আল্লাহর রাসূল a-এর দিকে অগ্রসর হতে দেখতে পেলেন, তখন আল্লাহর রাসূল a ছালাত আদায় করছিলেন। আবূ বকর c তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি দেখলেন যে, সে রাসূল a-এর গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাঁকে প্রচণ্ডভাবে শ্বাসরোধ করে চেপে ধরেছে। এ অবস্থা দেখে আবূ বকর c দ্রুত গতিতে সেখানে উপস্থিত হন এবং কঠোরভাবে তাকে প্রতিহত করেন। ফলে আল্লাহর রাসূল a তার ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি লাভ করেন।[3] অতঃপর আবূ বকর c বলতে থাকেন, তোমরা কি এমন একজন মানুষকে শুধু এজন্য হত্যা করতে চাও যে, তিনি বলেন, ‘আমার রব আল্লাহ, অথচ তিনি তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছেন?’ (গাফির, ৪০/২৮)

রাসূল a-এর সঙ্গ পাওয়া ছাহাবীদের নিকট সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয় ছিল। রাসূল a–এর সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করার জন্য তাঁরা সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। যখনই তাঁরা সুযোগ পেতেন, তখনই তাঁর সাক্ষাতের জন্য ছুটে যেতেন। কেননা তাঁর অনুপস্থিতি তাঁদের নিকট সবচেয়ে বড় বিরহের কারণ ছিল। তাঁকে অপ্রাপ্তি সর্বদা তাঁদেরকে আহত করত। যখন আল্লাহর রাসূল a মুআয ইবনু জাবাল c-কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন, তখন তিনি তাঁর সাথে বের হয়ে তাঁকে উপদেশ দিতে থাকেন। মুআয c যখন বাহনে আরোহী ছিলেন, তখন আল্লাহর রাসূল a বাহনের নিচে দিয়ে হাঁটছিলেন। উপদেশ দেওয়ার শেষ প্রান্তে বলেন, হে মুআয! সম্ভবত এই বছরের পর আমার আর সাক্ষাৎ পাবে না, তুমি আমার কবর ও মসজিদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবে। তখন মুআয c আল্লাহর রাসূল a-এর বিচ্ছেদের বিরহে অঝোরে কান্না করতে থাকেন।[4]

তাঁদের বিরহের বেদনা পার্থিব জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং পরকালের বিরহও তাদেরকে প্রচণ্ডভাবে আহত করত। আয়েশা g হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল a-কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার নিকট আমার জীবনের চেয়ে বেশি প্রিয়, আপনি আমার নিকট আমার সন্তানের চেয়ে বেশি প্রিয়। যখন আমি বাসায় অবস্থান করি তখন আপনার কথা স্মরণ হলে আপনাকে না দেখা পর্যন্ত বাসায় থাকতে পারি না। আর যখন আপনার ও আমার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি, তখন দেখি আপনি নবীদের সাথে জান্নাতের উঁচু স্থানে থাকবেন আর জান্নাতের নিম্ন স্তরে আমার থাকার সুযোগ হলে আপনাকে দেখতে না পাওয়ার বেদনা আমাকে অস্থির করে তুলে! আল্লাহর রাসূল a কোনো উত্তর দিলেন না। এমতাবস্থায় আয়াত অবতীর্ণ করে আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে তারা ওই সকল নবী, পরম সত্যবাদী, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের সাথে থাকবে যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। আর বন্ধু হিসেবে তাঁরা কতইনা উত্তম’ (আন-নিসা, ৪/৬৯)[5]

তাঁরা সকলের উপর আল্লাহর রাসূল a-এর ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিতেন। কারণ রাসূল a-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁরা নিজেদের হৃদয়ে লালন করতেন। তাঁরা নিজেদের পরিবার, সন্তান ও জীবনের উপর তাঁকে প্রাধান্য দিতেন, যার নির্দেশ আল্লাহ তা‘আলা সকল মুসলিমকে দিয়েছেন।

মহানবী a-এর প্রতি ছাহাবীদের ভলোবাসার চিত্র এমন ছিল যে, তাঁরা তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার আশায় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সর্বদা তাঁরা উদগ্রীব থাকতেন। তাঁরা প্রত্যেকেই অন্যের চাইতে তাঁর বেশি ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করতেন। এভাবেই তাঁর নির্ভেজাল ভালোবাসা ও গভীর মুহাব্বত লাভের জন্য তাঁদের চেষ্টা অব্যাহত থাকত।

রাসূল a-এর প্রতি তাঁদের ভালোবাসা এত গভীর ছিল যে, তাঁরা তাঁর পবিত্র শরীরে চুম্বন দিতেন। একদিন যখন আল্লাহর রাসূল a ছালাতের কাতার সোজা করছিলেন, তখন তিনি সাওয়াদ ইবনু গযিইয়ার পেটে লাঠি দিয়ে স্পর্শ করেন। সাওয়াদ এটিকে (রাসূল a-এর ভালোবাসা লাভের) একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল a! আপনি আমাকে ব্যাথা দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল তাঁর পেট থেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, হে সাওয়াদ! প্রতিশোধ নাও। সাওয়াদ দ্রুত আল্লাহর রাসূল a-এর পেটে নিজের পেট লাগিয়ে নিলেন এবং তাঁর পেটে চুমু খেলেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আপনার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার এটাই চূড়ান্ত মুহূর্ত। তাই আমি আমার শরীর আপনার শরীরের সাথে মিলিয়ে নিচ্ছি। অতঃপর রাসূল a তাঁর জন্য দু‘আ করেন।[6]

রাসূল a-এর প্রতি তাঁদের সত্য ভালোবাসার নিদর্শন এমন ছিল যে, তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে কোনো শাস্তিকে সানন্দে মাথা পেতে নিতেন। তিনি সাময়িক কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তাঁদের আনন্দ ও শান্তির চিন্তা মন থেকে উধাও হয়ে যেত। তাঁর শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা জীবন উৎসর্গের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। যার দৃষ্টান্ত যায়েদ ইবনু দাছেনার ঘটনা। যখন ছফওয়ান ইবনু উমাইয়া, তার পিতা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে তাঁকে কিনে নিয়েছিল। হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে মাসজিদে হারামের সীমানা থেকে বের করে কৃতদাস নিসতাসকে দিয়ে তানঈম নামক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে কুরাইশদের একদল লোক উপস্থিত হয়েছিল যার মধ্যে আবূ সুফয়ানও ছিলেন। হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে নিয়ে যাত্রা করলে আবূ সুফয়ান বললেন, ‘হে যায়েদ! আমি তোমাকে আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি কি চাও যে, মুহাম্মাদ এখন আমাদের নিকট তোমার জায়গায় আসুক, আমরা তাকে হত্যা করব আর তুমি তোমার পরিবারের নিকট চলে যাবে?’ তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ a এখন যদি নিজ বাসায় অবস্থান করেন এবং কাঁটার আঘাতে সামান্য আহত হন আর আমি বাসায় বসে থাকি; এমনটাও আমি চাই না!’ তখন আবূ সুফয়ান বললেন, ‘আমি মানুষের মধ্যে এমন কাউকে দেখিনি, যিনি কাউকে এমন ভালোবাসে যেমন মুহাম্মাদ a-এর অনুসারীরা মুহাম্মাদ a-কে ভালোবাসে’। অতঃপর নিসতাস তাঁকে হত্যা করে![7]

রাসূল a-এর প্রতি ছাহাবীদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো তাঁরা তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে কখনই পিছপা হননি। তাঁর যে কোনো আদেশ তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করতেন, তাঁর যে কোনো নিষেধাজ্ঞা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করতেন। এটি তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আব্দুর রহমান ইবনু আবী লায়লা থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু রওয়াহা একদিন এমন সময় আল্লাহর রাসূল a-এর নিকট আসলেন, যখন তিনি খুৎবা দিচ্ছিলেন। তিনি আল্লাহর রাসূল a-কে বলতে শুনেন ‘তোমরা বসো’ ফলে তিনি তৎক্ষণাৎ সেখানেই মসজিদের বাইরে খুৎবা শেষ হওয়া অবধি বসে রইলেন। তাঁর এই ঘটনা রাসূল a-এর নিকট পৌঁছলে তিনি তাঁর জন্য এই বলে দু‘আ করেন, ‘মহান আল্লাহ তোমার মধ্যে আল্লাহ এবং রাসূল a-এর অনুগত হওয়ার আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিন’।[8]

একজন মুমিন ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার হতে পারে না যতক্ষণ না সে রাসূল a-এর ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেয়। সত্যিকারের ভালোবাসা ও প্রিয়জনের জন্য মানুষ তাই ভালোবাসে এবং ঘৃণা করে যা সে নিজের জন্য করে থাকে। যদি এই ভালোবাসা আন্তরিক হয়, তবে এই ভালোবাসা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হবে। রাসূল a-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা অর্জনের জন্য আমাদের সকলকে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৩; মিশকাত, হা/৭।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬৩২।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮৫৬।

[4]. ইবনু হিব্বান, হা/৬৪৭; হাদীছটিকে আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী p

  ছহীহ বলেছেন; আত-তা‘লীকাতুল হিসান, হা/৬৪৬।

[5]. আল-মু‘জাম আত্ব-ত্ববারানী আছ-ছাগীর, হা/৫২; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৭/১০।

[6]. সিলসিলা ছাহীহা, ৬/৮০৮, হা/২৮৩৫।

[7]. আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/৬৬৯।

[8]. বায়হাক্বী, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ৬/২৫৭।