রোগ-ব্যাধি : ক্ষেত্র বিশেষে আপনিই দায়ী!
সাঈদুর রহমান*


সুখে থাকতে চায় না, এমন কেউ আছে? জানি, কেউ নেই। সবাই সুখ-শান্তি, আমোদ-প্রমোদে থাকতে পছন্দ করে। সুখের হাতছানি পাওয়ার জন্য মানুষ দেশ-বিদেশ হন্যে হয়ে ঘোরাফেরা করে। সুখের জন্য মানুষ কী না করতে পারে? সবই করতে পারে; কোনো পাপকেই আমলে নেয় না, এমনকি পরের গলায় অস্ত্রধারণ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। সবার একই বাসনা, আমাকে সন্তানাদি নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে হবে; তা যেভাবেই হোক না কেন! কখনো কখনো মানুষের সুখময় জীবনে চলে আসে বিষাদের ঘনঘটা; কোনো কিছুই আর ভালো লাগে না, কাছের মানুষগুলোকে দেখলেও বিরক্তি আসে, সবসময় একা-একা থাকতে ভালো লাগে।

আপনি জানেন কি এই সুখময় জীবন কেন বিষাদময় হয়ে উঠে? এর অনেকগুলো কারণ আছে; অন্যতম কারণ হলো শরীরে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি বাসা বাঁধা ও পার্থিব জীবনে বিপদাপদ চলে আসা। আল্লাহ তাআলা যেহেতু মানুষ সৃষ্টি করেছেন, সেহেতু তিনি জানেন কীভাবে মানুষ চললে সুস্থ থাকবে। আর এজন্যই তিনি কিছু বিধিনিষেধ নির্ধারণ করেছেন। মানুষরা না বুঝে আল্লাহর সেই বিধিনিষেধে হস্তক্ষেপ করে, যার ফলশ্রুতিতে তাদের শরীরে নানাবিধ রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়। আল্লাহ তাআলা কারো উপর যুলম, অবিচার, রোগ-ব্যাধি ও বিপদাপদ দিতে চান না; কিন্তু বান্দারা তা নিজ হস্তেই উপার্জন করে। তিনি বলেন,﴿ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ﴾ ‘জলে ও স্থলে যে বিপর্যয় আপতিত হয়ে থাকে, তা মানুষের হাতের উপার্জন। যেন তারা সঠিক পথে ফিরে আসে এ জন্য তিনি তাদেরকে তাদের অকর্মের কিছু শাস্তি আস্বাদন করান’ (আর-রূম, ৩০/৪১)

আজকের লেখাটা হবে রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে। কিছু রোগ-ব্যাধি আছে, যা আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য দিয়ে থাকেন। আর কিছু আছে, যা বান্দার অপকর্মের কারণে দিয়ে থাকেন। আমরা আলোচনা করব ঐ সমস্ত রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে, যা বান্দার অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে আপতিত হয়ে থাকে। অনেকে হয়তো প্রশ্ন করবে যে, আপনি তো চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে লেখাপড়া করেননি, তাহলে রোগ-ব্যাধি নিয়ে কীভাবে লেখালেখি করবেন? উত্তরে আমরা বলবো, দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকাতে অনেক প্রথিতযশা চিকিৎসক লেখালেখি করেন, সেখান থেকে আমরা কিছু উল্লেখ করব; নিজ পক্ষ থেকে নয়। কারণ আমরা তো চিকিৎসক নই। আর কালক্ষেপণ না করে শুরু করা যাক ‘রোগ-ব্যাধি’ যাত্রা।

মহিলাদের ক্যান্সার হওয়ার কারণ :

বর্তমানে সারা বিশ্বে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হু-হু করে বাড়ছে; কোনোভাবে কমছে না এর প্রকোপ। ছোট-বড়, নর-নারী ও তরুণ-তরুণী কেউ এর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এখন আপনাদের কাছে নয়া দিগন্ত পত্রিকার একটি রিপোর্ট উল্লেখ করব, যেখানে সারা বিশ্বে প্রতিবছর কতজন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তার একটি তালিকা উপস্থাপন করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১৮ লাখের বেশি নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। প্রতি ১৩ মিনিটে ১ জন আর বছরে ৪০ হাজার নারী এ রোগে মৃত্যুবরণ করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ থেকে ২৫ হাজার নারী এ রোগে আক্রান্ত হয়, যার মাঝে বিনা চিকিৎসায় মারা যায় ১৭ হাজার। এ রোগে আক্রান্ত ৫০ শতাংশ রোগীর বয়স ৩০ থেকে ৪০ এবং ৫ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের কম।[1]

নারীদের সাধারণত দু’টি ক্যান্সার হয়ে থাকে। স্তন ক্যান্সার ও জরায়ু ক্যান্সার। বিশেষজ্ঞ মহল স্তন ক্যান্সার হওয়ার কারণ উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা বলেন, ‘স্তন ক্যান্সার হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, শিশুকে স্তন থেকে দুগ্ধপান না করানো’।[2] সাধারণত সন্তান প্রসব করার পর নারীদের স্তনে দুধ আসে। এখন কোনো নারী যদি এই দুধ তার সন্তানকে পান না করিয়ে বাজারের কৌটার দুধ পান করায়, তাহলে তার স্তনে জমে থাকা দুধে পচন ধরে সেখান থেকে জীবাণু চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে আস্তে আস্তে তা রূপ নেয় মরণব্যাধি ক্যান্সারে। বর্তমানে নারীরা ঠুনকো অজুহাতে সন্তানকে বুকের দুধ পান করায় না, যার কারণে বাচ্চারা যেমন বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে; অনুরূপ নারীরাও ক্যান্সার নামক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

তাহলে বলুন, এই ধ্বংসাত্মক ব্যাধির জন্য দায়ী কে? আল্লাহ তাআলা, না-কি নারীরা? আল্লাহ তাআলা দুধ পান করানোর গুরুত্ব দিয়ে পবিত্র কুরআনে বলেন,﴿وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ﴾ ‘দুধপানকারিণীগণ তাদের সন্তানদের পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে; এটা তার জন্য, যে দুধ পানের মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়’ (আল-বাক্বারা, ২৩৩)। নবী a দুধ পান করানোর বিষয়টা অনেক গুরুত্ব দিতেন। তাঁর ছেলে ইবরাহীম যখন মারা যায়, তখন তিনি বলেন,  إِنَّ لَهُ مُرْضِعًا فِى الْجَنَّةِ‘তাঁর জন্য তো জান্নাতে একজন দুধ-মা রয়েছেন’।[3] রাসূল a-এর ছেলে ইবরাহীম ১৮ মাস হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করে। যেহেতু শিশুরা ২৪ মাস অর্থাৎ দু’বছর দুধ পান করে আর ইবরাহীম মাত্র ১৮ মাস দুধ পান করেছে, সেহেতু বাকি ৬ মাস পূর্ণ করার জন্য জান্নাতে তার জন্য দুধ পান করানোর ব্যবস্থা করা হবে।

সুধী পাঠক! দুধ পান করানোর গুরুত্ব কতটুকু আপনি কি বুঝতে পেরেছেন? বর্তমানে নারীরা ঠুনকো অজুহাতে দুধ পান করায় না। এতে যা সমস্যা হওয়ার তা আপনাদেরই হবে। আরেকটি হাদীছ দেখুন—

‘গামিদ গোত্রের এক নারী নবী a-এর নিকট এসে বললেন, আমি ব্যভিচার করেছি। তিনি বললেন, ফিরে যাও। তিনি ফিরে চলে গেলেন। পরদিন সকালে তিনি আবার তাঁর নিকট এসে বললেন, আপনি যেরূপ মা‘এয ইবনু মালেককে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, সম্ভবত আমাকেও সেরূপ ফিরিয়ে দিতে চান। আল্লাহর কসম! আমি নিশ্চয়ই গর্ভবতী। তিনি এবারো তাকে ফিরে যেতে বললে তিনি চলে গেলেন। পরদিন তিনি পুনরায় আসতেই নবী a বললেন, তুমি ফিরে যাও যতক্ষণ না সন্তান প্রসব কর। তিনি ফিরে গেলেন। যখন তিনি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন, তখন সেই শিশুটিকে কোলে করে নিয়ে এসে বললেন, আমি এই শিশুটিকে প্রসব করেছি। তিনি বললেন, তুমি ফিরে যাও এবং দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত তাকে দুধ পান করাতে থাকো। অবশেষে দুধ ছাড়ানো হলে শিশুটিকে নিয়ে তিনি হাযির হলেন। শিশুটি খাদ্য হাতে নিয়ে খাচ্ছিল। তিনি একজন মুসলিমকে তার ছেলেটিকে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন। অতঃপর তার জন্য গর্ত খনন করতে আদেশ দিলে তা খনন করা হলো এবং পাথর মেরে হত্যার আদেশ দিলে তাকে এভাবে হত্যা করা হলো। তাকে পাথর মারার জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে খালেদ cও ছিলেন। তিনি তাকে পাথর মারলে এক ফোঁটা রক্ত ছিটকে এসে তাঁর গালে পড়তেই তিনি তাকে গালি দেন। নবী a তাকে বললেন, হে খালেদ! থামো। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তার কসম! সে এরূপ তওবা করেছে যে, কোনো যালেম কর আদায়কারীও যদি সেরূপ তওবা করত, তাহলে অবশ্যই তাকে মাফ করা হতো। অতঃপর তাঁর আদেশে তার জানাযার ছালাত পড়া হয় এবং তাকে দাফন করা হয়।[4]

উক্ত হাদীছে নবী a মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তা মহিলাকে সন্তানকে দুধ পান করানোর জন্য অবকাশ দেন। তাহলে বিষয়টা কত গুরুত্বপূর্ণ তা সহজেই অনুমেয়। আর আপনি সাধারণ অজুহাতে বাচ্চাকে দুধ পান করানোর বন্ধ করে দিয়েছেন! রোগ আপনার না হলে কার হবে? অনেক মহিলার কাছ থেকে শোনা যায় যে, ছেলে-মেয়েরা নাকি কথা শুনে না। আমরা বলব, কীভাবে শুনবে; আপনি তো তাদের দায়িত্ব যথোচিত আদায় করেননি। সন্তানকে যদি দুধ পান করাতেন, তাহলে সে আপনার একটি অঙ্গ সদৃশ হতো। আপনার হাত কি কোনো দিন আপনার বিরোধিতা করেছে? না, করেনি। কারণ হাত তো আপনার অঙ্গ। অনুরূপভাবে সন্তান যদি আপনার দুধ পান করে বেড়ে উঠে, তাহলে কখনো সে আপনার বিরোধিতা করবে না। কারণ সে তো আপনারই অংশ।

আমরা পূর্বে বলেছি যে, নারীদের সাধারণত দু’টি ক্যান্সার হয়, স্তন ক্যান্সার ও জরায়ু ক্যান্সার। স্তন ক্যান্সারের আলোচনা আমরা করেছি। এখন হবে জরায়ু ক্যান্সার নিয়ে কথা। ব্যভিচার এমন একটি পাপ— যা ধর্ম, বর্ণ, শেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ সবাই অপছন্দ করে। আর এই ব্যভিচারই হলো জরায়ু ক্যান্সার হওয়ার অন্যতম কারণ। একজন নারী যখন একাধিক পুরুষের সাথে বিবাহবহির্ভূত অবৈধ কর্মে লিপ্ত হয়, তখন আস্তে আস্তে ঐ নারীর জরায়ুতে জীবাণু একত্রিত হয়ে সেখান থেকে ক্যান্সার নামক মরণব্যাধির উত্থান হয়। আর এর পতন হয় মহিলার জীবন নাশের মাধ্যমে। এখন যে আপনি ব্যভিচার করছেন, যার কারণে আপনার জরায়ু ক্যান্সার হচ্ছে, এর জন্য দায়ী কে? নিশ্চই আপনি। আপনার যেন এই ক্যান্সার না হয়, এজন্য আল্লাহ তাআলা বলছেন, ব্যভিচারের নিকটবর্তী না হওয়ার জন্য। এখন আপনার উচিত, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা। আর তা না করে উল্টো আপনি আল্লাহর সাথে ঔদ্ধত্য পোষণ করছেন? আপনাকে ভালো কথা বললেও আপনি রাগ করেন? আপনি সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী, না-কি উম্মাদ? সুস্থ মানুষ হলে তো নিজের কল্যাণ বুঝতে পারতেন।

পুরুষের ক্যান্সার হওয়ার কারণ :

বিশেষজ্ঞ মহল পুরুষের ক্যান্সার হওয়ার কারণগুলো উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা বলেন, ‘পুরুষের ক্যান্সার হওয়ার অন্যতম কারণ হলো মাদকদ্রব্য সেবন’। এ ব্যাপারে তারা বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য সেবনের একটি জরিপও উল্লেখ করেছেন— বাংলাদেশ তামাকদ্রব্য সেবনে বিশ্বের সাতটি দেশের মাঝে অন্যতম। আগে শুধু গরীব, দুঃখী ও গ্রামের লোকেরাই বিড়ি-সিগারেট সেবন করত। বর্তমানে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই সিগারেট পান করে। এমনকি তরুণীদের মাঝেও এর প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনের মাঝে ৪ জন ধূমপায়ী। তামাকদ্রব্যসেবীর সংখ্যা অন্তত ৪ কোটি ৬০ লক্ষ। দিনদিন এর প্রবণতা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে প্রতি বছর ৩০ হাজার মানুষ ক্যান্সার নামক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে; কোনোভাবেই এর প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ মহল বলেন, ‘প্রত্যেকটা দ্রব্যের কর ধরা হয় চড়া মূল্যে; কিন্তু মাদকদ্রব্যের কর ধরা হয় একেবারে সীমিত, যার কারণে এর প্রবণতা হু-হু করে বাড়ছে’।[5]

আপনি জানেন, কেন তরুণদের উপদেশে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না? কারণ তারা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে। আর এগুলো সেবন করলে তনু-মনে আবরণ পড়ে যায়। যার কারণে ব্যক্তির মাঝে উপদেশের কোনো প্রভাব পড়ে না। এখন আপনি বলুন, এই ক্যান্সারের জন্য দায়ী কে? আল্লাহ ও তাঁর রাসূল a মানুষের কল্যাণ চান। আর এজন্যই তাঁরা নেশাদায়ক বস্তু পরিহার করতে বলেন। আল্লাহ কত সুন্দর কথা বলেছেন,﴿وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ﴾ ‘তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো, আর নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ো না। অনুগ্রহ করো, নিশ্চই আল্লাহ অনুগ্রহশীলদের ভালোবাসেন’ (আল-বাক্বারা, ২/১৯৫)। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, ﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا﴾ ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের উপর অনুগ্রহশীল’ (আন-নিসা, ৪/২৯)

আল্লাহ কখনই মানুষের অকল্যাণ চান না, বরং তিনি চান তারা শান্তিতে থাকুক। নেশার মাঝে কখনই শান্তি নেই, যদিও সেবনকারীরা মনে করে এতে শান্তি রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের শান্তিটা মরীচিকার ন্যায়। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি মনে করে সুপেয় পানি, আসলে তা পানি নয়। অনুরূপভাবে নেশাখোররা মনে করে নেশা করে কষ্ট-যাতনা ভুলে থাকবে; কিন্তু হিতে বিপরীত হয়, কষ্ট আরো বেড়ে যায়। মাদকদ্রব্য সেবনের কারণে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যায়। কত নারী যে প্রিয়তম স্বামীর সংসার ছেড়েছে এই সর্বগ্রাসী মাদকদ্রব্যের কারণে তার ইয়ত্তা নেই! ভাই ভাইয়ের মাঝে, বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে কত আপনজনের সাথে শত্রুতার। শয়তান তো চায়ই মানুষের মাঝে শত্রুতা-বিদ্বেষের সূত্রপাত ঘটাতে। আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করার জন্যই নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,﴿إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ﴾ ‘মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তো শয়তান তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা-বিদ্বেষের সূত্রপাত ঘটাতে চায় এবং আল্লাহর স্মরণ ও ছালাত থেকে বিমুখ করতে চায়; তোমরা কি বিরত থাকবে না?’ (আল-মায়েদা, ৫/৯১)। পুরুষের ক্যান্সার হওয়ার আরেকটি কারণ হলো পর নারীর সাথে অবৈধ কর্মে লিপ্ত হওয়া।

সুধী পাঠক! মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা আপনাকে অবৈধ যৌনাচার থেকে দূরে থাকতে বলছেন। আল্লাহর কোনো লাভ-ক্ষতি নেই, যদি আপনি তাঁর কথা না শুনেন; কিন্তু আপনার ক্ষতি আছে। চিকিৎসকগণ বলেন, ‘কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর সাথে অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়, তাহলে ঐ নারীর যৌনাঙ্গ থেকে পুরুষের যৌনাঙ্গে সংক্রমণ স্থানান্তরিত হয়ে এইডস ও ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে পুরুষ আক্রান্ত হয়’।[6] এখন আপনার ইচ্ছা, আপনি কোনটি গ্রহণ করবেন?

নারী-পুরুষের বন্ধ্যাত্বের কারণ :

জীবনের বড় একটি হতাশা ও ব্যর্থতা হলো সন্তান জন্মদানে অপারগতা। প্রতিটি মানুষের বাসনা থাকে আমার সন্তান প্রথিতযশা বিজ্ঞ পণ্ডিত হবে; কিন্তু সবাই কি সফলতা লাভ করতে পারে? না, সবাই সফল হয় না। এই ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েই একপর্যায়ে পাড়ি জমাতে হয় পরপারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ – أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ﴾ ‘আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা ছেলে দেন ও যাকে ইচ্ছা মেয়ে দেন এবং কাউকে ছেলে-মেয়ে উভয়টি দেন আর কাউকে রাখেন বন্ধ্যা করে। নিশ্চই তিনি সর্বজ্ঞ ক্ষমতাধর’ (আশ-শূরা ৪২/৪৯-৫০)

মানুষের কিছু অনুচিত হস্তক্ষেপের কারণে নেমে আসে তাদের উপর মহা ‍মুছীবত। এই মুছীবতের মাঝে অন্যতম হলো ‘বন্ধ্যা’ হওয়া। প্রথিতযশা চিকিৎসক ডাক্তার এম.এ. রাজ্জাক বলেন, ‘নারী বন্ধ্যাত্বের কারণ হলো জন্মনিয়ন্ত্রণ ট্যাবলেট সেবন করা’।[7] আমি অনেক নবদম্পতিকে দেখেছি, তারা দাম্পত্য জীবনের প্রারম্ভে বিশেষ সময় কাটানোর লক্ষ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ ট্যাবলেট সেবন করেছে; তাদের পরিণতি শুভ হয়নি। এখন পর্যন্ত তাদের সন্তান হয়নি। অনেক দৌড়ঝাঁপ হয়েছে, কোনো কাজেই আসেনি। ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যাওয়ার পর যেমন মায়াক্রন্দন ফলপ্রসূ হয় না, তেমনি সন্তান প্রজননের সময় অতিক্রান্ত করার পর আফসোস করে কোনো লাভ নেই।

সুধী পাঠক! সন্তান দান করার মালিক আপনি? কেন আপনি এই দুঃসাহসিক কাজে অগ্রসর হয়েছেন? আপনি যদি শুরুতে এই ট্যাবলেট সেবন না করতেন, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার সন্তান হতো। যমীনে পোকামাকড় নিধনে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। আপনি তো আপনার স্ত্রী-নামক যমীনে কীটনাশক প্রয়োগ করেছেন, কীভাবে সন্তান হবে? সন্তান প্রজননের সবকিছু তো মারা গেছে। ইসলাম শর্তসাপেক্ষে সাময়িকভাবে গর্ভরোধের অনুমতি দিয়েছে আর আপনি শুরুতেই গর্ভরোধ আরম্ভ করেছেন? এখন সারা জীবন সন্তানহীনতার গ্লানি নিয়ে আফসোস করতে থাকুন! আপনি তো টিভিতে বারবনিতা মেয়েদের অ্যাড দেখে এ কাজ করেছেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল a-এর কথা তো শুনেননি। পুরুষের বন্ধ্যাত্বের কারণ হলো বিলম্বে বিয়ে করা ও পর নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে শুক্রাণু নষ্ট করে ফেলা। নবী করীম a বলেছেন,يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّه أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّه لَه وِجَاءٌ ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন ছওম পালন করে। কেননা ছওম তার যৌনতাকে দমন করবে’।[8] 

সুধী পাঠক! উক্ত হাদীছে নবী করীম a যুবকদের বিয়ে করতে বলেছেন। আর যুবক বলা হয় ১৫ থেকে ৩০ বা ৩৩ বয়সের লোকদের; এরপরে ৪০ পর্যন্ত বয়সকে বলে পৌঢ়ত্ব, ৪০ থেকে মৃত্যু অবধি বয়সকে বলে বৃদ্ধ।[9] সন্তান যেন বেশি জন্মগ্রহণ করে এজন্য নবী a আপনাকে বলেছেন, যুবকাবস্থায় বিয়ে করতে আর আপনি বিয়ে করছেন ৩০ বা ৩৫ বয়সের ঊর্ধ্বে; আপনার কীভাবে সন্তান হবে? ডাক্তাররা বলেন, ‘৩০ ঊর্ধ্বে বয়স হলে শুক্রাণু ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে’।

এখন বলুন, বন্ধ্যা হওয়ার জন্য দায়ী কে? ইসলাম থেকে যতদূরে যাবেন, আপনার ক্ষতি ততবেশি হবে। তাই নিজেকে সুস্থ-সবল রাখতে ইসলামের দেওয়া অনুশাসনের গণ্ডিতে থাকা উচিত। কারণ আপনাকে তো সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তাআলা। আর তিনি ভালো করেই জানেন কীভাবে চললে মানুষ সুস্থ থাকবে। একটি আয়াত উল্লেখ করে লেখার ইতি টানছি,﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾ ‘রাসূল যা আদেশ করেন তা মান্য করো এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চই তিনি শাস্তি দানে কঠোর’ (আল-হাশর, ৫৯/৭)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২২ অক্টোবর, ২০১৮।

[2]. প্রাগুক্ত।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৮২।

[4]. আবূ দাঊদ, হা/৪৪৪২।

[5]. দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮।

[6]. প্রাগুক্ত।

[7]. দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৭ অক্টোবর, ২০১৮।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৬।

[9]. ফাতহুল বারী, ১২তম খণ্ড, হা/৫০৬৬।