র‍্যাগ-ডে সম্পর্কে ইসলাম
-মুহাম্মাদ জাহিদ হাসান *


সম্প্রতি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে এই বার্ষিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থী পরবর্তী ক্লাসে পড়ার সুযোগ পায়। যার ফলে শিক্ষার্থীরা আনন্দে পরবর্তী ক্লাসে পদার্পণ করে থাকে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, শিক্ষার্থীরা পরবর্তী ক্লাসে উঠার আগেই বর্তমান নতুন এক অপসংস্কৃতি পালন করতে শুরু করেছে, যাকে বলা হয় র‍্যাগ-ডে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবনের শেষ দিনটা স্মৃতিময় করে রাখতে এই অপসংস্কৃতি পালন করে থাকে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই র‍্যাগ-ডে নামক অপসংস্কৃতি আদৌ ইসলামের সাথে যায় কিনা? তাহলে চলুন আজ আমরা এই র‍্যাগ-ডে সম্পর্কে কিছু জেনে নিই।

র‍্যাগ-ডে অর্থ কী?

‘RAG’ শব্দের অর্থ গোলমাল বা হৈ-হুল্লোড় আর DAY হলো দিন। সুতরাং র‍্যাগ ডে’র অর্থ গিয়ে দাঁড়ায় ‘হৈ-হুল্লোড়ের দিন’ বা ‘গোলমালের দিন’। তবে সাম্প্রতিককালে RAG শব্দটির জন্য বেশ কয়েকটি BACRONYM ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন— RAISE AND GIVE, RAISE A GRAND, RAISING AND GIVING- যা কিনা বড় কোনো দাতব্য তহবিল গঠনের সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে।[1]

যদি র‍্যাগ ডে’র আভিধানিক অর্থ দেখি, তাহলে YOURDICTIONARY.COM অনুসারে র‍্যাগ ডে’র অর্থ হলো— A DAY ON WHICH UNIVERSITY STUDENTS DO SILLY THINGS FOR CHARITY, OFTEN THE CULMINATION OF RAG WEEK. অর্থাৎ, এমন একটি দিন যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছোটখাটো কিছু দাতব্য কাজ করে থাকে। সাধারণত সপ্তাহের শেষ দিন তারা এমনটি পালন করে।[2]

আবার OXFORD ENGLISH DICTIONARY অনুসারে শুধু RAG শব্দটির অর্থ হলো— RAG AS AN ACT OF RAGGING ESPECIALLY EXTENSIVE DISPLAY OF NOISY, DISORDERLY CONDUCT CARRIED OUT ON IN DEFIANCE OF AUTHORITY.

অর্থাৎ, এমন কোনো গোলমাল, বিরক্তিকর, হৈ-হুল্লোড়পূর্ণ দিন, যেদিন কর্তৃপক্ষকে দ্বন্দ্বার্থে আহ্বান করা হয় বা অবাধ্যতা প্রকাশ করার জন্য কোলাহলময়, বিশৃঙ্খল আচরণ বা কাজকর্ম করা হয়।[3]

র‍্যাগ-ডে প্রথম যেভাবে শুরু হয় :

দক্ষিণ আফ্রিকায় সর্বপ্রথম র‍্যাগ ডে পালন করা হয় ১৯২৫ সালে ইউভার্সিটি অব প্রিটোরিয়ায়। শিক্ষার্থীরা সেসময় রাস্তায় শোভাযাত্রা করতে বের হতো। যার প্রচলন আজ পর্যন্ত বিদ্যমান। যুক্তরাজ্যে র‍্যাগ-ডে উদযাপন করা হয় শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত দাতব্য সংস্থার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। নাইজেরিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে র‍্যাগ-ডে উদযাপন করা হয় শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত দাতব্য সংস্থার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। নাইজেরিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে র‍্যাগ-ডে পালন করা হয় স্বেচ্ছাসেবী দাতব্য কর্মকাণ্ড বা দরিদ্রদের জন্য তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে। আফ্রিকায় র‍্যাগ-ডে’কে বলা হয় JOOL (JOU ONBAATSUGTIGE OPOFFERING VIR LIEFDADIGHEID) যার অর্থ– ‘YOUR SELFLESS SACRIFICE FOR CHARITY.’ যা প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পালন করা হয়।[4]

আমাদের সমাজে র‍্যাগ-ডের বর্তমান অবস্থা :

আজ থেকে গত কয়েক বছর আগেও এই র‍্যাগ-ডে নামক শব্দটির সাথে আমাদের তেমন কোনো পরিচিত ছিল না কিন্তু সম্প্রতি আমাদের সমাজে এই র‍্যাগ-ডে নামক অপসংস্কৃতি এমনভাবে বিস্তার করেছে যা বলার বাইরে। শুরুর দিকে পাশ্চাত্যে র‍্যাগ-ডে অভাবী দরিদ্রদের জন্য তহবিল সংগ্রহের মধ্য দিয়ে কাজ করলেও আমাদের সমাজে যা দেখা যায় তা পুরোই উল্টো। কেননা আমাদের সমাজে যেভাবে র‍্যাগ-ডে পালন করা হয়, তা প্রাথমিক অবস্থার মতো নয়। আমাদের সমাজে স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে র‍্যাগ-ডে পালন হয়ে থাকে গান, বাজনা, হৈ-হুল্লোড়, রং মাখামাখি, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার মধ্য দিয়ে। যা সম্পূর্ণভাবে ইসলাম বহির্ভূত কাজ।

তাছাড়াও আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেখতে পাই যে, র‍্যাগ-ডে উদযাপনকালীন সময় ছেলে-মেয়েরা সাদা রঙের টি-শার্ট অথবা গেঞ্জি পরে একজন আরেকজনের গেঞ্জিতে মার্কার দিয়ে বিভিন্ন বাক্য লিখতে। তাদেরকে দেখি, পরস্পর একাকার হয়ে রং মাখামাখি করতে।

র‍্যাগ-ডের কিছু কুফল :

র‍্যাগ-ডে চলাকালীন একে অপরকে নানা ধরনের রং অথবা জরি দিয়ে থাকে এবং সেগুলো কারো চোখে অথবা মুখে লেগে থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

র‍্যাগ-ডে পালনকালীন সময় বড় বড় সাউন্ড বক্স দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গান-বাজনা বাজানো হয়, এতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে যারা বসবাস করে তারা নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। অসুস্থ কিংবা ছোট্ট শিশুদের ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হয়।

র‍্যাগ-ডে পালন করার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে চাঁদা উঠানো হয়। এতে দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বিপাকে পড়ে।

র‍্যাগ-ডে চলাকালীন সময় অনেক ছাত্র-ছাত্রী মাদকতার সংস্পর্শে আসে, যা একপর্যায়ে পরিবার এবং সমাজে টেনে নিয়ে আসে এক কালো অধ্যায়।

মাঝে মাঝে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গায় র‍্যাগ-ডে নিয়ে র‍্যালি বের হতে, এতে শত শত ছাত্র-ছাত্রীদের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে জনসাধারণের ভোগান্তি হয়।

র‍্যাগ-ডে-এর কারণে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশার সুযোগ হয় এবং যেনা-ব্যভিচারের পথ ‍উন্মোচিত হয়।

র‍্যাগ-ডে সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

র‍্যাগ-ডে পালন করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং একটি গর্হিত কাজ। কারণ প্রথমত, র‍্যাগ-ডে একটি বিজাতীয় সংস্কৃতি। বিজাতীয় সংস্কৃতি পালন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ A বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত (হয়ে যাবে)’।[5]

দ্বিতীয়ত, র‍্যাগ-ডে তে নানা ধরনের গান-বাজনা বাজানো হয় এবং নানা ধরনের মাদকদ্রব্য সেবন করা হয় আর এই গান-বাজনা ও মাদকদ্রব্য সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, রাসূল A বলেছেন, ‘অবশ্যই অবশ্যই আমার পরে এমন কিছু লোক আসবে যারা যেনা, রেশম, নেশাদার দ্রব্য ও গান-বাজনা বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে’।[6] রাসূল A আরও বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মদ, জুয়া ও সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন’।[7]

র‍্যাগ-ডে চলাকালীন নানা ধরনের যে গান-বাজনা বাজানো হয়, তাতে আশেপাশের মানুষদের নানা ধরনের কষ্ট হয়ে থাকে। নবী করীম A বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! কে সে লোক? তিনি বললেন, যে লোকের প্রতিবেশি তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না’।[8]

তৃতীয়ত, এর মাধ্যমে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশার সুযোগ তৈরি হয় এবং যেনা-ব্যভিচারের পথ ‍উন্মোচিত হয়। রাসূল A বলেন, ‘দু’চোখের যেনা হলো দৃষ্টিপাত করা, দু’কানের যেনা হলো শ্রবণ করা, জিহ্বার যেনা হলো কথোপকথন করা, হাতের যেনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের যেনা হলো হেঁটে যাওযা, অন্তরের যেনা হলো আকৃষ্ট ও বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান তা বাস্তবায়িত করে এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করে’।[9]

এছাড়াও সেখানে মেয়েদের দেখা যায় ইসলাম পরিপন্থী ওয়েস্টার্ন পোশাক পরতে। অথচ তাদেরকে আপাদমস্তক ঢেকে বের হতে বলা হয়েছে।[10]

আল্লাহ আমাদের এসব ফেতনা থেকে হেফাযত করুন- আমীন!


* এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী, সরকারি মোল্লারটেক উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণখান, ঢাকা।

[1]. HTTPS://NEWSVIEWS.MEDIA/RAG-DAY-PREVIOUS-PRESENT/

[2]. HTTPS://NEWSVIEWS.MEDIA/RAG-DAY-PREVIOUS-PRESENT/

[3]. HTTPS://NEWSVIEWS.MEDIA/RAG-DAY-PREVIOUS-PRESENT/

[4]. HTTPS://NEWSVIEWS.MEDIA/RAG-DAY-PREVIOUS-PRESENT/

5. আহমাদ, ২/৫০; আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১, হাদীছ ছহীহ।

  1. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৯০।
  2. বায়হাক্বী, মিশকাত, হা/৪৫০৩।
  3. 8. ছহীহ বুখারী, হা/৬০১৬।
  4. 9. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৭।
  5. 10. দ্রষ্টব্য: সূরা আল-আহযাব, ৩৩/৫৯।