লোক দেখানো আমলের পরিণতি


ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর*
(অক্টোবর’২১ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(পর্ব-৪)


যারা লোক দেখানোর জন্য বা মানুষকে শুনানোর জন্য আমল করবে, তাদেরকে পরিশেষে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ এরূপ কাজকে ইসলামে শিরক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন কর্মে আল্লাহর সন্তুষ্টি মূল উদ্দেশ্য থাকে না। আর শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত না হলে তিনি তা কবুল করবেন না। প্রতিটি ইবাদতের মূল লক্ষ্যই হবে প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আবূ উমামা বাহেলী (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন, ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনি কী বলেন, যে ছওয়াব ও সুনামের জন্য জিহাদ করে? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। সে ব্যক্তি তা তিন বার পুনরাবৃত্তি করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। তারপর তিনি বললেন,

إِنَّ اللَّهَ لاَ يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلاَّ مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا وَابْتُغِىَ بِهِ وَجْهُهُ

‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কোনো আমল কবুল করবেন না, যদি তাঁর জন্য তা খালেছ হৃদয়ে ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য না করা হয়’।[1] বিধায় লৌকিকতা প্রদর্শনী বা সুনাম অর্জনের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি জন্যই সকল ইবাদত করা উচিত। সর্বাগ্রে হৃদয়কে শিরকী আক্বীদা হতে মুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন।

সুধি পাঠক! রিয়া এবং সুমআ তথা মানুষকে দেখানো কিংবা সুনাম অর্জনের জন্য আমল করার বিষয়টি খুবই ভয়াবহ। যার শেষ পরিণাম জাহান্নাম। অথচ মানুষ এ অপরাধটি করতে কোনো দ্বিধাই করে না। বহু মুসলিম কেবল প্রদর্শনীর জন্যই ইবাদত করে থাকে। এক শ্রেণির মানুষকে সারা বছর ইবাদতের ধারেকাছেও দেখা যায় না। অথচ নির্বাচনের প্রাক্কালে টুপি, বাহারি পাঞ্জাবি ও পায়জামায় নিজেকে খাঁটি মুসলিম হিসেবে তুলে ধরে। তাদের সালামের ধরনও পরিবর্তন হয়ে যায়। আবার এক শ্রেণির আলেম নিজেকে তাক্বওয়াবান হিসেবে অনেক বড় করে যাহির করে। নিজের পরহেযগারিতা ও সততার বিবরণ তুল ধরতে পঞ্চমুখর হয়। অথচ তার মধ্যে তাক্বওয়ার লেশমাত্র নেই। স্রেফ লৌকিকতা তার মূল উদ্দেশ্য। তার কথা-কর্মের মধ্যে থাকে বিস্তর ব্যবধান। তার বায়ান শুনে মনে হবে যেন এ কেবলই আকাশ থেকে নেমে এসেছে। কিন্তু তার ব্যক্তিজীবন পরখ করলে দেখা যাবে সম্পূর্ণই উল্টো চিত্র। যেন বয়ানগুলো ছিল কেবল মানুষের জন্য; তার নিজের জন্য নয়।

আর কুরবানী কেন্দ্রীক রিয়া ও সুমআ তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। এলাকার মধ্যে সেরা কুরবানীটি কেনার জন্য চলে রমরমা প্রতিযোগিত। কেউ দাম শুনতে না চাইলে ছলেবলে কৌশলে তাকে পশুটির দাম শুনাতেই হবে। আর গোশত কতটুকু হয়েছে সেটি অন্যকে না শুনালে যেন কুরবানীই বৃথা। কারো সাথে আলাপচারিতায় প্রথমেই থাকে নিজের ক্রয়কৃত কুরবানীর প্রশংসনীয় বিবরণ। কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। কিন্তু তাদের এর মাধ্যমে উদ্দেশ্য হলো নিজের সুনাম ও খ্যাতি সর্বমহলে ছড়িয়ে দেওয়া। অথচ এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন,

﴿لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ﴾

‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না ওগুলোর (কুরবানী কৃত পশুর) গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাক্বওয়া’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৭)

কতক দানশীলকে দেখা যায়, সে দানের প্রতিযোগিতায় লেগেছে। নিজেকে বড় দানবীর হিসেবে প্রকাশ করাই যেন মূল লক্ষ্য। তার দানের পূর্ণ বিবরণের ঘোষণা দিতে ত্রুটি হলে ঘোষককে একহাত দেখিয়ে ছেড়ে দেন। দুই ঈদে এবং বিভিন্ন দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণে এদের দেখা মিলে বেশি। তারা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে কথায় কথায় নিজের দানের বিষয় তুলে ধরে। যা দান করে তার প্রচারকে বেশি করে ভালোবাসে। আবার অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সভা-সমাবেশে নিজেকে যাহির করার জন্য পদ চেয়ে নেয়। এরূপ ব্যক্তিরা পোস্টার, লিফলেট কিংবা বিজ্ঞাপনে নিজের নাম, পদবি বা ডিগ্রি প্রচার করতে ব্যস্ত থাকে। নাম, পদবি বা ডিগ্রির বিবরণ লিখতে একটু উলট-পালট হয়ে গেলে উক্ত সমাবেশে না আসার হুংকার ছাড়ে। কখনোবা কর্তৃপক্ষকে দ্বিতীয়বার বিজ্ঞাপন ছাপাতে বাধ্য করে।

আবার এক শ্রেণির মুসলিম নিজেকে ফেমাস করার জন্য ব্যতিব্যস্ত। ছোট থেকে ছোট প্রতিটি বিষয়ই ফেসবুক, টুইটার, ম্যাসেঞ্জারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেই মশগূল থাকে। অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় বিষয় সকলকে জানাতেও ভুলে না। কেননা সেগুলোতে তার খ্যাতি জড়িত থাকে। এরূপ সেলফিপ্রেমিক ব্যক্তিরা স্বীয় মৃত আপনজনের লাশের সাথে সেলফি তুলে প্রচার করতে ছাড়ে না। হজ্জ ও উমরা করতে গিয়ে কা‘বাঘরকে ঘিরেও চলে তাদের বাহারি সেলফির আমেজ। জামরায় পাথর মারার সময় সেলফি তোলা বাদ পড়ে না। এক শয়তান তাড়ানোর সুন্নাত জাগ্রত করতে গিয়ে আরেক শয়তানকে মনের মধ্যে জায়গা করে দেয়। এরা সেলফি তোলার জন্য মেকি ছালাতের ভঙ্গিও ধারণ করে। কেউ কেউ কুরবানীর পশুর সাথেও সেলফি তুলতে দ্বিধাবোধ করে না। অনেকে ফেমাস হতে গিয়ে ভয়ংকর দৃশ্যের সাথেও সেলফিতে নিজেক বন্দি করতে চায়। ফলে এই সেলফির বিষাক্ত ছোবলে অনেকের জীবনের পরিসমাপ্তি পর্যন্ত ঘটে। সেলফি বর্তমানে এক প্রকার নেশায় রূপ নিয়েছে।

প্রিয় পাঠক! উল্লিখিত বিষয়গুলো একটু গভীর মনে ভাবলে দেখা যায় বর্তমান সমাজের চিত্র কতটা করুণ। রিয়া বা সুমআ তথা লৌকিকতার কবল থেকে বেঁচে আছে খুব কমসংখ্যক ব্যক্তি। আলেম, ওলামা, হাজী, গাজী, মোল্লা, মুনশী, সাধারণ শিক্ষিত, মাস্টার, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার কেউ রিয়া-সুমআ থেকে নিরাপদ নয়। সকলেই এ বিষয়ে বিপাকে রয়েছে। তবে যাদের আল্লাহ হেফাযত করেছেন তাদের কথা ভিন্ন। যারা খালেছ অন্তরে সঠিক পন্থায় সৎ আমল সম্পাদন করে তারা নিরাপদ। তাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত।

শিরকের ভয়াবহ পরিণাম :

শিরক এক ভয়ংকর ও জঘন্য অপরাধ। যার শেষ পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। জীবনের যাবতীয় কৃত সৎআমলকে ধ্বংস করে দেয়। যখন কোনো ব্যক্তি শিরক করে বসে তখনই তার সব আমল বরবাদ হয়ে যায়। কোনো আমল অবশিষ্ট থাকে না। ফলে ঐ লোকটি চরম ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে বলেন,

﴿وَلَوْ أَشْرَكُوْا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ﴾

‘তারা যদি শিরক করে, তাহলে তারা যা আমল করেছে সবই বাতিল হয়ে যাবে’ (আল-আনআম, ৬/৮৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে হুঁশিয়ার করে আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنْ الْخَاسِرِيْنَ﴾

‘আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শরীক করেন, তবে আপনার আমল (কাজ-কর্ম) নিষ্ফল হয়ে যাবে। আর আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন’ (আয-যুমার ৩৯/৬৫)

শিরককারীর সকল সৎআমল বাতিল বলে গণ্য হবে। বিধায় তার শেষ পরিণাম তো আর ভালো হওয়ার সুযোগ নেই। তার কোনো আমলই অবশিষ্ট নেই। ফলশ্রুতিতে তার চূড়ান্ত ঠিকানা হবে জাহান্নামে। এ মর্মে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

﴿إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنصَارٍ﴾

‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার স্থান হবে জাহান্নাম। আর এরূপ অত্যাচারীর জন্য কোনো সাহায্যকারী থাকবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/৭২)

উপরের আয়াতে কারীমার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শিরককারীর জন্য জান্নাত হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেননি যে, তাকে জান্নাতে দেব না বা জাহান্নামে দেব। বরং বলেছেন, তার জন্য জান্নাত হারাম। আর এরূপ নিকৃষ্ট ব্যক্তির অবধারিত ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম। সে যালিমদের অন্তর্ভুক্ত, ফলে সেদিন তার কোনো সাহয্যকারীও থাকবে না। শিরক জান্নাত ও জাহান্নামের মূল পার্থক্যকারী বিষয়। শিরক না করলে জান্নাত, আর শিরক করলে জাহান্নাম। যেমন হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, জাবের (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করে মারা যাবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি শরীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[2] জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[3] অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে— আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) একটি কথা বললেন, আর আমি একটি বললাম। নবী করীম (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে তাঁর সমকক্ষ হিসেবে আহ্বান করা অবস্থায় মারা যায়, সে জাহান্নামে যাবে। আর আমি বললাম, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সমকক্ষ হিসেবে আহ্বান না করা অবস্থায় মারা যায়? (তিনি বললেন), সে জান্নাতে যাবে।[4] আবূ হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنْ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ

‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি অংশীদারদের অংশীদারিত্ব হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো কাজ করে আর ঐ কাজে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, তাহলে আমি ঐ শিরককারী ও তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি’।[5] অন্য বর্ণনায় রয়েছে,

فَأَنَا مِنْهُ بَرِىءٌ وَهُوَ لِلَّذِى أَشْرَكَ

‘আমি তার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং তার সম্পর্ক ঐ ব্যক্তির সাথে, যার সাথে সে শিরক করেছে’।[6]

উক্ত হাদীছগুলোতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, শিরককারীর জন্য জান্নাত হারাম। তাকে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে বসবাস করতে হবে। তার জান্নাতে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না। তবে মৃত্যুর পূর্বে খালেছ অন্তরে তওবা করার কারণে আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন। অন্যথা সে জাহান্নামেই চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। কেননা মহান আল্লাহ শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। বিধায় কেউ তার শরীক স্থাপন করলে তিনি তাকে তার শিরকসহ বর্জন করেন।

নিয়্যত অনুসারে সকল আমলের প্রতিদান পাওয়া যাবে :

মানুষের প্রতিটি কাজ নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি যা নিয়্যত করবে সে অনুরূপই ফলাফল পাবে। তাই বলা হয়ে থাকে, নিয়্যতগুণে বরকত হয়। কিংবা যেমন কর্ম তেমন ফল। এমর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ – أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾

‘যারা পার্থিব জীবন ও তার সাজসজ্জা চায়, আমি তাদের কৃতকর্মের ফল পূর্ণভাবে দুনিয়াতেই দিয়ে দিব। এতটুকুও তাদেরকে কম দেওয়া হবে না। এরা এমন যে, আখেরাতে তাদের জন্য জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাদের সকল আমল তখন অকেজো এবং নিষ্ফল বলে বিবেচিত হবে’ (হূদ, ১১/১৫-১৬)। তিনি অন্য আয়াতে বলেন,

﴿مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَنْ نُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَدْحُورًا﴾

‘কোনো ব্যক্তি পার্থিব কোনো সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে ইচ্ছা এবং যা ইচ্ছা অতিসত্বর দিয়ে থাকি। অতঃপর আমি তার জন্য নির্ধারিত করে রাখি জাহান্নাম, যাতে সে প্রবেশ করবে অপমানিত ও লাঞ্ছিতভাবে’ (বানী ইসরাঈল, ১৭/১৮)। উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ

‘প্রত্যেক কাজ নিয়্যতের উপরই নির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষের জন্য তাই-ই রয়েছে, যার জন্য সে সংকল্প করেছে। সুতরাং যার হিজরত দুনিয়লাভের আশায় কিংবা কোনো মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হয়েছে, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হয়েছে যার জন্য সে হিজরত করেছে’।[7] জাবের (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى نِيَّاتِهِمْ ‘মানুষকে তাদের নিয়্যত অনুসারে হাশরের ময়দানে একত্র করা হবে’।[8] আরো একাধিক বর্ণনায় রয়েছে যে, ‘শেষ দিবসে নিয়্যত অনুযায়ী মানুষকে উঠানো হবে’।[9]

আবূ হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)! জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করতে চায়। অথচ তার উদ্দেশ্য দুনিয়া কামানো। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, তার কোনো ছওয়াব হবে না। লোকটি তাঁকে তিন বার এ কথাটি জিজ্ঞেস করলেন। আর তিনি প্রত্যেকবারই একই উত্তর দিলেন।[10] ক্বাতাদা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

من كانت الدّنيا همّه ونيّته وطلبته جازاه اللّه بحسناته في الدّنيا ثم يفضي إلى الآخرة وليس له حسنة يعطى بها جزاء وأما المؤمن فيجازى بحسناته في الدّنيا ويثاب عليها في الآخرة

‘দুনিয়াই যার আশা, ভরসা, চাওয়া ও পাওয়া হবে, আল্লাহ তাআলা তার সকল নেক আমলের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দিবেন। আখেরাতের জন্য একটি সৎআমলও তার জন্য গচ্ছিত রাখা হবে না। তবে খাঁটি ঈমানদার তার সৎআমলের ফল দুনিয়াতেও পাবে, আখেরাতেও পাবে’।[11]

মানুষের নিয়্যত অনুসারে প্রতিদান প্রদান করা হবে। বিশুদ্ধ নিয়্যতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করলে পুরোপুরি প্রতিদান পাবে। আর মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে খুশি করার জন্য বা লোক দেখানোর নিয়্যতে আমল করলে সবই বিফলে যাবে। ফলে বিচারের কঠিন দিবসে ক্ষতিগ্রস্তদের কাতারে শামিল হবে।

 (চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. নাসাঈ, হা/৩১৪০; আল-মুসনাদুল জামে‘, হা/৫৩৩৪; ছহীহ আত-তারগীব, হা/১৩৩১; সিলসিলা ছহীহা, হা/৫২, সনদ ছহীহ।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৯, ১/৬৬; মিশকাত, হা/৩৮।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮০, ৯৩; মিশকাত, হা/৩৮।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৯৭; মুসনাদে আহমাদ, হ/৩৫৫২।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৬৬৬; মিশকাত, হা/৫৩১৫।

[6]. ইবনু মাজাহ, হা/৪২০২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৯৮৭; ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/৯৩৮; মিশকাত, হা/৫৩১৫, সনদ ছহীহ।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫০৩৬; মিশকাত, হা/১।

[8]. ইবনু মাজাহ, হা/৪২৩০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯০৭৯; কানযুল উম্মাল, হা/৭২৪৫; ছহীহুল জামে‘, হা/৮০৪২, সনদ ছহীহ।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/২১১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪২৬; মিশকাত, হা/২৭২০।

[10]. আবূ দাঊদ, হা/২৫১৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৮৮৭; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪৬৩৭; মিশকাত, হা/৩৮৪৫, সনদ ছহীহ।

[11]. মুহাম্মাদ আলী আছ-ছাবূনী, ছাফওয়াতুত তাফাসীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৬; আত-তাফসীরুল মুনীর লিয-যুহাইলী, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৩৮।