শবেবরাত পালন করা বিদআত


-অধ্যাপক ওবায়দুল বারী বিন সিরাজউদ্দীন*


ভূমিকা :

‘শব’ ফারসী শব্দ, এর অর্থ রাত। ‘বারায়াত’-কে যদি আরবী শব্দ ধরা হয়, তাহলে এর অর্থ হচ্ছে সম্পর্কচ্ছেদ, পরোক্ষ অর্থে মুক্তি। যেমন কুরআন মাজীদে সূরা বারায়াত রয়েছে যা সূরা তওবা নামেও পরিচিত। ইরশাদ হয়েছে, ﴿بَرَاءَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ﴾ ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা’ (আত-তওবা, ৯/১)। ‘বারায়াত’ শব্দটি যদি ফারসী শব্দ ধরা হয়, তাহলে এর অর্থ হবে সৌভাগ্য। অতএব শবেবরাত শব্দটার অর্থ দাঁড়ায় মুক্তির রজনি, সম্পর্ক ছিন্ন করার রজনি অথবা সৌভাগ্যের রাত।

শবেবরাত শব্দটাকে যদি আরবীতে তরজমা করতে চান তাহলে বলতে হবে ‘লায়লাতুল বারায়াত’। এখানে বলে রাখা ভালো যে, এমন অনেক শব্দ আছে যার রূপ বা উচ্চারণ আরবী ও ফারসী ভাষায় একই রকম, কিন্তু অর্থ ভিন্ন। যেমন ‘গোলাম’ শব্দটি আরবী ও ফারসী উভয় ভাষায় একই রকম লেখা হয় এবং একইভাবে উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু আরবীতে এর অর্থ হলো কিশোর আর ফারসীতে এর অর্থ হলো দাস।

সার কথা হলো, ‘বারায়াত’ শব্দটিকে আরবী শব্দ ধরা হলে এর অর্থ সম্পর্কচ্ছেদ বা মুক্তি। আর ফারসী শব্দ ধরা হলে অর্থ হবে সৌভাগ্য। আল-কুরআনে শবেবরাতের কোনো উল্লেখ নেই। শবেবরাত বলুন আর লায়লাতুল বারায়াত বলুন কোনো আকৃতিতে শব্দটি কুরআন মাজীদে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

শবেবরাত নামটি হাদীছে কোথাও উল্লেখ আছে কি?

প্রশ্ন থেকে যায়, হাদীছে কি লায়লাতুল বরায়াত বা শবেবরাত নেই? সত্যিই হাদীছের কোথাও আপনি শবেবরাত বা লায়লাতুল বারায়াত নামের কোনো রাতের নাম খুঁজে পাবেন না। যে সকল হাদীছে এ রাতের কথা বলা হয়েছে তার ভাষা হলো ‘লায়লাতুন নিছফ মিন শা‘বান’ অর্থাৎ মধ্য শা‘বানের রাত্রি। শবেবরাত বা লায়লাতুল বারায়াত শব্দ আল-কুরআনে নেই; রাসূল

a
-এর হাদীছেও নেই। এটা মানুষের বানানো একটা শব্দ। ভাবলে অবাক লাগে যে, একটি বানোয়াট প্রথা ইসলামের নামে ভারতবর্ষে শত শত বছর ধরে পালন করা হচ্ছে অথচ এর আলোচনা আল-কুরআনে নেই; ছহীহ হাদীছেও নেই। অথচ আপনি দেখতে পাবেন যে, সামান্য নফল আমলের ব্যাপারেও হাদীছের কিতাবে এক একটি অধ্যায় বা শিরোনাম লেখা হয়েছে।

ফিক্বহের কিতাবে শবেবরাত :

শবেবরাতের কথা শুধু আল-কুরআনে কিংবা ছহীহ হাদীছে নেই এমন না, বরং আপনি ফিক্বহের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলো পড়ে দেখুন, কোথাও শবেবরাত নামের কিছু পাবেন না। বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশে দ্বীনী মাদরাসাগুলোতে ফিক্বহের যে সিলেবাস রয়েছে যেমন মা-লা-বুদ্দা মিনহু, নূরুল ইযাহ, কুদূরী, কানযুদ দাকায়েক, শরহে বেকায়া ও হেদায়াহ খুলে দেখুন! কোথাও শবেবরাত নামের কিছু পাওয়া যায় কিনা! অথচ আমাদের পূর্বসূরী ফিক্বহবিদগণ ইসলামের অতি সামান্য বিষয়গুলো আলোচনা করতেও কোনো ধরনের কার্পণ্য দেখাননি। তারা সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণের ছালাত সম্পর্কেও অধ্যায় রচনা করেছেন। অনুচ্ছেদ তৈরি করেছেন কবর যিয়ারতের মতো বিষয়েরও। শবেবরাতের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর সামান্যতম ইশারা থাকলেও ফিক্বহবিদগণ এর আলোচনা, মাসআলা-মাসায়েল অবশ্যই বর্ণনা করতেন।

অতএব, এ রাতকে শবেবরাত বা লায়লাতুল বারায়াত অভিহিত করা মানুষের বানানো একটি বিদআত, যা কুরআন বা হাদীছ দ্বারা সমর্থিত নয়।

শবেবরাত সম্পর্কিত প্রচলিত আক্বীদা ও আমল :

শবেবরাত যারা পালন করেন, তারা শবেবরাত সম্পর্কে যে সকল ধারণা পোষণ করেন ও এটাকে উপলক্ষ্য করে যে সকল কাজ করে থাকেন, তার কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

তারা বিশ্বাস করে যে, শবেবরাতে আল্লাহ তাআলা সকল প্রাণীর এক বছরের রিযিক্ব বরাদ্দ করে থাকেন। এই বছর যারা মারা যাবে ও যারা জন্ম নিবে, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ রাতে বান্দার পাপ ক্ষমা করা হয়। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগী করলে সৌভাগ্য অর্জিত হয়। এ রাতে কুরআন মাজীদ লাওহে মাহফূয হতে প্রথম আকাশে নাযিল করা হয়েছে। এ রাতে গোসল করাকে ছওয়াবের কাজ মনে করা হয়। মৃত ব্যক্তিদের রূহ এ রাতে দুনিয়ায় তাদের সাবেক গৃহে আসে। এ রাতে হালুয়া রুটি তৈরি করে নিজেরা খায় ও অন্যকে দেওয়া হয়। বাড়িতে বাড়িতে মীলাদ পড়া হয়। আতশবাজি করা হয়। সরকারি-বেসরকারি ভবনে আলোকসজ্জা করা হয়। সরকারি ছুটি পালিত হয়। পরের দিন ছিয়াম পালন করা হয়। কবরস্থানগুলো আগরবাতি ও মোমবাতি দিয়ে সজ্জিত করা হয়। লোকজন দলে দলে কবরস্থানে যায়। মাগরিবের পর থেকে মসজিদগুলো লোকে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। যারা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে ও জুমআয় মসজিদে আসে না, তারাও এ রাতে মসজিদে আসে। মসজিদগুলোতে মাইক চালু করে ওয়ায-নছীহত করা হয়। শেষ রাতে সমবেত হয়ে দু‘আ-মুনাজাত করা হয়। বহু লোক এ রাতে ঘুমানোকে অন্যায় মনে করে থাকে। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ১২ রাকআত থেকে শুরু করে ১০০ রাকআত এমনকি হাজার রাকআত ইত্যাদি নফল ছালাত আদায় করা হয়!

লোকজন ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করে, ‘হুজুর! শবেবরাতের ছালাতের নিয়ম ও নিয়্যতটা একটু বলে দিন।’ ইমাম সাহেব আরবী ও বাংলায় নিয়্যত বলে দেন। কীভাবে ছালাত আদায় করবে, কোন রাকআতে কোন সূরা তেলাওয়াত করবে তাও বলে দিতে আমাদের সম্মানিত আলেম নামধারী ইমামগণ কৃপণতা করেন না। আর যদি এ রাতে কোনো ইমাম সাহেব বা মুআযযিন সাহেব কোনো মসজিদে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তাদের চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়!

একটি বিষয় হলো, শবেবরাত সম্পর্কে যে সকল ধর্মবিশ্বাস বা আক্বীদা পোষণ করা হয়, তা কিন্তু কোনো দুর্বল হাদীছ দ্বারাও প্রমাণিত হয় না। যেমন ভাগ্যলিপি ও বাজেট প্রণয়নের বিষয়টি। যারা বলেন, আমলের ফযীলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীছ গ্রহণ করা যায়। অতএব এর উপর ভিত্তি করে শবেবরাতে আমল করা যায়। তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, তাহলে শবেবরাতের আক্বীদা সম্পর্কে কি দুর্বল হাদীছেরও দরকার নেই?

শবেবরাত শুধু আমলের বিষয় নয়; আক্বীদারও বিষয়। ১৫ শা‘বান রাতে শবেবরাত সম্পর্কে এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তাআলা এ রাতে আল-কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, তিনি এ রাতে মানুষের হায়াত, রিযিক্ব ও ভাগ্যের ফয়ছালা করে থাকেন, এ রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত হলে আল্লাহ হায়াত ও রিযিক্ব বাড়িয়ে সৌভাগ্যশালী করেন ইত্যাদি আক্বীদা কি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রতি মিথ্যা আরোপ করার মতো অন্যায় নয়? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,﴿وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ﴾ ‘তার চেয়ে বড় যালেম আর কে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে?’ (আছ-ছফ, ৬১/৭)

মধ্য শা‘বানের রজনি সম্পর্কিত হাদীছসমূহ পর্যালোচনার সারকথা :

১৫ শা‘বানের রজনির ফযীলত সম্পর্কিত হাদীছসমূহের একটি হাদীছও ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়নি। মধ্য শা‘বানের রজনি সম্পর্কিত হাদীছসমূহ পর্যালোচনার সারকথা হলো, ১৫ শা‘বান সম্পর্কে যত হাদীছ আছে, তাতে শবেবরাত হিসাবে এ রাতকে কথিত লায়লাতুল বারায়াত বা ক্বদরের রাত হিসেবে সাব্যস্ত করার কোনো দলীল নেই।

শবেবরাত সম্পর্কিত হাদীছের কোনো একটি দ্বারাও প্রমাণিত হয়নি যে, ১৫ শা‘বানের রাতে আল্লাহ তাআলা আগামী এক বছরে যারা ইন্তেকাল করবে, যারা জন্মগ্রহণ করবে, কে কী খাবে সেই ব্যাপারে ফয়ছালা করেন। যদি থাকেও তাহলে তা আল-কুরআনের বক্তব্যের বিরোধী হওয়ায় গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আল-কুরআনের স্পষ্ট কথা হলো, এ বিষয়গুলোর ফয়ছালা হয় লায়লাতুল ক্বদরে। এ সকল হাদীছের কোথাও বলা হয়নি যে, এ রাতে মৃত ব্যক্তিদের আত্মা তাদের গৃহে আসে। বরং এটি একটি প্রচলিত বানোয়াট কথা। মৃত ব্যক্তির আত্মা কোনো কোনো সময় গৃহে ফিরে আসার ধারণাটা হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাস। এ সকল হাদীছের কোথাও একথা নেই যে, আল্লাহর রাসূল a ও ছাহাবায়ে কেরাম n এ রাতে গোসল করেছেন, মসজিদে উপস্থিত হয়ে নফল ছালাত আদায় করেছেন, যিকির-আযকার করেছেন, কুরআন তেলাওয়াত করেছেন, সারা রাত জাগ্রত থেকেছেন, ওয়ায-নছীহত করেছেন কিংবা অন্যদের এ রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে উৎসাহিত করেছেন অথবা শেষ রাতে জামাআতের সাথে সম্মিলিত দু‘আ-মুনাজাত করেছেন। এ হাদীছসমূহের কোথাও একথা নেই যে, আল্লাহর রাসূল a বা ছাহাবায়ে কেরাম n এ রাতে সাহারী খেয়ে পরের দিন ছিয়াম পালন করেছেন। আলোচিত হাদীছসমূহে কোথাও একথা নেই যে, আল্লাহর রাসূল a বা ছাহাবায়ে কেরাম n বা খুলাফায়ে রাশেদীন বা তাবেঈন বা তাবে-তাবেঈন বা ইমামগণ কেউ এ রাতে হালুয়া-রুটি বা ভালো খানা তৈরি করে বিলিয়েছেন, বাড়িতে বাড়িতে যেয়ে মীলাদ পড়েছেন। এ সকল হাদীছের কোথাও নেই যে, আল্লাহর রাসূল a বা ছাহাবায়ে কেরাম n এ রাতে দলে দলে কবরস্থানে গিয়ে কবর যিয়ারত করেছেন কিংবা কবরে মোমবাতি জ্বালিয়েছেন। এমনকি আল্লাহর রাসূল a-এর যুগ বাদ দিলে খুলাফায়ে রাশেদীনের ৩০ বছরের ইতিহাসেও কি এর কোনো একটা আমল পাওয়া যাবে?

যদি না যায়, তাহলে শবেবরাত সম্পর্কিত এ সকল আমল ও আক্বীদা কি বিদআত নয়? এ বিদআত সম্পর্কে উম্মাতে মুহাম্মাদীকে সতর্ক করার দায়িত্ব কারা পালন করবেন? এ দায়িত্ব পালন করতে হবে আলেম-উলামার, দ্বীন প্রচারক, মসজিদের ইমাম ও খত্বীবদের। যে সকল বিষয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের ইশারা নেই, সে সকল আমল থেকে সাধারণ মুসলিম সমাজকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করতে হবে নবী-রাসূলগণের উত্তরসূরী সম্মানিত আলেমদের।

সৌভাগ্য রজনি ধর্ম বিকৃতির শামিল :

দ্বীন ইসলামে সৌভাগ্য রজনি বলতে কিছু নেই। নিজেদের সৌভাগ্য রচনার জন্য কোনো অনুষ্ঠান বা ইবাদত-বন্দেগী ইসলামে অনুমোদিত নয়। শবেবরাতকে সৌভাগ্য রজনি বলে বিশ্বাস করা একটি বিদআত তথা ধর্মে বিকৃতি ঘটানোর শামিল। এ ধরনের বিশ্বাস হিন্দু ধর্ম থেকে এসেছে। তারা সৌভাগ্য লাভের জন্য গনেশপূজাসহ আরো কত কী করে থাকে!

সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ বাদ দিয়ে এবং সারা জীবন ছালাত-ছিয়াম-যাকাত ত্যাগ করে শুধু একটি রাতে মসজিদে উপস্থিত হয়ে রাত জেগে ভাগ্য বদল করে সৌভাগ্য হাছিল করে নিবেন এমন ধারণা ইসলামে একটি হাস্যকর ব্যাপার। নবী করীম a-এর মৃত্যুর পর যে সমস্ত নতুন আচার-অনুষ্ঠান, কাজ ও বিশ্বাস ধর্মের আচার বলে চালিয়ে দেওয়া হবে, তা সবগুলো প্রত্যাখ্যাত বিদআত বলেই পরিগণিত হবে, তার প্রচলনকারী যে কেউ হোক না কেন এবং উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক না কেন। ছাহাবায়ে কেরাম n ও তাদের পরবর্তী উলামায়ে ইসলাম এ ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন বলে তারা বিদআতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন ও বিদআতের ব্যাপারে অন্যদের সতর্ক করেছেন।

এ ধারাবাহিকতায় উলামায়ে কেরাম মধ্য শা‘বানের রাত উদযাপন ও ওই দিন ছিয়াম পালন করাকে বিদআত বলেছেন। কারণ এ বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আমল করা যেতে পারে এমন কোনো দলীল নেই। যা আছে, তা হলো কিছু দুর্বল হাদীছ- যার উপর ভিত্তি করে আমল করা যায় না। উক্ত রাতে ছালাত আদায়ের ফযীলতের যে সকল হাদীছ পাওয়া যায়, তা বানোয়াট। এ ব্যাপারে হাফেয ইবনু রজব p তার কিতাব ‘লাতায়েফুল মাআরেফ’-এ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

সুধী পাঠক! শবেবরাত এমনই একটা বিষয়, যা আমরা ভারত উপমহাদেশের লোকেরা মহা ধুমধামে উদযাপন করছি, কিন্তু অন্য এলাকার মুসলিমদের কাছে এ সম্পর্কে কোনো খবর নেই। কী আশ্চর্য! এমন এক মহা নিয়ামত যা মক্কা-মদীনার লোকেরা, অন্য আরবরা, আফ্রিকানরা, ইন্দোনেশীয়, মালয়েশিয়ানরা, ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ানরা মহাদেশের লোকেরা পেল না; অথচ ভাগ্যক্রমে সৌভাগ্যের মহান রাত পেয়ে গেলাম আমরা ভারতবর্ষের কিছু লোকেরা ও শীআ মতাবলম্বীরা!

শবেবরাত সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের :

ইসলাম ধর্মে যতগুলো বিদআত চালু হয়েছে তা কিন্তু সাধারণ মানুষ বা কাফের-মুশরিকদের মাধ্যমে প্রসার ঘটেনি। এটার প্রসারের জন্য দায়ী যেমন এক শ্রেণি আলেম, তেমনি উলামায়ে কেরামই যুগে যুগে বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, জেল-যুলম বরদাশত করেছেন।

তাই বিদআত যে নামেই প্রতিষ্ঠা লাভ করুক না কেন, এটার বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করতে হবে আলেমদেরকেই। তারা যদি এটা না করে কারো অন্ধ অনুসরণ বা অনুকরণ করেন, বিভ্রান্তি ছড়ান বা কোনো বিদআতী কাজ-কর্ম প্রসারে ভূমিকা রাখেন, তাহলে এ জন্য তাদেরকে আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে। যে দিন বলা হবে, ﴿وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ﴾ ‘আর সে দিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা রাসূলদের আহ্বানে কীভাবে সাড়া দিয়েছিলে?’ (আল-ক্বাছাছ, ২৮/৬৫)। সেদিন তো এ প্রশ্ন করা হবে না যে, তোমরা অমুক পীরের মত অনুযায়ী বা অমুক ইমামের মত অনুযায়ী আমল করেছিলে কিনা। সুতরাং যারা ছহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করবে তারাই সেদিন সফলকাম হবে।

একটি বিভ্রান্তির নিরসন :

১৫ শা‘বানে দিনের ছিয়াম ও রাতের ইবাদত-বন্দেগী, কুরআন তেলাওয়াত, নফল ছালাত, কান্নাকাটি, দু‘আ-মুনাজাত, কবর যিয়ারাত, দান-ছাদাক্বা, ওয়ায-নছীহত প্রভৃতি নেক আমল গুরুত্ব সহকারে পালন করাকে যখন কুরআন ও হাদীছসম্মত নয় বলে আলোচনা করা হয়, তখন সাধারণ ধর্মপ্রাণ ভাই-বোনদের পক্ষ থেকে একটি প্রশ্ন আসে যে, জনাব! আপনি শবেবরাতে উল্লিখিত ইবাদত-বন্দেগীকে বিদআত বা কুরআন ও সুন্নাহসম্মত নয় বলেছেন, কিন্তু ছিয়াম পালন করা ছওয়াবের কাজ ও রুটি তৈরি করে গরীব দুঃখীকে দান করা ভালো কাজ নয় কি? আমরা কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে দোষের কী?

সুধী পাঠক! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দু‘আ-মুনাজাত, ছালাত, ছিয়াম, দান-ছাদাক্বা, কুরআন তেলাওয়াত, রাত্রি জাগরণ হলো নেক আমল। এতে কারও দ্বিমত নেই। আমরা কখনো এগুলোকে বিদআত বলি না। উম্মাতে মুহাম্মাদী প্রতিদিনই রাতের শেষ ভাগে এ সকল নফল ইবাদত অধিক ছওয়াব লাভের আশায় আল্লাহকে রাযী-খুশী করানোর জন্য আর রাসূল a-এর শাফাআত লাভ করে জান্নাতবাসী হওয়ার জন্য করতে পারেন। কিন্তু যাকে বিদআত বলি এবং যে সম্পর্কে উম্মাহকে সতর্ক করতে চাই, তা হলো ১৫ শা‘বান রাতকে শবেবরাত বা সৌভাগ্য রজনি অথবা মুক্তি রজনি মনে করে বিভিন্ন প্রকার আমল ও ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা। এটা কুরআন ও সুন্নাহ পরিপন্থী। এটাই ধর্মে বাড়াবাড়ি। যা ধর্মে নেই, তা উদযাপন করা ও প্রচলন করার নাম বিদআত।

নবী কারীম a তাঁর নবুঅতের ২৩ বছরের জীবনে কখনো তার ছাহাবীগণকে সাথে নিয়ে মক্কায় মসজিদুল হারামে অথবা মদীনায় মসজিদে নববীতে কিংবা অন্য কোনো মসজিদে একত্র হয়ে উল্লিখিত ইবাদত-বন্দেগীসমূহ করেছেন এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাঁর ইন্তেকালের পরে তাঁর ছাহাবায়ে কেরাম n তথা খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে কেউ জানত না- শবেবরাত কী এবং এতে কী করতে হয়। তারা নবী a-এর আমল প্রত্যক্ষ করেছেন। আমাদের চেয়ে উত্তমরূপে কুরআন অধ্যয়ন করেছেন। তারা তাতে শবেবরাত সম্পর্কে কোনো দিক-নির্দেশনা পেলেন না। তারা তাদের জীবন কাটালেন আল্লাহর নবী a-এর সঙ্গে, অথচ জীবনের একটি বারও তাঁর কাছ থেকে শবেবরাত বা মুক্তির রজনির সবক পেলেন না? যা পালন করতে রাসূলুল্লাহ a বলে যাননি, যা কুরআনে নেই, রাসূল a-এর তা‘লীমে নেই, ছাহাবীগণের আমলে নেই, তাদের সোনালী যুগের বহু বছর পরে প্রচলন করা শবেবরাতকে আমরা বিদআত বলতে চাই। আমরা বলতে চাই, এটা একটা মনগড়া ইবাদত পর্ব। আমরা মানুষকে বুঝাতে চাই, এসব প্রচলিত ও বানোয়াট মুক্তির রজনি উদযাপন থেকে দূরে থাকতে হবে, উম্মতকে কুরআন-সুন্নাহমুখী করতে এবং সেই অনুযায়ী আমল করাতে অভ্যস্ত করতে চাই। মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর সকলকে বিশেষ করে বাংলাদেশসহ এ উপমহাদেশের মুসলিমদেরকে সকল প্রকার ধর্মীয় বিদআত থেকে আর ভণ্ড পীর-বুযুর্গ নামধারী ইসলামের শত্রুদের হাত থেকে মুসলিম উম্মাহকে হেফাযত করুন এবং ছহীহ আমল করার তওফীক্ব দান করুন- আমীন!


* পিএইচডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।