শরীআতের বিষয়ে প্রশ্ন করার আদব
-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*



عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ مَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَاجْتَنِبُوهُ وَمَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَافْعَلُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُ فَإِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ كَثْرَةُ مَسَائِلِهِمْ وَاخْتِلاَفُهُمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ.

সরল অনুবাদ :

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, ‘আমি তোমাদের যা নিষেধ করি, তা থেকে দূরে থাকো। আর তোমাদেরকে যা আদেশ করি, তা সাধ্য অনুযায়ী পালন করো। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীগণ অধিক প্রশ্ন এবং নবীদের উপর মতভেদের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে’।[1]

হাদীছটির শারঈ অবস্থান :

ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শরীআতের মৌলিক নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদীছ এটি। অলংকারপূর্ণ বাক্য ব্যবহারে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশের এক অন্যন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি’।[2]

ইবনু হাজার আল-হায়ছামী (রাহিমাহুল্লাহ) এটিকে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার অন্যতম মূলভিত্তি বলে অভিহিত করেছেন। এটি মুখস্থ করা এবং এর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা অপরিহার্য।[3]

মুহাম্মাদ ইবনু আলী আশ-শাবশীরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘অলংকারপূর্ণ বাক্যের অন্যতম এটি। শরীআতের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি এটি’।[4]

আল্লামা ইবনু আল্লান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইসলামী বিধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির একটি এটি। আলংকারিক বাক্যের এক চমত্কার দৃষ্টান্ত এটি। কেননা এটি অগণিত শারঈ বিধিবিধানকে শামিল করে’।[5]

হাদীছটির শিক্ষণীয় দিক :

(১) আল্লাহ যা আদেশ করেছেন, তা করা এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।

(২) মানুষ যা করতে সক্ষম, তার চেয়ে অতিরিক্ত কিছুই অপরিহার্য নয়।

(৩) দ্বীন ইসলামের সহজতা, যেখানে সক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না।

(৪) সকল নিষেধাজ্ঞা বর্জন না করলে শরীআতের পরিপূর্ণ অনুসরণ হয় না।

(৫) আদিষ্ট বিষয়ের কোনো কিছু পালনে অসমর্থ হলে সক্ষমতানুযায়ী যতটুকু আদায় করতে পারবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।

(৬) এমন প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ, যাতে কোনো উপকার নেই।

(৭) নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর উপর মতভেদ ধ্বংসের কারণ। কেননা এই কারণে আমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

ব্যাখ্যা :

মানবতার জন্য একমাত্র কল্যাণকর জীবনবিধান হচ্ছে ইসলাম। এটি আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ চূড়ান্ত জীবনবিধান, যা ব্যতীত অন্য কোনো বিধান তাঁর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আদেশ ও নিষেধের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত এই জীবনবিধান। এটি প্রত্যেক কল্যাণকর বা উত্তম কাজের আদেশ দেয় এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর বা নিকৃষ্ট কাজ থেকে বাধা দান করে।

একজন আদর্শ প্রশ্নকর্তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, কোন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন করতে হবে, আর কোন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন করা হতে বিরত থাকতে হবে, সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এখানে। আমরা যদি হাদীছটি আলোচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটের প্রতি দৃষ্টি দেই, তাহলে সেটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে।

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে খুৎবায় বললেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর হজ্জ ফরয করেছেন। অতএব, তোমরা হজ্জ করো’। এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহ রাসূল! প্রতিবছরই কি (হজ্জ করতে হবে)? আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চুপ থাকলেন। এমনকি ঐ ব্যক্তি এই প্রশ্ন তিন বার করলেন। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তাহলে তোমাদের জন্য (হজ্জ) অপরিহার্য হয়ে যেত। আর তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হতে না। যে সমস্ত বিষয়ে আমি তোমাদের এড়িয়ে যাই (প্রশ্নের সম্মুখীন হতে চাই না), সেক্ষেত্রে তোমরা আমাকে ছেড়ে দিবে। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের মানুষেরা বেশি বেশি প্রশ্ন এবং নবীদের সম্পর্কে মতভেদের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। যখন আমি তোমাদের কোনো কাজের আদেশ দেই, তোমরা তা তোমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী পালন করো। আর যখন তোমাদের কোনো বিষয়ে নিষেধ করি, তখন তোমরা তা বর্জন করো’। অন্য আরেকটি রেওয়ায়েতে এসেছে, ‘যেসব বিষয়ে আমি তোমাদের এড়িয়ে যাই, সেসব বিষয় সম্পর্কে তোমরা আমাকে প্রশ্ন করো না’।[6]

প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকা বলতে কি সর্বক্ষেত্রে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে?

প্রশ্ন করা হতে বিরত থাকা বলতে সর্বক্ষেত্রে প্রশ্ন করা হতে বিরত থাকা উদ্দেশ্য নয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে। কেননা, সত্য অন্বেষণ করা একজন মুমিনের একমাত্র ব্রত হতে হবে। সত্যের সন্ধানে তাকে সাধনা করতে হবে। তবে প্রশ্ন করার সময় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যেন ইনছাফের ব্যত্যয় না ঘটে। সৎ উদ্দেশ্যের কোনো রকম লক্ষ্যচ্যুত না হয়।

যেসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকা জরুরী :

(১) যে প্রশ্নে কোনো কল্যাণ নেই; বরং উল্টো মতভেদ সৃষ্টি করে। (২) যে প্রশ্নের কারণে মন্দ অনুপ্রেরণা, বিষয়বস্তুর অস্পষ্টতা, কুমন্ত্রণা সৃষ্টি হয়।

(৩) জেদের বশবর্তী হয়ে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা।

(৪) যে প্রশ্নের কারণে প্রশ্নকারীর মনে ইসলামের পূর্ণতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে।

(৫) দ্বীনী বিষয়ে এমন প্রশ্ন করা, যার কারণে প্রশ্নকারীর শিরকে পতিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

(৬) হিংসা-বিদ্বেষ ও বিভেদ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা।

(৭) অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা বা পরিবেশ বা অবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয় এমন প্রশ্ন।

(৮) সীমালঙ্ঘন বা বাড়াবাড়ির কারণ হয় এমন প্রশ্ন।

(৯) শরীআতে যেখানে প্রশস্ততা রয়েছে, সেখানে সংকুচিত অবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়।

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে আমরা যখন ছাহাবীদের পদ্ধতির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, তখন তাদের প্রশ্নগুলোকে দুই ভাগে দেখতে পাই-

(ক) এমন সব বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা, যে সম্পর্কে তাদের চিন্তা সৃষ্টি হয় বা তাদের মনে প্রশ্ন করার কিংবা জানার আগ্রহ তৈরি হয়। এই জাতীয় প্রশ্ন করতে শরীআতে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে জ্ঞানীদের নিকট থেকে জানতে আদেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ‘যদি তোমরা না জানো তবে জ্ঞানীদের নিকট থেকে জেনে নাও’ (আন-নাহল, ১৬/৪৩)। এখান থেকেই ছাহাবীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, তারা কোনো বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করবেন। যেমন :

(১) ঘিয়ের মধ্যে ইঁদুর পড়ে গেলে সে ঘি খাওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন।

(২) রাস্তায় প্রাপ্ত সম্পদের ব্যবহার বা ভোগ সম্পর্কে প্রশ্ন।

(৩) সমুদ্রের পানি দিয়ে ওযূ করার বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন ইত্যাদি।

(খ) এমন সব বিষয় সম্পর্কে তাদের প্রশ্ন করা, যার বাস্তবে সংঘটিত হওয়ার প্রত্যাশা করা যায়। যেমন :

(১) রাফে‘ ইবনু খাদীজ (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের নিকট যে অস্ত্র আছে, তা শত্রুর মোকাবিলায় ব্যবহার করতে হবে। আমাদের হাতে তরবারি ব্যতীত পশু যবেহ করার জন্য কোনো ছুরি নেই। এখন আমরা কী করব? আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, রক্ত প্রবাহিত হয় এমন বস্তু দ্বারা যবেহকৃত এবং যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে এমন প্রাণী তোমরা খাও। তবে দাঁত ও নখ দ্বারা যবেহ করা যাবে না।

(২) দাজ্জালের সময় যখন এক দিন এক বছরের সমান হবে, তখন ছালাত আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা তার জন্য সময় নির্ধারণ করে নিবে।

শারীআতের আহকাম ও দলীল অনুযায়ী আমল করার পদ্ধতি সম্পর্কে মুসলিমদের জন্য দিকনির্দেশনা রয়েছে এই হাদীছে। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা করতে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আর এটাই শারঈ বিধানের মূল দাবি। কেননা নিষেধের মূল কথা হলো হারাম থেকে বেঁচে থাকা, যা রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণী, ‘আমি তোমাদের যে বিষয়ে নিষেধ করি তা থেকে বেঁচে থাকো’।[7] আর আল্লাহ তাআলার বাণী,

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

‘রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো আর তিনি তোমাদের যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো’ (আল-হাশর, ৫৯/৭)। এতে স্পষ্ট হয়েছে। অতএব, শরীআতের নিষেধকৃত বিষয় থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিষেধকৃত সকল বিষয় অবশ্যই হারাম হিসাবে গণ্য হবে। তবে মাকরূহ হওয়ার প্রমাণ থাকলে তা মাকরূহ বা অপছন্দনীয় হিসাবে গণ্য হবে। কাজেই তিনি যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা আর যা করতে বলেছেন, সাধ্যমতো তা করা এবং হালাল-হারামের যে বিধান তিনি এনেছেন, তা নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করা আমাদের উপর ফরয। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ

‘যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল’ (আন-নিসা, ৪/৮০)। নিষেধাজ্ঞার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে (اجْتَنَبُوا)  শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি এমন একটি শব্দ, যা কোনো বস্তু হতে দূরে থাকার অর্থ দিয়ে থাকে। বিষয়টি এমন যে, তুমি যেন একপার্শ্বে অবস্থান করছ আর হারাম অন্যপাশে অবস্থান করছে। এই কারণেই এটি বিরত থাকা বা বর্জন করার অর্থকে অধিক অর্থবোধক করে প্রকাশ করেছে।

আদিষ্ট বিষয় সম্পাদনে শারঈ বিধান হলো, আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেছেন, তার মধ্যে যা পালন করা সম্ভব এবং যা সক্ষমতার সীমার মধ্যে থাকে, তা পালন করা। যখনই কেউ কোনো বিধান পালনে অপারগ হয়, তখনই শরীআত তার দায়িত্ব হালকা করে দেয়। এটি ইসলামের সহজতা ও উদারতার প্রমাণ। যেমন কুরআনুল কারীমে এসেছে,

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি সহজ করতে চান; তোমাদের প্রতি কঠোর করতে চান না’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৫)। তিনি আরেও বলেন, فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটা সম্ভব’ (আত-তাগাবুন, ৬৪/১৬)। যেমন কেউ দাঁড়িয়ে ছালাত আদায়ে অক্ষম হলে বসে আর বসে অক্ষম হলে শুয়ে আদায় করবে। এমনকি নিরুপায় হলে হারাম খাদ্যও তার জন্য অনুমোদিত। উল্লেখ্য, এই অর্থের উপর ভিত্তি করেই উলামায়ে কেরাম গুরুত্বপূর্ণ ফিক্বহী মৌলিক বিধান তৈরি করেছেন। আর তা হচ্ছে, الْمَشَقَّةُ تَجْلِبُ التَّيْسِيرَ ‘কষ্টই সহজতার পথ উন্মুক্ত করে দেয়’। এটিকে তারা এমন উৎস মনে করেন, যার ওপর ভিত্তি করে ফিক্বহ শাস্ত্রের বহু মাসআলার উদ্ভব ঘটে।

এখানে স্মর্তব্য যে, শরীআত আদেশকৃত বিষয়ের তুলনায় নিষেধকৃত বিষয়ের ক্ষেত্রে বেশি কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছে। তাই আদেশ বাস্তবায়ন সক্ষমতার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে নিষিদ্ধ বিষয় সক্ষমতার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি, বরং তা আদায়ে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। কেননা শরীআত সর্বদা পাপে পতিত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। সমাজে পাপ ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এর প্রবেশদ্বার রুদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যে সমস্ত বিষয়কে হারাম করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা ব্যতীত এটি সম্ভব নয়। এই কারণে আল্লাহ তাআলা তার প্রজ্ঞাপূর্ণ কুরআনে ঘোষণা করেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না’ (আন-নূর, ২৪/২১)। হারামে পতিত হওয়ার সকল উপকরণকে আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন। কাজেই যেটা সরাসরি হারাম, সেটা তো নিষিদ্ধ হওয়া আরো বেশি যৌক্তিক।

সুধী পাঠক! উল্লিখিত ব্যাখ্যা থেকে একথা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বর্তমান সময়ে নামধারী অনেক মুসলিম পাপের মধ্যে ডুবে আছে। তাদেরকে ইবাদত পালনে যথেষ্ট সচেষ্ট দেখা যায়, কিন্তু হারাম থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে তারা মোটেও সতর্কতা অবলম্বন করে না। মানুষ যখন ইবাদত করে, তারাও তখন মানুষের সাথে ইবাদত করে। কিন্তু যখন বাসায় ফিরে আসে, তখন পাপ ও অবাধ্যতার কাজে লিপ্ত হতে তারা মোটেও ভয় করে না। তখন তারা আল্লাহকে ভুলে যায় অথবা ভ্রান্তির ছলনা করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর উম্মতকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই হারাম থেকে বেঁচে থাকবে, তবে তোমরা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদত আদায়কারী হিসাবে বিবেচিত হবে’।[8] এর দ্বারা ইবাদত পালনে তাচ্ছিল্য কিংবা শৈথিল্য প্রদর্শন উদ্দেশ্য নয়। বরং হারাম থেকে বিরত থাকার জন্য চরমভাবে সতর্ক করা, যা হাসান বাছরীর মন্তব্যে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ যত আমল করে, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো আল্লাহ তাআলা যা করতে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা’।[9]

এই হাদীছ যেসব অর্থের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষকে দ্বীনের বিধানানুযায়ী আমলের ক্ষেত্রে জেদি বা কঠোর করে গড়ে তোলা। এর প্রমাণ পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّهُ لَقَوْلٌ فَصْلٌ – وَمَا هُوَ بِالْهَزْلِ  ‘নিশ্চয়ই এটি সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী চূড়ান্ত বাণী। আর এটি কোনো কৌতুকের বিষয় নয়’ (আত্ব-ত্বরিক, ৮৬/১৩-১৪)। এই চ্যালেঞ্জ মানুষকে একথার প্রতি আহ্বান করে যে, শারঈ দৃষ্টিতে উপকারী হিসাবে যা কিছু সে জানে, তার সম্পূর্ণটাই গ্রহণ করা তার জন্য অপরিহার্য। তার জীবনের একমাত্র কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের প্রতিবন্ধক সকল বিষয় থেকে মুক্ত হতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। আত্মার প্রশিক্ষণ এবং বিশুদ্ধকরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

এমনকি আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই বিধান তাদের মধ্যে দৃঢ়ভাবে গ্রথিত করতে সক্ষম হন। তিনি এই সূক্ষ্ম বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করেছেন। এর প্রভাবেই পূর্ববতী উম্মত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যেসব প্রশ্ন নবী-রাসূলদের (আলাইহিমুস সালাম) বিব্রত করার জন্য করা হতো, তার ধরন নবীভেদে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। তাদের প্রশ্ন ছিল নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) উপর কঠোরতা আরোপের উদ্দেশ্য। নবীদের (আলাইহিমুস সালাম) উপর তাদের মতভেদ তাদের ধ্বংসের কারণ ছিল। এর উত্তম উদাহরণ হলো যা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জমানায় ঘটেছিল। যখন তাদেরকে একটি গরু যবেহ করার জন্য আদেশ করা হলো, তখন গরুর বৈশিষ্ট্যের প্রশ্নে তারা সীমালঙ্ঘন করল। আর এ বিষয়টি তারা নিজেরা নিজেদের উপর চাপিয়ে নিয়েছিল। যে কোনো গরু যবেহ করার অনুমোদন তাদের জন্য ছিল। কিন্তু তারা তা করতে অস্বীকার করেছিল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য কঠিন করে দিয়েছিলেন। যখন তারা তাদের নবী (আলাইহিমুস সালাম)-এর উপর মতভেদ করল, তখন তাদের নিজেদের হত্যার দু‘আ বত্যীত অন্য কোনো দু‘আ কবুল করা হলো না। ফলে আল্লাহ তাদেরকে তীহ প্রান্তরে ৪০ বছর উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ঘোরার শাস্তি দিলেন। এ জাতীয় কাজের পরিণাম এমনই হয়ে থাকে।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদীছ। একজন আদর্শ প্রশ্নকর্তার নৈতিকতা, বৈশিষ্ট্য, কথা বলার ধরন কেমন হবে, তা এই হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে তার মধ্যে কী মাত্রার সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আন্তরিকতা থাকতে হবে, তাও আলোচিত হয়েছে এখানে। আদিষ্ট বিষয়ের আলোকে জীবনযাপন এবং নিষেধকৃত বিষয় থেকে বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালানোর আদেশ করা হয়েছে এই হাদীছে। চরম সত্যবাদিতা, চরম ন্যায়পরায়ণতা, চরম একনিষ্ঠতা এবং কঠিন আত্মবিশ্বাস ইত্যাদি গুণ অর্জনের উপদেশ দেওয়া হয়েছে এখানে। ইবাদত পালনের সময়ের সততা, একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা যেন নির্জনতায় ও পারিবারিক আনন্দঘন মুহূর্তেও বজায় থাকে, সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে বলা হয়েছে। হাদীছটির শিক্ষা এবং এই গুণগুলোর আলোকে আমরা যেন আমাদের জীবন গঠন করতে পারি, সেই তাওফীক্ব আল্লাহ আমাদের দান করুন-আমীন! ছুম্মা আমীন!!


 

* প্রভাষক, বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, বরিশাল।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৭।

[2]. নববী, শারহে মুসলিম (আল-মিনহাজ), ৯/৮৬

[3]. ফাতহুল মুবীন, পৃ. ১১৯।

[4]. আল-জাওয়াহিরুল বাহিয়্যা শারহুল আরবাইন আন-নববীআ, পৃ. ১০৬।

[5]. দালীলুল ফাতিহীন, পৃ. ৬৫।

[6]. তিরমিযী, হা/২৬৭৯, হাদীছ ছহীহ।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৭।

[8]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৮০৯৫; তিরমীযী, হা/২৩০৫, ‘হাসান’।

[9]. আল-মাক্বসূদ মিন তাফযীলে তারকিল মুহাররামাত আলা ফিআলিত ত্বআত।