শাফাআতের প্রকারভেদ, কারা শাফাআত
করবেন এবং তা লাভের মাধ্যমগুলো কী?



 [১৩ শা‘বান, ১৪৪২ হি. মোতাবেক ২৬ মার্চ, ২০২১। মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ মাহির বিন হামাদ আল-মু্আয়ক্বীলী (রাহিমাহুল্লাহ)উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহীর সম্মানিত মুহাদ্দিছ ও ‘আল-ইতিছাম গবেষণা পর্ষদ’-এর গবেষণা সহকারী শায়খ আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথম খুৎবা



সকল প্রশংসা ঐ আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর সুন্দর নামসমূহ এবং গুণাবলিতে একক সত্তা। আমি তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি, তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি, তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি সকল কিছুকে তাঁর রহমত এবং জ্ঞান দ্বারা বেষ্টিত করে রেখেছেন। তিনি অসংখ্য নেয়ামত দ্বারা আমাদের পরিপূর্ণ করে রেখেছেন। মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নবী, আমাদের নেতা। তিনি আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল। আল্লাহ তাকে সত্য এবং হেদায়াত দিয়ে পাঠিয়েছেন। তাকে বড় শাফাআতকারী হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন। আল্লাহ তার ও তার পরিবার, সঙ্গী এবং পরবর্তী সকল অনুসারীদের প্রতি শান্তি, দয়া এবং বরকত নাযিল করুন- আমীন!

অতঃপর হে মুমিনগণ! আমি নিজেকে এবং আপনাদের তাক্বওয়া অবলম্বন করার অছিয়ত করছি। কেননা তাক্বওয়াই হচ্ছে পরকালের সম্বল এবং বিচার দিবসের আসল প্রস্তুতি। সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে তার পরকালীন জীবনের হিসাব করে। আর দুর্ভাগা সেই ব্যক্তি যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করে। ঐ ব্যক্তির জন্য লাঞ্ছনা এবং লজ্জা যার ঠিকানা জাহান্নাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী তার দুধের শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতালের মতো; অথচ তারা মাতাল নয়। বস্তুত, আল্লাহর আযাব সুকঠিন (আল-হজ্জ, ২২/১-২)

হে মুসলিম উম্মাহ! আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের তাঁর সৃষ্টির উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর বান্দার উপকারের সবচেয়ে বড় অধ্যায় হচ্ছে সুপারিশের অধ্যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে লোক সৎকাজের জন্য কোনো সুপারিশ করবে, তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক সুপারিশ করবে মন্দ কাজের জন্যে সে তার পাপের একটি অংশ পাবে। বস্তুত, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল’ (আন-নিসা, ৪/৮৫)। সৎকাজে সুপারিশ; সৃপারিশকৃত ব্যক্তির কল্যাণ সাধনের জন্য অথবা তাকে ক্ষতি হতে বাঁচানোর জন্যও হতে পারে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালো কাজে সুপারিশ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন এবং তার ছাহাবীদের উৎসাহ প্রদান করতেন। আবূ মূসা (আশআরী) (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কেউ কিছু চাইলে বা প্রয়োজনীয় কিছু চাওয়া হলে তিনি বলতেন, ‘তোমরা সুপারিশ করো ছওয়াবপ্রাপ্ত হবে, আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা তাঁর নবীর মুখে চূড়ান্ত করেন’।[1]

হে মুসলিম সমাজ! এটি দুনিয়াবী ক্ষেত্রে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুপারিশের একটি অংশ। আর পরকালীন জীবনে প্রত্যেক মানুষ তার সুপারিশের মুখোপেক্ষী হবে। যেদিন শিশুরা বার্ধক্যে উপনীত হয়ে যাবে, আর বৃদ্ধরা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে। মানুষ সেদিন একাকী সঙ্গীহীন অবস্থান করবে। সেদিন কোনো সম্পদ এবং প্রভাব থাকবে না। যেদিন কোনো সঙ্গী সন্তান-সন্ততি সাথে থাকবে না। ‘প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ থাকবে’ (আত-তূর, ৫২/২১)। প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করে তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে স্ব-স্ব পাপসমূহ স্বীকার করবে এবং তার বিচার ফয়সালা কী হবে? এর জন্য অপেক্ষা করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভ্রাতার কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে’ (আবাসা, ৮০/৩৪-৩৭)। আল্লাহ তাআলা শাফাআত (সুপারিশ)কে সুপারিশকৃত ব্যক্তির জন্য রহমত সুপারিশকারীর জন্য তা মর্যাদার বিষয় বানিয়েছেন। সেদিন ফেরেশতাগণ, নবীগণ, শহীদগণ নেককার বান্দাগণ আল্লাহর নিকট জাহান্নামীদরে জন্য শাফাআত করবেন। এমনকি ছিয়াম ও কুরআন বান্দার জন্য শাফাআত করবে। ছিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা দিয়েছি। অতএব, তার ব্যাপারে এখন আমার শাফাআত কবুল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব, তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে।[2] শাফাআতের মালিক একমাত্র আল্লাহ। কোনো নবী বা কোনো নিকটবর্তী ফেরেশতার নিকট শাফাআত চাওয়া যাবে না, বরং তা একমাত্র আল্লাহর নিকট চাইতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, শাফাআতের বিষয়টি পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য’ (আয-যুমার, ৩৯/৪৪)। তবে যাকে আল্লাহ শাফাআত করার অনুমতি দিবেন কেবল সেই শাফাআত করতে পারবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের কোনো সুপারিশ কাজে আসবে না, যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ও যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন’ (আন-নাজম, ৫৩/২৬)। প্রত্যক নবী দুনিয়াতে আল্লাহর নিকট যা চেয়েছেন আল্লাহ তার দু‘আ কবুল করেছেন। তবে আমাদের নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুনিয়াতে দু‘আ করেছিলেন যেন কিয়ামতের দিন তার উম্মতের জন্য শাফাআত করার অধিকার তাকে দেওয়া হয়। যেদিন আল্লাহ সৃষ্টির সূচনা হতে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষকে এক ময়দানে একত্রিত করবেন। সূর্য অতি নিকটে থাকবে। তারা জুতাবিহীন নগ্ন হয়ে খাতনাবিহীন অবস্থায় থাকবে। সেখানে তারা প্রচণ্ড কষ্টে ৫০ হাজার বছর অবস্থান করবে। তখন অতিষ্ঠ হয়ে সকল মানুষ বিচারকার্য শুরু করার জন্য, তাদেরকে এই কঠিন বিপদ থেকে মুক্তির দেওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট শাফাআত করার জন্য নবীদের নিকট ছুটাছুটি করবে। কোনো নবী শাফাআত করবে না। তখন সবাই মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসবে, তাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। তিনি সুপারিশ করবেন, আল্লাহ তার সুপারিশ গ্রহণ করবেন। মহান আল্লাহ বলবেন, ‘হে মুহাম্মাদ! তুমি তোমার উম্মতের মধ্য হতে যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাও’। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমার প্রভু আমার সাথে অঙ্গীকার করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্যে ৭০ হাজার মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যাদের কোনো হিসাবও নেওয়া হবে না এবং শাস্তিও প্রদান করা হবে না। আর প্রতি হাজারের সাথে থাকবে আরো ৭০ হাজার। আর আমার প্রতিপালকের দুই হাতের মুষ্ঠির তিন মুষ্ঠি পরিমাণ’।[3] প্রকৃতপক্ষে এটি আল্লাহর বড় অনুগ্রহ; তিনি অশেষ দয়ালু, অনুগ্রহকারী।

হে মুসলিম উম্মাহ! আমাদের নবী কয়েকটি স্থানে সুপারিশ করবেন— (১) জান্নাতের ফটক বন্ধ থাকবে। কোনো নবী সুপারিশ করবেন না, আল্লাহর নবীর সুপারিশে সেই জান্নাতের ফটক খোলা হবে। কিয়ামত দিবসে আমি জান্নাতের তোরণে এসে দরজা খোলার অনুমতি চাইব। তখন দ্বাররক্ষী বলবেন, আপনি কে? আমি উত্তর করব, মুহাম্মাদ। দ্বাররক্ষী বলবেন, আপনার জন্যই আমি আদিষ্ট হয়েছি, আপনার পূর্বে অন্য কারোর জন্য দরজা খুলিনি।[4] (২) তিনি কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবেন ঐ সকল ব্যক্তিদের জন্য যারা কাবীরা গুনাহের জন্য জাহান্নামে যাবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আমার উম্মতের কাবীরা গুনাহগারদের জন্য আমি সুপারিশ করব’।[5]

হে তাওহীদে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে মুমিন বান্দাগণ তাদের নিজ ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। তাদের অনেকেই বড় একটি দলের জন্য সুপারিশ করবে। আবার অনেকেই গোত্রের জন্য আবার অনেকেই কোনো কিছু মানুষের জন্য আবার অনেকেই একজন ব্যক্তির জন্য। ক্বাতাদা c বলেন, আল্লাহর কসম! বন্ধু যদি নেককার হয় তাহলে সে উপকারী হবে। আর আত্মীয় যদি নেককার হয় তাহলে শাফাআত করবে।

হে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব! কিয়ামত দিবসে যখন সকলের সুপারিশ করা শেষ হয়ে যাবে এবং জাহান্নামে আরো কিছু ঈমানদার পাপী মানুষ অবশিষ্ট থেকে যাবে, তখন আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের জান্নাতে দিবেন। আল্লাহ বলবেন, এরপর আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করবেন, ফেরেশতারা সুপারিশ করল, নবীগণও সুপারিশ করল এবং মুমিনরাও সুপারিশ করল, কেবল আরহামুর রাহিমীন- পরম দয়াময়ই রয়ে গেছেন। এরপর তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুঠো তুলে আনবেন, ফলে এমন একদল লোক মুক্তি পাবে, যারা কখনো কোনো সৎকর্ম করেনি এবং আগুনে জ্বলে অঙ্গার হয়ে গেছে। পরে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশমুখের ‘নাহরুল হায়াতে’ ফেলে দেওয়া হবে। তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন শস্য অঙ্কুর স্রোতবাহিত পানিতে সতেজ হয়ে ওঠে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমরা কি কোনো বৃক্ষ কিংবা পাথরের আড়ালে কোনো শস্যদানা অঙ্কুরিত হতে দেখনি, যেগুলো সূর্য কিরণের মাঝে থাকে সেগুলো হলদে ও সবুজ রূপ ধারণ করে আর যেগুলো ছায়ামুক্ত স্থানে থাকে, সেগুলো সাদা হয়ে যায়? ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! মনে হয় আপনি যেন গ্রামাঞ্চলে পশু চরিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এরপর তারা নহর থেকে মুক্তার মতো ঝকঝকে অবস্থায় উঠে আসবে এবং তাদের গ্রীবাদেশে মোহরাঙ্কিত থাকবে, যা দেখে জান্নাতীগণ তাদের চিনতে পারবেন। এরা হলো ‘উতাকাউল্লাহ’ (আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত)। কোন সৎ আমল ছাড়াই আল্লাহ তাআলা তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।[6] হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো এবং ভয় করো এমন এক দিবসকে যখন পিতা পুত্রের কোনো কাজে আসবে না এবং পুত্রও পিতার কোনো উপকারে আসবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব, পার্থিব জীবন যেন তোমাদের ধোঁকা না দেয় এবং আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারক শয়তানও যেন তোমাদের প্রতারিত না করে (লুক্বমান, ৩১/৩৩)

দ্বিতীয় খুৎবা



হামদ ও ছালাতের পর… অতঃপর হে মুমিনগণ! যারা সুপারিশ লাভে ধন্য হবেন, তারা হলেন-

(১) তাওহীদে বিশ্বাসী : নিশ্চয় কিয়ামতের দিন একনিষ্ঠ তাওহীদে বিশ্বাসীগণ ব্যতীত কারো জন্য সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, তোমরা আহ্বান করো তাদেরকে, যাদের তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে (মা‘বূদ) মনে করতে, তারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছুর মালিক নয় এবং এতদুভয়ে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের কেউ তার পৃষ্ঠপোষকও নেই। যাকে অনুমতি দেওয়া হয় সে ছাড়া আল্লাহর নিকট কারো সুপারিশ কাজে আসবে না’ (সাবা, ৩৪/২২-২৩)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, তাওহীদে বিশ্বাসী ব্যতীত কারো জন্য সুপারিশ করার অধিকার নেই।

(২) ছালাত আদায়কারী : রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কিয়ামতের দিন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুপারিশ লাভে ধন্য হবে সেই ব্যক্তি, যে একনিষ্টভাবে বলবে, لا إله إلا الله (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এবং ছালাত আদায় করবে। সুতরাং, ছালাত পরিত্যাগকারী ব্যক্তির জন্য কোনো সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তি ও শিরক-কুফরের মাঝে পার্থক্য ছালাত’।[7] সুতরাং, যারা মহান রবের সাথে শিরক করবে অথবা ছালাত আদায় করবে না, তাদের পক্ষে কারো সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।

কিয়ামতের মাঠে যারা সুপারিশ লাভে ধন্য হবেন তাদের অন্যতম হলেন ঐ ব্যক্তি, যে বেশি বেশি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর দরূদ পাঠ করে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘তোমরা যখন আযান শুনবে, তখন (আযানের উত্তরে) মুয়াযযিন যা বলবে, তোমরাও তাই বলবে। তারপর আযান শেষে আমার উপর দরূদ পাঠ করবে। কেননা, যে ব্যক্তি আমার উপর এক বার দরূদ পাঠ করবে, তার বিনিময়ে তার প্রতি আল্লাহ ১০টি রহমত নাযিল করেন। অতঃপর তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্য ‘অসীলা’ প্রার্থনা করবে। কারণ, ‘অসীলা’ হচ্ছে জান্নাতের এমন একটি স্থান, যা সমস্ত বান্দার মধ্যে কেবল আল্লাহর একজন বান্দা (তার উপযুক্ত) হবে। আর আশা করি, আমিই হব সেই বান্দা। সুতরাং, যে ব্যক্তি আমার জন্য অসীলা প্রার্থনা করবে, সে (আমার) সুপারিশপ্রাপ্ত হবে’।[8]

শাফাআত লাভের আরো কিছু মাধ্যম হচ্ছে- বেশি বেশি সৎ আমল করা।[9] যেমন : বেশি বেশি সিজদা করা, মদীনায় মৃত্যুবরণের সৌভাগ্য লাভ করা।[10]

হে আল্লাহ! আমাদের আপনি আপনার নবীর সুপারিশ লাভে ধন্য করুন, হাওযে কাওছারের পানি দ্বারা তৃপ্ত করুন, আপনার রহমত দ্বারা আমাদের ভাই-বন্ধুগণ, ছেলে সন্তান, আমাদের আলেমগণসহ সকলকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। আল্লাহ! মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তার পরিবার-পরিজন, তার সকল ছাহাবীগণসহ কিয়ামত পর্যন্ত তার যতো অনুসারী আসবে সকলের উপর শান্তি নাযিল করুন! আল্লাহ! পৃথিবীর যেখানে যেসকল মুসলিমগণ অবহেলিত লাঞ্ছিত, অপমানিত তাদেরকে বিজয় দান করুন! সর্বোপরি আপনি আমাদের ওই সব আমল করার তাওফীক্ব দান করুন, যে সকল আমল দ্বারা আমরা জান্নাত লাভ করতে পারি- আমীন!


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪৩২।

[2]. মুসনাদে আহমদ, হা/৬৬২৬।

[3]. তিরমিযী, হা/২৪৩৭।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৭।

[5]. মিশকাত, হা/৫৫৯৮।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮২।

[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৪।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৮৯।

[10]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৪৩৭