শায়খুল হাদীছ যিয়াউর রহমান আল-আ‘যামী (রহি.)

আল-ইতিছাম ডেস্ক

[ইলমের জগতে আধুনিককালের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম যিয়াউর রহমান আ‘যামী। তিনি হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। বহু বাধা উল্লঙ্ঘন করে শেষ পর্যন্ত মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে সেখানেই ‘হাদীছ বিভাগের’ ডীন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। পাশাপাশি তিনি মসজিদে নববীতে ছহীহুল বুখারীর দারস দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ধর্মান্তরিত এই মনীষীর আরবী ভাষায় রচিত বিশাল বিশাল বইগুলো সত্যিই বিস্ময়কর। গত ৩১ জুলাই তিনি মৃত্যু বরণ করেন। নিম্নে তার জীবনী তুলে ধরা হলো।]

শায়খুল হাদীছ যিয়াউর  রহমান আল-আ‘যামী হিন্দু থেকে ইলমে হাদীছের খাদেম এবং মুহাদ্দিছ হওয়ার বিরল ঘটনার জন্মদাতা। তিনি ১৯৪৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের আযমগড় জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু থাকা অবস্থায় তার নাম ছিল ‘বঙ্করাম’, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিজের নামকরণ করেন ‘ইমামুদ্দীন’। যখন তিনি এই নামে পরিচিত হয়ে উঠলেন এবং হিন্দুদের পক্ষ থেকে নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা করলেন, তখন নাম পরিবর্তন করে রাখলেন ‘যিয়াউর রহমান’। আর আ‘যামী বলা হয় আযমগড় জেলার দিকে সম্পৃক্ত করে। তার পূর্বপুরুষ হিন্দুধর্মের আরিয়া মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তার পিতা সমাজের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন এবং কলকাতায় তার বড় ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল।

মুহতারাম শায়খ ইবতেদায়ী পর্যন্ত নিজ গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেন। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য আযমগড় শহরের শিবলী কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে ১৬ বছর বয়সে মাধ্যমিক পাশ করেন। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরলে তার কোনো বন্ধু তাকে মাওলানা আবুল আলা মওদূদী (রহি.)-এর ‘দ্বীনে হাক্ব’ বইয়ের হিন্দী অনুবাদ উপহার হিসাবে পেশ করে। এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হন। হৃদয়ে নতুন এক অনুভূতি লাভ করেন। নতুন এক প্রকার আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ফলে তিনি কয়েকবার ‘দ্বীনে হাক্ব’ কিতাবটি মুতালা‘আ করেন। ইসলামী চিন্তাধারা তার উপর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করলে তিনি মাওলানা মওদূদী (রহি.)-এর আরও কিছু হিন্দী ভাষায় অনুবাদকৃত বই পড়ে ফেলেন। এই সময়ে তিনি খাজা হাসান নিযামী (রহি.)-এর কুরআনের হিন্দী অনুবাদ সংগ্রহ করে পড়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসা শুরু হয়। গোপনে ছালাত আদায় করা শুরু করে দেন। তবে তখনো তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিতে পারেননি। কিন্তু তার পরিবারের অনেক সদস্য তার ইসলাম কবুলের বিষয় জেনে যায়। তার পরিবার অবস্থা বেগতিক দেখে তার পিতাকে কলকাতা থেকে ডেকে পাঠায়। পিতা এসে সন্তানকে কিছু না বলে সন্তানের অবস্থান যাচাই করেন। কিছুদিন পর হিন্দু পণ্ডিতদের ডেকে এনে ঝাড়ফুঁক করা হয় এবং নানা মন্ত্র পড়া হয়। নানা উপদেশ বাণীও পেশ করা হয়। তবে তেমন কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। এরপর তাকে এলাহাবাদের আরও কিছু বড় পণ্ডিতের কাছে ঝাড়ফুঁক নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়। তিনি সেখানে নানা উপদেশের মুখোমুখি হন এবং তাকে প্রস্তাব দেওয়া  হয়, যেন সে মুসলিম না হয়ে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। কেননা মুসলিমরা পৃথিবীর দিকে দিকে নির্যাতিত এবং তাদের অবস্থা বেশি ভালো নয়। শায়খ (রহি.)-এর তখন জবাব ছিল ‘আমি মুসলিমদের দেখে নয়, বরং ইসলামকে জেনে মুসলিম হয়েছি’।

অবস্থা বেগতিক দেখে তার পরিবারের সকল সদস্য ভুখ হরতাল বা অনশন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ইসলাম না ত্যাগ করা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার রহমতে তিনি এ রকম কঠিন অবস্থাতেও নিজের সিদ্ধান্তের উপর অটল থাকেন এবং কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসেন।

সন্তানকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবার পিতা-মাতা নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তারা টাকা দিয়ে একজন ইমাম ভাড়া করে নিয়ে আসেন। যে ইমাম ছাহেবের উপদেশ ছিল পিতা-মাতার অনুমতি ব্যতীত ইসলামে প্রবেশ নিষেধ, পিতা-মাতা জীবিত থাকা অবধি অন্তরে ইসলাম রাখতে হবে কিন্তু প্রকাশ করা যাবে না। মাওলানা ছাহেবের এ রকম কথায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং অনেকটা বাধ্য হয়ে ইসলামের নানা আমল থেকে ফিরে আসেন। কেননা তিনি কেবল সবেমাত্র ইসলাম বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন। তেমন কোনো গভীর ইলমের অধিকারী তিনি হতে পারেননি। আল্লাহর রহমতে কিছু দিন পর তিনি মাওলানা ছাহেবের ভ্রষ্টতা অনুধাবন করতে পারেন। অনুসন্ধানে জানতে পারেন যে, মাওলানা ছাহেব প্রকৃত মুসলিম নন। ফলে তিনি আবার ছালাত আদায় করা শুরু করেন। এ রকম অবস্থাতেই তার গ্রামের মসজিদে কট্টরপন্থী হিন্দুদের একটি দল ছালাতরত মুসলিমদের উপর হামলা করে বসে। যেহেতু তিনি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন, তাই সরাসরি মসজিদে গিয়ে হামলার প্রতিবাদস্বরূপ নিজের ইসলামের ঘোষণা দেন।

ইসলাম থেকে ফিরিয়ে আনার সর্বশেষ চেষ্টা হিসাবে তার পরিবার হিন্দু ধর্মের কট্টরবাদী সংগঠন আর.এস.এস.-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। পিতা-মাতার কঠোর অবস্থানের কথা জানতে পেরে তিনি বাড়ি ত্যাগ করেন। শহর থেকে দূরে এক মুসলিম পরিবারের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং লম্বা সময় সেখানে নিজেকে গোপন করে রাখেন। কিছু দিন নিজেকে গোপন রাখার পর তিনি স্থান পরিবর্তন করে এমন স্থানে যাওয়ার মনোবাসনা করেন, যেখানে তিনি নিজেকে গোপন রাখার পাশাপাশি ইসলামের জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। বন্দী অবস্থাতেই তিনি দেড় বছর কাটিয়ে দেন এবং উর্দূ ভাষা শেখা শুরু করেন। দেড় বছর পর তিনি একাডেমিক ইলমী সফর শুরু করেন। তামিল নাড়ুর প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান ‘দারুস সালাম ওমারাবাদ’-এ ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি পাঁচ বছর পড়াশোনা করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি আলিম এবং দাওরায়ে হাদীছ সম্পন্ন করেন।

পাঁচ বছর লম্বা সময় পড়াশোনা শেষে তিনি নিজের এলাকায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করেন। যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম তাকে ‘দ্বীনে হাক্ব’ বই দিয়েছিলেন, তার বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ সফরে তিনি তার পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং হিন্দু ব্যক্তিরাও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তখন ছিল রামাযান মাসের শেষ সময়। এলাকায় ঘোষণা করা হয়, এবার ঈদুল ফিতরের ছালাত যিয়াউর রহমান আ‘যামী পড়াবেন। এ ঘোষণায় ঈদের ছালাতে ব্যাপক মানুষের সমাগম ঘটে। একজন নওমুসলিমের ঈদের ছালাতের ইমামতির ঘটনায় অনেকেই প্রভাবিত হয়। ১৯৬৬ সালে ‘দারুস সালাম ওমরাবাদ’ থেকে ফারেগ হওয়ার পর তিনি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। যাওয়ার সময় শায়খ ইবনে বায (রহি.) বরাবর তার জন্য একটি সুপারিশ লিখে দেন ওমরাবাদ মাদরাসার প্রবীণ মুহাদ্দিছ হাফীযুর রহমান আ‘যামী। মদীনায় যাওয়ার সাথে সাথে তাকে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নেওয়া হয়। চার বছর পড়াশোনা করেন এবং লীসান্স (অনার্স) সম্পন্ন করেন। ১৯৭০ সালে মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়াশোনার জন্য গমন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ‘রাবেতা আলামে ইসলামী’-এর সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি জেনারেল সেক্রেটারিয়েট অফিসের ইনচার্জ ছিলেন। তবে তিনি এখানেই থেমে থাকার পাত্র ছিলেন না। নিজের ইলমী গভীরতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ইসলামী ইতিহাসের বিখ্যাত এবং প্রাচীন ইউনিভার্সিটি ‘আল-আযহার’-এ গমন করেন। এখান থেকে তিনি পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তার ডক্টরেটের বিষয় ছিল ‘আকযিয়াতু   রাসূলিল্লাগি (ছা.)’ তথা রাসূলুল্লাগ (ছা.)-এর বিচার।

তিনি ১৯৭৯ সালে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদীছ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদ লাভ করেন। তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে মসজিদে নববীর শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। মসজিদে নববীতে তিনি ‘ছহীহুল বুখারী’ এবং ‘ছহীহু মুসলিম’-এর দারস প্রদান করতেন। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আলী আল-হারাকান (রহি.)-এর সুপারিশে দ্বীনের জ্ঞানীদের সম্মানস্বরূপ সঊদী সরকার তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করে।

শায়েখ (রহি.)-এর প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ :

১.        دِرَاسَاتٌ فِي الْيَهُوْدِيَّةِ وَالْمَسِيْحِيَّةِ وَأَدْيَانِ الْهِنْدِ وَالْبِشَارَات فِي كُتُبِ الْهُنْدُوْسِ

(ইয়াহূদী, খ্রিস্টান ও হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান একটি বই এটি। ‘মাকতাবাতুর রুশদ’ থেকে বৃহৎ খণ্ডে বইটি ছাপানো হয়েছে।)

২.       أَقْضِيَةُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ  (মূল লেখক: আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ফারজ আল-মালেকী। যিনি ইবনু ত্বালা‘ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি বইটির তাহক্বীক্ব, টীকা ও সম্পূরক আলোচনা সংযুক্ত করেছেন। বইটি সঊদী আরবের দারুস সালাম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে।)

৩.       مَرْوِيَّاتُ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ (মদীনার মাকতাবাতুল গুরাবা থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে।)

৪.       الْمَدْخَلُ إلَى السُّنَنِ الْكُبْرَى  (ইমাম বায়হাক্বী (রহি.)-এর এই কিতাবের তিনি তাহক্বীক্ব ও পর্যালোচনা লিখেছেন।)

৫.       الْمِنَّةُ الْكُبْرَى شَرْحُ وَتَخْرِيْجُ السُّنَنِ الصُّغْرَى

৬.       مُعْجَمُ مُصْطَلَحِ الْحَدِيْثِ وَلَطَائِفُ الأسَانِيْدِ (দারুল ইমাম মুসলিম থেকে কিতাবটি প্রকাশিত হয়েছে।)

৭.       الرَّازِيْ وَتَفْسِيْرُه

৮.       الْجَامِعُ الْكَامِلُ فِي الْحَدِيْثِ الصَّحِيْحِ الشَّامِل (আল-জামেঊল কামেল ফিল হাদীছিছ ছাহীহিশ শামেল। কিতাবটি ফিক্বহী ধারা অনুসারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ২২ খণ্ডের ১৫ হাজার পৃষ্ঠায় ১৬,৫৪৬ হাদীছের বিশাল গ্রন্থ, এটি শায়খের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। শায়খ (রহি.) ২০০১ সালে এই বই লেখা শুরু করেন। ১২ বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমের পর ২০১৩ সালে এর কাজ শেষ করেন। ইলমে হাদীছের বিশাল খাদেম মুহাদ্দিছ (রহি.) ৩০ জুলাই ২০২০ পবিত্র মদীনা নগরীতে মৃত্যুবরণ করেন। মাগরিবের ছালাতের পর মসজিদে নববীতে জানাযার ছালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং বাক্বী‘উল গারক্বাদ কবরস্থানে শায়খ (রহি.)-কে দাফন করা হয়।

তথ্যসূত্র :

১. শায়খ ইসহাক্ব ভাট্টী (রহি.), চামানিস্তানে হাদীছ।

২. এরফান ছাদীক্বী, বেরেলিয়াগঞ্জ সে জান্নাতুল বাক্বী তাক, আল-মুজতামা ম্যাগাজিন।