গ্রন্থ পরিচিতি-৫ : ছালাতে বুকের উপর হাত বাঁধুন

-আল-ইতিছাম ডেস্ক

ভূমিকা :  রাসূলুল্লাহ (ছা.) আমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তার সবকিছুই গ্রহণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প উপায় নেই। রাসূল (ছা.)-এর দেওয়া উপহারকে তথা সুন্নাতকে ছোট-খাঁটো বলে উপহাস করা, তুচ্ছ করা কুফরী। বর্তমানে ছালাতের বেশ কিছু মাসআলা নিয়ে তিন ধরনের মতবাদ দেখা যায়। প্রথম দল বলেন, এসব বিতর্কিত বিষয়ে ছহীহ হাদীছই একমাত্র সমাধান। দ্বিতীয় দল বলেন, মাযহাবে যা আছে তাই মানতে হবে। তৃতীয় দল বলেন, যার যেটা মন চায় মানুক; এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করা ফেতনা।

ছালাতের যে কয়টি বিষয় নিয়ে বেশি আলোচনা-পর্যালোচনা হয়ে থাকে, তার অন্যতম হলো ছালাতে হাত বাঁধা। ছালাতে হাত কোথায় অবস্থান করবে এটা নিয়ে আমাদের দেশে দু’টি মতবাদ খুব বেশি প্রসিদ্ধ: ১. বুকে হাত বাঁধতে হবে। ২. নাভির নিচে বাঁধতে হবে। উভয় পক্ষই তাদের মতের পক্ষে ও প্রতিপক্ষের বিপক্ষে অনেক লেখনী রচনা করেছেন। কেউ বুকে হাত বাঁধার পক্ষে। কেউ বা আবার নাভির নিচে হাত বাঁধার পক্ষে।

আধুনিক বিশ্বে যারা এ বিষয়ে অসাধারণ খিদমত দিয়েছেন, তাদের একজন হলেন শায়েখ কেফায়াতুল্লাহ  সানাবেলী (রহি.)। তিনি একজন তরুণ আহলেহাদীছ আলেম। বিদ‘আত ও বিদ‘আতীদের খণ্ডনে তিনি তার লেখনী দ্বারা খুবই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। নম্র ভাষা, ক্ষুরধার যুক্তি ও বেশুমার দলীল-দালায়েল দিয়ে গুরু-গম্ভীর তাহক্বীক্বী বিষয়কে সহজভাবে তুলে ধরার এক অসাধারণ যোগ্যতা আল্লাহ তাকে দান করেছেন। হাদীছ তাহক্বীক্বের মতো কঠিন বিষয়কে তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেন। নিচে তার বুকে হাত বাঁধা বিষয়ক গ্রন্থটি সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:

নাম : أنوار البدر في وضع اليدين على الصدر উর্দূতে লেখক যে শিরোনাম দিয়েছেন তার বাংলা অনুবাদ হলো, ‘ছালাতে বুকের উপর হাত বাঁধুন’।

বিবরণ : এ গ্রন্থটির চতুর্থ সংস্করণ ২০১৬ সালে মুদ্রিত হয়েছে। সঊদী আরবের রিয়াদস্থ মাকতাবা বায়তুস সালাম হতে উন্নতমানের কাগজ ও কভারসহ প্রকাশিত এই গ্রন্থটি অতীব দৃষ্টিনন্দন। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭৫৫।

বৈশিষ্ট্যাবলি : এই বইটির বৈশিষ্ট্যাবলি সংক্ষেপে তুলে ধরা মুশকিল। তবুও কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো-

১. মুহতারাম লেখক প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে বুকের উপর হাত বাঁধার পক্ষে মোট ৬ জন ছাহাবী থেকে মারফূ‘ হাদীছ পেশ করেছেন। আল-হামদুলিল্লাহ। অতঃপর তিনি ৪ জন ছাহাবী থেকে আছার পেশ করেছেন। সবগুলো হাদীছেরই অত্যন্ত দীর্ঘ ও তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন।

২. এরপর তিনি দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে হানাফীদের দলীলসমূহ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে তিনি একজন ছাহাবী থেকে মারফূ‘ হাদীছ নিয়ে এনেছেন এবং সেটিকে জাল প্রমাণ করেছেন। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তিনি ৪ জন ছাহাবী থেকে নাভির নিচে হাত বাঁধার হাদীছ উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলোকে বাতিল প্রমাণ করেছেন।

৩. তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি তাবেঈ, ইমাম চতুষ্টয় প্রমুখের মতামত উল্লেখ করেছেন।

৪. চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক দলীলসমূহ উপস্থাপন করেছেন।

মোট চারটি অধ্যায় সম্বলিত এই গ্রন্থে তিনি তাহক্বীক্বী আলোচনা দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, বুকে হাত বাঁধাই হলো নবী (ছা.) ও ছাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর আমল। নাভির নিচে হাত বাঁধার কোনো গ্রহণযোগ্য হাদীছ নেই। সুতরাং এ আমল বর্জনযোগ্য।

যারা গ্রন্থটির প্রশংসা করেছেন : পাক-ভারতের বড় বড় আলেম এ গ্রন্থটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গ্রন্থটির ভূমিকা রচনা করেছেন শায়েখ ইরশাদুল হক্ব আছারী (রহি.)। পাকিস্তানের যে সকল আলেম প্রশংসাবাণী দিয়েছেন, তাদের নাম নিম্নরূপ:

১. শায়েখ হাফেয ছালাহুদ্দীন ইউসুফ।

২. শায়েখ মুবাশশির রব্বানী।

৩. শায়েখ হাফেয ইবতিসাম ইলাহী যহীর।

৪. শায়েখ দাঊদ আরশাদ।

৫. শায়েখ রফীক তাহের।

ভারতের যে সকল আলেম প্রশংসা করেছেন :

১. শায়েখ আব্দুল মুঈদ মাদানী।

২. শায়েখ ছালাহুদ্দীন মাকবূল আহমাদ মাদানী।

৩. শায়েখ রাযাউল্লাহ আব্দুল করীম মাদানী।

৪. শায়েখ আব্দুস সালাম সালাফী।

৫. শায়েখ মাহফূযুর রহমান ফায়যী।

৬. শায়েখ আবূ যায়েদ যামীর প্রমুখ।

গ্রন্থকার পরিচিতি : তার নাম আবু ফাওযান কেফায়াতুল্লাহ ইবনে মুহিব্বুল্লাহ সানাবিলী। তিনি ১৯৮৩ সনের জানুয়ারি মাসে উত্তর প্রদেশের সিদ্ধার্থনগরের সাদুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লীর জামি‘আহ ইসলামিয়্যা সানাবিল হতে পড়াশোনা করেছেন। তিনি এ যাবৎ প্রায় ৬০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বর্তমানে তিনি জমঈয়তে আহলেহাদীছ মুম্বাই-এর গবেষক হিসাবে নিয়োজিত। এছাড়াও কেরালার কুল্লিয়া উম্মে সালামা আল-আছারিইয়া-এর মুহাদ্দিছ। পাশাপাশি তিনি মুম্বাই হতে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা আহলে সুন্নাহ-এর পরিচালক। তিনি জামি‘আহ সালাফিয়্যাহ, বানারস-এর ফৎওয়া ও তাহক্বীক্ব বিষয়ক উচ্চ পরিষদের রুকন হিসাবেও জড়িত।

উপসংহার : ‘ছালাতে বুকের উপর হাত বাঁধুন’ গ্রন্থটিতে প্রচুর পরিমাণে তাহক্বীক্ব ও উছূল রয়েছে, যা আলেমদের বিশেষ করে মুহাদ্দিছদের জন্য উপকারী। বাংলায় এর অনুবাদ হয়েছে। তবে এখনো প্রকাশিত হয়নি। আল্লাহ আমাদেরকে নবী (ছা.)-এর সুন্নাত পালনে অগ্রগামী হতে ও তার সুন্নাত প্রসারে অগ্রজ হবার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!