শিল্পের মানবিকতা
-আতিকুর রহমান*


ফ্রান্সের ‘চার্লি হেবদো’ পত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কার্টুন প্রকাশ এবং তারই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নানা ঘটনা বিভিন্ন মহলে আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে এবং ফ্রান্সেরই একটি স্কুলের এক শিক্ষক বাকস্বাধীনতার ক্লাসে এই ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশনার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। যার ফলে কোনো এক মুসলিম তাকে হত্যা করে সেই আততায়ীও নিহত হয়। তারপর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও প্রশাসনের তরফ থেকে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি একরকম জব্দ করার যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এইভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে ঘটনাটি প্রকাশ পায়। তবে এতসব গোলযোগ আমরা এই নিবন্ধে আলোচনা করতে চাইব না, আমাদের দেখার মূল বিষয় হলো শিল্পগত ও তাত্ত্বিক কিছু প্রসঙ্গ। আমার এক অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষিকা এ প্রসঙ্গে আমার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর কাছে আমি আমার মতামত ব্যক্ত করেছিলাম। এই প্রবন্ধে আমি আমার সেই সব মতামত সকলের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করব ইনশা-আল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাকে তাওফীক্ব দান করুন।
সমস্ত প্রশংসা সেই মহান প্রতিপালকের জন্য, যিনি আমাদের নিতান্ত প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত অসংখ্য নেয়ামত দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন। আমরা কেবল সেই মহান আল্লাহর ইবাদত করি এবং তাঁরই প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করি। অতঃপর শেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।

শিল্প কী? এর কোনো সর্বজনমান্য সংজ্ঞা পাওয়া যায় না। তবুও একথা সুবিদিত যে, শিল্প-সাহিত্যের প্রভাবে মানুষের মন বিশেষভাবে স্পন্দিত হয়ে থাকে। এই স্পন্দন ঘটে রসানন্দের দিক থেকে। আবার উপভোক্তার জীবনেও শিল্পচর্চা নানাভাবে প্রভাব রেখে যায়। শিল্প কেবল মানবজীবনকে উপস্থাপিত করে না; মানব জীবনের বহুবিধ বিষয়ের সংস্থাপনও ঘটিয়ে থাকে। এটি কেবল মানুষের জীবনশৈলী থেকে নির্মিত নয়, বরং মানুষের জীবন বিন্যাসের নানা বিষয়ের নির্মাণও ঘটিয়ে থাকে। যেমন কোনো বিপ্লবকে চিত্রিত করে বা তার অনুভূতি থেকে সাহিত্য রচনা হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি সাহিত্যের মাধ্যমে অনাগত বিপ্লবের বীজ উপ্ত হবার সম্ভাবনা শতভাগ থেকে যায়। এজন্য আমরা বলতে পারি, যেহেতু শিল্পকলা মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে থাকে, তাই মানব জীবনের কিছু দায়িত্ব ও রীতিনীতি শিল্পের উপর অবশ্যই বর্তায়। শিল্পসাহিত্য কোনো শূন্যজাত মানব নিরপেক্ষ বিষয় নয়। এমনকি শিল্প রচিতই হয় মানুষের জন্য। মানুষকে বাদ দিয়ে আমরা শিল্পের প্রকাশ কল্পনাও করতে পারি না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বক্তব্য হলো, শিল্পের মানবিকতা তার অস্তিত্বকে রক্ষা করে। শিল্পের মানবিকতা হলো সেই নান্দনিক শিল্পতত্ত্ব, যাতে নিহিত থাকে মানুষের কল্যাণময় দিগন্তের উদ্ঘাটন এবং অন্ততপক্ষে মানুষের জন্য অকল্যাণকর যাবতীয় ধ্যান-ধারণার বিপরীতে অবস্থান। কল্যাণ ও অকল্যাণের বিষয়ে সমস্ত মানুষের ঐকমত্য পাওয়া অসম্ভব। তাহলে প্রশ্ন উঠবে, আমরা শিল্পের পরিসরে কীভাবে সেই সব বিষয়গুলো নির্ধারণ করব? এর উত্তরে কিছু কথা পরে আলোচনা করা হবে ইনশা-আল্লাহ। তবে আপাতত এখানে এটুকু বলা যায় যে, শিল্পীর মন হলো সংবেদনশীল। এই সংবেদনশীলতা তিনি কোন উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করেছেন, তা বিবেচনার বাইরে রাখা যায় না। তিনি যদি তাঁর শিল্পগত বিশেষ ক্ষমতায় অন্যকে আঘাত করার ইচ্ছা রাখেন, তবে তা একরকম অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে। যদিও অপরাধের ধরনটা বাস্তবের সমরূপ নয়, তথাপি বলা যায়, শিল্পের অস্ত্র দিয়ে অকারণে আক্রমণ করা হলে শিল্পের মানবিকতা বিনষ্ট করা হয়। বাকস্বাধীনতার ছলনায় শিল্পের এই মানবিকতাকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

পাঠক হয়তো ভাবছেন, এতসব তত্ত্বকথা কীসের জন্য! আসলে এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যার উত্তর সহজে সবার কাছে দেওয়া সম্ভব হয় না। উচ্চতর গণিতের কোনো প্রশ্নের উত্তর সহজ হলেও তা সকলের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠে না। ঠিক তেমনি ইসলাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এমনও প্রশ্ন রয়েছে, যার উত্তর উপলব্ধি করা সকলের কাছে সহজ হয় না। উপরন্তু আজকের পৃথিবীতে ইসলামোফোবিয়ার আবহে ইসলাম নিয়ে সন্দেহ, অবজ্ঞা এবং কু-ধারণা এমন জটিলতার সৃষ্টি করেছে, যার ফলে সরল কথাও অনেকের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। অনেকে ভাবছেন, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করলে তাতে প্রতিক্রিয়া জানানোর কী প্রয়োজন! কেন মুসলিমরা এই বিষয়ে এতটা স্পর্শকাতর! কার্টুন প্রকাশ করেছে তো কী হয়েছে! এই ধরনের উপেক্ষা করার মানসিকতায় মুসলিমরা কেন নিজেদের বিলীন করতে পারে না, তার একটা জবাবদিহি বিশেষভাবে প্রয়োজন।

এখানে আরও একটি কথা আছে। পশ্চিমের দেশগুলোতে নাকি যিশুখ্রিষ্টেরও ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হয় এবং সেগুলো নাকি তারা উপভোগ করে থাকে। তাই মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কার্টুন প্রকাশিত হলে তার শৈল্পিক উপভোগ্যতা গ্রহণ করার পরামর্শ দিতে পারেন কিছু স্বঘোষিত উদারপন্থি (নাঊযুবিল্লাহ)। পশ্চিমাদের তথাকথিত আধুনিকতায় যদি আত্মমর্যাদাবোধ না থাকে, তাহলে তাকে দৃষ্টান্ত হিসাবে পেশ করে অন্য কোনো মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পশ্চিমা আধুনিকতা যেসব মানসিকতা ধারণ করে, নির্বিচার সমর্থন থেকে তার প্রতি সকল মানুষকে দীক্ষিত করার যারা চেষ্টা করছেন তারা ভুলেই গেছেন যে, মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক কর্মগুলো সম্পাদিত হয়েছে এইসব স্বঘোষিত সভ্য দেশগুলোর মধ্য দিয়ে।

মুসলিমরা কেন নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে অবমাননা করলে চুপ থাকতে পারে না? এর উত্তর সহজ হলেও আমরা একটু অন্যভাবে বোঝার চেষ্টা করব। এক্ষেত্রে ইসলামের মূল চেতনাটি আমাদের বুঝতে হবে। একজন প্রকৃত মুসলিমের কাছে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হলো মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। এই ভালোবাসা হলো তার প্রতি বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য বিষয়। এই বিশ্বাসকে ইসলামের পরিভাষায় বলা হয় ঈমান। আর এই ঈমানের অবস্থান হলো তিনটি স্তরে। প্রথমত, অন্তরে বিশ্বাস এবং বিশ্বাস অর্জনের জন্য জ্ঞান। দ্বিতীয়ত, মৌখিক স্বীকৃতি ও ঘোষণা। তৃতীয়ত, সেই বিশ্বাসের অনুসরণে নিজের বাস্তব জীবনের কর্মসম্পাদনা করা। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হলে তার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়টি ঈমানের এই তৃতীয় স্তরের অন্তর্ভুক্ত। ঈমানের মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, যার অর্থ হলো নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি তীব্র সম্মানবোধ, অনুরাগ এবং পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ। আর এখান থেকেই নিজের ইজ্জত ও মর্যাদার চেয়েও অধিক তীব্রতায় নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইজ্জত ও মর্যাদা রক্ষা করার আন্তরিকতা বিঘোষিত হয়। এই ভালোবাসার অন্য একটি দিক হলো, তার প্রতি ঘৃণাজ্ঞাপক সমস্ত কর্মকাণ্ডের উপর তীব্র ঘৃণা ব্যক্ত করা। এক্ষেত্রে ভালোবাসার একটি স্বভাবগত দাবিই কার্যকর করা হয়। যিনি ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু তার প্রতি অপমান কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না এবং কেউ তাঁর প্রতি অপমান করলে তাতে তীব্র প্রতিবাদ করা আসলে সেই ভালোবাসারই প্রকাশ। আবার এই অপমান যদি অকারণে করা হয়, তখন তার প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এখন কেউ যদি ভাবে যে, তিনি বিষয়টি উপেক্ষা করবেন, তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় ভালোবাসার মানুষটির প্রতিই উপেক্ষা প্রদর্শন। এছাড়া ইসলামের দৃষ্টিকোণে সাধ্য থাকা সত্ত্বেও অন্যায় কাজে নিষেধ না করার অর্থ একরকম নীরব সমর্থন। আর এই অন্যায় কাজ যদি ধর্মীয় ভাবাবেগের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশে আঘাত হানতে চায়, তখন তার প্রতি ক্ষোভ জ্ঞাপন করা আবশ্যক হয়ে যায়। অর্থাৎ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অটুট ভালোবাসা নিয়ে তার প্রতি অবমাননাকর সমস্ত কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করা হলো মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীকারের অংশবিশেষ।
ধর্মীয় স্বাধীনতা হলো দেশীয় এবং বৈশ্বিক স্তরে স্বীকৃত একটি সাংবিধানিক অধিকার। এটি মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, এই ধর্মীয় স্বাধীনতা মৌখিক ও লিখিতভাবে যতটা সুরক্ষিত, কার্যক্ষেত্রে তার ফল প্রকাশ ততটা স্পষ্ট নয়। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগানেও বিশেষ ধর্ম মানসের প্রতি অবজ্ঞা এবং ঘৃণা দেখে অনেক সময় হতবাক হতে হয়। আমরা এটা দেখেছি এবং অনুভব করেছি যে, ইসলামোফোবিয়ার লালন-পালন এই ধর্মনিরপেক্ষতার অন্তরালেও অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রতিপালিত হয়ে থাকে। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ যদি প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা হয়ে থাকে, তাহলে তার সুফল আমরা অবশ্যই পাব। ইসলাম এই স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয় এবং দ্বীন বা ধর্মের ব্যাপারে সমস্ত রকমের বাধ্যবাধকতা বা জোরজবরদস্তিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা অত্যন্ত অবমাননাকর এবং ঈমানের দাবি থেকে তা তীব্রভাবে ঘৃণিত ও জঘন্য একটি অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হলেও আমরা কোনোভাবেই ফ্রান্সের ওই শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করার বিষয়টি সমর্থন করতে পারি না। এ আমাদের অত্যন্ত স্পষ্ট অভিমত। ইসলামের দিক নির্দেশনা অনুসারে এসব অপরাধের শাস্তি রাষ্ট্রনায়কের আয়ত্তাধীন, আবেগে উন্মাদ হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ফলে পরিণতি হিসাবে ইসলামের প্রতি কু-ধারণা চড়াও হয় এবং মুসলিমদের জীবন যাপন আরও কষ্টকর ও সংকীর্ণতায় অসহনীয় হয়ে ওঠে। ফ্রান্সেও আমরা সেটাই দেখেছি। একজন আততায়ীর হত্যার দোষ বিপুল সংখ্যক মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে চুরমার করার রাষ্ট্রীয় আস্ফালন কত নিষ্ঠুর ও অবিবেকী হতে পারে, সেটা অনুমান করাও আমাদের সবার সহজসাধ্য নয়। অথচ সীমালঙ্ঘন করা না হলে প্রতিক্রিয়ার সমস্ত দায় বর্তায় ক্রিয়ার উপর। লজ্জার কথা হলো, যেসব ঘটনা ও কর্মকাণ্ড সন্ত্রাসবাদের প্ররোচনা যুগিয়ে থাকে, সে ব্যাপারে আমরা একেবারেই ভ্রুক্ষেপ করতে চাই না। উপরন্তু সন্ত্রাস দমনের নামে আমরা রচনা করি অন্য আরেক সন্ত্রাস। ফ্রান্সেও আমরা দেখেছি এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মসজিদ বন্ধ করার রাষ্ট্রীয় উদগ্রতা। ফ্রান্সসহ বিশ্বের বেশ কিছু স্বঘোষিত সভ্য দেশ মহিলাদের হিজাব পরিধানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এসব দেশে শরীর নগ্ন করার ক্ষেত্রে মানুষের পোশাক পরার স্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও এবং সেই যুক্তি দিয়ে নগ্নতার বৈধতা ঘোষিত হলেও, কোনো মুসলিম মহিলার ধর্মীয় স্বাধীনতাকে মেনে তাঁর ধর্মবিধি অনুযায়ী পোশাক পরিধান করার স্বাধীনতা থাকছে না। স্পষ্ট যে, এটা আসলে স্বাধীনতার ছলনায় একটা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধ হলো সন্ত্রাসেরই সহোদর। বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং ইসলামোফোবিয়ায় তাদের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা, লাঞ্ছনা ও বিদ্রুপ প্রভৃতি অপমানজনক বিষয়গুলো প্রমোট করা সুনিশ্চিতভাবে সন্ত্রাস হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মানুষের তেমন কোনো সচেতনতা পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি মুসলিমদের প্রতি এই সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস অনেকের কাছে প্রশংসিত হয়ে থাকে। আসলে এই ধোঁকা অধিকাংশ মানুষকে অভিভূত করে রেখেছে। হে আল্লাহ! সভ্যতার অহমিকায় আত্মহারা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের প্রবঞ্চনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন।

বাকস্বাধীনতা হলো ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশবিশেষ। এই বাক-স্বাধীনতা নিয়ে আমাদের বেশ কিছু বক্তব্য রয়েছে। বিশাল ভূখণ্ডের শাসক উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মসজিদে খুৎবা দিচ্ছেন, তখন এক সাধারণ প্রজা তাঁকে জিজ্ঞেস করছেন, রাষ্ট্রের সম্পদ থেকে তিনি এত বেশি কাপড় কোথায় পেলেন, যখন বাকিরা অনেক কম কাপড় পেয়েছেন? রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষ থেকে সেই কৈফিয়ত দেওয়া আবশ্যিক মনে করা হয়েছে। এটাই তো বাকস্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা আসলে শক্তিমানের মুখোমুখিতে শক্তিহীনের সম্বল। এই স্বাধীনতায় নির্ভীত হয় সংখ্যাগুরুর সম্মুখে সংখ্যালঘুর উচ্চারণ। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা এই বাকস্বাধীনতা দেখতে পাই? আসলে বাকস্বাধীনতা যেন একটা মুখোশ মাত্র, যার আড়ালে থাকে কুৎসিত, কদর্য ও হিংস্র একটি পাশবিক চেহারা। এখানে বাকস্বাধীনতার আরও একটি দিক আমরা উল্লেখ করতে চাই। বাকস্বাধীনতা কি শুধু নিজের দিক থেকে কার্যকর করা হবে, নাকি এর সমবায়িক সুরাহা থাকা অনিবার্য? আমার মুখ দিয়ে আমি কী বলব এবং কী বলব না, সে ব্যাপারে স্বাধীনতা তো আমার নিশ্চয়ই আছে। তাই বলে কি আমি কাউকে গালাগাল বা কটূক্তি করতে পারি? কখনই নয়। কারণ, আমার যেমন কথা বলার স্বাধীনতা আছে, তেমনি অন্য সকল মানুষের তাদের নিজেদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করার ব্যক্তিস্বাধীনতাও রয়েছে। আমি নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে দিয়ে অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারি না। এমনটা করা হলে তা অবশ্যই অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে এবং সেটা কোনোভাবেই ব্যক্তিস্বাধীনতার সুবাস মাখিয়ে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। যে বাকস্বাধীনতা অন্যকে অপমান করতে শেখায়, সেটা তর্কের ছলে স্বাধীনতা বলা হলেও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আসলে ব্যক্তিস্বাধীনতা হলো মানুষের পারস্পরিক ও আন্তরিক সেই সব সম্পর্কের সমীকরণ, যার মধ্য দিয়ে নিজের এবং অন্য সকল মানুষের অধিকারসমূহের প্রতি সুষম সংবেদনশীলতায় সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়। শিল্পের বিষয়টিও এর বাইরে নয়। আর এজন্যই আমি শিল্পের স্বাধীনতা থেকে শিল্পের মানবিকতাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাধান্যযোগ্য বলে মনে করি। আমাদের উচিত হবে অন্যের অনুভূতি, আবেগ, বিশ্বাস এবং সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকা। আমি হয়তো সবার বিশ্বাস গ্রহণ করব না, কিন্তু প্রকাশ্যে তাদের সেই বিশ্বাসকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে নিজের বিশ্বাসের প্রতি তাদেরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করার জন্য উস্কে দিতে পারি না। এটা লক্ষণীয় যে, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র করা হলেও মুসলিমরা মূসা (আলাইহিস সালাম) (মোজেস) কিংবা ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে (যীশু) নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করে না। ইসলামে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মতোই সকল নবী নিয়ে কার্টুন প্রকাশ করা চরম ঘৃণিত এবং জঘন্য অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়। এমনকি পৌত্তলিকদের দেবমূর্তির প্রতি গালাগাল বা কটূক্তি করা ইসলাম নিষিদ্ধ করে। এইভাবে অন্যের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হলে সামগ্রিকভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়টি সাফল্য লাভ করতে পারবে।

মনে করুন, আপনি একজন শিক্ষক এবং কথাশিল্পী। ভাষার অলঙ্করণে আপনি সাধারণ কথাকে অসাধারণ মার্গে উন্নীত করতে পারেন। এখন আপনার এই বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ক্লাসের মধ্যে এমন একটি দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ পেশ করছেন, যাতে সেই ক্লাসে আপনারই কোনো ছাত্র মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্ট পাবে। আপনি কি বাকচাতুর্য প্রকাশ করার স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিয়ে আপনার ছাত্রকে আঘাত করতে পারবেন? নিশ্চয়ই নয়। অন্যের অনুভূতিকে অনুভব করতে পারাই হলো আমাদের মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম সম্বল। এই সম্বলকে হারিয়ে ফেলে শুধু বাকস্বাধীনতার খোলস লাগিয়ে নিরেট সু-সভ্যতার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যায়। আর আমাদের শিল্পবোধ যদি এই দিকটি খেয়ালে না রাখে, তাহলে তার পরিণতি মোটেই সুখকর হবে না। শিল্পের মধ্যে একটা কথার বিলাসিতা থাকে এবং সেটা আমাদের প্রাত্যহিক প্রয়োজন থেকে কল্পনার বিস্তৃত জগতে অবারিত করে দেয়। এখন আমরা যদি শিল্পের মধ্যে হিংসা, ঘৃণা, অবজ্ঞা ও বিদ্বেষ প্রভৃতি অমানবিক বিষয়গুলো প্রমোট করতে থাকি, তাহলে তার প্রভাবে শিল্পের উপভোক্তার মন যে কল্পনা লাভ করবে, তা দূষিত, কলুষিত, অসহনশীল ও নির্বুদ্ধিতায় ব্যপীত হয়ে যাবে। শিল্পের মধ্যে যদি ইসলামোফোবিয়া পালিত হয়ে থাকে, তাহলে তার মধ্যে আসলে মানুষের ক্ষতি বৈ কোনো লাভ হবে না। বাকস্বাধীনতার ছাড়পত্র দেখিয়ে যদি কোনো শিল্প মানুষের অকল্যাণকে উদযাপিত করে, তর্কের খাতিরে তাকে শিল্প বলে মেনে নিলেও তার অপরাধকে ক্ষমা করা যায় না। আর তাই শিল্পের মানবিকতাকে লঙ্ঘন করার কারণে শিল্পীর অপরাধকে বিচারালয়ের ঊর্ধ্বে ভাবা সমীচীন নয়।

এখানে আরও একটা কথা আমি বলতে চাই। মনে করুন, আমি আপনাকে ব্যঙ্গ করে (মাফ করবেন; আমি ব্যঙ্গ করছি না, এটা নিছক বোঝানোর জন্য) কোনো শিল্প রচনা করেছি। এখন আপনি যদি সেই শিল্পকে সমাদর করেন, কিংবা আমার শিল্পের স্বাধীনতা ভেবে উপেক্ষা করেন, তাহলে আমার সেই শিল্পের প্রকাশে কোনো বাধা থাকে না। কিন্তু এতে যদি আপনি মনঃক্ষুণ্ণ হন এবং আমাকে এই বিষয়ে নিষেধ করেন, তখন শিল্পের মানবিকতায় আমার উচিত হবে, আপনাকে ব্যঙ্গ করে কোনো শিল্প রচনা না করা। যিনি আমাকে শিল্পী পরিচয় দেবেন, অর্থাৎ যাকে নিয়ে আমি শিল্প রচনা করব, তার প্রতি যদি আমার কোনো শ্রদ্ধা না থাকে, যার মাধ্যমে আমার শিল্পী পরিচয় তৈরি হবে এবং আমি যদি ভালোবাসতে না পারি আমার শিল্পের অবলম্বনকে, তাহলে আমার শিল্প একরকম যুলুমের উপায় হয়ে উঠবে। এটা এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনাও বলা চলে। আর যদি শিল্পীর উদ্দেশ্য হয় অন্যকে অকারণে আক্রমণ করা, শিল্পের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে কারও আবেগ নিয়ে খেলা করা, শিল্পের স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করে অন্যের স্বাধীনতা ও ইজ্জতকে নষ্ট করা, তাহলে তা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য করা উচিত। এটাও এক ধরনের সন্ত্রাস। শিল্পকে বাস্তব জীবনের ঊর্ধ্বে কোনো অলৌকিক অস্তিত্ব মনে করে এই সন্ত্রাসকে উপেক্ষা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রসঙ্গত, মুসলিমদের এই গর্জে উঠার মাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্রটির শিল্পগত বৈধতা খারিজ হয়ে যায়। আমি আবারও দৃঢ়তার সাথে বলছি যে, শিল্পের মানবিকতা লঙ্ঘন করে শিল্পের স্বাধীনতা কখনোই বেশি প্রাধান্য পেতে পারে না, এমনটা করা হলে শিল্পের শিল্পত্ব বাতিল বলে বিবেচিত হবে।

পরিশেষে আমি মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানাই রব্বুল আলামীনের প্রতি আত্মসমর্পণের দিকে। আমাদের প্রতিটি কর্মই যিনি বিচার দিবসে উপস্থাপিত করবেন। আমরা যেন শান্তি ও নিরাপত্তার পথে অবিচল থাকতে পারি এবং সমস্ত রকম অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন থেকে আত্মরক্ষা করতে পারি। মনে রাখবেন, কেউ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি কটূক্তি করে তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তবে আমরা আমাদের ঈমানের তাগিদে বিষয়টির প্রতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এক্ষেত্রে বয়কট অত্যন্ত কার্যকর একটি প্রতিক্রিয়া। আর এটাও জানি যে, আমরা যতখানি মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালোবাসি, তার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসেন আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক মহান আল্লাহ। আমরা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনিই তো ইজ্জত ও সম্মানের মালিক। এ ব্যাপারে আমরা মহান আল্লাহর কাছে আমাদের দুর্বলতার ক্ষমা চাই এবং তাঁর বাণীকে স্মরণ করি। আর মহান আল্লাহ তো বলেছেন, ‘বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট’ (হিজর, ১৫/৯৫)


* বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।