ঈমান-আক্বীদা

প্রশ্ন (১) : পীর কাকে বলে? ইসলামে পীরের বিধান কী?

-শামসুযযামান
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : ‘পীর’ (پیر‎) শব্দটি ফারসী শব্দ। এর অর্থ বয়োজ্যেষ্ঠ। ব্যবহারিকভাবে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ উভয়কেই ‘পীর’ বলা হয়। মূলত সূফীবাদী বা তাসাওউফপন্থীদের গুরুকে ‘পীর’ নামে অভিহিত করা হয় (পীরবাদের বেড়াজালে ইসলাম, পৃ. ৩৬)। তৃতীয় শতাব্দী হিজরীতে গ্রীক, পারসিক ও হিন্দু সভ্যতার সংমিশ্রণে পীর-মুরীদী প্রথার উৎপত্তি হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা একসময় তাদের ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা প্রদানকারী ব্যক্তিকে ‘পীর’ নামে অভিহিত করতো। যা এখনো বহু জায়গায় প্রচলিত আছে। ১৯৮১ সালের সরকারী হিসাব মতে এদেশে প্রায় দুই লক্ষ আটানব্বই হাজার ‘পীর’ রয়েছে। যারা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে ‘অসীলা’ হিসাবে পূজিত হচ্ছে। তারা নিজেদের তৈরি বিভিন্ন জঘন্য বুলি, নিয়ম-নীতি ও নোংরা দর্শনের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে যেমন ধোঁকা দিচ্ছে, তেমনি ভ্রান্তিতে নিপতিত করে পকেট ছাপ করছে। জীবিত হৌক বা মৃত হৌক তাদের সন্তুষ্টির উপরে মুরীদের ইহকালীন মঙ্গল ও পরকালীন মুক্তি নির্ভর করে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এদের মতে পীরকে কামনা করা আল্লাহকে কামনা করার শামিল (নাঊযুবিল্লাহ)। 

অথচ ইসলামী শরী‘আতে পীর ধরা বা মুরীদ হওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয কাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছা.), ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ এমনকি তাবে-তাবেঈনের যুগে পীর-মুরীদীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ (ছা.) কোনো পীরের অনুসরণ করার নির্দেশ দেননি। বরং মহান আল্লাহ তার ‘অসীলা’ তথা নৈকট্য অন্বেষণ করতে বলেছেন (আল-মায়েদাহ, ৫/৩৫)। এর অর্থ ‘পীর’ বা কোনো মাধ্যম ধরা নয়। বরং এর অর্থ ‘তাঁর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে’ তাঁর নৈকট্য সন্ধান করা (তাফসীরে ইবনে কাছীর, উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্র.)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাসূল এ উদ্দেশেই প্রেরণ করেছি, যেন আল্লাহর নির্দেশে তাঁর আনুগত্য করা হয়’ (আন-নিসা ৪/৬৪)। অপর আয়াতে তিনি বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের নেতার আনুগত্য করো’ (আন-নিসা, ৪/৫৯)। যিনি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা করেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১২৯৮; মিশকাত, হা/৩৬৬২)। রাসূলুল্লাহ (ছা.) পীরও ধরতে বলেননি। বরং তিনি বলেন, ‘তোমরা আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; মিশকাত, হা/১৬৫)। অতএব, পরকালে জান্নাত পিয়াসী প্রত্যেক মুসলিম সঠিক দ্বীন পাওয়ার জন্য পীর না ধরে বরং আল্লাহ, তাঁর রাসূল (ছা.) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে জীবন চলার একমাত্র পথপ্রদর্শক হিসাবে গ্রহণ করবে। আল্লাহ তা‘আলা সকলকে সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

প্রশ্ন (২) : অমুসলিম ব্যক্তি নিজে নিজেই কালেমা পড়ে মুসলিম হতে পারে কি?

জুয়েল বিন মনিরুল ইসলাম
 পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে তার প্রেরিত বার্তাবাহক হিসাবে বিশ্বাস করত মুখে ‘আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রসূলুহু’ উচ্চারণ করলেই একজন ব্যক্তি মুসলিম হয়ে যায়। এর জন্য কোনো আলেম বা ইমামের সামনে পড়তে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন হাবশার বাদশা নাজাশী কারও সামনে ঘোষণা না দিয়ে সবার অজান্তেই কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলে। রাসূলুল্লাহ (ছা.) যখন তার মুত্যুর কথা জানতে পারেন, তখন তিনি ছাহাবীদেরকে নিয়ে গায়েবানা জানাযা পড়েন। মুনাফিক্বরা বলল, আমরা একজন অমুসলিম হাবশীর জন্য জানাযা পড়ব? তখন আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বলেন, আহলে কিতাবগণের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং যা তোমাদের প্রতি ও তাদের প্রতি নাযিল হয়েছে, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে আল্লাহর প্রতি অনুগত হয়ে’ (আলে ইমরান, ৩/১৯৯; নাসাঈ, সুনানুল কুবরা, হা/১১০৮৮; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩০৪৪; তাফসীরে ইবনু কাছীর, আলে ইমরানের ৩/১৯৯ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)। ছুমামা ইবনে উছাল (রা.)-কে ইসলাম গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ (ছা.) দাওয়াত দিলেও তিনি গ্রহণ করেননি। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলে ইসলামের মাহাত্ম্য বুঝতে পেরে তিনি বাগানে গিয়ে গোসল করে মসজিদে প্রবেশ করে নিজে থেকেই কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান (ছহীহ বুখারী, হা/৪৬২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৬৪)।

প্রশ্ন (৩) : তাওহীদকে তিনভাগে ভাগ করা কি ঠিক? কখন থেকে এভাবে ভাগ করার প্রচলন হয়েছে?  

-মুহাম্মাদ বিলাল
ওয়ারী, ঢাকা।

উত্তর : বর্তমানে শব্দগতভাবে তাওহীদের যে প্রকার দেখা যায় তা রাসূলুল্লাহ (ছা.) ও ছাহাবীগণ হতে প্রমাণিত না হলেও একাধিক আয়াত এবং ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, তাওহীদ তিন ভাগেই বিভক্ত। আর তা হলো, (১) তাওহীদে রুবূবিয়াহ, অর্থাৎ সৃষ্টি ও পালনে আল্লাহর একত্ব। (২) তাওহীদে উলূহিয়াহ বা ইবাদাহ, অর্থাৎ ইবাদত বা উপাসনায় একত্ব। (৩) তাওহীদে আসমা ওয়া ছিফাত, অর্থাৎ নাম ও গুণাবলির একত্ব। নিম্বোক্ত আয়াত ও ছহীহ হাদীছসমূহ তার বাস্তব প্রমাণ। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

 رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا

‘তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের অন্তর্বর্তী যা কিছু আছে, সে সবের রব। কাজেই তারই ইবাদত করো এবং তার ইবাদতে ধৈর্যশীল থাকো। তুমি কি তাঁর সমনাম গুণসম্পন্ন কাউকেও জানো? (মারইয়াম, ১৯/৬৫)। অত্র আয়াতে প্রথম অংশে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের কথা এবং মধ্যের অংশে আল্লাহর উলুহিয়্যাত বা ইবাদাতের কথা বলা হয়েছে এবং শেষ অংশে তার গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আরো দ্রষ্টব্য (আয-যারিয়াত, ৫১/৫৬; আন-নাহল, ১৬/১৬-১৭; আল-ইসরা, ১৭/২৩; আন-নিসা, ৪/৩৬; আল-আনআম, ৬/১৫১ প্রভৃতি আয়াত ও ছহীহ বুখারী, হা/২৮৫৬, ৫৯৬৭, ৬২৬৭, ৬৫০০, ৭৩৭৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৩০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০৫২ প্রভৃতি হাদীছ)।

প্রশ্ন (৪) : যারা কুরআন মানে কিন্তু হাদীছ মানতে চায় না তাদের ছালাত কবুল হবে কি?

ফারূক ইসলাম ও আব্দুল গফুর
 নলডাঙ্গা, নাটোর।

উত্তর : ভারত উপমহাদেশে আত্মপ্রকাশকারী একটি ভ্রান্ত ফেরকার নাম ‘আহলে কুরআন’। এরা অতীতের ভ্রান্ত ফেরকা খারেজী ও রাফেযীদের নতুন রূপ। তাদের মতে, কুরআনই সকল সমস্যা সমাধানের পূর্ণাঙ্গ উৎস। হাদীছ মানার কোনো প্রয়োজন নেই। অথচ এই বিশ্বাস চরম গোমরাহী ছাড়া কিছুই নয়। একথা স্বীকার করার অর্থ হলো কুরআনকেই অস্বীকার করা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো’ (আল-হাশর, ৫৯/৭)। এখানে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলের বাণীকে গ্রহণ করার আদেশ দিয়েছেন। কুরআন ও হাদীছ দু’টোই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ অহী। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছা.) নিজের থেকে কোনো কথা বলতেন না, যা বলতেন সবকিছু অহী থেকেই বলতেন (আন-নাজম, ৫৩/৩-৪)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো ফায়ছালা দিলে কোনো মুমিন নারী-পুরুষের জন্য সে ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করার অধিকার নেই’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩৬)। তাছাড়া আল্লাহ হাদীছ নাযিল করেছেন কুরআনের ব্যাখ্যাস্বরূপ। তাহলে হাদীছকে ছেড়ে কুরআন বুঝা সম্ভব হয় কীভাবে? আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে’ (আন-নাহল, ১৬/৪৪)। যারা এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের দাবিদার কুরআন তাদের বিপক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এমন আক্বীদায় বিশ্বাসের ফলে মানুষ কাফের হয়ে যায়। তাই যারা এই বিশ্বাস লালন করে তাওবা না করা পর্যন্ত তাদের কোন ইবাদতই কবুল হবে না। ওয়াল্লাহু আ‘লাম।

 

কুরআন

প্রশ্ন (৫) : রামাযান মাসে ৩০ দিনে ৩০ পারা কুরআন খতম করার নির্দিষ্ট কোনো হুকুম ও ছওয়াব আছে কি?           

মাহমুদা বেগম
বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : রামাযান মাসে ৩০ দিনে ৩০ পারা কুরআন খতম করার পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো হুকুম ও ফযীলত নেই। তবে প্রত্যেক ব্যক্তি রামাযানে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করবে এটাই সুন্নাত। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রামাযানের প্রত্যেক রাতেই জিবরীল (আ.)  রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তিনি তাঁকে কুরআন শুনাতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০২, ৪৯৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩০৮)। মাসরূক্ব (রাহি.)  আয়েশা (রা.) -এর মাধ্যমে ফাতেমা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, নাবী করীম (ছা.) আমাকে গোপনে বলেছেন, প্রতি বছর জিবরীল (আ.) আমার সঙ্গে একবার কুরআন শুনান ও শুনেন; কিন্তু এ বছর তিনি আমার সঙ্গে দুবার এ কাজ করেছেন। মনে হচ্ছে আমার মৃত্যু আসন্ন (ছহীহ বুখারী, ৬৬/৭, ‘জিবরীল (আ.)  নাবী (ছা.)-এর সঙ্গে কুরআন মাজীদ শুনতেন ও শুনাতেন’ পরিচ্ছেদ)। উল্লেখ্য যে, ‘রামাযানের প্রত্যেক রাতেই জিবরীল (আ.) রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সাথে কুরআন তেলাওয়াত শুনতেন ও শুনাতেন’ -মর্মে বর্ণিত হাদীছের দোহাই দিয়ে আমাদের সমাজে তারাবীহর ছালাতে কুরআন খতম করার আমল চালু হয়েছে। যাকে বলা হয় ‘খতমে তারাবীহ’। অথচ ধর্মের নামে সমাজে এটি একটি নতুন প্রথা। এতে ইমাম যেমন তারতীলসহ তেলাওয়াত করতে পারেন না, তেমনি মুক্তাদীরা কিছু বুঝতে পারেন না। তাছাড়া এতে ছালাতের খুশূ-খুযূ ঠিক থাকে না। তবে তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ ছালাতে রাসূলুল্লাহ (ছা.) ও ছাহাবায়ে কেরাম বেশি বেশি তেলাওয়াত করতেন মর্মে অনেক দলীল রয়েছে (মুওয়াত্ত্বা মালেক, ১/১১৫; মিশকাত, হা/১৩০২; ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ, ৪/১৮৬)। সাথে সাথে যে কোনো সময় কুরআন তেলাওয়াত করলে তাতে ছওয়াবের কোনো তারতম্য ঘটে না। বরং তেলাওয়াতের ছওয়াব সর্বাবস্থায় সমান। কেননা রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে তার বিনিময়ে ১০টি ছওয়াব পাবে। আমি বলছি না যে, الم একটি হরফ বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ ‘লাম’ একটি হরফ, ‘মীম’ একটি হরফ’ (তিরমিযী, হা/২৯১০; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩৩২৭; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১৪১৬; ছহীহ আল-জামে‘, হা/৬৪৬৯; সুনানে দারেমী, হা/৩৩১১)।

প্রশ্ন (৬) : রেকর্ডকৃত কুরআন তেলাওয়াত শুনলে কি তেলাওয়াতকারী ও শ্রবণকারী উভয়েই নেকী পাবে

আলমগীর
পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা।

উত্তর : রেকর্ডকৃত অবস্থায় কুরআনের তেলাওয়াত তার নিজস্ব স্থান থেকে সরে যায় বিষয়টি এমন নয়। বরং যে কোনো মাধ্যমে তেলাওয়াত হলেই তেলাওয়াতকারী ও শ্রবণকারী উভয়েই নেকী পাবে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوْا لَهُ وَأَنْصِتُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ

‘যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করো এবং নীরব নিশ্চুপ হয়ে থাকো, হয়তো তোমাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করা হবে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/২০৪)। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে, তার বিনিময়ে সে ১০টি নেকী পাবে। আমি বলছি না যে, الم একটি হরফ; বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ, ‘মীম’ একটি হরফ’ (তিরমিযী, হা/২৯১০; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩৩২৭; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১৪১৬; ছহীহ আল জামি’, হা/৬৪৬৯; সুনানে দারামী, হা/৩৩১১)। অত্র আয়াত ও হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শ্রবণকারী যখন রেকর্ডকৃত কুরআন শুনবেন তখন তিনি শ্রবণের কারণে যা নেকী পাবেন তার সমপরিমাণ নেকী রেকর্ডে তিলাওয়াতকারীর আমলনামায়ও লিখিত হবে ইনশাআল্লাহ।

 

হাদীছ

প্রশ্ন (৭) : আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত শু‘আবুল ঈমান লিল বায়হাক্বীর ৩৮৫৪ নং হাদীছটি কি ছহীহ? যে হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, এ রাত হলো অর্ধ শা‘বানের রাত (লায়লাতুল বারাআত)। আল্লাহ তা‘আলা এ রাতে সব বান্দার প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন। ক্ষমাপ্রার্থীদেরকে ক্ষমা করেন। রহমতপ্রার্থীদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন। আর হিংসুকদেরকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন।

-মাযহারুল ইসলাম
কালাই, জয়পুরহাট।

উত্তর : উক্ত হাদীছটি যঈফ (আল-জামেঊছ ছগীর, হা/৩৬৬২; যঈফুল জামে‘, হা/১৭৩৯)।

প্রশ্ন (৮) : ‘বান্দা যখন ছালাতে দাঁড়ায় তখন তার পাপগুলো শরীর থেকে কাঁধে ও মাথায় চলে আসে। এরপর যখন সে মাথা নিচু করে রুকূতে যায় তখন তার পাপগুলো কাঁধ ও মাথা থেকে ঝরে নিচে পড়ে যায়’। এমর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ?

ফযলে মাহমূদ
 মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : হ্যাঁ, এমর্মে বর্ণিত হাদীছটি ছহীহ। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন,

إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا قَامَ يُصَلِّى أُتِىَ بِذُنُوبِهِ، فَجُعِلَتْ عَلَى رَأْسِهِ وَعَاتِقَيْهِ، فَكُلَّمَا رَكَعَ أَوْ سَجَدَ تَسَاقَطَتْ عَنْهُ

‘বান্দা যখন ছালাতে দাঁড়ায় তখন তার পাপগুলো নিয়ে এসে তার মাথায় ও কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়। বান্দা যখনই রুকূ‘ বা সিজদা করে তখন তার থেকে পাপগুলো ঝরে পড়তে থাকে’ (বায়হাক্বী, হা/৪৪৭৩; সিলসিলা ছহীহা, হা/১৩৯৮, সনদ ছহীহ)।

প্রশ্ন () ‘রাসূল (ছা.)-এর চেহারা স্বপ্নে দেখলে তার জন্য জাহান্নাম আযাব হারাম হয়ে যাবে’-এমর্মে ছহীহ কোনো দলীল আছে কি?

-রাজিবুল ইসলাম
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : ‘রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে স্বপ্নে দেখার কারণে তার জাহান্নামের শাস্তি হারাম হয়ে যাবে’-এমন কথার শারঈ কোনো ভিত্তি নেই। বরং কথাটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তবে মুমিন ব্যক্তি স্বপ্নে নবী-রাসূলগণকে দেখতে পারে। আবূ হুরায়রা (ছা.) হতে বর্ণিত,  রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘যে আমাকে স্বপ্নে দেখবে সে সত্যই আমাকে দেখবে। কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৯৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬৬; মিশকাত, হা/৪৬০৯-১০)।

 

পবিত্রতা

প্রশ্ন (১০) : পুকুরে ফরয গোসল করা যাবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম
 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : না, পুকুরে বা আবদ্ধ পানিতে ফরয গোসল করা যাবে না। কেননা আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন অপবিত্র অবস্থায় আবদ্ধ পানিতে গোসল না করে’।

তখন আবূ সায়িব (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ হুরায়রা (রা.)! তাহলে সে কীভাবে গোসল করবে? তিনি বললেন, পানি উঠিয়ে নিয়ে গোসল করবে (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৪; ইবনে মাজাহ, হা/৬০৫, নাসাঈ, হা/২২২)। তবে পুকুর যদি এমন বড় হয়, যার পানি বেশি হওয়ার কারণে তা অপবিত্র হয়না, তখন সে পানিতে ফরয গোসল করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে দু‘টি বিষয় লক্ষণীয় যথা, দুই কুল্লার চেয়ে বেশী পরিমাণ পানি হওয়া এবং পানির রং, স্বাদ ও গন্ধ ঠিক থাকা। (নাসায়ী, হা/৫২; নায়লুল আওতার, পৃ.১/৪৪) সর্বোপরি পুকুরে ফরয গোসল করা বা ইস্তিঞ্জা করা থেকে বিরত থাকাই উচিৎ।

 

ইবাদতছালাত

প্রশ্ন (১১) : ছালাতুত তাসবীহ পড়া যাবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম
 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : প্রত্যেক মুসলিম তার দৈনন্দিন ইবাদতের ক্ষেত্রে সর্বদা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বিশুদ্ধ দলীল দ্বারা ইবাদত করবে- এটাই শারঈ বিধান। কিন্তু ছালাতুত তাসবীহ একটি বিতর্কিত, সন্দেহযুক্ত ও দুর্বল ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত ইবাদত। কেননা এ ছালাত সংক্রান্ত হাদীছের যঈফ সূত্রসমূহ পরস্পরকে শক্তিশালী করে মনে করে শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহি.) তাকে ছহীহ লিগায়রিহি বলেছেন (আবূ দাঊদ, হা/১২৯৭; মিশকাত, হা/১৩২৮)। ইবনু হাজার আসক্বালানী ও ছাহেবে মির‘আত একে ‘হাসান’ স্তরে উন্নীত বলেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়নি। বরং আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণিত এ সম্পর্কিত হাদীছকে কেউ ‘মুরসাল’ কেউ ‘মাওকূফ’ কেউ ‘যঈফ’ আবার কেউ ‘মাওযূ‘’ বা জাল বলেছেন। সঊদী আরবের স্থায়ী ফতওয়া কমিটি ‘লাজনা দায়েমাহ’ এ ছালাতকে বিদ‘আত বলেছেন,

صَلَاةُ التَّسْبِيْحِ بِدْعَةٌ، وَحَدِيْثُهَا لَيْسَ بِثَابِتٍ، بَلْ هُوَ مُنْكَرٌ

(ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়েমাহ, ৮/১৬৪)। অতএব এরূপ বিতর্কিত, সন্দেহযুক্ত ও দুর্বল ভিত্তির উপরে শুধু তাসবীহের জন্য কোনো বিশেষ ইবাদত বা ছালাত প্রতিষ্ঠা করা ঠিক নয়। বরং যেকোন ছালাতে বা ছালাতের বাহিরে বেশী বেশী মহান আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করাই বেশী শরীয়তসম্মত।

প্রশ্ন (১২) : তাহাজ্জুদ ছালাত কি রাসূল (ছা.)-এর উপর ফরয ছিল?

        হাসিনুর রহমান
          পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : প্রথমদিকে তাহাজ্জুদ ছালাত রাসূল (ছা.)-এর উপর ফরয ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা নফল করা হয়। সা‘দ ইবনু হিশাম হতে বর্ণিত, তিনি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেন যে, আমাকে রাতের ক্বিয়াম সম্পর্কে বলুন! তিনি বললেন, তুমি কি কুরআনের ‘ইয়া আইছ্যুহাল মুযযাম্মিল’ সূরা পাঠ করোনি? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ, পাঠ করেছি। তিনি বললেন, এ সূরার প্রথমাংশ অবতীর্ণ হবার পর রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর ছাহাবীগণ এতো বেশি ‘ক্বিয়ামুল লাইল’ করতেন যে, তাদের পা ফুলে যেতো। অতঃপর এ সূরার শেষাংশ অবতীর্ণ হলে ‘ক্বিয়ামুল লাইল’ ফরয হতে নফল হিসাবে পরিবর্তন হয় (ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪৬; নাসাঈ, হা/১৬০২; আবূ দাঊদ, হা/১৩৪২)।

প্রশ্ন (১৩) : জামা‘আতে ছালাত আদায়ের সময় ইমাম উচ্চৈঃস্বরে আমীন না বললে মুছল্লীর করণীয় কী?

-ইউনুস
কানসাট, মোবারকপুর।

উত্তর : জামা‘আতে ছালাত আদায়ের সময় মুক্তাদীগণ ইমামের সাথে সাথে ‘আমীন’ বলবে এটাই সর্বাধিক ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (ছহীহ বুখারী, হা/৭৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪১০; আবূ দাঊদ, হা/৯৩২ ও ৯৩৩; তিরমিযী, হা/২৪৮; ইবনু মাজাহ, হা/৮৫৬)। তবে ইমাম যদি সূরা ফাতিহা শেষে উচ্চৈঃস্বরে আমীন নাও বলেন তুবও মুক্তাদীকে তার ‘গায়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায যল্লীন’ পাঠ শেষান্তে উচ্চৈঃস্বরে আমীন বলতে হবে। অবশ্য এ কাজটা ইমামের বিরোধিতা হিসেবে গণ্য হবেনা। কেননা ইমামের বিরোধিতা মূলত রুকু বা সিজদার ক্ষেত্রে ইমামের আগে-পরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ধর্তব্য। জোরে আমীন বলা, রাফউল ইয়াদায়ন করা, রুকু থেকে উঠে হাত বাধা বা ছাড়া ইত্যাদী ক্ষেত্রে ইমামের অনুসরণের সাথে মুক্তাদীর আমলের কোন সম্পর্ক নাই। (মাজমু ফাতাওয়া, ২৩/৩৭৫)। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ইমাম যখন ‘গায়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায যল্লীন’ বলবেন, তখন তোমরা ‘আমীন’ বলো। কারণ যার আমীন ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে, তার পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা হয়ে যাবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৮২)। ওয়ায়েল ইবনু হুজর (রা.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছা.) যখন ‘গায়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায যল্লীন’ বলতেন, তখন তিনি আমীন বলতেন। তিনি আমীনের আওয়াযটা উচ্চৈঃস্বরে বলতেন’ (আবূ দাঊদ, হা/৯৩২, সনদ ছহীহ)। অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছা.) যখন ‘গায়রিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায যল্লীন’ বলতেন, তখন তাকে আমীন বলতে শুনেছি। তিনি আমীনের আওয়ায উচ্চৈঃস্বরে বলতেন (তিরমিযী, হা/২৪৮, সনদ ছহীহ)।

প্রশ্ন (১৪) : ছালাতুল ইশরাক, চাশত ও আওয়াবীন-এর রাক‘আত সংখ্যা এবং সময়সীমা কত? এ ছালাতের ফযীলত কী?

-নাজনীন পারভীন
 আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর : ছালাতুল ইশরাক, চাশত ও আওয়াবীন এই তিন নামে এক ও অভিন্ন ছালাতকে বুঝানো হয়। ইশরাক শব্দের অর্থ হলো, সূর্য উদিত হওয়া অর্থাৎ সূর্য স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে উক্ত ছালাতের সময় শুরু হয়। প্রথম প্রহরের শুরুতে পড়লে তাকে ‘ছালাতুল ইশরাক্ব’ বলে এবং কিছু পরে দ্বিপ্রহরের পূর্বে পড়লে তাকে ‘ছালাতুয যোহা’ বা ‘চাশতের ছালাত’ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জামা‘আতের সাথে ফজরের ছালাত আদায়ের পর সেখানে বসেই যিকির-আযকারে মাশগূল থাকল। অতঃপর সূর্যোদয়ের পর সেখানেই দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করল।

সে ব্যক্তি একটি পূর্ণ হজ্জ ও ওমরার ন্যায় ছওয়াব পেল’ (তিরমিযী, হা/৫৮৬, সনদ হাসান; মিশকাত, হা/৯৭১)।  বুরায়দা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘মানুষের শরীরে ৩৬০টি জোড় আছে। অতএব মানুষের কর্তব্য হলো প্রত্যেক জোড়ের জন্য একটি করে ছাদাক্বাহ করা। ছাহাবীগণ বললেন, কার শক্তি আছে এই কাজ করার হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, চাশতের দু’রাক‘আত ছালাতই এ জন্য যথেষ্ট’ (আবূ দাঊদ, হা/৫২৪২; মিশকাত, হা/১৩১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৭২০; মিশকাত, হা/১৩১১)। আর রোদ্রের তাপে উত্তপ্ত বালুর গরমে উটের বাচ্চার পায়ের ক্ষুর পুড়ে যাওয়ার মতো সময়ে উক্ত ছালাত আদায় করলে তাকে ‘ছালাতুল আওয়াবীন’ বলা হয়’। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘ছালাতুল আওয়াবীন’-এর সময় হলো তখন, যখন (রোদের তাপে) উটের বাচ্চার ক্ষুর গরম হয়ে যায়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪৮; মিশকাত, হা/১৩১২)। উক্ত ছালাত চার রাক‘আতও আদায় করা যায়। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দিনের প্রথমাংশে চার রাক‘আত ছালাত আদায় করবে তার জন্য দিনের শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হবে’ (তিরমিযী, হা/৪৭৫)। উল্লেখ্য যে, মাগরিবের ছালাতের পরে ‘ছালাতুল আওয়াবীন’ নামে যে ৬ রাক‘আত ছালাত পড়ার প্রথা সমাজে চালু আছে শরী‘আতে তার কোনো ভিত্তি নেই। মূলত চাশতের সময় যে ছালাত পড়া হয় সেটাই আওয়াবীনের ছালাত (ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৯; মিশকাত, হা/১৩১০)।

প্রশ্ন (১৫) : একদা নবী করীম (ছা.) ছালাতে দাঁড়িয়ে ভোর হওয়া পর্যন্ত একটি আয়াত বার বার তেলাওয়াত করতে থাকেন। প্রশ্ন হলো, এখানে কোন ছালাতের কথা বলা হয়েছে এবং সে আয়াত কোনটি? দ্বিতীয়ত, ফরয ছালাতে একই আয়াত বার বার তেলাওয়াত করা যাবে কি?

-আব্দুর রহমান
 সিরাজগঞ্জ সদর।

উত্তর : এখানে ক্বিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ ছালাতের কথা বলা হয়েছে (তিরমিযী, হা/৪৪৮; ‘রাতের ছালাতের ক্বিরাআত’ পরিচ্ছেদ)। আর উক্ত ছালাতে বার বার তেলাওয়াতকৃত আয়াতটি ছিল সূরা আল-মায়েদার ১১৮ নং আয়াত। এমর্মে আবূ যার গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছা.) (রাতে) ছালাতে দাঁড়ালেন এবং একটি মাত্র আয়াত পড়তে পড়তে ভোর করে ফেললেন। আয়াতটি হলো,

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

‘(হে আল্লাহ!) যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন। তারা আপনার দাস। আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান’ (আল-মায়েদাহ, ৫/১১৮; নাসাঈ, হা/১০১০; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৫০; মিশকাত, হা/১২০৫)। দ্বিতীয়ত, ফরয ছালাতে সহজসাধ্য একই আয়াত বার বার তেলাওয়াত করা যাবে, এতে ছালাতের কোনো ক্ষতি হবে না। উক্ত আয়াতই তার প্রমাণ। রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘যখন তুমি ছালাতের জন্য দাঁড়াবে, তখন তাকবীর বলবে। অতঃপর কুরআন হতে যা তোমার পক্ষে সহজ তা পড়বে। অতঃপর রুকূ‘তে যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে রুকূ‘ করবে। অতঃপর সিজদা হতে উঠে স্থির হয়ে বসবে। আর তোমার পুরো ছালাত এভাবেই আদায় করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৭)।

প্রশ্ন (১৬) : একই মসজিদে জুম‘আর ছালাতে দুইবার জামা‘আত করা যাবে কি? 

-শোয়াইবুর রহমান
রাজবাড়ী, নাটোর।

উত্তর : না, একই মসজিদে জুম‘আর ছালাতের জন্য একাধিকবার জাম‘আত করা যাবে না। কেননা এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছা.) ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে ইজামের পক্ষ থেকে কোনো আমল পাওয়া যায় না (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়েমাহ, ৮/২৬২)। বরং যথাসময়ে জুম‘আর ছালাতের জামা‘আতে উপস্থিত হতে হবে এবং অন্তত এক রাক‘আত পেতে হবে। আর ঐ এক রাক‘আতও যদি না পায় তাহলে যোহরের ছালাত আদায় করবে। আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুম‘আর এক রাক‘আত পেয়েছে সে যেন তার সাথে দ্বিতীয় রাক‘আত যোগ করে এবং যার দুই রাক‘আতই ছুটে গেছে সে যেন চার রাক‘আত আদায় করে অথবা, সে যেন যোহরের ছালাত আদায় করে (দারাকুত্বনী, হা/১৬২০; ইবনু মাজাহ, হা/১১২১; ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৫৩৩৫; ইবনু খুযায়মাহ, হা/১৮৫১; মুসতাদরাকে হাকেম, হা/১০৭৮; মিশকাত, হা/১৪১৯)।

প্রশ্ন (১৭) : জায়নামাযে বা মেঝেতে ময়লা থাকলে তা ছালাত অবস্থায় হাত দিয়ে কিংবা ফুঁক দিয়ে পরিষ্কার করা যাবে কি?

-আব্দুর রহমান
 সিরাজগঞ্জ সদর।

উত্তর : একান্ত সমস্যা ব্যতীত ছালাতের স্থান হতে সাধারণ ময়লা বা কঙ্কর পরিষ্কার করা যাবে না। কেননা, ছালাতে একাগ্রতা বহির্ভূত কোনো কাজ করা যাবে না। যেহেতু এটা ছালাতে একাগ্রতা বিনষ্টের অন্তর্ভুক্ত; তাই তা পরিহার করা উচিত। তবে একান্ত প্রয়োজনে তা একবার পরিষ্কার করা যেতে পারে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি করা যাবে না। মু‘আয়ক্বিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) জনৈক ব্যক্তিকে ছালাতরত অবস্থায় সিজদার স্থান (হতে কঙ্কর সরিয়ে) সমান করতে দেখে বললেন, ‘তোমাকে যদি এরূপ করতেই হয়, তাহলে মাত্র একবারের জন্য করতে পারো’ (ছহীহ বুখারী, হা/১২০৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১২৪৭; মিশকাত, হা/১২৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৫৪৮)।

প্রশ্ন (১৮) : সামনের কাতার পূরণ হয়ে গেলে পিছনের কাতারে একাকী দাঁড়ানো যাবে কি?

-ফযলে মাহমূদ
 মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : কাতারে প্রবেশ করার মতো কোনো সুযোগ না থাকলে এবং এদিক-ওদিক লক্ষ করে কোনো মুছল্লীকে না পেলে, এমতাবস্থায় একাকী দাঁড়িয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, সামনের কাতার থেকে মুছল্লীকে টেনে নেওয়ার হাদীছ যঈফ (আল-মু‘জামুল কাবীর, হা/৩৯৪; মুসনাদে আবী ইয়া‘লা, হা/১৫৮৮; বুলূগুল মারাম, হা/৪২০)। তাছাড়া এতে সামনের কাতারে ফাঁকা সৃষ্টি হয়। আর সামনের কাতারে ফাঁকা রেখে ছালাত হবে না। 

প্রশ্ন (১৯) : ঢিলেঢালা বা বড় এমন জামা পরা আছে যা নাভিকে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু প্যান্ট বা পাজামা নাভির নিচে পরা হয়েছে। এতে কি শারঈ বিধান লঙ্ঘিত হবে?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর : কাপড় পরিধান করার মূল উদ্দেশ্য হলো ছতর আবৃত রাখা (আবূ দাঊদ, হা/৪৯৬; মিশকাত, হা/৩১১১)। সুতরাং যদি ছতর উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকে তাহলে এমন পোশাক পরিধানে কোনো সমস্যা নেই। তবে প্যান্ট বা পাজামা যদি রুকূ-সিজদায় যাওয়ার সময় ঢেকে রাখা অঙ্গগুলো উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে তা পরিধান করা যাবে না।

প্রশ্ন (২০) : বসে জুম‘আর খুৎবা দেওয়া যাবে কি?

-শহীদ সরদার
আদমদিঘী, বগুড়া।

উত্তর : জুম‘আর খুৎবা দাঁড়িয়ে প্রদান করতে হবে। এটাই বিধিবদ্ধ সুন্নাত। জাবের ইবনু সামুরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছা.) দাঁড়িয়ে খুত্ববা দিতেন। অতঃপর মাঝে একটু বসতেন। তারপর আবার দাঁড়িয়ে খুত্ববা দিতেন। রাবী বলেন, যে ব্যক্তি তোমাকে বলে যে, তিনি বসে খুত্ববা দিতেন, তাহলে সে মিথ্যারোপ করল। আল্লাহর কসম! আমি তাঁর সাথে দুই হাজারেরও অধিকবার ছালাত আদায় করেছি (অথচ কখনো তাঁকে বসে খুত্ববা প্রদান করতে দেখিনি (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৬২; মিশকাত, হা/১৪১৫)। ইবনে উমার (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছা.) জুম‘আতে দুইটি খুত্ববা প্রদান করতেন। প্রথমে তিনি মিম্বারে উঠে মুআযযিন আযান শেষ না করা পর্যন্ত বসে থাকতেন। অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে (প্রথম) খুত্ববা দিতেন। তারপর বসতেন এবং কোনো কথা না বলে আবার দাঁড়াতেন এবং (দ্বিতীয়) খুত্ববা দিতেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২০৩২; আবূ দাঊদ, হা/১০৯২; সুনানুল কুবরা বায়হাক্বী, হা/৫৫৩৮)। কেউ যদি বসে খুত্ববা প্রদান করে, তাহলে তা বিদ‘আত হবে, যা পরিত্যাজ্য। তবে অসুস্থতাজনিত কারণে খত্বীব বসে খুত্ববা শেষ করতে পারেন (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/২৩২)।

প্রশ্ন (২১) : খুত্ববার সময় বাঁশ বা কাঠের পরিবর্তে লোহা, এ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিকের লাঠি ব্যবহার করা যাবে কি?

-আবীর আহমাদ
 শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : খুত্ববার সময় যে কোনো ধরনের লাঠি ব্যবহার করা সুন্নাত। চাই তা কাঠের বিকল্প যাই হোক না কেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.) জুম‘আর খুত্ববা প্রদানের সময় লাঠি অথবা ধনুকের উপর ভর দিয়েও খুত্ববা প্রদান করেছেন (আবূ দাঊদ, হা/১০৯৬, সনদ হাসান; বায়হাক্বী, সুনানুছ ছুগরা, হা/৪৮৪)। অতএব কাঠের বিকল্প হিসাবে লোহা, এ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিকের লাঠি ব্যবহার করা যায়। এতে শারঈ কোনো বাধা নেই। কেননা লাঠি তৈরির ধাতু যেটাই হোক না কেন, সেটা লাঠি নামই বহন করে।

 

মসজিদ-মুছাল্লা

প্রশ্ন (২২) : মসজিদ ফান্ডের টাকা দিয়ে কি দায়িত্বশীলগণ মিটিংয়ের নাস্তার ব্যবস্থা করতে পারে?

-ফারূক ইসলাম ও শাহিন কাদির
 নলডাঙ্গা, নাটোর।

উত্তর : মসজিদ ফান্ডের টাকা-পয়সা জনসাধারণের আমানত। সেটা মসজিদের কাজে ব্যয় করা দায়িত্বশীলগণের পবিত্র দায়িত্ব। সুতরাং মসজিদের অর্থ-সম্পদ মসজিদের কাজেই ব্যবহার করতে হবে। তবে শ্রমের বিনিময় হিসেবে দায়িত্বশীলগণের অনুমতিক্রমে মসজিদ ফান্ডের টাকা-পয়সা খরচ করতে পারে। কিন্তু মসজিদের টাকা সাশ্রয় করার জন্য কমিটির ধনী ব্যক্তিদের উচিৎ নিজের পকেট থেকে এই ধরণের আনুষঙ্গিক খরচগুলো বহন করা।  

প্রশ্ন (২৩) : কী কী কারণে মসজিদ পৃথক করা যায়? উক্ত কারণ ব্যতীত যদি কোনো মসজিদ পৃথকভাবে তৈরি করা হয়, তাহলে সেখানে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-শাকিল হোসাইন
চরগগণপুর, জামালপুর সদর।

উত্তর : প্রয়োজন ও সুবিধার স্বার্থে কোনো প্রকারের হিংসা-বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ সৃষ্টি এবং ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ওয়াক্বফকৃত যে কোনো স্থানে পৃথকভাবে মসজিদ নির্মাণ করা যেতে পারে এবং সে মসজিদে ছালাত আদায় করা যেতে পারে।  যেমন : পুরাতন মসজিদে জায়গা সংকুলান না হলে; অথবা মসজিদে যাতায়াতের রাস্তা না থাকলে; কিংবা মসজিদের জায়গা ওয়াক্বফ করে দিতে রাযী না হলে; ইত্যাদি। এ ব্যতীত মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, মুসলিম সমাজের ঐক্য নষ্ট করা এবং যাবতীয় ভ্রান্ত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য যে মসজিদ নির্মাণ করা হয়, সে মসজিদে ছালাত আদায় করা যাবে না। এমন মসজিদকে ‘মসজিদে যেরার’ বলা হয়। এমন মসজিদ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, (হে নবী!) আপনি কখনো সেখানে গিয়ে ছালাত আদায় করবেন না (আত-তওবা, ৯/১০৮)। মসজিদে যেরারের পরিচয় উল্লেখ্য করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর কেউ কেউ এমন আছে, যারা ক্ষতি সাধন করার উদ্দেশ্যে, কুফরী করার উদ্দেশ্যে, বিশ্বাসীদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে এবং যে ব্যক্তি ইতোপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তার ঘাঁটিস্বরূপ (নতুন) মসজিদ নির্মাণ করেছে। তারা অবশ্যই শপথ করে বলবে, আমরা কেবল কল্যাণ চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষ্য যে, তারা সবাই মিথ্যুক’ (আত-তওবা, ৯/১০৭)।

 

ইবাদত ছিয়াম

প্রশ্ন (২৪) : অনেক সময় আরবী মাসের হিসাব ঠিক রাখতে পারি না। তাই বাংলা বা ইংরেজি মাসের প্রতি ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ ছিয়াম রাখা যাবে কি?

-মারুফ হোসেন
রূপসা, খুলনা।

উত্তর : বাংলা বা ইংরেজি মাসের তারিখ হিসাব করে ছিয়াম রাখা যাবে না। কেননা ছিয়াম পালনের বিষয়টি আরবী মাসের সাথে সম্পৃক্ত, যা চন্দ্র উদয়ের উপর নির্ভরশীল। আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৮১; মিশকাত, হা/১৯৭০)। সুতরাং প্রতি মাসের ছিয়াম রাখার আমলটি আরবী মাসের হিসাব অনুযায়ী পালন করতে হবে। আবূ যার (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, হে আবূ যার! যখন তুমি মাসের তিন দিন ছিয়াম রাখবে, তখন (আরবী মাসের) ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রাখবে (তিরমিযী, হা/৭৬১; নাসাঈ, হা/২৪২৪; মিশকাত, হা/২০৫৭, সনদ হাসান ছহীহ)।

প্রশ্ন (২৫) : মানতের ছিয়াম শা‘বান মাসে রাখা যায় কি?

        -হাসিনুর রহমান
পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও

উত্তর : হ্যাঁ, যাবে। কেননা মানতের ছিয়াম ওয়াজিব। আর ওয়াজিব বা ক্বাযা ছিয়ামসমূহ রামাযান মাস ব্যতীত অন্য যে কোনো মাসে রাখা যায়। আয়েশা (রা.) তাঁর রামাযানের ছুটে যাওয়া ছিয়াম পরবর্তী শা‘বান মাসে পালন করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৪৬; আবূ দাঊদ, হা/২৩৯৯; সুনানুল কুবরা বায়হাক্বী, হা/৮২১০; মিশকাত, হা/২০৩০)।

উল্লেখ্য নফল ছিয়াম ১৫ শা‘বানের পর রাখা যাবে না। আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘যখন শা‘বান মাস অর্ধেক হয়ে যায়, তখন তোমরা আর (নফল) ছিয়াম রেখো না (আবূ দাঊদ, হা/২৩৩৭)। তবে রামাযানের সাথে মিলে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলে রাখতে পারে।

প্রশ্ন (২৬) : আরাফা, আশূরা, সাপ্তাহিক ও মাসিক নফল ছিয়ামগুলোর ক্বাযা আদায় করা যাবে কি

-আব্দুল্লাহ ছিদ্দীক্ব
 শেরপুর, বগুড়া।

উত্তর : আরাফা ও আশূরার নফল ছিয়াম নির্দিষ্ট মাস ও দিনের সাথে সম্পৃক্ত। বিধায় এগুলোর ক্বাযা আদায় করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘আরাফার দিনের ছিয়াম- আমি আশা করি, আল্লাহর নিকট তা তার পূর্বের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহর কাফফারা হবে এবং আশূরার ছিয়াম- আমি আশা করি, আল্লাহর নিকট তা তার পূর্বের এক বছরের গুনাহর কাফফারা হবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬২; আবূ দাঊদ, হা/২৪২৫; তিরমিযী, হা/৭৫২; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৩৮; ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ, হা/২০৮৭; মিশকাত, হা/২০৪৪)। তবে সাপ্তাহিক নফল ছিয়ামের ক্বাযা আদায় করা যায়। আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (ছা.) ও কতিপয় ছাহাবীকে দাওয়াত করলাম। খাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে জনৈক ছাহাবী (নফল) ছিয়ামরত থাকায় খাবারে অংশগ্রহণ করলেন না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছা.) তাকে ছিয়াম ভঙ্গ করে খাবার গ্রহণ করতে বললেন এবং ইচ্ছা করলে পরবর্তীতে এটার ক্বাযা আদায় করার জন্য বললেন (বায়হাক্বী, ৪/৪৬২, হা/৮৩৬২, ‘নফল ছিয়াম ক্বাযা করা ঐচ্ছিক’ অনুচ্ছেদ, সনদ হাসান; নায়লুল আওত্বার ২/২৫৯, ‘নফল ছিয়াম’ অনুচ্ছেদ)। আর মাসিক নফল ছিয়াম তথা আইয়ামে বীযের ছিয়াম, মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রাখতে হবে (ছহীহ আত-তারগীব, হা/১০৩৮)। তবে কোনো কারণে উক্ত তারিখে রাখা সম্ভব না হলে মাসের যে কোনো তারিখে রাখা যাবে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসূল (ছা.) মাসের যে কোনো দিনে তিনটি ছিয়াম রাখতেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৮০১; মিশকাত, হা/২০৪৬)।

 

ইবাদত যিকির ও দু‘আ

প্রশ্ন (২৭) : ঋণ হতে মুক্তি লাভের জন্য নির্ধারিত কোন দু‘আটি পড়তে হবে

-আব্দুল আযীয
সাভার, ঢাকা।

উত্তর : ঋণ হতে মুক্তি লাভের জন্য নিচের দু‘আটি পড়তে হবে। তা হলো,

اَللّٰهُمَّ اكْفِنِىْ بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِىْ بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মাক ফিনী বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনী বিফাযলিকা আম্মান সিওয়াকা’। অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে হালাল (জিনিসের) সাহায্যে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখো এবং তুমি তোমার রহমতের মাধ্যমে আমাকে পরমুখাপেক্ষী হতে রক্ষা করো’। এ দু‘আর গুরুত্ব সম্পর্কে আলী (রা.) বলেন, একদিন তার কাছে জনৈক চুক্তিবদ্ধ দাস (মুকাতাব) এসে বলল, আমি আমার মনিবের সাথে সম্পদের লিখিত চুক্তিপত্রের মূল্য পরিশোধ করতে পারছি না; আমাকে সাহায্য করুন। উত্তরে তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কিছু বাক্য শিখিয়ে দিব, যা রাসূলুল্লাহ (ছা.) আমাকে শিখিয়েছেন? যদি তোমার উপর বড় পাহাড়সম ঋণের বোঝাও থাকে, আল্লাহ তা (এ দু‘আর মাধ্যম) পরিশোধ করে দিবেন’ (তিরমিযী, হা/৩৫৬৩; আহমাদ, হা/১৩১৯; মুসতাদরাকে হাকেম, হা/১৯৭৩; সিলসিলা ছহীহা, হা/২৬৬; মিশকাত, হা/২৪৪৯)।

প্রশ্ন (২৮) : কাউকে কিছু দান করার পর তার কাছে দু‘আ চাওয়া যাবে কি?

        হাসিবুর রহমান
পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : দান করে দু‘আ চাওয়া যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ছা.) জনৈক ব্যক্তির বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া শেষে চলে যেতে উদ্যত হলে বাড়ির মালিক তাঁর ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তাদের জন্য দু‘আ করতে বলেন। এ মর্মে আব্দুল্লাহ ইবনু বুসর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ছা.) আমার পিতার নিকট পৌঁছলেন। আমরা তাঁর নিকট কিছু রুটি ও খেজুর, পনির ও ঘি মিশ্রিত এক জাতীয় মিষ্টান্ন পেশ করলাম। তিনি তার কিছু খেলেন। অতঃপর তাঁর নিকট কিছু খেজুর উপস্থিত করা হলো। তখন তিনি তা খেতে লাগলেন এবং তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলী মিলিয়ে তাদের মধ্যখান দিয়ে তার বিচি ফেলতে লাগলেন। অপর বর্ণনায় রয়েছে, তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলীদ্বয়ের পিঠের দিক দিয়ে বিচি ফেলতে লাগলেন। অতঃপর তাঁর নিকট কিছু পানীয় আনা হলো এবং তিনি তা পান করলেন। অতঃপর আমার পিতা তাঁর সওয়ারীর লাগাম ধরে বললেন, আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট কিছু দু‘আ করুন। তখন তিনি বললেন,

اللهم بَارِكْ لَهُمْ فِيْمَا رَزَقْتَهُمْ وَاغْفِرْ لَهُمْ وَارْحَمْهُمْ

‘হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে যা দান করেছেন তাতে আপনি বরকত দান করুন এবং তাদেরকে মাফ করুন ও দয়া করুন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২০৪২; মিশকাত, হা/২৪২৭)। তবে কোনো প্রকার দাবী-দাওয়া ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান করা উত্তম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে অন্ন দান করে। আর বলে, শুধু আল্লাহর সস্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে খাবার দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়’ (আদ-দাহর, ৭৬/৮)।

প্রশ্ন (২৯) : ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পাঠ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন

-নাজনীন পারভীন
 আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর : ‘বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম’ পুরোটাই পড়বে কুরআন তেলাওয়াতের শুরুতে। চাই তা ছালাতে হোক কিংবা ছালাতের বাইরে যখনই হোক না কেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৪০০; আবূ দাঊদ, হা/৭৭৮; মিশকাত, হা/২২১৮) এবং লিখবে চিঠি-পত্রের শুরুতে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) রোম-পারস্যের সম্প্রাটদের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তাতে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ লেখা ছিল (ছহীহ বুখারী, হা/৭)। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় যে চুক্তিনামা লেখা হয়েছিল, তাতেও তিনি (ছা.) সম্পূর্ণ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ লেখার কথা বলেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৭৩১, ২৭৩২)। আবূ বকর (রা.) আনাস (রা.)-কে বাহরাইনের গভর্নর হিসাবে পাঠানোর সময় যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতেও পূর্ণ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ লেখা ছিল (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৫৪)। এছাড়া ওযূ, গোসল ও খানা-পিনাসহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে না, তার ওযূ হয় না’ (তিরমিযী হা/২৫; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৭)। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ খাদ্য খাবে, সে যেন বিসমিল্লাহ বলে’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৭৬৭; ইবনু মাজাহ, হা/৩২৬৪)। জাবির (রা.) বলেন, নবী করীম (ছা.) বলেছেন, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তুমি তোমার দরজা বন্ধ করো। কারণ শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে বাতি নিভিয়ে দাও। একটু কাঠখড়ি হলেও আড়াআড়িভাবে রেখে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পাত্রের মুখ ঢেকে রাখো। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পানির পাত্র ঢেকে রাখো’ (বুখারী, হা/৩২৮০; মুসলিম, হা/২০১২; আবূ দাঊদ, হা/৩৭৩১; তিরমিযী, হা/২৮৫৭)।

প্রশ্ন (৩০) : অনেক সময় অসুস্থ ব্যক্তিরা পেশাব-পায়খানার কষ্টের কারণে সেখানে বসে মনে মনে আল্লাহর নিকট সাহায্য চায়। এটা করা কি ঠিক হবে?

-নাজনীন পারভীন
 আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর : পেশাব-পায়খানা চলাকালীন আল্লাহর যিকির থেকে বিরত থাকাই উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে পেশাব-পায়খানা অবস্থায় জনৈক ছাহাবী সালাম দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি তার জওয়াব দেননি। বরং তা থেকে অবসর হয়ে তিনি জওয়াব দেন। আবূ জুহাইম আনছারী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী করীম (ছা.) জামাল নামক কূপের দিক হতে আসলেন। তখন জনৈক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হলে সে তাঁকে সালাম দিল। কিন্তু নবী করীম (ছা.) উত্তর দিলেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি একটি দেওয়ালের নিকট আসলেন এবং তার মুখমণ্ডল ও হাত মাসাহ করলেন। অতঃপর তিনি সালামের উত্তর দিলেন (ছহীহ বুখারী হা/৩৩৭; ছহীহ মুসলিম হা/৩৬৯; মিশকাত, হা/৫৩৫)। তবে পেশাব-পায়খানায় প্রবেশের সময় দু‘আ পড়তে ভুলে গেলে কিংবা পেশাব-পায়খানার কষ্টের কারণে সেখানে বসে মনে মনে আল্লাহর নিকট দু‘আ ও সাহায্য চাইতে পারে (ফাতহুল বারী, ১/২৪০; আল-আওসাত্ব, ইবনুল মুনযির, ১/৩৬৬)।

প্রশ্ন (৩১) : রাগ দমনের কোনো দু‘আ আছে কি?

-ফারূক ইসলাম
 নলডাঙ্গা, নাটোর।

উত্তর : রাগ দমনের জন্য ‘আঊযুবিল্লাহ’; আঊযুবিল্লাহি মিনাশ-শাইত্বন’ অথবা, ‘আঊযুবিল্লাহি মিনাশ-শাইত্বনির রাজীম’ দু‘আটি পড়া যায়। সুলাইমান ইবনু সুরাদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছা.)-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন দুইজন লোক গালাগালি করছিল। তাদের এক জনের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল এবং তার রগগুলো ফুলে গিয়েছিল। তখন নবী করীম (ছা.) বললেন, ‘আমি এমন একটি দু‘আ জানি, যদি এ লোকটি তা পড়ে তবে তার রাগ দূর হয়ে যাবে। সে যদি পড়ে ‘আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তান’ অর্থাৎ, আমি শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। তবে তার রাগ চলে যাবে। তখন তাকে বলল, নবী করীম (ছা.) বলেছেন, তুমি আল্লাহর নিকট শয়তান থেকে আশ্রয় চাও। সে বলল, আমি কি পাগল হয়েছি? (ছহীহ বুখারী, হা/৩২৮২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬১০)।  

প্রশ্ন (৩২) : সূরা আল-ইনশিরাহ বা সূরা আলাম নাশরাহ সাতবার তেলাওয়াত করে পানিতে ফুঁ দিয়ে পান করলে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়’-এমন কোনো ছহীহ বর্ণনা আছে কি? স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য কোনো দু‘আ-দরূদ বা শারঈ কোনো নিয়মনীতি আছে কি?

-আবূ তাহের
 আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য সূরা আল-ইনশিরাহ সাতবার তেলাওয়াত করত পানিতে ফুঁক দিয়ে পান করার পক্ষে কোনো ছহীহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত দু‘আগুলো যে কোনো সময় পড়ে আল্লাহর কাছে জ্ঞান চাওয়া যায়। যেমন, (১) رَبِّ زِدْنِيْ عِلْمًا উচ্চারণ : রব্বি যিদনী ‘ইলমা। অর্থ : হে প্রভু! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও (ত্বো-হা, ২০/১১৪)। (২)

رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِ

উচ্চারণ : রব্বিশ রহ-লী ছদরী ওয়া ইয়াসসিরলী আমরী ওয়াহলুল উক্বদাতাম মিন লিসানী ইয়াফক্বহু ক্বওলী। অর্থ : হে আমার প্রভু! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও। আমার করণীয় কাজ আমার জন্য সহজ করে দাও। আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দাও, যেন তারা আমার কথা বুঝতে পারে (ত্বে-হা, ২০/২৫-২৮)।

(৩)

َللهم إِنِّيْ أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَعَمَلاً مُّتَقَبَّلاً وَرِزْقًا طَيِّباً.  

উচ্চারণ : আল্ল-া-হুম্মা ইন্নী আস-আলুকা ‘ইলমান নাফি‘আন, ওয়া ‘আমালাম মুতাক্বাব্বালান, ওয়া রিযক্বান ত্বাইয়্যিবান। অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে উপকারী জ্ঞান, কবুলযোগ্য আমল ও পবিত্র রূযী প্রার্থনা করছি (ইবনু মাজাহ, হা/৯২৫; ত্বাবারানী ছাগীর, হা/৭৩৫; মিশকাত, হা/২৪৯৮)।

 

ইবাদত যাকাত

প্রশ্ন (৩৩) : বেতন হতে কর্তিত টাকা (যা অবসরের পর পাওয়া যাবে) যদি কর্তৃপক্ষের নিকট জমা থাকে এবং তা নিসাব পরিমাণ হয়ে যায়, তাহলে কি আমাকে তার যাকাত দিতে হবে

-মারুফুল ইসলাম
দিগদানা, যশোর।

উত্তর : প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমাকৃত টাকা নিজের পূর্ণ অধিকারে থাকলে অর্থাৎ যে কোনো সময়ে উঠানো সম্ভব হলে সূদের টাকা ব্যতীত বাকী টাকার যাকাত দিতে হবে। কারণ যাকাত দেওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদের পূর্ণ মালিক হওয়া যরূরী। আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘এক বছর অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্পদের যাকাত নেই’ (আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩)।

(৩৪) : স্ত্রী উপার্জন করলে তার যাকাত ও কুরবানী স্বামী দিবে, না-কি স্ত্রী দিবে? 

-তরীকুল ইসলাম
  ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

উত্তর : স্ত্রী উপার্জন করে যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় অথবা যে কোনোভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তার যাকাত তাকেই আদায় করতে হবে। স্ত্রী যদি স্বামীকে ওয়াকীল নির্ধারণ না করে এবং স্বামী তার পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করে দেয়, তাহলে এই যাকাত আদায় হবে না। কেননা যাকাত হলো একটি ইবাদত। আর ইবাদতের জন্য নিয়্যত শর্ত। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমলসমূহ নিয়তের উপর নির্ভরশীল’ (ছহীহ বুখারী, হা/১; আবূ দাউদ, হা/২২০৩; মিশকাত, হা/১)। আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ঈদুল আযহা অথবা, ঈদুল ফিতরের দিনে রাসূলুল্লাহ (ছা.) ঈদগাহে গেলেন এবং ছালাত শেষ করলেন। পরে লোকদের উপদেশ দিলেন এবং তাদের ছাদাক্বা করার নির্দেশ দিলেন আর বললেন, লোক সকল! তোমরা ছাদাক্বা করো।

অতঃপর মহিলাগণের নিকট গিয়ে বললেন, মহিলাগণ! তোমরা ছাদাক্বা করো। আমাকে জাহান্নামে তোমাদেরকে অধিক সংখ্যক দেখানো হয়েছে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এর কারণ কী? তিনি বললেন, তোমরা বেশি অভিশাপ দিয়ে থাকো এবং স্বামীর অকৃতজ্ঞ হয়ে থাকো। হে মহিলাগণ! জ্ঞান ও দ্বীনে অপরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দৃঢ়চেতা পুরুষের বুদ্ধি হরণকারিণী তোমাদের মতো কাউকে দেখিনি। যখন তিনি ফিরে এসে ঘরে পৌঁছলেন, তখন ইবনু মাসঊদ (রা.)-এর স্ত্রী যায়নাব (রা.) তাঁর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! যায়নাব এসেছেন। তিনি বললেন, কোন যায়নাব? বলা হলো ইবনু মাসঊদের স্ত্রী। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকে আসতে দাও। তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনি ছাদাক্বা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার অলংকার আছে। আমি তা ছাদাক্বা করার ইচ্ছা করেছি। ইবনু মাসঊদ (রা.) মনে করেন, আমার এ ছাদাক্বায় তার এবং তার সন্তানদেরই হক্ব বেশি। তখন রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, ইবনু মাসঊদ (রা.)  ঠিক বলেছেন। তোমার স্বামী ও সন্তানই তোমার এ ছাদাক্বার অধিক হাক্বদার (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৬২)। এ হাদীছ থেকে বুঝা যায় যে, স্ত্রীর যাকাত স্ত্রীকেই আদায় করতে হয় এবং স্বামী ও সন্তানাদী গরীব হলে তারাই এই মালের বেশি হক্বদার। সামর্থ্য থাকলে স্ত্রী কুরবানী করতে চাইলে কুরবানী করতে পারে। উম্মে সালমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘যিলহজ্জের দশম তারিখে তোমাদের কেউ কুরবানী করতে চাইলে সে যেন কুরবানী না করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে’ (নাসাঈ, হা/৪৩৬৩; মিশকাত, হা/১৪৫৯)। তবে পরিবারের কর্তা কুরবানী দিলে সবার পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে (তিরমিযী, হা/১৫১৮; আবূ দাঊদ, হা/২৭৮৮, সনদ ছহীহ; ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৫, সনদ হাসান)।

 

মৃত্যু-কবর-জানাযা

প্রশ্ন (৩৫) : কবরস্থানের জমি কি ওয়াক্বফ করা যরূরী? খাছ জমিতে কি কবর দেওয়া যাবে

-ওমর ফারূক
পঞ্চগড়।

উত্তর : কবরস্থানের জমি ওয়াক্বফ হওয়াই শরী‘আতসম্মত (মাওয়াহিবুল জালীল লিল হাত্ত্বব, ৫/৪৯৫)। কেননা কবরস্থানের জমি ওয়াক্বফ না হলে মানুষ সহজেই তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করবে। তখন কবরকে সম্মান করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছা.) যা বলেছেন, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। কবরস্থানের জমি যে ওয়াক্বফকৃত হতে হবে বাক্বীউল গারক্বাদ তার প্রমাণ। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর যুগ হতে অদ্যবধি স্থানটিকে কবরস্থান হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ তাকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেননি। আর খাছ জমিতে কবর না দেওয়াই উত্তম। কেননা খাছ জমি এমন জায়গা যা নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। তবে কবরস্থান বা ব্যক্তিগত জায়গা না পেলে উক্ত জমিতে কবর দিতে পারে।

প্রশ্ন (৩৬) : জানাযার ছালাত কখন চালু হয় এবং কে রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে জানাযার ছালাতের পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন?

-বুরহানুদ্দীন
 উত্তরা, ঢাকা।

উত্তর : জানাযার ছালাত ১ম হিজরীতে চালু হয় (ইতহাফুল কিরাম শারহে বুলূগুল মারাম, পৃ. ১৪১, ‘জানাযা’ অধ্যায়)। পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর শিক্ষক বা প্রশিক্ষক নন। বরং মহান আল্লাহই জিবরীলের মাধ্যমে তাকে সবকিছু জানিয়েছেন ও শিখিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সে মনগড়া কথা বলে না, এটা তো অহী যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। তাকে শিক্ষা দান করে মহাশক্তিশালী,  (ফেরেশতা জিবরীল (আ.) (আন-নাজম, ৫৩/৩-৫)।

 

ব্যবসা-বাণিজ্য ও সূদী কারবার

প্রশ্ন (৩৭) : বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে স্যাম্পল ওষুধ ডাক্তারদেরকে ভিজিট করিয়ে থাকে। কিন্তু ওষুধগুলো ডাক্তারদের প্রয়োজন না হওয়ায় কোম্পানির কর্মচারীরা ফার্মেসী ব্যবসায়ীদের নিকট তা বিক্রয় করে দেয়। ব্যবসায়ীরাও তা জনগণের কাছে বিক্রয় করে। অথচ তা কোম্পানি বা সরকার অনুমোদিত নয়। এমন ব্যবসা বৈধ হবে কি?

আব্দুল হালীম সরকার
মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : স্যাম্পল ওষুধের ব্যাপারে কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা মোতাবেক ওষুধগুলো কাজে লাগাতে হবে। যদি সেগুলো বিক্রি করার ব্যাপারে কোম্পানির তরফ থেকে কোনো অনুমতি না থাকে, তাহলে কোম্পানির অজান্তে সেগুলো বিক্রি করা জায়েয হবে না। বরং তা চুরি বলে গণ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন অন্যের বকরী বিনা অনুমতিতে দোহন না করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৩৫; ১৭২৬)। তিনি আরও বলেন, ‘কোনো মুসলিমের সম্পদ ভোগ করা জায়েয হবে না, তার সন্তুষ্টি ছাড়া’ (দারাকুত্বনী, হা/২৯২৪; ছহীহুল জামে‘, হা/৭৬৬২)। যেহেতু এসব ওষুধ বাজারজাতকরণের ব্যাপারে কোম্পানি কিংবা সরকারি অনুমতি নেই, বিধায় কারও জন্য এমন ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয নয়। তবে যদি কোম্পানির তরফ থেকে বিক্রির স্বাধীনতা দেওয়া থাকে, তাহলে সেগুলো বিক্রি করে দেওয়াতে কোনো সমস্যা নেই।

প্রশ্ন (৩৮) : সূদী কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের নিকট হতে টাকা-পয়সা ঋণ নেওয়া যাবে কি?

-আব্দুল্লাহ
 সাঘাটা, গাইবান্ধা।

উত্তর : এমন ব্যক্তির নিকট হতে টাকা-পয়সা ঋণ না নেওয়াই উত্তম। কেননা তার নিকট থেকে টাকা-পয়সা ঋণ নিলে বড় পাপীকে সহযোগিতা করা হবে, যা নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা সৎ ও পরহেযগারিতার কাজে সহযেগিতা করো এবং মন্দ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না (আল-মায়েদাহ, ৫/২)।

প্রশ্ন (৩৯) : আমার পিতা সোনালী ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি বাড়ি করার জন্য ও ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করানোর জন্য বিভিন্ন সোর্স থেকে লোন নিয়েছেন। যার সূদ এখনো পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারেননি। এমতাবস্থায় পিতা-মাতাসহ আমাদের কারও ফরয বা নফল কোনো ধরনের ইবাদত কবুল হবে কি?

-আব্দুর রহমান
রামনগর, দিনাজপুর।

উত্তর : ইবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত হলো, হালাল রূযী। সুতরাং রূযী হালাল না হলে মহান আল্লাহ কারও ইবাদত কবুল করবেন না। আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলগণকে যে আদেশ করছেন, মুমিনগণকেও সে আদেশই করেছেন। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসূলগণ! আপনারা পবিত্র খাদ্য খাবেন এবং সৎ আমল করতে থাকবেন’ (আল-মুমিনূন, ২৩/৫২)। মুমিনগণকে লক্ষ্য করে অনুরূপই বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! আমার দেওয়া পবিত্র রিযিক্ব হতে খাও’ (আল-বাক্বারাহ, ২/১৭২)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছা.) উল্লেখ করলেন, এক ব্যক্তি দূর-দূরান্তে সফর করছে। তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীরে ধুলাবালি। এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তি উভয় হাত আসমানের দিকে উঠিয়ে কাতরস্বরে হে প্রভু! হে প্রভু! বলে ডাকছে। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবিকা নির্বাহ হারাম, কীভাবে তার দু‘আ কবুল হবে? (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)। তবে সন্তানরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে এবং উপার্জনক্ষম না হলে পিতা-মাতার উপার্জন হতে ভোগ করতে পারে। কেননা তারা শরী‘আতের মুকাল্লাফ নয়। তাদের প্রতিপালনের দায়িত্ব পিতা-মাতার। সুতরাং এজন্য সন্তান দায়ী হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘কোনো বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না’ (আন-নাজম, ৫৩/৩৮)। রাসূলুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘কোনো প্রাণ অপরের অপরাধের কারণে দণ্ডিত হবে না’ (নাসাঈ, হা/৪৮৪৯, ৪৮৫০, ৪৮৫১; ইরওয়াউল গালীল, হা/২৩০৩)। উল্লেখ্য যে, প্রকাশ্য সূদী ব্যাংকে চাকরি করা হারাম এবং এর বেতনও হারাম (ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৪৯৩৮)।

 

হালাল-হারাম

প্রশ্ন (৪০) : বাবা হালাল-হারাম মিশ্রিত অর্থ দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করলে সন্তানরা উক্ত বাড়িতে বসবাস করলে ও তার ভাড়া (বাসা ভাড়া) ভোগ করলে তা-কি হালাল হবে?

-মুহাম্মাদ হামিম
 ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া।

উত্তর : যদি সন্তানদের সামর্থ্য থাকে তাহলে পিতার হালাল-হারাম মিশ্রিত উপার্জনের দ্বারা তৈরি করা বাড়িতে বসবাস করা এবং বাসা ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ ভোগ করা হতে বিরত থাকাই উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র তিনি পবিত্র ছাড়া গ্রহণ করেন না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘যে কাজে মনে খটকা লাগে, সে কাজ পরিহার করে খটকাহীন কাজ অবলম্বন করো’ (তিরমিযী, হা/২৫১৮; নাসাঈ, হা/৫৭১১; মিশকাত, হা/২৭৭৩)। অপর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বস্তুর মধ্যে লিপ্ত হবে, সে হারামেই পতিত হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২; বুলূগুল মারাম, হা/১৪৬৭)। আর সামর্থ্য না থাকলে পিতাকে হারাম পথ ছেড়ে সৎ পথে উপার্জন করতে নছীহত করতে হবে ও সে পথে পিতাকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। তবে সন্তানরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে এবং উপার্জনক্ষম না হলে তা ভোগ করতে পারে। কেননা তারা শরী‘আতের মুকাল্লাফ নয়। তাদের প্রতিপালনের দায়িত্ব পিতা-মাতার। সুতরাং এজন্য সন্তান দায়ী হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘কেউ অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না’ (আন-নাজম, ৫৩/৩৮)। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘কোনো প্রাণ অপরের অপরাধের কারণে দণ্ডিত হবে না’ (নাসাঈ, হা/৪৮৪৯, ৪৮৫০, ৪৮৫১; ইরওয়াউল গালীল, হা/২৩০৩)।

 

পারিবারিক বিধান বিবাহ

প্রশ্ন (৪১) : বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র পক্ষের নিকট কোনো মেয়ের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করলে কি গীবত হবে? আবার দোষ-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও যদি ভালো বলা হয়, তাহলে কি প্রতারণা করা হবে?

-জুয়েল বিন মনিরুল ইসলাম
 পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : বিবাহের ক্ষেত্রে এক পক্ষের কাছে অপর পক্ষের মাঝে থাকা দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা গীবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং তা প্রকাশ করাই উচিত। কারণ কোনো ত্রুটির কথা গোপন করে বিবাহ সম্পাদিত হওয়ার পর যখন সেই ত্রুটি প্রকাশিত হয়ে যাবে, তখন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হবে। দুই পক্ষের মাঝে দ্বন্দ্ব-কলহ হবে এবং একে-অপরকে প্রতারক মনে করবে। ফাতেমা বিনতে ক্বায়েস তালাক্বপ্রাপ্তা হওয়ার পর ইদ্দত পালন শেষে যখন তাকে মু‘আবিয়া (রা.) এবং আবূ জাহ্ম (রা.) বিবাহের প্রস্তাব দিলেন, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, মু‘আবিয়া তো নিঃস্ব মানুষ, তার কোনো সম্পদ নেই। আর আবূ জাহম স্ত্রীকে অধিক মারধর করে। সুতরাং তুমি উসামা ইবনে যায়েদকে বিবাহ করো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮০; ইবনে মাজাহ, হা/১৮৬৯; মিশকাত, হা/৩৩২৪)। যেসব দোষ-ত্রুটি কিংবা রোগ-ব্যাধি বিবাহের উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করে, সেসব ত্রুটি ও রোগ-ব্যাধির কথা দুই পক্ষেরই একে-অপরকে জানিয়ে দেওয়া যরূরী। তা না জানালে ধোঁকাবাজ ও প্রতারক বলে সাব্যস্ত হবে। আর দোষ-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ‘ভালো’ বলা তো চরম মিথ্যাচার ও প্রতারণা। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে আমাদের ধোঁকা দিল, সে আমাদের আদর্শভুক্ত নয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১; মিশকাত, হা/৩৫২০)।

প্রশ্ন (৪২) : স্ত্রী যদি বলে আমি মোহর নিব না এবং আমার মোহরের কোনো দাবীও নেই। তাহলে করণীয় কী?

-ওয়াসিম আকরাম
দাউদকান্দী, কুমিল্লা।

উত্তর : মোহর আল্লাহ প্রদত্ত স্ত্রীর হক্ব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পর এক। অতএব, তাদেরকে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে করো এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে মোহরানা প্রদান করো’ (আল-বাক্বারাহ, ২/২৫)। সুতরাং সকলের উচিত স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা। তবে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ না করেন কিংবা ক্ষমা করে দেন, তাহলে দিতে পারেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘অতএব এদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা (বিবাহর পর) যৌন সম্ভগ করবে, তাদেরকে তাদের পাওনা (মোহরানা) দিয়ে দাও। মোহরানা নির্ধারণের পর পারস্পরিক সম্মতিতে (কোনো হ্রাস-বৃদ্ধি করলে তোমাদের) কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী রহস্যবিদ’ (আন-নিসা, ৪/২৪)।

প্রশ্ন (৪৩) : ছেলের বিবাহের জন্য কি অভিভাবকের সম্মতি প্রয়োজন?

-আসাদুল্লাহ
মিরপুর, কুষ্টিয়া।

উত্তর : ছেলের বিবাহের জন্য অভিভাবকের সম্মতি শর্ত নয়, যেমন মেয়ের জন্য তা আবশ্যক (তিরমিযী, হা/১১০২; মিশকাত, হা/৩১৩১)। বরং ছেলে রাজি থাকলেই বিবাহ বৈধ হয়ে যাবে। তবে পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ভুল প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাদের কথার অনুসরণ করা উচিত। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তুমি তোমার পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না। যদিও তারা তোমাকে তোমার পরিবার ও ধন-সম্পদ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলেন’…(আহমাদ, হা/২২১২৮, সনদ ছহীহ; ইরওয়াউল গালীল, হা/২০২৬; ইবনু মাজাহ, হা/৪০৩৪; মিশকাত, হা/৬১)। অতএব, উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিবাহ হওয়া ভালো। এতে পারিবারিক দ্বন্দ্ব হতে মুক্ত থাকা যায়।

 

পারিবারিক বিধান তালাক

প্রশ্ন (৪৪) : ২০১৫ সালের প্রথম দিকে পারিবারিকভাবে একটা মেয়ের সাথে আমার বিয়ের কাবিন করে রাখা হয়। তার ৪-৫ মাস পরে কিছু মোহর বাকি রেখে ইজাব-কবুলের মাধ্যমে আমাদের বিয়ে হয়। তবে বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথিদের কাছ হতে উপহার হিসাবে প্রাপ্ত স্বর্ণালংকারগুলো তাকে দেনমোহর হিসাবে দিয়ে দেই। যার পরিমাণ ছিল বাকি মোহরের চেয়ে অনেক বেশি। বিয়ের কিছুদিন পরে ব্যবসায় লস এবং আমার মায়ের ক্যান্সারের কারণে আমাদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়। তখন থেকে শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমাকে ছেড়ে দেবার জন্য তার প্রতি চাপ সৃষ্টি করে অন্যথা তাকে ত্যাজ্য করার হুমকি দেয়। এরপর শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিছুদিন আগে সে তার পিতার বাড়ি বেড়াতে যায়। তার কয়েক দিন পরেই শুনতে পেলাম কাবিননামার ১৮ নং ধারার ক্ষমতাবলে সে আমাকে তালাক দিয়েছে। তবে আমি তালাকের কোনো নোটিশ পাইনি। এ বিষয়ে আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, সে কিছু বলতে পারে না। তবে এক মৌলভীর কাছে শুনেছে যে, তালাক হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, এভাবে কি আমাদের তালাক হবে?

-শাহিন আলম
তানোর, রাজশাহী।

উত্তর : প্রশ্নোল্লিখিত পদ্ধতিতে দেওয়া তালাক, তালাক বলে গণ্য হবে না। কারণ স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে সে যেহেতু বলে এ বিষয়ে সে কিছুই জানে না, সেহেতু স্পষ্ট হয় যে, স্ত্রী খোলা হিসাবে তালাকও গ্রহণ করেনি। আর স্ত্রীর পক্ষ থেকে যে তালাক হয় তাকে ‘খোলা’ বলা হয়। খোলা তালাকে স্ত্রীকে দায়িত্বশীলদের সামনে সংসার না করার স্বীকৃতি প্রকাশ করতে হবে। যেমন ছাবেত ইবনু ক্বায়েসের স্ত্রী করেছিলেন (আবূ দাঊদ হা/২২২৯; বুলূগুল মারাম হা/১০৬৬)।

 

পারিবারিক বিধান সম্পর্ক

প্রশ্ন (৪৫) : পিতা-মাতা অন্যায়ভাবে জামাইকে গালিগালাজ করলে মেয়ে কার পক্ষে কথা বলবে?

-মাহমূদা বেগম
বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : কোনো অবস্থাতেই কাউকে গালিগালাজ করা ঠিক নয়, বরং তা পাপের কাজ। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিক্বী এবং তাকে হত্যা করা কুফরী’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৪; মিশকাত, হা/৪৮১৪)। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ে পক্ষাবলম্বনমূলক কোনো ভাব, ভাষা বা বাক্য বিনিময় না করে সত্য ও ন্যায়সংগত কথা বলবে। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমনা যখন কথা বলবে তখন ইনছাফপূর্ণ কথা বলবে, নিকটাত্মীয়দের সম্পর্কে হলেও’ (আল-আন‘আম, ৬/১৫২)। অতএব, সত্য ও ন্যায়ের উপর অটল থাকলে অব্যশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য নেমে আসবে। আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, তিনটি জিনিস মুক্তিদানকারী এবং তিনটি জিনিস ধ্বংস সাধনকারী। মুক্তিদানকারী জিনিসগুলো হলো, প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করা। খুশী ও অখুশী, সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় সত্য কথা বলা এবং ধনী ও দরিদ্র উভয় অবস্থায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। পক্ষান্তরে ধ্বংস সাধনকারী জিনিসগুলো হলো, প্রবৃত্তির অনুসারী হওয়া, লোভ-লালসা-কৃপণতার দাস হওয়া এবং কোনো ব্যক্তি নিজ অহমিকায় লিপ্ত হওয়া। আর তা হলো সর্বাপেক্ষা জঘন্য (বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/৭৪৫, ৭২৫২; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৮০২; মিশকাত, হা/৫১২২)।

প্রশ্ন (৪৬) : বিয়ের বয়স যখন এক বছর, তখন স্বামী-স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ত্রীর গর্ভে সন্তান চলে আসে। ফলে তারা সেটাকে নষ্ট করে ফেলে। বর্তমানে তারা বুঝতে পারছে যে, এটা করা তাদের চরম অন্যায় হয়েছে। উক্ত পাপ হতে মুক্তির জন্য শরী‘আত অনুযায়ী এখন তাদের করণীয় কী?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
  চট্টগ্রাম সদর।

উত্তর : গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট করা অর্থ সন্তান হত্যা করা, যা শরী‘আতে স্পষ্ট হারাম ও মহাপাপ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা দরিদ্রতার ভয়ে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। কেননা আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ’ (ইসরা, ১৭/৩১)। আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা বড় পাপ কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করা অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এটা তো বড় পাপ বটে। এরপর কোনটি? তিনি বললেন, আপন সন্তানকে এ আশঙ্কায় হত্যা করা যে, সে তোমার খাবারে অংশগ্রহণ করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৭)। সুতরাং যদি শয়তানের প্ররোচনায় কারও দ্বারা এমন অপরাধ সংঘটিত হয়েই যায়, তাহলে তার উচিত এমন আচরণ পরিহার করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে খালেছ অন্তরে আল্লাহর নিকট তওবা করা। ইনশাআল্লাহ তিনি তাকে ক্ষমা করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তারা আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দিবেন। নিশ্চয় তিনিই মহা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (আয-যুমার, ৩৩/৫৩)।

 

অপরাধ-দণ্ডবিধি

প্রশ্ন (৪৭) : জনৈক বৃদ্ধ গাভীর সাথে যেনা করেছে। এমন কাজের জন্য পরিবারের লোকজন তার সাথে কেমন আচরণ করবে? তারা তার সাথে মন্দ আচরণ করলে কি গুনাহগার হবে

-নূরুযযামান
কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।

উত্তর : পশুর সাথে যেনা করা নিকৃষ্ট চরিত্রের পরিচায়ক এবং জঘন্যতর কবীরা গুনাহ। যারা এমন কর্মে লিপ্ত হয়, তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা অভিশাপ করেন। ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পশুর সাথে যেনা করে, আল্লাহ তার প্রতি অভিশাপ করেন’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৮০৫২)। অপর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পশুর সাথে যেনা করল, সে অভিশপ্ত’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৭৫; ছহীহ ও যঈফ আল-জামেঊছ ছগীর, হা/১০৮৩১)। তবে কোনো ব্যক্তি পাপী হলে তাকে সামাজিকভাবে ঘৃণার চোখে দেখা বা তার সাথে মন্দ আচরণ করা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘যদি তোমাদের কারও দাসী যিনা করে এবং তা প্রকাশ হয়ে যায়, তখন তাকে শাস্তিস্বরূপ চাবুক মারো। কিন্তু তাকে তিরস্কার করো না। পুনরায় যদি যেনা করে, তাহলে তাকে শাস্তিস্বরূপ চাবুক মারো। কিন্তু তিরস্কার করো না। তৃতীয়বার যদি সে যিনায় লিপ্ত হয় এবং তার যেনা করাটা প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে চুলের একটি রশির বিনিময়ে বিক্রয় করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/২২৩৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭০৩; মিশকাত, হা/৩৫৬৩)। সুতরাং এমন ব্যক্তিকে নছীহত বা উপদেশের মাধ্যমে সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে।

 

অনলাইন জগৎ

প্রশ্ন (৪৮) : ফেইসবুক পেজে অনেক মেয়েরা অশ্লীল ছবি এবং ছেলেরা ভ্যারাইটিজ ডিজাইনের চুল নিয়ে ছবি আপলোড দিয়ে থাকে। এমন ছবিতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করার ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশনা কী?  

-মানিক ছিদ্দীক
কুমারখালী, কুষ্টিয়া।

উত্তর : এমন ছবিতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করা নিষিদ্ধ। কেননা ফেসবুকে আপলোডকৃত এমন ছবিতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করার মাধ্যমে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। যা পাপ ও অন্যায়ের প্রচার-প্রসারের শামীল। অথচ এমন কাজ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজ হতে বিরত রাখবে’ (আলে-ইমরান, ৩/১১০)। তা ছাড়া এ ধরনের অশ্লীল ছবি আপলোডকারী এবং তাতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারকারী সকলেই সমান অপরাধী। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তার জন্য তার কাজের গুনাহ রয়েছে এবং তাঁর পরবর্তীতে যারা এ কাজ করবে, তাদেরও গুনাহ রয়েছে। অথচ তাদের গুনাহ থেকে কিছুই কম করা হবে না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৭; মিশকাত, হা/২১০)। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে ফেসবুক যাবতীয় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার একটি ক্রাইম-ব্যাংক হিসাবে এবং যুব সমাজের ঈমান ও আদর্শকে ধ্বংসের পিছনে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে। কেননা অবৈধ সম্পর্ক, যেনা-ব্যভিচার, মিথ্যার প্রচার, সময়ের অপব্যবহার, অশ্লীল ফটোগ্রাফী, মানুষকে হত্যার হুমকিসহ এমন কোনো অন্যায় ও অপরাধ নেই, যা ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটছে না। বিশেষভাবে মেয়েদের নগ্ন ছবি প্রদর্শন এবং ছেলেদের বিজাতীয় অনুসরণ সম্বলিত বিভিন্ন অশ্লীল কর্মকাণ্ড ও তৎসম্বলিত ছবি আপলোডকরণ এবং তাতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অথচ মেয়েদের সর্বাঙ্গই সতর, যা ঢেকে রাখা ফরয। আর তা প্রদর্শন করে বেড়ানো জাহেলিয়াত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করো এবং জাহেলী যুগের নারীদের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করো না’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩৩)। অপরদিকে বিজাতীদের অনুসরণ ও অনুকরণের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করে রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের অনুসরণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত’ (আবূ দাউদ, হা/৪০৩১; মিশকাত, হা/৪৩৪৭)। অতএব এ ধরনের কর্মকাণ্ড হতে বিরত থাকতে হবে।

 

চিকিৎসা

প্রশ্ন (৪৯) : হোমিও চিকিৎসা ও ওষুধ তৈরিতে এ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়, এ চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে কি?

-হাসান মাহমুদ রাসেল
হাজিগঞ্জ, চাঁদপুর। 

উত্তর : হোমিও ওষুধ খাওয়া যাবে। কেননা তাতে যে এ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়, তা মদ হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই (উছায়মীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ১১/২৫৬-২৬০)।

 

অন্যান্য

প্রশ্ন (৫০) : পৃথিবীর মানুষের জ্ঞান যদি এক পাল্লায় রাখা হয়, আর ওমর (রা.)-এর জ্ঞান যদি অন্য পাল্লায় রাখা হয়, তাহলে ওমরের জ্ঞানের পাল্লা ভারী হবে’-এ কথাটির কোনো ভিত্তি আছে কি

   –সিরাজুল হক্ব
 শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর : হ্যাঁ, ওমর (রা.)-এর ইলমের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি মন্তব্য পাওয়া যায়। এমর্মে তিনি বলেছেন, ‘যদি ওমর (রা.)-এর ইলমকে এক পাল্লায় ও পৃথিবীবাসীর ইলমকে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তাহলে ওমর (রা.)-এর ইলম তাদের উপরে  অগ্রাধিকার লাভ করবে (মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ৬/৩১; মাজমাঊয যাওয়ায়েদ তাহক্বীক্বকৃত, ৮/৩৭১)।