সওয়াল-জওয়াব
ফাতাওয়া বোর্ড, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ


পবিত্রতা

প্রশ্ন () : ওযূর সময় এক অঙ্গ ধৌত করার পূর্বে অপর অঙ্গ শুকিয়ে গেলে ওযূ হবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম
জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : এমতাবস্থায় ওযূ হবে না এজন্য যে, হাদীছের বিবরণ হলো, ওযূর সময় অঙ্গগুলো ধৈত করার ব্যাপারে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক অঙ্গ ধৌত করার কিছুক্ষণ পরে অপর অঙ্গ ধৌত করেছেন মর্মে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অতএব ওযূর ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে ওযূ বাতিল হবে।



ইবাদতছালাত

প্রশ্ন (২) : বিতর ছালাতে কুনূতের পর বাংলায় কোনো দুআ পড়া যাবে কি?

-মহসিন
কসবা, বি-বাড়ীয়া।

উত্তর : ছালাতের কোনো স্থানেই বাংলা, আরবী অথবা অন্য কোনো ভাষায় প্রয়োজনীয় দু‘আ তৈরি করে পড়া যাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘নিশ্চয়ই ছালাত মানুষের কথাবার্তা বলার ক্ষেত্র নয়। এটা কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তেলাওয়াতের জন্যই নির্দিষ্ট’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৭, আবূ দাঊদ, হা/৭৯৫; নাসাঈ, হা/১২০৩)। তবে কুনূতে নাযেলায় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ধরে তাদের বিরুদ্ধে দু‘আ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৮০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৫; মিশকাত, হা/১২৮৮)। তাই কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত দু‘আগুলোই পড়া উচিত। এরপরও যদি কেউ আরও বেশি দু‘আ করতে চায়, তাহলে ছালাতের সালাম ফিরানোর পর দুই হাত তুলে একাকী নিজ ভাষায় দু‘আ করবে। দুই হাত তুলে দু‘আ করলে আল্লাহ খালি হাত ফেরত দেন না।


প্রশ্ন (৩) : বাসায় আযান ও খুৎবা দিয়ে জুমআর ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-তাযবীউল হাসান
আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা।
উত্তর : জামে মসজিদে জুমআর ছালাত আদায় করতে হবে এটি শারঈ বিধান। তবে পাড়া-গ্রামে যদি মসজিদের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে অন্য যে কোনো স্থানে বা মাঠে খুৎবা দিয়ে জুমআর ছালাত আদায় করা যাবে। কেননা জুমআর জন্য মসজিদ শর্ত নয়। বরং জামআত ও খুৎবা শর্ত। সুতরাং যে স্থানে জুমআ ও জামাআতের সুযোগ মিলবে সে স্থানে জুমআর ছালাত আদায় করা যাবে (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/২৫৭-২৬০; আবূ দাঊদ, হা/১০৬৭; ইরওয়াউল গালীল, হা/৫৯২)।


প্রশ্ন (৪) : ছালাতে নূন্যতম তিন আয়াত এবং ধারাবাহিকভাবে সূরা পাঠের ব্যাপারে শারঈ বিধান কী

-আদার আলী
কালীগঞ্জ, লালমণিরহাট।
উত্তর : সূরা ফাতিহার পর নির্দিষ্ট করে কত আয়াত পড়তে হবে, তা কোনো ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়নি। তবে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যতটুকু সম্ভব ততটুকু পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন (ছহীহ আবূ দাঊদ, হা/৮৫৬, সনদ ছহীহ)। তাই কখনো ছোট আবার কখনো বড় সূরা তেলাওয়াত করা যাবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম রাকআত দ্বিতীয় রাকআতের চেয়ে বেশি দীর্ঘ করতেন মর্মে ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৯, ৭৭৬, ৭৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৫১)। অতএব সর্বদা এরূপই হওয়া সুন্নাত। তবে কখনো দ্বিতীয় রাকআতে ক্বিরাআত লম্বা হয়ে গেলে তাতে কোনো সমস্যা হবে না (ছিফাতু ছালাতিন্নবী, পৃ. ১০৩)। অনুরূপ ধারাবাহিকভাবে সূরা পড়া উত্তম। তবে আগ-পিছ করে বা একই সূরা বারবার পড়েও ছালাত আদায় করা যায়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের ছালাতের উভয় রাকআতে সূরা যিলযাল পড়েছেন (আবূ দাঊদ, হা/৮১৬; হাসান ছহীহ; মিশকাত, হা/৮৬২)। শায়খ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমাদের নিকট স্পষ্ট যে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের ছালাতে সূরা যিলযাল ইচ্ছাকৃতভাবেই তেলাওয়াত করেছেন; ভুলবশত নয়। তিনি এটিকে শরীআতে বৈধকরণ ও মানুষকে শিক্ষাদানের জন্য করেছেন। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) ধারাবাহিকতা ছাড়া আগে পিছে সূরা পড়া জায়েয হিসাবে অধ্যায় রচনা করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৯৩, ‘কুরআনের ফযীলতসমূহ’ অধ্যয়)।


প্রশ্ন (৫) : ঋতুবতী মহিলা কীভাবে লায়লাতুল ক্বদর তালাশ করবে?

-রাশেদ
চরফ্যাশন, ভোলা।
উত্তর : ঋতুবতী মহিলাগণ ছালাত, ছিয়াম, কা‘বাঘর তাওয়াফ, মসজিদে ই‘তিকাফ করা ব্যতীত আল্লাহর যিকির-আযকার, তওবা-ইস্তিগফার এবং দু‘আ-দরূদের ও বিনা স্পর্শে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে লায়লাতুল ক্বদর জাগরণ করবে। কেননা নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ রাত্রিতে তাঁর স্ত্রীদেরকেও জাগিয়ে দিতেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রামাযানের শেষ দশক আসত, তখন নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত্র জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০২৪; ছহীহ মুসলিম হা/১১৭৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫১০৯)।


প্রশ্ন (৬) : বাড়ির নিকটে ছহীহ আক্বীদার মসজিদ না থাকায় দূরের (৬ কি. মি.) মসজিদে যাওয়া যাবে কি?
-আনোয়ার হোসেন
কাশিমপুর, গাজীপুর।
উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদ্ধতিতে ছালাত আদায় করার কারণে কোনো মসজিদে যদি ছালাত আদায় করতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে গ্রামের মসজিদ ছেড়ে দূরের মসজিদে যাওয়া যাবে। তাবেঈ মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে ছালাত আদায়ের জন্য এক মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে আযান হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মুয়াযযিন আবার ছালাতের জন্য ডাকা শুরু করল। তখন ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘চলো বের হয়ে যাই এই বিদআতীর নিকট থেকে। তিনি সেখানে আর ছালাত আদায় করলেন না (তিরমিযী, হা/১৯৮; আবূ দাঊদ, হা/৫৩৮)।


প্রশ্ন (৭) : তাশাহহুদ-এর পটভূমি কী? জনৈক আলেম বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মে‘রাজে গমন করলে আল্লাহর সাথে যে কথোপকথন হয়েছিল এবং ফেরেশতারা যে সাক্ষী দিয়েছিল সেটাই তাশাহহুদ নামে পরিচিত। এ কথার কোনো সত্যতা আছে কি?

-ড. মো. গোলাম মোর্তুজা
পদ্মা আবাসিক এলাকা, রাজশাহী।
উত্তর : ‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মে‘রাজে গমন করার সময় আল্লাহর সাথে যে কথোপকথন হয় এবং ফেরেশতাগণ যে সাক্ষ্য দেন সেটাই তাশাহহুদ মর্মে বর্ণিত ঘটনাটি সনদবিহীন ও ভিত্তিহীন। তাশাহহুদের পটভূমি সম্পর্কে ছহীহ হাদীছের বক্তব্য একেবারে সুস্পষ্ট। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন আমরা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছালাত আদায় করতাম, তখন আমরা বলতাম,

اَلسَّلاَمُ عَلَى اللهِ قَبْلَ عِبَادِهِ، السَّلاَمُ عَلَى جِبْرِيْلَ، السَّلاَمُ عَلَى مِيْكَائِيْلَ، السَّلاَمُ عَلَى فُلاَنٍ

অর্থাৎ, ‘বান্দাদের আগে আল্লাহর প্রতি সালাম, জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি সালাম, মীকাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি সালাম এবং অমুকের প্রতি সালাম। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছালাত শেষ করে আমাদের দিকে ফিরে বললেন, আল্লাহ তাআলা নিজেই ‘সালাম’। অতএব যখন তোমাদের কেউ ছালাতের মধ্যে বসবে, তখন বলবে,

التَّحِيَّاتُ لله وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلاَمُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ السَّلاَمُ عَلَيْنَا وَعَلٰى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِينَ

‘মুছল্লী যখন এই কথা বলবে, তখন আসমান-যমীনে সব নেক বান্দাদের নিকট এ সালাম পৌঁছে যাবে। তারপর বলবে,أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه وَرَسُوْلُه ‘তারপর সে যা ইচ্ছা দু‘আ করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬২৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪০২)।


প্রশ্ন (৮) : ছালাতের সালাম ফিরানোর কতক্ষণ পরে একজন মুছল্লী তার স্থান হতে উঠে যেতে পারে?

-রওশন আলী
বাঘা, রাজশাহী।
উত্তর : ছালাতের সালাম ফিরানোর পর বেশ কিছু তাসবীহ-তাহলীল ও দু‘আসহ অনেক যিকির-আযকার পাঠ করার কথা ছহীহ হাদীছসমূহে বর্ণিত হয়েছে। মুক্তাদীগণ সেগুলো পাঠ করে তার স্থান হতে উঠে যেতে পারে। যেমন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ছালাতের শেষে সালাম ফিরাতেন, তখন তিনি ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ পড়তেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯২; মিশকাত, হা/৯৬০)। এ ছাড়া তিনি আরও অনেক যিকির-আযকার করতেন। এতে প্রমাণিত হয়, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাম ফিরানোর সাথে সাথে উঠতেন না। তবে জরুরী প্রয়োজন থাকলে সংক্ষিপ্ত ছানা বা ‘আল্লাহু আকবার’, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ’; ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালামু, তাবারকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ এতটুকু বলে উঠে যেতে পারে। (মুসলিম, হা/৫৯২)।


প্রশ্ন (৯) : কেউ জুমআর জামাআত না পেলে কি যোহর আদায় করবে

 -রওশন আলী
বাঘা, রাজশাহী।
উত্তর : বাধ্যগত কারণে জুমআ পড়তে না পারলে, অথবা দ্বিতীয় রাকআতের রুকু শেষ হওয়ার পরে ছালাতে যোগ দিলে চার রাকআত যোহর পড়ে নিবে (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/২২৬-২৭)। তবে জুমআর ছালাতের শেষ রাকআতের রুকূ পেলে, অথবা এক রাকআত পেলে বাকী এক রাকআত পূর্ণ করে জুমআ সমাপ্ত করবে (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/৬০৭; মিশকাত, হা/১৪১২; ইরওয়াউল গালীল, ৩/৮২)।


প্রশ্ন (১০) : যদি রুকূতে যাওয়ার পূর্বে হাত উত্তোলন না করি এবং তাশাহহুদের সময় শাহাদাত আঙ্গুল না উঠাই তাহলে কি ছালাত হবে?
-আমীর হামজা
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

উত্তর : রাফউল ইয়াদায়েন ছালাতের একটি অতীব গুরুত্ব ও ফযীলতপূর্ণ সুন্নাত। কেননা ছালাতে রাফউল ইয়াদায়েনের জন্য ১০টি করে নেকী বেশি হয় (সিলসিলা ছহীহা, হা/৩২৮৬)। উক্ববা ইবনে আমের জুহানী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, যখন মুছল্লী রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় দুই হাত উত্তোলন করবে, তখন তার জন্য প্রত্যেক ইশারায় ১০টি করে নেকী হবে (বায়হাক্বী, মা‘রেফাতুস সুনান, হা/৮৩৯; আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন নবী, পৃ. ১২৯)। অন্যদিকে তাশাহহুদের বৈঠকে শাহাদাত আঙ্গুল নড়াচড়া করাও ছালাতের একটি সুন্নাত। এ কাজটি শয়তানের উপর খুব কঠিন হয় এবং সে মুছল্লীকে বিভ্রান্ত করার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যায়। নাফে‘ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন ছালাতে বসতেন তখন দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখতেন, তাঁর আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করতেন এবং তার উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেন। অতঃপর তিনি বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এই আঙ্গুলের ইশারা শয়তানের উপর লোহার চেয়েও কঠিন’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/৬০০০; মিশকাত, হা/৯১৭, সনদ হাসান)। উল্লেখ্য যে, তাশাহহুদের সম্পূর্ণ বৈঠকেই মুদৃভাবে আঙ্গুল নড়াতে হবে। কেবলমাত্র আশহাদু আল্লা-ইলা-হা’ বলার সময় একবার আঙ্গুল উঠানোর প্রমাণে কোনো হাদীছ পাওয়া যায় না (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮০; মিশকাত, হা/৯০৬-এর টীকা-১ দ্র.)। আরও উল্লেখ্য যে, আঙ্গুল না নেড়ে কেবল তুলে রাখার হাদীছটি যঈফ (মিশকাত, হা/৯১২-এর টীকা দ্র.; যঈফ আবূ দাঊদ, হা/৯৮৯)। সুতরাং ছালাতে রুকূতে যাওয়ার পূর্বে হাত উত্তোলন করা ও তাশাহহুদের বৈঠকে শাহাদাত আঙ্গুল নড়াচড়া করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ দুইটি সুন্নাত। এ সুন্নাতদ্বয়ের প্রতি আমলের জন্য যত্নবান হওয়া জরুরী। তবে কেউ তা পরিত্যাগ করার কারণে ছালাত বাতিল হবে না; বরং তার ছালাতের নেকী কম হবে (আবূ দাঊদ, হা/৭৯৬)।


প্রশ্ন (১১) : আছরের ছালাত জামাআতে দুরাকআত পেয়েছি। কিন্তু ভুলক্রমে ইমামের সাথে সালাম ফিরিয়ে নিলে বাকী ছালাত আদায় শেষে কি সাহু সিজদা দিতে হবে?

-হৃদয়
দিনাজপুর সদর।

উত্তর : হ্যাঁ, বাকী ছালাত আদায় শেষে সাহু সিজদা দিতে হবে। ইবনু সীরীন (রাহিমাহুল্লাহ) আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিয়ে অপরাহ্নের দুটি ছালাতের মধ্যে একটি ছালাত আদায় করলেন। ইবনু সীরীন বলেন, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সেই ছালাতের নাম বলেছিলেন কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তিনি আমাদের নিয়ে দুই রাকআত ছালাত আদায় করলেন, অতঃপর সালাম ফিরালেন। তারপর মসজিদের পরিত্যক্ত একটি কাঠের সাথে ঠেস দিয়ে রাগান্বিত অবস্থায় দাঁড়ালেন। তিনি তাঁর ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখলেন এবং আঙ্গুলসমূহকে পরস্পরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। তিনি মুখমণ্ডলের ডান দিকস্থকে বাম হাতের পিঠের উপর রাখলেন। তাড়াতাড়িকারীরা মসজিদের বিভিন্ন দরজা দিয়ে বের হয়ে পড়ল এবং তারা বলতে লাগল, ছালাত সংক্ষেপ করা হয়েছে। লোকদের মধ্যে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন কিন্তু তারা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করতে ভয় পাচ্ছিলেন। লোকদের মধ্যে লম্বা হাতবিশিষ্ট এক ব্যক্তি ছিল, যাকে বলা হত ‘যুল ইয়াদাইন’। সে বলল, হে আল্লাহ রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনি কি ভুলে গেছেন, না ছালাত সংক্ষেপ করা হয়েছে? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমি ভুলিনি এবং ছালাত সংক্ষেপও হয়নি। অতঃপর তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, যুল ইয়াদাইন যা বলছে তা কি ঠিক? তারা বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্মুখে গেলেন এবং ছুটে যাওয়া ছালাত পূর্ণ করলেন। অতঃপর সালাম ফিরালেন। অতঃপর তাকবীর দিলেন এবং পূর্বের সিজদার ন্যায় কিংবা তদপেক্ষাও দীর্ঘ সিজদা করলেন। অতঃপর মাথা উঠালেন এবং তাকবীর বললেন। অতঃপর তাকবীর দিলেন এবং পূর্বের সিজদার ন্যায় কিংবা তদপেক্ষাও দীর্ঘ সিজদা করলেন। অতঃপর মাথা উঠালেন এবং তাকবীর দিলেন। লোকসকল ইবনু সীরীনকে জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি সালাম ফিরালেন? উত্তরে ইবনু সীরীন বলেন, আমাকে অবহিত করা হয়েছে যে, ছাহাবী ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাম ফিরালেন (ছহীহ বুখারী, হা/৪৮২; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭৩; মিশকাত, হা/১০১৭)।



ইবাদতযাকাত

প্রশ্ন (১২) : আমার সাড়ে সাত ভরির চেয়ে কিছু কম স্বর্ণ আছে সেটাকে রুপার মূল্যে ট্রান্সফার করলে সাড়ে ৫২ তোলার চেয়েও বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে কি আমার যাকাত দিতে হবে?

-শহিদুল ইসলাম রাজিব
কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : স্বর্ণকে রৌপ্যের মূল্যে ট্রান্সফার করা যাবে না। কেননা স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাতের নিছাব ভিন্ন ভিন্ন। স্বর্ণের যাকাতের নিছাবের পরিমাণ ২০ দীনার তথা সাড়ে ৭ তোলা বা ৮৫ গ্রাম। আর রৌপ্যের যাকাতের পরিমাণ ২০০ দিরহাম তথা সাড়ে ৫২ তোলা বা ৫৯৫ গ্রাম, যা মালিকানায় পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হতে হবে। এর চেয়ে পরিমাণে কম হলে যাকাত আবশ্যক নয়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘২০ দীনারের কম স্বর্ণে কোনো যাকাত নেই। যদি কোনো ব্যক্তির নিকট স্বর্ণ এক বছর যাবৎ থাকে, তাহলে তাকে অর্ধ দীনার যাকাত দিতে হবে। এরপর যা বৃদ্ধি পাবে তার হিসাব ঐ অনুপাতে হবে’ (আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩ সনদ ছহীহ; বুলূগুল মারাম, হা/৬০৬)। যেহেতু স্বর্ণ নিছাব পরিমাণ হয়নি, সেহেতু উক্ত স্বর্ণের যাকাত দিতে হবে না।

প্রশ্ন (১৩) : বর্গা নেওয়া জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের কি উশর দিতে হবে?

-নাদিরুজ্জামান
কাহালু থানা বগুড়া।

উত্তর : জমি বর্গা নেওয়া হোক কিংবা নিজের হোক, তাতে উৎপাদিত ফসল নিছাব পরিমাণ হলেই তার ওশর বের করতে হবে। অর্থাৎ ফসল যদি আকাশের পানি, ঝরনার পানি কিংবা কূপের পানি দ্বারা উৎপাদিত হয়, তাহলে তা হতে ওশর বা এক-দশমাংশ যাকাত দিতে হবে। আর যদি সেচ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফসল উৎপাদিত হয় তাহলে ‘নিছফে ওশর’ বা বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৮৩; মিশকাত, হা/১৭৪৭; বুলূগুল মারাম, হা/৬১৫)। উল্লেখ্য, উৎপাদিত ফসল প্রায় ২০ মন হলে তার উপর যাকাত ফরয হয়। অর্থাৎ নিছাব পূর্ণ হয়।


প্রশ্ন (১৪) : ভাগা জমিতে উৎপাদিত ফসলের ওশর কে দিবে? জমির মালিক না-কি কৃষক যিনি ভাগা নিয়েছেন?

-হৃদয় সরকার
 দিনাজপুর সদর।

উত্তর : ভাগা কিংবা আধি পদ্ধতিতে জমি আবাদ করা হলে সেই জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের যাকাত তথা ওশর মালিক ও চাষী উভয়কেই দিতে হবে, যদি উভয়ের অংশ নিছাব পরিমাণ (১৮ মণ ৩০ কেজি) হয়। তবে যদি কারও অংশই নিছাব পরিমাণ না হয়, তাহলে কাউকেই যাকাত দিতে হবে না (আল-মুগনী, ৫/৩০৪)।



ইবাদতযিকির ও দু‘আ

প্রশ্ন (১৫) : ছাত্রীরা মাসিক অবস্থায় কুরআন, হাদীছ, তাফসীর তথা ইসলামী বই-পুস্তক পড়তে পারবে কি

-আক্বীমুল ইসলাম
 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ঋতুবতী অবস্থায় মহিলারা কুরআন মুখস্থ ও তেলাওয়াত করতে পারে এবং কুরআনের আয়াত ও অনুবাদ সম্বলিত অন্যান্য ইসলামী গ্রন্থ, হাদীছ ও তাফসীর গ্রন্থ, সাধারণ যিকির-আযকার ও দু‘আ-দরূদের বই-পুস্তকসমূহ স্পর্শ করতে ও পড়তে পারে। সাথে সাথে সকল প্রকার তাসবীহ, তাহলীল ও তাকবীর পাঠ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যামানায় ঋতুবতী মহিলাগণ ঈদের খুৎবা ও দু‘আয় শরীক হতেন। উম্মু আত্বিয়্যা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, দুই ঈদের দিনে ঋতুবতী ও পর্দানশিন মহিলাদেরকে ঈদের মাঠে বের করার জন্য আমাদের আদেশ করা হয়েছে। তবে ঋতুবতী মহিলারা মুছল্লা থেকে পৃথক থাকবে এবং মুসলিমদের জামাআতে ও দু‘আতে শরীক হবে (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯০; মিশকাত, হা/১৪৩১)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি ঋতুবতী হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বায়তুল্লাহ ত্বাওয়াফ ছাড়া হজ্জের বাকী সব অনুষ্ঠান পালন করার জন্য আমাকে নির্দেশ দিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৯৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১২১১; মিশকাত, হা/২৫৭২)। ইবরাহীম নাখঈ বলেন, ঋতুবতী মহিলার কুরআনের আয়াত পড়াতে কোনো দোষ নেই (ছহীহ বুখারী, পবিত্রতা অধ্যায়) ইবনু আব্বাস নাপাক ব্যক্তির জন্য কুরআন পড়াকে দোষের কিছু মনে করতেন না (ছহীহ বুখারী, পবিত্রতা অধ্যায়)। তাছাড়া অপবিত্র অবস্থায় যে কুরআন স্পর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা হলো মূল কুরআন (মুগনী শারহুল কাবীর, ২/৭৫)।


প্রশ্ন (১৬) : ছালাতের মধ্যে সিজদায় গিয়ে সিজদার দুআ পাঠের পর আল্লাহর কাছে বাংলায় কোনো কিছু চাওয়া যাবে কি?

-ফযলে মাহমূদ
 মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : ছালাতের মধ্যে সিজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে বাংলায় কোনো কিছু চাওয়া যাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘নিশ্চয়ই ছালাত মানুষের কথা-বার্তা বলার ক্ষেত্র নয়। এটা কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তেলাওয়াতের জন্যই নির্দিষ্ট’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৭, আবূ দাঊদ, হা/৭৯৫; নাসাঈ, হা/১২০৩)।


প্রশ্ন (১৭) : জনৈক আলেম বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূরা আছ-ছাফফাত এর ১৮০-১৮২ নং আয়াত পাঠের মাধ্যমে দুআ শেষ করতেন। কালেমা তাইয়্যেবা পাঠের মাধ্যমে দুআ শেষ করা বিদআত। কথাটির সত্যতা কতটুকু? প্রকতপক্ষে কি বলে দুআ শেষ করতে হবে?

-ড. মো. গোলাম মোর্তুজা
পদ্মা আবাসিক এলাকা, রাজশাহী।

উত্তর : দু‘আর মাঝে উক্ত কালেমা বা সূরার শেষাংশ পড়া যেতে পারে। তবে তা পাঠের মাধ্যমে দু‘আ শেষ করা যাবে না। বরং দু‘আ শুরু করবে হামদ ও দরূদ দ্বারা এবং শেষ করবে ‘আমীন’ দ্বারা (ফাতহুল বারী, ১১/২০০)। উল্লেখ্য যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বৈঠক শেষে সূরা আছ-ছাফফাত এর ১৮০-১৮২ নং আয়াত পাঠ করতেন’ মর্মে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তা যঈফ (সিলসিলা ছহীহা, ১১/২৩)।


প্রশ্ন (১৮) : মৃত্যুশয্যায় কোন কালেমা পড়লে ঈমানের সাথে মৃত্যু হয়?

-আনোয়ার হোসেন
 কাশিমপুর, গাজীপুর।

উত্তর : মৃত্যুশয্যায় কালেমা তাইয়্যেবা পড়লে ঈমানের সাথে মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মুয়ায ইবনু জাবাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যার শেষকথা হবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৩১১৬; মিশকাত, হা/১৬২১)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন,لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ইন্না লিল-মাউতে সাকারাতিন’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। সত্যিই মৃত্যুযন্ত্রণা কঠিন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৪৯; মিশকাত, হা/৫৯৫৯)। তাছাড়া বিশেষভাবে মৃত্যুযন্ত্রণায় নিপতিত ব্যক্তিকে কালেমার তালক্বীন দেওয়া তথা তার পাশে বসে কালেমা পড়তে থাকা জরুরী। ইয়াহইয়া ইবনু উমারাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলতে শুনেছি, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা মুমূর্ষু ব্যক্তিকে ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’র তালক্বীন দাও’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯১৬-১৭; মিশকাত, হা/১৬১৬)।


প্রশ্ন (১৯) : মৃত ব্যক্তির সন্তানেরা কি যে কোনো দিন তার জন্য হাত তুলে কবর যিয়ারত করতে পারে?

-রওশন আলী
 বাঘা, রাজশাহী।

উত্তর : কোনো দিন নির্ধারণ করে দলবদ্ধভাবে কবরের কাছে গিয়ে সবাই মিলে হাত তুলে দু‘আ করার যে প্রথা সমাজে চালু আছে, তার শারঈ কোনো ভিত্তি নেই। তাই কোনো দিন নির্ধারণ না করে যে কোনো দিনে, যে কোনো সময়ে সন্তানেরা একাকী মৃত ব্যক্তির জন্য ক্বিবলামুখী হয়ে দুই হাত তুলে দু‘আ করতে পারে (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৫৫, ১/৩১৩; মিশকাত, হা/১৭৬৭)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে রাত্রিতে তার নিকট রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর থাকার পালা আসত, সে রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শেষ রাতে ‘বাক্বী’-এর দিকে বের হতেন এবং বলতেন,

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِيْنَ وَأَتَاكُمْ مَا تُوْعَدُوْنَ غَدًا مُؤَجَّلُوْنَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَاحِقُوْنَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَهْلِ بَقِيْعِ الْغَرْقَدِ

অর্থ : ‘হে মুমিন দলের বাসস্থানের অধিবাসীগণ! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদেরকে ক্বিয়ামতের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কি তোমরা পেয়ে গেছ? অবশ্যই আল্লাহ যদি চায় আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব। হে আল্লাহ! আপনি বাক্বী গারক্বাদের অধিবাসীদের ক্ষমা করো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৪; মিশকাত, হা/১৭৬৬)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, জনৈকা ইয়াহূদী মহিলা আমার দরজায় এসে খেতে চাইল ও বলল, আমাকে খেতে দিন, আল্লাহ আপনাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা ও কবরের আযাবের ফিতনা হতে পরিত্রাণ দিবেন। তখন আমি তাকে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত ধরে রাখলাম। অতঃপর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন আসলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! এই ইয়াহূদী মহিলা কী বলে? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, সে কী বলছে? আমি বললাম, সে বলছে আল্লাহ আপনাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা ও কবরের আযাবের ফিতনা হতে রক্ষা করুন। তখন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়ালেন এবং পূর্ণ হাত তুলে দু‘আ করলেন। এ সময় তিনি দাজ্জালের ফিতনা ও কবরের আযাবের ফিতনা হতে পরিত্রাণ চাচ্ছিলেন (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৮৩১, ২৮৯৭০, সনদ ছহীহ)।      


প্রশ্ন (২০) : মসজিদ বা মাহফিলের সভাপতি বা প্রধান অতিথি করার শর্ত সাপেক্ষে সেখানে দান করলে উক্ত দান কবুল হবে কি?

-আতাউর রাহমান
বুড়াইল, ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

উত্তর : ইবাদত কবুলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হলো, ইখলাছ ফীল ইবাদাত তথা যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগী একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই নিবিষ্ট হওয়া এবং সেক্ষেত্রে কোনো প্রকার লৌকিকতা ও সুনাম অর্জনের মনোভাব না থাকা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ব্যতীত (সত্য) কোনো মা‘বূদ নেই; সুতরাং তোমরা তাঁকেই ডাকো, তাঁর ইবাদতে একনিষ্ঠ হয়ে’ (মুমিন (গাফির), ৪০/৬৫)। আবূ উমামা বাহিলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বলল, ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনি কী বলেন, যে ব্যক্তি সম্পদ এবং সুনামের জন্য জিহাদ করে, তার জন্য কী রয়েছে? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। তিনি তা তিনবার বললেন। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। তারপর তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য খালেছভাবে কৃত আমলর যার মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি কামনা করা হয়, এমন আমল ব্যতীত কিছুই কবুল করেন না’ (নাসাঈ, হ/৩১৩৩; সিলসিলা ছহীহা, হা/৫২)। অতএব, মসজিদ বা মাহফিলের সভাপতি বা প্রধান অতিথি করার শর্তে সেখানে দান করলে উক্ত দান কবুল হবে না।


প্রশ্ন (২১) : সূরা মূলক পাঠ করলে কবরের আযাব হবে নামর্মে কোনো বর্ণনা আছে কি?

-সোহাগ
সাভার, ঢাকা।

উত্তর : ‘সূরা মূলক পাঠ করলে পাঠকারীর কবরের শাস্তি মাফ হয়’ মর্মে বর্ণিত হাদীছ সঠিক। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে ‘তাবারাকাল্লাযী বিইয়াদিহিল মুলক’ পাঠ করে আল্লাহ তার কবরের আযাব মাফ করে দেন (ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১৫৮৯, সনদ ছহীহ)। অপর বর্ণনায় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘সূরা মুলক কবরের শাস্তি দূর করে’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৩৮৩৯)। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কুরআনে ৩০ আয়াতের একটি সূরা আছে, যা এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেছিল ফলে তাকে মাফ করা হয়েছে। সে সূরাটি হচ্ছে ‘তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক’ তথা সূরা মূলক (আহমাদ, হা/৭৯৬২; তিরমিযী, হা/২৮৯১; আবূ দাঊদ, হা/১৪০০; ইবনু মাজাহ, হা/৩৭৮৬; মিশকাত, হা/২১৫৩, সনদ হাসান)। তবে এ মর্মে তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (তিরমিযী, হা/২৮৯০ যঈফ জামে‘, হা/৬১০১)। কেননা উক্ত হাদীছের সনদে ইয়াহইয়া ইবনু আমর ইবনু মালেক আন-নাকরী একজন যঈফ রাবী (শারহুস সুন্নাহ, ৪/৪৭৩-এর তাহক্বীক্ব দ্রষ্টব্য)। অবশ্য উক্ত হাদীছের هِىَ الْمَانِعَةُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ ‘উহা কবরের শাস্তি প্রতিরোধকারী’ অংশটুকু ছহীহ (সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১১৪০, ৩/১৩১)।



ইবাদতমসজিদ—মুছাল্লা

প্রশ্ন (২২) : মসজিদে আগরবাতি জ্বালানো যাবে কি?

-রাফিউল ইসলাম
নিতপুর, নওগাঁ।

উত্তর : মসজিদকে সুগন্ধিময় করার উদ্দেশ্যে সেখানে আগোরবাতি জ্বালানো যাবে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ নির্মাণ করতে এবং মসজিদকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে ও তাতে সুগন্ধি লাগাতে নির্দেশ দিয়েছেন (আবূ দাঊদ, হা/৪৫৫; তিরমিযী, হা/৫৯৪; ইবনু মাজাহ, হা/৭৫৮; মিশকাত, হা/৭১৭)।



হালাল—হারাম

প্রশ্ন (২৩) : অভিভাবক যদি সন্তানকে হারাম উপার্জন দিয়ে লালন-পালন করে তাহলে সন্তানের করণীয় কী?

-মুজাহিদ হুসাইন জাকারিয়া
  ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

উত্তর : যদি সন্তানদের সামর্থ্য থাকে তাহলে পিতার হারাম উপার্জন ভোগ করা হতে বিরত থাকবে। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র তিনি পবিত্র ছাড়া গ্রহণ করেন না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)। আর সামর্থ্য না থাকলে পিতাকে হারাম পথ ছেড়ে সৎ পথে উপার্জন করতে নছীহত করবে ও সেপথে পিতাকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে। তবে সন্তানরা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হলে এবং উপার্জনক্ষম না হলে তা ভোগ করতে পারে। কেননা তারা শরীআতের মুকাল্লাফ নয়। তাদের প্রতিপালনের দায়িত্ব পিতা-মাতার। সুতরাং এজন্য সন্তান দায়ী হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কেউ অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না’ (আন-নাজম, ৫৩/৩৮)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘কোনো প্রাণ অপরের অপরাধের কারণে দণ্ডিত হবে না’ (নাসাঈ, হা/৪৮৪৯, ৪৮৫০, ৪৮৫১; ইরওয়াউল গালীল, হা/২৩০৩)।


প্রশ্ন (২৪) : আমাদের মুদির দোকানে টিভি চালু রাখার পাশাপাশি গুল, তামাক, জর্দা, বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি বিক্রয় করা হয়। গালিগালাজের কারণে বাধ্য হয়ে আমাকেও সেখানে বসতে হয়। এমতাবস্থায় আমার ইবাদত কবুল হবে কি?

-আলীম হক্ব
পাহাড়ভাঙ্গা, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দ্দা ইত্যাদি যেহেতু মাদকের অন্তর্ভুক্ত ও হারাম বস্তু (আবূ দাঊদ, হা/৩৬৮১; তিরমিযী, হা/১৮৬৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৩৯৩; মিশকাত, হা/৩৬৪৫)। সেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান পিতার এ জাতীয় দ্রব্য-সামগ্রীর ব্যবসায়ে সহযোগিতা করলে ও জেনেশুনে উক্ত হারাম উপার্জন থেকে ভক্ষণ করলে গোনাহগার হবে এবং তারও ইবাদত কবুল হবে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি পবিত্র ছাড়া গ্রহণ করেন না (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)। উল্লেখ্য যে, এমন পাপ কাজ হতে বিরত থাকার কারণে পিতা-মাতা গালিগালাজ করলেও তাদের কাজে সহযোগিতা করা যাবে না। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, لاَ طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِىْ مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ ‘সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টিজীবের কোনো আনুগত্য নেই’ (শারহুস সুন্নাহ, হা/২৪৫৫; মিশকাত, হা/৩৬৯৬)। তবে অন্যান্য বৈধ আদেশ মান্য করা ও তাদের সাথে সদাচরণ করা জরুরী (লুক্বমান, ৩১/১৫)। [বি. দ্র. : নামটি আলীম হক্ব না হয়ে আব্দুল আলীম হওয়া ভালো]।



হালাল—হারামখাদ্য-পানীয়

প্রশ্ন (২৫) : ভ্যানিলা এসেন্স যুক্ত খাবার কি হালাল?

-সামি উজ্জামান
কান্দিভিটা নাটোর।

উত্তর : হ্যাঁ! ভ্যানিলা এসেন্স যুক্ত খাবার খাওয়া হালাল। কেননা, বর্তমান বাজারে যে ভ্যানিলা পাওয়া যায়, তা মূলত ভ্যানিলা নামক গাছ হতে তৈরি আর ভ্যানিলা কোনো নেশা জাতীয় গাছ নয় এবং তা হারামও নয়। আর পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হারাম বস্তু ব্যতীত সকল রুচিশীল খাদ্য হালাল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা জিজ্ঞেস করে যে, কী কী তাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে? বলে দিন, তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে (আল-মায়েদা, ৫/৪)। তবে ভ্যানিলা এসেন্স তৈরির সময় তাতে অতি সামান্য পরিমাণ এ্যালকহোল ব্যবহার করা হয় যা ব্যবহারে কোনো ধরনের নেশা বা মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে না এবং তা বেশি পরিমাণ খেলেও তার কোনো বিরুপ প্রতিক্রিয়া হয় না। তাই তা খাবারের সাথে যুক্ত করাতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা মদ বলা হয় যা খাওয়ার পর মস্তিষ্ককে বিকৃত করে দেয়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, প্রত্যেক মস্তিষ্ক বিকৃতকারী দ্রব্যই হারাম (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৪৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৭)। যেহেতু ভ্যানিলা মস্তিষ্কের কোনো প্রকার বিকৃতি ঘটায় না। তাই তা খাবারে ব্যবহার করাতে কোনো সমস্যা নেই (ফতওয়া শাবাকাতুল ইসলাম, ৮/৪১৮৯)। তবে অবশ্যই ভ্যানিলা ক্রয়ের সময় কোম্পানির নাম ও পণ্যের শরীরে লিখিত সকল উপাদানের নাম পড়ে নিতে হবে।


প্রশ্ন (২৬) : যারা বাম হাতে কাজ করতে অভ্যস্ত তারা যদি বাম হাতেই খানাপিনা করে তাহলে কি পাপ হবে?

-আব্দুল্লাহ
শেরপুর, বগুড়া।

উত্তর : যারা বাম হাতে কাজ করতে অভ্যস্ত কিন্তু ডান হাতে খেতে সক্ষম, তাদেরকে ডান হাতেই খেতে হবে। কেননা ডান হাতে খাওয়া সুন্নাত এবং বাম হাতে পানাহার করা হারাম। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘তোমরা বাম হাতে পনাহার করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে পানাহার করে’ (তিরমিযী, হা/১৭৯৯; ইবনে হিব্বান, হা/৫৩৩১)। আমর ইবনু আবূ সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তত্ত্বাবধানাধীন ছোট বালক ছিলাম। সে সময় আমার হাত (খাদ্য) পাত্রের এদিক-সেদিক যেত। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘হে বৎস! তুমি খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলো। ডান হাত দিয়ে খাও ও নিকট থেকে খাও; মাঝখান থেকে নয়। এরপর থেকে তাঁর শিখানো পদ্ধতিই আমার খাবার পদ্ধতি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৭৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৮৮; মিশকাত হা/৪১৫৯)। সালামাহ ইবনু আকওয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত যে, এক লোক রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট বাম হাতে খাদ্য গ্রহণ করছিল। তিনি বললেন, তুমি তোমার ডান হাতে খাও। সে বলল, আমি পারব না। তিনি বললেন, তুমি যেন না-ই পার। শুধুমাত্র অহমিকাই তাকে বারণ করছে। সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, সে আর কখনো তার ডান হাত মুখের নিকট উঠাতে পারেনি (ছহীহ মুসলিম, হা/২০২১)। তবে যদি কারও ডান হাত জন্মগত, অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে অকেজো বা বিকলাঙ্গ হয়ে যায়, তাহলে সে কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে বাম হাতে খেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দাকে তার সাধ্যের বাইরে বিধান চাপিয়ে দেন না’ (আল-বাক্বারা, ২/২৮৬)।



মৃত্যু—কবর—জানাযা

প্রশ্ন (২৭) : জানাযার ছালাতে পায়ের সাথে পা মিলাতে হবে কি?

-শাহিনুর রহমান,
টাংগাইল সদর। 

উত্তর : জানাযার ছালাতে পায়ের সাথে পা মিল করেই দাঁড়াতে হবে। কারণ এটাও ছালাত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাজ্জাশীর জানাযায় সারিবদ্ধ হন এবং চার তাকবীরে জানাযা পড়ান (ছহীহ বুখারী, হা/১২৪৫; মিশকাত, হা/১৬৫২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১৫৬৩)। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা জনৈক ব্যক্তির জানাযায় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম (ছহীহ বুখারী, হা/১৩২১; মিশকাত, হা/১৬৫৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১৫৬৯)।


প্রশ্ন (২৮) : কবরকে সামনে রেখে গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম
 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ‘গায়েব’ শব্দের অর্থ অনুপস্থিত। লাশের অনুপস্থিতিতে যে জানাযা পড়া হয় তাকে ‘গায়েবানা জানাযা’ বলে। সুতরাং কবরকে সামনে রেখে জানাযা পড়া আর গায়েবানা জানাযা পড়া এক নয়। দাফন হয়ে যাওয়ার পর কবরের পাশে জানাযার ছালাত আদায় করা যায়। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, একজন মহিলা মসজিদ ঝাড়ু দিত। সে রাত্রিবেলা মারা গেলে ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কষ্ট হবে ভেবে তাকে না জানিয়ে নিজেরাই জানাযা ও দাফনের কাজ সেরে ফেলেন। সকাল হলে তার সম্পর্কে জানতে চাইলে ছাহাবীগণ বললেন, সে মারা গেছে। তখন তিনি বললেন, ‘আমাকে জানাওনি কেন? আমাকে তার কবরের কাছে নিয়ে চলো। অতঃপর তার কবরের কাছে এসে কবরের উপর জানাযার ছালাত আদায় করলেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৫৬)।


প্রশ্ন (২৯) : একজন বড় আলেম ও সাধারণ ব্যক্তির জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নেকীর কোনো তারতম্য আছে কি?

-আনোয়ার হোসেন
 কাশিমপুর, গাজীপুর।

উত্তর : না, একজন বড় আলেম ও সাধারণ ব্যক্তির জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নেকীর কোনো তারতম্য নেই। কেননা মৃত ব্যক্তির জানাযায় শরীক হলেই এক ক্বীরাত বা উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ এবং ছালাত ও দাফন উভয় কার্য সম্পাদনকারী দুই ক্বীরাত বা দুই উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ নেকী পেয়ে থাকেন। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ছওয়াবের আশায় কোনো মুসলিমের জানাযায় অংশগ্রহণ করে এবং ছালাত ও দাফনকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে, সে দুই ক্বীরাত নেকী নিয়ে ফিরে আসে। আর প্রত্যেক ক্বীরাত নেকীর পরিমাণ উহুদ পাহাড়ের সমান। আর যে ব্যক্তি শুধু ছালাত পড়ে ফিরে আসে, সে এক ক্বীরাত নেকী নিয়ে ফিরে আসে (ছহীহ বুখারী, হা/৪৭; মিশকাত, হা/১৬৫১)। অন্য বর্ণনায় আছে, দুই ক্বীরাত হলো দুটি বড় পাহাড় সমপরিমাণ নেকী (ছহীহ বুখারী, হা/১৩২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৪৫)।


প্রশ্ন (৩০) : ইসরাফীল (আলাইহিস সালাম)-এর বাঁশির ফুৎকারে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এমন কোনো তথ্য আছে কি যে, সবার শেষে কে মারা যাবে, কীভাবে মারা যাবে এবং পুনরুত্থানের সময় সর্বপ্রথম কাকে জীবিত করা হবে

-মনিরুল ইসলাম
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : ইসরাফীল (আলাইহিস সালাম)-এর বাঁশির ফুৎকারে সবকিছু ধ্বংস হবে এবং সকল প্রাণী মারা যাবে এ কথাই ঠিক। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, ফলে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলে মূর্ছিত হয়ে পড়বে; তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করবেন তারা নয়। অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তৎক্ষণাত তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে’ (আয-যুমার, ৩৯/৬৮)। এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় ইসরাফীল (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম ফুৎকারে সকল প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু র্সবশেষ কে মারা যাবে এবং কীভাবে মারা যাবে? এমন কোনো বর্ণনা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে পাওয়া যায় না। আর সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –কে কবর থেকে জীবিত করা হবে (মুসলিম, হা/২২৭৮)।


প্রশ্ন (৩১) : বলা হয়ে থাকে যে, প্রতি হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামে যাবে। প্রশ্ন হলো, তারা মুসলিম-অমুসলিম সকলের মধ্য থেকে গণ্য হবে? না-কি শুধু মুসলিমদের মধ্য থেকে?

-রনি খান
রূপসা, খুলনা।

উত্তর : হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামী, এটা মুসলিম অমুসলিম সবার মধ্য থেকে গণনা হবে। তবে তার মধ্যে উম্মাতে মুহাম্মাদীর সংখ্যা হবে মাত্র একজন। এই একজনের মধ্যে পাপী মুমিনরাও অন্তর্ভুক্ত। পাপী মুমিনরা শাস্তি ভোগ করার পর জান্নাতে যাবে। জাহান্নামীদের সংখ্যার বিষয়ে বর্ণিত মৌলিক হাদীছ দু্ইটি। এক. আবু হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত একটি হাদীছে প্রতি এক শত জনে ৯৯ জনকে জাহান্নাম থেকে বের করার কথা বলা হয়েছে (বুখারী, হা/৬৫২৯)। যা হিসাব করলে হাজারে ৯৯০ জন দাঁড়ায়। ২. আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীছে প্রতি হাজারে ৯৯৯ জনের কথা বলা হয়েছে (বুখারী হা/৩৩৪৮)। সংখ্যার বৈপরীত্য দূরীকরণার্থে মুহাদ্দিছগণ বলেছেন, ইয়াজুজ মাজুজ ও সকল কাফের মুশরিকসহ হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামী। আর ইয়াজুজ-মাজুজ ব্যতীত অন্যান্য কাফের-মুশরিকের তুলনায় হাজারে ৯৯০ জন জাহান্নামী (ফায়যুল বারী, ৫/৩৩১)।



ব্যবসা-বাণিজ্য

প্রশ্ন (৩২) : একই পণ্য নগদে কম ও বাকীতে বা কিস্তিতে বেশি মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে কি?

-শহীদুল্লাহ বিন রহমাতুল্লাহ
কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : উক্ত পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এটি বৈধ হওয়ার পক্ষে দলীল পাওয়া যায়। তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করার আদেশ করেছিলেন। ফলে তিনি বাকীতে দু’টি উটের বিনিময়ে একটি উট ক্রয় করেছিলেন’ (শারহুস সুন্নাহ, ৮/৭৪; হা/২০৬৫)। তাছাড়া বাকীতেও ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ইয়াহূদীর কাছ থেকে বাকীতে খাদ্য কিনেছিলেন এবং একটি লৌহবর্ম বন্ধক হিসাবে তার কাছে রেখেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২০৬৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬০৩)।


প্রশ্ন (৩৩) : বিকাশ, রকেট বা মোবাইল ব্যাংকিং-এর এইচ. আর কিংবা এজেন্ট হিসাবে কাজ করা যাবে কি?

-রোকনুজ্জামান
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর : বিকাশ, রকেট বা মোবাইল ব্যাংকিংসহ সকল ক্ষেত্রে সে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা যাবে কি না? তা নির্ভর করে ঐ প্রতিষ্ঠানের লেনদেন ও ব্যবসা পদ্ধতির উপর। যদি সে প্রতিষ্ঠান শরীআতের অর্থনীতিমালা সম্পূর্ণ মেনে লেনদেন বা ব্যবসা পরিচালনা করে তাহলে, সে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা যাবে। আর যদি সে প্রতিষ্ঠান সে সব নীতিমালা মেনে লেনদেন বা ব্যবসা না করে (যেমন : হারাম পণ্যের ব্যবসা, সূদী লেনদেন, অতিরিক্ত ট্যাক্স, প্রতারণা ইত্যাদি) তাহলে এমন প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রকারের চাকরি, লেনদেন করা যাবে না। সুতরাং চাকরি নেওয়ার আগে সে প্রতিষ্ঠানের সংবিধান জেনে ও বুঝে চাকরিতে যোগ দিতে হবে| রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূদের সাথে জড়িত সকলকে অভিশপ্ত হিসাবে উল্লেখ করেছেন (মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৭২৫; জামেউল হাদীছ, হা/১৮৩৮৩)। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসমানের দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইয়াহূদীদের ধ্বংস করুন। তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয়েছে, অথচ তারা তা বিক্রয় করে এবং তার মূল্য ভক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বস্তুকে হারাম ঘোষণা করেন, তখন তার মূল্যকেও হারাম করে দেন’ (ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৪৯৩৮)।


প্রশ্ন (৩৪) : হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কারও জন্য সুপারিশ করল এবং তার জন্য কিছু হাদিয়া প্রদান করল; সে যদি তা গ্রহণ করে তাহলে সে সূদের দরজাসমূহের মধ্যে একটি বড় দরজায় প্রবেশ করল’। প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে হাদিয়া প্রদানকারীর কি কোনো পাপ হবে

-মীযানুর রহমান
গোমস্তাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : প্রশ্নোল্লেখিত হাদীছটি ছহীহ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৪১, সনদ হাসান; মিশকাত, হা/৩৭৫৭; ছহীহুল জামে‘, হা/৬৩১৬)। সুতরাং এক্ষেত্রে প্রদানকারীরও পাপ হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূদদাতা, গ্রহীতা, সূদের লেখক ও সাক্ষী সকলের উপর লা‘নত করেছেন এবং বলেছেন (পাপের ক্ষেত্রে) এরা সবাই সমান (ছহীহ মুসলিম, হা/৪১৭৭; মিশকাত, হা/২৪০৭)।

 



ইতিহাস—যুদ্ধ—জিহাদ

প্রশ্ন (৩৫) : আলী ও আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর মাঝে সংঘটিত যুদ্ধের কারণ কী? বিস্তারিত জানাবেন।  

-খলীলুর রহমান
 শ্যামনগর, সাতক্ষীরা।

উত্তর : আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণ ছিল তাদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি। উল্লেখ্য যে, ছাহাবীগণের মধ্যকার উক্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কে আমাদের চুপ থাকতে হবে। তারা একে অপরকে কাফের মনে করে লড়াইয়ে লিপ্ত হননি। কারণ তাদের অনেকেই ‘আশারায়ে মুবাশশারা’ এবং বদরী ছাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কাজেই তাদের ব্যাপারে কুচিন্তা করা যাবে না। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তাআলা বদরী ছাহাবীদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন, তোমরা যা ইচ্ছা তাই করো। তোমাদের জন্য জান্নাত অবধারিত (ছহীহ বুখারী, হা/৩৯৮৩)।



পারিবারিক বিধানবিবাহতালাক

প্রশ্ন (৩৬) : আমাদের সমাজে বিবাহের নিয়মগুলো প্রায় হিন্দুদের বিবাহের পদ্ধতির সাথে মিলে যায়। তাই দয়া করে বিবাহের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানিয়ে বাধিত করবেন।

-ফায়সাল
 সাপাহার, নওগাঁ।

উত্তর : বিবাহ পড়ানোর নিয়ম হলো, প্রথমে খুৎবা দেওয়া। অতঃপর কিছু কথার মাধ্যমে বিবাহ বাস্তবায়ন করা। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুৎবার মধ্যে সূরা আলে ইমরানের ১০২ নং আয়াত, নিসার ১ নং আয়াত ও আহযাবের ৭০-৭১ নং আয়াত পাঠ করতেন। অতঃপর বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলতেন (ইবনু মাজাহ, হা/১৮৯২; আবূ দাঊদ, হা/২১১৮; নাসাঈ, হা/১৪০৪; দারেমী, হা/২২০২; মিশকাত, হা/৩১৪৯)। কাজেই খুৎবা পড়ার পর মেয়ের পিতা বা অভিভাবক বা তাদের উপস্থিতিতে অন্য কেউ বরের সামনে দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বলবেন, আমার মেয়ে ওমুক এতো নগদ ও এতো বাকী মোহরের বিনিময়ে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে রাযী তুমি তাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করো। তখন সে মেয়ের ওলী ও দুজন সাক্ষীকে শুনিয়ে বলবে, ‘ক্বাবিলতু’ (আমি গ্রহণ করলাম)। এরূপ তিনবার হওয়া ভালো। কারণ রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনবার বলতেন (ছহীহ বুখারী, মিশকাত, হা/৩০৮)। অতঃপর ওলীসহ অন্যরা তাদের মঙ্গলের জন্য নিম্নের দু‘আ পাঠ করবে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোনো ব্যক্তির বিবাহ সম্পাদনকালে বলতেন,

بَارَكَ اللهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكُمَا وَجَمَعَ بَيَنَكُمَا فِىْ خَيْرٍ،

উচ্চারণ : বা-রাকাল্লুহ লাকা ওয়া বা-রাকা আলাইকুমা ওয়া জামাআ বায়নাকুমা ফী খয়রিন। অর্থ : ‘আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন ও তোমাদের উভয়কে বরকত দান করুন। তিনি তোমাদের উভয়ের মাঝে দাম্পত্য মিলন কল্যাণমণ্ডিত করুন’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৯৫৭; তিরমিযী, হা/১০৯১; আবূ দাঊদ, হা/২১৩০; ইবনু মাজাহ, হা/১৯০৫; মিশকাত হা/২৪৪৫)।

উল্লেখ্য যে, বিবাহের খুৎবা দাঁড়িয়ে দেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া কনের কাছে গিয়ে বিবাহ পড়ানো বা তার জবানবন্দী গ্রহণেরও কোনো প্রমাণ নেই। সমাজে প্রচলিত এ সকল প্রথা মানব রচিত। যার কোনো শারঈ ভিত্তি নেই। বিয়ের খুৎবা নিম্নরূপ :

 إِنَّ الْحَمْدَ لِلهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِيْنُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّآتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلاَ مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلاَ هَادِىَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ- يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلاَ تَمُوْتُنَّ إِلاَّ وَأَنْتُمْ مُسْلِمُوْنَ. يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِىْ خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيْراً وَنِسَاءً وَاتَّقُوْا اللهَ الَّذِىْ تَسَاءَلُوْنَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيْباً. يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ وَقُوْلُوْا قَوْلاً سَدِيْدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَمَنْ يُطِعْ اللهَ وَرَسُوْلَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيْمًا.

(ইবনু মাজাহ, হা/১৮৯২; আবূ দাঊদ, হা/২১১৮; নাসাঈ, হা/১৪০৪; দারেমী, হা/২২০২; মিশকাত, হা/৩১৪৯; আলে ইমরান, ৩/১০২; আন-নিসা, ৪/১; আল-আহযাব, ৩৩/৭০-৭১)। উল্লেখ্য যে, বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো (১) মেয়ের ওলী বা অভিভাবকের অনুমতি (আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; মিশকাত, হা/৩১৩০)। (২) কন্যার সম্মতি বা অনুমতি (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১৯; মিশকাত, হা/৩১২৬) (৩) স্বামীর গ্রহণ এবং (৪) দু’জন সাক্ষী।


প্রশ্ন (৩৭) : শুধু অলংকার দিয়ে মোহর আদায় করা যাবে কি?

-ইসমাইল বিন রুহুল আমিন
কুমিল্লা সদর।

উত্তর : হ্যাঁ, শুধু অলংকার দিয়ে মোহর আদায় করা যাবে। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জনৈকা আনছারী মহিলাকে খেজুরের আঁটি সমপরিমাণ স্বর্ণ মোহর দিয়ে বিয়ে করেছেন। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হে আব্দুর রহমান তোমার কী হয়েছে? তিনি উত্তরে বলনেন, আমি জনৈকা আনছারী মহিলাকে বিয়ে করেছি। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কত মোহর দিয়েছে? তিনি বললেন, খেজুরের আঁটি সমপরিমাণ স্বর্ণ দিয়েছি। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, একটি বকরী দিয়ে হলেও ওয়ালিমার ব্যবস্থা করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৭২)।


প্রশ্ন (৩৮) : মেয়ের পরিবারের সদস্যরা যদি মেয়েকে দিয়ে জোরপূর্বক ডিভোর্স দেয়ায় তাহলে কি তা কার্যকর হবে?

-বৃষ্টি
ফুলবাড়ী, ময়মনসিংহ।

উত্তর : মেয়ের পরিবারের সদস্যরা যদি মেয়েকে জোরপূর্বক তালাক দানে বাধ্য করে এবং মেয়ে সে তালাক মেনে না নেয়, তাহলে এমন তালাক, তালাক হিসাবে গণ্য হবে না। আবূ যার আল-গিফারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমার উম্মাতের ভুল, বিস্মৃতি ও বলপূর্বক যা করিয়ে নেওয়া হয়, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০৪৫; মিশকাত, হা/৬২৮৪)।


প্রশ্ন (৩৯) : স্ত্রী নিজ খেয়াল-খুশীমতো চলে, স্বামী বাধা দিলেও মানে না। এমতাবস্থায় স্বামী কি তাকে তালাক দিতে পারে?

শিহাবুদ্দীন
মহারাজপুর, নাটোর।

উত্তর : এমতাবস্থায় তাকে বারবার উপদেশ দিতে হবে। তার শয্যা পৃথক করে দিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষামূলক কিছু শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা পৃথক করো এবং প্রহার করো। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়, তবে তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করো না’ (নিসা, ৪/৩৪)। এই আয়াত প্রমাণ করে, যদি স্ত্রী তাতে সংশোধন না হয় তাহলে শরীআতসম্মত পদ্ধতিতে তাকে তালাক দিতে হবে।


প্রশ্ন (৪০) : হিল্লা বিবাহ কি শরীআত সম্মত?

-আক্বীমুল ইসলাম
 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ‘হিল্লা বিবাহ’ শরীআতে সম্পূর্ণরূপে হারাম। উক্ববা ইবনু আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের ভাড়াটিয়া পাঁঠা সম্পর্কে বলব না? তারা বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তিনি বললেন, সে হলো হিল্লাকারী। আর হিল্লাকারী ও যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয়কেই আল্লাহ লা‘নত করেছেন’ (ইবনু মাজাহ, হা/১৯৩৬; বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/১৪১৮৭)। 


প্রশ্ন (৪১) : বিয়ের দুই দিন পর মেলামেশার পূর্বেই স্ত্রী খোলা করলে তাকে কতদিন ইদ্দত পালন করতে হবে?

-লুৎফর রহমান
শান্তাহার, বগুড়া।

উত্তর : বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যদি নির্জনবাস হয়ে থাকে (শারীরিক সম্পর্ক হোক বা না হোক), তাহলে তা শারীরিক মিলন বলে গণ্য হবে এবং এক্ষেত্রে এক হায়েয ইদ্দত পালন করতে হবে। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সূত্রে বর্ণিত। ছাবিত ইবনু ক্বায়স (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী তার কাছ থেকে খোলা তালাক নিলেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ইদ্দাতকাল নির্ধারণ করলেন এক হায়েয (আবূ দাঊদ, হা/২২২৯)। সাথে সাথে স্বামী থেকে প্রাপ্ত সকল মোহর তাকে ফেরত দিবে। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, ছাবিত ইবনু ক্বায়স (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! ছাবিত ইবনে ক্বায়স (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যবহার ও দ্বীনদারী সম্পর্কে আমার কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু ইসলামের ছায়ায় থেকে আমার দ্বারা স্বামীর অবাধ্যতা পছন্দ করি না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘তবে কি তুমি তার বাগান তাকে ফেরত দিবে? সে বলল, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)বললেন, ‘তুমি তোমার বাগান গ্রহণ করো এবং তাকে এক তালাক দিয়ে দাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭৩; মিশকাত, হা/৩২৭৪)।


প্রশ্ন (৪২) : কোনো এক মহিলার সাথে জনৈক ব্যক্তির শারীরিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মহিলাটির অন্যত্র বিবাহ হয়ে যায়। অনেক বছর পরে ঐ মহিলা ও তার স্বামী উভয়েই দু’টি কন্যা সন্তান রেখে মারা যায়। পরবর্তীতে কন্যা দু’টির অসহায়ত্বের কথা ভেবে ঐ ব্যক্তি তাদের একজনকে বিবাহ করে ঘর-সংসার করছে। উক্ত বিবাহ কি জায়েয হবে?

-কাওসার তানজীর

উত্তর : হ্যাঁ, উক্ত বিবাহ জায়েয হবে। কেননা কন্যাটি তার জন্য মাহরাম বা বিবাহ হারাম এমন মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা যে সকল মহিলাকে বিবাহ করা হারাম তাদের বর্ণনা আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে দিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর বর্ণনার শেষান্তে বলেছেন, ‘উল্লেখিত নারীগণ ব্যতীত বাকী সকল নারীকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে’ (আন-নিসা, ৪/২৩)। সুতরাং এমন মেয়েকে বিবাহ করাতে শারঈ কোনো বাধা নেই।



পারিবারিক বিধানমীরাছ বণ্টন

প্রশ্ন (৪৩) : প্রায় ২৮ বছর পূর্বে সম্পাদিত এক বণ্টননামার ভিত্তিতে চার শরীক স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সম্পত্তি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২৩ বছর পরে ঘটনাক্রমে জমির মান বিবেচনার মূল্যায়নে দেখা যায় যে, তুলনামূলকভাবে দুই শরীক ৩ থেকে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা বেশি পেয়েছে। এমতাবস্থায় কম পাওয়া অপর দুই শরীক বর্তমানে সমপরিমাণ টাকা দাবি করছে। শারঈ দৃষ্টিতে তাদের এ দাবি কি সঠিক? উল্লেখ্য যে, বেশি পাওয়া দুই শরীক তাদের জমি প্রায় সবটাই বিক্রি করে দিয়েছে। সামান্য যা আছে, তা থেকে দিতে অস্বীকার করছে। এতে কি তাদের কোনো গুনাহ হবে?

-ইয়াকুব আলী
৭১/৩, উপশহর, রাজশাহী।

উত্তর : সময়ের ব্যবধানে জায়গা-জমির দাম কম-বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বণ্টনের সময় ইনছাফের সাথে ন্যায্য বণ্টন হওয়ার পর কারণ বিশেষে জায়গার দাম কম-বেশি হলে পুনরায় অর্থ দাবি করা জায়েয নয় এবং দ্বিতীয় পক্ষ তাদের সেই দাবি না মানলে গুনাহগারও হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে একবার দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে গেলে ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমাদের জন্য পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিন। তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহই পণ্যদ্রব্যের মূল্য নির্ধারক, হ্রাসকারী, বৃদ্ধিকারী ও রিযিকদাতা। আর আমি এমন অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই, যেন কেউ রক্ত কিংবা সম্পদের ক্ষেত্রে যুলুমের কারণে আমাকে তলব না করে’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৪৫১; মিশকাত, হা/২৮৯৪)।

প্রশ্ন (৪৪) : আমার দাদা মারা যাওয়ার আগেই আমার ফুফু তার একমাত্র কন্যাকে রেখে মারা যান। এরপর আমার দাদা ও তারপর আমার বাবা মারা যান। বর্তমানে আমার ঐ ফুফাতো বোন আমার কাছে দাবি করছে যে, সে জমি পাবে। অথচ দাদা তার জন্য কিছু অছিয়ত করে গেছে কি-না সেটাও বাবা আমাকে কিছু বলে যাননি। সুতরাং সে কি তার দাবি অনুযায়ী জমি পাবে?

রানু মিয়া
পীরগাছা, রংপুর।

উত্তর : কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ‘জীবিত’ উত্তরাধিকারীরাই তার সম্পদের ওয়ারিছ হবে। পিতার আগে তার সন্তান মারা গেলে নাতী-পুতিরা সেই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয় না। সেই হিসাবে দাদার পূর্বে ফুফু মারা যাওয়ায় তার মেয়ে মীরাছ বঞ্চিত হবে। তবে দাদা চাইলে তার নাতনীর জন্য কিছু অংশের ব্যাপারে অছিয়ত করে যেতে পারতেন (আল-বাক্বারা, ২/১৮০)। বিবরণ অনুযায়ী যেহেতু তিনি কোনো অছিয়ত করে যাননি, তাই ফুফুর মেয়ে কোনো সম্পদ পাবে না। তবে প্রশ্নকারী আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে ইচ্ছা হলে তাকে কিছু সম্পদ দিতে পারে।



অন্যান্য

প্রশ্ন (৪৫) : উম্মু দারদা ছাহাবী ছিলেন, না-কি তাবেঈ ছিলেন? বিস্তারিত জানাবেন।

-রোকনুযযামান
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর : আবূ দারদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর দুজন স্ত্রী ছিল। প্রথমজনকে বলা হতো বড় উম্মুদ দারদা এবং দ্বিতীয়জনকে বলা হতো ছোট উম্মুদ দারদা। বড় উম্মুদ দারদার আসল নাম ছিল খায়রা বিনতে আবী হাদরাদ আল-আসলামী, যিনি ছিলেন একজন মহিলা ছাহাবী। আর ছোট উম্মুদ দারদার আসল নাম ছিল হুজাইমা বিনতে হুইয়াই আল-আওছাবিয়্যাহ, যিনি ছিলেন একজন তাবেঈ এবং একাধিক হাদীছ বর্ণনাকারিণী (সিয়ার আ‘লামিন নুবালা, ৪/২৭৮)।


প্রশ্ন (৪৬) : বর্তমানে তাবলীগ জামাআতের কর্মীরা যেভাবে দাওয়াত দিচ্ছে তা-কি রাসূলের তরীকা অনুযায়ী হচ্ছে?

-আবূ সাঈদ
পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা।

উত্তর : তাবলীগ অর্থ পৌঁছানো, প্রচার-প্রসার করা। শরীআতের পরিভাষায় তাবলীগ বলা হয়, মানুষকে সঠিক ঈমান ও ইসলামের প্রতি আহ্বান করা। তাবলীগ করা ফরয। তাবলীগ করা সকল নবী-রাসূলগণের উপর ফরয ছিল (আন-নাহল, ১৬/৩৬)। কিন্তু মনে রাখতে হবে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের জন্য একমাত্র আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ’ (আল-আহযাব, ৩৩/২১)। সুতরাং আমাদের প্রতিটি কাজে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা একান্ত কর্তব্য। ঠিক দাওয়াতের ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা জরুরী। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত তাবলীগ জামাআতের র্কমপদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ছাহাবীগণের তাবলীগের সাথে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক। তেমনি আক্বীদাগতভাবেও তা সাংঘর্ষিক। তাদের ফাযায়েলে আমল, ফাযায়েলে সাদাকাতসহ সকল বইয়ে ছহীহ আক্বীদা ও ছহীহ হাদীছ বিরোধী নানা বক্তব্য রয়েছে, যা মানুষের ঈমানকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। তাদের মধ্যে অনেক ভ্রান্ত আক্বীদা রয়েছে, যা কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তাদের বইগুলো বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী দ্বারা পরিপূর্ণ। সুতরাং এমন মিথ্যা ও আক্বীদা বিনষ্টকারী তাবলীগ জামাআত কখনো রাসূলের মূল ধারার তাবলীগ হতে পারে না। সুতরাং এমন তাবলীগ ইসলাম সমর্থিত নয়। বরং মিথ্যা দ্বীন ও আক্বীদা প্রচার-প্রসার করার কারণে জাহান্নামে যেতে হবে। এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সতর্কবাণী উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমার পক্ষ হতে একটি বাণী জানা থাকলেও তা পৌঁছে দাও। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা করো, এতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১; মিশকাত, হা/১৯৮)।


প্রশ্ন (৪৭) : মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর সন্তুষ্ট কি-না তা বুঝার উপায় সম্পর্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে জনৈক বক্তা বলেন, যদি দেখ যে, দুনিয়ার শাসকরা তোমার উপর যুলুম করছে না তাহলে বুঝবে মহান আল্লাহ তোমার উপর সন্তুষ্ট। পক্ষান্তরে যদি দেখ যে, তারা যুলুম করছে তাহলে বুঝবে তিনি তোমার উপর অসন্তুষ্টএ মর্মে কোনো ছহীহ বর্ণনা আছে কি?

-যাকওয়ান
আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : না, এ মর্মে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করে থাকেন। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধন ও প্রাণ এবং ফল-শস্যের অভাবের কিছু দ্বারা পরীক্ষা করব। সুতরাং আপনি ঐসব ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন’ (আল-বাক্বারা, ২/১৫৫)।


প্রশ্ন (৪৮) : কেউ যদি অন্য কোনো ব্যবসায়ীর উপকারার্থে যিম্মাদারী নিয়ে কোনো মার্কেট থেকে বাকীতে মালামাল ক্রয় করে দেয় এবং উক্ত ব্যবসায়ী যদি তা সুদীর্ঘ ১০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও পরিশোধ না করেন, তাহলে কি যিম্মাদারী ব্যক্তিকে উক্ত বকেয়া পরিশোধ করতে হবে?

-হোসাইন মোঃ রাসেল
চাঁদপুর সদর।

উত্তর : ঋণ গ্রহীতার উচিত সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা। কেননা জরুরী কোনো কারণ ছাড়া ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা হারাম। এতে দুনিয়া ও আখেরাতে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা যুলুম’ (ছহীহ বুখারী, হা/২২৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৫৪)। প্রশ্নোল্লেখিত বিষয়টি  ঋণ গ্রহণের সময় কৃত চুক্তি অনুযায়ী সমাধান হবে। ‘গ্রহীতার অপারগতার ক্ষেত্রে যিম্মাদার ব্যক্তি উক্ত ঋণ পরিশোধ করবেন’ মর্মে কোন চুক্তি হয়ে থাকলে যিম্মাদার ব্যক্তিকে তা পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় পরিশোধ করা জরুরী নয়। তবে ঋণগ্রহীতা অসচ্ছল হলে যিম্মাদার ব্যক্তি উক্ত ঋণ পরিশোধ করতে পারে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জনৈক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাযা পড়াতে না চাইলে আবূ ক্বাতাদাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জানাযার ছালাত আদায় করুন, আমি তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিলাম। তখন তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জানাযার ছালাত আদায় করিয়ে দিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২২৮৯; আহমাদ, হা/১৬৫১০)।


প্রশ্ন (৪৯) : লায়লাতুল ক্বদরের রাতে মানুষের বার্ষিক রিযিক, হায়াত, মাউত ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয়। কথাটির সত্যতা জানতে চাই।

-মাযহারুল ইসলাম
সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

উত্তর : লায়লাতুল ক্বদরের রাতে মানুষের আগামী এক বছরের রিযিক, হায়াত, মউত, সুখ, দুঃখ ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয় কথাটি পবিত্র কুরআন দ্বারা সাব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, সে রাতে প্রত্যেক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থিরকৃত হয়। আমাদের আদেশক্রমে, নিশ্চয়ই আমরা রাসূল প্রেরণকারী (আদ-দুখান, ৫৯/৪-৫)।


প্রশ্ন (৫০) : জনৈক লেখক মে‘রাজ সম্পর্কিত তার বইয়ে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মে‘রাজে গমন করলে আল্লাহ তাআলা তাকে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত এবং ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি প্রদান করেন। তিনি দফাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন। লেখকের উক্ত দাবি কি সত্য?

-ড. মো. গোলাম মোর্তুজা
পদ্মা আবাসিক এলাকা, রাজশাহী।

উত্তর : পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত মে‘রাজ রজনীতে ফরয হয়, এ কথা ঠিক (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৪২৯)। তবে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এই রজনীতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি প্রদান করেন, এ কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।