সওয়াল-জওয়াব



কুরআন

প্রশ্ন () : পুরাতন, জীর্ণশীর্ণ, পড়ার অনুপযোগী কুরআন কী করতে হবে?

-জুয়েল বিন মনিরুল ইসলাম
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : কুরআন মাজীদের কপি পুরাতন হয়ে গেলে মেরামত করে পড়ার উপযোগী করা সম্ভব হলে সেটাই করা ভালো। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান করে, তা মূলত তার অন্তরের তাক্বওয়ার পরিচায়ক’ (আল-হাজ্জ, ২২/৩২)। আর যদি মেরামত করে পাঠ উপযোগী করা সম্ভব না হয়, তাহলে রাস্তাঘাট কিংবা ডাস্টবিনে না ফেলে পুড়িয়ে দিয়ে বিনষ্ট করতে হবে। উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার শাসনামলে কুরআন একত্রিত করার পর ভিন্ন ক্বিরাআতের কপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৮৭; মিশকাত, হা/২২২১)।


প্রশ্ন (২) : কুরআন মুখস্থ করার পর ভুলে গেলে পাপ হবে কি?

-মাহফুজ বিন জহুরুল ইসলাম
সাঘাটা, গাইবান্ধা।

উত্তর : কুরআন মুখস্থ করার পর চর্চা না করে ভুলে যাওয়া আদৌ ঠিক নয়। তবে পাপ হবে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কারও এরূপ বলা কী জঘন্য কথা! যে বলে, আমি কুরআনের অমুক অমুক আয়াত ভুলে গেছি বরং সে যেন বলে, তাকে ভুলানো হয়েছে। সুতরাং তোমরা পুনঃপুনঃ কুরআন স্মরণ করবে। কেননা এটা মানুষের অন্তর হতে চতুষ্পদ জন্তু অপেক্ষাও অধিক পলায়নপর (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৯০; মিশকাত, হা/২১৮৮)। তাই কুরআনের হিফয ধরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। উল্লেখ্য যে, কুরআন মুখস্থ করার পর ভুলে যাওয়া সবচেয়ে বড় পাপ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬১; মিশকাত, হা/৭২০)।



হাদীছ

প্রশ্ন (৩) : যারা ছহীহ হাদীছকে দুর্বল বা জাল হিসাবে প্রচার করে তাদের শাস্তি কী?

-চঞ্চল চৌধুরী
নারায়ণগঞ্জ সদর।

উত্তর : ছহীহ হাদীছকে দুর্বল বা জাল হিসাবে প্রচার করার অর্থই হলো, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি মিথ্যারোপ করা। সুতরাং যারা এমন প্রচারের কাজে নিমজ্জিত তাদের স্থান জাহান্নাম। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয় (ছহীহ মুসলিম, হা/৩)। তবে যদি তদন্ত করার সময় বুঝের কম-বেশির কারণে এমনটি হয়ে যায় তাহলে সে গুনাহগার হবে না।


প্রশ্ন (৪) : ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদীছের কোনো রাবীকে কাযযাব বা মিথ্যুক বললে তার শাস্তি কী?

-চঞ্চল চৌধুরী
নারায়ণগঞ্জ সদর

উত্তর : ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদীছের কোনো রাবীকে কাযযাব বা মিথ্যুক বললে মূলত তা সংশ্লিষ্ট হাদীছের রাবীসহ ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন সম্মানিত মুহাদ্দিছকে অপমান করা হবে। কেননা তিনি প্রত্যেকটি হাদীছের সনদ, মতন, রাবী ইত্যাদির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে আল্লাহর তরফ থেকে নিশ্চয়তা লাভ করার পরে সেটাকে তার কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। এ মর্মে তিনি বলেন, আমি আমার এই কিতাব মসজিদুল হারামে বসে সংকলন করেছি এবং আমি সেখানে কোনো হাদীছ প্রবেশ করাইনি যতক্ষণ না আমি ইস্তিখারার দু’রাকআত নফল ছালাত আদায় করেছি এবং হাদীছটি বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা লাভ করেছি (ফাতহুল বারীর ‘ভূমিকা’ খণ্ড, কায়রো : দারুর রাইয়ান ২য় সংস্করণ ১৪০৭/১৯৮৭, পৃ. ৫১৩-১৪)। তবে প্রথম যুগের বেশ কিছু মুহাদ্দিছ ছহীহ বুখারীর কতিপয় হাদীছ সম্পর্কে সমালোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে সর্বাধিক ইমাম দারাকুত্বনী (৩০৬-৩৮৫ হি.) ছহীহ বুখারীর ৭৮টি এবং বুখারী ও মুসলিমের মিলিতভাবে ৩২টি হাদীছের উপর সমালোচনা করেছেন। এসব সমালোচনার উত্তরে বিভিন্ন গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়েছে। ছহীহ বুখারীর ভাষ্যকারগণের প্রত্যেকেই সংক্ষেপে বা বিস্তারিতভাবে এসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। তবে সর্বশেষ ভাষ্যকার হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হি.) ফাতহুল বারীর ভূমিকা ‘হাদীয়ুস সারী’-তে এসব সমালোচনার একটি একটি করে বিস্তারিতভাবে জবাব দিয়েছেন (হাদীয়ুস সারী মুক্বাদ্দামা ফাতহুল বারী, ৮ম অনুচ্ছেদ, পৃ. ৩৬৪-৪০২)।

আলোচনার শেষে উপসংহারে তিনি বলেন, সমালোচিত প্রত্যেকটি হাদীছই দোষযুক্ত নয়। বরং অধিকাংশের জওয়াব পরিষ্কার ও দোষমুক্ত। কোনো কোনোটির জওয়াব গ্রহণযোগ্য এবং খুবই সামান্য কিছু রয়েছে, যা না বুঝে তাঁর উপর চাপানো হয়েছে। আমি প্রত্যেকটি হাদীছের শেষে এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেশ করেছি’ (মুক্বাদ্দামা, পৃ. ৪০২)।

তিরমিযীর ভাষ্যকার শায়খ আহমাদ মুহাম্মাদ শাকের বলেন, ‘ছহীহ বুখারীর যেসব হাদীছ সমালোচিত হয়েছে তার অর্থ হলো সেগুলো ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর শর্তানুযায়ী বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেনি। তবে হাদীছটি স্বীয় অবস্থানে ছহীহ। তিনি বলেন, মুহাক্কিক্ব ওলামায়ে হাদীছ-এর নিকটে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের প্রতিটি হাদীছই ছহীহ। এ দু’টি গ্রন্থের কোনো একটি হাদীছ দুর্বলতা বা ত্রুটিযুক্ত নয়। ইমাম দারাকুত্বনীসহ মুহাদ্দিছগণের কেউ কেউ যে সমালোচনা করেছেন তার অর্থ হলো তাঁদের নিকট সমালোচিত হাদীছসমূহ ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারেনি। তবে সাধারণভাবে হাদীছগুলোর বিশুদ্ধতা নিয়ে কেউই মতভেদ করেননি (আল-বা‘এছুল হাছীছ, তাহক্বীক্ব : আহমাদ মুহাম্মাদ শাকের, পৃ. ৩৩-৩৪)।

শায়খ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)ও উছূলে হাদীছের আলোকে ছহীহ বুখারীর ১৫টি হাদীছের সমালোচনা করেছেন তাঁর ‘সিলসিলা যঈফা’ গ্রন্থে। উক্ত সমালোচনা হাদীছবিরোধী বা হাদীছে সন্দেহবাদীদের মতো নয়, বরং একজন সূক্ষ্মদর্শী মুহাদ্দিছ বিদ্বান হিসাবে। যেমন ইতোপূর্বে অনেক মুহাদ্দিছ করেছেন। যদি এতে তিনি ভুল করে থাকেন তাহলেও নেকী পাবেন। আর ঠিক করে থাকলে দ্বিগুণ নেকী পাবেন। তবে তিনি যেসব হাদীছকে যঈফ বলেছেন, সে ব্যাপারে ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কেননা দুর্বল রাবীদের বর্ণনা গ্রহণ করার ব্যাপারে তাঁর কতগুলো স্পষ্ট নীতি ছিল। যেমন : (১) দুর্বল রাবীদের সকল বর্ণনাই দুর্বল নয়। (২) উক্ত বিষয়ে অন্য কোনো হাদীছ না পাওয়া এবং হাদীছটি বিধানগত ও আক্বীদা বিষয়ক না হওয়া। বরং হৃদয় গলানো ও ফযীলত বিষয়ে হওয়া। (৩) সনদে বা মতনের কোনো ত্রুটি দূর করার জন্য বা কোনো বক্তব্যের অধিক ব্যাখ্যা দানের জন্য কিংবা শ্রুত বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য সহযোগী হিসাবে (من المتابعات) কোনো হাদীছ আনা’ (ড. মুহাম্মাদ হামদী আবু আবদাহ, জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয়ে শরীআ অনুষদ কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলনে পেশকৃত গবেষণাপত্র, পৃ. ৩৪)।

আলবানী ও দারাকুত্বনী (রাহিমাহুল্লাহ) বুখারী গ্রন্থের যে সকল হাদীছের উপর মন্তব্য করেছেন তা ঠিক নয় জানতে দেখুন- (মিন্নাতুল বারী, আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক, পৃ. ১৮২-২৩১) অতএব, ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদীছের কোনো রাবীকে কাযযাব বা মিথ্যুক বলা মূলত তার প্রতি মিথ্যারোপ করা, যা যুলুমের অন্তর্ভুক্ত মহাপাপ এবং তা স্পষ্ট হারাম। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের (দ্বীনী) ভাই। মুসলিম ব্যক্তি অপর মুসলিমের উপর অবিচার করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং অবজ্ঞা করবে না। আল্লাহভীতি এখানে! এ কথা বলে তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের বক্ষের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করে বললেন, ‘একজন মানুষের জন্য এতটুকু অন্যায়ই যথেষ্ট যে, সে নিজের মুসলিম ভাইকে হেয় জ্ঞান করবে। মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান হারাম (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৪; ছহীহ আত-তারগীব, হা/২৯৫৮; মিশকাত, হা/৪৯৫৯)।



ঈমান-আক্বীদা

প্রশ্ন (৫) : আমার পরে যদি কেউ নবী হতো, তাহলে সে হতো উমার’-এ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ

-রোকনুযযামান
 শিবগঞ্জ, বগুড়া

উত্তর : হ্যাঁ, হাদীছটি ছহীহ। এ মর্মে উক্ববা ইবনু আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমার পরে কেউ নবী হলে অবশ্যই উমার ইবনুল খাত্ত্বাবই নবী হতো’ (তিরমিযী, হা/৩৬৮৬)।


প্রশ্ন (৬) : বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠানে নেতা-নেত্রীর ছবি টাঙানোসহ সরাকরি বিভিন্ন দিবস, অনুষ্ঠান ও নিয়ম-কানুন মানতে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বাধ্য করা হচ্ছে? এমতাবস্থায় সেখানে চাকরি করা বা ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানো যাবে কি?

-ফরীদুল ইসলাম
মিরপুর, ঢাকা।

উত্তর : বিষয়টি অতীব স্পর্শকাতর। কুরআন ও হাদীছে বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং মানুষের জন্য জরুরী কর্তব্য হলো, সে তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী এই সকল বিষয় হতে বাঁচার চেষ্টা করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো’ (আত-তাগাবুন, ৬৪/১৬)।


প্রশ্ন (৭) : মাযহাব অর্থ কী? মাযহাব মানা কি ফরয? কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জানতে চাই?

-এবিএম ফাহিম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ‘মাযহাব’ আরবী শব্দ। এর অর্থ চলার পথ। শরীআতে ‘মাযহাব’ একটিই। সেটা হলো আল্লাহ ও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পথ, পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের পথ (আল-আনআম ৬/১৫৩; আহমাদ, নাসাঈ, মিশকাত, হা/১৬৬ ও ১৬৫, ‘কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ)। এছাড়া দ্বিতীয় কোনো মাযহাব নেই। যে সমস্ত মাযহাব মুসলিম সমাজে প্রচলিত আছে তার সবই স্বর্ণযুগের বহু পরে সৃষ্ট। যেমন- শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা’র মধ্যে লিখেছেন, ৪র্থ শতাব্দী হিজরীর পূর্বে কোনো মুসলমান নির্দিষ্টভাবে কোনো একজন বিদ্বানের মাযহাবের তাক্বলীদের উপরে সংঘবদ্ধ ছিল না (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা, ১/১৫২-৫৩, ‘চতুর্থ শতাব্দী ও তার পরের লোকদের অবস্থা বর্ণনা’ অনুচ্ছেদ)। সুতরাং সমাজে প্রচলিত এসব মাযহাব মানা ফরয নয়। এমনকি মাযহাব না মানলে কেউ কাফেরও হবে না, বরং এ সমস্ত মাযহাব মানলেই মানুষের মাঝে সংকীর্ণতার সৃষ্টি হয়। মুসলিম মাত্রই স্বাধীনভাবে কেবল পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপর আমল করবে। এছাড়া কোনো মাযহাব বা তন্ত্রের অনুসরণ করতে পারে না। যেমন ৪র্থ শতাব্দী হিজরীর পূর্বের কোনো মানুষ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন না।


প্রশ্ন (৮) : আমার এলাকায় পীরের প্রাদুর্ভাব এত বেশি যে, দুই ঈদ ও জুমআর দিন তাদের সম্পর্কে প্রশংসামূলক বাক্য বলে খুৎবা শুরু করতে হয়। তারা পীরের পায়ে সিজদা করে এবং মসজিদ বাদ দিয়ে পীরের আস্তানায় আযান দিয়ে ৫ ওয়াক্ত ছালাত পড়ে। এদের পিছনে কি ছালাত হবে?

-আব্দুর রউফ মন্ডল
কালাই, জয়পুরহাট।

উত্তর : এ জাতীয় কর্মকাণ্ডে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা শিরকে নিমজ্জিত। কেননা সাধারণভাবে কোনো ব্যক্তির গুণ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার এতখানি প্রশংসাও করা যায় না যাতে তার ব্যক্তিত্বকেই অসাধারণভাবে বড় করে তোলা হয় এবং সে আল্লাহর সমকক্ষতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মূলত এইরূপ প্রশংসাই মানুষকে তাদের পূজার কঠিন পাপে নিমজ্জিত করে। সে জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিকে বলেছেন, ‘যখন অধিক প্রশংসাকারীদেরকে দেখবে, তখন তাদের মুখের উপর ধূলি নিক্ষেপ করো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০২)। দ্বিতীয়ত, সিজদা হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য (আন-নাজম, ৫৩/৬২)। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা বৈধ নয়। বরং তা স্পষ্ট শিরক। কারণ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো লোকের প্রতি সিজদা করার কোনো সুযোগ নেই (তিরমিযী, হা/১১৫৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৫৩)। তাই যারা শিরকের মতো এমন জঘন্য পাপে লিপ্ত তাদের পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে না। কারণ এ ধরনের শিরকের সাথে জড়িত থাকলে ঈমান, আমল ও ইসলাম কিছুই অবশিষ্ট থাকে না (আল-মায়েদা, ৫/৭২)।


প্রশ্ন (৯) : একজন ইমাম যদি আল্লাহর কাছে দু‘আ করে বলে যে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অসীলায় আমাদের ছালাত কবুল করে নিনতাহলে কি তা জায়েয হবে?

-মোহাম্মদ সায়েম
গাইবান্ধা সদর।

উত্তর : না, এভাবে দু‘আ করা জায়েয হবে না। কেনন আল্লাহর নিকট দু‘আ করার জন্য কোনো অসীলা বা মাধ্যেমে প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ‘আর যখন আমার বান্দাগণ আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন তাদেরকে বলে দাও যখনই কোনো আহ্বানকারী আহ্বান করে, তখনই আমি তার আহ্বানে সাড়া দেই’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৬)। আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে এক সফরে ছিলাম। অতঃপর উপরে উঠার সময় লোকজন উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর দিতে শুরু করলে তিনি বলেন, তোমরা চুপে চুপে তাকবীর দাও। কেননা তোমরা বধির কিংবা অনুপস্থিত সত্তার নিকট প্রার্থনা করছ না। বরং তোমরা প্রার্থনা করছ অধিক শ্রবণকারীর নিকট যিনি তোমাদের সাথেই আছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭০৪)। অতএব দু‘আ করতে হবে কেবল মহান আল্লাহর নিকট, অন্য কারও নিকট নয় (তিরমিযী, হা/২৫১৬; মিশকাত, হা/৫০০২ সনদ ছহীহ)।


প্রশ্ন (১০) : বিনোদনের উদ্দেশ্যে জাদু শেখা বা প্রদর্শন করা যাবে কি?

বাকী বিল্লাহ খান পলাশ
হাবেলী গোপালপুর, ফরিদপুর।

উত্তর : না, বিনোদনের উদ্দেশ্যে জাদু শেখা যাবে না। কেননা জাদু চর্চা করা কুফরী এবং তা শয়তানের আমল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুলায়মান কুফরী করেনি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত’ (আল-বাক্বারা, ২/১০২)।

আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে বেঁচে থাকো, তাহলো আল্লাহর সাথে শরীক করা ও জাদু করা’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৬৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯; মিশকাত, হা/৫২)। তবে জাদুকৃত ব্যক্তি হতে জাদুর প্রভাব দূর করার নিয়্যতে প্রতিরোধক জাদু বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করো, তবে ঠিক ততখানি প্রতিশোধ গ্রহণ করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে; তবে তোমরা ধৈর্যধারণ করলে ধৈর্যশীলদের জন্য ওটাও তো উত্তম’ (আন-নাহল, ১৬/১২৬; ছহীহ বুখারী, ‘জাদুর চিকিৎসা করা যাবে কি-না?’ অধ্যায়, সিলসিলা ছহীহা, হা/২৭৬০)।


প্রশ্ন (১১) : জুমআর খুৎবা দেওয়ার আগে খত্বীবের ছবি মসজিদের গেটে লাগানো যাবে কি?

-সৈয়দ আকরাম হোসেন
বাড়ি নাম্বার ৩৩, রোড নাম্বার ১, ব্লক এ, বনশ্রী রামপুরা ঢাকা।

উত্তর : না, মসজিদের গেটে হোক বা অন্য যেকোনো স্থানে হোক কোথাও কোনো প্রকারের ছবি লাগানো যাবে না। কারণ যে ঘরে ছবি কিংবা কুকুর থাকে সে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৪৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৬৩৬)। মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-র গদিতে প্রাণীর ছবি থাকায় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে প্রবেশ না করে দরজায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, ঘরে প্রবেশ করেনি। আর বলেছেন, ছবি অঙ্কনকারীদের কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২১০৫-৫১৮১, ৫৯৬১; ছহীহ মুসলিম, হা/২১০৭; আহমাদ, হা/২৬৯০)।


প্রশ্ন (১২) : কথা শেষে ভালো থাকেনবলা শিরক হবে কি?

-শোয়াইব
কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : কথা শেষে বা বিদায়ের সময় ‘ভালো থাকেন’ বাক্যটি বিনিময়ের মাধ্যমে শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা মানুষ নিজে নিজেই ভালো বা মন্দ থাকতে পারে না। বরং ভালো-মন্দের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ। উত্তম হবে সালাম দিয়ে বিদায় নেওয়া। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোনো মজলিসে যাবে তখন সালাম দিবে। যখন সেখান উঠে আসতে চাইবে তখনও সালাম দিবে। এর প্রথমবারের সালাম দ্বিতীয়বারের সালামের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকারযোগ্য নয়’ (আবূ দাঊদ, হা/৫২০৮; মিশকাত, হা/৪৬৬০)। তবে এভাবে বলা যায় যে, ‘আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন’।


প্রশ্ন (১৩) : মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত অন্যান্য নবী-রাসূলগণের নাম শুনে বলতে হয় ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম’। কিন্তু তাঁর নাম শুনলে বলতে হয় ‘ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’। এর কোনো কারণ আছে কি?

-শোয়াইব
কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : না, এর বিশেষ কোনো কারণ পাওয়া যায় না। তবে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠের বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী নবীগণের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়নি। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার উপর দশবার রহমত নাযিল করবেন। তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে আর আল্লাহর নৈকট্যের জন্য দশটি মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হবে (নাসাঈ, হা/১২৯৭; মিশকাত, হা/৯২২)। উল্লেখ্য যে, অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে শুধু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলতে হয় একথা ঠিক। তবে তাদের কারো কারো ক্ষেত্রে ‘ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ও ব্যবহার হয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৭৮)।


প্রশ্ন (১৪) : ছাহাবী ও নবী-রাসূলগণের নামের পূর্বে হযরতলেখা যাবে কি? কখন থেকে এর ব্যবহার চালু হয়?

-শোয়াইব
কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : কখন থেকে এর ব্যবহার শুরু হয় তা জানা যায় না। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নবী-রাসূলসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামের শুরুতে ‘হযরত’ লেখার যে প্রচলন রয়েছে, তা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত নয়। অনুরূপভাবে কুরআন ও হাদীছে যে সমস্ত নামে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করা হয়েছে, ‘হযরত’ শব্দটিও তার অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এতে ছাহাবীগণ যে শব্দের মাধ্যমে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করেছেন তা পরিহার করা হয়েছে। এছাড়া শব্দটিতে যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে এবং অর্থের সাথেও অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। কেননা ‘হযরত’ শব্দটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ‘হাযির/নাযির’ হওয়ার আক্বীদা থেকে উদ্ভূত। এক্ষেত্রে অনেকের আক্বীদা হলো, আমাদের নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাযির-নাযির বা মীলাদ মাহফিলে উপস্থিত হতে পারেন- আর এমন আক্বীদা থেকেই রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে সরাসরি ‘হযরত’ ব্যবহার করে থাকে। তাই এ শব্দগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে এবং তা থেকে বিরত থাকতে হবে।


পবিত্রতা

প্রশ্ন (১৫) : ওযূর পরে লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে ওযূ ভঙ্গ হবে কি?

-যুবায়ের
চিলাহাটি, ডোমার, নীলফামারী।

উত্তর : স্বাভাবিক অবস্থায় লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে ওযূ ভাঙবে না (ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/১১২৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৪১৭)। তবে উত্তেজনার সাথে স্পর্শ করলে সর্বাবস্থায় ওযূ ভেঙে যাবে (আবূ দাঊদ, হা/১৮২; তিরমিযী, হা/৮২)।


প্রশ্ন (১৬) : বিড়াল খাবারে মুখ দিলে সে খাবার খাওয়া যাবে কি?

-সাফি ইসলাম
সোনাতলা, বগুড়া।

উত্তর : হ্যাঁ, যাবে। কেননা বিড়ালের উচ্ছিষ্ট অপবিত্র নয়; বরং তা পবিত্র। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, বিড়াল নাপাক নয়। এটা তোমাদের আশেপাশে ঘনঘন বিচরণকারী বা বিচরণকারিণী (আবূ দাঊদ, হা/৭৫, সনদ হাসান ছহীহ; ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৭; নাসাঈ, হা/২৬৮; আহমাদ, হা/২৩১৯১; মিশকাত, হা/৪৮২)। তবে তার মুখে অপবিত্র লেগে থাকলে তা না খাওয়া উত্তম।


ইবাদতমসজিদ-মুছাল্লা

প্রশ্ন (১৭) : মাঠের একপাশে মসজিদ এবং অপর পাশে মাদরাসা। জুমআর দিনে কি মহিলারা ঐ মাদরাসায় অবস্থান করে মসজিদের জুমআর অনুসরণ করে ছালাত আদায় করতে পারে?

-আবূ আব্দুল্লাহ
 ফুলপুর, ময়মনসিংহ।

উত্তর : হ্যাঁ, পারে। কেননা কেউ যদি মসজিদের বাইরে কোনো ঘরে বা হুজরায় ইমামের ইক্বতিদা করে ছালাত আদায় করে, তাহলে তার ছালাত আদায় হয়ে যাবে। এ মর্মে ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘ইমাম বা মুক্তাদির মাঝে দেওয়াল বা সুতরা থাকলে’ শিরোনামে অধ্যায় রচনা করে বলেন, হাসান বছরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, তোমার এবং ইমামের মধ্যে একটি নদী থাকলেও ইমামের ইক্বতিদা করাতে কোনো সমস্যা নাই। আবূ মিরজাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, যদি ইমামের তাকবীর শোনা যায়, তাহলে ইমাম ও মুক্তাদির মধ্যে রাস্তা বা দেওয়াল থাকলেও ইক্বতিদা করা যায়। তারপর ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছ উল্লেখ করে বলেন, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তাতে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর নিজ কামরায় রাতের ছালাত আদায় করেছেন। আর ছাহাবীগণ দেয়ালের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর ইক্বতিদা করে তার সঙ্গে ছালাত আদায় করেছেন। (ছহীহ বুখারী, হা/৭২৯)।


প্রশ্ন (১৮) : কাউকে মসজিদ কমিটির সদস্য করার জন্য কী কী যোগ্যতা লাগবে?

-জামিল
কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : মসজিদ আবাদকারীদের গুণাবলি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, পরকালকে বিশ্বাস করে, ছালাত আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না- তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে’ (আত-তওবা, ৯/১৮)। অতএব মসজিদ কমিটির সদস্যদের উপরিউক্ত পাঁচটি গুণ থাকা আবশ্যক। এছাড়া কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত অন্যান্য গুণাবলি থাকা আবশ্যক। যেমন শিরক ও বিদআতের অনুসারী না হওয়া এবং আমানতদার হওয়া।


প্রশ্ন (১৯) : কী কী কারণে মসজিদ স্থানান্তর করা যায়?

-এবি এম ফাহিম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

উত্তর : মসজিদ স্থানান্তর করার কারণগুলোর মধ্যে- ১. মসজিদে মুছল্লীদের জায়গা সংকুলান না হলে ২. পার্শ্বে মসজিদ সম্প্রসারণের সুযোগ না থাকলে ৩. মসজিদে যাওয়ার মতো উপযুক্ত রাস্তা না থাকলে ৪. দাতার পক্ষ হতে মসজিদ ওয়াক্বফ করার বিষয়টি স্পষ্ট না হলে ৫. মসজিদ বা মসজিদের আসবাবপত্র নিরাপদে না থাকলে ৬. কোনো এলাকার সকল মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেলে। সাথে সাথে মসজিদের আসবাবপত্র বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ নতুন মসজিদে ব্যয় করাও শরীআতসম্মত। মসজিদের মুতাওয়াল্লী বা কমিটি উক্ত মসজিদের স্থান বিক্রয় করে তার অর্থ দিয়ে অন্য স্থানে জমি ক্রয় করে অথবা কেউ দান করলে সেখানে নতুন মসজিদ নির্মাণ করতে পারেন। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে কূফার শাসক ছিলেন ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)। একদা মসজিদ হতে বায়তুল মালের অর্থ চুরি হলে সে ঘটনা উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জানানো হয়, তখন তিনি মসজিদ স্থানান্তর করার নির্দেশ দেন এবং মসজিদ স্থানান্তর করা হয়। পরে পরিত্যক্ত মসজিদের স্থানটি খেজুর বিক্রেতাদের স্থানে পরিণত হয়’ (ইবনু তায়মিয়্যা, মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৩১/২১৬-২১৭)।

উল্লেখ্য ‘ওয়াক্বফের সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না এবং কাউকে হেবা করাও যাবে না’ মর্মে বর্ণিত হাদীছটির ব্যাপারে কতিপয় আলেম বলে থাকেন যে, যেহেতু মসজিদের সম্পত্তি ওয়াক্বফকৃত, তাই তাকে পরিবর্তন করা যাবে না। ইমাম ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) এ কথার উত্তরে বলেন, ওয়াক্বফের সম্পত্তি বিক্রি করে তার চেয়ে উন্নতমানের সম্পত্তি ক্রয় করলে ওয়াক্বফকে নষ্ট করা হয় না বা পরিবর্তন করাও হয় না। যেমনটি উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) করেছেন। তাছাড়া একটি ঘোড়া যা জিহাদের জন্য ওয়াক্বফ করা হয়েছে, সেটি বৃদ্ধাবস্থায় বিক্রি করে তার চেয়ে উন্নতমানের ঘোড়া ক্রয় করে জিহাদের জন্য রেখে দেওয়াতে ওয়াক্বফের কোনো পরিবর্তন হয় না; বরং আরও ভালো হয় (ইবনু তায়মিয়্যা, মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৩১/২১৪)।


প্রশ্ন (২০) : ইমাম নিয়োগ দেওয়ার জন্য কী কী শর্ত বা যোগ্যতা জরুরী?

-শোয়াইব
কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : ইমামতির জন্য প্রথমত যোগ্যতা হলো, ক্বিরাআতে পারদর্শী হওয়া- চাই সে বয়স্ক হোক, বালক হোক বা কিশোর হোক (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩০২; মিশকাত, হা/১১২৬)। দ্বিতীয়ত, ইলমে হাদীছে পারদর্শী হওয়া ও সুন্নাতের পাবন্দী হওয়া। তৃতীয়ত, তুলনামূলক বয়স বেশি হওয়া। আবূ মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘মানুষের ইমামতি করবে সেই ব্যক্তি যে কুরআন ভালো পড়ে। যদি কুরআন পড়ায় সকলে সমান হয়, তবে যে সুন্নাহ বেশি জানে। যদি সুন্নাহতেও সকলে সমান হয়, তবে যে হিজরত করেছে সে। যদি হিজরতেও সকলে সমান হয়, তবে যে বয়সে বেশি’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৩; মিশকাত, হা/১১১৭)। আমর ইবনু সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, …যখন ছালাতের সময় উপস্থিত হবে, তখন তোমাদের মধ্য হতে যেন কেউ আযান দেয় এবং তোমাদের ইমামতি যেন সেই ব্যক্তি করে, যে কুরআন অধিক জানে। তখন লোকেরা দেখল, আমার চেয়ে অধিক কুরআন জানার আর কেউ নেই। কেননা আমি পথিকদের নিকট হতে পূর্বেই তা মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। তখন তারা আমাকেই তাদের আগে বাড়িয়ে দিল অথচ তখন আমি ছয় কিংবা সাত বৎসরের বালক মাত্র… (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩০২; মিশকাত, হা/১১২৬)।


ইবাদতছালাত

প্রশ্ন (২১) : যোহর ছালাতের পূর্বে চার রাকআত সুন্নাতের প্রতি রাকআতেই কি সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে হবে?

-আবূ আব্দুল্লাহ
 ফুলপুর, ময়মনসিংহ

উত্তর : যোহরের পূর্বের চার রাকআতের শুধু প্রথম দুই রাকআতে মিলালেই চলবে। আবূ ক্বাতাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যোহর এবং আছরের ছালাতের প্রথম দুই রাকআতে সূরা ফাতেহা এবং অন্য দুটি সূরা আর শেষের দুই রাকআতে শুধু সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। আর কোনো কোনো সময় তিনি আমাদেরকে শুনিয়ে ক্বিরাআত করতেন। আর তিনি যোহরের প্রথম রাকআত দীর্ঘ করতেন (নাসাঈ, হা/৯৮০)। তবে প্রত্যেক রাকআতেও সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে পারে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যোহর কিংবা আছরের (রাবীর সন্দেহ) প্রথম দুই রাকআতের প্রতি রাকআতে ১৫ আয়াত পরিমাণ পাঠ করতেন এবং শেষের দুই রাকআতে অর্ধেক পরিমাণ পাঠ করতেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৫২)। এতে প্রমাণিত হয়, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো কখনো পরের দুই রাকআতেও অন্য মিলিয়েছেন।


প্রশ্ন (২২) : ইসলামের দৃষ্টিতে সূর্যগ্রহণের কারণ কী?

-আক্বীমুল ইসলাম
 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : সূর্যগ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের ভয় দেখান এবং নিজ ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। আবূ মাসঊদ আল-আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্য থেকে দুইটি নিদর্শন। এ দুইটির মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মাঝে ভীতির সঞ্চার করেন। কোনো মানুষের মৃত্যুর কারণে এ দুটোর গ্রহণ ঘটে না। কাজেই যখন গ্রহণ দেখবে, তখন তোমরা এ পরিস্থিতি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ছালাত আদায় করবে এবং দু‘আ করতে থাকবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯১১; ছহীহ বুখারী, হা/১০৪১; মিশকাত, হা/১৪৮৪)। আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার সূর্যগ্রহণ হলো, তখন নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। এরপর তিনি মসজিদে আসেন। এর আগে আমি তাঁকে যেমন করতে দেখেছি, তার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্বিয়াম, রুকু ও সিজদা সহকারে ছালাত আদায় করলেন। আর তিনি বললেন, এগুলো হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত নিদর্শন; এগুলো কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে ঘটে না। বরং আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা তাঁর বান্দাদের মাঝে ভীতির সঞ্চার করেন। কাজেই যখন তোমরা এর কিছু দেখতে পাবে, তখন ভীতবিহ্বল অবস্থায় আল্লাহর যিকির, দু‘আ ও ইস্তিগফারে মগ্ন হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১০৫৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৯১২)।


প্রশ্ন (২৩) : চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের ছালাত আদায়ের পদ্ধতি জানিয়ে বাধিত করবেন?

-জুয়েল বিন মনিরুল ইসলাম
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের ছালাত দুই রাকআত। যা দীর্ঘ কিরাআত, রুকূ ও সিজদা সহকারে আদায় করতে হয়। তবে এ ছালাতদ্বয়ের প্রত্যেক রাকআতে দুই বা ততোধিক রুকূ ও দুইটি সিজদা রয়েছে। তথা দুই রাকআত ছালাতে মোট রুকূ হবে চারটি বা ছয়টি এবং সিজদা হবে চারটি। এ ছালাত জামআতে আদায় করা সুন্নাত (মিশকাত, হা/১৪৮৫)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময় একবার সূর্যগ্রহণ হলো, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকদের নিয়ে ছালাত আদায় করলেন। তিনি দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম করেন, অতঃপর দীর্ঘক্ষণ রুকূ করেন। তারপর পুনরায় তিনি উঠে দাঁড়ান এবং দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম করেন। অবশ্য তা প্রথম ক্বিয়ামের চেয়ে কম দীর্ঘ ছিল। আবার তিনি রুকূ করেন এবং সে রুকূও দীর্ঘ করেন। তবে তা প্রথম রুকূর চেয়ে কম দীর্ঘ ছিল। অতঃপর তিনি সিজদা করেন এবং দীর্ঘক্ষণ সিজদা করেন। অতঃপর তিনি প্রথম রাকআতে যা করেছিলেন তার অনুরূপ দ্বিতীয় রাকআতে করেন… (ছহীহ বুখারী, হা/১০৪৪)। তবে প্রতি রাকআতে ৮, ১০ রুকূর হাদীছগুলো দুর্বল।


প্রশ্ন (২৪) : মহিলাদের জামাআতে মহিলারা ইমামতি করতে পারবে কি?

-আবুল বাশার
গুরুদাসপুর, নাটোর।

উত্তর : হ্যাঁ, মহিলাদের জামাআতে মহিলারা ইমামতি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে মহিলা ইমাম সামনে না দাঁড়িয়ে কাতারের মাঝে দাঁড়াবে (বায়হাক্বী সুনানুল কুবরা, হা/৫৯০, ৫৯১; দারাকুত্বনী, হা/১৫২৫)। তবে মহিলারা জুমআর ছালাতে ইমামতি করতে পারবে না। কারণ জুমআর ছালাত তাদের উপর ফরয নয়। ঈদের ছালাতে মহিলারা মহিলাদের ইমামতি করতে পারবে না, বরং পুরুষদের সাথে খোলা ময়দানে গিয়ে ঈদের ছালাত আদায় করবে (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯০)। উল্লেখ্য যে, পুরুষের উপস্থিতিতে মহিলা ইমামতি করতে পারবে না। কেননা আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সে জাতি কখনো সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার স্ত্রীলোকের হাতে অর্পণ করে’(ছহীহ বুখারী, হা/৭০৯৯; মিশকাত, হা/৩৬৯৫)।


প্রশ্ন (২৫) : কিছু গেঞ্জি/শার্ট/পাঞ্জাবি এমন যে, কিছু অংশ গলা পর্যন্ত বের হয়ে থাকে। এমন পোশাকে ছালাত হবে কি?

-শোয়াইব
কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : গেঞ্জি, শার্ট বা পাঞ্জাবি পরিধানরত অবস্থায় গলদেশের কিছু অংশ বেরিয়ে থাকলেও তাতে ছালাত হয়ে যাবে। তবে এমন কোনো কাপড় পরে ছালাত আদায় করা যাবে না, যা পরিধান করলে কাঁধ উন্মুক্ত থাকে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কাঁধ উন্মুক্ত রেখে এক কাপড়ে তোমাদের কেউ যেন ছালাত আদায় না করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৯)। আর তিনি নিজেও এক কাপড়ে ছালাত আদায় করার সময় তা শরীরে এমনভাবে জড়িয়ে নিতেন যে, কাপড়ের দুই দিক তাঁর দুই কাঁধের উপর থাকত (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৫১৭; মিশকাত, হা/৭৫৪)।


প্রশ্ন (২৬) : অফিসিয়াল ট্রেনিং-এ আমাকে মাঝে মাঝে দেশের বাইরে যেতে হয়ট্রেনিং সেন্টারে ছালাতের কোনো পরিবেশ থাকে নাএমতাবস্থায় আমি কি যোহর, আছর, মাগরিব ও এশার ছালাত একসাথে রাতে আদায় করতে পারি

-মুহাম্মদ নাঈম
বনশ্রী, ঢাকা।

উত্তর : উক্ত চার ওয়াক্ত ছালাতকে রাতে একসাথে আদায় বা জমা করা যাবে না। বরং ট্রেনিং সেন্টারের পার্শ্ববর্তী কোনো মসজিদ কিংবা যেকোনো পবিত্র স্থানে নির্ধারিত সময়ে ছালাত আদায় করতে হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে ছালাত ক্বায়েম করা মুমিনের জন্য অবশ্য কর্তব্য’ (আন-নিসা, ৪/১০৩)। তবে মুসাফির হিসাবে যোহর কিংবা আছর ওয়াক্তের মধ্যে যোহর-আছরকে একসাথে এবং মাগরিব কিংবা এশার ওয়াক্তের মধ্যে মাগরিব-এশাকে একসাথে জমা করতে পারে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরে গেলে যোহর ও আছরের ছালাত একসাথে আদায় করতেন। (ঠিক এমনিভাবে) মাগরিব ও এশার ছালাত একসাথে আদায় করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১১০৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৭০৫; মিশকাত, হা/১৩৩৯)।



ইবাদতযিকির ও দু‘আ,

প্রশ্ন (২৭) : দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধির জন্য কী কী আমল করা যায়?

-আব্দুল্লাহ
বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধির জন্য শরীআতে নির্ধারিত কোনো দু‘আ বা আমল বর্ণিত হয়নি। তবে শরীর, কর্ণ ও চোখের সুস্থতার ব্যাপারে নিম্নোক্ত দু‘আটি পড়া যেতে পারে। তা হলো,

اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَدَنِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي سَمْعِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَصَرِي، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ.

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার দেহ সুস্থ রাখো। হে আল্লাহ! আমার শ্রবণশক্তিতে সুস্থতা দান করো। হে আল্লাহ! আমার দৃষ্টিশক্তিতে সুস্থতা দান করো। আপনি ছাড়া কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই’। উক্ত দু‘আ সম্পর্কে আব্দুর রহমান ইবনু আবূ বকর বলেন, আমি আমার পিতাকে বললাম, আব্বা! আমি আাপনাকে প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যায় তিনবার করে এ দু‘আটি বলতে শুনি। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ বাক্যগুলো দ্বারা দু‘আ করতে শুনেছি। তাই আমিও তাঁর নিয়ম অনুসরণ করতে ভালোবাসি (আবূ দাঊদ, হা/৫০৯০)। পাশাপাশি ভাল মানের সুরমা চোখে লাগালে চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি হতে পারে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমাদের জন্য উত্তম সুরমা হচ্ছে ইছমিদ, তা চোখের জ্যোতি বাড়ায় এবং চোখের পাতায় লোম গজায় (আবূ দাঊদ, হা/৩৮৭৮; মিশকাত, হা/৪৪৭২)।

উল্লেখ্য যে ‘সবুজ ঘাসের দিকে বা সুন্দরী নারীর দিকে তাকালে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়’ এই মর্মে বর্ণিত সকল হাদীছ জাল (সিলসিলা ছহীহা, হা/১৩৩; হিলয়্যা, ৩/২০১)। অনুরূপভাবে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধির জন্যفَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيْدٌ  আয়াতটি পড়ে চোখে ফুক দেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।


প্রশ্ন (২৮) : ছালাত শেষে একবার সূরা ফাতিহা, ৩ বার সূরা আল-ইখলাছ এবং ১১ বার দরূদ পড়ার শারঈ কোনো ভিত্তি আছে কি?

-বাকী বিল্লাহ খান পলাশ
হাবেলী গোপালপুর, ফরিদপুর।

উত্তর : না, এর কোনো শারঈ ভিত্তি নেই। বরং ছালাত শেষে ‘আল্লাহু আকবার’ (১ বার)। ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ (তিন বার) (ছহীহ বুখারী, হা/৮৪২; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮৩; মিশকাত হা/৯৫৯)। ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ (১ বার) (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯২; মিশকাত হা/৯৬০)। তাছাড়া ছালাত শেষে আয়াতুল কুরসী পাঠ করা যায় (নাসাঈ, সিলসিলা ছহীহা, হা/৯৭২)। এছাড়াও ছালাতের শেষে আরও অনেক মাসনূন দু‘আ রয়েছে।



ইবাদতযাকাত-ছাদাক্বা

প্রশ্ন (২৯) : জোর করে দান গ্রহণ করা বা নেওয়া যাবে কি?

-জাহিদ
নওদাপাড়া, রাজশাহী।

উত্তর : দান করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উৎসাহ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কখনোই যথার্থ নেকী অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় না করবে’ (আলে ইমরান, ৩/৯২)। আবূ তালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার প্রিয় ‘বাইরুহা’ বাগানটি আল্লাহর পথে দান করলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ঘনিষ্ট আত্মীয় ও চাচাতো ভাইদের মাঝে বিতরণ করতে বললেন। ফলে তিনি তাই করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৬১)। হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি ব্যয় করো, আমি (কিয়ামতের দিন) তোমার সহযোগিতা করব (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৫২)। উল্লিখিত আয়াত ও হাদীছের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, দান অবশ্যই করতে হবে। তবে তা জোর জবরদস্তি করে নয় বরং উৎসাহ দানের মাধ্যমে নিতে হবে এবং তা যেন যুলুম না হয়।



মৃত্যু-কবর-জানাযা

প্রশ্ন (৩০) : মহিলারা কি লাশের খাটিয়া বহন করতে পারবে?

-মাহাবুব
নিলসাগর, নিলফামারী।

উত্তর : পুরুষ থাকাকালীন মহিলাদের খাটিয়া বহন করা জায়েয হবে না। কেননা মহিলাদের খাটিয়া বহন করা বা মাটি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। কেননা লাশের খাটিয়া বহন করলে স্বাভাবিকভাবেই তাদেরকে কবরস্থানে যেতে হবে। অথচ তাদের জানাযার পশ্চাদানুগমণ করা উচিত নয়। উম্মু আত্বিয়্যা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমাদেরকে জানাযার পশ্চাদানুগমণ করতে নিষেধ করা হয়েছে, তবে কঠোরভাবে নিষেধ করা হতো না (ছহীহ বুখারী, হা/১২৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩৮)।


প্রশ্ন (৩১) : তওবা করার শর্ত কী? মৃত্যু ঘনিয়ে আসার সময় তওবা করলে তা কবুল হবে কি?

-আলিফ বিন জাহাঙ্গির কবীর ও খোরশেদ মাসুদার রহমান
সাঘাটা, গাইবান্ধা।

উত্তর : তওবা কবুলের জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে (১) একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই তওবা হতে হবে। (২) কৃত গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে। (৩) পুনরায় সে গুনাহে জড়িত না হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আর যদি পাপটি বান্দার সাথে যুক্ত হয়, তাহলে তা বান্দার নিকট ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। যেমন : সম্পদ হলে ফেরত দিতে হবে, সামর্থ্য না হলে ক্ষমা নিতে হবে ‍ইত্যাদি (নববী, রিয়াযুছ ছালেহীন, ‘তওবা’ অনুচ্ছেদ)। তওবার জন্য পাঠ করতে হবে رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الْغَفُورُ (মিশকাত, হা/২৩৫২)। অথবা ‘আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ুম ওয়া আতূবু ইলাইহহি’ (তিরমিযী, হা/৩৫৭৭; আবূ দাঊদ, হা/১৫১৭; মিশকাত, হা/২৩৫৩)। মৃত্যু ঘনিয়ে আসার সময় তওবা করলেও তা কবুল হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাহর তওবা কবুল করেন, বান্দাহর রূহ কণ্ঠনালীতে আসা পর্যন্ত’ (তিরমিযী হা/৩৫৩৭; ইবনু মাজাহ হা/৪২৫৩; মিশকাত, হা/২৩৪৩)। তবে এমন ব্যক্তির তওবা কবুল হবে না যে মন্দ কাজ করতেই থাকে এবং মৃত্যুর প্রাক্কালে তওবা করে (আন-নিসা, ৪/১৮)।


প্রশ্ন (৩২) : মৃত ব্যক্তির অবাঞ্চিত লোম কাটতে হবে কি?

-মুসলেম আলী
কুশখালী, সাতক্ষীরা।

উত্তর : মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আমাদের সামাজে বহু বিদআত প্রচলিত আছে। যেমন: মাইয়্যেতের নখ কাটা, গুপ্তাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা, পেটে চাপ দিয়ে ময়লা বের করা, দাঁত খেলাল করা ইত্যাদি। এগুলো করার ব্যাপারে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিংবা ছাহাবায়ে কেরাম থেকে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাছাড়া নখ কাটা, গোঁফ ছাটা ইত্যাদি জীবিত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মানুষ মারা গেলে সে হুকুম পালন করার দায়িত্ব আর থাকে না। সর্বোপরি যেহেতু তা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিংবা ছাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়, তাই অবশ্যই তা পরিত্যাজ্য।


প্রশ্ন (৩৩) : বিচার দিবসে সকল প্রকার নিয়ামতের বিষয়ে আল্লাহ কি বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন?

-আরিফ বিন আলী
ফেনী সদর।

উত্তর : বিচার দিবসে সকল প্রকার নিয়ামতের বিষয়ে আল্লাহ বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই সেই কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে’ (তাকাছুর, ১০২/৮)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, বান্দাকে কিয়ামতের দিন খেজুর ও পানি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হবে (তিরমিযী, হা/৩২৬৬, ৩৩৫৬; আহমাদ, হা/১৪৩৪; তাখরিজু মশকিলী আসার, হা/৪৬৭)। আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার নিকট সর্বপ্রথম যে নেয়ামত প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সে প্রসঙ্গে তাকে বলা হবে, আমি তোমার শরীর কি সুস্থ রাখিনি এবং সুশীতল পানির মাধ্যমে তোমাকে তৃপ্ত করিনি? (তিরমিযী, হা/৩৩৫৮)।



পারিবারিক বিধান

প্রশ্ন (৩৪) : দাদার পূর্বেই আমার পিতা মারা গেছেন। দাদার সমস্ত সম্পদ দুই ভাগে ভাগ করে এক ভাগ চাচাকে ও আরেক ভাগ আমার মাকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফুফুরা উক্ত সম্পদ দিতে নারায। দাদার সম্পদ আমাদের বা আমার মায়ের ব্যবহার করা বৈধ হবে কি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : না, তা ব্যবহার করা বৈধ হবে না। কেননা পিতার আগে সন্তান মারা গেলে নাতী-পুতিরা সেই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয় না। বরং বর্তমানে ঐ সম্পদের প্রকৃত ওয়ারিছ হলেন, মৃত ব্যক্তির জীবিত দুই উত্তরাধিকারী (তথা প্রশ্নকারীর চাচা ও ফুফু)। সুতরাং ফুফুকে বঞ্চিত করে উক্ত সম্পদ ভোগ করলে তা হারাম হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৮; আন-নিসা, ৪/২৯)। তাছাড়া আল্লাহর বণ্টনে বিরোধিতা করলে তার পরিণাম হবে চিরস্থায়ী জাহান্নাম (আন-নিসা, ৪/১৪)। তবে দাদা চাইলে তার নাতীদের জন্য কিছু অংশ দান করে যেতে পারতেন (আল-বাক্বারা, ২/১৮০)। বিবরণ অনুযায়ী যেহেতু তিনি কোনো কিছু দান করে যাননি, তাই তারা কোনো সম্পদ পাবে না। তবে চাচা ও ফুফুরা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে ইচ্ছা হলে তাদেরকে কিছু সম্পদ দান করতে পারে।


প্রশ্ন (৩৫) : মাহরামের অন্তর্ভুক্ত কারা?

-মামুন
 মিঞাপাড়া, রাজশাহী।

উত্তর : ইসলামী শরীআতে যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ তারাই মাহরামের অন্তর্ভুক্ত। মহিলাদের জন্য মাহরামের অন্তর্ভুক্ত পুরুষগণ হলো : পিতা, চাচা, মামা, দাদা, নানা, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, নাতি (ছেলের ছেলে), নাতি (মেয়ের ছেলে), শশুর, যৌন কামনাহীন পুরুষ এবং নারীর গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ শিশু (আন-নূর, ২৪/৩১)।

আর পুরুষদের জন্য মাহরামের অন্তর্ভুক্ত মহিলারা হলো : মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাতিজী, ভাগ্নি, দুধ মা, দুধ বোন, শাশুড়ী, ছেলের স্ত্রী, সহোদরা দুই বোনকে একত্রে, স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত মেয়ে (যারা অভিভাবকত্বে রয়েছে) (আন-নিসা, ৪/২৩)। উল্লেখ্য যে, মহিলাদের জন্য ফুপা-খালু এবং পুরুষদের জন্য চাচি-মামি মাহরামের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই তাদের সাথেও পর্দা করতে হবে।


প্রশ্ন (৩৬) : স্বামী প্রতিনিয়ত পরকীয়ায় লিপ্ত থাকে। এক্ষেত্রে স্ত্রীর করণীয় কী?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : প্রথমত, পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়া স্পষ্টত যেনা। যার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর পক্ষ হতে কঠিন শাস্তির নির্ধারিত রয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯০; মিশকাত, হা/২৫৫৮)। দ্বিতীয়ত, এটা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে মারাত্মক বিশ্বাসঘাতকতা বা খিয়ানত, যাকে আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন (আল-আনফাল, ৮/২৭)। তৃতীয়ত, এর মাধ্যমে অন্যের হক্ব নষ্ট হয়, যা হারাম (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৮৫১০)। চতুর্থত, পরকীয়ায় লিপ্ত ব্যক্তি তার এই অন্যায় কাজের মাধ্যমে দুনিয়ায় ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তাই তার একমাত্র শাস্তি হলো হত্যা করা (আল-মায়েদা, ৫/৩৩)। তাই এ জঘন্য পাপ কাজ থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে আনার জন্য স্ত্রীর উচিত হবে ভালো আচরণের মাধ্যমে তাকে বুঝানো, উপদেশ দেওয়া ও বাধা প্রদান করা। কারণ এটি একটি অন্যায় কাজ আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯; মিশকাত, হা/৫১৩৭)। তবে তাতেও কাজ না হলে ‘খোলা’ করার মাধ্যমে বিছিন্ন হতে পারে।


প্রশ্ন (৩৭) : মেয়ে ‘খোলা’ করার এক মাস পরে আবার ঐ স্বামীর সাথে ঘর-সংসার করতে চাইলে করণীয় কী?

-রাজিব হোসেন
শ্রীপুর, গাজীপুর।

উত্তর : মেয়ে যদি কোনো দায়িত্বশীলের মাধ্যমে ‘খোলা’ করে থাকে তাহলে স্বামী নতুন বিবাহের মাধ্যমে নতুন মোহর ধার্য করে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ২/৩২৪; তাফসীরে ইবনে কাছীর ১/২৮৩-৮৪; ফাতাওয়া নাযীরিইয়্যাহ, ৩/৫৮)। কিন্তু যদি কোনো দায়িত্বশীলের মাধ্যমে ‘খোলা’ না হয়ে থাকে তাহলে তা খোলা বলে গণ্য হবে না। বরং সে উক্ত স্বামীরই স্ত্রী হিসাবে আছে। তাই তারা এমনিতেই স্বামী-স্ত্রী হিসাবে সংসার করতে পারবে। এতে শারঈ কোনো বাধা নেই।


প্রশ্ন (৩৮) : ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স আছে কি?

-হারুন
নীলফামারী সদর।

উত্তর : না, ইসলামে বিবাহের জন্য কোনো বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। বরং সন্তান বালেগ হলেই বিবাহের উপযুক্ত হয়ে যায়। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দু’টো কন্যাকে তাদের বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, সে ব্যক্তি ও আমি ক্বিয়ামতের দিন এভাবে একসাথে থাকব; একথা বলে তিনি তার নিজের আঙ্গুলগুলো একত্রিত করলেন’ ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৩১; তিরমিযী, হা/১৯১৪; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১৯৭০; ছহীহ আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/৬৯০; মিশকাত, হা/৪৯৫০)। তবে অভিভাবক তার সুবিধা অনুযায়ী ছেলে-মেয়ের বিবাহ দিতে পারে। তাছাড়া নাবালেগ অবস্থাতেও বিবাহ জায়েয। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে যখন বিবাহ করেছিলেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৬/৭ বছর। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ৬/৭ বছর বয়সে বিবাহ করেছিলেন এবং ৯ বছর বয়সে সংসার শুরু করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৩৪; ছহীহ আবূ দাঊদ, হা/৪৯৩৩)।


প্রশ্ন (৩৯) : বিভিন্ন নাটক-নাটিকা ও সিনেমায় অভিনয়ের সময় ছেলে-মেয়েদেরকে বিবাহ দেওয়া হয়। এ বিবাহ কি কার্যকর হবে?

-শাকিল বাবু
লালপুর, নাটোর।

উত্তর : বিবাহের যে সকল শর্ত রয়েছে, যেমন- মেয়ের অবিভাবকের অনুমতি, দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি ও মোহরানা নির্ধারিত হওয়া ইত্যাদি… যদি পাওয়া যায় তাহলে নাটক-নাটিকা ও সিনেমার অভিনয়সহ সকল অবস্থায় বিবাহ কার্যকর হয়ে যাবে। কেননা বিবাহের ক্ষেত্রে ঠাট্টা-বিদ্রুপ বা অভিনয় চলবে না। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তিনটি কাজ এমন যা বাস্তবে বা ঠাট্টাচ্ছলে করলেও তা বাস্তবিকই ধর্তব্য। তা হলো বিবাহ, তালাক ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনা (আবূ দাঊদ, হা/২১৯৪, সনদ হাসান; ইবনু মাজাহ, হা/২০৩৯, সনদ হাসান; তিরমিযী, হা/১১৮৪)। যেহেতু এই তিনটি বিষয়ে কোনো প্রকার অভিনয় বা ঠাট্টা চলে না সেহেতু বিবাহের সকল শর্ত যদি অভিনয়ের বিবাহে বিদ্যমান থাকে, তাহলে বিবাহ কার্যকর হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, নাটক-সিনেমার নামে যে নগ্নতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও নোংরামি সমাজে চলছে এগুলো কখনোই ইসলাম সর্মথন করে না। বরং এগুলোর মাধ্যমে যুবসমাজের চারিত্রক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে। ফলে সমাজে যেনা-ব্যভিাচার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে নগ্নতা, অশ্লীলতা, অবৈধ ও অশ্লীল কথা-বার্তা ইত্যাদি না থাকলে সামাজিক উপকারার্থে ইসলামী নাটক-নাটিকা বা সংলাপ করা যেতে পারে।


প্রশ্ন (৪০) : সাময়িকভাবে জন্ম নিয়ত্রণের জন্য কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করলে পাপ হবে কি?

-শরীফুল ইসলাম
ডাকবাংলা, ঝিনাইদহ।

উত্তর : সাময়িকভাবে হোক কিংবা স্থায়ীভাবে হোক খাদ্য প্রদানের ভয়ে কিংবা সুখী সংসারের উদ্দেশ্যে জন্ম বিরতিকরণ পদ্ধতি গ্রহণ করা বা গর্ভের সন্তান ধারণের পর তা নষ্ট করা হারাম (ইসরা, ৩১; আনআম, ১৫১; ছহীহ বুখারী, হা/৪৭৬১; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৬)। তবে শারীরিক কোনো সমস্যা থাকলে অথবা উল্লিখিত বিষয়গুলো উদ্দেশ্য না হলে, সাময়িকভাবে আযল কিংবা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আযল করতাম তখন কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল। ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) বৃদ্ধি করে বলেছেন, আমাদের আযল করার সংবাদ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পৌঁছল কিন্তু তিনি আমাদের নিষেধ করেননি (ছহীহ বুখারী, হা/৫২০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৪০; মিশকাত, হা/৩১৮৪)।



হালাল-হারাম

প্রশ্ন (৪১) : বিড়ি বা তামাক কারখানায় কাজ করলে ছালাত হবে কি?

-আলিফ বিন জাহাঙ্গির কবীর
সাঘাটা, গাইবান্ধা।

উত্তর : এ অবস্থায় ছালাত কবুল হবে না। কেননা বিড়ি বা তামাক নেশাদার বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘প্রত্যেক নেশাদার বস্তুই হারাম’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৬৮৭; মিশকাত, হা/৩৬৫২)। অতএব তামাক উৎপাদন করা, এর ব্যবসা করা, এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সবই হারাম। কেননা সেখানে কাজের বিনিময়ে যে পয়সা বা বেতন দেওয়া হয় তা ঐ হারাম বস্তুর মূল্য বা লভ্যাংশ থেকেই দেওয়া হয়। অথচ তা স্পষ্ট হারাম। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘মহান আল্লাহ যখন কোনো জিনিসকে হারাম করেন তখন তার মূল্যকেও হারাম করেন’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৪৮৮; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/২৩৫৯)। তাছাড়া সেখানে চাকরি করলে মূলত ঐ হারাম বা পাপ কাজেই সহযোগিতা করা হয়, যা করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন (আল-মায়েদা, ৫/২)। সুতরাং বিড়ি বা তামাকের কারখানায় কাজের বিনিময়ে যা উপার্জন করা হয় তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ছালাত কবুল হবে না। কেননা আল্লাহ পবিত্র; পবিত্র ছাড়া তিনি কোনো কিছু গ্রহণ করেন না (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)।


প্রশ্ন (৪২) : শুধু জুমআর ছালাত আদায় করে এমন ব্যক্তির জবাই করা প্রাণীর গোশত খাওয়া যাবে কি?

-মনিরুল ইসলাম
পাংশা, রাজবাড়ী।

উত্তর : এমন ব্যক্তির জবাই করা প্রাণীর গোশত খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বেচ্ছায় ছালাত পরিত্যাগকারীকে কাফের হিসাবে উল্লেখ করেছেন (ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৪৬৩)। যদিও অলসতা করে ছালাত পরিত্যাগকারী কাফের কি না এই ব্যাপারে বিদ্বানদের মতভেদ রয়েছে। তাই এমন ব্যক্তির যবেহ করা প্রাণির গোশত খাওয়া হতে বেঁচে থাকা উত্তম।


প্রশ্ন (৪৩) : সরকারী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ, ফ্রিজ, ওয়াইফাই ব্যবহারের অনুমতি নেই। কিন্তু জরুরী প্রয়োজনে যদি শিক্ষার্থীদের তা ব্যবহারের দরকার হয় তাহলে কি তারা তা ব্যবহার করতে পারে

-সুমাইয়া ইয়াসমিন
বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হিসাবে এগুলোর যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ করা দায়িত্বশীলদের প্রতি বড় আমানত। সুতরাং দায়িত্বশীলদের বিনা অনুমতিতে তা ব্যবহার করলে খিয়ানত করা হবে। উবাদা ইবনুস সামিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনায়নের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিয়ে গনীমতের উটের পাশে নামায পড়লেন। তারপর তিনি উটের দেহ থেকে একটি পশম নিয়ে তা তাঁর দু’ আঙ্গুলের মাঝে রেখে বলেনঃ হে লোকসকল! অবশ্য এটা তোমাদের গনীমতের মাল। সুতা এবং সুঁই, আর যা পরিমাণে তার চেয়ে বেশী এবং যা তার চেয়ে কম, সবই তোমরা গনীমতের মালের মধ্যে জমা দাও। কেননা গনীমতের মাল চুরি করার ফলে কিয়ামতের দিন তা চোরের জন্য অপমান ও গ্লানি এবং জাহান্নামের শাস্তির কারণ হবে (ইবনু মাজাহ, হা/২৮৫০)। সুতরাং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত বিশেষ প্রয়োজনে যদি কেউ সেগুলো ব্যবহার করে তাহলে যে বিল আসবে তা দায়িত্বশীলদের কাছে প্রদান করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতকে তার হক্বদারের নিকট পৌঁছে দাও’ (সূরা আন-নিসা, ৪/৫৮)।



হালাল-হারামপ্রসাধনী-সৌন্দর্য

প্রশ্ন (৪৪) : অল্প বয়সে রোগ-ব্যাধির কারণে চুল সাদা হয়ে গেলে তাতে কালো কলপ লাগানো যাবে কি?

-শোয়াইব
কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : না, যাবে না। কেননা কলপ বা কালো খেযাব ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা সাদা চুল কালো করা থেকে বেঁচে থাকো (ছহীহ মুসলিম, হা/২১০২; মিশকাত, হা/৪৪২৪)। তিনি আরও বলেছেন, ‘শেষ যামানায় এমন কিছু লোক হবে যারা কবুতরের বক্ষের ন্যায় কালো রঙের খেযাব দিয়ে চুল কালো করবে। তারা জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না’ (আবূ দাঊদ, হা/৪২১২; নাসাঈ, হা/৫০৭৫; মিশকাত, হা/৪৪৫২, সনদ ছহীহ)। তাই উল্লিখিত অবস্থায় কলপ বা কালো খেযাব লাগানো উচিত হবে না। বরং মেহেদী রঙয়ের খেযাব লাগানো উত্তম। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘মেহেদীর রং হলো সর্বোত্তম খেযাব’(আবুদাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/৪৪৫১)। উল্লেখ্য যে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব জন্মগতভাবেই মাথায় সাদা চুলের অধিকারী ছিলেন (আর-রাহীকুল মাখতূম, পৃ. ৪৯)। এজন্য তার নাম ছিল শায়বাহ বা সাদাচুলের অধিকারী। সুতরাং জেনেটিক কারণে সাদা চুলের অধিকারী হওয়া দোষের কিছু নয়; বরং সামাজিকভাবে বিষয়টি সহজভাবে নেওয়াই কর্তব্য। আরও জানা আবশ্যক যে, আরবদের মধ্যে আব্দুল মুত্ত্বালিবই সর্বপ্রথম কালো কলপ ব্যবহার করেন। আর সাধারণভাবে প্রথম কালো কলপ ব্যবহার করে ফেরাঊন (ফাতহুল বারী, ১০/৪৩৫, হা/৫৮৯৯-এর ব্যাখ্যা দ্র.)।



আদব-আখলাক

প্রশ্ন (৪৫) : আমার পিতা-মাতা আমার নাম রেখেছিল‌‌ ‘হায়াত’। স্কুলে এবং NID Card-এ নাম আছে আবু হায়াত ইসলামিক দৃষ্টিতে ‘হায়াত বা আবু হায়াত নামটি রাখা যাবে কি?

-আবু হায়াত
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : এই নাম রাখা যাবে না। কেননা এই নামের অর্থ সুন্দর নয়। তাই এই নাম পরিবর্তন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি কারো নাম সুন্দর অর্থপূর্ণ না হতো তাহলে তা পরিবর্তন করে দিতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৬১৯০, ৬১৯১)।


প্রশ্ন (৪৬) : অভিভাবক অর্থপূর্ণ সুন্দর নাম রাখেননি। সুতরাং বড় হয়ে কি নাম পরিবর্তন করা যাবে

-ইউসুফ
সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা।

উত্তর : অর্থপূর্ণ সুন্দর নাম না রাখা হলে যে কোন সময় তা পরিবর্তন করে অর্থপূর্ণ সুন্দর নাম রাখা যায়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন্দ নাম পরিবর্তন করে দিতেন (তিরমিযী, হা/২৮৩৯; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২০৭, ২০৮; ছহীহুল জামি‘ হা/৪৯৯৪; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১৯৮০; মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/২৫৮৯৬; মিশকাত, হা/৪৭৭৪)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিবি ‘জুওয়াইরিয়া’-এর নাম ছিল ‘বাররাহ’। তিনি তার নাম পরিবর্তন করে ‘জুওয়াইরিয়া’ রেখেছিলেন এজন্য যে ‘বাররাহ-এর নিকট হতে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বের হয়ে গেলেন’ এরূপ বলাটা তিনি অপছন্দ করতেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২১৪০; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/ ২১১; তাহক্বীক মিশকাত, হা/৪৭৫৭)। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কন্যাকে আসিয়া (নাফরমানকারী) বলা হত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘জামীলা’ (সুন্দরী) (ছহীহ মুসলিম, হা/৩১৩৯; তাহক্বীক মিশকাত, হা/৪৭৫৮; বিস্তারিত আলোচনা দ্র : শারহুন নাবাবী, ১৪ তম খণ্ড, হা/২১৩৯; তুহফাতুল আহওয়াযী, ৭ম খণ্ড, হা/২৮৩৮; আওনুল মা’বুদ, ৮ম খণ্ড, হা/৪৯৪৪)।



ইতিহাস-যুদ্ধ-জিহাদ

প্রশ্ন (৪৭) : সালমান ফারেসী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে জানাবেন

-জুয়েল বিন মনিরুল ইসলাম
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : সালমান ফারেসী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একজন বিশ্বস্ত সহচর ও প্রিয়ভাজন ছাহাবী ছিলেন। তিনি এক ইয়াহূদীর কৃতদাস ছিলেন। তিনি নবুঅতের সত্যতা যাচাই করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আবূ বুরায়দা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় হিজরতের পর একবার সালমান ফারসী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একটি পাত্রে কিছু কাঁচা খেজুর নিয়ে এলেন এবং তিনি তা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে রাখলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হে সালমান! এগুলো কিসের খেজুর?

(অর্থাৎ হাদিয়া না ছাদাক্বা)। তিনি বললেন, এগুলো আপনার ও আপনার সাথীদের জন্য ছাদাক্বা। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এগুলো তুলে নাও; আমরা ছাদাক্বা খাই না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি তা তুলে নিলেন। পরের দিন তিনি অনুরূপ কিছু খেজুর নিয়ে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে পেশ করলেন। তখন তিনি বললেন, এগুলো কিসের খেজুর? সালমান বললেন, আপনার জন্য হাদিয়া। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ছাহাবীদের বললেন, তোমরা হাত প্রসারিত করো (হাদিয়া গ্রহণ করো)। এরপর সালমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পৃষ্ঠদেশ মোহরে নবুঅত দেখতে পেলেন, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করলেন (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৪৭)।

উল্লেখ্য যে, সালমান ফারেসী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) প্রিয়নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ‘ছাদাক্বা ও হাদিয়া’ উপস্থাপনের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন এবং মোহরে নবুঅত দেখে নিশ্চিত হয়েছিলেন। কারণ পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবে এ সংবাদ ছিল যে, শেষ নবী ও রাসূল যিনি হবেন তিনি ছাদাক্বা গ্রহণ করবেন না এবং তাঁর পৃষ্ঠদেশে থাকবে মোহরে নবুঅত। আর তিনি তা পরীক্ষা করেই ইসলাম গ্রহণ করলেন।



অনলাইন জগৎ

প্রশ্ন (৪৮) : অনলাইনে কাজ করে উপার্জিত অর্থ হালাল হবে কি?

-জাহিদ হাসান
বোয়ালিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : অনলাইনের কাজে যদি কোনো প্রতারণা না থাকে এবং কোনো প্রকার হারাম না থাকে তাহলে তা মানুষের সহযোগিতা হিসাবে জায়েয। কেননা ভালো কাজে সহযোগিতা করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন,وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সাহায্য করো না’ (আল-মায়েদাহ, ৫/২)। উবাদা ইবনু সামিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘ক্ষতি করো না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২২৭২, সিলসিলা ছহীহা, হা/২৫০, ইরওয়াউল গালীল, হা/৮৯৬(। নো‘মান ইবনে বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, ‘অবশ্যই হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দুটির মাঝখানে রয়েছে কিছু সন্দেহপূর্ণ বস্তু, যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব, যে ব্যক্তি এই সন্দেহপূর্ণ বিষয়সমূহ হতে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করবে এবং যে সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে পতিত হবে সে হারামে পতিত হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪১৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৯)। অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র সম্পদ ব্যতীত কবুল করেন না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; তিরমিযী, হা/২৯৮৯; মিশকাত, হা/২৭৬০)।



অন্যান্য

প্রশ্ন (৪৯) : বিভিন্ন মক্তবে ছাত্র-ছাত্রীরা কুরআন ধরলে মিষ্টি বিতরণ বা খানা-পিনার আয়োজন করা হয়। এটা কি জায়েয?

-আক্বীমুল ইসলাম
 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর :  যখন দাতার উপর যুলুম বা চাপ সৃষ্টি হবে না এবং সামাজিক কোনো বাধ্যবাধকতার অন্তর্ভূক্ত হবে না তখন খুশি হয়ে হাদিয়া হিসাবে দিতে পারে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং তার প্রতিদানও দিতেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৫৮৫; মিশকাত, হা/১৮২৬)।


প্রশ্ন (৫০) : বর্তমানে কি দাস-দাসী ক্রয়-বিক্রয়ের প্রথা চালু আছে?

-জুয়েল বিন মনিরুল ইসলাম
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : সমাজে দাস-দাসী নেই। তবে দাস-দাসী প্রথা বৈধ আছে। এখনও অমুসলিম-মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ হলে ও তারা মুসলিমদের হাতে বন্দী হলে দাস-দাসী হিসাবে গণ্য হবে। কেননা দাস-দাসী প্রথা রহিত নয়। তবে স্বাধীন মানুষকে ক্রয়-বিক্রয় করা হারাম (ছহীহ বুখারী, হা/২২২৭; মিশকাত, হা/২৯৮৪)। কেননা আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন যে তিন লোকের বিরুদ্ধে বাদী হবেন তার মধ্যে একজন হল ঐ ব্যক্তি যে স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য খেয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/২২২৭; ইবনু মাজাহ, হা/২৪৪২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৬৯২; মিশকাত, হা/২৯৮৪)।