সওয়াল-জওয়াব



যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের আমল ও ফযীলত



প্রশ্ন (১) : যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের গুরুত্ব ও ফযীলত কী?

-নাজিউর রহমান
আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রাজশাহী।

উত্তর : যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের নেক আমল মহান আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং এর ফযীলত জিহাদের চেয়েও বেশি। আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘(বাছরের) যে কোনো দিনের সৎ আমলের চেয়ে যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল মহান আল্লাহর নিকটে অধিকতর প্রিয়’। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়েও কি? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়েও। তবে সেই ব্যক্তির কথা স্বতন্ত্র, যে তার জানমাল নিয়ে জিহাদে বের হয়েছে এবং কোনো একটিও নিয়ে ফিরে আসেনি (অর্থাৎ শহীদ হয়ে গেছে)’ (আবূ দাঊদ, হা/২৪৩৮; তিরমিযী, হ/৭৫৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৭২৭; মিশকাত, হা/১৪৬০, সনদ ছহীহ)।


প্রশ্ন (২) : যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে ঠিক কয়টা ছিয়াম পালন করতে হবে?

-মনছুর আহমাদ
গাংণী, মেহেরপুর।

উত্তর : যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন অধিক ফযীলতপূর্ণ বলে ছিয়াম কিংবা অন্যান্য নেকীর কাজ করা যেতে পারে (ছহীহ বুখারী, হা/৯৬৯; মিশকাত, হা/১৪৬০)। সে হিসাব ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত ছিয়াম রাখা যায়। কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উক্ত ছিয়াম রাখতেন (নাসাঈ, হা/২৪১৭, সনদ ছহীহ)। তবে আরাফার দিনের ছিয়ামের মর্যাদা আলাদা। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আরাফার দিনের ছিয়াম পালন করবে আল্লাহ তাআলা তার এক বছর আগের এবং এক বছর পরের ছগীরা গুনাহ মাফ করে দিবেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬২; মিশকাত, হা/২০৪৪)। উল্লেখ্য যে, মা আয়েশা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) বর্ণিত ছহীহ মুসলিমের হাদীছে এসেছে যে, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে যিলহজ্জের প্রথম দশকে কোনো ছিয়াম পালন করতে দেখিনি’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৮১-২৭৮২)। এ বিষয়ে ভাষ্যকার ইমাম নববী বলেন, সফর বা অন্য কোনো কারণে হয়তো আয়েশা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) এটা দেখেননি। তবে এর দ্বারা এ সময় ছিয়াম পালন নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয় না (ঐ, ব্যাখ্যা দ্র.)।


প্রশ্ন (৩) : যিলহজ্জের চাঁদ উঠার পর কুরবানীদাতার জন্য নখ, চুল, গোঁফ ইত্যাদি কাটা উচিত নয়। এই বিধান কি পরিবারের সকল সদস্যের উপর প্রযোজ্য হয়?

-সাব্বির হোসেন
বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : এ বিধান পরিবারের সবার উপর প্রযোজ্য নয়; বরং তা শুধু কুরবানীদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উম্মু সালামা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘যখন যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখবে, আর তোমাদের কেউ যদি কুরবানী করার মনস্থ করে, তাহলে সে যেন চুল কিংবা নখ না কাটে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৭৭; মিশকাত, হা/১৪৫৯)। হাদীছে উল্লিখিত বিষয়টি শুধু কুরবানীদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পরিবারের সকলের জন্য নয়। কাজেই পরিবারের অন্য সদস্যগণ এসব থেকে বিরত থাকলেও কোনো ছওয়াবের অধিকারী হবে না। সাথে সাথে কুরবানী দিতে অক্ষম ব্যক্তি নেকীর আশায় নখ, চুল, গোঁফ ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত থাকলে নেকী পাবেন মর্মের কথাটি ঠিক নয়। বরং এমর্মের হাদীছটি যঈফ (যঈফ আল-জামিউছ ছাগীর, হা/১২৬৫; সুনান নাসাঈ, হা/৪৩৬৫; আবূ দাঊদ, হা/২৭৮৯; মিশকাত, হা/১৪৭৯)।


প্রশ্ন (৪) : যিলহজ্জের চাঁদ উঠার পর কুরবানীদাতা নখ, চুল কাটলে পাপ হবে কি?

-আক্কাস আলী
 আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : হ্যাঁ, যিলহজ্জের চাঁদ উঠার পর কুরবানীদাতা নখ, চুল কাটলে পাপ হবে (শরহে নববী, ১৩/১৩৮; মাআলেমুস সুনান, ২/২২৭)। কারণ এটা রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর নির্দেশ। উম্মু সালামা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা কুরবানী দেওয়ার ইচ্ছা রাখে, তারা যেন যিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পর হতে কুরবানী সম্পন্ন করা পর্যন্ত স্ব স্ব চুল ও নখ কর্তন করা হতে বিরত থাকে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৬৫; মিশকাত, হা/১৪৫৯)। তবে কোনো কুরবানীদাতা ভুলবশত বা অজ্ঞতার কারণে তা কেটে থাকলে পাপী হবেন না। কিন্তু নেকী থেকে বঞ্চিত হবেন। আর যদি ইচ্ছাপূর্বক তা করেন তাহলে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।


আরাফার ছিয়াম



প্রশ্ন () : প্রতি বছর আরাফার দিন (৯ যিলহজ্জ) ছিয়াম রাখা সুন্নাত। কিন্তু বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী সাধারণত ৮ যিলহজ্জ তারিখে আরাফা হয়। এক্ষণে করণীয় কী?

-ছিফাত
গাবতলী বগুড়া।

উত্তর : আরাফার ছিয়াম পালন করতে হয় যেদিন হাজীগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করেন। আর সেটা হয় যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে। সুতরাং যেদিন যে দেশে ৯ যিলহজ্জ হবে সেদিন সে দেশে আরাফার ছিয়াম পালন করবে, সঊদীর সাথে মিল রেখে নয় (ফাতাওয়া ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, ফতওয়া নং ৪০৭২০; ইসলাম ওয়েব, ফতওয়া নং ২২৭৯৫৩)। কারণ ছিয়াম ও ঈদের বিধান চাঁদ দেখার সাথে সম্পর্কিত, স্থানের সাথে নয়  (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৮০; মিশকাত, হা/১৯৭০)। আর এটাই দলীলের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী। তবে সঊদী আরবের আরাফার দিনে ছিয়াম রাখার পক্ষে শায়খ বিন বাযসহ কয়েকজন বিদ্বানের ফতওয়া আছে। বিধায় কেউ চাইলে সঊদী আরবের সাথে মিল রেখেও আরাফার ছিয়াম রাখতে পারে। -(ওয়াল্লাহু আ‘লাম)


কুরবানীর ইতিহাস



প্রশ্ন (৬) : কখন থেকে কুরবানীর প্রচলন শুরু হয়?

-আবুল বাশার
চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন। পৃথিবীর ইতিহাসে আদম (আলাইহিস সালাম)-এর পুত্রদ্বয় হাবীল ও ক্বাবীলের কুরবানী করার মাধ্যমে যার সূচনা হয় (আল-মায়েদা, ৫/২৭)। তবে বর্তমানে আমরা যে কুরবানীর সাথে পরিচিত তা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর আদর্শ হিসাবে অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয় (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০০-১১১)। দ্বিতীয় হিজরীতে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাধ্যমে যার পুনঃপ্রচলন শুরু হয় (সুবুলুস সালাম, ২/৭০)।


প্রশ্ন (৭) : কা‘ব আহবার (রাহিমাহুল্লাহ) আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) এবং মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বিভিন্ন রাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যখন পুত্রকে কুরবানী করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন, তখন ইবলীস মনে মনে হাজেরা (আ.)-কে বিপথে পরিচালিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এসে বলল, তুমি কি জানো, তোমার স্বামী ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? হাজেরা (আ.) বললেন, কেন? পাহাড়ে খড়ি কাটতে যাচ্ছে৷ শয়তান বলল, আল্লাহর কসম! তোমার স্বামী তার রবের নির্দেশে ইসমাঈলকে কুরবানী করতে নিয়ে যাচ্ছে৷ এ কথা শুনে হাজেরা (আ.) বললেন, যদি তার রবই তাকে এ নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে আমিও তাকে সহযোগিতা করব৷ হাজেরা (আ.)-এর নিকট হতে নিরাশ হয়ে শয়তান ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর পিছন পিছন চলা ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে বিপথগামী করতে চাইল। কিন্তু মায়ের মতো ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)ও একই উত্তর দিল। অনেকক্ষণ চিন্তা করে  ভালো মানুষের রূপ ধরে শয়তান স্বয়ং ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে গিয়ে বলল, আল্লাহর কসম! আমি জানি শয়তানই আপনাকে এ স্বপ্ন দেখিয়েছে। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ইলমে নববী দ্বারা বুঝতে পারলেন যে, এ ব্যক্তি শয়তান ছাড়া আর কেউ না। তাই তিনি শয়তানকে বললেন, হে অভিশপ্ত! তুই দূর হয়ে যা। এতে শয়তান রাগান্বিত হয়ে পিছু হটল। উক্ত ঘটনা কি ঠিক?

-মুশফিকুর রহমান
লালপুর, নাটোর।

উত্তর :  প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনাটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। ছহীহ সূত্রে ও নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে এর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। সুতরাং এমন অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা বিশ্বাস করা ও তা প্রচার করা থেকে বেঁচে থাকা একান্ত জরুরী কর্তব্য।


প্রশ্ন (৮) : ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে যবেহ করার সময় তার চোখ, মুখ বেঁধে রাখা হয়েছিল কি?

-সাঈদুর রহমান
সিংড়া, নাটোর।

উত্তর : ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে যবেহ করার সময় তার চোখ, মুখ বাঁধা হয়েছিল, হাত-পা বাঁধা হয়েছিল, গলায় ছুরি চালানোর সময় গলায় লোহার স্পাত রাখা হয়েছিল এসব কথার কোনো ছহীহ ভিত্তি নেই। তবে যবেহের সময় ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) সাদা কাপড় পরিহিত ছিলেন এবং পিতাকে কাপড় খুলে ফেলতে বলেন যাতে তা কাফন হিসাবে ব্যবহার করতে পারে (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৭০৭)।


প্রশ্ন (৯) : সমাজে প্রচলিত আছে যে, ‘কাবিল তার সুন্দরী বোনকে বিবাহ করতে না পারায় হিংসার বশবর্তী হয়ে হাবীলকে হত্যা করেছিল’। এ ঘটনা কি ঠিক?

-মুশফিকুর রহমান
লালপুর, নাটোর।

উত্তর : না, সমাজে প্রচলিত উক্ত ঘটনাটি সম্পূর্ণ বানাওয়াট, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। মূলত হাবীল-কাবীলের দ্বন্দ্বটি ছিল কুরবানী কবুল হওয়া ও না হওয়া নিয়ে। বোনকে বিবাহ করা নিয়ে নয়। এমর্মে দু’টি ছহীহ বর্ণনা পাওয়া যায়। (১) আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) মেষপালক সন্তানটি সাদা শিংওয়ালা প্রশস্ত চোখবিশিষ্ট একটি মেষ কুরবানী করেন। আর জমি চাষকারী সন্তানটি এক স্তুপ খাদ্য কুরবানী করেন। আল্লাহ মেষটি কবুল করেন এবং তাকে জান্নাতে ৪০ বছর লালনপালন করেন। আর সেটি সেই মেষ যা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) সন্তানের বিনিময়ে কুরবানী করেন (তাফসীরে ইবনে কাছীর, সূরা আল-মায়েদা, ২০-২৭ আয়াতের তাফসীর দ্র.)। (২) আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) বলেন, আদম (আলাইহিস সালাম)-এর দু’সন্তান কুরবানী করেছিল। তাদের একজনের কুরবানী কবুল হয়েছিল অপরজনের কুরবানী কবুল হয়নি। দু’জনের একজন ছিল চাষী অপরজন ছিল মেষপালক। মেষপালক তার অতীব প্রিয় সুন্দর মোটাতাজা উত্তম মেষ কুরবানী করেছিল। অপরজন গমের চেয়ে ছোট খুব নিম্নমানের এক শ্রেণির শস্য কুরবানী করেছিল। আল্লাহ মেষপালকের কুরবানী কবুল করেছিলেন। আর চাষীর কুরবানী কবুল করেননি (তাফসীরে ইবনে কাছীর, সূরা আল-মায়েদা, ২০-২৭ আয়াতের তাফসীর দ্র.)।


প্রশ্ন (১০) : আমাদের কুরবানী কোন নবীর সুন্নাত?

-মামুন
মুরাদনগর, কুমিল্লা।

উত্তর : আমাদের কুরবানী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সুন্নাত। আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে পুত্র কুরবানী করতে বলে তাকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০৬)। তিনি সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পশু কুরবানী করতে বলেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ ‘আমি এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমি তাঁকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০৭-১০৮)। পরবর্তীতে ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে মদীনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং ছাহাবীগণও নিয়মিতভাবে কুরবানী করেছেন। অতঃপর অবিরত ধারায় মুসলিম উম্মাহর সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে। এটি কিতাব ও সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রমাণিত (মিরআতুল মাফাতীহ, ৫/৭১, ৭৩)।


কুরবানীর পশু



প্রশ্ন (১১) : কুরবানীর নিয়্যতে ক্রয়কৃত পশু ত্রুটিযুক্ত হলে সেই পশু দিয়ে কুরবানী দেওয়া যাবে কি?

-আহমাদ
কাটাখালী, রাজশাহী।

উত্তর : কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত সুস্থ পশু যদি রোগাক্রান্ত কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়, তাহলে উক্ত পশু দিয়ে কুরবানী করতে শারঈ কোনো বাধা নেই। আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তার কাছে হজ্জের কুরবানীর পশুসমূহের মধ্যে একটি কানা পশু নিয়ে আসা হলো। তখন তিনি বললেন, যদি পশুটি তোমাদের কেনার পরে কানা হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা তা কুরবানীতে চালিয়ে দাও। আর যদি তোমাদের কেনার আগে থেকেই কানা হয়ে থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে অন্য একটি কুরবানী দাও’ (বায়হাক্বী, সুনানে ছুগরা, হা/১৭৭৪)। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, হাদীছটির সনদ ছহীহ (আল-মাজমূ‘, ৮/৩৬৩)।


প্রশ্ন (১২) : কুরবানীর পশুর বয়স কত বছর হলে কুরবানী করা যায়? পশুর দুধের দাঁত পড়ার পর নতুন দাঁত উঠা কি শর্ত?

-মুস্তাকীম
 মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : শরীআতে কুরবানীর পশুর বয়সের কথা বলা হয়নি। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘তোমরা দুধের দাঁত ভেঙ্গে নতুন দাঁত উঠা (মুসিন্নাহ) পশু ব্যতীত যবেহ করো না (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬৩; মিশকাত, হা/১৪৫৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১৩৭১, ৩/২২২)। এই হাদীছ প্রমাণ করে যে, দুধের দাঁত ভেঙ্গে নতুন দাঁত উঠা শর্ত। তবে এমন পশু পাওয়া না গেলে যে সকল পশুর বয়স এক বছর পূর্ণ হয়েছে তা দ্বারাও কুরবানী করা যায়।


প্রশ্ন (১৩) : কুরবানীর চাঁদ উঠলে না কি কোনো পশু যবেহ করা যায় না। তাহলে এ সময়ে জন্মের সপ্তম দিনে আক্বীক্বা করতে হলে করণীয় কী?

– আব্দুস সালাম
দৌলতপুর, কুষ্টিয়া।

উত্তর : কুরবানীর চাঁদ উঠলে কোনো পশু যবেহ করা যায় না— এ কথাটি ঠিক নয়। কুরবানীর চাঁদ উঠার পরও হালাল পশু যবেহ করা যায়। এতে শরীআতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সুতরাং জন্মের সপ্তম দিন ঈদের দিন হলেও আক্বীক্বা দেওয়া যাবে। তবে কুরবানীদাতার জন্য নখ ও চুল কাটা নিষেধ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৭৭; মিশকাত, হা/১৪৫৯)।


কুরবানীর ফযীলত



প্রশ্ন (১৪) : ক্বিয়ামতের মাঠে কুরবানীর পশুর লোম, শিং ও খুর  উপস্থিত হবে। একথা কি ঠিক?

-ছিবগাতুল্লাহ
আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : উক্ত মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (যঈফ তিরমিযী, হা/১৪৯৩; মিশকাত, হা/১৪৭০; সিলসিলা যঈফা, হা/৫২৬, ২/১৪; যঈফ তারগীব, হা/৬৭১, ১/১৭০)। এছাড়া উক্ত হাদীছ কুরআনের আয়াতের বিরোধী। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নিকটে কুরবানীর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না; বরং তোমাদের তাক্বওয়া তাঁর নিকট পৌঁছে’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৭)।


প্রশ্ন (১৫) : কুরবানীর পশুর প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে মর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ?

-শামীম হোসেন
  নওগাঁ সদর, নওগাঁ।

উত্তর : এ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৭; মিশকাত, হা/১৪৭৬)। এই সানাদে আয়িযুল্লাহ নামে একজন দুর্বল ও নাফে‘ আবূ দাঊদ নামে একজন পরিত্যাজ্য রাবী রয়েছে (তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৭২৩০ ও ৩১৩৩)।


প্রশ্ন (১৬) : কুরবানীর চামড়ার টাকা মসজিদ ও মাদরাসায় দেওয়া যাবে কি?

-আবূ তাহের
ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

উত্তর : ওশর, যাকাত ও কুরবানীর চামড়ার টাকা মসজিদে দেওয়া যাবে না। কারণ সূরা আত-তওবার ৬০ আয়াতে যাকাতের যে ৮টি খাত উল্লেখ করা হয়েছে, মসজিদ তার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে মাদরাসা ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত হিসাবে চামড়া ও যাকাত-ওশরের টাকা সেখানে প্রদান করা যায় (ফাতাওয়া আরকানিল ইসলাম, পৃ. ৪৪২, ফতওয়া নং ৩৮৬; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ১৮/২৫২-২৫৩)।


একই পশুতে কুরবানী ও আক্বীক্বা



প্রশ্ন (১৭) : কুরবানী ও আক্বীক্বার মধ্যে পার্থক্য কী?

-মামুন
মুরাদনগর, কুমিল্লা।

উত্তর : কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার অন্যতম মাধ্যম (আল-কাওছার, ১০৮/২; আল-হজ্জ, ২২/৩৭)। এর গোশত মানুষ নিজে খাবে এবং ফকীর-মিসকীনকে দিতে বাধ্য (আল-হজ্জ, ২২/৩৬)। পক্ষান্তরে আক্বীকা পিতার উপরে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বসমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা জন্মের সপ্তম দিনে করতে হয় (আবূ দাঊদ, হা/২৮৩৭; নাসাঈ, হা/৪২২০; মিশকাত, হা/৪১৫৩)। এর গোশত ফকীর-মিসকীনকে দিতে বাধ্য নয়। বরং তা নিজে খাবে। আর ইচ্ছা করলে আত্মীয়-স্বজন ও ফকীর-মিসকীনকে দিবে।


 প্রশ্ন (১৮) : একই পশুতে কুরবানী ও আক্বীক্বা করা যাবে কি?

-এহসানুল হক্ব
পলিখাঁপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : না, একই পশুতে কুরবানী ও আক্বীক্বা করা যাবে না। এটা শরীআতের সাথে প্রতারণা। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বা ছাহাবায়ে কেরামের যুগে এ ধরনের আমলের অস্তিত্ব ছিল না (নায়লুল আওত্বার, ৬/২৬৮, ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায়; মিরআত, ২/৩৫১ ও ৫/৭৫)। কুরবানী ও আক্বীক্বা দুটি পৃথক বিষয়। পৃথকভাবেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে।


কুরবানীর গোশত বণ্টন



প্রশ্ন (১৯) : কুরবানীর গোশত সমানভাবে তিন ভাগে ভাগ করা কি জরুরী? কুরআন-হাদীছের আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মিলন হুসাইন
রহিমানপুর, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : কুরবানীর গোশত সমানভাবে তিন ভাগে ভাগ করার বিষয়টি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং তা নিজে খাবে এবং আত্মীয়-স্বজন ও ফকীর-মিসকীনকে খাওয়াবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘…তা হতে তোমরা নিজেরা খাও এবং হতদরিদ্রদের খাওয়াও’ (আল-হজ্জ, ২২/২৮)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘…তোমরা তা থেকে খাও এবং মিসকীন ও ফক্বীরকে খাওয়াও’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৬)। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রথমদিকে তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত জমা রাখতে নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীতে জমা রাখার অনুমতি দেওয়া হলে ছাহাবীগণ বললেন, আপনি তো তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন? তখন রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘গ্রাম থেকে অনেক অভাবী লোক আসার কারণে আমি সেই বছরে নিষেধ করেছিলাম। এখন যেহেতু সেই পরিস্থিতি নেই, অতএব তোমরা খাও, জমা রাখ এবং দান করো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৭১)। পূর্বোক্ত আয়াতদ্বয়ে নিজে খাওয়া এবং দুই শ্রেণির মানুষকে খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে। আর হাদীছে পরিস্থিতি অনুযায়ী দান করতে বলা হয়েছে। অতএব, এলাকায় অভাবী লোকের সংখ্যা বেশি হলে নিজে খাওয়ার তুলনায় দান করতে হবে বেশি। আর অভাবীর সংখ্যা কম হলে নিজের ইচ্ছামতো খাওয়া বা দান করা যেতে পারে। তবে তিন ভাগ করলে মানুষ গোনাহগার হবে বিষয়টি এমন নয়।


প্রশ্ন (২০) : প্রতিবেশীকে কুরবানীর গরুর গোশত দিয়ে সমপরিমাণ অথবা কম কিংবা বেশি করে ছাগলের গোশত নেওয়া যাবে কি?

-ছিদ্দীক্ব
 চাঁপাই নবাবগঞ্জ সদর।

উত্তর : এরূপ পরিমাণভিত্তিক লেনদেনের ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের কোনো আমল পাওয়া যায় না। তাই কুরবানীর গোশতের ক্ষেত্রে এই ধরনের লেনদেন করা উচিত নয়। তবে প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের নিকট থেকে হাদিয়াস্বরূপ কিছু নেওয়া এবং তাদেরকে কিছু দেওয়া যায়। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘হাদিয়া দাও, মহব্বত বাড়বে’ (আল আদাবুল মুফরাদ, হা/৫৯৪; মিশকাত, হা/৪৬৯৩)। অন্য হাদীছে এসেছে, ‘রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাদিয়া নিতেন এবং তার বদলা দিতেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৫৮৫; মিশকাত, হা/১৮২৬)।


প্রশ্ন (২১) : কুরবানীর পশু যবেহকারীকে পারিশ্রমিক হিসাবে গোশত দেওয়া যাবে কি?

-রকীবুল ইসলাম
বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : কুরবানীর গোশত থেকে কাউকে পারিশ্রমিক হিসাবে কিছু দেওয়া যাবে না। আলী (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে তার কুরবানীর পশুর পাশে দাঁড়াতে, এদের গোশত, চামড়া ও পিঠের আবরণসমূহ বিতরণ করতে এবং তা হতে কাউকে পারিশ্রমিক হিসাবে কিছু না দিতে নির্দেশ দেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৭১৭)। তবে যবেহকারী কুরবানীর গোশত পাওয়ার হক্বদার হলে হক্বদার হিসাবে কিছু দেওয়া যেতে পারে (মুগনী, ১১/১০)। তবে তাকে তার পারিশ্রমিক দিতে হবে (ইবনু মাজাহ, হা/২৪৪৩; ইরওয়াউল গালীল, হা/১৪৯৮; মিশকাত, হা/২৯৮৭)।


প্রশ্ন (২২) : সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কুরবানী করেনি, তাদেরকে গোশত দেওয়া যাবে কি?

-আব্দুল হামীদ
তালা, সাতক্ষীরা।

উত্তর : হ্যাঁ, যাবে। কেননা সামর্থ্য থাকলেই কুরবানী করা জরুরী নয়। বরং কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। কোনো সময় কেউ ছেড়ে দিলে গোনাহগার হবে না। আবূ বকর ও উমার (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো কুরবানী করেননি (ইরওয়াউল গালীল, হা/১১৩৯, ৪/৩৫৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ, ৪/১৭৭)। আবূ মাসঊদ আনছারী (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকার পরও আমি কুরবানী দিই না এই আশঙ্কায় যে, আমার প্রতিবেশীগণ হয়ত মনে করবে কুরবানী দেওয়া আমার জন্য জরুরী’ (ইরওয়াউল গালীল, ৪/৩৫৫)। তাই তাদেরকে হাদিয়াস্বরূপ কুরবানীর গোশত দেওয়াতে কোনো বাধা নেই।


প্রশ্ন (২৩) : টাকা ধার নিয়ে কুরবানী দেওয়া যাবে কি?

-আব্দুল আলিম
গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : কুরবানী আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। বছরে মাত্র এ

কবার কুরবানী দেওয়ার সুযোগ আসে। তাই যথাসাধ্য কুরবানী দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। ঋণ করা ব্যতীত কুরবানী দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে এবং মাসিক বেতন কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে অল্প সময়ে ঋণ পরিশোধ করার উপায় থাকলে ঋণ করে কুরবানী করাতে শারঈ কোনো বাধা নেই (মাজমূঊল ফাতাওয়া লি-ইবনে তায়মিয়া, ২৬/৩০৫; ফাতাওয়া বিন বায, ১/৩৭)।


কুরবানী ও ভাগা কুরবানী



প্রশ্ন (২৪) : কুরবানী করার সময় কোন দুআ পড়তে হবে?

– আব্দুস সামাদ
দৌলতপুর, কুষ্টিয়া।

উত্তর : কুরবানী করার সময় বলবে, بِاسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ ‘বিসমিল্লা-হি ওয়াল্লাহু আকবার’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬৬)। এর সাথে ‘আল্ল-হুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্নী’ও বলা যাবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬৭; আলবানী, মানাসিকুল হাজ্জ, পৃ. ৩৫)। তাছাড়া ‘আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্নী ওয়া মিন আহলি বায়তী’ দু‘আও পড়া যায় (ইবনু মাজাহ, হা/৩১৪৭)।


প্রশ্ন (২৫) : পরিবারের তিন ছেলেই বাইরে থাকে। ঈদে বাড়িতে এসে ঈদ করে। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদে সকল ছেলেকে পৃথক পৃথক কুরবানী দিতে হবে, না-কি সবার পক্ষ থেকে একটি কুরবানী দিলেই চলবে?

– আব্দুর রহমান
সপুরা, রাজশাহী।

উত্তর : এমতাবস্থায় স্ব স্ব পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক কুরবানী দেয়াই উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘হে জনগণ! নিশ্চয়ই প্রত্যেক পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর একটি করে কুরবানী’ (আবূ দাঊদ, হা/২৭৮৮; তিরমিযী, হা/১৫১৮; নাসাঈ, হা/৪২২৪; ইবনু মাজাহ হা/৩১২৫; মিশকাত হা/১৪৭৮)। ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সত্য কথা এই যে, একটি বকরী একটি পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট যদিও সেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা শতাধিক হয় এবং এভাবেই নিয়ম চলে আসছে (নায়লুল আওত্বার, ৬/২৪৪)।

তবে পিতা যদি সবার থেকে টাকা নিয়ে নিজে কুরবানী দেন এবং সবাই সেখানে থাকে ও খায় তাতে কোনো শারঈ বাধা নেই।


প্রশ্ন (২৬) : একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতটি পশু কুরবানী করতে পারে?

-তানভীরুল ইসলাম
 মহাদেবপুর, নওগাঁ।

উত্তর : একটি পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কুরবানীই যথেষ্ট। তবে সামর্থ্য অনুপাতে একাধিক পশু কুরবানী করতে পারে। আনাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)  শিংওয়ালা সাদা-কালো রঙের দু’টি ভেড়া কুরবানী করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৬৪, ৫৫৬৫)। অপর বর্ণনায় আছে, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একসাথে ১০০টি উট কুরবানী করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩০৭৪)।


প্রশ্ন (২৭) : পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানী দিয়ে গোশত খাওয়ার আশায় গরুর ভাগায় অংশগ্রহণ করা যাবে কি?

-রফীক আহমাদ
 সাতমাথা, বগুড়া।

উত্তর : গোশত খাওয়ার আশায় এই পদ্ধতিতে কুরবানী দেওয়া যাবে না। কেননা ইখলাছে ত্রুটি থাকলে ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না (আল-বাইয়্যেনা, ৯৮/৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৪)। স্মর্তব্য, পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানী করলেই কুরবানীর হক্ব আদায় হয়ে যায়। তো একটি কুরবানীর মাধ্যমে তা আদায় হয়ে গেছে। এখন ভাগে কুরবানীর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে যেহেতু বিদ্বানদের মাঝে ভিন্নমত রয়েছে, তাই ভাগে কুরবানী দিতে চাইলে সেক্ষেত্রে গোশত খাওয়ার নিয়্যত না করে বরং কুরবানীরই নিয়্যত করবে।


প্রশ্ন (২৮) : হাদীছে সামর্থ্যবান ব্যক্তি কুরবানী না দিলে তাকে ঈদের মাঠে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই এমন ব্যক্তি যদি কুরবানী না দেন তাহলে কি তিনি ঈদগাহে ছালাত আদায় করতে যেতে পারবেন?

-নূর আলম
গুরুদাসপুর, নাটোর।

উত্তর : সামর্থ্য থাকলে কুরবানী করা জরুরী বিধানটি এমন নয়। সুতরাং সামর্থ্যবান ব্যক্তি কুরবানী না দিলেও সে যেমন পাপী হবে না; তেমনি তার ঈদগাহে যাওয়া ও ছালাত আদায় করায় শারঈ কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। কেননা কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হলেও তা ফরয নয়। আবূ বকর ও উমার (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো কুরবানী করতেন না (ইরওয়াউল গালীল, হা/১১৩৯, ৪/৩৫৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ, ৪/১৭৭)। উল্লেখ্য যে, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী না দেওয়া ব্যক্তিকে ঈদের মাঠে যেতে নিষেধ করা হয়েছে’ মর্মে আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীছটির বিশুদ্ধতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে (ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৩; ছহীহুল জামে‘, হা/৬৪৯০)। সাথে সাথে আবূ বকর, উমার ও আবূ মাসঊদ আনছারী (রাযিয়াল্লা-হু আনহুম) সহ আরও অনেক ছাহাবী মাঝেমধ্যে কুরবানী না দেওয়ার কারণে কি ঈদের মাঠে যেতেন না? অবশ্যই যেতেন। তাই সামর্থ্যবান ব্যক্তি বিনা ওযরে কুরবানী না দিলেও ঈদের মাঠে ছালাত আদায়ের জন্য যাবে।


প্রশ্ন (২৯) : কুরবানীর জন্য একটি পশুতে সর্বোচ্চ কত জন অংশগ্রহণ করতে পারে

-রাকিব হাসান
কুমারখালী, কুষ্টিয়া।

উত্তর : একটি পশুতে একাধিক জনের অংশগ্রহণ সম্পর্কে যে হাদীছগুলো এসেছে, সেগুলো প্রায় সবগুলোই সফরের সাথে সম্পর্কিত। তবুও সেখানে সাত পরিবারের পক্ষ থেকে ভাগে অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ নেই, বরং সাত জনের কথা উল্লেখ আছে। এক্ষেত্রে একটি উট ও গরুতে সাত জন পর্যন্ত শরীক হতে পারে। জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘গরু সাত জনের পক্ষ থেকে এবং উট সাত জনের পক্ষ থেকে’ (আবূ দাঊদ, হা/২৮০৮; তিরমিযী, হা/৯০৪; মিশকাত, হা/১৪৫৮)। তবে উটে দশ জনও শরীক হওয়া যায় (ইবনু মাজাহ, হা/৩১৩১, সনদ ছহীহ)। উল্লেখ্য যে, হাদীছগুলোতে সফরের কথা উল্লেখ থাকলেও হাদীছগুলোর আমল সফরের সাথে খাছ নয়। সফরে হোক আর মুক্বীম অবস্থায় হোক গরুতে সাত জন ও উটে দশ জন অংশগ্রহণ করতে পারে। অবশ্য সাত পরিবারের পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী করার স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। কাজেই প্রত্যেক পরিবারের পক্ষ থেকে একটি করে কুরবানী হওয়াই ভালো। কারণ রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘হে লোক সকল! প্রত্যেক পরিবারের পক্ষ থেকে একটি করে কুরবানী ও আতীরা দেওয়া আবশ্যক’ (আবূ দাঊদ, হা/২৭৮৮; মিশকাত, হা/১৪৭৮)। অবশ্য আতীরা কথাটুকু মানসূখ হয়ে গেছে (আবূ দাঊদ, হা/২৭৮৮)। আত্বা ইবনু ইয়া সার বলেন, আমি আবূ আইয়ূব আনছারী (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-কে জিজ্ঞস করলাম, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর যুগে কীভাবে কুরবানী হতো? তিনি বললেন, একজনে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানী করত। সেটা থেকে তারা খেত এবং মানুষকে খাওয়াতো। অতঃপর মানুষ গর্ব করা শুরু করল। শেষ পর্যন্ত অবস্থা কোথায় দাঁড়িয়েছে, তা তুমি দেখতেই পাচ্ছ’ (তিরমিযী, হা/১৫০৫)।


প্রশ্ন (৩০) : ঈদের ছালাতের পরে ও খুৎবার পূর্বে কুরবানী করা যাবে কি?

-মিলন হুসাইন
রহমানপুর, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ঈদের ছালাতের পরে খুৎবা দেওয়া যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত তেমনি খুৎবা শোনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা রাসূলুল্লাহ ছালাত শেষে যখন মুছল্লীদের দিকে ফিরে দাঁড়াতেন তখন মুছল্লীগণ নিজ নিজ কাতারে বসে থাকত। তিনি তাদের উপদেশ দিতেন, অছিয়ত করতেন এবং বিভিন্ন কাজের আদেশ দিতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬; মিশকাত, হা/১৪২৬)। খুৎবা শেষ হলে ছাহাবীগণ কুরবানী করতেন। তাই খুৎবার পরেই কুরবানী করতে হবে। তবে জরুরী কোনো কারণে ঈদের ছালাতের পরে ও খুৎবার পূর্বে কুরবানী করলে কোনো সমস্যা নেই। কেননা খুৎবা না শুনে চলে যাওয়ার অনুমতি আছে। আব্দুল্লাহ ইবনু সাইব (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর সাথে এক ঈদের ছালাতে উপস্থিত ছিলাম। ছালাত আদায়ের পর তিনি বলেন, ‘আমরা ঈদের ছালাত পূর্ণ করেছি। সুতরাং যার ইচ্ছা সে খুৎবা শ্রবণের জন্য বসে যাবে আর যার ইচ্ছা সে চলে যেতে পারে’ (ইবনু মাজাহ, ১/৩৮৭, হা/১০৭৩-১৩০৬, ‘ঈদের ছালাতের পর খুৎবার জন্য অপেক্ষা করা’ অনুচ্ছেদ)। তবে ছালাতের পূর্বে কিংবা ছালাত চলাকালীন সময়ে কুরবানী করলে সেটি কুরবানী হবে না। বরং তাকে আরেকটি কুরবানী করতে হবে। (ছহীহ বুখারী, হা/৯৮৫, ৫৫০০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬০; মিশকাত, হা/১৪৭২)।


মৃত ব্যক্তির কুরবানী



প্রশ্ন (৩১) : মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী দেওয়া যাবে কি?

-আব্দুছ ছামাদ
ডুমুরিয়া, খুলনা।

উত্তর : মৃত ব্যক্তির নামে পৃথক কুরবানী দেওয়া শরীআতসম্মত নয়। কেননা তা রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কথা, কর্ম বা সম্মতি কোনোটির দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর জীবদ্দশাতেই ফাতেমা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) ছাড়া তার সকল সন্তান, দুই স্ত্রী খাদীজা ও যায়নাব বিনতে খুযায়মা (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) এবং চাচা হামযা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) প্রমুখ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অথচ তিনি তাদের কারও পক্ষ থেকেই কুরবানী করেননি। তাছাড়া রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর জীবদ্দশায় কোনো ছাহাবী কাছের কিংবা দূরের কোনো মৃতের নামে কুরবানী করেছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া যায় না (মাজমূ‘ ফাতাওয়া শায়খ উছায়মীন, ১৭/২৬৭)। কোনো কোনো বিদ্বান জায়েযের পক্ষে ফতওয়া দিলেও তার পক্ষে সুস্পষ্ট কোনো দলীল উল্লেখ করেননি।


প্রশ্ন (৩২) : কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পূর্বে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার অছিয়ত করে গেলে তার অছিয়ত পূর্ণ করার বিধান কী?

-আব্দুল আহাদ
 ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

উত্তর : অছিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা বাস্তবায়ন করার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন (আন-নিসা, ৪/৭৯)। তাই মৃত ব্যক্তি কুরবানীর করার অছিয়ত করে গেলে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করতে হবে। তবে পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ থেকে কুরবানী করতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/১২৯৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৮)।


ঈদুল আযহার দিনের আমল



প্রশ্ন (৩৩) : একই ইমাম ঈদের জামাআতে একাধিক বার ইমামতি করতে পারে কি? ছাহাবায়ে কেরামের জীবনে এরূপ কোনো আমল আছে কি?

-মীযানুর রহমান
 গোমস্তাপুর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : একই ইমাম একই ঈদের ছালাত একাধিক বার পড়িয়েছেন মর্মে রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তার ছাহাবীগণের কোনো আমল পাওয়া যায় না। তবে একই ছালাত একাধিকবার পড়ার বিষয়টি প্রমাণিত। মুআয ইবনু জাবাল (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর পিছনে এশার ছালাত পড়তেন এবং নিজ সম্প্রদায়ে গিয়ে আবার তাদের ইমামতি করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৭১১; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৬৫; মিশকাত, হা/১১৫০)। এক্ষণে ইমামের অভাবে যদি এরূপ করতে হয়, তাহলে তা শরীআতে জায়েয হবে।


প্রশ্ন (৩৪) : ঈদুল আযহার দিন ছালাত আদায়ের পূর্ব পর্যন্ত ছওম থাকা ও কুরবানীর কলিজা দ্বারা ইফতারী করা কি সুন্নাত?

-মিলন হুসাইন
রহিমানপুর, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঈদুল ফিতরে খেয়ে ঈদের মাঠে যাওয়া এবং ঈদুল আযহাতে ঈদের মাঠ থেকে এসে খাওয়া সুন্নাত (তিরমিযী, হা/৫৪২; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৫৬; মিশকাত, হা/১৪৪০)। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় কুরবানীর গোশত হতে খেতেন (আহমাদ, হা/২৩০৩৪, সনদ হাসান; নায়লুল আওত্বার, ৪/২৪১)। অপর বর্ণনায় আছে, ‘…তিনি ঈদুল আযহার দিন খেতেন না (পশু) যবেহ না করা পর্যন্ত’ (ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/১৪২৬; বায়হাক্বী, হা/৫৯৫৪; ছহীহুল জামে‘, হা/৪৮৪৫, সনদ ছহীহ)। অবশ্য কুরবানীর গোশত দিয়ে খাওয়া উত্তম। বিদায় হজ্জের দিন তিনি ১০০টি উটের প্রতিটি থেকে একটু করে অংশ নিয়ে এক পাত্রে রান্না করে সেখান থেকে গোশত খেয়েছিলেন ও ঝোল পান করেছিলেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩০৭৪; মিশকাত, হা/২৫৫৫)। তবে কলিজা খাওয়া মর্মে বর্ণিত হাদীছটি দুর্বল (সুবুলুস সালাম, ১/৪২৮; তা‘লীক্ব আলবানী, ২/২০০)। উল্লেখ্য যে, ঈদুল আযহার দিন না খেয়ে থাকাকে ছওম বলা এবং ঈদগাহ থেকে এসে খাওয়াকে ইফতারী বলার কোনো প্রমাণ শরীআতে পাওয়া যায় না।


প্রশ্ন (৩৫) : ঈদুল আযহার দিন ছিয়াম পালনে শারঈ নিষেধাজ্ঞা আছে কি?

-মিলন হুসাইন
রহমানপুর, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা ও তাশরীকের দিনগুলোতে ছিয়াম রাখা জায়েয নয়। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ছিয়াম রাখতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৯১; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩৭; মিশকাত, হা/২০৪৮)। নুবায়শা আল-হুযালী (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তাশরীকের দিনগুলো (ঈদুল আযহার পরের তিন দিন) খানাপিনা ও তাকবীর পাঠ করার দিন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৪১; মিশকাত, হা/২৬৪৫)।


প্রশ্ন (৩৬) : ঈদের দিনে কবর যিয়ারত করা যাবে কি?

-আব্দুর রহীম
পবা, রাজশাহী।

উত্তর : কবর যিযারত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। তবে কবর যিযারত করার জন্য জুমআ ও দুই ঈদের দিনকে নির্দিষ্ট করে নেওয়া বিদআত হবে। কেননা এই দুই দিনে খাছ করে দু‘আ করার পক্ষে রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও ছাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ নেই। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল যা শরীআতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)। তবে যেকোনো দিনে, যেকোনো সময়ে কবর যিয়ারত করা যায় (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৫৫; মিশকাত, হা/১৭৬৭)।


প্রশ্ন (৩৭) : ‘ঈদ মোবারাক’ বলা যাবে কি?

-এহসানুল হক
পলিখাঁপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : ‘ঈদ মোবারক’ বলার পক্ষে কোনো ছহীহ দলীল পাওয়া যায় না। তবে ঈদের দিনে ছাহাবায়ে কেরাম পরস্পর সাক্ষাতে বলতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন! (ফাতহুল বারী, ৩/৫৬৭, হা/৯৫১-এর আলোচনা, সনদ হাসান; তামামুল মিন্নাহ, ১/৩৫৪-৫৫)।


  প্রশ্ন (৩৮) : দুই ঈদের তাকবীর কোন সময় থেকে কখন পর্যন্ত পড়তে হয়?

-নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়া হতে ঈদের ছালাত পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করা সুন্নাত (নায়লুল আওত্বার, ৩/৩৪০; শারহুস সুন্নাহ, ৪/৩০০)। আর ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে যিলহজ্জের ৯ তারিখ তথা আরাফার দিন সকাল হতে ১৩ তারিখ আছর পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করা সুন্নাত (মুছান্নাফ  ইবনু  আবী  শায়বা,  হা/৫৬৭৮,  সনদ  ছহীহ;  ইরওয়াউল গালীল, হা/৬৫৩-এর আলোচনা দ্র., ৩/১২৫)। তবে যিলহজ্জের প্রথম দিন হতে কুরবানীর পরের তিন দিন পর্যন্তও তাকবীর পাঠ করা যায় (ছহীহ বুখারী, হা/৯৬৯-এর অনুচ্ছেদ দ্র.)।


প্রশ্ন (৩৯) : লকডাউনের জন্য ছহীহ আক্বীদার ঈদগাহে যেতে পারছি না। এমতাবস্থায় ছয় তাকবীরে ঈদের ছালাত আদায়কারী ইমামের সাথে ছালাত জায়েয হবে কি?

-আব্দুস সামী
গংগাচড়া, রংপুর।

উত্তর : এমন ইমামের সাথে ঈদের ছালাত জায়েয হবে। তবে ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী ছালাত না পড়ানোর কারণে ইমাম দোষী হবেন। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরে প্রথম রাকআতে সাতটি ও শেষ রাকআতে পাঁচটিসহ মোট বারোটি তাকবীর দিতেন (আবূ দাঊদ হা/১১৫১, ১১৫০, সনদ ছহীহ; ইবনু মাজাহ হা/১২৭৮)। তাই যেখানে রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর পদ্ধতি অনুযায়ী ছালাত আদায় করা হয়, সেখানে যাওয়া উচিত।


হজ্জ ও উমরা



প্রশ্ন (৪০) : হজ্জে যাওয়ার পূর্বে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদেরকে দাওয়াত দিয়ে খানাপিনার অনুষ্ঠান করা যাবে কি?

-আব্দুর রহীম
পলাশপোল, সাতক্ষীরা

উত্তর : হজ্জে যাওয়ার পূর্বে ও হজ্জ থেকে এসে খানাপিনার অনুষ্ঠান করার শারঈ কোনো বিধান নেই। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো এক সফর থেকে ফিরে এসে খানাপিনার অনুষ্ঠান করেছিলেন (বুখারী হা/৩০৮৯; মিশকাত হা/৩৯০৫)। যেহেতু হজ্জ সফরও একটি সফর সেহেতু কেউ চাইলে হজ্জ থেকে ফিরে এসে খানাপিনার অনুষ্ঠান করতে পারে। তবে তা জরুরী নয়।


প্রশ্ন (৪১) : ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) প্রথমে কাকে লক্ষ্য করে পাথর মেরেছিলেন? পাথর মারার জন্য তিনটি জামরা কেন হলো?

-হাসিবুল ইসলাম
শান্তাহার, বগুড়া।

উত্তর : ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তিন বার অর্থাৎ প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বার শয়তানকে লক্ষ্য করেই পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যখন কুরবানীর উদ্দেশ্যে মিনার দিকে বের হলেন তখন জামরাতুল আক্বাবায় শয়তানকে দেখতে পেলেন, তখন তিনি শয়তানকে লক্ষ্য করে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন যার ফলে শয়তান মাটিতে গেড়ে গেল। অতঃপর দ্বিতীয় জামরায় আবার শয়তান প্রকাশ পেল, তিনি তাকে আবারো সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। এমনকি শয়তান মাটিতে গেড়ে গেল। অতঃপর তৃতীয় জামরায় শয়তান আবার প্রকাশ পেল, তিনি সেখানে আবারো তাকে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলেন, ‘তোমরা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করছ আর তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর অনুসরণ করছ’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হা/১৭১৩; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১১৫৬)। উক্ত হাদীছ এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-এর কথা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) শয়তানকে লক্ষ্য করেই তিন বার পাথর নিক্ষেপ করেছেন।

তাছাড়া উক্ত হাদীছ আরও প্রমাণ করে যে, হজ্জ পালন করার সময় তিন স্থানে (জামরায়) পাথর নিক্ষেপ মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ যা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য অনুসরণীয় হিসাবে স্বীকৃত। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‌خذوا ‌عني ‌مناسككم অর্থাৎ ‘তোমরা আমার থেকে তোমাদের হজ্জের পদ্ধতি গ্রহণ করো (সুনানুল কুবরা বায়হাক্বী, হা/৯৭৯৬)।


প্রশ্ন (৪২) : কোনো ব্যক্তি হজ্জে যাওয়ার পূর্বে ওয়ারিছদের মাঝে সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে অছিয়ত করতে পারবে কি?

-মনিরুল ইসলাম
গোমস্তাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : মূলত মালিকের মৃত্যুর পরেই সম্পদ বণ্টন হবে। তবে ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজনবোধে অংশহারে সম্পদ বণ্টনের অছিয়ত করতে পারে। সাথে সাথে সামাজিক কোনো বিষয়েও অছিয়ত করতে পারে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অছিয়ত করতে চায় তার জন্য যরূরী হলো, দু’রাত পার না হওয়ার পূর্বেই সে অছিয়তনামা লিখে নিজের কাছে রেখে দিবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৭৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৭; মিশকাত, হা/৩০৭০)।


প্রশ্ন (৪৩) : আর্থিক সামর্থ্য আছে কিন্তু হজ্জে যেতে অক্ষম এমন ব্যক্তি কিংবা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বদলী হজ্জ করা যাবে কি?

-আব্দুল্লাহ কাওছার
শিবগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : হ্যাঁ, এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করা যাবে। আবূ রাযীন উক্বায়লী (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, একদা তিনি নবী করীম (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আগমন করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমার পিতা অতি বৃদ্ধ, হজ্জ ও উমরা করতে সক্ষম নয় এবং বাহনে বসতে পারেন না। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ ও উমরা করো’ (তিরমিযী, হা/৯৩০; আবূ দাঊদ, হা/১৮১০; নাসাঈ, হা/২৬২১; মিশকাত, হা/২৫২৮)। তবে হজ্জ আদায়কারীকে নিজের হজ্জ পূর্বে আদায় করতে হবে। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, আমি শুবরোমার পক্ষ হতে হজ্জের নিয়্যত করছি। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘শুবরোমা কে? সে বলল, আমার এক ভাই অথবা বলল, আমার এক আত্মীয়। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি নিজের হজ্জ করেছো? সে বলল, না। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘তুমি প্রথমে নিজের হজ্জ করো অতঃপর শুবরোমার হজ্জ করবে’ (মুসনাদুশ শাফেঈ, হা/১০০০; আবূ দাঊদ, হা/১৮১১; ইবনু মাজাহ, হা/২৯০৩)। তবে এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে শুধু উমরা করা যাবে না এবং এক হজ্জের সাথে একাধিক উমরাও করা যাবে না।


প্রশ্ন (৪৪) : কেউ বদলী হজ্জ করলে নিজের জন্য দুআ করতে পারবে কি? তাছাড়া তিনি কি পূর্ণ হজ্জের নেকী পাবেন?

-আব্দুর রাজ্জাক
 হিমছড়ি, সিলেট।

উত্তর : বদলী হজ্জ সম্পাদনকারী নিজের জন্য এমনকি সকল মুসলিমের জন্যও দু‘আ করতে পারবে। কেননা হজ্জের জন্য দু‘আর বিষয়টি ব্যাপক। সাফওয়ান (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সিরিয়াতে এসে আবূ দারদা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু)-এর বাড়িতে গেলাম। কিন্তু সেখানে আবূ দারদা(রাযিয়াল্লা-হু আনহু)কে পেলাম না বরং পেলাম উম্মু দারদা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা)-কে। উম্মু দারদা (রাযিয়াল্লা-হু আনহা) বললেন, আপনি কি এ বছর হজ্জ পালনের ইচ্ছা করেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ! তিনি বললেন, তাহলে আমাদের মঙ্গলের জন্য দু‘আ করবেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির দু‘আ তার ভাইয়ের জন্য অবশ্যই কবুল করা হয়ে থাকে, যা তার অনুপস্থিতিতে করা হয়। তার মাথার পাশেই একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে তার ভাইয়ের জন্য

দু‘আ করে তখনই নিযুক্ত ফেরেশতা বলে ‘আমীন’ এবং বলে তোমার জন্যও অনুরূপ কল্যাণ হোক (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৩৩)। তবে অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জ-উমরা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার পক্ষে নিয়্যত করে বাহ্যিক ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত কর্মসমূহ আদায় করা (আবূ দাঊদ, হা/১৮১১; মিশকাত, হা/২৫২৯)। বদলী হজ্জ সম্পাদনকারীও পূর্ণ হজ্জের নেকী পাবেন (ফাতাওয়া লাজনা আদ-দায়েমা, ১১/৭৮)।


প্রশ্ন (৪৫) : মাহরাম ছাড়া কোনো মহিলা কাফেলার অন্যান্য প্রতিবেশী মহিলাদের সাথে মিলে পূর্ণ পর্দা সহকারে হজ্জ করতে পারে কি?

-ফারহান ইবনে আমিন
কলাবাগান, ঢাকা।

উত্তর : মাহরাম ব্যতীত মহিলাদের জন্য হজ্জ-উমরাসহ যে কোনো ধরনের সফর করা বৈধ নয়। কারণ মহিলাদের উপর হজ্জ ফরয হওয়ার জন্য মাহরাম শর্ত। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘কোনো মহিলা মাহরাম ব্যতীত এক দিনের সফর করবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৮৬২, ৩০০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৮২৭, ১৩৩৮; মিশকাত, হা/২৫১৫ ও ২৫১৩)। সুতরাং হজ্জের সফরে স্বামী অথবা মাহরাম থাকা জরুরী। মাহরাম ছাড়া হজ্জ ফরয হবে না।


প্রশ্ন (৪৬) : হাজারে আসওয়াদস্পর্শ করলে পাপ মোচন হয় কি?

-আব্দুল কাদের
  শাহজাহানপুর, বগুড়া।

উত্তর : হ্যাঁ, ‘হাজারে আসওয়াদ’ স্পর্শ করলে পাপ মোচন হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ হাজারে আসওয়াদকে উঠাবেন, তখন তার দু’টি চোখ থাকবে যা দ্বারা সে দেখবে এবং তার একটি জিহ্বা হবে যা দ্বারা সে কথা বলবে এবং যে তাকে ঈমানের সাথে চুম্বন করেছে সে তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে’ (তিরমিযী, হা/৯৬১, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/২৫৭৮)। তবে রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর সুন্নাতের অনুসরণের উদ্দেশ্যে পাথরকে চুম্বন করতে হবে। সাথে সাথে বিশ্বাস রাখতে হবে যে উক্ত পাথর উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না। যেমনটি উমার (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি অবগত আছি যে, তুমি একখানা পাথর মাত্র। তুমি ক্ষতিও করতে পারো না, আবার উপকারও করতে পার না, যদি আমি রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে না দেখতাম যে, তিনি তোমাকে চুম্বন করছেন, তাহলে আমিও তোমাকে চুম্বন করতাম না’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৫৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১২৭০)।


প্রশ্ন (৪৭) : হাজারে আসওয়াদসাদা ছিল। কিন্তু আদম সন্তানের পাপের কারণে তা কালো হয়েছেএকথা সঠিক কি?

-মাহফূয
বাঘা, রাজশাহী।

উত্তর : হ্যাঁ, একথা সঠিক। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘হাজারে আসওয়াদ যখন জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হয়, তখন দুধ অপেক্ষা অধিক সাদা ছিল। পরে আদম সন্তানের পাপ তাকে কালো করে দিয়েছে’ (তিরমিযী, হা/৭৮৮; মিশকাত, হা/২৫৭৭)।


প্রশ্ন (৪৮) : যার হজ্জ করার সামর্থ্য নেই সে যদি তার মায়ের দিকে সুনযরে তাকায়, তাহলে সে কবুল হজ্জের সমান নেকী পাবে। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক?

-তানভীর
মহাদেবপুর, নওগাঁ।

উত্তর : উক্ত মর্মে বর্ণিত হাদীছটি জাল। এর সনদে নাহশাল ইবনু সাঈদ নামে একজন পরিচিত মিথ্যুক রাবী আছে (বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান, হা/৭৮৫৬; সিলসিলা যঈফা, হা/৬২৭৩)।


প্রশ্ন (৪৯) : হজ্জ ও উমরা পালন করলে পাপ মোচন হওয়ার পাশাপাশি অভাবও দূর হয়। উল্লিখিত বক্তব্য কি ছহীহ হাদীছসম্মত?

-আব্দুস সাত্তার
পুঠিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : উল্লিখিত বক্তব্য ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লা-হু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা হজ্জ ও উমরা আদায়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করো। কারণ এ দু’টি দরিদ্রতা এবং পাপ উভয়ই দূর করে, যেমন হাপর লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা দূর করে। আর মাবরূর (কবুল) হজ্জের প্রতিদান জান্নাত বৈ কিছুই নয়’ (তিরমিযী, হা/৮১০, ১/১৬৭; ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/২৫১২; নাসাঈ, হা/২৬৩১, সনদ ছহীহ)।


প্রশ্ন (৫০) : হজ্জ থেকে বাড়ি ফেরার পর তিন দিন পর্যন্ত কারও সাথে কথা বলা কিংবা বাড়ি থেকে বের হওয়া ঠিক নয়। এমনিভাবে গরু-খাসী যবেহ করে দাওয়াত খাওয়ানো কিংবা বাজারে কিছু কিনতে গেলে একদরে ক্রয় করা উচিত মর্মে সমাজে প্রচলিত আমলগুলো কি শরীআতসম্মত?

-ইসরাঈল
 শেরপুর, বগুড়া।

উত্তর : এগুলো সব কুসংস্কার। ইসলামে এগুলোর কোনো স্থান নেই। বরং হজ্জ অথবা কোনো সফর থেকে ফিরে

আসলে প্রথমে মসজিদে দুই রাকআত ছালাত আদায়ের পর মানুষের সাথে প্রয়োজনীয় কুশলাদি বিনিময় করে বাড়িতে প্রবেশ করা সুন্নাত। কা‘ব ইবনু মালেক (রাযিয়াল্লা-হু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো সফর থেকে আসলে প্রথমে মসজিদে প্রবেশ করে দু’রাকআত ছালাত আদায় করতেন। অতঃপর লোকদের সাথে বসতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩০৮৭ ও ২৬০৪)। তবে হজ্জ সফর থেকে ফিরে এসে দাওয়াত খাওয়ানো যায়। রাসূল (ছাল্লাল্লা-হু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক সফর থেকে ফিরে এসে খানাপিনার অনুষ্ঠান করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩০৮৯; মিশকাত, হা/৩৯০৫)। তবে হজ্জে যাওয়ার পূর্বে অনুষ্ঠান করে দাওয়াত খাওয়ানোর যে প্রথা সমাজে চালু আছে তার কোনো প্রমাণ শরীআতে নেই; বরং তা বিদআত ও কুসংস্কার।