প্রশ্ন (১) চার মাযহাব মানতে হবে বা কোনো এক ইমামের তাক্বলীদ করতে হবেমর্মে কখনো কি ইজমা হয়েছে?

-আবু হুরায়রা ছিফাত
প্রসাদপুর, নওগাঁ।

উত্তর : চার মাযহাবের আবির্ভাব ঘটেছে তাবে-তাবেঈনদের পরে। শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহিঃ) বলেন, হিজরী ৪র্থ শতাব্দীর পূর্বে কোন মুসলিমরা নির্দিষ্টভাবে কোন একজন বিদ্বানের মাযহাবের তাক্বলীদের উপরে সংঘবদ্ধ ছিল না (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ, ১/১৫২-৫৩, ‘চতুর্থ শতাব্দী ও তার পরের লোকদের অবস্থা বর্ণনা’ অনুচ্ছেদ)। অত্র বিবরণে বুঝা যায়, ভারতীয় বিদ্বানদের নিকটেও ৪০০ হিজরীর পূর্বে কোন মাযহাবের ছিল না। অতএব মাযহাব শরী‘আতের কোন অংশ হতে পারে না। তাই স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, এ ব্যাপারে কোন বিদ্বানদের ইজমা‘ হয়নি। আর ইজমা‘র দাবী করা কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহকে না মানার শামিল। বরং পরবর্তীতে সৃষ্ট সকল মাযহাব বা কোন নির্দিষ্ট ইমামের অন্ধ তাক্বলীদ করা নাজায়েয। কেননা ইসলামী শরী‘আতের মূল ভিত্তি দু‘টি বস্তুর উপরে নির্ভরশীল। তা হল, পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের (ছাঃ) আনুগত্য কর (নিসা, ৫৯; মুহাম্মাদ, ৩৩)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘রাসূল (ছাঃ)  তোমাদের নিকট যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ কর আর যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাক’ (হাশর, ৭)। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)  বলেন, ‘আমি তোমাদের নিকট দু‘টি জিনিস রেখে গেলাম সে দু‘টি জিনিস যতদিন তোমরা আঁকড়িয়ে ধরবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। বস্তু দু‘টি হল, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত’ (মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৩৩৮; মুস্তাদরাক হাকেম, হা/৩১৮; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৪০; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৮৬)। উল্লিখিত আয়াত ও  হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন মাযহাব ও ব্যক্তির অন্ধ তাকলীদ শরী‘আতে জায়েয নয়।

প্রশ্ন (২) দিবস পালন করলে শিরক হয় কিভাবে?

-রাসেল মাহমুদ মনির

দূর্গাপুর, রাজশাহী।

উত্তর : দিবস পালন করার মানসিকতা একটি সামাজিক কুসংস্কার। দিবস পালন বলতে মানুষ একটি নির্ধারিত দিনে কিছু করতে চায়। যেমন, জন্মদিন ও মৃত্যুদিনে মানুষ আনন্দ করে, শোক পালন করে, খানা-পিনার ব্যবস্থা করে। ঠিক তেমনি নির্ধারিত দিনে মানুষ তাদের বড় সফলতা এসেছে বলে সেদিন নানা ধরনের অনুষ্ঠান পালন করে থাকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ইত্যাদি বন্ধ রাখে। এরকম নির্ধারিত দিনকে কল্যাণকর মনে করা এবং সেই লক্ষ্যে কিছু করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আবু ওয়াক্বিদ লাইছী (রাঃ) হতে বর্ণিত, যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হুনাইনের যুদ্ধে বের হলেন, তখন তিনি মুশরিকদের এমন একটি বৃক্ষের নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাতে নিজেদের অস্ত্রসমূহ ঝুলিয়ে রাখত। উক্ত বৃক্ষটিকে ‘যাতু আনওয়াত্ব’ বলা হত। এটা দেখে কোন কোন নব্য মুসলিম বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! ঐ সমস্ত মুশরিকদের ন্যায় আমাদের জন্যও একটি ‘যাতু আনওয়াত্ব’ নির্ধারণ করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! মূসা (আঃ)-এর কওম তাঁকে বলেছিল, আমাদের জন্য এরূপ মা‘বূদ নির্ধারণ করে দিন, যেরূপ ঐ কাফের সম্প্রদায়ের মা‘বূদ রয়েছে। তোমরাও তো সেরূপ কথা বলছো। সেই মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় তোমরা ঐ সমস্ত লোকদের পথ অনুসরণ করে চলবে, যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়ে গেছে’ (তিরমিযী, হা/২১৮০; মিশকাত, হা/৫৪০৮)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, কোন নির্ধারিত দিনের মাধ্যমে কল্যাণ কামনা করা বা কোন কিছু মনে করে সে দিন পালন করা শিরক।

তবে যদি দিবস পালনের পিছনে কোন কল্যাণ, মঙ্গল ও শুভ কিছু হওয়ার নিয়্যাত না থাকে এবং দিবসকে সম্মান করার বিষয়ও না থাকে এমনিতেই স্বাভাবিকভাবে দিবস পালন করে তাহলে সেটি শিরক নাহলেও হারাম হবে। রাসূল (ছাঃ)  যখন মক্কা থেকে মদীনায় আসলেন, তখন দেখলেন মক্কার লোকেরা দু‘টি দিনে খেলাধুলা করে। তিনি (ছাঃ)  জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দু‘টি দিন কী? তারা বলল, আমরা জাহিলিয়্যাতের যুগ থেকেই এ দু‘টি দিন পালন করে আসছি। তখন রাসূল (ছাঃ)  সে দু‘টি দিনকে বাতিল করে মুসলিমদের জন্য দু‘টি দিন নির্ধারণ করলেন তাদের খেলাধুলা, আনন্দ ও যিকিরের জন্য। তার একটি হল, ঈদুল ফিতর আর অন্যটি ঈদুল আযহা (আবুদাঊদ, হা/১১৩৪; মিশকাত, হা/১৪৩৯)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে মুসলিমদের জন্য এ দু‘টি দিন ছাড়া আর কোন দিন পালনীয় হতে পারে না। আর কোন দিন পালনীয় হলে তা রাসূল (ছাঃ)  বলতেন, তোমাদের দু‘দিন আর আমার পক্ষ থেকে দু‘দিন। কিন্তু তিনি তা না করে মদিনাবাসীর দুই দিনকে বাতিল করে নতুন দুটি দিন দিয়েছেন। যার মাধ্যমে অন্য কোন দিবস পালনের সুযোগ আর ইসলামে নাই।

 

প্রশ্ন (৩) মসজিদের বারান্দায় একটা কবর আছে। লোকেরা কোন প্রকার উদ্দেশ্য ছাড়াই সেখানে ছালাত আদায় করে। তাছাড়া মসজিদটি কবর কেন্দ্রিক কিংবা কবরটি মসজিদ কেন্দ্রিক গড়ে উঠেনি। সুতরাং উক্ত মসজিদে ছালাত আদায় করা বৈধ হবে কি?

-মাসুদুর রহমান

রংপুর সদর, রংপুর।

উত্তর : কোন ক্রমেই মসজিদের ভিতরে বা বারান্দাতে কবর থাকলে সেখানে ছালাত আদায় করা ঠিক হবে না। মসজিদের বারান্দা হতে কবর সরিয়ে অন্যত্রে দাফন করতে হবে।  কারণ রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা কবরের দিকে ফিরে ছালাত আদায় কর না এবং তার উপরে বসো না (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭২; নাসাঈ, হা/৭৬০)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, কবর যেখানে আছে তার উপরে, তার দিকে এবং তার পাশে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর মসজিদের পাশে কবর থাকলে সম্ভভপর কবর সরিয়ে ফেলতে হবে। অন্যথায় কবর ও মসজিদের দেওয়ালের মধ্যে একটি অতিরিক্ত দেওয়াল দিতে হবে।

প্রশ্ন (৪) মায়ের পেটে শিশু মারা গেলে তার কি কাফন, জানাযা ও নাম রাখতে হবে?

-আক্বীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : মায়ের পেটে শিশু মারা গেলে তার দাফন-কাফন, জানাযা ও নাম রাখা যাবে না। বরং নাড়ি-ভুঁড়িসহ ন্যাকড়া দিয়ে মাটিতে পুঁতে দিতে হবে (ফিকহুস সুন্নাহ, ১/২৩৮ পৃঃ, ‘জানাযা’ অধ্যায়)। কেননা জানাযার জন্য জীবিত জন্ম হতে হবে।

প্রশ্ন (৫) ছালাতে কখন কখন রাফঊল ইয়াদায়েন করতে হয়।

– মনিরুল ইসলাম

পুঠিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : ছালাতে চার স্থানে রাফঊল ইয়াদায়েন করতে হয়। তা হলো: তাকবীরে তাহরীমা বাঁধার সময়, প্রত্যেক বার রুকূতে যাওয়া ও রুকূ হতে উঠার সময় এবং তিন বা চার রাক‘আত বিশিষ্ট ছালাতের তৃতীয় রাক‘আত শুরু করার সময়। ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ)  যখন ছালাত শুরু করতেন, তখন দুই হাত দুই কাঁধ বরাবর উঠাতেন। অতঃপর যখন রুকূর জন্য তাকবীর বলতেন এবং রুকূ হতে মাথা উঠাতেন, তখনও এরূপভাবে দুই হাত উঠাতেন আর বলতেন, ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ রাব্বানা লাকাল হামদ’। কিন্তু সিজদায় যেতে এরূপ করতেন না (ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯০; তাহ্ক্বীক্ব মিশকাত, হা/৭৯৩)। উল্লেখ্য যে, রাফঊল ইয়াদায়েন শরী‘আতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। রাফঊল ইয়াদায়েন করা সম্পর্কে চার খলীফা সহ প্রায় ২৫ জন ছাহাবী থেকে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ সমূহ রয়েছে। একটি হিসাব মতে রাফঊল ইয়াদায়েন এর হাদীছের রাবী সংখ্যা আশারায়ে মুবাশ্শারাহ সহ অন্যূন ৫০ জন ছাহাবী (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/১০৭ পৃঃ ; ফাৎহুল বারী, ২/২৫৮ পৃঃ, হা/৭৩৭-এর ব্যাখ্যা) এবং সর্বমোট ছহীহ হাদীছ ও আছারের সংখ্যা অন্যূন চার শত। ইমাম সুয়ূত্বী (রহিঃ) ও আলবানী (রহিঃ) প্রমুখ বিদ্বানগণ রাফঊল ইয়াদায়েন এর হাদীছকে ‘মুতাওয়াতির’ (যা ব্যাপকভাবে ও অবিরত ধারায় বর্ণিত) পর্যায়ের বলে মন্তব্য করেছেন (তুহফাতুল আহওয়াযী, ২/১০০, ১০৬ পৃঃ; আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন্নাবী, পৃঃ ১০৯)। ইমাম বুখারী (রহিঃ) বলেন,

لَمْ يَثْبُتْ عَنْ أَحَدٍ مِّنْهُمْ تَرْكُهُ. و قَالَ لاَ أَسَانِيْدَ أَصَحُّ مِنْ أَسَانِيْدِ الرَّفْعِ-

অর্থাৎ কোন ছাহাবী রাফঊল ইয়াদায়েন তরক করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। তিনি আরও বলেন ‘রাফঊল ইয়াদায়েন’-এর হাদীছ সমূহের সনদের চেয়ে বিশুদ্ধতম সনদ আর নেই’(ফাৎহুল বারী, ২/২৫৭ পৃঃ, হা/৭৩৬-এর ব্যাখ্যা)। সুতরাং তাকে উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। কেউ যদি স্বেচ্ছায় তা উপেক্ষা করে তাহলে সে সুন্নাতকে অমান্য করল (ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/১৯৭; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২১৩০)।

ছালাতে রাফঊল ইয়াদায়েনের জন্য ১০টি করে নেকী বেশী হয় (সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩২৮৬)। উক্ববা ইবনে আমের জুহানী (রাঃ) বলেন, যখন মুছল্লী রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় দু‘হাত উত্তোলন করবে তখন তার জন্য প্রত্যেক ইশারায় দশটি করে নেকী হবে (বায়হাক্বী, মা‘রেফাতুস সুনান, হা/৮৩৯; আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন নাবী, পৃঃ ১২৯)। পক্ষান্তরে, রাফঊল ইয়াদায়েন না করলে ছালাতের নেকী কম হয়। আম্মার ইবনু ইয়াসার প হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘এমন অনেক লোক আছে যারা ছালাত আদায় করে। কিন্তু তাদের ছালাত পুরোপুরি কবুল না হওয়ায় পরিপূর্ণ নেকী তারা পায় না। বরং তাদের কেউ দশ ভাগের এক ভাগ, কেউ নয় ভাগের এক ভাগ, কেউ আট ভাগের এক ভাগ, কেউ সাত ভাগের এক ভাগ, কেউ ছয় ভাগের এক ভাগ, কেউ পাঁচ ভাগের এক ভাগ, কেউ চার ভাগের এক ভাগ, কেউ তিনের একাংশ বা অর্ধাংশ নেকী প্রাপ্ত হয়ে থাকে (আবুদাঊদ, হা/৭৯৬)।

প্রশ্ন (৬) একজন স্ত্রী খোলা করার পর পুনরায় যদি ঐ স্বামীর সাথে ঘর-সংসার করতে চায় তাহলে তার মেয়াদ কত বা তার পদ্ধতি কী?

-মাহমুদ, মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর :  কোন মহিলা যদি খোলা তালাক নেয় এবং পুনরায় ঘর-সংসার করতে চায় তাহলে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ঘর-সংসার করতে পারে। সেক্ষেত্রে তাতে কোন ইদ্দত পালন করতে হবে না (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ২/৩২৪; তাফসীরে ইবনে কাছীর, ১/২৮৩-৮৪ পৃঃ; ফাতাওয়া নাযীরিইয়্যাহ, ৩/৫৮)।

প্রশ্ন (৭) সম্পর্ক করে বিবাহ করেছিলাম। বিষয়টি জানাজানি হলে পুনরায় সামাজিকভাবে মেয়ের বাবার সম্মতিতে বিবাহটি সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেখানে তার বাবা উপস্থিত ছিলেন না। উপস্থিত ছিলেন তার দাদা। প্রশ্ন হল বিবাহটি কি সম্পন্ন হয়েছে?

-মোরশেদ, পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : প্রথমত, সম্পর্ক করে এবং মেয়ের অলীর সম্মতি ছাড়া বিবাহ করলে তা বাতিল হবে এবং মেলামেশা হয়ে থাকলে সেটি যেনা হিসাবে গণ্য হবে। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘অলী ছাড়া বিবাহ বাতিল’ (তিরমিযী, হা/১১০১; আবুদাঊদ, হা/২০৮৫; তাহ্ক্বীক্ব মিশকাত, হা/৩১৩০)। তিনি আরও বলেন, ‘কোন মহিলা যদি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে, তাহলে তার বিবাহ বাতিল, বাতিল, বাতিল’ (আবুদাঊদ, হা/২০৮৩; তিরমিযী, হা/১১০২; তাহ্ক্বীক্ব মিশকাত, হা/৩১৩১)। তবে মেয়ের বাবার সম্মতিতে দাদা উপস্থিত থাকলে উক্ত বিবাহ বৈধ হবে। অবশ্য অনৈতিকভাবে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বিবাহ করার জন্য মহান আল্লাহর নিকটে তওবা করতে হবে।

প্রশ্ন (৮) কিডনিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে পঠিতব্য কিছু সংক্ষিপ্ত দুআ উচ্চারণসহ পত্রিকার মাধ্যমে জানালে উপকৃত হব।

খাজা নাজিমুদ্দীন

অবসরপ্রাপ্ত হিসাব রক্ষণ অফিসার।

উত্তর : প্রথমত সূরা ইখলাস, নাস, ফালাক্ব সকালে তিনবার ও রাতে তিনবার পড়ে শরীরের ফুঁক দিতে হবে। বিশেষ করে ঘুমানোর সময় উক্ত সূরা তিনটি পড়ে হাতে ফুঁক দিয়ে যতদুর সম্ভব শরীরে মাসাহ করবে। তাছাড়া নিম্বের দু‘আগুলোও পড়তে পারে। যেমন, আইয়ূব (আঃ) নিজের রোগমুক্তির জন্য পড়েছিলেন,

أَنِّيْ مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِيْنَ

উচ্চারণ : আন্নী মাসসনীয়ায যুররু ওয়া আনতা আরহামুর র-হিমীন। অর্থ : ‘নিশ্চয়ই অনিষ্ট আমাকে স্পর্শ করেছে, আর তুমি শ্রেষ্ঠ দয়ালু’ (আম্বিয়া, ৮৩)।

اَللّٰهُمَّ إِنِّى أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُوْنِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الْأَسْقَامِ উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আঊযুবিকা মিনাল বারাছি ওয়াল জুনূনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিন ছাইয়্যিইল আসক্বামি’। অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ধবল, কুষ্ট, পাগল ও অন্যান্য যতরকমের খারাপ অসুখ আছে তাত্থেকে পরিত্রাণ চাচ্ছি (আবুদাঊদ, হা/১৫৫৪; নাসাঈ, হা/৫৪৯৩)।

أَذْهِبِ الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ وَإشْفِ أَنْتَ الشَّافِيْ لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَّا يُغَادِرُ سَقَمًا.

উচ্চারণ : আযহিবিল বা‘স, রব্বান না-স! ওয়াশ্ফি, আনতাশ শা-ফী, লা শিফা-আ ইল্লা শিফা-উকা, শিফা-আল লা ইউগা-দিরু সাক্বামা। অর্থ : কষ্ট দূর কর, হে মানুষের প্রতিপালক! আরোগ্য দান কর। তুমিই আরোগ্য দানকারী। কোন আরোগ্য নেই তোমার দেওয়া আরোগ্য ব্যতীত; যা কোন রোগীকে ধোঁকা দেয় না (বুখারী, হা/৪৭৫০; মুসলিম, হা/২১৯১; মিশকাত হা/১৫৩০)।

প্রশ্ন (৯) মসজিদের নীচ তলায় দোকান। সেগুলো যাদেরকে ভাড়া দেওয়া আছে তারা সেখানে বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা, আরসি, পেপসি ইত্যাদি বিক্রি করে থাকে। প্রশ্ন হল, ঐ সকল দোকানের ভাড়া দিয়ে মসজিদের কোন কাজ করা বৈধ হবে কি?

-উত্তর রামপুর উন্মুক্ত, ইসলামী পাঠাগার

পতœীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা ইত্যাদি হারাম বস্তু। আর হারাম বস্তুর ব্যবসাও হারাম। সুতরাং ঐ সকল দোকানের ভাড়া দিয়ে মসজিদের কোন কাজ করা বৈধ হবে না (মায়েদাহ, ২)। উল্লেখ্য যে, মসজিদের উন্নতিকল্পে শর্ত সাপেক্ষে মসজিদের উপরে-নিচে দোকান বা অফিসের জন্য ভাড়া দেওয়াতে শারঈ কোন বাধা নেই। তবে শর্ত হল- ব্যবসা হালাল হতে হবে এবং এসব দোকানের ভাড়ায় প্রাপ্ত সম্পদ মসজিদের নামে ওয়াক্বফ হতে হবে অর্থাৎ ব্যক্তি মালিকানা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত হ‘তে হবে (ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ, ৩১ খ-; ফাতাওয়া নাযিরিয়া, ১ম খ-, পৃঃ ৩৬৭ ‘মসজিদ’ অধ্যায়)।

 

 

 

প্রশ্ন (১০) : যে ব্যক্তি শিরক ও বিদআতের সাথে জড়িত তার জানাযায় শরীক হওয়া যাবে কি?

-আব্দুস সামী

গঙ্গাচড়া, রংপুর।

উত্তর : প্রত্যেক মৃত মুসলিম ব্যক্তির জানাযার ছালাত আদায় করা ফরয। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি মুশরিক হয়ে মারা যায় তাহলে তার জানাযার ছালাত আদায় করা যাবে না। আর যদি কোন ব্যক্তি এমন বিদ‘আতী আমল করে যা তাকে কুফুরী পর্যন্ত পৌঁছায় না। যেমন আমলগত বিদ‘আত, তাহলে এমন বিদ‘আতীর জানাযা পড়া যাবে। আর যদি কোন ব্যক্তি আক্বীদাগত এমন কোন বিদ‘আত করে যার কারণে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। তাহলে তার জানাযা পড়া যাবে না। যেমন, জাহমিয়্যাহ, মু`তাযিলা, শী‘আ ইত্যাদি। এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর ভবিষ্যতে (মুনাফিকদের) কোনো লোক মারা গেলে তার (জানাযা) ছালাত তুমি কখনই আদায় করবেনা এবং তাদের কবরের পাশে কখনও দাঁড়াবেনা। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফুরী করেছে এবং তারা কুফুরী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে (তাওবা, ৮৪)।

প্রশ্ন (১১) : কী আমল করলে হজ্জের নেকী পাওয়া যায়?

-মিনা, দিনাজপুর।

উত্তর : যে সকল আমল করলে হজ্জের নেকী পাওয়া যায় তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি হল। (১) বিদ্যা অর্জনের জন্য বা শেখানোর জন্য মসজিদে গেলে। আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন কল্যাণকর বিষয় শেখার জন্য বা শেখানোর জন্য মসজিদে সকাল করে সে পরিপূর্ণ উমরার ছওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি কোন কল্যাণকর বিষয় শেখার জন্য বা শেখানোর জন্যে সন্ধ্যা করে, সে পরিপূর্ণ হজ্জের ছওয়াব পাবে’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৩১১; মাজমাঊয যাওয়ায়েদ, ১/৩২৯ পৃঃ, হা/৪৯৯)। (২) ওযূ করে মসজিদে গমন করলে। আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ)  বলেছেন, ‘যে নিজের ঘর হতে ওযূ করে ফরয ছালাতের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে, তার ছওয়াব একজন ইহরামধারী হাজীর ছওয়াবের সমান’ (সূনানে আবুদাঊদ, হা/৫৫৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৩৫৮; মিশকাত, হা/৭২৮)। (৩) মসজিদে জামা‘আতের সাথে ফজরের ছালাত আদায় করে সূর্য উঠা পর্যন্ত যিকির করলে অতঃপর দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করলে (সূনানে তিরমিযী, হা/৫৮৬; মিশকাত, হা/৯৭১)।

প্রশ্ন (১২) : ছালাতে কাতারের ডান পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ কোন ফযীলত আছে কি?

-আব্দুর রহমান

গেদীপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : হ্যাঁ, কাতারের ডান পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে বিশেষ কিছু ফযীলত আছে। বারা ইবনু আযেব (রাঃ) বলেন, যখন আমরা রাসূলের পিছনে ছালাত আদায় করতাম তখন তার ডান দিকে দাঁড়ানো পসন্দ করতাম, যেন তিনি সালাম ফিরানোর পরে আমাদের দিকে মুখ করে বসেন (আবুদাঊদ, হা/৬১৫)। আয়েশা (রাঃ) বলেন, নিশ্চয় কাতারের ডান দিকের (মুছল্লীর) উপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা দু‘আ করেন (আবুদাঊদ, হা/৬৭৬; ইবনু হিব্বান, হা/২১৬০)।

 

প্রশ্ন (১৩) : যে সকল মহিলা ছালাত আদায় করে না, তাদের হাতের রান্না খাওয়া যাবে কি?

-আব্দুর রহমান

গেদীপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ছালাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যার উপরে নির্ভর করে অন্যান্য ইবাদত। ঋতু ও নিফাস অবস্থা ব্যতীত যেকোন সময়ে, যেকোন স্থানে ছালাত আদায় করতে হবে। ছালাত আদায় না করলে সে কাফের হয়ে যায়। তবে ছালাত আদায় করে না এমন মহিলার রান্না খাওয়া যায়। কেননা খাওয়ার জন্য খাদ্য হালাল হওয়া শর্ত। রান্নাকারী মুসলিম হওয়া শর্ত নয়। অবশ্য এক্ষেত্রে তাকে ছালাত আদায়ের প্রতি জোরালো তাগিদ এবং উপদেশ দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং পরিবারের লোকদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও’ (তাহরীম, ৬)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘দ্বীন হল, মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা করা’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪২; মিশকাত, হা/৪৯৬৬)। অতএব, তার কল্যাণের জন্য বারবার ছালাত আদায়ের উপদেশ দিতে হবে।

প্রশ্ন (১৪) : জুমআর দিনে সর্বাগ্রে মসজিদে প্রবেশের ফযীলত কী?

-আক্বীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : জুম‘আর দিনে আগমনের ব্যাপারে হাদীছটি পাঁচটি সময়ের কথা বলা হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৫০)। জুম‘আর দিন সূর্য উঠার পর থেকে খুতবা শুরু হওয়া পর্যন্ত সময়কে হাদীছের দৃষ্টিকোণে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। তার প্রথম সময়ে যারা মসজিদে আসবে তারা উট দানের ফযীলত পাবে। দ্বিতীয় সময়ে যারা আসবে তারা গরু দান করার ফযীলত পাবে। তৃতীয় সময়ে যারা আসবে তারা ছাগল দান করার ফযীলত পাবে। চতুর্থ সময়ে যারা আসবে তারা বন্য মুরগী দান করার ফযীলত পাবে এবং পঞ্চম বা শেষ সময়ে যারা আসবে তারা ডিম দান করার ফযীলত পাবে (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৫০)।

প্রশ্ন (১৫) : মেয়েদের ঋতু হলে মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে কি?

-হুমায়রা আক্তার

সৈয়দপুর, নীলফামারী।

উত্তর : মেয়েদের ঋতু হলেও তারা মসজিদে যেতে পারবে। তবে তারা ছালাত আদায় করতে পারবে না। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি ঋতুবতী হয়ে পড়লে রাসূল (ছাঃ)  বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ছাড়া হজ্জের বাকী সব অনুষ্ঠান পালন করার জন্য আমাকে নির্দেশ দিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৯৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১২১১; মিশকাত, হা/২৫৭২)।

প্রশ্ন (১৬) : অমুসলিমদের মৃত্যু সংবাদ শুনলে কোন দুআ পড়তে হবে?

-আবুল হাশেম, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : অমুসলিমদের মৃত্যু সংবাদ শুনে ‘ইন্না লিল্লা-হি ওয়া ইন্না ইলাইহি রা-জি’ঊন’ পড়া যায়। কেননা মৃত্যুর পর সকল মানুষই আল্লাহর নিকট ফিরে যায়। আর এ সম্পর্কিত আয়াতের (বাক্বারাহ, ১৫৬) সারমর্মও এটাই। এর দ্বারা কোন আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশ করা উদ্দেশ্য নয় (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ১/৩৭৫ পৃঃ)।

প্রশ্ন (১৭) : ছেলে-মেয়েতে বিবাহ করতে ইচ্ছুক। কিন্তু পারিবারিকভাবে যেকোন এক পক্ষ রাজি নন। এমতাবস্থায় বিবাহ বৈধ হবে কি?

-সাদিয়া, ফেনী।

উত্তর : বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য মেয়ের পিতা বা অভিভাবক এবং দু’জন সাক্ষী থাকা শর্ত । আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বলেন, ‘কোন নারী অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করলে তা বাতিল, বাতিল, বাতিল’ (আবুদাঊদ, হা/২০৮৩; মিশকাত, হা/৩১৩১)। আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘অভিভাবক ছাড়া বিবাহ সিদ্ধ নয়’(আবুদাঊদ, হা/২০৮৫; মিশকাত, হা/৩১৩০; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪০৭৫)। ছেলের পক্ষ থেকে কারো রাজি থাকা শর্ত নয়। বরং ছেলে রাজি থাকলেই বিবাহ বৈধ হয়ে যাবে। তবে উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিবাহ হওয়া ভালো। এতে পারিবারিক দ্বন্দ্ব হতে মুক্ত থাকা যায়।

প্রশ্ন (১৮) : বিবাহের ক্ষেত্রে যে কোন এক পক্ষের দুজন সাক্ষী হলে বিবাহ বৈধ হবে কি?

-সাদিয়া, ফেনী।

উত্তর : বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য কোন পক্ষ লাগে না। বরং দু’জন মুসলিম সাক্ষী হিসাবে থাকা আবশ্যক (ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪০৭৫)। এ সময় দু’জন পুরুষ না থাকলে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলার সাক্ষীই যথেষ্ট। বর্তমানে কাজীর বিবাহ রেজিষ্ট্রি খাতায় চারজন সাক্ষী রাখা হয় যা শরী‘আতকে অমান্য করার শামিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দু’জন পুরুষ সাক্ষী রাখো, যদি দু’জন পুরুষ না থাকে, তোমাদের পসন্দ মত একজন পুরুষ এবং দুইজন মহিলা সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট হবে’ (বাক্বারাহ, ২৮২)।

প্রশ্ন (১৯) : এক ওযূতে দুই ওয়াক্তের ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : এক ওযূতে একাধিক ওয়াক্তের ছালাত আদায় করা যাবে। কেননা প্রত্যেক ছালাতের পূর্বে ওযূ করা শর্ত নয়। বরং ওযূ থাকা শর্ত। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ওযূ ছাড়া ছালাত হবে না’ (আবুদাঊদ, হা/১০১; ইবনু মাজাহ, হা/৩৯৮ মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৫১৮)। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল (ছাঃ)  এক ওযূতে একাধিক ওয়াক্তের ছালাত আদায় করেন। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি এতদিন যা করেননি আজ তা করলেন। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই তা করেছি’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৭৯)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যতক্ষণ ওযূ থাকবে ততক্ষণ সেই ওযূতে ছালাত আদায় করতে পারবে।

প্রশ্ন (২০) : জানাযার ছালাতে ভুলক্রমে পাঁচ তাকবীর হওয়াতে কি ছালাত বাতিল হয়ে যাবে? বাতিল হলে করণীয় কী?

-আব্দুল মোমিন

পশ্চিম মাদার বাড়ী, চট্টগ্রাম।

উত্তর : জানাযার ছালাতে ভুলক্রমে পাঁচ তাকবীর হওয়াতে ছালাত বাতিল হবে না। কেননা জানাযার ছালাত পাঁচ তাকবীরেও পড়া যায়। আব্দুর রহমান ইবনু আবু লায়লা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়েদ ইবনু আরক্বাম (রাঃ) ছালাতুল জানাযায় চার তাকবীর বলতেন। এক জানাযায় তিনি পাঁচ তাকবীরও বললেন। আমরা তখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, রাসূল (ছাঃ)  পাঁচ তাক্ববীরও দিয়েছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৫৭; আবুদাঊদ, হা/৩১৯৭; তিরমিযী, হা/১০২৩; মিশকাত, হা/১৬৫৩)। উল্লেখ্য যে, জানাযার ছালাতে ভুল হলে কিংবা কোন অংশ ছুটে গেলে তার সংশোধন করা লাগে না। কারণ ঈদের ছালাতের ন্যায় জানাযার ছালাতে ভুল হ’লে ক্বাযা করার প্রয়োজন নেই। ইবনু ওমর (রাঃ) সহ অন্যান্যরা এমনটি বলেছেন (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/৪৪৪ পৃঃ ‘জানাযার ছালাত’ অনুচ্ছেদ)।

প্রশ্ন (২১) : আইয়ূব (আঃ) তার স্ত্রীকে কেন প্রহার করতে চেয়েছিলেন?

-নির্দিষ্ট লাইব্রেরী এন্ড রিসার্চ সেন্টার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রীকে প্রহার করার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘(আমি তাকে আদেশ করলাম) এক মুষ্টি তৃণ নাও এবং তা দ্বারা আঘাত কর ও শপথ ভঙ্গ কর না। আমি তাকে পেলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল (আমার) অভিমুখী’(ছোয়াদ, ৪৪)। অত্র আয়াত কিংবা কোন ছহীহ হাদীছ থেকে আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রীকে প্রহার করতে চাওয়ার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে তাফসীরে ইবনু কাছীর ও তাফসীরে জালালাইনে তাঁর স্ত্রীকে প্রহার করার তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, যার কোন ছহীহ সূত্র নাই (তাফসীরে ইবনু কাছীর, ৬/৪৮, ৪৯ পৃঃ; তাফসীর জালালাইন, পৃঃ ৩৮৬)। সুতরাং কোন দুর্বল সূত্রের ভিত্তিতে নবীগণের উপরে কোনকিছু বলা যাবে না। বরং আল্লাহ যেমন অস্পষ্ট রেখেছেন, তেমন অস্পষ্ট রাখাই উচিত।

 

 

 

 

প্রশ্ন (২২) : ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে কি জুলেখার বিবাহ হয়েছিল?

-ফজলে রাব্বী

মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে জুলেখার বিবাহ হয়েছিল কি-না, সে সম্পর্কে কোন সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। অনেকেই বলেছেন, তার সাথে বিবাহ হয়েছিল এবং তার গর্ভে কয়েকজন সন্তানও হয়েছিল। তার কোন স্পষ্ট প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। সুতরাং প্রমাণ ছাড়া এই জাতীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহই ভাল জানেন।

প্রশ্ন (২৩) : আমি যখন বাসায় ফরয ছালাত আদায় করি তখন আমার স্ত্রী পেছনে মুক্তাদী হিসাবে ছালাত আদায় করে। এতে কি জামাআতের নেকী পাওয়া যাবে?

-তুরাব হুসাইন

উত্তরা-১০, ঢাকা।

উত্তর : কারণবশত কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বাড়ীতে জামা‘আত করে ছালাত আদায় করলে জামা‘আতের নেকী পাবে (ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৫-৬৪৬; মিশকাত, হা/১০৫২)। তবে পুরুষদেরকে মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করতে হবে এটাই শারঈ বিধান (ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৪; মিশকাত, হা/১০৫৩; আবুদাঊদ, হা/৫৫৪; মিশকাত, হা/১০৬৬)।

প্রশ্ন (২৪) : একজন আলেম বলেন, ‘ইবরাহীম (আঃ) কাবা গৃহ নির্মাণের পর অতিরিক্ত ইট-বালি সম্পর্কে মহান আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ বলেন, সেগুলো আকাশের দিকে উড়িয়ে দাও। সেগুলো দুনিয়ার যেখানে যেখানে পড়বে সেখানে সেখানে মসজিদ নির্মাণ হবে একথার সত্যতা আছে কি?

উত্তর রামপুর উন্মুক্ত, ইসলামী পাঠাগার

পতœীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : একথার কোন সত্যতা নাই। এটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কাহিনী।

প্রশ্ন (২৫) : ওযূর অঙ্গগুলো তিনবারের বেশী ধৈত করা যাবে কি? তিনবার ধৈত করা হল কি-না এমন সন্দেহ হলে করণীয় কী?

-আক্বীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ওযূর অঙ্গগুলো তিনবারের বেশী ধৈত করা যাবে না। জনৈক বেদুঈন রাসূল (ছাঃ) -এর নিকট আগমন করে ওযূ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। রাসূল (ছাঃ)  তাকে তিনবার করে দেখালেন। অতঃপর বললেন, ‘ওযূ এরূপ, যে এর অতিরিক্ত করল, সে মন্দ কাজ, সীমালঙ্ঘন এবং যুলূম করল’(নাসাঈ, হা/১৪০; ইবনু মাজাহ, হা/৪২২; মিশকাত, হা/৪১৭)। তিনবার হল কি-না এমন সন্দেহ হলে তৃতীয়বার ধৌত করার প্রয়োজন নেই। কেননা ওযূর অঙ্গ একবার বা দুইবার ধৌত করলেও তা বৈধ হবে (ছহীহ বুখারী, হা/১৫৭-৫৮)।

প্রশ্ন (২৬) : কাপড়ের কোন অংশে পেশাব লাগলে তা কতটুকু ও কতবার ধৌত করলে ছালাত আদায় করা যাবে?

-আব্দুল্লাহ

মাসিমপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : কাপড়ের কোন অংশে পেশাব বা নাপাকী লাগলে ঐ অংশটুকু ধৌত করলেই হবে (মিশকাত, হা/৪৯৪; ছহীহ বুখারী, হা/২৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৯)। পেশাব বা নাপাকী লাগা অংশটুকু ধৌত করার ব্যাপারে কোন সংখ্যা শরী‘আতে উল্লেখ নেই। সুতরাং সন্দেহমুক্ত হওয়ার জন্য তা একের অধিকবারও ধৌত করতে পারবে (আবুদাঊদ, হা/৩৭৪; মিশকাত, হা/৫০১-৫০২)।

প্রশ্ন (২৭) : জনৈক বক্তা বলেন, ‘ক্ববরের শাস্তি না-কি প্রকৃত শাস্তি নয়। বরং এটা স্বপ্নের মত। অর্থাৎ স্বপ্নে বাঘ তাড়া করলে বা সাপ কামড়ালে যেমন আতঙ্ক ও কষ্ট অনুভব হয় ঠিক তেমনি কথাটি কি ঠিক?

-আব্দুর রাকীব

পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ‘কবরের শাস্তি প্রকৃত শাস্তি নয়’ কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কল্পনাপ্রসূত। বরং কবরের শাস্তি অবশ্যই হবে। বারা ইবনু আযেব (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ)  বলেন, ‘মুসলিম যখন কবরে জিজ্ঞাসিত হয়, তখন সে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন হক্ব  মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ)  আল্লাহর রাসূল। আর এটাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِيْنَ آمَنُوْا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِىْ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِىْ الْآخِرَةِ

‘আল্লাহ ঈমানদারগণকে সুদৃঢ় বাক্য দ্বারা অটল রাখেন দুনিয়াবী জীবনে ও আখেরাতে’ (ইবরাহীম, ২৭)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবী করীম (ছাঃ)  বলেন, ‘উক্ত আয়াতটি কবরের আযাব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। মাইয়েতকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমার পালনকর্তা কে? সে বলবে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ এবং আমার নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)   (ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৯৯, ‘তাফসীর’ অধ্যায়, সূরা ইবরাহীম, ২৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ; মিশকাত, হা/১২৫)। তবে কবরের শাস্তি দেখা যায় না এবং শোনাও যায় না। এটা ঠিক স্বপ্নের মত। মানুষ স্বপ্নে যেমন ভীতিকর দৃশ্য দেখে এবং সে স্পষ্ট বুঝতেও পারে কিন্তু পাশের জাগ্রত ব্যক্তি কিছু দেখতে পায় না এবং উপলব্ধিও করতে পারে না।

প্রশ্ন (২৮) : একাধিকবার হজ্জের প্রয়োজন আছে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : হজ্জ জীবনে একবারই ফরয (সূরা আলে ইমরান ৯৭)। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)   আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, হে মানবম-লী! আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর হজ্জ ফরয করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ্জ কর। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তা কি প্রত্যেক বছরই? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)   চুপ থাকলেন, এমনকি সে তিনবার জিজ্ঞেস করল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বললেন, আমি যদি হ্যাঁ বলতাম তবে তা ফরয হয়ে যেত; কিন্তু তখন তোমাদের আদায় করার সাধ্য হত না। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা আমাকে অধিক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাক! কেননা, তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা বেশি প্রশ্ন করার কারণে এবং তাদের নবীদের সাথে মতবিরোধ করার কারণেই ধ্বংস হয়েছে। অতএব আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ে নির্দেশ দিব, তখন তা সাধ্যমত পালন করবে এবং যে ব্যাপারে নিষেধ করব, তা পরিত্যাগ করবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৭; মিশকাত হা/২৫০৫)। তবে নফল হিসাবে একাধিকবারও হজ্জ করতে পারে।

প্রশ্ন (২৯) : ছালাতে একই সূরা বারবার পড়া যাবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : ছালাতে একই সূরা বা একই আয়াত বার বার পড়া যায়। আবু যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)   রাতে ছালাতে দাঁড়ালেন এবং একটি মাত্র আয়াত পড়তে পড়তে ভোর করে ফেললেন। আয়াতটি হল,

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

অর্থ : ‘(হে আল্লাহ!) যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন। তারা আপনার দাস। আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান’(মায়েদাহ ১৮; নাসাঈ হা/১০১০; ইবনু মাজাহ হা/১৩৫০; মিশকাত, হা/১১০৫)।

প্রশ্ন (৩০) : শ্বশুর-শাশুড়ীকে আব্বা-আম্মা বলা যাবে কি?

-মিলন হোসাইন

রহিমানপুর, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : শ্বশুর-শাশুড়ীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে আব্বা-আম্মা বলা যায়। কেননা যে হাদীছে অন্যকে পিতা বলতে নিষেধ করা হয়েছে তার অর্থ হল, নিজের পিতা ব্যতীত অন্যকে নিজ পিতা বলে স্বীকৃতি দেয়া। আর তা হারাম। কেননা এ সময় সে কাফের হয়ে যায় (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৬১) এবং জান্নাতও তার জন্য হারাম হয়ে যায় (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩২৬)। তবে শ্বশুর-শাশুড়ীকে আব্বা-আম্মা বলা হয় মূলত সম্মানের খাতির; স্বীকৃতি স্বরূপ নয়। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)   ইবনু আব্বাস ও আনাস (রাঃ)-কে আদর করে ‘ইয়া বুনাইয়া’ বা ‘হে আমার ছেলে’ বলতেন (আবূ দাঊদ, হা/১৯৪০; নাসাঈ, হা/৩০৬৪; ইবনু  মাজাহ, হা/৩০২৫; মিশকাত হা/২৬১৩; তিরমিযী, হা/২৬৯৮; মিশকাত হা/৪৬৫২)। বদরের যুদ্ধে মু‘আয ও মু‘আউওয়ায নামক দুই তরুণ প্রবীণ ছাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে ‘আউফ (রাঃ)-কে ‘ইয়া ‘আম্মে’বা ‘হে চাচাজী’ বলে সম্বোধন করেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩১৪১)। অবশ্য পালকপুত্র পালনকর্তাকে পিতা বলে স্বীকৃতি দিতে পারবে না। প্রয়োজনে খাতা-কলমে নিজ পিতার নামই উল্লেখ করবে এবং পালকপুত্র যুবক হলে পালিত মাতাকে তার থেকে পর্দা করতে হবে।

প্রশ্ন (৩১) : আমাদের সমাজের কোন লোক মারা গেলে আগে খানা-পিনার ব্যবস্থা করা হত। বর্তমানে তার পরিবর্তে মসজিদে টাকা দেওয়া হয়। মৃত ব্যক্তির জন্য এটা করা কি বৈধ হবে?

রশিদুল ইসলাম

খানসামা, দিনাজপুর।

উত্তর : মৃত ব্যক্তির নামে মসজিদসহ যেকোন সঠিক আক্বীদার প্রতিষ্ঠানে বা অসহায় পুরুষ-নারীকে ছাদাক্বা করলে সে তার প্রতিদান পাবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ) -কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ! আমার পিতা মারা গেছেন এবং সম্পদ রেখে গেছেন। কিন্তু তিনি অছিয়ত করে যাননি। এগুলো যদি তার জন্য ছাদাক্বা করা হয় তাহলে কি তার গুনাহ মাফ হবে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বললেন, হ্যাঁ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩০; ইবনু মাজাহ, হা/২৭১৬; )। আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা একজন লোক এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)  ! আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু কোন অছিয়ত করে যাননি। আমার ধারণা তিনি কথা বলতে পারলে ছাদাক্বা করতেন। এখন আমি তার পক্ষ থেকে ছাদাক্বা করলে তিনি নেকী পাবেন কি? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১০০৪; মিশকাত, হা/১৯৫০)।

উল্লেখ্য যে, মৃত ব্যক্তির নামে মসজিদের মুছল্লীদেরকে খাওয়ানো ঠিক নয়। কারণ সেখানে ধনী-গরীব সর্বপ্রকার মানুষ থাকে। আর ধনীদের জন্য ছাদাক্বা খাওয়া ঠিক নয়। বরং মসজিদের উন্নয়নকল্পে দান করা উচিত।

প্রশ্ন (৩২) : কোন কারণে ঈদের ছালাত ছুটে গেলে করণীয় কী?

-সাগর আলী

আলীনগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : কোন কারণে ঈদের ছালাত ছুটে গেলে (৭+৫=১২ তাকবীরে) দু‘রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিবে। একবার আনাস বিন মালেক (রাঃ)-এর কারণ বশত ঈদের ছালাত ছুটে গেলে তিনি তার গৃহের সকলকে নিয়ে যাবীয়্যাহ নামক স্থানে শহরবাসীর ন্যায় তাকবীরসহ ছালাত আদায় করেন (ছহীহ বুখারী, ‘কারো ঈদের ছালাত ছুটে গেলে সে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, অনুরূপ মহিলারাও এবং যারা বাড়ীতে কিংবা গ্রামে থাকে’ অনুচ্ছেদ-২৫; ‘ঈদায়েন’ অধ্যায়-১৩)।

 

 

প্রশ্ন (৩৩) : কোন হিন্দু ব্যক্তি মুসলিম হওয়ার পরপরই মারা গেলে আল্লাহ কি তার পাপ ক্ষমা করবেন?

-সুজন আলী

আলীনগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : হ্যাঁ, এমতাবস্থায় আল্লাহ তার পাপ ক্ষমা করবেন। কেননা কেউ ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে তার পূর্বের সকল গোনাহ মিটে যায়। আমর ইবনুল ‘আছ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসূল (ছাঃ) -এর খেদমতে হাযির হলাম। অতঃপর বললাম, আপনি আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, যাতে আমি বায়‘আত করতে পারি। রাসূল (ছাঃ)  তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু আমি আমার হাত গুটিয়ে নিলাম। তখন রাসূল (ছাঃ)  বললেন, কী ব্যাপার হে আমর! আমি বললাম, আমি শর্ত করতে চাই। তিনি বললেন, কী শর্ত করতে চাও? আমি বললাম, যেন আল্লাহ আমার গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি বললেন, তুমি জান না আমর! ‘ইসলাম’ তার পূর্বেকার সকল কিছু বিদূরিত করে দেয়, ‘হিজরত’ তার পূর্বেকার সকল কিছুকে বিনাশ করে দেয় এবং ‘হজ্জ’ তার পূর্বের সবকিছুকে বিনষ্ট করে দেয় (ছহীহ মুসলিম, হা/১২১; ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/২৫১৫; ছহীহ আল-জামে‘, হা/১৩২৯; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১০৯৭; বায়হাক্বী, হা/১৮৯৯০; মিশকাত, হা/২৮)।

প্রশ্ন (৩৪) : মুছল্লীদের স্মরণ রাখার সুবিধার্থে মসজিদের দেয়ালে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লিখে রাখা যাবে কি?

-খালিদ বিন খাইরুল

গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : মসজিদে কিংবা গৃহের দেয়ালে মুছল্লীদের দৃষ্টিতে আসে এমন কারুকার্য খচিত নকশা তা ‘কালেমা’ হোক অথবা কুরআনের আয়াত হোক কোন কিছুই রাখা যাবে না। কেননা এগুলো ছালাতের একগ্রতা বিনষ্ট করে। আয়েশা ম থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) একটি চাদরে ছালাত আদায় করলেন, তাতে নকশা করা ছিল। নকশাগুলোতে তার দৃষ্টি পড়ল। ছালাত শেষ হলে তিনি বললেন, এই চাদরটি তোমরা আবু জাহমের কাছে নিয়ে যাও এবং তার কাছ থেকে আম্বিজানিয়া চাদর নিয়ে আস। কারণ এর নকশাগুলো এখনই আমাকে আমার ছালাত থেকে অমনোযোগী করে দিয়েছে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৩, ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৬)।

প্রশ্ন (৩৫) : ক্বিয়ামতের দিন কাবা, মসজিদ, মাদরাসা ও কুরআন মাজীদ অক্ষত থাকবে মর্মে কোন ছহীহ হাদীছ আছে কি?

-খালিদ বিন খাইরুল

গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : না, এ মর্মে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। বরং ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ ব্যতীত পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এমর্মে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে যে, ‘ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। শুধু তোমার রব যিনি মহিমাময়, মহানুভব তিনি ব্যতীত’(সূরা আর-রহমান, ২৬-২৭)। মসজিদ ধ্বংস হবে না মর্মে বর্ণিত হাদীছটি জাল (তাবারানী আওসাত, সিলসিলা যঈফা, হা/৭৬৫)।

প্রশ্ন (৩৬) : আত্মরক্ষার জন্য কাউকে মেরে ফেললে পাপ হবে কি?

-আবু তালহা বিন নজরুল ইসলাম

আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, পবা, রাজশাহী।

উত্তর : আত্মরক্ষাকারী যদি সম্পূর্ণ নির্দোষ হয় এবং কেউ তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতে আসে, তাহলে জীবন বাঁচানোর জন্য প্রতিপক্ষকে মেরে ফেললে গোনাহ হবে না। বরং প্রতিপক্ষ মারা গেলে সে জাহান্নামে যাবে এবং আত্মরক্ষাকারী মারা গেলে সে শহীদ বলে গণ্য হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি কোন লোক এসে জোর পূর্বক আমার মাল ছিনিয়ে নিতে চায়, তখন আমি কী করব? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তুমি তাকে তোমার মাল দিয়ো না। লোকটি বলল, যদি সে আমার উপর আক্রমণ করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বললেন, তুমিও তার উপর আক্রমণ করবে। লোকটি বলল, যদি সে আমাকে হত্যা করে ফেলে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বললেন, তখন তুমি হবে শহীদ। লোকটি বলল, যদি আমি তাকে হত্যা করে ফেলি? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  বললেন, সে হবে জাহান্নামী (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০; মিশকাত, হা/৩০১৩)।

প্রশ্ন (৩৭) : ছালাত আদায়কালে সিজদা কয়টা দিলাম তাতে মাঝে মধ্যে সন্দেহ হয়। এমন ক্ষেত্রে করণীয় কী?

-আব্দুস ছামাদ

মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : ছালাতে সিজদা কম হয়েছে বলে সন্দেহ হলে সিজদা করে নিতে হবে। তারপর শেষে সাহু সিজদা দিয়ে সালাম ফিরাবে। কেননা রুকূ-সিজদা ছুটে গেলে রাক‘আত বাতিল হয়ে যায় (ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/৫৩৯; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৫৩৭)।

প্রশ্ন (৩৮) : হারাম উপার্জনকারী দাওয়াত দিলে ও হাদিয়া দিলে তা গ্রহণ করা যাবে কি?

-আব্দুস সামী

গঙ্গাচড়া, রংপুর।

উত্তর : অবৈধ উপার্জনকারী দাওয়াত ও হাদিয়া দিলে তা গ্রহণ করা যাবে না। কেননা, এর মাধ্যমে অবৈধ উপার্জনকে ঘৃণা করা হয় ও অবৈধ উপার্জনকারীকে শিক্ষা দেয়া হয়। পক্ষান্তরে, হাদিয়া গ্রহণ করার মাধ্যমে অবৈধ উপার্জনে সহযোগিতা করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অন্যায় কাজে সহযোগিতা করো না’ (মায়েদাহ, ২)।

 

 

প্রশ্ন (৩৯) : সাধারণ মানুষের কবরকে বলা হয় কবর’, পীর সাহেবদের কবরকে বলা হয় মাযার’, আর রাসূল (ছাঃ)-এর কবরকে বলা হয় রওযা বিভিন্ন ব্যক্তির কবরকে এভাবে নামকরণ করা কি সুন্নাত সম্মত?

-ড. গোলাম মোর্তুজা

পদ্মা আবাসিক এলাকা, রাজশাহী।

উত্তর : না, বিভিন্ন ব্যক্তির কবরকে এভাবে নামকরণ করা সুন্নাত নয়। বরং ব্যক্তি যিনিই হোক না কেন তার দাফনকৃত স্থানকে কবর বলাই যথেষ্ট। এমনকি রাসূল (ছাঃ)-এর কবরকেও কবর বলা হয় (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৯০)। উল্লেখ্য যে, রাসূল (ছাঃ)-এর ঘর থেকে মসজিদে নববীর মিম্বার পর্যন্ত জায়গাটুকুকে রওযা বলা হয় (বুখারী, হা/১১৭৫; মুসলিম, হা/১৩৯০)। অতএব রাসূল (ছাঃ)-এর কবরকে রওযা বলাটা ভুল। আর ‘মাযার’ অর্থ ‘যিয়ারতের কেন্দ্র’। এটা মানুষের দেয়া পরিভাষা। সুন্নাহর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। বরং তা বিদ‘আতের পর্যায়ভুক্ত।

প্রশ্ন (৪০) : এশার ছালাতের পর ইসলামী সভা-সম্মেলন ও আলোচনা সভা করা যাবে কি?

-ড. গোলাম মোর্তুজা

পদ্মা আবাসিক এলাকা, রাজশাহী।

উত্তর : এশার ছালাতের পর ইসলামী সভা-সম্মেলন ও আলোচনা সভা করা যায়। রাসূল (ছাঃ) এশার ছালাতের পরে ছাহাবীদের সাথে প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা বলতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৬০০; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৪০)। তাছাড়া বিশেষ কোন দিনে দীর্ঘক্ষণ ইসলামী আলোচনা বা বক্তব্য পেশ করা শরী‘আত সম্মত। রাসূলুল্লাহ ধও কোন কোন সময় দীর্ঘ সময় ভাষণ দিয়েছেন। আমর ইবনু আখত্বাব আনছারী (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)  আমাদেরকে ফজর ছালাত আদায় করিয়ে মিম্বরে উঠলেন এবং আমাদের সম্মুখে ভাষণ দিলেন। ভাষণ একটানা যোহর পর্যন্ত চলল। অতঃপর মিম্বর হতে তিনি নামলেন এবং যোহরের ছালাত আদায় করলেন। ছালাত শেষ করে আবার মিম্বরে উঠে ভাষণ দিলেন, এমনকি আছরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। তখন মিম্বর হতে নেমে আছরের ছালাত আদায় করলেন। আছরের ছালাত শেষ করে তিনি পুনরায় মিম্বরে উঠে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি সেই সমস্ত বিষয়গুলো আমাদেরকে অবহিত করলেন, যা কিছু ক্বিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিত হবে। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী, যে ঐ দিনের কথাগুলো বেশি বেশি স্মরণ রেখেছে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৯২; মিশকাত, হা/৫৯৩৬)। তবে এশার পরে অহেতুক বাজে গল্প-গুজব করা যাবে না। কেননা রাসূল (ছাঃ) এশার পূর্বে নিদ্রা যাওয়া এবং পরে কথা বলা অপসন্দ করতেন (ছহীহ বুখারী হা/৫৪৭; ছহীহ মুসলিম হা/৬৪৭; মিশকাত, হা/৫৮৭)। উল্লেখ্য যে এশার পর এত গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা করা ঠিক নয় যাতে ফজরের ছালাতে উঠতে সমস্যা হতে পারে। এ বিষয়ে আয়োজন কমিটির সচেতন হওয়া যরূরী।

 

প্রশ্ন (৪১) : আমার ভিটা-বাড়ীতে ও মাঠে কিছু জমি আছে। কিন্তু আমার দুই মেয়ে ছাড়া আর কোন সন্তান নেই। তাই যদি ভিটা-বাড়ীর জমিটুকু মেয়েদেরকে এবং মাঠের জমিটুকু ভাতিজাদেরকে দেই, তাহলে কি তা বিধিসম্মত হবে?

-মনিরুল ইসলাম

তালা, সাতক্ষীরা।

উত্তর : মালিক জীবিত থাকাকালীন অংশীদারদেরকে অংশহারে সম্পদ বণ্টন করে দিতে পারে (ছহীহ বুখারী হা/২৬৫০; ছহীহ মুসলিম হা/১৬২৩)। অতএব, ভাতিজা ও মেয়েদের সাথে পরামর্শ করে তিনি ভিটা-বাড়ী ও আবাদী জমি বণ্টন করতে পারেন।

প্রশ্ন (৪২) : জায়নামাযে মক্কা-মদীনার ছবি আছে। তাতে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-আকীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : এ ধরনের জায়নামাযে ছালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা নকশাদার জায়নামাযে ছালাতের একাগ্রতা বিনষ্ট হয়। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) একটি চাদরে ছালাত আদায় করলেন, তাতে নকশা করা ছিল। নকশাগুলোতে তার দৃষ্টি পড়ল। ছালাত শেষ হলে তিনি বললেন, এই চাদরটি তোমরা আবু জাহমের কাছে নিয়ে যাও এবং তার কাছ থেকে আম্বিজানিয়া চাদর নিয়ে আস। কারণ এর নকশাগুলো এখনই আমাকে আমার ছালাত থেকে অমনোযোগী করে দিয়েছে’(ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৩, ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৬)। উক্ত হাদীছে রাসূল (ছাঃ) পুনরায় ছালাত আদায় করেছেন, এর কোন প্রমাণ নেই। বিধায় নকশাদার চাদর বা কার্পেটে ছালাত আদায় করলে ছালাত হয়ে যাবে। তবে ছালাত থেকে মুছল্লীকে অমনোযোগী করে দেয় এমন রং বেরংয়ের নকশাদার জায়নামায, চাদর বা কার্পেট পরিহার করা একান্ত কর্তব্য। কারণ রাসূল (ছাঃ) ছালাত পুনরায় আদায় না করলেও সাথে সাথে চাদর সরিয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৬)। অতএব, সারাবিশ্বে মসজিদগুলোর মেঝে যেভাবে নকশাদার টাইলস ব্যবহার করা হচ্ছে এবং রং-বেরংয়ের যেসব কার্পেট ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বর্জন করা উচিত।

প্রশ্ন (৪৩) : জনৈক বক্তা বলেছেন, ‘বাচ্চারা যেহেতু কোন সূরা জানে না, সেহেতু তাদের গলায় তাবিজ ঝুলানো যাবে।কথাটি কতটুকু সঠিক?

-হাসিনুর রহমান

পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : তাবিজ ব্যবহার করা শিরক। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো, সে শিরক করল’ (মুসনাদে আহমাদ, ৪/১৫৬, হা/১৭৪৫৮; সিলসিলাহ ছহীহাহ, হা/৪৯২, সনদ ছহীহ)। উক্ত হাদীছে ছোট-বড়, কুরআন জানা- না জানার মাঝে কোন পার্থক্য করা হয়নি। বরং ছোটদের ব্যাপারে স্পষ্টভাবে হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ)  أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ  পড়ে হাসান ও হুসাইনকে ফুঁক দিতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৭১)। তাই ছোট বাচ্চারা কুরআন পড়তে পারে না, এই অসীলায় তাদের গলায় তাবিজ ঝুলানো জায়েয নয়। বরং পিতা-মাতা সূরা নাস, ফালাক্ব ও উল্লেখিত দু‘আ পড়ে বাচ্চার গায়ে ফুঁক দিবে।

প্রশ্ন (৪৪) : লুডু, দাবা এবং ক্যারাম খেলা যাবে কি?

-রবিউল ইসলাম

শান্তাহার, বগুড়া।

উত্তর : না, খেলা যাবে না। কেননা লুডু, দাবা এবং ক্যারাম খেলা শরী‘আতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও হারাম। সুলায়মান ইবনু বুরায়দা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি লুডু খেলল, সে যেন তার হাতকে শুকরের রক্ত ও মাংসে রঙ্গিন করল’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬০৩৩)।  অন্য বর্ণনায় আছে, তার হাতকে শুকরের রক্তে-মাংসে মাখিয়ে নিল’ (সুনানে বায়হাক্বী, হা/২১৪৭৭)। ইবনু কুদামা (রহিঃ) বলেছেন, শতরঞ্জ বা দাবা খেলা নিষিদ্ধ হওয়ার দিক থেকে লুডু খেলার মতই (আল মুগনী, ১৪/১৫৫)। আলী ইবনু আবু তালেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি একদিন কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, তারা শতরঞ্জ বা দাবা খেলছে। তখন তিনি বললেন, তোমরা কী এসব মূর্তির সামনে বসে আছো? (ইরওয়াউল গালীল, ১/৫৩২)।

ক্যারাম পরবর্তীতে আবিষ্কৃত জঘন্য এক খেলা। যার মাধ্যমে সময় অপচয় হয়, আল্লাহর স্মরণ থেকে অমনোযোগী করে তোলে। এর মাধ্যমে শারীরিক কোন ব্যায়ামও হয় না। তাই এসব খেলা অনর্থক হিসেবে গণ্য। এ কারণে তা হারামের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘কিছু মানুষ রয়েছে, যারা মানুষকে আল্লাহ্র পথ থেকে গোমরাহ করার জন্য অন্ধভাবে অবান্তর কথা সংগ্রহ করে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি‘ (সূরা লুকমান, ৬)।

প্রশ্ন (৪৫) : পর্দার ব্যবস্থা ছাড়া কোন পুরুষ শিক্ষক কি মহিলাদের আরবী শিক্ষা দিতে পারে?

-হাসিনুর রহমান

পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : না, পারে না। কেননা পর্দা করা এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত (সূরা নূর, ৩০-৩১)। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীর সুরক্ষার একমাত্র মাধ্যম (সূরা আহযাব, ৫৯)। কারও জন্যই জায়েয নয় এই বিধান লঙ্ঘন করা। পর্দার ব্যবস্থা নেই, এমন পরিবেশে পুরুষ কর্তৃক নারীদের শিক্ষা দেওয়া যাবে না। হোক তা আরবী ভাষা কিংবা অন্য যে কোন শিক্ষা। এমনকি পর্দা লঙ্ঘন করে, কুরআন শিক্ষা দেওয়াও জায়েয নয়। অনুরূপভাবে পুরুষ শিক্ষকের সামনে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে শিক্ষার্থী, নারী শিক্ষিকার সামনে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে শিক্ষার্থী কিংবা ছেলে-মেয়ের একই বসে শিক্ষাগ্রহণ করা শরী‘আত অনুমোদন করে না। জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম (নারীর উপর) হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়া সম্পর্কে। তখন আমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ করলেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২১৫৯)। যেখানে সামান্য সময়ের জন্য নারীর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার অনুমতি রাসূল (ছাঃ) দিলেন না, সেখানে সারাক্ষণ দৃষ্টি বিনিময় করে শিক্ষা দেওয়া কীভাবে জায়েয হতে পারে? (!)

প্রশ্ন (৪৬) : বই-পুস্তকে পা লাগলে অনেকে তাতে চুমু খায়। আবার কুরআন মাজীদ পড়া শেষে তাতে চুমু খায়। এভাবে চুমু খাওয়া কি জায়েয?

-আকীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : কুরআন মাজীদ, হাদীছের কিতাবসহ অন্যান্য যে কোন বই সম্মানিত বস্তু। তাই লক্ষ রাখতে হবে, কোনভাবে যেন সেগুলোর অসম্মান না হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহর নিদর্শনাবলীর সম্মান করল, তা মূলত অন্তরের তাক্বওয়ার পরিচায়ক’ (সূরা আল হজ্জ, ৩২)। সতর্ক থাকার পরেও যদি কোনভাবে তাতে পা লেগে যায়, তাহলে তাকে উঠিয়ে চুমু খেতে হবে, এমন কোন প্রমাণ শরী‘আতে পাওয়া যায় না। আবার পড়ার শুরুতে বা শেষে চুমু খেতে হবে কিংবা বুকে লাগাতে হবে, এরও কোন প্রমাণ ছাহাবী, তাবেঈদের যুগে পাওয়া যায় না। বরং এমন আমল নেকীর আশায় করলে তা বিদ‘আত হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; মিশকাত, হা/১৪০)। অবশ্য কুরআন মাজীদ, হাদীছের কিতাব বা যে কোন সম্মানিত বই হাত থেকে পড়ে গেলে কিংবা পা লেগে গেলে অনুতপ্ত হওয়া এবং মনের মধ্যে অনুশোচনাবোধ আসা উচিত। এটাকে মুছীবত বা বিপদ মনে করে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলতে পারে এবং ক্ষমার আশায় ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলতে পারে।

প্রশ্ন (৪৭) : মহিলারা মাথায় সুগন্ধি তেল ব্যবহার করতে পারবে কি?

-মিলন হোসাইন

রহিমানপুর, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : মহিলাদের খুশবু বা সুগন্ধি হলো যার রং প্রকাশ পাবে এবং ঘ্রাণ গোপন থাকবে। আর পুরুষের খুশবু হল যার রং গোপন থাকবে আর ঘ্রাণ প্রকাশ পাবে (তিরমিযী, হা/২৭৮৭; নাসাঈ, হা/৫১১৭-১৮; মিশকাত, হা/৪৪৪৩, সনদ ছহীহ)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে নারীরা সাধারণত সুগন্ধিপূর্ণ জিনিস ব্যবহার করতে পারবে না। বরং তা পুরুষরা ব্যবহার করবে। তবে নারীরা বাড়ীতে ব্যবহার করলে তাতে দোষের কিছু নেই। কেননা পুরুষদেরকে জুম‘আর ছালাতে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহারের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে ‘যদিও তার স্ত্রীর সুগন্ধি থেকে হয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৪৬; আবু দাঊদ, হা/৩৪৪)। হাদীছ থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, রাসূলের যুগে বাড়ীতে মহিলাদের সুগন্ধি থাকত। তবে যদি বাড়ীতে মাহরাম নয় এমন কেউ থাকে, তাহলে তা ব্যবহার করতে পারবে না। সেই সাথে সুগন্ধময় কোন কিছু ব্যবহার করে বাড়ীর বাইরে যেতে পারবে না। আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে নারী আতর ব্যবহার করে মানুষের পাশ অতিক্রম করল, যেন তারা তার আতরের ঘ্রাণ পায়, সে নারী ব্যভিচারিণী’ (নাসাঈ, হা/৫১২৬; ছহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৬৮১)।

প্রশ্ন (৪৮) : ছালাতে সালাম ফিরানোর সাথে সাথে উঠে যাওয়া যাবে কি?

-আকীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : সালাম ফিরানোর পরপরই উঠে যাওয়া যাবে না। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) যখন ছালাতের শেষে সালাম ফিরাতেন, তখন তিনি ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ পড়তেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯২; মিশকাত, হা/৯৬০)। এছাড়া তিনি আরো অনেক যিকির-আযকার করতেন। এতে প্রমাণিত হয়, রাসূল (ছাঃ) সালাম ফিরানোর সাথে সাথে উঠতেন না। তবে যরূরী কারণ থাকলে সংক্ষিপ্ত ছানা বা ‘আল্লাহু আকবার’, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ, আসতাগ্ফিরুল্লাহ, আস্তাগ্ফিরুল্লাহ’; ‘আল্লাহুম্মা আন্তাস্ সালামু ওয়া মিন্কাস্ সালামু, তাবারকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ ইত্যাদি বলে উঠে যেতে পারে।

প্রশ্ন (৪৯) : ছালাতের প্রথম রাকআতের কিরাআত দীর্ঘ এবং দ্বিতীয় রাকআতে সংক্ষিপ্ত করতে হবে, এমন কোন প্রমাণ আছে কি?

-আকীমুল ইসলাম

জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : প্রথম রাক‘আতে ক্বিরাআত দীর্ঘ এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে ক্বিরাআত সংক্ষিপ্ত করার পক্ষে বহু প্রমাণ রয়েছে।  আবু ক্বাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেন, নবী (ছাঃ) যোহরের প্রথম দুই রাক‘আতে সূরা ফাতিহা ও অন্য দুটি সূরা পড়তেন। প্রথম রাক‘আতে ক্বিরাআত দীর্ঘ করতেন। আর দ্বিতীয় রাক‘আতে ক্বিরাআত সংক্ষিপ্ত করতেন। কখনো কখনো কোন আয়াত শুনিয়ে দিতেন। আর আছর ছালাতে সূরা ফাতিহা ও অন্য দুটি সূরা পড়তেন। প্রথম রাক‘আতে ক্বিরাআত দীর্ঘ করতেন। আর ফজরের প্রথম রাক‘আতে ক্বিরাআত দীর্ঘ করতেন এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে ক্বিরাআত সংক্ষিপ্ত করতেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৯; নাসাঈ, হা/৯৭৬; ইবনে খুযায়মা, হা/৫০৪)। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) জুম‘আর দিন ফজরের ছালাতে প্রথম রাক‘আতে সূরা সাজদা এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরা দাহর পড়তেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৮৯১; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৭৯)। আর এটা সবার জানা যে, সূরা সাজদার দৈর্ঘ্য তিন পৃষ্ঠা এবং সূরা দাহরের দৈর্ঘ্য দুই পৃষ্ঠা। বিতর ছালাতে তিন রাক‘আতে যথাক্রমে পড়তেন সূরা আ‘লা, সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাছ (তিরমিযী, হা/৪৬৩; ইবনে মাজাহ, হা/১১৭৩, ছহীহ)।

প্রশ্ন (৫০) : আমাদের জামে মসজিদের ভিতরে একদিকে আল্লাহ এবং অপরদিকে মুহাম্মাদ লেখা আছে। এটার অপসারণ নিয়ে ইমাম ও কমিটির মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। এক পর্যায়ে তাদের চরম গোঁড়ামির কারণে ইমাম ইস্তফা দিয়ে চলে যায়। এখন ঐ মসজিদে ছালাত আদায় করা জায়েয হবে কি?

-মুস্তাকীম বিল্লাহ

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : মসজিদ, মাদরাসা, গেট, বাস, ট্রাক, ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ইত্যাদির মধ্যে একপাশে ‘আল্লাহ’ ও অপরপাশে ‘মুহাম্মাদ’ লেখা জায়েয নয়। আরবীতে ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ একসাথে লেখার কোন দলীল কুরআন ও হাদীছের কোথাও পাওয়া যায় না। পরবর্তীতে ইসলামের দুশমনরা মুসলিমদের আক্বীদাকে ধ্বংস করার জন্য এর আবিষ্কার করে। খ্রিস্টানেরা যেমন তাদের ধর্মের প্রকৃত বিধশ্বাসকে লঙ্ঘন করে তিন ইলাহতে বিশ্বাস করে এবং ইয়াহুদীরা বিশ্বাস করে দুই ইলাহতে। মুসলিমদেরকে সেই পথের পথিক বানানোর কৌশল হিসাবে তারা এভাবে একসাথে ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ লেখার প্রচলন করেছে। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘আল্লাহই মুহাম্মাদ, মুহাম্মাদই আল্লাহ’, (নাউযুবিল্লাহ) যা স্পষ্ট শিরক। তাই এ ধরনের বাক্য লেখা সম্পূর্ণরূপে হারাম। কোন মসজিদে এই বাক্য লেখা থাকলে যরূরীভিত্তিতে তা অপসারণ করতে হবে। কিন্তু যদি তা অপসারণ করা নিয়ে দ্বন্দ্ব বেধে যায় এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি তা অপসারণ না করে, তাহলে সকল পাপের দায় দায়িত্বশীলদের কাঁধে বর্তাবে। তবে উক্ত মসজিদে ছালাত আদায় করা যাবে।