সওয়াল-জওয়াব


ঈমান-আক্বীদা


প্রশ্ন (১) : আমরা তো জানি যে, ইসলামের ছোট-খাটো যেকোনো বিষয় অস্বীকার করা কুফুরী। এখন ইসলামের ইখতেলাফপূর্ণ বিষয়গুলোর একটিকে স্বীকার করে ভিন্ন মতটিকে অস্বীকার করা কি ফুফুরী হবে? কেননা ভিন্ন মতটিও সঠিক হতে পারে।

-আকিবুল ইসলাম
রেলগেইট, ফেনী।

উত্তর : ইসলামের যে সমস্ত বিধানের ব্যাপারে মতভেদের সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে যদি উভয়টি দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হয় তাহলে যেটি বেশি যুক্তিযুক্ত তা পালন করতে হবে। আর যদি এমনটি হয় যে, একটি দলীল দ্বারা সাব্যস্ত আর অপরটি প্রবৃত্তি অনুযায়ী হয়েছে। সে ক্ষেত্রে দলীল দ্বারা সাব্যস্ত বিষয়টি গ্রহণ করতে হবে আর অপরটি পরিহার করতে হবে। আর যদি কোনো মুজতাহিদ ইজতেহাদের মাধ্যমে কোনো ফতওয়া দিয়ে গিয়েছেন যা পরবর্তীতে ভুল সাব্যস্ত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি পাপী হবেন না বরং নেকী পাবেন। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন বিচারক ইজতেহাদ করে বিচার করে এবং তা ঠিক হয় তখন দুই নেকী পান আর যদি ভুল হয়ে যায় তবুও এক নেকী পান ( ছহীহবুখারী, হা/৭৩৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৬)। তবে যদি তার অনুসারীরা জেনে-বুঝেও সঠিকটাকে অস্বীকার করে ভুলটিকে গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে তারা বড় ধরনের কুফরী করল। যা মূলত ঈমান ভঙ্গের কারণ। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘তুমি তাদের মাঝে আল্লাহ যা অবর্তীণ করেছেন সে অনুযায়ী সমাধান প্রদান করো এবং তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না (আল-মায়েদা, ৫/৪৯)। অতএব একজন ‍মুসলিম হিসাবে উচিত হবে দলীল সম্মত বিষয় গ্রহণ করা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ পরিহার করা।


প্রশ্ন (২) : আক্বীদা বিশুদ্ধ না হলে সব আমল বাতিল। কিন্ত কারো যদি মাতুরিদী আক্বীদা থাকে তার ইবাদাত কি কবুল হবে বা সে কি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে? এই আক্বীদা থাকলে সে কি জান্নাতে যেতে পারবে?

-শামসুজ্জামান
ছাতক, সুনামগঞ্জ।

উত্তর : যারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে আবূল মানসূর মাতুরিদীর অনুসারী তাদেরকে মাতুরিদী বলা হয়। আর তারা আল্লাহর গুণাবলির দূরবর্তী ব্যাখ্যা করে। যে সকল লোক মাতুরিদী আক্বীদায় বিশ্বাসী তাদের আমল যদি শরীয়া সম্মত হয় তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে, অন্যথায় তা পরিতাজ্য বলে বিবেচিত হবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ   ‘যে কেউ এমন আমল করল যা আমার দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত নয় তা পরিতাজ্য’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬০; ছহীহ ‍মুসলিম, হা/১৭১৮)। আর যদি তা শরীয়া অনুযায়ী না হয় তাহলে তা বিদ’আত বলে গণ্য হবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘তোমরা নতুন জিনিস আবিষ্কার করা হতে বিরত থাক। কেননা প্রত্যেক নতুন জিনিসই হলো বিদ’আত। আর প্রত্যেক বিদ’আতের পরিণাম ভ্রষ্টতা। আর প্রত্যেক ভ্রষ্টাতা মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; মিশকাত, হা/১৬৫)। তাদের মাঝে এমন কোনো কর্ম পাওয়া যায় না যার মাধ্যমে তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। বিধায় তাদেরকে ইসলাম থেকে খারিজ করা যাবে না। তবে তাদের কিছু আক্বীদা শরীয়া বিরোধী হওয়ায় তারা পাপী হিসাবে গণ্য হবে যা আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। যদি তিনি চান মাফ করবেন অন্যথায় শাস্তি দিবেন। তাদের জান্নাত-জাহান্নামে যাওয়ার বিষয়টিও অনুরুপ।


প্রশ্ন : (৩) কোনো মুসলিম ঈসা (আলাইহিস সালাম) (যিশু খ্রিষ্টের) -এর  জন্মদিন (বড় দিন) উদযাপন করলে তাকে ঈমানদার বলা যাবে কি?

-আব্দুর রহমান
দিনাজপুর।

উত্তর : ইসলামে নবী-রাসূল, আলেম-উলামা বা যে কোনো ব্যক্তির জন্মদিন পালনের কোনো বিধান বর্ণিত হয়নি। আর দলীল ছাড়া ইবাদত বিদ’আত বলে গন্য হবে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এ দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু আবিষ্কার করল যা আমাদের শরীয়ার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)। তা ছাড়া বড় দিন পালন করা এটা খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় অনুষ্টান। আর বিধর্মীদের যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান করা, পূজার প্রসাদ খাওয়া, গান-বাজনায় অংশগ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম। অন্য ধর্মের কোনো শিআর বা প্রতিকের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে অংশ গ্রহন করা স্পষ্ট কুফরী। আর মনে ঘৃণা পোষণ করে শরীক হলে হারাম হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা বিধর্মীদের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহন করো না, তারা চায় তোমরা তোমাদের দ্বীন থেকে বিচ্ছুত হও’ (আলে ইমরান, ৩/১১৮)। তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীন তালাশ করে, তার কোনো আমল গ্রহণ করা হবে না। সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে’ (আলে ইমরান, ৩/৮৫)।

বর্তমানে একটি স্লোগান প্রচলিত আছে, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। মূলত এ স্লোগান সামনে রেখেই অনেক মুসলিম নামধারীরা বিধর্মীদের উৎসবে শরীক হয় যা ঈমান ধ্বংসের দারপ্রান্তে পৌছে দেয়। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মদিনায় আসলেন তখন দেখতে পেলেন মদিনাবাসীরা দুইটি দিনে উৎসব পালন করছে। এ দেখে তিনি তাদের বললেন, ‘এই দুইটি কীসের দিন? তারা বলল, জাহেলী যুগ থেকে আমরা এ দুই দিনে উৎসব পালন করে থাকি। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তা’আলা তোমাদের এ দুই দিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। সে দিন দুটি হলো ঈদুল আযহা এবং ঈদুল ফিতর’ (মিশকাত, হা/১৪৩৯)।


প্রশ্ন : (৪) ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে কেন আল্লাহ তা‘আলা আসমানে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন? তার প্রার্থনার কারণে না-কি আল্লাহর ইচ্ছায়?

-আব্দুল্লাহ
ঢাকা।

উত্তর : ইয়াহূদীদের হত্যা ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলা নিজ ইচ্ছায় ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে জীবিতাবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা (ইয়াহূদীরা) ষড়যন্ত্র করল। আর আল্লাহ কৌশল অবলম্বল করলেন। আল্লাহ মহাকৌশলী। স্বরণ করুন, যখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ঈসা! নিশ্চয় আমি আপনাকে জীবিতাবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিব’… (আলে ইমরান, ৩/৫৫)।


শিরক


প্রশ্ন : (৫) নতুন বাড়ি নিমার্ণের সময় মাটিতে রক্ত দেওয়া কি জায়েয?

-আজিজুল্লাহ
মাহিগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : নতুন বাড়ি নিমার্ণের সময় অপশক্তি বা অশরীরিকে কল্পনা করে রক্ত প্রবাহ করা বৈধ হবে না। বরং তা হবে স্পষ্ট শিরক। কারণ সকল রক্ত প্রবাহ আল্লাহর জন্য হতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসূল আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ এ সবকিছু জগৎসমূহের রবের জন্য’ (আল-আন’আম, ৬/১৬২)। তিনি অন্যত্র বলেন, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় এবং কুরবানী করুন’ (আল-কাওছার, ১০৮/২)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে… যা নির্দিষ্ট আস্তানায় যবেহ করা হয় (আল-মায়েদা, ৫/৩)। আলি (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহ অভিসাপ করেছেন; যে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য যবেহ করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৭৮)। তবে বাড়িকে শয়তানের সকল প্রকার অনিষ্ঠতা থেকে সংরক্ষিত রাখার জন্য সূরা আল-বাক্বারা পড়তে  হবে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের বাড়ি-ঘরকে কবরস্থান বানিয়ো না, নিশ্চয় শয়তান সে বাড়ি থেকে পলায়ন করে যে বাড়িতে সূরা আল-বাক্বারা তেলাওয়াত করা হয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৭৮০)।


পবিত্রতা- ওযূ- বীর্য


প্রশ্ন (৬) : স্বপ্নদোষ হওয়ার কারণে পোশাকে বীর্য লেগে রয়েছেএই বীর্য লেগে থাকা পোশাকে ছালাত হবে?

-নাহিদ আলি
চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : কাপড়ে ময়লা লাগলে যেমন কাপড় ধুয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে ছালাত আদায় করা উত্তম (আল-আ’রাফ, হা/৩১)। তদ্রূপ কাপড়ে বীর্য জাতীয় কিছু লাগলে তা পরিস্কার করে ছালাত আদায় করা উত্তম। বীর্য কাপড়ে শুকিয়ে গেলে তা নখ বা কাষ্ট টুকরা দ্বারা খুটিয়ে ফেলা যথেষ্ট আর যদি তা আদ্র থাকে তাহলে তা ধুয়ে নিতে হবে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাপড়ে লেগে থাকা বীর্য খুটিয়ে উঠিয়ে দিতাম অতঃপর সেই কাপড়ে তিনি ছালাত আদায় করতেন। (আবূ দাঊদ, হা/৩৭২; নাসাঈ, হা/২৯৭; ইবনু মাজাহ, হা/৫৩৭-৫৩৯)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর কাপড় থেকে  বীর্য ধুয়ে দিতাম। অতঃপর তিনি সেই কাপড় পরিধান করে ছালাতের জন্য বের হয়ে যেতেন। ধৌত করা পানির চিহ্ন কাপড়ে লক্ষ্য করা যেত। (ছহীহ বুখারী, হা/২৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৯; নাসাঈ, হা/২৯৬; ইবনু মাজাহ, হা/৫৩৬)।


প্রশ্ন (৭) :  ছালাতে দাঁড়িয়ে একাধিক রাকা’আত পড়ার পর মনে পড়ল আমার ওযূ ছিল না। এমতাবস্থায় করণীয় কী?

-আনোয়ার হোসেন
কাশিমপুর, গাজীপুর।

উত্তর : পূর্ব হতে ওযূ না থাকার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে স্বরণ হলে তৎক্ষণাত ছালাত ছেড়ে দিয়ে পুনরায় ওযূ করে পূর্ণ ছালাত আদায় করবে। এক্ষেত্রে আগের ছালাত বাতিল হিসাবে গণ্য হবে। কেননা ছালাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য পবিত্রতাকে শর্ত করা হয়েছে (আন-নিসা, ৪৩)। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ঐ ব্যক্তির ছালাত কবুল হবে না যার ওযূ ভেঙ্গে গেছে যতক্ষণ সে পুনরায় ওযূ করে ছালাত আদায় না করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৫)। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ওযূ ব্যতীত আল্লাহ ছালাত কবুল করবেন না’। (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৪; তিরমিযী, হা/১৩৯; আবূ দাঊদ, হা/৫৯; ইবনু মাজাহ, হা/২৭৩)।


প্রশ্ন () : ওযূ শুরু করলাম তারপর আমার সন্দেহ হলো যে, ওযূ ভেঙ্গে গেছে। আবার ওযূ করলাম এইভাবে বারবার সন্দেহ হচ্ছে আর বারবার ওযূ করছি এমতাবস্থায় আমার করনীয় কি?

-আব্দুল আওয়াল
-রঘুনাথগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ।

উত্তর : ওযূ করার পর ওযূ ভেঙ্গে গেছে মর্মে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঐ ওযূ ভঙ্গ হবে না এবং সে ওযূ দ্বারা যতো খুশি ছালাত আদায় করবে। সন্দেহের উপর নির্ভর করে বারংবার ওযূ করবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যার ছালাতে ওযূ ভেঙ্গে গেছে মর্মে সন্দেহ হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, لاَ يَنْصَرِفْ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا ‘সে ব্যক্তি যতক্ষণ বায়ু নির্গমণের কোনো আওয়াজ বা গন্ধ না পায় ততক্ষণ যেনো সে ছালাত ছেড়ে না দেয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৬১)। অর্থাৎ ওযূ ভেঙ্গে গেছে এমন সন্দেহ নির্ভর হয়ে যেনো ছালাত ছেড়ে না দেয়। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, সন্দেহের কারণে ওযূ ভঙ্গ হবে না।


ইবাদত- ছালাত


প্রশ্ন (৯) : ফরয ছালাতে দুই ব্যক্তি হলে পাশাপাশি দাঁড়ায় এই দুই ব্যক্তি ফরয ছালাত আদায়ের মাঝে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি আসলে কীভাবে দাঁড়াবে? এক পাশাপাশি না-কি ইমামকে সামনে চলে যেতে হবে?

-নাহিদ আলি
চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : দুই ব্যক্তি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায়রত অবস্থায় তৃতীয় কোনো ব্যক্তি তাদের সাথে ছালাতে শরীক হতে চায়লে ইমাম তার পাশের ব্যক্তিকে পিছনে ঠেলে দিবে। অতঃপর তারা ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে।

জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছালাত আদায় করার জন্য দাঁড়ালেন। আমি এসে তাঁর বাম পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের পেছন দিক দিয়ে আমার ডান হাত ধরলেন। আমাকে ডান পাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর জাবের ইবনু সাখর আসলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাম পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের দুজনের হাত একসাথে ধরে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০১০; মিশকাত, হা/১১০৭) উল্লেখ্য যে, সামনের পূর্ণ কাতার থেকে কোনো মুছল্লিকে টেনে নিয়ে কাতার বদ্ধ হওয়া মর্মে বর্ণিত হাদীছ যঈফ (ত্ববারানী, আল মুজামূল কাবীর, হা/৩৯৪)।


প্রশ্ন (১০) :  ছালাতের শেষ  বৈঠকে পা বিছিয়ে নিতম্ব মাটিতে রেখে বসতে হয়। এটা কি দুই রাকা’আত ছালাতের শেষ বৈঠকেও করতে হবে?

-রেদওয়ানুল কবির রাসেল
সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ছালাত দুই রাকা’আত বিশিষ্ট হোক কিংবা চার রাকা’আত; ছালাতের শেষ বৈঠকে (অর্থাৎ যে বৈঠক শেষে সালাম ফেরানো হয়) নিতম্ব মাটিতে রেখে বসা সুন্নাত। যাকে হাদীছের ভাষায় تورك (তাওয়াররুক) বলা হয় (ছহীহ বুখারী, তিরমিযী, হা/৩০৪)।


প্রশ্ন (১১) : ছালাতে রুকূ করার সময় চোখ কোথায় রাখবো সিজদার জায়গায় না দুই পায়ের মাঝে?

-মেজবাহ
মাগুরা।

উত্তর : রুকূ অবস্থায় দুই পায়ের মাঝে দৃষ্টি রাখা যাবে না। বরং সিজদার স্থানেই রাখতে হবে। কেননা বৈঠকে বসা অবস্থা ব্যতীত ছালাতের সকল অবস্থায় একজন মুসল্লীর দৃষ্টি সিজদার স্থানে থাকবে। আর বৈঠকে বসা অবস্থায় ডান হাতের ইশারারত শাহাদাত আঙ্গুলির প্রতি থাকবে (নাসাঈ, হা/১২৭৫)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কা’বা গৃহে প্রবেশ করার পর সেখান থেকে বের হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর দৃষ্টি সিজদার স্থান হতে সরাননি (মুসতাদরাক হাকেম, হা/১৭৬১; সুনানুছ-ছুগরা, হা/১৩৬৭)।  ক্বিলাবা (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,  আমি মুসলিম ইবনু ইয়াসারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ছালাতে মুসল্লীর দৃষ্টি কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, তোমার সিজদার স্থানে (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৬৫৬২)।


প্রশ্ন (১২) : ইমামের পিছনে ছালাত পড়লে কি ‘আল্লাহু আকবর’ ‘সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলা ফরয? না বললে ছালাত হবে কি?

-সৌরভ
কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

উত্তর : ইমাম নিযুক্ত করা হয় তার অনুসরণের জন্য। সুতরাং ইমাম যা যা করবে মুক্তাদীদের তা তা করা ফরয। অর্থাৎ ইমাম তাকবীর দিলে মুক্তাদীও তাকবীর দিবে। আনাস ইবনু মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا ، وَإِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوا ، وَإِذَا سَجَدَ فَاسْجُدُوا    ‘ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছে তার অনুসরণের জন্য। অতএব যখন সে তাকবীর দিবে তখন তোমরা তাকবীর দিবে, যখন সে রুকূ করবে তখন তোমরাও রুকূ করবে আর যখন সে সিজদা করবে তখন তোমরাও সিজদা করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৪১১)। তবে ইমাম ‘সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলার সময় ‘সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ না বলে মুক্তাদী তার পরে ‘রব্বানা লাকাল হামদ’ বলবে (ছহীহ বুখারী, ৬৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৪০৪)। সুতরাং স্বচ্ছায় ইমামের পিছনে তাকবীর, তাসবীহ কোনো কিছুই ছাড়া যাবে না। তবে ভুলে যদি ছুটে যায় তাহলে ছালাত হয়ে যাবে। এর জন্য মুক্তাদীকে কোনো সাহু সিজদা দিতে হবে না। কেননা ইমামের পিছনে মুক্তাদীর ব্যক্তিগত ভুলের কারণে সাহু সিজদা নেই।


প্রশ্ন (১৩) : ইমাম সামনে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে এবং মুছল্লীরা পিছনে নিচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-জুয়েল বিন মনিরুল ইসলাম
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : ইমাম উঁচু স্থানে এবং মুক্তাদী ‍নিচু স্থানে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করা যাবে না। আদি ইবনু ছাবেত (রাহিমাহুল্লাহ) জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, একদা আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে মাদায়েনে ছিলেন। ছালাতের জন্য ইক্বামত দেয়া হলে আম্মার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একটি দোকানের উপর (উঁচু স্থান) দাঁড়িয়ে ছালাতের ইমামতি করতে যান, মুক্তাদীগণ নিচু স্থানে দন্ডায়মান ছিলেন। হুযায়ফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) অগ্রসর হয়ে আম্মার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাত ধরে তাকে নীচে নামিয়ে আনেন। আম্মার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ছালাত শেষ করলে হুযায়ফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাকে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেননি, যখন কোনো ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের ইমামতি করবে, সে যেন সমাগত মুছল্লী হতে কোনো উঁচু স্থানে দন্ডায়মান না হয়? তখন ‘আম্মার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উত্তর দিলেন, এ জন্যেই তো আপনি যখন আমার হাত ধরেছেন আমি আপনার অনুসরণ করেছি (নেমে এসেছি) (আবূ দাউদ, হা/৫৯৮)। তবে উপরে ইমামের সাথে দুই-এক কাতার দাঁড়ালে নিচে থাকা মুসল্লিদের ছালাত জায়েয হবে।


প্রশ্ন (১৪) : মাগরিবের আযানের আগ মুহুর্তে মসজিদে ঢুকে কি তাহিয়্যাতুল মসজিদের ছালাত পড়া যাবে?

-ফয়েজউল্লাহ
মিরপুর-১২।

উত্তর : তাহিয়্যাতুল মসজিদ তথা মসজিদে বসার পূর্বে দুই রাকা’আত ছালাতের নিষিদ্ধ কোনো সময় নেই। বরং যেকোনো সময় মসজিদে ঢুকলে তা পড়া যায়। তিন সময় ছালাত পড়া নিষিদ্ধ- ১. সূর্য উদিত হওয়ার সময় ২. সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ৩. সূর্য ঠিক মাথার উপর অবস্থান করার সময়। কেউ যদি এই নিষিদ্ধ তিন সময়েও মসজিদে প্রবেশ করে তার জন্যও বসার পূর্বে দুই রাকা’আত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া আবশ্যক। আবূ ক্বাতাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন সে যেন বসার আগে দুই রাকা’আত ছালাত আদায় করে নেয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৪)।


প্রশ্ন : (১৫) অনেক সময় মসজিদে ছালাত আদায় করতে গিয়ে দেখি ইমাম সাহেব নেই, তার জায়গায় ইমামতি করছে সূদের সাথে জড়িত এমন ব্যক্তি। এমন সময় আমাদের করণীয় কী?

-আজগর আলী
শিবগঞ্জ, চাপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : ইমামতির যোগ্য ব্যক্তি হলেন, কুরআন পাঠে পারদর্শী পরহেজগার ব্যক্তিগণ। আবূ মাসঊদ আনসারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি লোকদের ইমামতি করবেন যিনি আল্লাহর কিতাব পাঠে সবচাইতে অভিজ্ঞ। কুরআন পাঠে যদি সকলেই সমান হয় তবে যিনি তাঁদের মধ্যে সুন্নাহ সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা অভিজ্ঞ। তাতেও যদি সকলে একরকম হয় তবে যিনি আগে হিজরত করেছেন। তাতেও যদি সকলেই সমান হয় তবে যিনি আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৩)। তবে পাপিষ্ঠ ব্যক্তির পিছনে ছালাত হয়ে যাবে। কেননা, ছাহাবায়ে কেরাম ফাসেক ইমামের পিছনেও ছালাত আদায় করেছেন। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহে গিয়ে প্রথমে ছালাত আদায় করতেন। তারপর তিনি লোকদের দিকে ঘুড়ে দাড়িয়ে ওয়াজ করতেন, উপদেশ দিতেন, আদেশ করতেন। আর লোকেরা কাতার বন্দি হয়ে বসে থাকতো। আবূ সাঈদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, লোকেরা এ আমলের উপর ছিল। আমি মারওয়ানের সাথে ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে আসলাম। সে ছিল মদিনার আমীর। আমরা ঈদগাহে আসলে দেখতে পেলাম একটি মিম্বর যা কাছীর ইবনু ছালত বানিয়েছে। মারওয়ান যখন ছালাতের পূর্বেই মিম্বরে উঠতে উদ্দ্যত হল, তখন আমি তার কাপড় টেনে ধরে বাধা দিলাম। সে আমার বাধা উপেক্ষা করে মিম্বরে উঠে ছালাত আদায়ের পূর্বেই খুৎবা দিলেন… (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬)। সূদের কারণে কোনো পাপ হলে তার উপরই বর্তাবে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তারা তোমাদের ইমামতি করে। যদি তারা সঠিকভাবে আদায় করে তাহলে তার ছওয়াব তোমরা পাবে। আর যদি তারা ত্রুটি করে, তাহলে তোমাদের জন্য ছওয়াব রয়েছে, আর ত্রুটি তাদের (ইমামের) উপরই বর্তাবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪; মিশকাত, হা/১১৩৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৯৪৩)।


ইবাদত- যাকাত, ওশর


প্রশ্ন : (১৬) ইতোপূর্বে আমার সকল আবাদী জমিতে ধান চাষ হত। এখন আম চাষ হয়। আমার প্রশ্ন হলো ‘আমরা আগে ধানের ওশর দিতাম। এখন কি আমের ওশর দিতে হবে? যদি দিতে হয় তাহলে আমের ওশর দেওয়ার পদ্ধতি জানাবেন।

-আব্দুন নূর
সাপাহার, নওগাঁ।

উত্তর : সাক-সবজি এবং পচনশীল ফল-মূলের যাকাত আদায় করতে হবে না। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সাক-সবজিতে যাকাত নেই’… (মিশকাত, হা/১৮১৩)। সুতরাং আম পচনশীল ফল হওয়ায় আমের যাকাত আদায় করতে হবে না। তবে কেউ যদি ব্যবসা করার জন্য আমের বাগান করে বা বাগান ক্রয় করে, তাহলে তাকে তার যাকাত আদায় করতে হবে। যখন তার মূল্য নিছাব পরিমাণ হবে তথা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্য হবে এবং এক বছর অতিক্রম করবে, তখন তা থেকে শতকরা আড়াই টাকা যাকাত আদায় করবে। সামুরা ইবনু জুনদুব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের ঐ পণ্যের যাকাত বের করতে আদেশ করতেন যা আমরা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করতাম (মিশকাত, হা/১৮১১)।


প্রশ্ন (১৭) : অফিস থেকে ঋণ নিয়ে কিছু টাকা নগদ প্রদান করে ফ্ল‍্যাট ক্রয় করেছি এখন আরো ১০ লক্ষ টাকা পাবে। এই টাকা পরিশোধ করার জন্য আমি আমার নামে ব‍্যাংকে একটি ডিপিএস খুলেছি এবং মাসিক ১১ হাজার টাকা করে একাউন্টে জমা করছি। আগামী বছর ডিপিএসের মেয়াদ শেষ হবে তখন ফ্ল‍্যাট মালিককে টাকা দিব। এই অবস্থায় ডিপিএসের টাকার উপর যাকাত দিতে হবে কি?

-খন্দকার মামুন আফসার
ভাষানটেক, ঢাকা।

উত্তর : প্রথমত ডিপিএস একাউন্ট খোলাই জায়েয নয়। কেননা তা সুষ্পষ্ট সূদের সাথে সম্পৃক্ত। আর সূদী কারবার সম্পূর্ণভাবে হারাম। আল্লাহ তা’আলা বলেন, أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সূদকে করেছেন হারাম’ (আল-বাক্বারা, ২/২৭৫)। দ্বিতীয়ত যদি ডিপিএস এ জমাকৃত টাকা নেসাব পরিমাণ হয় এবং উক্ত নেসাবের উপর পূর্ণ এক বছর অতিক্রম হয়ে যায় তাহলে, বছরান্তে উক্ত টাকার মূলধনের উপর ২.৫% যাকাত প্রদান করতে হবে। আর যদি বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে ঋণ পরিশোধ করে দেয় তাহলে যাকাত প্রদান করতে হবে না। সুতরাং ঋনগ্রস্ত ব্যক্তিদের উচিত হবে বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায় করে দেওয়া। সায়েব ইবনু ইয়াযিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, উছমান ইবনু আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন, এই মাস (মাহে রমযান) যাকাত আদায়ের মাস। ঋণগ্রস্তদের উচিত তাদের ঋণ শোধ করে দেওয়া, যাতে অবশিষ্ট সম্পদের যাকাত আদায় করে নেওয়া যায় (মুয়াত্ত্বা মালেক, হা/৮৭৩)। উক্ত হাদীছ প্রমাণ করে যে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে এবং  বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই ঋণ পরিশোধ না করে দেয়, তাহলে বছরান্তে যাকাত আদায় করতে হবে।


ইবাদত- হজ্জ-উমরা


প্রশ্ন (১৮) : আমার উপর হজ্জ ফরয হয়নিআমি কি উমরা করতে পারব? জনৈক ব্যক্তি বলেন, কারো যদি হজ্জ করার সামর্থ্য না থাকে সে কখনো উমরা করতে পারবে না। কথাটি কতটুকু সত্য?

-বেলকুচি
সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : একজন জ্ঞানসম্পন্ন মুসলিম ব্যক্তি চায়লে যেকোনো সময়ে উমরা পালন করতে পারে। উমরা করার জন্য যেমন পূর্বে হজ্জ করা জরুরী নয় তদ্রূপ প্রাপ্ত বয়স হওয়াও জরুরী নয়। বরং হজ্জে গেলে হজ্জের পূর্বে হাজীগণকে উমরা আদায় করতে হয় অথচ তখনো তারা হজ্জ পালন করেনি। ইক্বরিমা ইবনু খালেদ (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনু ইমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)–কে হজ্জ পালনের পূর্বে উমরা পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। ইক্বরিমা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আরো বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ্জ পালনের পূর্বে উমরা পালন করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৭৭৪)। অপর বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে চারবার উমরা পালন করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৭৭৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১২৫৫-২১৯৭)। উল্লেখ্য যে, নাবালেগ সন্তান যার উপর ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ কিছুই ফরয হয়নি সে চায়লেও হজ্জ, উমরা করতে পারে। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রওহা নামক স্থানে একদল আরোহীর সাক্ষাৎ পেলেন এবং তিনি বললেন, তোমরা কোন সম্প্রদায়ের লোক? তারা বলল, আমরা মুসলিম। তারা জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল। এরপর এক মহিলা তাঁর সামনে একটি শিশুকে তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করল, এর জন্য হজ্জ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ; এবং তোমার জন্য এর ছওয়াব রয়েছে। (ছহীহ মুসলিম, ‘শিশুর হজ্জ শুদ্ধ অধ্যায়’ হা/১৩৩৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৮-৩১৮৭ )।


ইবাদতজানাযা, কাফনদাফন


প্রশ্ন (১৯) : যারা বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা যায়, তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা হারিয়ে যায়। তাদের গোসলের বিধান কী?

-সাজিবুল ইসলাম
গাজিপুর।

উত্তর : এমন ব্যক্তিকে যদি গোসল করানো সম্ভব হয় তাহলে গোসল করাতে হবে। আর যদি দূর্ঘটনার কারণে এমনভাবে বিভৎস হয়ে যায় বা পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় যাকে গোসল করানো অসম্ভব বা গোসল করালে গলে যাবে ইত্যাদী। তাহলে এমন মৃত ব্যক্তিকে তায়াম্মুম করিয়ে কাফন দিতে হবে। কেননা তায়াম্মুম গোসলের স্থলাভিষিক্ত (আল-মুগনী, ২/২১০ পৃ.; মাজমু’উল ফতওয়া ইবুন বায, ১৩/১২৩ পৃ.; মাজমু’উল ফতওয়া ইবনু উছায়মীন, ১৭/৫০ পৃ.)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ‘যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো’ (আত-তাগাবূন, ১৬)।


প্রশ্ন : (২০) এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মারা গেলে এনজিও থেকে যদি ঋণ মাপ করে দেওয়া হয় তাহলে কি সেই ঋণ মাপ হবে? এবং তারা যে দাফনের জন্য টাকা দেয় সেই টাকা নেওয়া যাবে কি?

-আজিজুল্লাহ
মাহিগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : সূদী এনজিওর সাথে লেনদেন করা হারাম। কোনো ব্যক্তি যদি এমন সূদী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে থাকে তাহলে সে এর জন্য গুনাহগার হবে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে মাফ করে দেয় তাহলে মাফ হয়ে যাবে। সালেম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না, বিপদে ফেলবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে লেগে থাকবে, আল্লাহ তার প্রয়োজনে পাশে থাকবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের কোনো কষ্ট/বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তা’আলা তার থেকে এর বিনিময়ে ক্বিয়ামতের বিপদ থেকে একটি বিপদ দূর করবেন… (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৯৯; মিশকাত, হা/২০৪)। উল্লেখ্য যে, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে যদি সে ব্যক্তি একেবারেই নিঃস্ব হয় তাহলে, তার ছেলে-সন্তানরা সে দায়িত্ব পালন করবে অন্যথায় সরকারী ফান্ড থেকে তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো সূদী এনজিও বা প্রতিষ্ঠান থেকে কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা হলে তা গ্রহণ করা যাবে না।


প্রশ্ন (২১) : জানাযার ছালাত জুতা পরিহিত অবস্থায় আদায় করা যাবে কি? না-কি জুতা খুলে রাখা আবশ্যক? দলীলসহ জানাবেন।

-আকবর আলি
ভারত।

উত্তর : ফরয, নফলসহ যেকোনো ছালাত জুতা খুলে অথবা জুতা পরিহিত উভয় অবস্থায় আদায় করা যাবে, কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুতা পরিহিত অবস্থায় ছালাত আদায় করেছেন’। তবে জুতা যেন অবশ্যই পবিত্র হয়। আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা ছাহাবীদের নিয়ে ছালাত আদায়কালে পায়ের জুতা খুলে ফেললেন। এটা দেখে তারাও তাদের জুতা খুলে ফেলল। তিনি ছালাত শেষে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা জুতা খুললে কেন?’ তারা বলল, আপনি আপনার জুতা খুলে ফেলেছেন তাই আমরাও খুলেছি। তখন তিনি বললেন, ‘জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এসে আমার জুতায় ময়লা লেগে থাকার কথা বলেছেন। তাই আমি আমার জুতা খুলেছি’। অতঃপর তিনি বললেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করে তখন সে যেন তার জুতা দেখে নেয়। আর জুতায় ময়লা লেগে থাকলে তা মুছে নিয়ে ছালাত আদায় করে’ (আবূ দাউদ, হা/৬১০, ‘সনদ ছহীহ; দারেমী’, হা/১৩৭৮;  মিশকাত, হা/৭৬৬)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, পবিত্র জুতা পরিহিত অবস্থায় ছালাত পড়া যায়। তাছাড়া অন্য বর্ণনায় রয়েছে, দাফন শেষে মানুষ যখন কবরস্থান থেকে ফিরে যায়, তখন মৃত ব্যক্তি কবর থেকে মানুষের পায়ের জুতার শব্দ শুনতে পায় (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৩৮; মিশকাত, হা/১২৬)।


ইবাদত- যিকির ও দু’আ


প্রশ্ন (২২) : কেউ যদি সকাল ও বিকাল সূর্যে উঠা ও ডোবার পূর্বে ১০০ বার সুবহা-নাল্ল-হ, ১০০ বার আল-হামদুলিল্লাহ, ১০০ বার আল্লাহু আকবার১০০ বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে তাহলে, সে ১০০ উট, ১০০ জিহাদের ঘোড়া, ১০০ হজ্জ-উমরা ও ১০০ দাস মুক্ত করার নেকী লাভ করবে। এ হাদীছ কি ছহীহ?

-আব্দুল আলিম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : প্রশ্নে  উল্লিখিত হাদীছটি হাসান তথা আমলযোগ্য ও গ্রহণীয় (ইবনু মাজাহ, হা/৩৮১০; ‘হাসান’; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৯৫৬; মু’জামুল কাবীর, হা/১০৭১; আল-মু’জামুল আওসাত্ব, হা/৭৬৯৪)।


পারিবারিক বিধান- পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ


প্রশ্ন (২৩) : বাবা মায়ের প্রতি মেয়েদের কী কী দায়-দায়িত্ব রয়েছে? ভরণপোষণের দায়িত্ব কি মেয়েদের উপর নেই?

সাহিদা আক্তার।

উত্তর : প্রথমত: পিতা-মাতার সেবা-শুশ্রুষা মর্মে বর্ণিত কুরআন ও হাদীছ দ্বারা বোঝা যায় যে, তাদের সেবা-শুশ্রুষার ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের কোনো পার্থক্য নেই। পিতা-মাতার খেদমত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো… অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো’ (আল-ইসরা, ২৩-২৪)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের সন্তানগন তোমাদের পবিত্রতম উপার্জনের অর্ন্তভুক্ত। অতএব তোমরা তোমাদের সন্তানদের উপার্জন হতে ভক্ষণ কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৫ আবূ দাঊদ, হা/ ৩৫৩০; মিশকাত, হা/৩৩৫৪)। আসমা বিনতু আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মা আমার কাছে আসলেন। তিনি ছিলেন মুশরিকা। এ ঘটনা ঐ সময়ের, যখন কুরাইশদের সাথে হুদায়বীয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়েছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমার মা আমার কাছে এসেছেন, তিনি আমার প্রতি আকৃষ্ট। সুতরাং আমি কি তার সাথে সদ্ব্যবহার করব? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তার সাথে উত্তম আচরণ করো’ (মিশকাত, হা/৪৯১৩)। দ্বিতীয়ত: কন্যা সন্তানরা যেহেতু বিবাহের পর স্বামীর বাড়িতে চলে যায় আর ছেলে সন্তানরা পিতা-মাতার সাথে বাড়িতে থাকে এবং পিতা-মাতার সকল দায়িত্ব পালন করে থাকে এবং উত্তরাধিকারী হিসাবেও কন্যার ডবল সম্পদ পেয়ে থাকে তাই ছেলের উপরই পিতা-মাতার খেদমতের মূল দায়িত্ব বর্তায় (আল-মুগনী, ৮/২১৯)। তবে, ছেলে সন্তানের অবর্তমানে মেয়ে তাদের পূর্ণ খেদমত করবে। আর তাদের বর্তমানে মেয়েরা সম্ভবপর তাদের খেদমত করার চেষ্টা করবে।


ইবাদত- মসজিদ নির্মাণ


প্রশ্ন (২৪) : কিছু সংখ্যক বিদ্বেষী মুসলিম হয়েও যারা মসজিদ ভাঙ্গে কিংবা পুড়িয়ে দেয় তাদের জন্য বদ-দুআ করা যাবে কি?

-মো. মাজহারুল ইসলাম
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর : মসজিদ ভেঙ্গে দেওয়ার অর্থ হলো- মানুষকে আল্লাহর ইবাদত হতে বাধা প্রদান করা, মানুষকে মসজিদ বিমূখ বানানো যা কোনো মুসলিমের কাজ হতে পারে না। যারা মুসলিমদের মসজিদ ভাঙ্গবে আল্লাহর ভাষায় তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অত্যাচারী-যালেম। আর যালেমের বিরুদ্ধে মাযলুম ব্যক্তিগণ বদ-দু’আ করতে পারে এবং বদ-দু’আ করলে আল্লাহ তাদের বদ-দু’আ কবুল করবেন। এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদসমূহে তাহার নাম স্বরণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে ধ্বংস সাধনে প্রয়াসী হয় তার অপেক্ষা বড় যালিম কে হতে পারে? ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থা ছাড়া এদের জন্য মসজিদসমূহে প্রবেশ করা বিধেয় নয়। তাদের জন্য ইহকালে লাঞ্ছনা এবং পরকালে রয়েছে মহা-শাস্তি’ (আল-বাক্বারা, ১১৪)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মু’আয (রাযিয়াল্লাহু আনহু)–কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় উপদেশ দিয়ে বললেন, ‘তুমি মাযলুমের বদ-দু’আকে ভয় করবে। কেননা তার বদ-দু’আ আর আল্লাহর মাঝে কোনো অন্তরাল থাকে না অর্থাৎ সরাসরি কবুল হয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯)।


হালাল-হারাম- সূদ, ঘুষ, চাকুরী


প্রশ্ন (২৫) : আমি একটি টিভি চ্যানেলের কম্পিউটর পদে পর্দা মেন্টন করে চাকুরী করি। অতি প্রয়োজনে পুরুষদের সাথে কাজ করতে হয় ও কথা বলতে হয়। আমার এই চাকুরী বৈধ হবে কি? উল্লেখ্য যে, আমার কাজ নাচ-গানের সাথে সম্পৃক্ত নয়।

-মোছাঃ খাদিজা আক্তার।
৩৩৫/১/এ, টিভি রোড রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।

উত্তর : ইসলামে পর-পুরুষের সাথে সহবস্থান করে নারীর জন্য চাকুরীসহ কোনো কাজ করা বৈধ নয় যদিও তা পূর্ণ হিজাবসহ হয়ে থাকে। কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নারী-পুরুষের সহবস্থানকে সরাসরি নাকচ করেছেন। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কোনো (গায়রে মাহরাম) নারী-পুরুষ যেনো নির্জনবাস না করে। কেননা (এমন হলে) তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান’ (মিশকাত, হা/৩১১৮)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের সহবস্থান স্পষ্ট হারাম। আর টিভিতে বিভিন্ন অবৈধ অনুষ্ঠান, গান-বাজনা ইত্যাদী হয়ে থাকে যা স্পষ্ট হারাম। আর এধরণের চ্যানেলে চাকুরী করার দ্বারা এসকল হারাম কাজে সহযোগিতা হয়ে থাকে। আর অন্যায় কাজে সহযোগিতাও হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কল্যাণ ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো এবং পাপ ও নাফরমানীর কাজে সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


প্রশ্ন (২৬) : আমার বাবা ডাক বিভাগে কর্মরত যেখানে হালাল-হারাম মিশ্রিত। একদিকে সূদের কারবার অন্যদিকে নগদ চালু রয়েছে! এমতাবস্থায় আমার বাবার উপার্জন হালাল হবে কি?

-জুলকার
ঢাকা।

উত্তর : সূদী কারবারের সাথে জড়িত কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করা যাবে না। কারণ এটিও পরোক্ষভাবে সূদী কারবারে সহযোগিতার শামিল যা হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যকে সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর’ (আল-মায়েদা, ৫/২)। নূ’মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয় হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। এ দুইয়ের মাঝে রয়েছে অনেক সন্দেহজনক বিষয় যা অনেক মানুষই জানে না। যে ব্যক্তি এ সব সন্দেহজনক বিষয় হতে দূরে থাকল সে তার দ্বীন ও মর্যাদাকে নিরাপদ রাখতে পারল, আর যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়ে জড়ালো হলো সে হারামের মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়ল। সাবধান! প্রত্যেক বাদশারই সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। সাবধান! আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হলো তার হারামকৃত বিষয়সমূহ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২; তিরমিযী, হা/১২০৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৯৮৪)। প্রশ্নের বর্ণনানুসারে যেহেতু উক্ত বিভাগে হালাল-হারাম মিশ্রিত রয়েছে যার সাথে জড়িত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে এবং সে অফিসে কর্মরত থাকায় হারাম বিষয়ে সহযোগিতা করতে হয় তাই ইসলামের নির্দেশনানুযায়ী এমন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী না করে বৈধ পন্থায় রিযিক অন্বেষণ করা উচিত।


প্রশ্ন : (২৭) আমি ওয়েব ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর কাজ করি। ক্লায়েন্টের আবেদনে আমি ওয়েবসাইট ডিজাইনে নারীর ছবি ব্যবহার করি। আমার প্রশ্ন হলো- এই উপার্জন আমার জন্য হালাল হবে কি? উল্লেখ্য যে, আমি যে ডিজাইন করছি তার উদ্দেশ্য সূদ, ঘুষ, মিথ্যা, হারাম পণ্যের প্রচার ও অশ্লিলতা ছড়ানো নয়।

-মাইনুল ইসলাম
আগ্রাবাদ, সিডিএ, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ইনকামের টাকা হারাম হওয়ার জন্য ইনকামের মধ্যে একটি হারাম থাকাই যথেষ্ট বা একটি নারী ছবি অ্যাড দেওয়াই যথেষ্ট, অন্যান্য হারামের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরী নয়। কেননা এই নারীর ছবি যত জন পুরুষ মানুষ দেখবে তত জনই চোখের গুনাহ করে হারাম কাজ করবে এবং সেই গুনাহর একটি অংশ আপনার ঘাড়ে এসে বর্তাবে। আর হারাম কাজে সহযোগিতা করা হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কল্যাণ ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো এবং পাপ ও নাফরমানীর কাজে সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে সৎ আমলের দিকে ডাকবে, যারা তা আমল করবে এবং নেকী পাবে সে তাদের সমপরিমাণ নেকী পাবে। এটা তাদের নেকী থেকে বিন্দু পরিমাণ নেকী কমানো হবে না। আর যে ব্যক্তি মানুষকে পাপের পথ দেখাবে, তার জন্য তাদের সমপরিমাণ পাপ বরাদ্দ থাকবে যারা ঐ পাপের কাজে জড়িয়ে পড়বে। এটা তাদের পাপ থেকে বিন্দু পরিমাণ পাপ হ্রাস করবে না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৪ আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৯)।


প্রশ্ন (২৮) : ইউরোপ/আমেরিকায় বাসা ক্রয় করতে হলে ব্যাংক থেকে লোন নিতেই হয়। এছাড়া বাসা ক্রয় করা সম্ভবই নয়। ক্যাশ টাকা দ্বারা বাসা ক্রয় করলে অনেক সমস্যা হয়এমতাবস্থায় ব্যাংক থেকে কি টাকা লোন নেওয়া জায়েয হবে? আর যারা অভিবাসী হয় তারা ১০০% মিত্যা বলে অভিবাসী হয় এবং অভিবাসী হওয়ার কারণে প্রতিমাসে অভিবাসন ভাতা পায়। এইভাবে অভিবাসী হওয়া কি বৈধ হবে?

-আলিমুদ্দীন
প্যারিস।

উত্তর : . সূদী লোন নিয়ে বাসা-বাড়িসহ কোনো কিছুই করা যাবে না। কেননা সূদ একটি সুস্পষ্ট হারাম বস্তু। একজন মু’মিন-মুসলিম হিসাবে সূদ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। যতোই সমস্যা হোক না কেন সূদের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সূদকে করেছেন হারাম (আল-বাক্বারা, ২/২৭৫)। তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ সূদ মিশ্রিত সম্পদকে সংকুচিত করেছেন’ (আল-বাক্বারা, ২/২৭৬)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভিসাপ করেছেন, ‘সূদ-দাতা সূদগ্রহীতা, সূদের সাক্ষী এবং এর লেখকের উপর এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান পাপী’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮; মিশকাত, হা/২৮০৭)। বিশেষ সুবিধার আশায় মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে অভিবাসি ভাতা গ্রহণ করা যাবে না। কেননা মিথ্যা একটি মহাপাপ। এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা মিথ্যা বলা থেকে বেঁচে থাকো কারণ মিথ্যা অশ্লিলতার দিকে ধাবিত করে আর অশ্লিলতা জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮০৫; মিশকাত, হা/৪৮২৮)। এমন পরিস্থিতিতে হারাম ব্যতীত বৈধ পন্থায় বৈধ অর্থে বাড়ি নিমার্ণ করবে অন্যথায় ভাড়া বাসায় বসবাস করবে।


প্রশ্ন (২৯) : পান কি নেশাদার দ্রব্যের অর্ন্তভুক্ত? পান চাষাবাদ বৈধ হবে কি?

-আব্দুর রহমান
আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : পান চাষ করা যায়। কেননা পান পাতা মূলত হারাম বস্তু নয়। বরং তা খাওয়ার উপাদান হিসাবে নেশাদার বস্তুর মিশ্রণ হারাম। যেমনভাবে খেজুর, আঙ্গুর হালাল বস্তু। কিন্তু তা দ্বারা মদ তৈরি হয় বলেই খেজুর, আঙ্গুর খাওয়া বা চাষ করাকে হারাম বলা যাবে না। আর যা হারাম নয় তাকে হারাম বলা নিষেধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ যেসব পবিত্র বস্তু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন সেগুলোকে হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না (আল-মায়েদা, ৮৭)।


প্রশ্ন (৩০) : ATM বুথের সিকিউরিটির চাকুরী হালাল হবে কি?

-বাসার আলি
চাপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : স্পষ্ট সূদের সাথ সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কোনো পদেই চাকুরী করা যাবে না। কেননা সূদ হারাম বস্তু আর সেই ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করার মাধ্যমে হারাম কাজে সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। হারাম কাজে সহযোগিতা করা হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ‘তোমরা পরস্পর নেকী ও আল্লাহভীতিতে সহযোগীতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কর না’ (আল-মায়েদা, ২)।


পারিবারিক বিধান- বিবাহ-তালাক


প্রশ্ন (৩১) : অবিবাহিত মেয়েকে বিবাহের প্রলোভন দেখিয়ে অবিবাহিত পুরুষ যেনা করে। এখন মেয়েটি গর্ভবতী ছেলেটি ঐ মেয়েটিকে বিবাহ করতে অনিচ্ছুক। ইসলামী শরীয়াতে এর সঠিক সমাধান কী?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : বিবাহের পূর্বে নারী-পুরুষের সকল সম্পর্ক হারাম। সুতরাং তাদের উপর হদ্দ (যেনার নির্ধারিত শাস্তি) প্রয়োগ করতে হবে (আন-নূর, ২৪/২)। আর এই শাস্তি কার্যকরের দায়িত্ব সরকারের। আর তাদের মাঝে বিবাহের বিষয়টি এমন যে, বিচারক তাদের মাঝে বৈবাহিক বন্ধন সৃষ্টির জন্য চেষ্টা করবে বা বিবাহের প্রস্তাব প্রদান করবে। তবে যদি তাদের কেউ বিবাহতে অসম্মতি ব্যক্ত করে তাহলে, জোরপূর্বক তাদের মাঝে বিবাহ করানো যাবে না। উবায়দুল্লাহ ইবনু ইয়াযিদ (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, একজন ছেলে একজন মেয়ের সাথে অপকর্ম করল। অতঃপর উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন মক্কায় আগমণ করলেন তখন তার সামনে এই মামলাটি পেশ করা হলো। তিনি তাদের দুইজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, তারা দুইজন এই অপকর্মের স্বীকারক্তি প্রদান করল। তিনি তাদের দুইজনকে (যেনার শাস্তি) বেত্রাঘাত করলেন এবং তাদেরকে একত্রিত করার (বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার) আশা ব্যক্ত করলেন। ছেলেটি তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন (মুসনাদ আশ-শাফেঈ, হা/৩৮; সুনানুল কুবরা, হা/১৩৬৫৩)।  অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাদের সম্মান ও ইজ্জতের বিষয়টি ভেবে তাদের মাঝে বিবাহ করানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন কিন্তু ছেলে অসম্মতি থাকায় তিনি আর কিছু বলেননি। উল্লেখ্য যে, গর্ভের সন্তানটি ওয়ালাদু-যিনা (যেনার সন্তান) হিসাবে বিবেচিত হবে।ু ই করা্রস্তাবনা হতে /৩৯৮৪


প্রশ্ন (৩২) : স্ত্রী যদি স্বামীকে রাগ করে হোক বা মজাক করে হোক এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক বলে, তাহলে কি তালাক হয়ে যাবে?

-ফজলে রাব্বী
মুহাম্মদপুর, ঢাকা।

উত্তর : না; তালাক হবে না। তালাকের অধিকার একমাত্র স্বামীর। স্ত্রী তালাকের অধিকার রাখে না। অতএব স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিলে তালাক হবে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّمَا الطَّلاَقُ لِمَنْ أَخَذَ بِالسَّاقِ ‘তালাক শুধু সেই দিতে পারে যে চালানোর দায়িত্ব নিয়েছে (তথা স্বামী)’ (ইবনু মাজাহ, হা/২০৮১; ইরওয়ায়ুল গালীল, হা/২০৪১)। তবে স্ত্রী যদি কোনো কারণে স্বামীর সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় তাহলে, উভয় পক্ষের মাঝে সালিশী প্রক্রিয়ায় স্বামীর নিকট হতে পূর্ণ মোহরানা (সম্মতিতে কম-বেশি হতে পারে) ফেরত দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে (আল-বাক্বারা, ২/২২৯)। ছাবেত ইবনু কায়েস এর স্ত্রী রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর  নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ছাবেত ইবনু কায়েসের দ্বীন বা চরিত্রের ক্ষেত্রে দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামে অবাধ্য হওয়াটা অপছন্দ করি। তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘তুমি কি চাও যে, তার বাগান ফিরিয়ে দিতে? যা সে তোমাকে মোহর স্বরুপ দিয়েছিল। উত্তরে বলল, হ্যাঁ। তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘তুমি বাগানটি গ্রহণ করে নাও  এবং তাকে ছেড়ে দাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭৩)।


প্রশ্ন (৩৩) : আমাদের জানা মতে, কোনো মহিলা অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। কিন্তু জনৈক আলেম বলেন, তালাকপ্রাপ্তা মহিলা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নিজে নিজেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এ কথার কোনো ভিত্তি আছে কি?

-মাজহারুল ইসলাম
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর : অলী (অভিভাবক) ব্যতীত বিবাহ বৈধ নয় একথাই ঠিক। হোক না সে কুমারী, বিবাহিতা বা অবিবাহিতা। আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لاَ نِكَاحَ إِلاَّ بِوَلِىٍّ ‘অলী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই’ (তিরমিযী, হা/১১০১; আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৮১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৪৬; দারেমী, হা/২২২৮)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, أَيُّمَا امْرَأَةٍ نُكِحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ ‘অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত কোনো মহিলা বিয়ে করলে তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল’ (আবূ দাউদ, হা/২০৮৩; মিশকাত, হা/৩১৩১)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ করিয়ে দাও’ (আন-নূর, ৩২)। মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার বোনকে এক ব্যক্তির সাথে বিবাহ দেন। কিছু দিন পর ঐ ব্যক্তি তার বোনকে তালাক দিয়ে বিদায় করে দেয়। পরবর্তীতে তারা দুইজন আবার বিবাহ করতে চায়লে মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার অসম্মতি প্রকাশ করে বলেন,  لاَ وَاللَّهِ لاَ تَعُودُ إِلَيْكَ أَبَدًا ‘আল্লাহর ক্বসম! সে তোমার নিকট কখনো ফিরে যাবে না’। তখন আল্লাহ আয়াত নাযিল কলেন, وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يَنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ ‘তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং তারা ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তারা যদি বিধিমত পরস্পর সম্মত হয়, তাহলে স্ত্রীগণ নিজেদের স্বামীদেরকে ‍পুনর্বিবাহ করতে চায়লে তাদেরকে বাধা দিও না’ (আল-বাক্বারা, ২৩২)। মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এখন আমি কি করব? তিনি বললেন, ‘তাকে তার সাথে বিবাহ করিয়ে দাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৩০)। উপরে বর্ণিত আয়াত এবং হাদীছ দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, নারী বিবাহিতা হোক কিংবা অবিবাহিতা তাকে তার অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষেই বিবাহ করতে হবে। অন্যথায় বিবাহ বাতিল হিসাবে গণ্য হবে।


প্রশ্ন (৩৪) : আমি সাহিদা আক্তার। আমার বিয়ে হয় ২০০৯ সালে। বিয়ের ৩ মাস পর থেকে আমার স্বামীর সাথে কোন যোগাযোগ নেই। বিয়েতে তার আসল ঠিকানাও দেয়নি। নকল যে ঠিকানা দিয়েছে ঐ ঠিকানায় আমি কোর্ট থেকে তালাকের কাগজ পাঠাই। ঐ ঠিকানা তো সঠিক না আর তালাকও হচ্ছে না। ইসলামি শরীয়া মোতাবেক আমি ২য় বিবাহ করার জন্য কি করতে পারি?

-তাকরিমা
শ্রীপুর, গাজীপুর।

উত্তর :  কোনো মহিলার স্বামী নিখোঁজ হয়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে এবং সে জীবিত না-কি মৃত কোনোভাবে তা জানতে না পারলে, ঐ মহিলা চার বছর অপেক্ষা করবে। অতঃপর ঐ স্বামীকে মৃত ভেবে চার মাস ১০দিন ইদ্দত পালন করার পর চায়লে অন্যত্র বিবাহ করতে পারে। এক্ষেত্রে তালাক প্রদানের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, أَيُّمَا امْرَأَةٍ فَقَدَتْ زَوْجَهَا فَلَمْ تَدْرِ أَيْنَ هُوَ فَإِنَّهَا تَنْتَظِرُ أَرْبَعَ سِنِينَ ثُمَّ تَعْتَدُّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا ثُمَّ تَحِلُّ ‘যে নারীর স্বামী নিখোঁজ হয়ে যায় এবং জানতে পারে না সে কোথায়। তাহলে সে চার বছর অপেক্ষা করবে। অতঃপর চার মাস ইদ্দত পালন করে হালাল হয়ে যাবে (অর্থাৎ সে এখন অন্যত্র বিবাহ করতে পারে) (মুয়াত্বা মালেক, হা/২১৩৪)। সুতরাং আপনি চাইলে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন।


প্রশ্ন : (৩৫) একবার খোলা নেওয়ার পরে তিন মাসের ভিতরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়বার স্বামী কোর্টের মাধ্যমে তালাক দিয়ে আবার তিন মাসের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়েছে। তৃতীয়বার প্রথমে কোর্টে তালাক দিয়ে একমাস পরে আবার খোলা করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, আবার ফিরিয়ে নেওয়া যাবে কি?

উত্তর : এক. প্রথমবার খোলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ হওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে  ফিরিয়ে নেওয়ার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা যদি নতুন বিবাহ ও নতুন মোহরের মাধ্যমে না করে সরাসরি ফিরিয়ে নিয়ে থাকে তাহলে, তা বৈধ হয়নি এবং পরবর্তী ফিরিয়ে নেওয়া আবার তালাক দেওয়া কোনোটিই শরীয়া সম্মত হয়নি এবং এসবের কোনো ধর্তব্য নেই এবং প্রথম খোলার পরের সকল সম্পর্ক অবৈধ হয়েছে। সুতরাং এখন চায়লে নতুন মোহর নির্ধারণ করে নতুনভাবে বিবাহ করতে পারে। কেননা খোলা তালাক নয় (মাজমুউল ফতওয়া, ৩২/৩০৬ পৃ. আল-ইসতেযকার,৬/৮২ পৃ.)। দুই. প্রশ্নের বর্ণনানুযায়ী যদি প্রথম খোলার পর নতুন মোহর ও বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিয়ে থাকে তাহলে পরবর্তী দুই তালাক হয়েছে। সুতরাং এখন চায়লে আবার নতুন মোহর ও বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তালাক দুইবার অতঃপর হয় স্ত্রীকে বিধিসম্মতভাবে রাখবে অথবা সদ্ভাবে বিদায় দেবে’ (আল-বাক্বারা, ২২৯)। অত্র আয়াত প্রমাণ করে যে, দুই তালাক পর্যন্ত স্ত্রীকে রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে এরপর আবার তালাক দিলে ঐ স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না।


উত্তরাধিকার আইনসম্পদ বণ্টন


প্রশ্ন (৩৬) : বাবার দুইটি ছেলে একটি মেয়ে। বড় ছেলে বাবার অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করায় বাবা ছোট ছেলে ও মেয়েকে সকল সম্পত্তি লিখে দিয়েছে। বাবা কী কাজটি ঠিক করেছে? এর জন্য বাবা কি দায়বদ্ধ থাকবে?

-হাবিব
চিরির বন্দর, দিনাজপুর।

উত্তর : বাবার সম্পত্তিতে সকল সন্তানের অধিকার রয়েছে। এই অধিকার বাবার মৃত্যুর পর সন্তানরা মীরাছ হিসাবে অংশহারে পেয়ে থাকে। তবে তিনটি কারণে ব্যক্তি তার মীরাছের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়- ১. দাসত্ব ২. হত্যা ৩. দ্বীনের ভিন্নতা । এই মর্মে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘মুসলিম কাফেরের উত্তরাধিকারী হয় না। আর কাফের মুসলিমের উত্তরাধিকারী হয় না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৬৪)। অন্যত্র বলেন, ‘হত্যাকারী উত্তরাধিকারী পায় না’ (আবূ দাউদ, হা/৪৫৬৪)। এই তিন কারণ ব্যতীত কাওকো তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যুলুম। আর যদি জীবদ্দশায় লিখে দিতে চায় তবুও ন্যায় সংগতভাবে শরীয়ত নির্ধারিত উত্তরাধিকার বণ্টন নীতিমালা অনুসারে সম্পদ বণ্টন করা আবশ্যক। নু’মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পিতা তার জীবদ্দশায় তাকে একটি গোলাম প্রদান করলেন, অতঃপর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর নিকট তাঁকে এই বিষয়ে সাক্ষী করতে আসলেন, তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পিতাকে বললেন,  أَعْطَيْتَ سَائِرَ وَلَدِكَ مِثْلَ هَذَا » . قَالَ لاَ . قَالَ  فَاتَّقُوا اللَّهَ ، وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلاَدِكُمْ  অর্থাৎ ‘তুমি কি তোমার সকল সন্তানকে অনুরূপভাবে সম্পদ দিয়েছ?’ তার পিতা বললেন, না; রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো, সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করো’ নু’মান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এরপর তিনি ফিরে এসে তার দান প্রত্যাহার করলেন। (ছহীহ বুখারী, হা/২৫৮৭; মিশকাত, হা/৩০১৯)। বাবা-মায়ের সম্মতিসহ বিবাহ করা ভালো। তবে ছেলে সন্তানের জন্য বাবার সম্মতি জরুরী নয়। সুতরাং ছেলে সন্তান বাবার অসম্মতিতে বিয়ে করার কারণে তাকে সম্পদ হতে বঞ্চিত করা শরীয়া সম্মত হয়নি। তাই এর জন্য বাবা দায়বদ্ধ থাকবে। বাবার উচিত পূণরায় সন্তানদের মাঝে ন্যায়-সঙ্গত বণ্টন বাস্তবায়ন করা।


প্রশ্ন (৩৭) : আমার প্রশ্ন- ধরা যাক, মায়ের সম্পত্তি ৪০ শতাংশ। স্বামী, ৩ পুত্র, ১ কন্যা ও ১ মৃত কন্যা রেখে যদি মা মারা যায় তাহলে ৪০ শতাংশ হতে কে কত অংশ জমি পাবে তা কুরআন ও হাদীছ অনুযায়ী জানালে উপকৃত হবো।

-হাফিজুর রাহমান
রাজপাড়া, রাজশাহী।

উত্তর : ইসলামী শরীয়ার উত্তরাধিকার বণ্টন নীতিমালা অনুসারে প্রশ্নোল্লিখিত ৪০ শতাংশ সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে নিম্ন পদ্ধতিতে বণ্টিত হবে। স্বামী ১০% প্রত্যেক ছেলে পৃথক পৃথকভাবে ৮.৫৭% এবং কন্যা ৪.২৮% (আন-নিসা, ১১-১২)। উল্লেখ্য যে, মৃত কন্যা বা মৃত কন্যার কন্যারা কোনো সম্পদ পাবে না। কেননা ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে- ব্যক্তির মৃত্যুর পূর্বে তার কোনো উত্তরাধিকারী মারা গেলে সে উত্তরাধিকারী হবে না। অর্থাৎ ব্যক্তির মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকারী ব্যক্তির জীবিত থাকা আবশ্যক। নচেৎ উত্তরাধিকারী হবে না। ‍


প্রশ্ন (৩৮) : একজন ব্যক্তির চার মেয়ে কোনো ছেলে নেই। এক মেয়ের স্বামী শ্বশুর বাড়িতে থাকে এবং শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা করে (তার নিজ পিতা-মাতা দুনিয়াতে নেই)। বাকি মেয়েরা তাদের কোনো ধরণের দেখাশোনা করে না। শশুর ঐ জামাইকে কিছু জমি দলীল করে দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো- ঐ জামাইকে শশুরের জমি লিখে দেওয়া কতটুকু শরীয়ত সম্মত হয়েছে?

-আতিকুল ইসলাম
দুবাই প্রবাসী।

উত্তর :  অন্যকে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে শরীয়তের মূলনীতি হলো- যে সকল ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে তাদের কোনো একজনকে পৃথকভাবে কেউ সম্পত্তি লিখে দিতে বা অছিয়ত করে যেতে পারবে না। তবে যারা ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হয় না তাদেরকে কেউ চায়লে সম্পত্তি লিখে বা অছিয়ত করে দিতে পারে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৩)। তবে তা যেন এক তৃতীয়াংশের বেশি না হয়।  সা’দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, মক্কায় আমি অসুস্থ থাকা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে দেখতে আসলেন, আমি তাকে বললাম, আমার কিছু সম্পদ রয়েছে আমি আমার সকল সম্পদ অছিয়ত করে দিতে চাই। আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, না;  আমি আবার বললাম, তাহলে অর্ধেক অছিয়ত করে দেই।  তিনি বললেন, না; আমি আবার বললাম, তাহলে এক তৃতীয়াংশ অছিয়ত করে দেই। তিনি বললেন, হ্যাঁ; এক তৃতীয়াংশ ঠিক আছে। এক তৃতীয়াংশই বেশি (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৫৪;  ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৮)। জামাই যেহেতু শশুর-শাশুড়ির উত্তরাধিকারী নয় তাই শশুর-শাশুড়ি চায়লে তাদের সম্পদের এক তৃতীয়াংশ জামাইকে লিখে দিতে পারে। তবে মেয়ের নামে লিখে দিলে অন্যন্য মেয়েদেরকেও সমপরিমাণ লিখে দিতে হবে।


অর্থনৈতিক বিধান-  ব্যবসা-বাণিজ্য


প্রশ্ন (৩৯) : আমার বাবা কিস্তিতে চাউলের ব্যবসা করেন। নগদ বিক্রি করলে কিছুটা কম দামে বিক্রয় করেন, বাকিতে বিক্রি করলে ২০০/৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রয় করেন। এমন ব্যবসা হালাল হবে কি? (ক্রেতা তার সুবিধা অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করেন এর জন্য অতিরিক্ত কোন টাকা দিতে হয় না)।

-আহসানুল হক
কুলনিয়া, দোগাছি, পাবনা।

উত্তর : নগদে কম মূল্যে আর বাকিতে বেশি মূল্যে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতিতে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। তবে এর জন্য মূল্য পরিশোধের সময় নির্ধারিত হতে হবে। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মদীনায় পদার্পণ করলেন, তখন মদীনাবাসীগণ এক, দুই এবং তিন বছরের মেয়াদে বিভিন্ন রকমের ফল ক্রয়-বিক্রয় করতো। তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় করবে, তার উচিত অগ্রিম দেওয়া নির্ধারিত পরিমাপে এবং নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত (ছহীহ বুখারী, হা/২২৩৯; মিশকাত, হা/২৮৮৩)। ইক্বরিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এমন চুক্তিতে কোনো সমস্যা নেই যে, নগদ মূল্যে এত আর বাকি মূল্যে এত (মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বা, হা/২০৮২৬, ২০৮২৭)।


প্রশ্ন (৪০) : অর্থনৈতিক লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে কাগজের মুদ্রা কতটুকু শরীয়া সম্মত?

-হাসান
দক্ষিণ কোরিয়া।

উত্তর : ১. অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মুদ্রা হিসাবে কাগজে নোটের ব্যবহার শরীয়া সম্মত। কারণ ১. বর্তমান বিশ্বব্যাপী প্রচলিত কাগজের মুদ্রা মূলত স্বর্ণ বা রৌপ্যের মূল্যমান যা তাবেঈগণের যুগে উমায়্যা খলীফা আব্দুল মালেক ইবনু মারওয়ান আরবীতে লেখা দীনার (স্বর্ণমুদ্রা), দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা), ফালস (তাম্রমুদ্রা) প্রচলন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় মুদ্রার প্রচলন হয় (আল-মুদাউওয়ানাহ, ৩/২৯ পৃ.)। ২. আর যেকোনো দেশ টাকা তৈরির জন্য তার সমপরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য রিজার্ভ ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর সে মূল্য পরিমাণ কাগজের নোট তৈরি করতে পারে। এ থেকে বুঝা যায় যে, বর্তমান প্রচলিত কাগজের নোটের সতন্ত্র কোনো মান না থাকলেও তার পরিবর্তে জমাকৃত স্বর্ণ বা রৌপ্যের কারণে তা স্বর্ণ বা রৌপ্যের স্থলাভিষিক্ত। অর্থাৎ কাউন্টারে টাকা দিয়ে টিকিট কেটে গেটম্যানকে টাকা না দিয়ে কাগজ দেখিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার মতো। কাগজের নোট লেনদেনের ক্ষেত্রে বর্তমান বিদ্বানগণ এই নোটকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের সাথে তুলনা করেছেন। ইবনু বা’য (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, কাগজের নোট একটি আরেকটির সাথে বিনিময়ের ক্ষেত্রে স্বর্ণ ও রৌপ্যের স্থলাভিষিক্ত (মাজমূ‘উল ফতওয়া ইবনু বা’য, ১৯/১৫৮ পৃ.)। এছাড়াও ইবনু তাইমিয়্যা ও ইবনুল ক্বায়্যুম (রাহিমাহুল্লাহ) স্বর্ণ ও রৌপ্যের সূদের বিষয়টিকে তার মূল্যমান কাগজের নোটের সাথে সংযুক্ত করেছেন (মাজমূ‘উল ফতওয়া ইবনু তাইমিয়্যা, ২৯/৪৭১-৭২ পৃষ্টার আলোচনা দ্র.;  ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন ইবনুল ক্বইয়্যুম, ২/১৫৬ পৃ.)। সূদের বিধান কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে কাগজের নোট স্বর্ণ ও রৌপ্যের ন্যায় (আবহাছু হাইয়াতি কিবারিল উলামা, ১/৮৫ পৃ.)।


প্রশ্ন : (৪১) আমি একটা সেলাই মেশিন ক্রয় করতে চাই। মেশিনটির বর্তমান মূল্য ৭০০০ টাকা। আমি পনেরশো টাকা নগদ প্রদান করে বাকি টাকা তিন মাস পরে দিতে চেয়ে ক্রয় করতে চাই। বাকি টাকা পরে পরিশোধ করতে চাওয়ায় দোকানদার আমার কাছ থেকে ১০০০ টাকা বেশি নিতে চাচ্ছে এভাবে মেশিন ক্রয় করা বৈধ হবে কি?

-মো: মিঠুন মিয়া
বদরগঞ্জ বাজার, চুয়াডাঙ্গা।

উত্তর : বৈধ হবে। নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ বা কিস্তিতে নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্য পরিশোধের শর্তে পণ্যের বর্তমান বাজার মূল্য থেকে অতিরিক্ত মূল্য ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে আপোষে নির্ধারণ করে বাকিতে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয আছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের লেনদেন/আদান-প্রদান করলে তা লিখে রাখো… (আল-বাক্বারা, ২/২৮২)। তিনি আরো বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের মাল অন্যায়ভাবে খেও না। কিন্তু যদি তা তোমাদের পরস্পরের সম্মতিতে ব্যবসায়িক পদ্ধতিতে হয়ে থাকে (তাহলে খেতে পারো) (আন-নিসা, ৪/২৯)। ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক ক্রয়-বিক্রয়ে দুইবার ক্রয়-বিক্রয় করা সূদ হিসেবে গণ্য হবে। তবে কেউ  যদি বলে নগদ নিলে এত টাকা এবং বাকিতে নিলে এত টাকা (তাহলে হালাল হবে) (মুছান্নাফ ইবনু আবি শায়বা, হা/২০৮২৭)। উল্লেখ্য যে, কোনো মাসের কিস্তি অনাদায়ে যদি অতিরিক্ত সূদ চাপানো হয় তাহলে, সে ক্রয়-বিক্রয় হারাম হবে।


প্রশ্ন (৪২) : আমি জনৈক ব্যক্তিকে ইটের দাদনের ব্যবসার জন্য কিছু টাকা দিয়েছি। তিনি ৬-৮ মাস পর ইট বিক্রি করে যাই লাভ হোক না কেন আমাকে প্রতি ইটের বিনিময়ে ১ টাকা করে লাভ দেন। গত বছর ব্যবসা কম হওয়াতে ৫০ পয়সা লাভ দিয়েছেন। তবে এখানে ঝুঁকির বিষয় হলো, যদি ব্যক্তিটি মারা যান তাহলে আমার মূল টাকাটা না পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন প্রশ্ন হলো, ১. আমার জন্য এই ব্যবসা হালাল কি-না? ২. আমি যে টাকা ইনভেস্ট করেছি তার যাকাত দিতে হবে কি-না?

-হিলালুদ্দীন
উখিয়া, কক্সবাজার।

উত্তর : একজনের পরিশ্রম অপর জনের মূলধন লভ্যাংশ উভয়ের মাঝে শতকরা হারে বণ্টিত হবে মর্মে যে ব্যবসা করা হয় তাকে শরীয়তের পরিভাষায় মুদারাবা বলা হয়। এই ব্যবসা বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে- ১. লাভ নির্ধারিত করা যাবে না ২. লাভ-লোকসানের ভাগিদারী হতে হবে (দারাকুৎনী, হা/৩০৭৭, মুয়াত্তা, হা/২৫৩৫; ইরওয়া, হা/১৪৭২; ‘বুলুগুল মারাম মওকুফ ছহীহ’)। যেহেতু প্রশ্নে উল্লেখিত পদ্ধতিতে লাভ-লোকসানের হিসাব না করে লাভ নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে তাই এই দাদন ব্যবসা বৈধ হবে না। বরং এই লাভের টাকা সূদ হিসাবে বিবেচিত হবে (মুসলিম, হা/ ১৫৯৮; মিশকাত, হা/ ২৮০৭ ‘ক্রয় বিক্রয় অধ্যায়’)। তাছাড়াও মূলধন ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কা থাকায় ধোকার সম্ভবনার কারণে এই ব্যবসা জায়েয নয়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, الْخَدِيعَةُ فِى النَّارِ ‘ধোকাবাজ জাহান্নামে যাবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/ ১৫৯৮; মিশকাত, হা/ ২৮০৭ ‘ক্রয় বিক্রয় অধ্যায়’)। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) সূত্রে বর্ণিত, এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উল্লেখ করলেন যে, তাকে ক্রয়-বিক্রয়ে ধোঁকা দেওয়া হয়। তখন তিনি বললেন, যখন তুমি ক্রয়-বিক্রয় করবে তখন বলে নিবে কোনো প্রকার ধোঁকা নেই (ছহীহ বুখারী, ২৪০৭; মিশকাত, হা/২৮০৩)।


বৈধঅবৈধ- পাকা চুল তোলার বিধান


প্রশ্ন (৪৩) : পাকা চুল তোলার বিধান কী?

-নিয়ামুল হাসান
শিবগঞ্জ, চাপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : পাকা চুল তুলে বা উপড়ে ফেলা ঠিক নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাদা চুল উপড়ে ফেলতে নিষেধ করেছেন। আমর ইবনু শু‘আইব (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا تَنْتِفُوا الشَّيْبَ ; فَإِنَّهُ نُورُ الْمُسْلِمِ. مَنْ شَابَ شَيْبَةً فِي الْإِسْلَامِ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِهَا حَسَنَةً، وَكَفَّرَ عَنْهُ  بِهَا خَطِيئَةً، وَرَفَعَهُ بِهَا دَرَجَةً‘তোমরা সাদা চুলগুলো উপড়িয়ে ফেলো না। কেননা এটা মুসলিমদের জন্য আলো স্বরুপ। বস্তুত ইসলামের মধ্যে থাকাবস্থায় যে ব্যক্তির একটি পশম সাদা হবে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য একটি নেকী লিপিবদ্ধ করবেন এবং তার একটি গুনাহ মুছে ফেলবেন এবং তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন (আবূ দাউদ, হা/৪২০২; মিশকাত, হা/৪৪৫৮)। অপর বর্ণনায় রয়েছে,  كَانَتْ لَهُ نُورًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘তা তার জন্য ক্বিয়ামত দিবসে হবে আলো’ (প্রাগুক্ত)।


মানবধিকার– মর্যাদাহানী করন


প্রশ্ন (৪৪) : কোনো মুসলিম যদি অমুসলিমের মর্যাদার হানি করে এবং দুনিয়াতে ক্ষমা না চায় তাহলেও কি বিচারের মাঠে মুসলিমের নেকী কেটে অমুসলিমকে দিয়ে দেওয়া হবে? যে অমুসলিম সে তো এমনিতেই জাহান্নামে যাবে, সে নেকী নিয়ে কি করবে?

-মো: মোস্তফা কামাল
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

উত্তর : না; মুসলিমের নেকী কেটে অমুসলিমকে দেওয়া হবে না। তবে মুসলিম ব্যক্তি গুনাহগার হবে। একজন মুসলিম ব্যক্তির মর্যাদাহানী করা যেমন হারাম অনুরূপ একজন অমুসলিমের মর্যাদাহানী করাও হারাম এবং একজন মু’মিনের বৈশিষ্ট এমন হতে পারে না। এমন ব্যক্তির পরিণাম জাহান্নাম। এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلاَ اللَّعَّانِ وَلاَ الْفَاحِشِ وَلاَ الْبَذِىءِ مَنْ سَمَّعَ يَهُوْدِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا دَخَلَ النَّارَ ‘মু’মিন খোঁটা দানকারী, অভিশাপকারী, নির্লজ্জ ও অশ্লীলভাষী হয় না। যে ব্যক্তি কোনো ইয়াহূদী বা খ্রিস্টানের দোষ বর্ণনা করে বেড়ায় সে জাহান্নামী’ (তিরমিযী, হা/১৯৭৭; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪৮৬০ ‘হাদীছ ছহীহ’)। তবে  যুদ্ধ ক্ষেত্র হলে ভিন্ন বিষয়।


সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্য- আক্বীকা


প্রশ্ন (৪৫) : জনৈক আলেম বলেছেন, আক্বিকার ছাগলের জন্য দাঁত বা এক বছর পূর্ণ হওয়া আবশ্যক। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক?

-রমজান আলি
নওগাঁ।

উত্তর : উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। কুরবানীর পশুর ন্যায় আক্বিকার পশুর জন্য দাঁত বা বছর পূর্ণ হওয়া আবশ্যক নয়। বরং ছেলে সন্তানের জন্য যেকোনো বয়সের দুইটি ছাগল আর কন্যা সন্তানের জন্য যেকোনো বয়সের একটি ছাগল হলেই যথেষ্ট হবে। কেননা যে সকল হাদীছে দাঁত বা বছরের শর্তারোপ করা হয়েছে তার সবগুলোই কুরবানীর সাথে সম্পৃক্ত। আর আক্বিকার পশুর বিষয়টি ব্যাপক বা শর্তহীন ( ইবনু মাজাহ, হা/৩১৬২; মিশকাত, হা/৪১৫২; নাইনুল আওতার, ৫/১৪৫ পৃ.)।


হাদীছ- ছহীহ-যঈফ


প্রশ্ন (৪৬) : যারা মিউজিক শুনে তাদের কানে উত্তপ্ত গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে মর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ?

-রাহাত
মিরপুর-১০।

উত্তর : যারা মিউজিক শুনে তাদের শাস্তির ব্যাপারে কঠিন হতে কঠিন শাস্তির কথা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। যেমন: ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘এই উম্মতের জন্য ভূমিধ্বস, চেহারা বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণের আযাব হবে। জনৈক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তা কখন ঘটবে? তিনি বললেন, ‘যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে এবং মদ্যপান দেখা দিবে (তিরমিযী, হা/২২১২; মিশকাত, হা/১০৬)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা মদ, জুয়া ও সব ধরণের বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন’ (মিশকাত, হা/৪৫০৩ ‘হাদীছ ছহীহ’)। তবে কানে  সীসা ঢেলে দেওয়া হবে মর্মে বর্ণিত হাদীছটি ছহীহ সূত্র দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং তা জাল (সিলসিলা যঈফা, হা/৪৫৪৯ ‘বাতিল হাদীছ’; ছহীহ ওয়া যঈফ আল-জামে’ আছ-ছগীর, হা/১২১৮৮)।


প্রশ্ন (৪৭) : রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন আয়েশা g-কে বললেন, আজ তুমি যা চায়বে তাই তোমাকে দেবো, আয়েশা g মেরাজের রাত্রির এক গোপন তথ্য জানতে চাইলেন যা শুনে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কেঁদেছিলেন। অনেকে বলেছেন যে, ঘটনাটি বুখারীতে আছে। এই ঘটনা সত্য কতটুকু?

-জাকির হোসেন
গোপীনাথপুর, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর : উত্তর : না; এমন কোনো হাদীছ ছহীহ বুখারীতে নেই এবং এমন কোনো ছহীহ হাদীছ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত নয়।


প্রশ্ন (৪৮)  : ‘নূরনবী’ নাম রাখা কি ঠিক?

-আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ
ফতুল্লা, নারায়নগঞ্জ।

উত্তর : এমন নাম রাখা যাবে না যার অর্থ সুন্দর নয় এবং আক্বীদা বিনষ্টকারী। ‘নূরনবী’ অর্থ নূরের নবী। এ নাম মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস থেকে বলা হয়ে থাক যে, তিনি নূরের তৈরি বা তিনি আল্লাহর নূরের অংশ ‘নাউযুবিল্লাহ’ যা সরাসরি শিরক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন! আমি কেবল তোমাদের মতই একজন মানুষ’ (আল-কাহাফ, ১১০)। রাসূল  (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুল কর তেমন আমিও ভুল করি (তবে তিনি অহীর ক্ষেত্রে কোনো ভুল করেননি)। তবে যদি আমি ভুলে যাই তাহলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪০১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭২)। অসতর্কতা বা অজ্ঞতা বসত কারো এমন নাম যদি রেখে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার এই নাম পরিবর্তন করে সুন্দর অর্থপূর্ণ নাম রাখা জরুরী। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন মহিলার আছিয়া (অবাধ্য) নাম পরিবর্তন করে জামিলা (সুন্দরী) রেখেছিলেন (ছহীহ মুসলিম,  হা/২১৩৯; তিরমিযী, হা/২৮৩৮)।


বিবিধ


প্রশ্ন (৪৯) : আমরা মুসলিমরা নামের আগে কেন মো. লেখি? এইভাবে মো. লেখা কি ঠিক?

-আরমান মোল্লা
ভেকুটিয়া, যশোর।

উত্তর : মুসলিম পুরুষের নামের পূর্বে ‘মুহাম্মাদ’ এবং মেয়েদের নামের পূর্বে ‘মুসাম্মাৎ’ লেখা বা বলার নিয়ম নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), ছাহাবা ও তাবেঈনদের যুগে ছিল না। এমনকি আরব দেশগুলোতে এখনো নেই। এই নিয়মটি ভারত উপমহাদেশেই বেশি প্রচলিত। তবে এরূপ করাতে কোনো আপত্তি নেই। কেননা যতদূর জানা যায়, বৃটিশ আমলে ভারতে হিন্দুরা যখন ঢালাওভাবে হিন্দু-মুসলিম সবার নামের আগে শ্রী, শ্রীযুক্ত (যা তাদের নিকট সম্মানসূচক শব্দ) ইত্যাদি ব্যবহার করতে শুরু করে এবং রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে ঐ শব্দগুলো যখন হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিমদের নামের শুরুতে বসানোর ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে, তখন মুসলিমগণ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার নিমিত্তে তাদের পুরুষদের নামের আগে শ্রী প্রভৃতির পরিবর্তে ‘মুহাম্মাদ’ ও মহিলাদের নামের আগে শ্রীমতী-এর পরিবর্তে ‘মুসাম্মাৎ’ চালু করেন।


প্রশ্ন : (৫০) কেউ যদি তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে অসহায় মানুষকে টাকা কিংবা অন্যান্য সহায়তা দেয়, তাহলে সেটা কি নেকীর কাজের অর্ন্তভুক্ত হবে?

-আব্দুল্লাহ
ময়মনসিংহ।

উত্তর : ইসলাম ধর্মে উৎসবের দিন দুইটি ১. ঈদুল আযহা ২. ঈদুল ফিতর। বাকি সকল উৎসব বিদ‘আত। ছাহাবীগণ কখনো নিজের কিংবা কারো জন্মদিন পালন করেননি এবং এদিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো আমল করেননি।  আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আগমন করার পর দেখলেন তাদের দুটি দিন ছিল। এ দিন দুটিতে তারা খেলাধূলা ও আমোদ-প্রমোদ করত। (এ দেখে) তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, এ দুটি দিন কি? তারা বলল, ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের সময় এ দিন দুটিতে আমরা খেলাধূলা করতাম। এ কথা শ্রবণ করে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ দুদিনের পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য আরো উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। এর একটি হলো ঈদুল আযহার দিন ও অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন’ (নাসঈ, হা/১৫৫৬; মিশকাত, হা/১৪৩৯)। জন্ম দিনকে কেন্দ্র করে সমাজে যা প্রচলিত আছে তার সবই বিজাতীয় কুসংস্কার ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামী সভ্যতায় এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই। কেননা নির্ধারিত দিনে কোনো কল্যাণ বা বরকত রয়েছে মনে করা শিরক। আবূ ওয়াক্বিদ আল-লায়ছী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, যখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুনায়নের যুদ্ধে বের হলেন, তখন তিনি মুশরিকদের এমন এক গাছের নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাতে তারা নিজেদের অস্ত্রসমূহ ঝুলিয়ে রাখত। উক্ত গাছটিকে ‘যাতু আনওয়াত’ বলা হত। এটা দেখে কোন কোন নতুন মুসলিমরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ সমস্ত মুশরিকদের মতো আমাদের জন্যও একটি ‘যাতু আনওয়াত’ ধার্য করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (বিস্ময় প্রকাশে) বললেন, ‘সুবহা-নাল্ল-হ মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায়ও তাকে বলেছিল, ‘হে মুসা! আমাদের জন্য এরূপ উপাস্য নির্ধারণ করে দিন যেরূপ ঐ কাফের সম্প্রদায়ের উপাস্য রয়েছে’ ( আল আ’রাফ, ৭/১৩৮)। তোমরাও তো সেরূপ কথা বললে, সেই মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় তোমরা ঐ সকল লোকদের পথ অনুকরণ করে চলবে, যারা তোমাদের আগে অতীত হয়ে গেছে (মিশকাত, হা/৫৪০৮)।