ঈমান-আক্বীদা


প্রশ্ন (১) : ফেরেশতা, ইবলীস কিংবা আদম-হাওয়া কি আল্লাহকে দেখেছে?
-শাহাদাত

আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর: এ মর্মে সঠিক আক্বীদা হচ্ছে, চর্ম চক্ষু দ্বারা মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহকে দেখা অসম্ভব। জান্নাতীগণ আল্লাহকে জান্নাতে যাওয়ার পর দেখতে পারবেন। সুতরাং আদম (আলাইহিস সালাম), ফেরেশতাগণ এবং ইবলীস কেউই আল্লাহকে দেখেননি। এমনকি মি‘রাজের রাত্রিতে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ও সরাসরি আল্লাহকে দেখেছেন এর কোনো প্রমাণ নেই। উমার ইবনু ছাবেত আল-আনসারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, أَنَّهُ لَنْ يَرَى أَحَدٌ مِنْكُمْ رَبَّهُ حَتَّى يَمُوتَ ‘নিশ্চয় মৃত্যুর পূর্বে কখনো তোমাদের কেউ আল্লাহকে দেখতে পারবে না’ (তিরমিযী, হা/২২৩৫; সিলসিলা ছহীহা, হা/২৮৬২)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না। কিন্তু দৃষ্টিসমূহ তাঁর আয়ত্বে আছে এবং তিনি সূক্ষ দর্শী, সম্যক পরিজ্ঞাত’ (আল-আন‘আম, ৬/১০৩)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তোমাকে বলে যে, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাঁর রবকে দেখেছেন, সে মিথ্যা বলল’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৫৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪২৭৩)। আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) পাঁচটি বিষয় নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন। (সেগুলোর মধ্যে একটি হলো) তাঁর পর্দা হচ্ছে নূর। তিনি তাঁর পর্দা তুলে নিলে তাঁর চেহারার জ্যোতি বা মহিমা তাঁর সৃষ্টির দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত সব কিছু ভস্মীভূত করে দিত (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৯; মিশকাত, হা/৯১)।


শিরক


প্রশ্ন () : বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র এবং উপার্জনের মধ্যে অধীনস্থতা বাধ্যতামূলক ও ইচ্ছাকৃত যে সকল শিরক ও হারাম মিশে আছে সেগুলো কী কী? তা স্পষ্ট করার জন্য অনুরোধ রইলো।

-এস. এম. মুশফিকুর রহমান
সাঁথিয়া বাজার, পাবনা।

উত্তর : কোন কর্মক্ষেত্রে কোন শিরক মিশে আছে তা এইভাবে বলা সহজ নয়। বরং ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে শিরক বা হারাম মনে হলে, সাথে সাথে বিজ্ঞ আলেমদের নিকট থেকে জেনে নিয়ে তা থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা শিরকের সাথে কোনো প্রকারের আপোষ করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ  ‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি শিরক করে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার অস্থান হবে জাহান্নাম’ (আল-মায়েদা, ৫/৭২)।


বিদআত-কুসংস্কার


প্রশ্ন (৩) : শবে বরাত ইসলামী পরিভাষা না হলেও উপমহাদেশে শা‘বান মাসের মধ্যবর্তী রজনীকে বুঝানো হয়। এ মর্মে হাদীছগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ বলা হলেও ইবনু মাজাহতে বর্ণিত (১৩৯০ নং) হাদীছকে আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাসান বলেছেন। তাহলে আহলেহাদীছগণ একে বিদ‘আত বলেন কেন?

-আব্দুর রাকিব
গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।

উত্তর : শবে বরাত ইসলামী পরিভাষা নয়, একথায় ঠিক। শবে বরাত বলে ১৫ শা‘বান বুঝালেও তা পরিহার করতে হবে। কেননা তা রাসূল ছা. এর বলা শব্দ নয়। রাসূলুল্লাহ ছা. বলেছেন, ‘নিসফ শা‘বান’। সাথে সাথে শবে বরাত বলে, সমাজের লোক যা বুঝে তা ১৫ শা‘বানের ঘটনা নয় বরং তা হয় রামাযান মাসের লায়লাতুল ক্বদরের রাত্রি। আর হাদীছ জাল বা যয়ীফ একথায় ঠিক। কারণ আলবানী (রহ) অত্র হাদীছের সূত্রকে যয়ীফ বলেছেন। তবে তিনি অন্যান্য সনদ ও ‘শাহেদ’-এর উপর ভিত্তি করে হাদীছটিকে ‘হাসান’ বলেছেন (সিলসিলা ছহীহাহ, ৩/১৩৮ পৃ., হা/১১৪৪)। শায়খ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ইলম, মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও এই হাদীছটিতে তাঁর ইজতিহাদ বা গবেষণা আমাদের কাছে অগ্রাধিকারযোগ্য মনে হয়নি। কারণ, হাদীছটির অন্যান্য সনদ ও শাহেদ এমন ত্রুটিপূর্ণ, যা পরস্পর মিলেও ‘গ্রহণযোগ্য’ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। বরং শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীছগুলো হয় জাল, না হয় দুর্বল (দ্রষ্টব্য : ইবনু রজব, লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃঃ ১৩৭; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে বায ১/১৮৭ পৃ.)। তর্কের খাতিরে আমরা যদি ধরে নিই যে, শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে ‘গ্রহণযোগ্য’ হাদীছ আছে, কিন্তু ঐ দিনে বা রাতে অতিরিক্ত ও বিশেষ কোন ইবাদত সম্পর্কে ‘ছহীহ’, ‘হাসান’ বা এমনকি ‘অল্প যঈফ’ হাদীছও বর্ণিত হয়নি। বরং এ সম্পর্কিত সব হাদীছ হয় অত্যন্ত দুর্বল, আর না হয় জাল। এজন্য, আহলেহাদীছগণ শুধু নয়; বরং সর্বযুগের জগদ্বিখ্যাত ওলামায়ে কেরাম শবে বরাত উপলক্ষ্যে বিশেষ ইবাদত-বন্দেগীকে বিদ‘আত বলেছেন। এমনকি যে আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনু মাজাহর উপর্যুক্ত হাদীছকে ‘ছহীহ’ বলেছেন, খোদ তিনিই বলেছেন, نعم لا يلزم من ثبوت هذا الحديث اتخاذ هذه الليلة موسمًا يجتمع الناس فيها، ويفعلون فيها من البدع  ‘তবে হ্যাঁ, এই হাদীছ প্রমাণিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এই রাত্রিকে এমন মৌসুম হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে মানুষ মসজিদে একত্রিত হবে এবং বিদ‘আতসমূহ করবে’ (আল-ক্বাসেমী, ইছলাহুল মাসাজিদ মিনাল বিদা‘ ওয়াল আওয়ায়েদ, পৃঃ ৯৯, টীকা নং ২)।


প্রশ্ন (৪) : জুম’আর খুৎবায় অনেক খতীব বলে থাকেন যে, রমাযান মাস পর্যন্ত জীবিত থাকার জন্য এবং রামাযানের ফযীলত লাভের জন্য اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ এই দু’আটি বেশি বেশি পাঠ করা সুন্নাত। এই মর্মে সঠিক সমাধান জানতে চাই।

-সোলায়মান
সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : উক্ত দু‘আটি সঠিক নয়। কারণ প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীছটি যঈফ। এ হাদীছটি আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাধ্যমে যিয়াদ আন-নুমায়রী বর্ণনা করেন। ইবনু মাঈন তাকে যঈফ রাবী বলেছেন। আবূ হাতেম ইবনু হিব্বান বলেন, সে হলো মুনকারুল হাদীছ। তার বর্ণিত হাদীছ গ্রহণ করা যাবে না। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন তাকে পরিত্যাগ করেছেন (তাহযীবুল কামাল, ৫/১১৬)। সুতরাং এ হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যাবে না।


প্রশ্ন () : রজব মাসের বিশেষ ছালাত ‘ছালাতুর রাগায়েববলতে কোনো ছালাত আছে কি?  থাকলে তা পড়ার পদ্ধতি কী?

-আব্দুর রহমান
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : ছালাতুর রাগায়েব বলতে রজব মাসে বিশেষ কোনো ছালাত কুরআন ও ছহীহ হাদীছে নেই। এমনকি কোনো ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ থেকেও এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। বরং ইহা ৪৮০ হিজরীর পরবর্তীতে আবিস্কৃত একটি বিদ‘আত (ফাতাওয়াল ইসলাম সুওয়াল-জাওয়াব, ১/৫২৫৭ পৃ.)। আর বিদ‘আত প্রত্যাখ্যাত। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোন কর্ম করলো যা আমাদের শরীয়তে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৭১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬২৩৪)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; মিশকাত, হা/১৪০)।


ইবাদাত- পবিত্রতা


প্রশ্ন (৬) : মোবাইলে ভিডিও দেখলে বা গেম খেললে কি ওযূ নষ্ট হবে?

-ফয়সাল রায়হান
ইতালী প্রবাসী।

উত্তর : মোবাইলে ভিডিও দেখলে বা গেম খেললে ওযূ ভঙ্গ হবে না। তবে, গেমস খেলা হারাম। যা জুয়ার অর্ন্তভুক্ত। এছাড়াও মোবাইলে অশ্লীল উলঙ্গ অর্ধ উলঙ্গ ভিডিও ও স্থীর পিকচারের মাধ্যমে চোখের চেনা হয়। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আদম সন্তানের জন্য যেনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যেনা হল তাকানো, জিহ্বার যেনা হল কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খায়েশ সৃষ্টি করে এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য মিথ্যা প্রমাণ করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪৩; আবূ দাউদ, হা/২১৫২; মিশকাত, হা/৮৬)। উল্লেখ্য যে, কোনো অশ্লীল ভিডিও দেখার কারণে উত্তেজনা বসত যদি যৌনাঙ্গ দ্বারা সাধারণ তরল পর্দাথ বের হয় তাহলে ওযূ ভেঙ্গে যাবে (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০৩)।


ইবাদাত- ছালাত


প্রশ্ন (৭) : হায়েয শেষ হওয়ার পর ছালাতের ওয়াক্ত রয়েছে। কিন্তু পবিত্রতা সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে যদি ওয়াক্ত চলে যায়, তাহলে ঐ ছালাত কি ক্বাযা করতে হবে? যদি করতে হয় তাহলে নিয়ম কী?

-আবূ সাঈদ
বাসাইল, টাঙ্গাইল।

উত্তর : হায়েযগ্রস্ত নারীদের জন্য হায়েয চলাকালীন সময়ে ছালাতের বিধান নেই (ছহীহ বুখারী, হা/৩০৪; মিশকাত, হা/১৯)। আর ছালাতের জন্য পবিত্রতা শর্ত। কেননা পবিত্রতা ছাড়া ছালাত বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا ‘আর তোমরা যদি অপবিত্র হয়ে যাও, তাহলে পবিত্রতা অর্জন করো’ (আল-মায়েদা, ৫/৬)। সুতরাং সম্ভবপর পবিত্রতা অর্জন করে ওয়াক্তের মধ্যে ছালাত আদায় করার চেষ্টা করবে অন্যথায় সেই ওয়াক্তের ছালাত ক্বাযা আদায় করবে। গোসল করা সম্ভব না হলে তায়াম্মুম করবে।


প্রশ্ন (৮) : ‘রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত’ বইয়ে জানাযার জন্য ২টি দু’আ দেওয়া রয়েছে। দু’আ ২টি একসাথে পড়া যাবে কি? দু’আগুলো একাধিকবার পড়া যাবে কি?

-ফজলে রাব্বী
মহিমাগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্দা।

উত্তর :রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত’ বইয়ে জানাযায় পঠিতব্য যে ২টি দু‘আর কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা তৃতীয় তাকবীরের পর এক সাথে পাঠ করা যাবে। কেননা উল্লিখিত দু’আ দুটি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) জানাযায় পাঠ করতেন (আবূ দাউদ, হা/৩২১০; তিরমিযী, হা/১০২৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৪৯৮; মিশকাত, হা/১৬৭৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৬৩, মিশকাত, হা/১৬৫৫)। আর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)–এর জানাযার পদ্ধতি ছিল- প্রথম তাকবীর দিয়ে তিনি ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ-শায়ত্বনির রজীম’ ও বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পাঠ করে সূরা ফাতিহা ও অন্য যেকোনো একটি সূরা পাঠ করতেন (তিরমিযী, হা/১০২৬; নাসাঈ, হা/১৯৮৭; মিশকাত, হা/১৬৭৩)। অতঃপর দ্বিতীয় তাকবীর দিয়ে দরূদ পাঠ করতেন (সুনানুল কুবরা ‘বায়হাক্বী’, হা/৭২০৯; জামে‘উল আহাদীছ, হা/৪২৭৫৩)। তৃতীয় তাকবীর দিয়ে মায়্যেত, উপস্থিত, অনুপস্থিত সকলের জন্য দু‘আ করতেন (প্রাগুক্ত)। যেহেতু তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তৃতীয় তাকবীর পর দু‘আ করতেন আর উক্ত দু‘আ দুটি জানাযার দু‘আ হিসাবে প্রমাণিত তাই তা তৃতীয় তাকবীরের পর এক সাথে পড়া যাবে।


প্রশ্ন (৯) : যোহর, আছর, মাগরিব এবং এশার ফরয ছালাতে এক বা দুই রাকা‘আত ছুটে গেলে, ছুটে যাওয়া রাকা’আত আমি কিভাবে পড়ব?

-নাহিদ আলী
চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : ইমামের সাথে যে কয় রাকা‘আত ছালাত পাবে সে কয় রাকা‘আত ছালাত হলো প্রথম ছালাত এবং ছুটে যাওয়া ছালাত হলো শেষের ছালাত। আলী ইবনু আবূ তালেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তুমি ইমামের সাথে যে কয় রাকা‘আত পেয়েছো তা তোমার প্রথম ছালাত, ক্বিরা‘আতের যে কয় রাকা‘আত তোমার ছুটে গেছে তা তুমি পূর্ণ করো (দারাকুৎনী, হা/১৫১৫, ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৭১১৪)। সুতরাং চার রাকা‘আত বিশিষ্ট ছালাতের এক বা দুই রাকা‘আত ছু্টে গেলে শুধুমাত্র এক বা দুই রাকা‘আত পড়ে ছালাম ফিরাবে এবং এতে সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা মিলানো জরুরী নয়। কেননা, ঐ এক রাকআত বা দুই রাকা‘আত তৃতীয় বা চতুর্থ রাকা‘আত বলে গণ্য হবে। আর ইমামের সাথে পাওয়া ছালাত প্রথম বা দ্বিতীয় রাকা‘আত বলে গণ্য হবে। আর তৃতীয় ও চতুর্থ রাকা‘আতে সূরা ফাতেহার সাথে কেরাত মিলানো জরুরী নয়। আর তিন রাকা‘আত বিশিষ্ট ছালাত তথা মাগরিবের ছালাতের এক রাকা‘আত ছালাত ছুটে গেলে শুধু এক রাকা‘আত পূর্ণ করবে এবং এতে সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা মিলানো জরুরী নয়। কেননা, তা তৃতীয় রাকা‘আত বলে গণ্য হবে। আর মাগরিবের তৃতীয় রাকা‘আতে কেরাত মিলাতে হয় না। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা আযান শুনতে পেলে ধীরস্থিরভাবে পায়ে হেটে ছালাতে যাও, দ্রুত যেও না। তোমরা ইমামের সাথে যে কয় রাকআত ছালাত পাবে তা আদায় করবে এবং যে কয় রাকা‘আত পাবে না তা পূর্ণ করে নিবে (ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৬; ‍মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৯০৬)। এমতাবস্থায় ইমামের সাথে প্রাপ্ত রাকা‘আত প্রথম রাকা‘আত হিসাবে গণ্য হবে। আলি ইবনু আবূ তালেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইমামের সাথে তুমি ছালাতের যেটুকু পাও তা তোমার ছালাতের প্রথমাংশ। সুতরাং ছালাতের যা ছুটে গেছে তা পূর্ণ করো (দারাক্বুতনী, হা/১৫১৫)।


প্রশ্ন (১০) : আমার বাবা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত পড়েন। কিন্তু ছহীহ পদ্ধতিতে পড়েন না। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি কিন্তু তিনি বুঝার চেষ্টা করেন না। এমতাবস্থায় আমার করণীয় কী?

-মিম
রংপুর।

উত্তর : মানুষকে সঠিক দাওয়াত দিতে থাকতে হবে। আর ব্যক্তি যদি হয় আত্মীয়, তাহলে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আরো বেশি। সুতরাং পিতার সম্মান-মর্যাদা ঠিক রেখে সুন্দরতম ভাষায় সঠিক পদ্ধতিতে ছালাত আদায়ের দাওয়াত দিতে থাকুন। আল্লাহ চাইলে হেদায়েত দান করবেন ইনশা-আল্লাহ। কেননা হেদায়াতের বিষয়টি আল্লাহর ক্ষমতায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে হেদায়েত করতে পারবেন না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন (আল-ক্বছাছ, ২৮/৫৬)। সেক্ষেত্রে পিতাকে সঠিক আক্বীদার আলেমদের ছালাত বিষয়ে লিখিত বইগুলো পড়ার জন্য উপহার দিতে পারেন। উল্লেখ্য যে, এ জন্য পিতার সাথে কোনো ধরণের কটু বাক্য প্রয়োগ ও আচরণবিধি ভঙ্গ এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না (আল-ইসরা, ১৭/২৩)।


প্রশ্ন (১১) : আমি একজন মেয়ে। আমার বয়স ১৮ বছর। আমি একটি মেসে থাকি। আমি নিয়মিত ছালাত পড়ি। কিন্তু আমার রুমমেট  হিন্দু। হিন্দু মহিলাটির সামনে আমার ছালাত ছহীহ হবে কি? আর হিন্দু মেয়েটার সাথে একই রুমে থাকা শরীয়তসম্মত হবে কি?

-জিনাত
ঢাকা।

উত্তর : একান্ত কারণে কোনো বির্ধমীর সাথে এক রুমে বা পাশাপাশি অবস্থান করা যায়। তবে তাকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের সর্বনাশ করতে ত্রুটি করবে না’ (আলে ইমরান, ৩/১১৮)। আরো অনেক আয়াতে অমুসলিমদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে মহান আল্লাহ নিষেধ করেছেন (আল-মায়েদা, ৫/৫১; আলে-ইমরান, ৩/১১৮; আল-মুজাদালা, ৫৮/২২)। সুতরাং মুসলিম ধার্মীক ব্যক্তির সাথে থাকার জন্য চেষ্টা করতে হবে। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে সঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করবে না। আর মুত্তাক্বী ব্যতীত অন্য কেউ যেন তোমার খাবার না খায় (আবূ দাউদ, হা/৪৮৩২; মিশকাত, হা/৫০১৮)। রুমমেট হিসাবে যদি বির্ধমী রুমে থাকে এবং কোনো ছবি-মূর্তি না থাকে তাহলে সে রুমে ছালাত আদায় করা যায়।


প্রশ্ন (১২) : ফজরের ২ রাকা’আত সু্ন্নাত ও ফরযের মধ্যে না-কি আর কোনো ছালাত আদায় করা যায় না। এখন কেউ যদি ফজরের ২ রাকা’আত সুন্নাত ছালাত বাসায় পড়ে মসজিদে যায়; তাহলে আবার মসজিদে বসার পূর্বে ২ রাকা’আত ছালাত আদায় করতে পারবে কি?

-মো. বেলাল হোসেন
সাঘাটা, গাইবান্দা।

উত্তর : বসার প্রয়োজন হলে দুই রাকআত ছালাত আদায় করেই বসতে হবে। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন দুই রাকা’আত ছালাত না পড়ে যেন না বসে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১১৬৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৪)। তাই ফজরের ‍সুন্নাত পড়ে মসজিদে প্রবেশ করলেও দুই রাকা’আত ছালাত আদায় করে বসতে হবে।


প্রশ্ন (১৩) : যে সমস্ত ইমাম মীলাদ-ক্বিয়াম করে এবং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে নূরের তৈরি বিশ্বাস করে। দলীল দেওয়ার পরও সে তার এই বিশ্বাস থেকে ফিরে আসে না। এমন ইমামের পিছনে ছালাত হবে কি?

-আশরাফুল ইসলাম
উলিপুর, কুড়িগ্রাম।

উত্তর : বিশুদ্ধ আক্বীদার ইমামের পিছনে ছালাত আদায় করতে হবে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) গায়েব জানতেন, পীর-দরবেশ গায়েব জানেন এমন কুফুরী আক্বীদায় বিশ্বাসী ইমামের পিছনে ছালাত আদায় করলে ছালাত হবে না। কেননা আল্লাহ ব্যতীত কেউ গায়েব জানে না (আল-আন‘আম, ৫৯)। আর এমন বিশ্বাস ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। তবে আক্বীদা যদি এমন হয় যা বিদ‘আতী বা ফাসেক্বী আক্বীদা প্রমাণ করে, তাহলে তার পিছনে সাময়িকভাবে ছালাত আদায় করা যেতে পারে। কেননা এমন আক্বীদা পোষণ করার কারণে ইমাম গোনাহগার হবেন। কিন্তু মুক্তাদীর ছালাত হয়ে যাবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘অনেকেই তোমাদেরকে ছালাত আদায় করায়। তারা যদি ঠিক করে তাহলে তোমাদের জন্য নেকী রয়েছে। আর তারা যদি ভুল করে, তাতে তোমাদের নেকী হবে আর তাদের গোনাহ হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪; মিশকাত, হা/১১৩৩)।


প্রশ্ন (১৪) : যোহরের পূর্বের চার রাকাআত সুন্নাত ছালাতের প্রত্যেক রাকাআতেই কি সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা পড়তে হবে?

-নূর জাহান
পলিখাঁপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : যোহরের পূর্বের চার রাকা‘আতের শুধু প্রথম দুই রাকা‘আতে মিলালেই চলবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যোহর এবং আছরের ছালাতের প্রথম দুই রাকা‘আতে সূরা ফাতেহা এবং অন্য দুটি সূরা আর শেষের দুই রাকা‘আতে শুধু সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। আর কোনো কোনো সময় তিনি ছাহাবীগণকে শুনিয়ে ক্বিরাআত করতেন। আর তিনি যোহরের প্রথম রাকাআত দীর্ঘ করতেন (নাসাঈ, হা/৯৮০)। তবে প্রত্যেক রাকা‘আতেও সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে পারে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যোহর কিংবা আছরের (রাবীর সন্দেহ) প্রথম দুই রাকা‘আতের প্রতি রাকা‘আতে ১৫ আয়াত পরিমাণ পাঠ করতেন এবং শেষের দুই রাকা‘আতে অর্ধেক পরিমাণ পাঠ করতেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৫২)। এতে বুঝা যায়, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কখনো কখনো পরের দুই রাকা‘আতেও অন্য সূরা মিলিয়েছেন।


প্রশ্ন (১৫) : ছালাতে সিজদারত অবস্থায় সিজদার তাসবীহ পড়ার পর আল্লাহর কাছে নিজ মাতৃভাষায় কিছু চাওয়া যাবে কি?

-মো. নূর হাসান
শেরপুর, ময়মনসিংহ।

উত্তর : ছালাতে সিজদারত অবস্থায় সিজদার তাসবীহ পড়ার পর আল্লাহর কাছে নিজ মাতৃভাষায় কিছু চাওয়া যাবে না। কেননা ছালাতে মানুষের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলা সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘নিশ্চয়ই ছালাত মানুষের কথাবার্তা বলার ক্ষেত্র নয়। এটা কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তেলাওয়াতের জন্যই নির্দিষ্ট’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৭, আবূ দাঊদ, হা/৭৯৫; নাসাঈ, হা/১২০৩)। তবে কুনূতে নাযেলায় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ধরে তাদের বিরুদ্ধে বদ-দু‘আ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৮০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৫; মিশকাত, হা/১২৮৮)। তাই কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত দু‘আগুলোই পড়া উচিত। এরপরও যদি কেউ আরও বেশি দু‘আ করতে চায়, তাহলে ছালাতের সালাম ফিরানোর পর দুই হাত তুলে একাকী নিজ ভাষায় দু‘আ করবে। কেননা দুই হাত তুলে দু‘আ করলে আল্লাহ  বান্দার খালি হাত ফেরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন (তিরমিযী, হা/৩৫৫৬)।


ইবাদাত- যাকাত


প্রশ্ন (১৬) :মাসিক আল-ইতিছামঅক্টোবর ২০২১ সংখ্যার মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, জিপিএফ (জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড)-এর টাকার যাকাত দিতে হবে। আমার প্রশ্ন হলো, জিপিএফ এর টাকা আমি ইচ্ছা করলে তুলতে পারি না। আমি যে প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করি সেখানে কয়েকবার আবেদন করেও তুলতে পারিনি। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

-আনিসুর রহমান
নওগাঁ।

উত্তর : যাকাত দিতে হবে একথাই ঠিক। যদি তা উঠানো  সম্ভব হয় তাহলে উঠিয়ে অন্যান্য সম্পদের সাথে মিলিয়ে যাকাত দিতে হবে। আর সম্ভব না হলে যাকাত দিবে না যখন টাকা উত্তলন করবে তখন শুধু এক বছরের যাকাত আদায় করে দিবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে বিধান চাপিয়ে দেন না’ (আল-বাক্বারা, ২/২৮৬)।


ইবাদাত- ছিয়াম


প্রশ্ন (১৭) : নিছফে শাবানের ফযিলত মর্মে বর্ণিত হাদীছের বিশুদ্ধ তাহক্বীক জানতে চাই

-নাজমুল ইসলাম
ঢাকা।

উত্তর : নিসফে শা‘বান সম্পর্কে যত হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তার কোনোটি হয়তো জাল না হয় জঈফ। যেমন এ প্রসঙ্গে একটি হাদীছ হলো, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘যখন শা‘বানের মধ্যরাত হবে তখন তোমরা রাতে ছালাত আদায় করো এবং দিনে ছিয়াম রাখো… (মিশকাত, হা/১৩০৮; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৮৮)। এই হাদীছটি মাওযূ। এ হাদীছের সনদে ‘ইবনু আবি সাবরাহ’ নামে একজন রাবি আছে। তার ব্যাপারে ইমামদের মাঝে সমালোচনা রয়েছে। ইবনু হিব্বান বলেন, তার বর্ণিত হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যাবে না (তাহযীবুল কামাল, ৪/৪৮৯)। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল তার পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, ইবনু আবি সাবরাহ হাদীছ যাল করতো (তাহযীবুল কামাল, ৩৩/১০২)। সুতরাং এ রাতে কুরআন তেলাওয়াত ও বিশেষ কোনো ছালাত নেই। আর যে সকল উলামায়ে কেরাম এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে থাকেন তাদের এ বর্ণনা ছহীহ নয়, বরং যঈফ।


প্রশ্ন (১৮) : জনৈক আলেম বলেছেন, শাবান মাসে মালাকুল মাউত বেশি পরিমাণ রূহ কবয করে থাকেনঅর্থাৎ বেশি মানুষ মারা যায়এমন কোনো ছহীহ হাদীছ বা আছার আছে কি

-আব্দুল্লাহ
নওগাঁ।

উত্তর : শাবান মাসে মালাকুত মাউত বেশি পরিমাণ রূহ কবয করেন এমর্মে কোনো ছহীহ হাদীছ বা আছার বর্ণিত হয়নি। তবে পুরো বছরে যে সকল মানুষ মৃত্যুবরণ করে থাকে তাদের তালিকা শা‘বান মাসে নির্ধারণ করা হয় মর্মে  হাদীছ ও আছার বর্ণিত হয়েছে। তবে সেগুলো সবই নিতান্তই যঈফ (সিলসিলা যঈফা, হা/৬৬০৭; ফাতহুল ক্বাদীর, ৪/৮০১; যঈফুল জামে‘, হা/৪০১৯; আদ-র্দুরুল মানছূর, ৭/৪০১-৪০২; তারিখে বাগদাদ, ৪/৪৩৬; মিযানুল ই‘তেদাল, ৪/৫০৭; মুসনাদ, ৮/৩১১)।


প্রশ্ন (১৯) : আমার বাবা মৃত্যুর পূর্বে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে রমাযানের কয়েকটি ছিয়াম পালন করতে পারেননি। এজন্য তিনি খুবই মর্মাহত হোন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন। তাই আমি উনার সন্তান হিসেবে ছিয়ামগুলো পালন করবো মর্মে কথা দেই। কিন্তু কয়েকজন বলল যে, ছিয়ামগুলো আমি পালন করলে বাবার পক্ষ থেকে আদায় হবে না বরং ফিদিয়া দিতে হবে। এ বিষয়ে সঠিক সমাধান দানে বাধিত করবেন।

-মো. সজিব খান
নান্দাইল, ময়মনসিংহ।

উত্তর : এমতাবস্থায় মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে অন্য কেউ ছিয়াম রাখতে পারবে না। বরং তার পক্ষ থেকে ছিয়ামের ফিদইয়া দিবে।  মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা সামর্থ্যবান (কিন্তু  ছিয়াম পালনে অক্ষম) তারা এর পরিবর্তে ফিদইয়া হিসাবে একজন মিসকীনকে খাদ্য দিবে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৪)। উল্লেখ্য যে, ছিয়ামের ক্বাযা যিম্মায় রেখে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে ছিয়াম আদায় করবে’ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি নযর তথা মানতের ছিয়ামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৪৮; আবূ দাঊদ, হা/২৪০০)।


প্রশ্ন (২০) : ইয়াওমুশশাক বা সন্দেহের দিন বলতে কোন দিনকে বোঝানো হয়। এই দিনে কি গত বছরের ক্বাযা ছিয়াম পালন করা যাবে?

-আহমাদুল্লাহ
মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : সন্দেহের দিন বলতে আরবী মাসের ৩০ তারিখকে বুঝানো হয়। উক্ত দিনে পূর্বের বছরের ছুটে যাওয়া ছিয়াম পালন করা যাবে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা এক বা দুই দিন পূর্বে ছিয়াম পালনের মাধ্যমে রমাযানকে অগ্রগামী কর না। তবে ঐ ব্যক্তি ব্যতীত যে কোনো নির্দিষ্ট দিনে ছিয়াম পালন করে থাকে, তাহলে সে সন্দেহের দিনেও ছিয়াম পালন করবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১০৮২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৭৬৫)। অত্র হাদীছে নফল ছিয়ামের ব্যাপারে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। যেমন: সোমবার ও বৃহস্পতিবারের ছিয়াম। তাহলে যেখানে নফল ছিয়ামের ব্যাপারেই ছাড় দেওয়া হয়েছে সেখানে ওয়াজিব ছিয়ামের ব্যাপারে ছাড় দেওয়া আরো শ্রেয় বা উত্তম। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সন্দেহের দিনে কাযা ছিয়াম, নযরের ছিয়াম ও কাফফারার ছিয়াম পালন করা বৈধ। কারণ সে দিনে যদি নফল ছিয়াম পালন করা যায়, তাহলে ফরয ছিয়াম পালন করা আরো উত্তম (আল-মাজমূ‘, ৬/৩৯৯)।


প্রশ্ন (২১) : শুনেছি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, অন্যান্য মাসের তুলনায় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) শা‘বান মাসে বেশি ছিয়াম পালন করতেন। তাহলে কি পুরো শাবান মাস ছিয়াম পালন করা যাবে?

-আব্দুর রহমান
মালোশিয়া।

উত্তর : রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) শা‘বান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি ছিয়াম পালন করতেন এ কথা ঠিক। তবে তিনি পুরো শা‘বান মাস অর্থাৎ ৩০ দিন ছিয়াম পালন করতেন না। বরং অল্প কয়েকদিন হলেও  শেষের দিকে ছিয়াম রাখা বাদ দিয়েছেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে রমাযান ব্যতীত কোনো পূর্ণাঙ্গ মাস ছিয়াম পালন করতে দেখিনি। তবে অন্যান্য মাসগুলোর মধ্যে শা‘বান মাসে তিনি বেশি ছিয়াম পালন করতেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৬; আবূ দাউদ, হা/২৪৩৪)। অপর বর্ণনায় রয়েছে, كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ إِلاَّ قَلِيلاً ‘রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কয়েক দিন ব্যতীত পুরো শা‘বান মাস ছিয়াম পালন করতেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৬)। উসামা ইবনু যায়েদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে তো শা‘বান মাসে যে পরিমাণ ছওম পালন করতে দেখি বছরের অন্য কোন মাসে সে পরিমাণ ছওম পালন করতে দেখি না। তিনি বললেন, ‘শা‘বান মাস রজব এবং রমাযানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস যে মাসের (গুরুত্ব সম্পর্কে) মানুষ খবর রাখে না অথচ এ মাসে আমলনামাসমূহ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকটে উত্তলোন করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, আমার আমলনামা আল্লাহ তা’আলার নিকটে উত্তোলন করা হবে আমার ছওম পালনরত অবস্থায় (নাসাঈ, হা/২৩৫৭)।


ইবাদাত- হজ্জ


প্রশ্ন (২২) : আমি হজ্জে গিয়ে রওযায় যে দুই রাকা’আত ছালাত আদায় করতে হয় কোনো কারণবসত আমি তা করিনি। এখন আমার করণীয় কী?

-আবুল বাশার
নাটোর।

উত্তর : রসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর রওযাতে (কবরে) ছালাত আদায় করা শিরক। আর যে স্থানটুকুকে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) روضة من رياض الجنة  (রওযাতুম মিন রিয়াযিল জান্নাত) বলেছেন, সেখানে দুই রাকা‘আত ছালাত আদায়ের ব্যাপারে কোন হাদীছ নেই। বরং মাসজিদে নববী ছালাত আদায়ের কথা হাদীছে এসেছে। জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মাসজিদুল হারাম ব্যতীত অন্য মসজিদের ছালাত অপেক্ষা আমার মসজিদের ছালাত হাজার গুণ উত্তম। অন্যান্য মসজিদের ছালাতের তুলনায় মাসজিদুল হারামের ছালাত এক লক্ষ গুণ উত্তম (ইবনু মাজাহ, হা/১৪০৬)।


কাফন-দাফন ও মৃতের বিধান


প্রশ্ন (২৩) : আছরের ফরয ছালাতের পরে নফল ইবাদত করা যায় না। প্রশ্ন হলো- আছর ছালাতের পর জানাযা দেওয়া যাবে কি-না? আমাদের এলাকায় বেশির ভাগ জানাযা আছরের পর হয়। হাদীছসহ উত্তর প্রত্যাশা করি।

-সবুজ ইসলাম
ভেড়ামারা কুষ্টিয়া।

উত্তর : রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) সাধারণত আছর ছালাতের পর হতে সূর্য অস্তমিত যাওয়া পর্যন্ত এবং ফজরের ছালাতের পর থেকে সূর্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো ছালাত পড়তে নিষেধ করেছেন। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, ফজরের পর সূর্য উদিত হয়ে (একটু) উপরে না উঠা পর্যন্ত এবং আছরের পর সূর্য অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত কোন ছালাত নেই (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৬; মিশকাত, হা/১০৪১)। তবে ক্বাযা ছালাত আছরের পরে পড়া যাবে। কেননা ক্বাযা ছালাতের সময় হচ্ছে যখন তা স্বরণ হয়। হোক তা আছরের পর কিংবা ফজরের পর (আবূ দাউদ, হা/৪৩৫; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩৯৬)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ব্যস্ততার কারণে যোহরের পরবর্তী ছুটে যাওয়া দুই রাকা‘আত ছালাত আছরের পরে পড়ে ছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/১২৩৩; মুসলিম, হা/৮৩৪; মিশকাত, হা/১০৪৩)। অনুরূপভাবে আছরের পরে জানাযা ও দাফন-কাফন করাতেও কোনো সমস্যা নেই। কেননা তিন সময়ে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) জানাযা ও কবরস্থ করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু আছরের পরের সময়টি তার অন্তর্ভুক্ত নয়। উক্ববা ইবনু আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তিনটি সময়ে আমাদেরকে ছালাত আদায় ও মৃত ব্যক্তিকে দাফন করতে নিষেধ করতেন ১. যখন সূর্য উদয় আরম্ভ হয়, তখন থেকে সূর্য উপরে উঠা পর্যন্ত ২. ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়, পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে না পড়া পর্যন্ত এবং (৩) যখন সূর্য অস্তমিত হওয়ার উপক্রম হয়, তখন থেকে সূর্য অস্তমিত না যাওয়া পর্যন্ত (আবূ দাউদ, হা/৩১৯২; নাসাঈ, হা/৫৬০; মিশকাত, হা/১০৪০)।


প্রশ্ন (২৪) : পুরুষ ব্যক্তি মারা গেলে মহিলারা দেখতে পারবে কি? আর মহিলারা মারা গেলে পুরুষরা দেখতে পারবে কি?

-শরিফুল ইসলাম
ঝিনাইদাহ।

উত্তর : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গা জীবিত অবস্থায় তার হাড় ভাঙ্গার ন্যায় (আবূ দাউদ, হা/৩২০৭; মিশকাত, হা/১৭১৪)। অত্র হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনু হাযার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই হাদীছ থেকে বুঝা যায় যে, মৃত্যুর পরে মুমিন ব্যক্তির সম্মান ঐরূপ অবশিষ্ট থাকে যেরূপ জীবিত অবস্থায় ছিল (ফাতহুল বারী, ৯/১১৩ পৃ.)। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, জীবিত অবস্থায় মাহরাম ও গায়রে মাহরামের বিধান যেমন কার্যকর মৃত্যুর পরেও তা বহাল থাকে। তাই কোনো নারী মৃত্যুবরণ করলে, নারী ও মাহরাম পুরুষ ব্যতীত কেউ তাকে দেখতে পারবে না। আর পুরুষ ব্যক্তি মারা গেলে মাহরাম নারী ও পুরুষ ব্যতীত কেউ তাকে দেখতে পারবে না। মৃত ব্যক্তির আবৃত শরীর দেখা জীবিত নারীর আবৃত শরীর দেখার নামান্তর (লাজনা দায়েমা, ২৪/৪২৩ পৃ.)।


প্রশ্ন (২৫) : আমাদের এলাকায় মানুষ মারা গেলে বাড়ি থেকে জানাযার স্থানে নেওয়ার সময় চল্লিশ কদম পর্যন্ত গণনা করা হয়। প্রতি দশ কদম পর পর খাটিয়া বহনকারীদের পরিবর্তন করা হয়। ইহা কতটা শরীয়া সম্মত?

-শামসুল আলম
উত্তরখান, ঢাকা-১২৩০

উত্তর : খাটিয়ায় বহন করে লাশ কবর স্থানে নেওয়ার সময় চল্লিশ কদম গণনা করে প্রতি দশ কদম পর পর খাটিয়া বহনকারীদের পরিবর্তন করার এই পদ্ধতি কুরআন, ছহীহ হাদীছ ও কোনো সালাফ দ্বারা প্রমাণিত নয়। সুতরাং এমন আমল সুস্পষ্ট বিদ‘আত। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছে, ‘কেউ যদি এমন আমল করে যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তাহলে তা বর্জনীয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।


প্রশ্ন (২৬) : মৃত মহিলাকে গোসল দেওয়ার পর শরীরে আতর, করপুর, সুরমা লাগানো যাবে কি?

-শাহজালাল মিয়া
মাহিগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : মুহরিম ব্যতীত সাধারনভাবে মৃত্যুবরণকারী মায়্যেতের শরীরে বা কাফনের কাপড়ে, গোসলের সময় বা পরে সুগন্ধি জাতীয় জিনিসের ব্যবহার করা জায়েয। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যদি তোমরা মায়্যেতকে সুগন্ধি লাগাও তাহলে তিনবার লাগাও (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৫৮০)। আসমা’ বিনতু আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহা) মৃত্যুর পূর্বে তার পরিবারের লোকদের অছিয়ত করে বলেন, আমি যখন মারা যাবো তখন তোমরা আমাকে সুগন্ধ ধুঁয়া দিবে অতঃপর সুগন্ধি ব্যবহার করবে (সুনানুল কুবরা বায়হাক্বী, হা/৬৯৫১; মুয়াত্বা, হা/৫৩০)। যায়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা)–এর গোসলের সময় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কর্পুর (সুগন্ধি) ব্যবহার করতে আদেশ করেছিলেন (ছহীহ বুখরী, হা/১২৫৩)। ইবনু আব্বাস (রাহিমাহুল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তির উট তার ঘাড় মটকে দিল। (ফলে সে মারা গেল)। আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলাম। সে ছিল ইহরাম অবস্থায়। তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দুই কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা আবৃত করো না। কেননা, আল্লাহপাক কিয়ামতের দিন তাকে মুলাব্বিদ অবস্থায় উঠিয়ে নিবেন  (ছহীহ বুখারী, হা/১২৬৭)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, ইহরাম অবস্থায় মারা গেছেন এমন মায়্যেত ব্যতীত সকল ময়্যেতকে সুগন্ধি লাগানো যাবে।   তবে সুরমা লাগানোর কথা হাদীছে পাওয়া যায় না। তাই এমনটি করা জায়েয নয় (ফাতওয়া আল লাজনাহ আদ দায়েমাহ, ৭/৩৪০)।


প্রশ্ন (২৭) : কোনো নারীকে যদি মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তার কোনো অভিভাবক খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে ঐ নারীকে আমরা কাফন-দাফন ও জানাযা পড়ে কবরস্থ করব না-কি আগুনে পুড়িয়ে কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলব? কেননা নারী হওয়ার কারণে মুসলিম না-কি অমুসলিম আমরা বুঝতে পারছি না।

-আব্দুস সামাদ
দুর্গাপুর, রাজশাহী।

উত্তর : অজ্ঞাত লাশের মধ্যে যদি কুফুরের লক্ষণ থাকে, যেমন: ক্রুশ, সিঁদুর, শাঁখা, ধুতি ও নিদির্ষ্ট ধর্মীয় পোষাক; তাহলে তাকে বিধর্মী গণ্য করে কাফন-দাফন ছাড়া মাটিতে পুঁতে দিবে। কেননা কাফেরের জানাযা পড়া ও তার জন্য দু’আ করা জায়েয নয়। এ জন্যই আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) নিজ চাচা আবূ তালেবের মৃত্যুর পর তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলার নির্দেশ দেন। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বললাম, আপনার বৃদ্ধ পথভ্রষ্ট চাচা মৃত্যুবরণ করেছেন, এখন কে তাকে দাফন করবে? তিনি বললেন, তুমি গিয়ে তোমার পিতাকে ঢেকে রাখো এবং তুমি আমার কাছে না আসা পর্যন্ত অন্য কিছু করবে না। অতঃপর আমি তাকে ঢেকে দিলাম। এরপর তার কাছে আাসলাম। আমাকে নির্দেশ দেওয়ায় আমি গোসল করলাম এবং তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন (আবূ দাউদ, হা/৩২১৪)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার উপর তুমি জানাযা পড়বে না এবং তার কবরের উপর দাঁড়াবে না। নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং তারা ফাসিক অবস্থায় মারা গিয়েছে’ (আত-তওবা, ৯/৮৫)। আর যদি এমন প্রকাশ্য কোনো লক্ষণ পাওয়া না যায়, তাহলে তাকে সে দেশ বা শহরের মানুষের ধর্মের মানুষ গণ্য করে দাফন করবে। সুতরাং বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট এবং অমুসলিম হওয়ার কোনো নিদর্শন নেই, তাই এমন নারী পাওয়া গেলে তাকে মুসলিম গণ্য করে কাফন-দাফন ও জানাযা পড়ে কবরস্থ করবে (লিক্বাউল বাবিল মাফতূহ, ২১/৩২ পৃ.)।


প্রশ্ন (২৮) : আমরা জানি যে, মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান করা বিদ’আত। কিন্তু মৃত ব্যক্তির পরিবার ও দূর-দুরান্ত থেকে জানাযায় উপস্থিত হতে আসা লোকজন, আত্মী-স্বজনদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য সমাজের পক্ষ থেকে নিজ অর্থায়নে ব্যবস্থা করা যাবে কি? বেঁচে যাওয়া টাকা কি করতে হবে?

-রমজান আলী
পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : না, যাবে না। বরং যারা জানাযায় গিয়েছে তারা নিজ গতিতে ফিরে আসবে। এধরনের কোন অনুষ্ঠান করা যাবে না। উল্লেখ্য যে, মৃতের বাড়িতে খাবার পৌঁছানো সুন্নাত (আবূ দাউদ, হা/৩১৩২; ইবনু মাজাহ, হা/১৬১০)।


প্রশ্ন (২৯) : মৃত ব্যক্তির ভিডিও কিংবা অডিও লেকচার শোনা যাবে কি?

-মো. জহুরুল ইসলাম
পোরশা, নওগাঁ।

উত্তর : হ্যাঁ, মৃত ব্যক্তির ভিডিও কিংবা অডিও লেকচার শোনা যাবে। জীবিতাবস্থায় যেমন ব্যক্তির ভিডিও ও অডিও লেকচার শুনে উপকৃত হওয়া যায় তেমনি ব্যক্তি মারা গেলেও তার ভিডিও ও অডিও লেকচার শোনা যায়। কেননা তার লেকচার থেকে যদি জাতি উপকার লাভ করতে পারে তাহলে প্রয়োজনের তাগিদে দ্বীন প্রচারের স্বার্থে ভিডিও লেকচারগুলো মিডিয়ায় রেখে  দেওয়া যায় এবং তা থেকে দ্বীনি ইলম হাছিল করা যায়। রসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। ১. সদাকাহ জারিয়াহ ২. এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩১)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে কল্যাণের পথ দেখাবে সে ঐ ব্যক্তির সমপরিমাণ ছওয়াব পাবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৯৩; মিশকাত, হা/২০৯)।


প্রশ্ন (৩০) : মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করার কয়েক মাস পর ধসে তা ‍নিচু হয়ে যায়। ফলে সেখানে বিভিন্ন জীব-জন্তু বসবাস করতে আরম্ভ করে। আমরা কি কবরগুলি ভরাট করতে পারব? বা এ ক্ষেত্রে করণীয় কী? জানিয়ে বাধিত করবেন।

-হাফিযুর রহমান
মহাদেবপুর, নওগাঁ।

উত্তর : মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করার পর ধসে যায় কিংবা নিচু হয়ে যায় এমন কবরকে ভরাট করার কোনো বিধি-নিষেধ শরীয়তে নেই। সুতরাং কবরকে বাঁশ জাতীয় বেড়া দিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে তা আবশ্যক নয়। পরিবর্তন করতে চাইলে ভরাট করে দেওয়া যায় (ফতওয়া ইবনু তাইমিয়্যা, ৩১/২৬২ পৃ. দ্র.)।


ব্যবসা-বাণিজ্য


প্রশ্ন (৩১) : বিদেশী সৌখিন পাখিগুলো যেমন. লাভবার্ড, কোকাটেল, বাজরিকা ইত্যাদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে খাচায় পালন করা যাবে কি?

-তৌহিদুজ্জামান সুজন
ঢাকা।

উত্তর : দেখতে সুন্দর, সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী পাখি বিনোদন ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে খাঁচায় রেখে যত্ন সহকারে পালন করা যায় (ফাতহুল বারী, ১/৫৪৮ পৃ.; লাজনা দায়েমা, ১৩/৩৮-৪০ পৃ.)। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) সবচেয়ে বেশি সদাচারী ছিলেন। আমার এক ভাই ছিল; তাকে ‘আবূ উমায়ের’ বলে ডাকা হতো। আমার ধারণা যে, সে তখন মায়ের দুধ খেতো না। যখনই সে তাঁর নিকট আসত, তিনি বলতেন, হে আবূ উমায়ের! কি করছে তোমার নুগায়ের? সে নুগায়ের পাখিটি নিয়ে খেলত (ছহীহ বুখারী, হা/৬২০৩, ৬১২৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৫০)। অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণ হয় যে, আনন্দ ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে পাখি পালন করা যায়। তবে, পশু-পাখিকে বন্দি করে খাবার ও থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না দিয়ে কষ্ট দেওয়া যাবে না এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইবনু উমার (রাহিমাহুল্লাহু আনহুমা) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘একজন মহিলা একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গিয়েছে, সে তাকে বেঁধে রেখেছিল। সে না তাকে খাবার দিয়েছিল, না তাকে ছেড়ে দিয়েছিল, যাতে সে যমীনের পোকা মাকড় খেতে পারত’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৩১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬১৯)।


প্রশ্ন (৩২) : অনলাইন থেকে ইনকাম অর্থাৎ ফ্রিল্যান্সিং করে বা গ্রাফিক্স ডিজাইন করে ইনকাম করা কি জায়েয?

-আল-আমীন
ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ।

উত্তর : ইনকাম বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে মূল নীতি হচ্ছে, তা বৈধ পন্থায় বৈধ জিনিস হওয়া। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) পাথর খন্ড নিক্ষেপের মাধ্যমে কেনা-বেচা ও প্রতারনামূলক ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫১৩; মিশকাত, হা/২৮৫৪)। সুতরাং যেকোনো বৈধ পন্থার বৈধ উপার্জন ইসলামে বৈধ ও হালাল। কেননা অবৈধ রিযিক্ব খেয়ে কারো ইবাদত আল্লাহ কবুল করবেন না। মহান আল্লাহ হালাল রিযিক্ব ভক্ষণ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদের যেসব পবিত্র জিনিস রিযিক্ব হিসাবে দিয়েছি তা হতে খাও’ (আল-বাক্বারা, ২/১৭২)। আবূ বারযা আসলামী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দা তার পদদ্বয় এক ধাপ নড়াতে পারবে না। …তার সম্পদ সম্পর্কে কোথায় থেকে তা উপার্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে (তিরমিযী, হা/২৪১৭; মিশকাত, হা/৫১৯৭)। সুতরাং ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে অনলাইন ভিত্তিক একটি কর্ম ব্যবস্থা। একজন মানুষ যেমন চাকুরী, ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করে তদ্রুপ একজন ব্যক্তি অনলাইনে মুক্তভাবে বিভিন্ন কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে পারে। সুতরাং ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকুরীর অর্থ হালাল ও বৈধ হওয়ার জন্য যেমন সূদ-ঘুষ, হারাম ও সকল ধরণের ধোঁকা থেকে মুক্ত থাকা জরুরী। তদ্রুপ ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রেও সূদ-ঘুষ, হারাম, অবৈধ কাজ, থেকে মুক্ত থাকতে হবে। তবেই ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ উপার্জন করা বৈধ হবে।


প্রশ্ন (৩৩) : সিজিন্যাল ব্যবসার মধ্যে থেকে পাট এবং ধান এই দুটি পণ্য ৬ মাস অথবা তার বেশি সময় ধরে স্টক করে রাখা যাবে কি?

-আব্দুল খালেক
বদলগাছী, নওগাঁ।

উত্তর : ধান খাদ্যদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং বাজারে কৃত্রিম সংকট তথা সিন্ডিকেট তৈরি উদ্দেশ্য না হলে এবং বাজারে চাহিদা পরিমাণ পণ্য মজুদ থাকলে সাময়িকভাবে ধান গুদামজাত করণে কোনো সমস্যা নেই। বরং এমন গুদামজাতের ফলে খাদ্য সংকটের সময় মানুষ সহজে পণ্য হাতে পেয়ে থাকে। সুতরাং এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। (আল-মুগনী, ‘ইবনু ক্বুদামা’, ৬/৩১৭)। আর সাময়িকভাবে এক বছরের জন্য খাদ্য মজুদ করা যায়। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বনু নাযীরের খেজুর বিক্রি করতেন এবং তার পরিবারের জন্য এক বছরের খাদ্য জোগাড় করে রাখতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৫৭)। তবে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার উদ্দেশ্যে, পণ্যের মূল্য আকাশ চুম্বি করার লক্ষ্যে যেকোন পণ্য গুদামজাত করা হারাম এবং অভিশাপের কাজ। সুতরাং এমন উদ্দেশ্যে খাদ্য গুদামজাত করা যাবে না। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘গুনাহগার ছাড়া কেউ পণ্য গুদামজাত করে না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬০৫)।


বৈধ অবৈধ


প্রশ্ন (৩৪) : আমরা মোবাইলে টাকা রিচার্জ করি। ৪৯ টাকা রিচার্জ করলে ৫০ টাকা নেওয়া হয়, তাহলে এক টাকা বেশি নেওয়া জায়েয হবে কি?

-শরিফুল ইসলাম
ঝিনাইদাহ।

উত্তর : এধরনের লেনদেন করা জায়েজ নয়। কেননা একই জাতীয় জিনিসের ক্ষেত্রে কম-বেশি করে লেনদেন করা সূদ। আর সূদ ভক্ষণ করা হারাম। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছন, ‘স্বর্ণ স্বর্ণের বিনিময়ে, রৌপ্য বৌপ্যের বিনিময়ে, গম গমের বিনিময়ে, যব যবের বিনিময়ে, খেজুর খেজুরের বিনিময়ে এবং লবন লবনের বিনিময়ে সমান সমান সমপরিমাণ ও হাতে হাতে (নগদ) হবে। অবশ্য এই দ্রব্যগুলো যদি একটা অপরটার সাথে বিনিময় হয়। (অর্থাৎ পণ্য এক জাতীয় না হয়) তোমরা যেরূপ ইচ্ছা করতে পার যদি হাতে হাতে (নগদে) হয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৪১৪৮; মিশকাত, হা/২৮০৯)। সুতরাং উক্ত এক টাকার কোনো বিনিময় না থাকায় তা হারাম।


পারিবারিক বিধান- বিবাহ-শাদী


প্রশ্ন (৩৫) : বিয়েতে আত্মীয়দের নিকট থেকে উপহার চেয়ে নেওয়া যাবে কি?

-আব্দুল্লাহ আল মামুন
বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : উপহার হচ্ছে যা কোনো ধরণের কামনা ছাড়া একে অন্যকে ভালোবাসার কারণে আনন্দ চিত্তে দিয়ে থাকে। আর চেয়ে নেওয়া একজন সামর্থবান ব্যক্তির জন্য লজ্জাকর। সুতরাং বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজনদের নিকট থেকে উপহার চেয়ে নেওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং শরীয়ত সমর্থিতও নয়। হাকিম ইবনু হিযাম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى ‘উপরের হাত (দাতার হাত) নিচের হাত (গ্রহীতার হাত) থেকে উত্তম’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৪২৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৩৩)। তবে আত্মীয়-স্বজন আনন্দ চিত্তে কিছু উপহার দিলে তা গ্রহণ করা জায়েয ও উত্তম।  উল্লেখ্য যে, বন্ধুত্বের খাতিরে কিছু চেয়ে নিলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা একজন ছাহাবী রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)–এর নিকট থেকে চাদর চেয়েছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/১২৭৭)।


পারিবারিক বিধানতালাক


প্রশ্ন (৩৬) : তালাক প্রদানের সঠিক পদ্ধতি কী? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : তালাক প্রদানের সঠিক পদ্ধতি হলো- তিন তুহুরে তিন তালাক প্রদান করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যখন স্ত্রীদের তালাক দিতে চাও তখন তাদেরকে তালাক দাও তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দতের হিসাব সঠিকভাবে গণনা করবে’ (আত-তালাক, ৬৫/১)। এখানে ইদ্দত বলতে তুহুরকে বুঝানো হয়েছে (ছফওয়াতুত তাফাসীর, ৩/৩৭৫; আল-মুয়াসসার, ১০/১৬৮; আত-ত্ববারী, ২৩/৪৩১; ফাতহুল কাদীর, ৭/২৩৯)। আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেন, ‘তালাকপ্রাপ্তা মহিলারা যেন তিন কুরু’ পর্যন্ত  নিজেদেরকে (পুনরায় বিয়ে) করা থেকে দূরে রাখে’ (আল-বাকারা, ২/২২৮)। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে তার স্ত্রীকে হায়েযা অবস্থায় তালাক দিলে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, তুমি তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দাও। এরপর সে পবিত্র হওয়া পর্যন্ত যেন বিরত থাকে। এরপর আবার হায়েযা হবে এবং পবিত্র হবে। এরপর  চাইলে সে রাখবে অথবা স্পর্শের পূর্বেই তালাক প্রদান করবে। আর এটাই হলো সেই সময়সীমা যার ব্যাপারে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭১)।


মাতার-পিতার মর্যাদা


প্রশ্ন (৩৭) : আমার মা টাকার লোভে কখনো কখনো মিথ্যা কথা বলে। আবার পরিবারে বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমি আমার মাকে অনেক গালিগালাজ করি (তবে অকথ্য ভাষায় নয়) এবং পরে নিজেই অনুতপ্ত হই। এতে আমার মা আমার জন্য বদ দু‘আ করে। এখন আমার করণীয় কী?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : পিতা-মাতার সাথে সর্বদায় ভালো ব্যবহার করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের (পিতা-মাতাকে) উফ শব্দ বলো না এবং ধমক দিয়ো না, তাদের সাথে নরম ভাষায় কথা বলো’ (আল-ইসরা, ১৭/২৩)। পিতা-মাতা মুশরিক হলেও তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে, খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তারা তোমাকে আামার সাথে শিরক করতে পিড়াপিড়ি করে যার ব্যাপারে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করো না, তবে তাদের সাথে দুনিয়ায় ভালো ব্যবহার করো’ (লুক্বমান, ৩১/১৫)। আসমা বিনতু আবূ বকর বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর যামানায় আমার মুশরিকা মা আমার নিকট আসত। আমি এ ব্যাপারে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট ফতওয়া জিজ্ঞস করে বললাম, আমার মা আমার কাছে আসে, সে ইসলাম বিদ্বেশী। আমি কি তারা সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সাথে সদাচারণ করো। অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করতে হবে একথা ঠিক। তবে গালিগালাজ করে প্রতিবাদ করা এটা নীতি বিরুদ্ধ কাজ।


প্রশ্ন (৩৮) : আমার বাবা বিড়ি সিগারেট খায়আর এর জন্য আমার নিকট টাকা চায় টাকা দেওয়া যাবে কি?

-শরিফুল ইসলাম
ঝিনাইদাহ।

উত্তর : দেওয়া যাবে না। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে, আর পাপকাজ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না’ (আল মায়েদা, ৫/২)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ ‘সৃষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির কেনো আনুগত্য নেই’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৯৫; মিশকাত, হা/৩৬৯৬)। অত্র আয়াত এবং হাদীছ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো ব্যক্তির আনুগত্য করা যাবে না। আর বিড়ি-সিগারেট খাওয়া হারাম। সুতরাং পিতাকে বিড়ি-সিগারেট কেনার জন্য টাকা দেওয়া যাবে না। বরং তাদেরকে বুঝাতে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত এর মাধ্যমে অন্যায় কাজে সহযোগিতা হয়ে থাকে। আর অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


পশু-প্রতিপালন


প্রশ্ন (৩৯) : ছহীহ হাদীছে এক পাপাচারী মহিলা কর্তৃক তৃষ্ঞার্ত কুকুরকে কুয়া থেকে পানি উঠিয়ে পান করানোর প্রতিদানে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। আবার ছহীহ হাদীছে বলা হয়েছে, যে বাড়িতে কুকুর থাকে সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না। বিষয়টির ব্যাখ্যা জানতে চাই। মুমিন ব্যক্তি কি কোনো অসুস্থ বিপন্ন কুকুরকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিলে তা ক্ষতিকর হবে?

-তাহেরা
রাজশাহী।

উত্তর : এক নারী কর্তৃক কুকুরকে পানি পান করিয়ে জান্নাত লাভের হাদীছটি ছহীহ বুখারীসহ বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। অত্র হাদীছের উদ্দেশ্য হলো, জীবের প্রতি দয়া করা। আর তা শুধু কুকুরের সাথে খাছ নয় বরং সকল প্রাণির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর প্রত্যেক জিনিসের প্রতি দয়া করাকে অত্যাবশ্যক করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৫৫)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এক ব্যক্তি কুকুরকে পানি পান করালেন। আল্লাহ তার এই আমল কবুল করলেন যার ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! পশুর ব্যাপারেও কি আমাদের জন্য ছওয়াব রয়েছে? তিনি বললেন, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণির জন্য ছওয়াব রয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৬০০৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৪৪)। প্রাণি শিকারের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যতীত শখের বসে কুকুর পালন করা যাবে না। কেননা অপ্রয়োজনীয় কুকুর পালনের কারণে প্রতিদিন বান্দার ছওয়াব হতে দুই ক্বীরাত পরিমাণ ছওয়াব কমে যায়। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাহিমাহুল্লাহু আনহুমা) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিকারী কুকুর কিংবা পশু রক্ষাকারী কুকুর ছাড়া অন্য কোন কুকুর পোষে, সে ব্যক্তির ছওয়াব থেকে প্রতিদিন দুই ক্বীরাত পরিমাণ কমে যায়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৪৮১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৭৪)। তবে অসুস্থতার কারণে সেবার উদ্দেশ্যে সুস্থতা অর্জন পর্যন্ত বাড়ি ব্যতীত কোনো সংরক্ষিত জায়গায় রেখে সেবা করা যেতে পারে।


হাদীছ- ছহীহ-যঈফ

প্রশ্ন (৪০) : ‘কোনো বান্দার পাপ বেড়ে গেলে আল্লাহ তাকে বেশি সন্তান দিয়ে তার পাপ মোচন করে দেন’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫২৩৬) অত্র হাদীছটি কি ছহীহ?

-আব্দুল্লাহ
নওগাঁ।

উত্তর: প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীছটি যঈফ। কারণ তাতে লাইছ ইবনু আবী সুলায়ম নামে একজন দূর্বল রাবী রয়েছে (তাখরীজুল ইহইয়া, ২/৪২; সিলসিলা যঈফা, হা/২৬৯৫)।


পোষাক-পরিচ্ছদ, হিজাব


প্রশ্ন (৪১) : মেয়েরা কি রেস্টুরেন্টে গিয়ে শুধুমাত্র খাওয়ার সময় মুখ খুলতে পারবে?

-তানজিনা সুলতানা সিনথী
সাদুল্যাপুর,গাইবান্ধা।

উত্তর : নারীগণ বাড়ির বাহিরে গমন করতে চাইলে, অবশ্যই পর্দা দ্বারা আবৃত হয়ে বের হবে। কেননা সৌন্দর্য পরিদর্শন করে ঘুরে বেড়ানো জাহিলী যুগের নারীদের অভ্যাস। এই মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাচীন জাহেলী যুগের নারীদের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩৩)। তিনি অন্যত্র বলেন, ‘তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয় (যখন তারা বাড়ীর বাইরে যায়), এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে এবং তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৯)। সুতরাং নারীরা বাড়ির বাহিরে যাবে না। প্রয়োজনে যেতে হলে মাহরামের সাথে ও পূর্ণ পর্দাসহ যাবে  (ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৮)। সুতরাং জরুরী কারণে যদি হোটেল বা রেস্টুরেন্টে যেতে হয় তাহলে, নির্জন ও নিরিবিলি স্থানে বসবে। এমতাবস্থায় মুখ খুলতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন,  فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ‘তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো’ (আত-তাগাবূন, ৬৪/১৬)।


প্রশ্ন (৪২) : আমরা ছহীহ হাদীছ থেকে জানতে পারি যে, অহংকারসহ ও অহংকার ছাড়া টাখনুর নিচে পুরুষদের জন্য কাপড় ঝুলানো জায়েয না। কিন্তু একটি নির্ভরোগ্য ফতওয়া ওয়েবসাইট-এ পড়লাম, চার মাযহাবের বেশির ভাগ আলেমের মতে অহংকার ছাড়া টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা মাকরুহ বা জায়েয। অথচ আমরা উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘটনা জানি, তিনি এক যুবককে কাপড় টাখনুর উপর উঠাতে বলেছিলেন। সঠিক সমাধান দিয়ে বাধিত করবেন।

-আহমেদ
ইসিবি চত্বর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা -১২০৬।

উত্তর : কুরআন ও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)–এর ছহীহ সুন্নাহ আমাদের জন্য অনুসরনীয়। সুতরাং ইমামদের কথা কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ মোতাবেক হলে, তাদের কথা অবশ্যই গ্রহণীয়। আর যদি তা কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর বিপরীত হয় তাহলে, কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর ছহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে, টাখনু গিরার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করা যাবে না। সুতরাং মুসলিম হিসাবে সকল মতামতকে অপেক্ষা করে সু্ন্নাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া কর্তব্য। আর ছহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, টাখনু গিরার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা হারাম এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘ইযারের বা পরিধেয় বস্ত্রের যে অংশ পায়ের গোড়ালির নীচে থাকবে, সে অংশ জাহান্নামে যাবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৮৭; নাসাঈ, হা/৫৩৩১; মিশকাত, হা/৪৩১৪)। আবূ যার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘তিন শ্রেণির লোকের সাথে আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দয়ার দৃষ্টি দিবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না, আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আযাব’। আবূ যার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ কথা শুনার সাথে সাথে বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যাদের জন্য অধঃপতন ও ধ্বংস, তারা কারা? তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, ১. ‘যে লোক পরনের কাপড় পায়ের গিরার নীচে পরে, ২. যে দান করে খোটা দেয়, ৩. যে লোক নিজের মাল বেশি চালু (বিক্রয়) করার চেষ্টায় মিথ্যা কসম করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০৬; মিশকাত, হা/২৭৫৯)। আর এসব হাদীছের বাস্তবতাতেই উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ঐ যুবককে টাখনুর ওপরে কাপড় উঠাতে বলেছিলেন।


রাস্তার আদব


প্রশ্ন (৪৩) : মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) থেকে নির্দেশনা রয়েছে যে, রাস্তার ডান পাশ দিয়ে হাঁটতে হবে। কিন্তু সরকারি নিয়ম বাম পাশ দিয়ে হাঁটতে হবে। এখন আমাদের করণীয় কী?

-নিয়ামুল হাসান
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : ইসলামের বিধান হলো- চলাচল ও গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে ডান পার্শ্ব দিয়ে চলা। দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের দেশসমূহসহ অনেক দেশে রাস্তার বাম পার্শ্ব দিয়ে চলাচল ও গাড়ি চালানোর আইন রয়েছে। যা জনগণকে মানতে বাধ্য করা হয়। বাধ্য হলে এমন আইন মেনে চলা যায়। কেননা এমন পরিস্থিতিতে সে নিরুপায়। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা যথাসম্ভব আল্লাহকে ভয় করো’ (আত তাগাবুন, ৬৪/১৬)। ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, অচিরেই স্বজনপ্রীতি প্রকাশ পাবে এবং এমন সব কর্মকান্ড ঘটবে যা তোমরা অপছন্দ করবে। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তদাবস্থায় আমাদের কী করতে বলেন? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করো, আর তোমাদের প্রাপ্যের জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করো (ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৪৬, ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৩)।


চিকিৎসা


প্রশ্ন (৪৪) : যে ব্যক্তি যাদু ও কুফুরী কালাম দ্বারা আক্রান্ত তারা কিভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করবে?

-গোলাম নূর
খুলনা।

উত্তর : যাদু, কুফুরী কালাম বা জিন দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির শারয়ী চিকিৎসা পদ্ধতি নিম্নোরূপ: ১. কোন জিনিস দ্বারা যাদু করা হয়েছে এবং তা কোথায় রাখা আছে? তা যদি অবগত হওয়া যায়, তাহলে সর্বপ্রথম তা তুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে। এতে যাদুর প্রভাব নষ্ট হয়ে যাবে (ছহীহ বুখারী, হা/৩২৬৮)।  ২. কী দ্বারা যাদু করেছে তা যদি জানা না যায় কিন্তু যাদুকরকে চেনা যায়, তাহলে তাকে যাদু নষ্টের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। সে যাদু নষ্ট করে দিলে আরোগ্য লাভ করা যাবে ইনশা-আল্লাহ (প্রাগুক্ত)। ৩. কুরআন ও সুন্নাহ’তে বর্ণিত আয়াত ও দু‘আগুলো পাঠ করা ও সেগুলো পাঠ করে ঝাড়-ফুঁর মাধ্যমে আরগ্য লাভ করা যায়। এক্ষেত্রে যেকোনো শিরক মুক্ত দু‘আ পাঠ করা যায়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন,‘ মন্ত্রের মধ্যে যখন শিরকের কিছু থাকবে না, তখন তা করাতে কোন ক্ষতি নেই (ছহীহ মুসলিম, হা/২২০০; মিশকাত, হা/৪৫৩০)।


নামকরণ


প্রশ্ন (৪৫) : কারো নাম যদি আব্দুল মতিন, আব্দুল বারী, আব্দুর রহিম হয় তাহলে নামের শুরু থেকে ‘আব্দুল, আব্দুর’ বাদ দিয়ে ডাকলে গুনাহ হবে কি?

-আব্দুর রাকিব
গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।

উত্তর :  আল্লাহর সত্ত্বার সাথে খাছ এবং বান্দার জন্য প্রযোজ্য নয় এমন গুণ বিশিষ্ট নামের শুরুতে عبد (‘আব্দুল বা আব্দুর’) যুক্ত করা আবশ্যক। কেননা এমন নামের শুরুতে عببد যুক্ত না করলে সৃষ্টিকে স্রষ্টার স্থানে বসানো হবে। যেমন.الرَزَّاقْ، الخَالِقْ، الحيَ ، القَيُّوْم، الجَبَّارْ،  الرَحْمَانْ ، المُصَوِّرْ ،  ) আর রহমান, আর রাযযাক্ব, আল খালেক্ব, আল হাই, আল ক্বইয়্যুম, আল জাব্বার, আল মুছাওয়ের)  ইত্যাদী। সুতরাং এ সকল নামের শুরুতে আব্দুর বা আব্দুল যুক্ত করে নাম রাখতে হবে এবং বলতে হবে। আর যে সকল গুণ বিশিষ্ট নাম আল্লাহর কর্ম বোঝায় এবং তা আল্লাহর জন্য খাছ নয়, সেগুলোর পূর্বে আব্দুর বা আব্দুল যুক্ত করা ভালো তবে জরুরী নয়। যেমন. نَافِعْ، عَلِيْ،  ‘নাফে‘ আলী’ (তুহফাতুল মাওদুদ, ১২৫ পৃ.; আসনাল মাত্বালেব শারহু রাওযাতুত ত্বলেব এর টিকা, ৪/২৪৩ পৃ.)।


প্রশ্ন (৪৬) : আমার নাম ‘মো. ইয়ানবী’। নামটি কতটা শরীয়তসম্মত? পড়াশোনা শেষ করে চাকুরী করছি। নাম পরিবর্তন করা সম্ভব না হলে করণীয় কী?

-মো. ইয়ানবী
নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : মুসলিম ব্যক্তির নাম শিরক মুক্ত সুন্দর অর্থপূর্ণ হওয়া বাঞ্চনীয়। আর ইয়া নবী অর্থ হে নবী!। নবী ব্যতীত কাওকো হে নবী! বলা যাবে না। মূলত নূর নবী, ইয়া নবী এই নামগুলো বিদ‘আতীদের থেকে এসেছে। সুতরাং এমন নাম জরুরী ভিত্তিতে পরিবর্তন করতে হবে। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এমন নাম পরিবর্তন করে দিতেন। ইবনু উমার (রাহিমাহুল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) (এক নারীর) আছিয়া ‘পাপিষ্ট’ নাম পরিবর্তন করে বলেন, তোমার নাম জামিলা ‘সুন্দরী’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২১৩৯; আবূ দাউদ, হা/৪৯৫১)। উল্লেখ্য যে, এফিডেভিট এর মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করা যায়।


ইবাদাত- প্রার্থনা


প্রশ্ন (৪৭) : আমরা জানি যে, দু’আর শুরুতে হামদ ও দরূদ পাঠের কথা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে (তিরমিযী, হা/৩৪৭৬)। দু’আর শেষে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু অনেক দু’আর বইয়ে দু’আর শেষে হামদ ও দরূদ পাঠের কথা লিখা আছে। প্রশ্ন হলো- হামদ ও দরূদ দ্বারা দু’আ শেষ করা কি শরীয়তসম্মত?

-মো. মিনহাজ পারভেজ
হড়গ্ৰাম, রাজশাহী।

উত্তর : হামদ তথা আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ পাঠের মাধ্যমে দু‘আ আরম্ভ করলে, দু‘আ কবুল হয় একথা ঠিক (তিরমিযী, হা/৩৪৭৬; ছহীহ আবূ দাঊদ, হা/১৩৩১)। আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)–র লিখিত ‘ছিফাতু ছালাতিন্নবী’ বইয়ে সূরা ইউনূসের ১০ নং আয়াতের আলোকে দু‘আ শেষে হামদ পাঠের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, وَآخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‘আর তাদের প্রার্থনার সমাপ্তি হয় ‘সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব আল্লাহর জন্য’ (ইউনূস, ১০/১০)। তবে দু‘আর শেষে দরূদ পাঠের কোনো বর্ণনা ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়নি। তাই শেষে দরূদ পাঠ করার সাথে দু‘আ কবুলের কোনো সম্পর্ক নেই।


প্রশ্ন (৪৮) : আমি শুনেছি যে আল্লাহর ৯৯টি নাম পড়ে কেউ যদি হাত তুলে দু‘আ করে, তাহলে তার দু‘আ কবুল হয়, এ কথা কি ঠিক?

-জুলকার
ঢাকা।

উত্তর : হ্যা, আল্লাহর গুণবাচক নাম উল্লেখ করে দু‘আ করলে দু‘আ কবুল হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুন্দর সুন্দর নামসমূহ তাঁরই। অতএব তোমরা এই নামগুলো ধরে তাঁকে ডাকো (আল-আ‘রাফ, ৭/১৮০)। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহর ৯৯টি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি ঐ নামগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখবে অথবা ধারাবাহিকভাবে পড়বে বা মুখস্থ রাখবে সে জান্নাতে যাবে (ছহীহ বুখারী, হা/২৭৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৭; মিশকাত, হা/২২৮৭)। উল্লেখ্য যে, হাত তুলে দু‘আ করা যায়। কেননা কেউ হাত তুলে দু‘আ করলে আল্লাহ তার খালি হাত ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন (তিরমিযী, হা/৩৫৫৬)।


বিবিধ


প্রশ্ন (৪৯) : এক প্রতিবেশি থেকে অপর প্রতিবেশি যদি খুবই সামান্য পরিমাণ (৫০, ১০০ গ্রাম) লবন ধার নেয় তাহলে সেটা ফেরত না নেওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কিছু বলেছে কি? আমি শুনেছি লবন, পানি কাউকো দিলে তা ফেরত নিতে হয় না।

-ইব্রাহিম
উত্তরখান, ঢাকা।

উত্তর : ঋণস্বরূপ নিলে অবশ্যই তা পরিশোধ করতে হবে। কেননা হুনায়ন যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) ছাহাবীগণকে নিয়ে গনীমতের উটের পাশে ছালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি উটের দেহ থেকে পশম নিয়ে তা তাঁর দু’ আঙ্গুলের মাঝে রেখে বললেন, হে লোকসকল! অবশ্যই এটা তোমাদের গনীমতের মাল। সুতা এবং সুঁই, আর যা তার চেয়ে পরিমাণে বেশী এবং যা তার চেয়ে কম, সবই তোমরা গনীমতের মালের মধ্যে জমা দাও। কেননা গনীমতের মাল চুরি করার ফলে কিয়ামতের দিন তা চোরের জন্য অপমান ও গ্লানি এবং জাহান্নামের শাস্তির কারণ হবে’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৮৫০, সিলসিলা ছহীহা, হা/৯৮০)। পানি, লবণ, আগুন চাইতে আসলে তা বাধা দেওয়া যাবে না মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (ইবনু মাজাহ, হা/২৪৭৪)।


প্রশ্ন (৫০) : আমি কিছু অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি। ডা. জাকির নায়েকের লেকচার দেখে তারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে অনেক আগ্রহী। তারা পবিত্র কুরআন পড়তে চায়। তাদেরকে আমি কুরআন মাজীদ উপহার দিতে চাচ্ছি। আমি কি তাদেরকে কুরআন মাজীদ দিতে পারব? যদি দিতে পারি তাহলে নির্ভরযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থ কোনটি দয়া করে জানাবেন।

-মো. হোসেন আলী
শৈলকূপা, ঝিনাইদাহ।

উত্তর : কোনো অমুসলিমকে কুরআন মাজিদের মূল কপি দেওয়া যাবে না। কেননা মুশরিকরা হলো নাপাক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় মুশরিকরা হলো নাপাক’ (আত-তওবা, ৯/২৮)। যদিও সে কুরআন নিয়ে গবেষণা করার আশা ব্যক্ত করে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাহিমাহুল্লাহু আনহুমা) বলেন, নিশ্চয় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) শত্রু ভুখন্ডে কুরআন নিয়ে সফর করতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৯৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৬৯)। তবে অমুসলিমকে পুরো কুরআন মাজীদ নয়, বরং কুরআনের কিছু অংশ বিশেষ দেওয়া যেতে পারে। আর নির্ভরযোগ্য অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আধুনিক প্রকাশনী হতে প্রকাশিত অনুবাদ।