ঈমান-আক্বীদা


প্রশ্ন (১) : আযানের সময় না-কি আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। ২৪ ঘন্টার মধ্যে যেকোনো সময় পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে আযান হয়। অর্থাৎ এমন কোনো সময় বাকি থাকে না যে, সে সময়ে পৃথিবীর কোথাও আযান হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো- তাহলে কি আসমানের দরজা সবসময় খোলা থাকে?

-শামিম আক্তার
 বারজুমলা, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : প্রত্যেক আযানের সময় আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় একথা ঠিক। রাসূল a বলেছেন, إِذَا ثُوِّبَ بِالصَّلاَةِ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَاسْتُجِيبَ الدُّعَاءُ ‘অর্থাৎ যখন ছালাতের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং দু‘আ কবুল করা হয় (সিলসিলা ছহীহা, হা/১৪১৩; জামে‘উল আহাদীছ, হা/১১৯৭)। তবে দরজা কিভাবে খোলা হয় আর কিভাবে বন্ধ করা হয় এটা গায়েবের বিষয়। গায়েব সম্পর্কে মহান আল্লাহ ভালো জানেন। গায়েবের জগতকে আমাদের দুনিয়ার সাথে তুলনা করে প্রশ্ন উত্থাপন করা ঈমান বিরোধী। রাসূল a বলেছেন আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। আর এটাই ঈমানের দাবী।


শিরক


প্রশ্ন (২) : শিরকের গুনাহর ক্ষমা পাওয়ার কোনো উপায় আছে কী?

-সিজান বিন জহরুল
পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা।

উত্তর : মৃত্যুর পূর্বে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা হবে না এমন কোনো পাপ নেই। বরং খালেছ অন্তরে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইলে আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন। মহান আল্লাহ বলেন, বল! হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছো- আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (আয-যুমার, ৩৯/৫৩)। আর মৃত্যুর পর আল্লাহ চাইলে বান্দার সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন তবে, শিরকের পাপ ক্ষমা করবেন না। এমর্মে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করবেন না ইহা ছাড়া অন্য সব পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যে কেহ আল্লাহর অংশী স্থির করে সে এক মহা অপবাদ আরোপ করল’ (আন-নিসা, ৪/৪৮)। শিরক থেকে বাঁচার জন্য শিরক সম্পর্কে জেনে সেগুলো থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আর আল্লাহর নিকট দু‘আ করতে হবে। শিরক থেকে বাঁচার জন্য নিম্নোক্ত দু‘আটি পড়া যায়-

أَللهم إنِّيْ أَعُوْذُ بِك أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ وَأَسْتَغْفِرُك لِمَا لَا   أَعْلَمُ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু-বিকা আন উশরিকা বিকা, ওয়া আনা আ‘লামু ওয়া আসতাগফিরুকা লেমা লা-আ‘লামু’ অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! আমি জেনে বুঝে তোমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করা থেকে তোমরা নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং তেমার নিকট ক্ষমা চাচ্ছি ঐ পাপ থেকে যা না জেনে করি বা করবো’ (ইমাম বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৭১৬, সনদ ছহীহ)।


বিদ‘আত


প্রশ্ন (৩) : হাদীছ দ্বারা জানতে পারি যে, দুই শ্রেণির মানুষ হাউজে কাওছারের নে‘আমত থেকে বঞ্চিত হবে। তাদের অন্তর্ভুক্ত হলো, বিদ‘আতী। প্রশ্ন হচ্ছে, যে সকল আলেম ইমামগণ পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের পর, বিবাহের পর সম্মিলিত মুনাজাত করে, তারা কি সেদিন হাওযে কাওছারের পানি থেকে বঞ্চিত থাকবে?

-শাহজালাল
মাহিগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : প্রথমেই জানতে হবে যে, নেকির আশায় যা শরীআতে করা হয় অথচ এর প্রমাণে কোনো দলীল পাওয়া যায় না তাই হলো বিদআত। আর ফরজ ছালাতের পর কিংবা বিবাহের পর সম্মিলিত মুনাজাত করা মর্মে কোনো দলীল পাওয়া যায় না তাই তা বিদআত বলেই বিবেচিত হবে। আর বিদআতীরা হাওযে কাউছারের পানি থেকে বঞ্চিত হবে এ মর্মে রাসূল a বলেন, আমি হাউযে কাউছারের ক্ষেত্রে তোমাদের আগে আগে থাকবো। তোমাদের কাউকে আমার কাছে নিয়ে আসার সময় তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে যেমনটি হারানো উটকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন আমি বলবো, কেন এমনটি তার সাথে করা হচ্ছে? উত্তরে বলা হবে, আপনি জানেন না যে তারা আপনার পরে কতই না নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছে। তখন আমি বলবো, দূর হও (ছহীহ মুসলিম, হা/৬১১৪; শারহু মুসলিম লিন নাবাবী, ৩/১৩৭; আত-তাজকিরা, ১/৩৪৮)।


প্রশ্ন (৪) : মৃত ব্যক্তির কবর খননকারীদের জন্য চল্লিশা ব্যতীত ভিন্ন কোনো দিনে খানাপিনার আয়োজন করা যাবে কি?

-আব্দুল বারী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : এ ধরনের খানাপিনার আয়োজন করার পক্ষে শারঈ কোন দিকনির্দেশনা নেই। বরং তা অজ্ঞতার যুগের প্রথা। জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ আল-বাজালী c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা মৃত ব্যক্তির পরিবারের নিকট একত্রিত হওয়া এবং দাফনের পরে এ উপলক্ষ্যে খানাপিনার আয়োজন করাকে জাহেলী যুগের ক্রন্দন বা বিলাপ হিসাবে গণ্য করতাম (মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৮৬৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৬১২)। সুতরাং সামাজিকতা রক্ষার নামে এ ধরনের খানাপিনার আয়োজন করা বিদ‘আত ও অপচয়, যা পরিত্যাজ্য। আয়েশা g বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করবে যা শরী‘আতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।


ছালাত


প্রশ্ন (৫) : বর্তমানে ফরয ছালাতে সালাম ফেরানোর পর ‘আল্লাহু আকবার’ না-কি তিনবার ইস্তিগফার করতে হবে তা নিয়ে খুব আলোচনা চলছে। এই মর্মে সঠিক সমাধান জানতে চাই।

-ছিয়াম
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ৪২ ওয়ার্ড, বেরাইদ।

উত্তর : প্রথমে উচ্চস্বরে তাকবীর পরে আস্তাগফিরুল্লাহ মর্মে বর্ণিত হাদীছ স্পষ্ট। ভারত উপমহাদেশের প্রায় সকল আহলে হাদীছ আলেম এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন (মিরকাতুল মাফাতীহ, ৩/৩১৪)। ইবনু আব্বাস h হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল a-এর ছালাত শেষ হওয়া বুঝতে পারতাম তাকবীর শ্রবণের মাধ্যমে (ছহীহ বুখারী, হা/৮৪২)। এই হাদীছের উপর ইমাম আবূ দাউদ ও ইমাম ইবনু খুজায়মা p ছালাতের পর তাকবীর নামে অধ্যায় রচনা করেছেন (আবু দাউদ, হা/১০০২; ছহীহ ইবনু খুজায়মা, হা/১৭০৬)। আর ইমাম বুখারী p ‘ছালাতের পর যিকির’ নামে অধ্যায় রচনা করেছেন। ইমাম বুখারী p উক্ত অধ্যায় দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন অন্য হাদীছে যেখানে ছালাতের পর যিকিরের কথা এসেছে সেই যিকিরের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে তাকবীর। যেমন ঈদায়নের ক্ষেত্রে যিকিরের কথা বলা হয়েছে আর ঈদায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যিকির হচ্ছে তাকবীর। ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী p ছালাফদের থেকে ছালাতের পর তাকবীর বলার কিছু আমলও পেশ করেছেন (ইবনু রজব, ফাতহুল বারী, ৭/৩৯৬)। সুতরাং দলীলের আলোকে ছালাতের পর তাকবীর বলাই উত্তম। তবে এ ব্যাপারে পরস্পরে বাড়াবাড়ি হতে বিরত থাকাই শ্রেয় হবে। আর আল্লাহই অধিক অবগত।


প্রশ্ন (৬) : ইমাম মুক্তাদীগণসহ বিশ রাকা‘আত ছালাত আদায় করেন। ছহীহ ‍সুন্নাহর উপর আমল করার উদ্দেশ্যে ৮ রাকা‘আত তারাবীহ পড়ে আমি বের হয়ে আসলে পাপ হবে কি?

-আব্দুল কায়্যুম
সৈয়দপুর, নীলফামারী।

উত্তর : আয়েশা g আট রাকাআতের কথাই বলেছেন। আবূ সালামাহ ইবনু ‘আবদুর রাহমান p হতে বর্ণিত যে, তিনি আয়েশা g-কে জিজ্ঞেস করলেন, রমাযান মাসে আল্লাহর রাসূল a-এর ছালাত কেমন ছিল? আয়েশা g বলেন, নবী a রমাযান মাসে ও অন্যান্য সব মাসের রাতে এগার রাক‘আতের অধিক ছালাত আদায় করতেন না। প্রথমে চার রাক‘আত পড়তেন। এ চার রাক‘আত আদায়ের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর আরো চার রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন। এ চার রাক‘আতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিন রাক‘আত আদায় করতেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতর ছালাত আদায়ের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েন? নবী a বললেন, আমার চোখ ঘুমায়, আমার অন্তর ঘুমায় না (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৬৯)। উমার c আট রাকাতেরই আদেশ করেছিলেন, বিশ রাকাতের নয় (মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হা/৭৭৩০)। পক্ষান্তরে বিশ রাকাআতের প্রমাণে যত হাদীছ আছে সবই জাল ও যঈফ। এমতাবস্থায় আট রাকাআত আদায় করেই চলে আসতে হবে। কেননা এটিই হলো ছহীহ হাদীছের দাবী।


প্রশ্ন () : তারাবীহর ছালাত মসজিদে না পড়ে বাড়ির ছাদ, গ্যারেজ বা অন্য স্থানে হাফেয নিয়োগ করে পড়া ছহীহ হবে কি?

-শওকত হোসেন
মানিকদি নামাপাড়া, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট।

উত্তর : তারাবীহর ছালাত নফল ছালাত। আর নফল ছালাত বাড়িতে পড়াই উত্তম। ইবনু উমার h থেকে বর্ণিত, রাসূল a বলেছেন, ‘তোমাদের বাড়িকে তোমরা কবর বানিয়ে না ফেলে কিছু ছালাত (নফল ছালাত) তোমরা বাড়িতে আদায় করো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৭৭৭)। তাই তারাবীহর ছালাত বাড়িতে, গ্যারেজে কিংবা অন্য স্থানে পড়া যায়। বরং এতে উক্ত স্থানগুলো কবরের মতো হওয়া থেকে মুক্ত হবে। তবে উক্ত স্থানগুলোতে তারাবীহর সাথে এশা ছালাত পড়া যাবে না। কারণ ফরয ছালাতের জন্য ওযর না থাকলে মসজিদে যাওয়া জরুরী।


প্রশ্ন (৮) : তারাবীহ সমাপ্ত হওয়ার পর ইমামের সাথে বিতর পড়া কি আবশ্যক? না-কি নিজে নিজে বাড়িতে পড়ে নিলেও হবে?

-মো. ওয়ালীদ
চকবাজার, চট্টগ্রাম।

উত্তর : তারাবীর ছালাত জামাআতে পড়া যেমন জরুরী নয়, তেমনই বিতর ছালাতও জামাআতে পড়া জরুরী নয়। কোন মুসল্লীর আরো ছালাত আদায়ের জন্য অথবা একাই বিতর ছালাত আদায়ের জন্য তারাবীর ছালাতের পরে বাড়ি চলে যাওয়া, এমন আমলের কোন প্রমাণ নেই। বরং বিতরসহ তারাবী একা পড়াই উত্তম। রাসূল a বলেছেন, হে লোকেরা! তোমরা নিজ নিজ ঘরেও ছালাত আদায় করো। কারণ, মানুষের সবচেয়ে উত্তম ছালাত হল যা সে তার ঘরে আদায় করে, তবে ফরয ছালাত ছাড়া (ছহীহ বুখারী, হা/৭২৯০)।


প্রশ্ন (৯) : ছালাতের সিজদা ও শেষ বৈঠকে ইসমে আজম পড়া যাবে কি-না?

-জসিমুদ্দীন রায়হান
বায়েজিদ বোস্তামী, চট্টগ্রাম।

উত্তর : সেজদা ও শেষ বৈঠকে উভয় জায়গাতেই পড়া যাবে। কেননা শেষ বৈঠকে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত যেকোনো দু‘আ পাঠ করা যায়। শেষ বৈঠকে দু‘আ পাঠ করার ব্যাপারে রাসূল a বলেছেন, ثُمَّ يَتَخَيَّرُ مِنَ الثَّنَاءِ مَا شَاءَ ‘অর্থাৎ (তাশাহহুদের পর) হামদ সানাসহ যা ইচ্ছা পড়তে পারবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৩২৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৯২৪; মিশকাত, হা/৯০৯)। ইসমে আযম পাঠ করলে দু‘আ কবুল হয়। সুতরাং শেষ বৈঠকে যেহেতু দু‘আর স্থান তাই তাশাহহুদের পর দরূদ তারপর ইসমে আযম পড়ে আল্লাহর নিকট দু‘আ করা যায়।


প্রশ্ন (১০) : আমাদের বরগুনা জেলায় মহিলা মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইসলাম কী বলে? আমার ঘরের মা-বোনরা সেখানে যেতে পারবে কি?

-রেজাউল করিম
বরগুনা।

উত্তর : মহিলারা তাদের বাড়িতে একাকি অথবা জামা‘আতবদ্ধভাবে ছালাত আদায় করতে পারে এবং তারা তাদের ইমামতিও করতে পারে। যার মধ্যে মহিলা মাদরাসাগুলোও অন্তর্ভূক্ত হবে। এ মর্মে উম্মুল হাসান g হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলের স্ত্রী উম্মু সালামা g-কে মহিলাদের ইমামতি করতে দেখেছেন। আর তিনি তাদের সাথে তাদের কাতারের (মাঝে) দাঁড়াতেন (মুছান্নাফে ইবনু আবী শায়বা, ৪৯৮৯; আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন)। অনুরুপভাবে আয়েশা gও ফরজ ছালাতের ক্ষেত্রে মহিলাদের নিয়ে ইমামতি করতেন। আর ইমামতি করার সময় তাদের মাঝে দাঁড়াতেন (বায়হাক্বী, হা/৫১৩৮)। ইমাম নববী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন (আল-খুলাছাহ, ২/৩৯)। ইবনু বায p বলেছেন, মহিলারা তাদের বাড়িতে জামা‘আতের সহিত ছালাত আদায় করতে পারে (মাজমূআয়ে ফাতাওয়া, ১২/৭৮)। অনুরুপভাবে লাজনা আদ-দায়েমাতেও একই কথা বলা হয়েছে, (আল-লাজনা আদ-দায়েমা, ৮/২১৩)। তবে পৃথকভাবে মহিলাদের মসজিদ তৈরি করে জামা‘আতের সহিত ছালাত আদায় করা মর্মে কোনো দলীল পাওয়া যায় না। বরং পুরুষদের মসজিদেই আলাদা ব্যবস্থার মাধ্যমে মেয়েরা ছালাত আদায় করবে। বিধায় এমন অবস্থা হতে সকলকে বিরত থাকতে হবে। যার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলা ও ফিতনার মাঝে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহই অধিক জানেন।


প্রশ্ন (১১) : ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে কি ফজরের সুন্নাত আদায় করা যায়?

-শামিম
মিরপুর-১২, ঢাকা।

উত্তর : না, ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে ফজরের সুন্নাত আদায় করা যায় না। কেননা, ফজরের দুই রাকা‘আত সুন্নাত ওয়াক্তের সাথে সম্পৃক্ত। ওয়াক্ত হলে কেবল তা আদায় করা যাবে, চাই আযান হোক অথবা না হোক। আয়েশা g বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘ফজরের দুই রাকা’আত সুন্নাত দুনিয়া ও এর মাঝে যা কিছু আছে সব কিছুর চেয়ে উত্তম’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৭২৫; নাসাঈ, হা/১৭৫৯; মিশকাত, হা/১১৬৪)।


যাকাত


প্রশ্ন (১২) : কোনো ব্যক্তি যদি ছালাত ও ছিয়াম আদায় না করে, তাহলে তার ফিতরা নেওয়া যাবে কি?

-তারিকুজ্জামান
গাংনী, মেহেরপুর।

উত্তর : হ্যাঁ, ফিতরা নেওয়া যাবে। এটি একটি ইসলামের বিধান। আল্লাহ তাআলা বলেন, সুতরাং তোমাদের যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে ছিয়াম পালন করে’ (আল বাকারা, ২/১৮৫)। ইবনু উমার c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রত্যেক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল a যাকাতুল ফিতর হিসেবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক সা’ পরিমাণ আদায় করা ফারয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের ছালাতের বের হবার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩, ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৩, মিশকাত, হা/১৮১৫)। অত্র হাদীছে ছোট বড়সহ সকল মুসলিমকেই যাকাতুল ফিতর দেওয়ার আদেশ করা হয়েছে। ইবনু আব্বাস c বলেন, রাসূল a  ছাদাক্বাতুল ফিতর ফারয করেছেন- অশ্লীল কথা ও বেহুদা কাজ হতে (রমাযানের) ছিয়ামকে পবিত্র করতে এবং মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য (আবূ দাউদ, হা/১৬০৯, মিশকাত, হা/১৮১৮)।


প্রশ্ন (১৩) : যাকাতের টাকা দিয়ে বোনের শ্বশুর বাড়িতে ইফতার অনুষ্ঠান করা যাবে কি?

-খালেদ মাহমুদ
চট্টগ্রাম।

উত্তর : যাকাতের সম্পদকে আল্লাহ তা‘আলা ফকীর মিসকীনসহ আট শ্রেণির মানুষের হক্ব বলেছেন (আত তাওবা, ৯/৬০)। যাকাত দাতাকে যাকাতের হক্বদারের নিকটেই তার যাকাত দিতে হবে। সেখানে সে নিজ স্বাধীনতা ব্যবহার করতে পারবে না। তবে যদি বোন যাকাতের হক্বদার হয় আর হক্ব হিসেবে তাকে দেওয়া হয়, তখন সে তার নিজস্ব সম্পদ হিসেবে মানুষকে দাওয়াত দিতে পারে। আয়েশা g হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী a-এর কাছে গোশত হাযির করা হলো। আমি বললাম, এটা বারীরাকে ছাদাকাহস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। নবী a বললেন, এটা বারীরাহ’র জন্য ছাদাক্বা, আর আমাদের জন্য হাদিয়া বা উপহার (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৯৩, ছহীহ মুসলিম, হা/১০৭৪, ১০৭৫)।


প্রশ্ন (১৪) : আমাদের তিন বন্ধুর একটি ঔষধের দোকান আছে। বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষ টাকার মতো ঔষধ আছে। এ দোকানের কি যাকাত দিতে হবে?

-শহীদুল ইসলাম
প্রবাসী, আল-মক্কা আল-মুকাররামা।

উত্তর : এই সম্পদের যাকাত দিতে হবে। কেননা ৫ লক্ষ টাকার মালিক যদি তিনজনেই হয়, তাহলে প্রত্যেককেই যাকাত দিতে হবে। যাকাতের ব্যাপারে স্বর্ণ ও রূপার হিসাব করা হয়। স্বর্ণের হিসেবে ৫ লক্ষ আর রৌপ্যের হিসেবে প্রায় ৭০ হাজার টাকা হলেই তাতে যাকাত দিতে হবে। বর্তমান বাজারে ২০০ দিরহাম সমান প্রায় ৭০ হাজার টাকা আর ৭.৫ ভরি স্বর্ণ সমান প্রায় ৫ লক্ষ টাকা।


প্রশ্ন (১) : আমি একজন ছাত্র। পড়া-লেখার পাশাপাশি প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু টাকা জমিয়েছি। এই টাকার যাকাত দিতে হবে কি?

-শফিকুল ইসলাম, পুঠিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : প্রাইভেট পড়িয়ে যে টাকা জমা করেছেন তা নিসাব পরিমাণ হলে এবং পুরো এক বছর অতিবাহিত হলে সেই টাকার যাকাত দিতে হবে। নবী করীম a বলেন, যখন তোমার কাছে দুইশত দিরহাম থাকবে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে এমন অবস্থায় তুমি তাতে পাঁচ দিরহাম যাকাত আদায় করবে। আর যদি তোমার কাছে বিশ দিনার থাকে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে তাতে অর্ধ দিনার যাকাত আদায় করবে (আবূ দাউদ, হা/১৫৭৩)। অতএব রূপা হিসেবে প্রায সত্তর হাজার এবং স্বর্ণের হিসেবে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা এক বছর পরিমাণ থাকলে তাতে যাকাত দিতে হবে।


প্রশ্ন (১) : পিতা-মাতা দরিদ্র হলে তাদেরকে যাকাতের টাকা দেওয়া যাবে কি?

-রিয়াদ হোসাইন, মুন্সিগঞ্জ, সদর।

উত্তর : পিতা-মাতাকে যাকাতের মাল দেওয়া যায়েয নয়। কেননা সন্তান-সন্ততি এবং তাদের সম্পদ মূলত পিতা-মাতারই সম্পদ। আমর ইবনু শুআয়েব c তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী a-এর নিকট এসে বললো, আমার নিকট ধন-সম্পদ আছে এবং আমার পিতা দরিদ্রতার দরুন আমার ধন-সম্পদের মুখাপেক্ষী। তখন তিনি বললেন, তুমি ও তোমার ধন-সম্পদ তোমার পিতার। তোমারদের সন্তান সন্ততিগণ তোমাদের উত্তম রিযিক্ব। সুতরাং তোমারা সন্তানের উপার্জন খাও’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৩০; ইবনু মাজাহ, হা/২২৯২; আহমাদ, হা/৬৬৭৮; মিশকাত, হা/৩৩৫৪)।

উল্লেখ্য যে, পিতামাতা নিজ স্বাধীনতায় পরিমিতভাবে ছেলের সম্পদ থেকে ভোগ করতে পারবে। যদিও ছেলের সম্পদের ফারায়েজ অনুযায়ী মালিক ছেলে নিজেই।


প্রশ্ন (১৭) : জনৈক বিধবা মহিলা ১,৯০,০০০/= (এক লক্ষ নব্বই হাজার) টাকা তিন বছর মেয়াদে পোস্ট অফিসে জমা রেখেছে এবং ১০০০/= (এক হাজার) টাকা মাসিক মুনাফা হিসাবে ২,০০,০০০/= (দুই লক্ষ) টাকা ইসলামী ব্যাংকে জমা রেখেছে এবং দেড় বিঘার মতো মাঠের আবাদি জমি আছে। এই সমস্ত আয় হতে সে কোনো রকম তার সংসার চালিয়ে নিচ্ছে। এখন তার উপর যাকাত দেওয়া ফরয হবে কি-না? যদি ফরয হয় তবে তার পরিমাণ কতটুকু?

-মিজান
গাংনী, মেহেরপুর।

উত্তর : প্রথমত, ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সূদ সুস্পষ্ট হারাম। ফিক্সড ডিপোজিট করা সুস্পষ্ট হারাম। কারণ আল্লাহ সূদকে হারাম করেছেন (আল বাকারা, ২/২৭৫)। তাই উক্ত টাকা ব্যাংক থেকে তুলে উৎপাদনমূখী কোনো কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কোনো লোকের সহযোগিতা নিবে। দ্বিতীয়ত, সাড়ে বায়ান্নো ভরি রৌপ্য কিংবা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের মূল্য সমপরিমাণ টাকা হলে তাতে যাকাত ফরয হয় (আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩)। যেহেতু রৌপ্যের মূল্য বিবেচনায় তার টাকা নিছাব পরিমাণ হয়ে গেছে, তাই তাতে শতকরা আড়াই টাকা তথা এক লক্ষে আড়াই হাজার টাকা হারে যাকাত দিতে হবে (আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩)। আর আবাদি জমির ক্ষেত্রে ফসলের ওশর দিতে হবে।


প্রশ্ন (১৮) : নেসাব পূর্ণ হওয়ার পর বছরের মাঝে যে টাকা আয় হয়েছে সেগুলোর হিসাব ও যাকাতের হিসাব কিভাবে করব?

-উবায়দুল্লাহ
খুলনা।

উত্তর : যাকাতের হিসাব করার ক্ষেত্রে দুইটি বিষয় জেনে রাখা জরুরী। আর তা হলো- (১) সম্পদ নেসাব পরিমান হওয়া (২) সম্পদের উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া। বিধায় যখন সম্পদ নেসাব পরিমান হবে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে তখন যাকাত আদায় করতে হবে। আর এ কথাও জেনে রাখা জরুরী যে, নেসাব পূর্ণ হওয়ার পর বছরের মাঝে বা শেষের দিকে অথবা শুরুর দিকে যা কিছুই  অর্জিত হোক না কেন তার যাকাত আদায় করতে হবে। এ মমে নবী করীম a বলেন, যখন তোমার কাছে দুইশত দিরহাম থাকবে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে এমন অবস্থায় তুমি তাতে পাঁচ দিরহাম যাকাত আদায় করবে। আর যদি তোমার কাছে বিশ দিনার থাকে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে তাতে অর্ধ দিনার যাকাত আদায় করবে (আবূ দাউদ, হা/১৫৭৩)।


প্রশ্ন (১৯) : ব্যবহৃত স্বর্ণের যাকাত দিতে হবে কি?

-তাসকিয়া ‍সিদ্দীক
রাঙ্গামাটি।

উত্তর : হ্যাঁ, ব্যবহৃত স্বর্ণের যাকাত দিতে হবে। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, এক মহিলা আল্লাহর রাসূলের কাছে আসল, এমন অবস্থায় তার মেয়ের হাতে স্বর্ণের দুটি বালা ছিল। তা দেখে রাসূল a বললেন, তুমি কি এর যাকাত আদায় কর? উত্তরে সে বলল, না। তখন রাসূল a বললেন, তোমাকে কি এটা আনান্দ দিতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে ক্বিয়ামতের দিন আগুনের দুটি বালা পরাবেন। (এ কথা শুনে) সে বালা দুটি খুলে বলল, তা আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য (আবূ দাউদ, হা/১৫৬৩)। উম্মু সালামা g হতে বণিত, তিনি পায়ে স্বর্ণের নূপুর ব্যবহার করতেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি কানয বলে গন্য করা হবে? উত্তরে তিনি বললেন, যা যাকাতের নেসাব পরিমাণ হয়ে যায় এবং তাতে যাকাত দেওয়া হয় তা কানয বলে বিবেচিত হবে না (দারাক্বুৎনী, হা/১৯৭৩)। অত্র হাদীছে যাকাত দিতে হবে না এমনটি বলেননি। বরং বলেছেন, যার যাকাত আদায় করা হয় তা কানয বলে বিবেচিত হবে না। অতএব যাকাত আদায় করতে হবে। আর অলংকারের ক্ষেত্রে যাকাত নেই মমে যে হাদীছ বণিত হয়েছে সেটিকে আলবানী p যঈফ বলেছেন (জামেউছ ছাগীর, হা/১০৩৭৪)।


প্রশ্ন (২০) : প্রচলিত লুঙ্গি, শাড়ী কিনে যাকাত প্রদানের বিধান কি? যাকাতের টাকা দিয়ে সমাজে নলকূপ, কুঁয়া, রাস্তা-ঘাট তৈরি বা সংস্করণ করে দিলে যাকাত আদায় হবে কি?

-নাহিদ আলী, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : যে সম্পদের উপর যাকাত ফরয হয়েছে, সেই সম্পদ দিয়েই যাকাত বের করা জরুরী। যেমন : শস্যের যাকাত শস্য দিয়ে, প্রাণীর যাকাত প্রাণী দিয়ে, স্বর্ণের যাকাত স্বর্ণ দিয়ে এবং রৌপ্যের যাকাত রৌপ্য দিয়ে দিতে হবে। তবে ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে যেহেতু পণ্যের উপর যাকাত ফরয হয় না; বরং পণ্যের মূল্যের উপর যাকাত ফরয হয়, তাই ব্যবসায়িক পণ্যে টাকা দিয়েই যাকাত দিতে হবে। কিন্তু টাকার পরিবর্তে লুঙ্গি, শাড়ি দিয়ে যাকাত দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতি মূলত যাকাতে ফাঁকি দেওয়ার নামান্তর। কারণ এর মাধ্যমে নামকাওয়াস্তে কিছু লুঙ্গি-শাড়ি মানুষকে দেখানো হয় যে, সে যাকাত দিচ্ছে। এর মাধ্যমে অভাবীর কোন কল্যাণ হয় না। আবার তাদের পছন্দ মতো কাপড়টিও তারা নিতে পারে না। সম্পদ ব্যক্তিগতভাবে পরিবর্তন করতে পারবে না। তবে সরকারীভাবে পরিবর্তন করে সেটি দিয়ে নলকূপ  ‍কুয়া, রাস্তাঘাট ইত্যাদী তৈরি করতে পারবে।


প্রশ্ন (২১) : বিগত কয়েক বছর আমি যাকাত প্রদান করিনি। এখন আমার করণীয় কী?

-সোলায়মান
বরিশাল।

উত্তর : যাকাত একটি ফরয ইবাদত। অলসতা কিংবা কৃপণতাবশত যাকাত আদায় না করলে যাকাত মওকূফ হয় না। বরং তার কাযা আদায় করা জরুরী। কারণ তা বান্দার হক। তাই পূর্বের বছরগুলোতে সম্পদের পরিমাণ কত ছিল তা নির্দিষ্টভাবে জানা থাকলে সেই অনুসারে অথবা নির্দিষ্ট হিসাব না থাকলে আনুমানিক হিসাব ধরে তার যাকাত আদায় করে দেওয়া জরুরী (মাজমূউল ফাতাওয়া লি ইবনি উছায়মীন, ১৮/৩০২)। আর এর জন্য রমাযান মাসের অপেক্ষা করা যাবে না। বরং সাথে সাথে দিয়ে দিতে হবে।


প্রশ্ন (২২) : প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের টাকার উপর যাকাত দিতে হবে কি?

-আকবার আলী
ঢাকা, উত্তরা।

উত্তর : যাকাত দিতে হবে একথাই ঠিক। যদি তা উঠানো  সম্ভব হয় তাহলে উঠিয়ে অন্যান্য সম্পদের সাথে মিলিয়ে যাকাত দিতে হবে। আর সম্ভব না হলে যাকাত দিবে না। যখন টাকা উত্তলন করবে তখন শুধু এক বছরের যাকাত আদায় করে দিবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে বিধান চাপিয়ে দেন না’ (আল-বাক্বারা, ২/২৮৬)।


প্রশ্ন (২৩) : স্ত্রী তার নিজস্ব স্বর্ণালাঙ্কারের যাকাত স্বামীর থেকে টাকা নিয়ে প্রদান করলে যাকাত আদায় হবে কি?

-সিজান
মেহেরপুর।

উত্তর : স্ত্রী তার নিজস্ব স্বর্ণালাঙ্কারের যাকাত আদায় করার ক্ষেত্রে নিজের টাকা হতেই দিবে। কারণ হাদীছে এমনটি বলা হয়েছে যে, যদি তোমার দুইশ দিরহাম থাকে এবং পূণ এক বছর তাতে অতিবাহিত হয় তাহলে তাতে পাচঁ দিরহাম যাকাত আদায় করবে (আবূ দাউদ, হা/১৫৭৩)। অত্র হাদীছে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, অন্য কারো দিকে নয়। তবে স্বামী যদি খুশি মনে দিয়ে থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। তবুও এমন অবস্থা হতে বিরত থাকাই ভালো। কারণ এতে স্বামীর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহই অধিক অবগত।


প্রশ্ন (২৪) : অন্য মাসের চেয়ে রামাযান মাসে যাকাত বের করার কোনো গুরুত্ব ও ফযীলত আছে কি

-আবু আব্দুল্লাহ
নাটোর।

উত্তর : রামাযান মাসে যাকাত বের করা ভলো তবে নির্ধারিত সময়েই যাকাত দেওয়া উত্তম। যাকাতের কয়েকটি নিয়ম আছে। তা হলো, পুরো এক বছর অতিবাহিত হলেই যাকাত দেওয়া ফরজ। কিন্তু ফসলের ক্ষেত্রে ফসল তোলার দিন ওশর বের করতে হবে। রামাযানের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তোমরা ফসলের হকসমূহ আদায় করো যেদিন ফসল কর্তন কর সেদিনই (আল আনআম, ৬/১৪১)। তবে নিসাব পরিমাণ সম্পদে বছর পূর্ণ  হওয়ার আগেও যাকাত দেওয়া যাবে। আলী c থেকে বর্ণিত, একদা আব্বাস c নবী a এর নিকট আগাম যাকাত দেওয়ার আবেদন করলে তিনি তাকে  এ ব্যাপারে অনুমতি দেন (তিরমিযী, হা/৬৭৮; আবূ দাঊদ, হা/১৬২৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৯০)। রামাযান মাসে যাকাত আদায় করার ফযিলত: রমাযানে যাকাত বের করার বিশেষ কোন ফযিলত নেই। কেননা যাকাত একটি ফরয বিধান, যার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সস্য ব্যতীত প্রতিটি সম্পদে এক বছর পুর্ণ হলে তাতে যাকাত দিতে হবে। অবশ্য যাকাত সময়ের আগেও দেওয়া যায়। কেউ যদি রহমত ও বরকতের আশায় রমাযানকে নির্ধারণ করে দুই এক মাস আগেই যাকাত প্রদান করে তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই।


প্রশ্ন (২৫) : ফিতরা কত তারিখে দেওয়া সুন্নাত?

-আব্দুর রহমান
ঝিনাইদাহ।

উত্তর : ঈদের ছালাতে বের হওয়ার পূর্বে ফিতরা বের করতে হবে। তবে ঈদুল ফিতরে এক বা দুইদিন পূর্বে বের করা যাবে। ইবনু উমার c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a লোকেরা ছালাতের উদ্দেশ্যে (ঈদগাহে) যাওয়ার পূর্বেই আমাদেরকে ছাদাকাতুল ফিতর প্রদান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। নাফি’ p বলেন, ইবনু উমার c ঈদের একদিন ও দুইদিন পূর্বেই তা প্রদান করতেন (আবূ দাঊদ, হা/১৬১০,১৬১২)। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার c হতে বর্ণিত, নবী a লোকদেরকে ঈদের ছালাতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩, ১৫০৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৪; আহমাদ, হা/৬৫৪১)।


 প্রশ্ন (২৬) : পরিবারের সকল মহিলার স্বর্ণ একত্র করলে যাকাত পরিমাণ হয়। এখন করনীয় কি? যাকাত দিতে হবে কি?

-জাহিদুল ইসলাম
ঢাকা।

উত্তর : পরিবাবের সকল মহিলার অভিভাবক যদি একজন হন এবং সেই স্বর্ণ উক্ত অভিভাবকের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় তাহলে একত্রে যাকাত আদায় করতে হবে। আর যদি মালিকানা ভিন্ন ভিন্ন হয় তাহলে স্বর্ণ একত্রিত করে যাকাত আদায় করার প্রয়োজন নেই। তবে এককভাবে কারো যদি স্বর্ণ যাকাতের নেসাব পরিমান হয়ে থাকে তাহলে তাতে অবশ্যই যাকাত আদায় করতে হবে। এ মমে নবী করীম a বলেন, যখন তোমার কাছে দুইশত দিরহাম থাকবে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে এমন অবস্থায় তুমি তাতে পাচঁ দিরহাম যাকাত আদায় করবে। আর যদি তোমার কাছে বিশ দিনার থাকে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে তাতে অর্ধ দিনার যাকাত আদায় করবে (আবূ দাউদ, হা/১৫৭৩)।


প্রশ্ন (২৭) : ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির অর্থের উপর যাকাতের বিধান কি?

-মিজান
নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : পরিবার ও সন্তানদের আহার যোগাতে গিয়ে ঋণগ্রস্থ হলে তা পরিশোধের পরে যাকাত দিতে হবে। উছমান উবনু আফফান c বলেন, এটা তোমাদের যাকাতের মাস। অতএব যার উপর ঋণের বোঝা আছে সে যেন আগে তা পরিশোধ করে। তারপর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে যাকাত আদায় করে (মুয়াত্তা মালেক, হা/৯৭৩)। আর যদি ব্যবসা বাণিজ্য ও বাড়ি গাড়ির জন্য ঋণ নিয়ে থাকে যা সমাজে প্রচলিত আছে তাহলে তার মূল সম্পদ নিসাবে পৌঁছলেই যাকাত দিতে হবে। আর এভাবে ঋণ নেওয়া জায়েযও নয়।


ছিয়াম


প্রশ্ন (২৮) : দীর্ঘ দিনের ফরয ছিয়াম বাকি রয়েছে যার সংখ্যা আমি জানি। উক্ত ছিয়ামগুলো কি ক্বাযা করব না-কি ফিদিয়া দিব?

-জাহাঙ্গীর আলম
উত্তরামপুর, নওগাঁ।

উত্তর : দীর্ঘদিন ধরে ছিয়াম ছেড়ে আসছেন। সত্যই যদি নিশ্চিভাবে সেগুলোর সংখ্যা জানা থাকে, তাহলে অবশ্যই সেগুলোর একটি ছিয়ামের বদলে একটি ক্বাযা করতে হবে। স্বেচ্ছায় ছিয়াম ছেড়ে দিলে একটি ছিয়ামের বদলে একটিই ক্বাযা করতে হয়। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, নবী a বলেছেন, কোন লোকের ছিয়াম থাকাবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হলে সে লোককে ঐ ছিয়ামের কাযা আদায় করতে হবে না। কিন্তু কোন লোক ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে তাকে কাযা আদায় করতে হবে (তিরমিযী, হা/৭২০)। তবে বিগত দিনের ছিয়ামের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা না থাকলে তার কাযা আদায় করবে না। এক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে। ছিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মানুষ বিনয়ী হয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।


প্রশ্ন (২৯) : আমার বয়স ৫০ বছরবিগত জীবনে আমি যাকাত ছিয়াম পালন করিনিতবে এখন করি এবং ভবিষ্যতেও করবো ইনশাআল্লাহবিগত জীবনের যাকাত ছিয়ামগুলো কি আদায় করতে হবে নাকি তওবা করলে হবে?

-মিজানুর রহমান
পীরগঞ্জ, নাটোর।

উত্তর : যাকাত আদায়ের বিলম্ব করার কারণে নিঃসন্দহে সে পাপী হবে। তাই তাকে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে। তার উপর অবশ্যক হচ্ছে যেসব বছরের সে যাকাত আদায় করেনি সেই বছরগুলোর হিসাব করে একত্রে দ্রূত যাকাত আদায় করা (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম প্রশ্ন নং- ৩৬০)। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল a বলেছেন, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি। ক্বিয়ামতের দিন তার সম্পদ টেকো মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখেল দুপার্শ্বে কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল (ছহীহ বুখারী, হা/১৪০৩)। ছিয়ামের জন্য ক্ষমা চাইবে আর যাকাত দেওয়ার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করবে। যদি দিতে না পারে তাহলে সেক্ষেত্রেও ক্ষমা চাইবে।


প্রশ্ন (৩০) : ঘুমিয়ে থাকার কারণে ইফতারির সময় ৩০ মিনিট পার হয়ে গেছে এখন করণীয় কী?

-আসাদুল্লাহ, ঢাকা।

উত্তর : যখন ঘুম ভাঙবে তখনই তাকে ইফতার করতে হবে। কেননা নবী a বলেন, তিনি ব্যক্তি হতে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: (১) ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয় (২) নাবালেগ, যতক্ষণ না সে বালেগ হয় এবং (৩) পাগল, যতক্ষণ না জ্ঞানসম্পন্ন হয়। (আবূ দাঊদ, হা/৪৪০৩)। ছালাতের ব্যাপারেও নবী a বলেন, ‌فَلْيُصَلِّهَا ‌إِذَا ‌ذَكَرَهَا কেউ ছালাত আদায় করতে ভুলে গেলে যখনই স্মরণ হবে তখনই তা আদায় করে নিবে (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮০)।


প্রশ্ন (৩১) : ছিয়াম থাকাবস্থায় দিনের বেলায় টুথপেষ্ট ব্যবহার করে ব্রাশ করা যাবে কি?

-সাজ্জাদুল কারীম, ঢাকা।

উত্তর : ছিয়াম অবস্থায় যেকোন সময় মিসওয়াক বা দাঁতন করা যায়। মিসওয়াক করা যাবে না মর্মে সমাজে যে কথা প্রচলিত আছে, তা সঠিক নয়। বরং টুথপেষ্ট কিংবা মাজন দিয়ে, কাঁচা অথবা শুকনা ডাল দ্বারা ছিয়াম অবস্থায় মিসওয়াক করা যাবে। এমতাবস্থায় মিসওয়াক কিংবা টুথপেষ্ট, মাজনের স্বাদ আস্বাদন অনুভব হলেও ছিয়ামের ক্ষতি হবে না। কুরআন ও হাদীছে ওযূর সময় দাঁতন ব্যবহার  করাতে কোন নিষেধ বর্ণিত হয়নি। তবে ওযূতে নাকে পানি দেওয়ার বিষয়ে সাবধানতার কথা রয়েছে। স্বজোরে নাকে পানি টান দেওয়া যাবে না। আমের ইবনু রাবী‘আহ c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী a-কে ছিয়াম থাকবস্থায় অসংখ্য বার মিসওয়াক করতে দেখেছি। আবূ হুরাইরাহ্ c নবী a হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমার উম্মাতের জন্য যদি কষ্টকর মনে না করতাম তাহলে প্রতিবার ওযূর সময়ই আমি তাদের মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম। জাবের c এবং যায়েদ ইবনু খালেদ c-এর সূত্রে নবী a হতে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে এবং তিনি ছিয়ামপালনকারী এবং ছিয়ামপালনকারী নয়, তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি। আয়েশা g নবী a হতে বর্ণনা করেন যে, মিসওয়াক করায় রয়েছে মুখের পবিত্রতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। ‘আত্বা p এবং কাতাদাহ p বলেছেন, ছিয়ামপালনকারী তার মুখের থুথু গিলে ফেলতে পারে (ছহীহ বুখারী, ৩য় খ. পৃ.৩১; ছিয়াম অধ্যায়)।


প্রশ্ন (৩২) : গর্ভবতী থাকার কারণে অনেকগুলো ছিয়াম রাখতে পারিনি। পরবর্তীতে ছিয়াম ক্বাযা করার ইচ্ছা করেও রাখতে পারিনি। পরের বছর সন্তানকে দুধ পান করানোর কারণে ছিয়াম রাখতে পারিনি এবং এখনো আমি অসুস্থ। প্রশ্ন হলো- পূর্বের ছিয়ামগুলোর ব্যাপারে সমাধান জানতে চাই।

-আলতাফ, রায়পুরা, নরসিংদী।

উত্তর : এমতাবস্থায় আপনার ছুটে যাওয়া অতীতের ছিয়ামগুলোর জন্য ফিদিয়া হিসেবে প্রতিদিন সোয়া কেজি চাউল দিতে হবে। ইবনু ‘আব্বাস h সূত্রে বর্ণিত, আল্লাহর বাণী, ‘‘যারা সামর্থবান (কিন্তু ছিয়াম পালনে অক্ষম) তারা এর পরিবর্তে ফিদিয়া হিসেবে একজন মিসকীনকে খাদ্য দিবে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৪)। তিনি বলেন, এ আয়াতে অতিবৃদ্ধ ও বৃদ্ধার জন্য ছিয়াম ভঙ্গের বিধান রয়েছে। এরা উভয়ে যখন ছিয়াম পালনের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, এমতাবস্থায় ছিয়াম না রেখে প্রত্যেক দিন একজন মিসকীনকে খাবার দিবে। গর্ভবতী এবং দুগ্ধদানকারিণী সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করলে তাদের জন্যেও ছিয়াম ভঙ্গের অনুমতি আছে (আবূ দাউদ, হা/২৩১৮)।


প্রশ্ন (৩৩) : আমরা জানি ই‘তিকাফ করা ‍সুন্নাত। প্রশ্ন হলো- ই‘তিকাফের জন্য মসজিদে প্রবেশের সময় কখন?

-আসাদুল হক
ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

উত্তর : ২০ রামাযান অতিবাহিত হওয়ার পর মাগরিবের পর ই‘তিকাফে প্রবেশ করবে। কারণ শেষ দশক আরম্ভ হয় ২০ রামাযানের সূর্য ডুবার পর হতে (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৭২; ফাতাওয়া ইবনু উছায়মীন, ২০/১২০)। আর ২১ তারিখ ফজর পর হতে ই‘তিকাফকারী সম্পূর্ণ একাকী ইবাদতে মশগূল থাকবে (ছহীহ মুসলিম, মিশকাত, হা/২১০৪; ফাতাওয়া ইবনু উছায়মীন, ২০/১৭০-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)।


প্রশ্ন (৩৪) : রমাযান কেন্দ্রিক বিদআতগুলো জানতে চাই

-আব্দুল মুক্বীত
ঢাকা।

উত্তর : রামাযান মাসে অনেক বিদ‘আত আমল করা হয়। অথচ আয়েশা g হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের এদিনে নতুন উদ্ভবন করেছে যা এতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত (বুখারী, হা/২৬৯৭; মুসলিম, হা/১৭১৮)। নিম্নে কিছু বিদআত উল্লেখ করা হলো:

(১) ইফতারের সময় দলবদ্ধভাবে দুই হাত তুলে দুআ করা। (২) রামাযান মাসে শেষ শুক্রবার দলবদ্ধভাবে কবরস্থানে কবর যিয়ারত করা। (৩) ইফতারের সময় দেরী করে ইফতার করা। (৪) তারাবী ছালাতের শেষে দলবদ্ধভাবে দুআ করা। (৫) ঈদের মাঠে কয়েকটি খুৎবা দেওয়া। (৬) ঈদের ছালাতের পর কয়েকটি হাত তুলে মুনাজাত করা। (৮) মৃত্য ব্যক্তির নামে ইফতারের আয়োজন করা।(৯) নির্দিষ্টভাবে ঈদের দিন দলবদ্ধ হয়ে কবর যিয়ারত করা। এছাড়াও আরো অনেক বিদ‘আত রয়েছে, যেগুলো রামাযান মাসে করা হয়। অথচ এগুলো পরিত্যাগ করা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদেরকে বিদআত থেকে দুরে রাখুন। আমিন!


হালাল হারাম


প্রশ্ন (৩৫) : শরীর চর্চার জন্য ক্রিকেট, ফুটবল খেলা যাবে কি?

-শিহাব
ময়মনসিংহ।

উত্তর : ক্রিকেট, ফুটবল বা এ জাতীয় খেলা কিছু শর্তের ভিত্তিতে তা খেলা যেতে পারে। শর্তগুলো হলো, (ক) জুয়া ‍মুক্ত হওয়া। (খ) আল্লাহর যিকর-আযকার, ছালাত, ছিয়াম ইত্যাদি থেকে ব্যক্তিকে ব্যস্ত রাখবে না। (গ) সতর আলগা করা, নারী-পুরুষ একাকার হয়ে যাওয়া, ঢাক-ঢোল, গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র, পর্দাহীনতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ইত্যাদি শরীয়ত নিষিদ্ধ কোন বিষয় সেগুলোতে থাকবে না। (ঘ) হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকবে এবং সেগুলোতে শারীরিক ও মানসিক কোন ক্ষতি থাকবে না। (ঙ) সময় ও অর্থ অপচয় হওয়া যাবে না (ফৎওয়া-লাজনা দায়েমা, ১৫/১৯৪, ২৩৯ পৃ.)। তবে, এসব শ্রমনির্ভর খেলা যদি শরীর চর্চা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, রোগ-বালাই নাশ ইত্যাদি উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে সেগুলো জায়েয; বরং মুস্তাহাব (ফৎওয়া রাসায়েলুশ-শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম, ৮/১১৮ পৃ.)।


প্রশ্ন (৩৬) : আমি একটা জব করি। সেখানে নিকোটিনের ঘাটতি পূরণের জন্য কর্মচারীদের সিগারেট দেওয়া হয়। আমি তা বিক্রি করে অন্য কিছু কিনে খাই বা আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করি। এমনটি করা কি শরীয়তসম্মত হচ্ছে? না হলে করনীয় কী?

-আব্দুল কায়্যুম, গাইবান্ধা।

উত্তর : নিকোটিন হলো তামাকপাতা থেকে প্রাপ্ত একরকম বিষাক্ত বর্ণহীন উপক্ষার। এক কথায় মাদক বলা যেতে পারে। মহান আল্লাহ মদ খাওয়া হারাম করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! জেনে রাখো, নিশ্চয় মদ, জুয়া, লটারী, ও ভাগ্যনির্ধারনী তীরসমূহ শয়তানের নাপাক কর্ম (আল মায়েদা, ৫/৯০)। ইবনু উমার h বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘প্রত্যেক নেশাদার দ্রব্য হারাম’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২০০৩; আবূ দাঊদ, হা/৩৬৭৯)। সুতরাং কর্মচারীদের ক্লান্তি দূর করার জন্য মাদক পরিবেশন করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পাপের কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো না’ (আল মায়েদা, ৫/২)। আর কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের মাদকদ্রব্য পরিবেশন করে থাকলে তা গ্রহণ করা যাবে না বা গ্রহণ করলেও তা ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করতে হবে, কারো নিকট বিক্রি করে এর মূল্য ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। আনাস c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ শ্রেণির মানুষকে রাসূল a অভিশাপ করেছেন। তার এক শ্রেণির লোক হলো, যে মদ বিক্রি করে (তিরমিযী, হা/১২৯৫; মিশকাত, হা/২৭৭৬)।


প্রশ্ন (৩৭) : মেহের জাইন, জাইন বিখা, আহমেদ বুখাতির যেসব নাশিদ গায় তা শুনা কি ঠিক হবে? শিরোনামে ‘নো মিউজিক’ লেখা থাকলেও তাতে এক ধরনের বাজনা থাকে।

-রাকিব হাসান
ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ।

উত্তর : বর্তমান সময়ে বিভিন্ন নাশীদ ও গজলে মিউজিক তথা ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড হিসাবে যে সাউন্ড ব্যবহার করা হচ্ছে তা বাদ্যযন্ত্রের অর্ন্তভুক্ত। সুতরাং এমন ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড যুক্ত নাশীদ ও গজল শোনা যাবে না। কেননা ইসলামে বাদ্যযন্ত্র সম্পূর্ণভাবে হারাম। কুরআনে এগুলোকে لَهْوَ الْحَدِيْثِ অনর্থক কাজ/জিনিস হিসাবে বলা হয়েছে (লুক্বমান, ৩১/৬)। আবূ মালেক আশ‘আরী c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ a-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মাঝে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড় মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে’ (অথচ তা হারাম) (ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৯০; বুলূগুল মারাম, হা/৫২৪)। অপর বর্ণনায় রয়েছে- আবূ মালেক আশ‘আরী c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘আমার উম্মতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গান পরিবেশন করবে। আল্লাহ তাআলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন (ইবনু মাজাহ, হা/৪০২০)।


প্রশ্ন (৩৮) : হাদীছে রয়েছে, কুকুর পালন করলে প্রতিদিন ১ ক্বেরাত ছওয়াব কমে যায়। আমার স্ত্রী একটি কুকুরের বাচ্চাকে নিয়মিত খাবার দিত। এই সুবাদে আমিও দিতাম। এখন কুকুরটি বড় হয়েছে এবং আমার বাড়ি ছাড়ছে না। এতে কি আমার ছওয়াব কমে যাবে এবং গুনাহ হবে? যদি হয় তাহলে এক্ষেত্রে আমার করনীয় কী?

-হাবিবুর রহমান শিমুল
রায়পুর, লক্ষীপুর।

উত্তর: যে কোনোভাবেই হোক কুকুরটিকে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। কেননা, বিনা প্রয়োজনে শখের বশে কুকুর পালন করা যাবে না। করলে বাড়িতে রহমতের ফেরেশতা আসবে না ও প্রতিদিন নিজের নেকী থেকে এক ক্বেরাত নেকী কমে যাবে। তবে বাহিরে থাকা ক্ষুধার্ত কুকুরকে খাবার প্রদান করা যাবে। আবূ ত্বালহা c বলেন, আমি রাসূল a-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘যে ঘরে কুকুর ও প্রাণির ছবি থাকে তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩২২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২১০৬)। তবে সস্যক্ষেত ও শিকারের জন্য যদি কুকুরটি লালনপালন করা হয় তাহলে তাতে সমস্যা নেই। আব্দুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিকার করা, গবাদী পশু দেখাশুনা ও ক্ষেত-খামার দেখাশুনা করা ব্যতীত কুকুর পালন করবে, তার নেকী থেকে প্রতিদিন এক কেরাত নেকী কমে যাবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৭৫)।


প্রশ্ন (৩৯) :  আমি ফুড ডেলিভারি বয় হিসাবে একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করিছিয়াম ফরয হয়েছে এমন ব্যক্তির নিকট রমাযান মাসে দিনের বেলায় খাবার ডেলিভারি করতে হয়। এমন ব্যক্তির নিকট খাবার ডেলিভারি করা বৈধ হবে কি? আর ঐ ডেলিভারির টাকা হালাল হবে কি? 

-যোবায়ের ইসলাম
শেরপুর, ময়মনসিংহ।

উত্তর : যে ব্যক্তির ওপর ছিয়াম পালন করা ফরয এমন ব্যক্তি যদি রমাযান মাসে দিনের বেলায় খাবার ডেলিভারী চায় তাহলে তাকে ডেলিভারি দেওয়া যাবে না। কেননা এতে তাকে হারাম ও শরীআত বিরোধী কাজে সহায়তা করা হবে যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না (আল মায়েদা, ৫/২)। রাসূল a বলেছেন, لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الخَالِقِ স্রষ্টার অবাধ্যতা করে সৃষ্টির কোন আনুগত্য নেই (তিরমিযী, ৪/২০৯)।


প্রশ্ন (৪০) : আমাদের মোবাইল ফোনে যে গেমসগুলো থাকে যেমন. গাড়ির গেমস, মটরসাইকেলের গেমস ইত্যাদী এই গেমসগুলো খেলা বা এই গেমসগুলোর সফটওয়্যার বানানো জায়েয হবে কি?

-মুবাশ্বিরা, বুশরা
পার্বতীপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : না, জায়েয হবে না। কেননা, মোবাইল ফোনের গেমসহ যে সকল খেলা-ধুলায় সময় নষ্ট হয়, বাজি ধরা হয় তার সবটাই হারাম। বাজি ধরে খেলা করা জুয়ার অন্তুর্ভক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! জেনে রাখো, মদ, জুয়া, লটারী ও ভাগ্য নির্ণয়ক তীর এ সবই শয়তানের অশ্লীল কর্ম। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তোমাদের মাঝে মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেশ ছড়াতে চায় এবং আল্লাহর যিকির ও ছালাত আদায় করতে বাধা সৃষ্টি করতে চায়। অতএব, তোমরা কি এগুলো থেকে বিরত হবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/৯০-৯১)। সুলায়মান ইবনু বুরায়দা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেন, নবী করীম a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নারদাশীর (পাশা বা এমন খেলা যাতে শারিরিক ও শরীয়তের কোন কল্যাণ নেই) খেলবে, সে যেন তার হাতকে শুকরের গোশত ও রক্তে রঞ্জিত করলো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬০; আবূ দাঊদ, হা/৪৯৩৯)। আর শরীয়তের মূলনীতি হলো: হারাম কাজে সহযোগিতা করা হারাম। শরীয়ত বহির্ভূত গেম খেলা না জায়েয। সুতরাং গেম খেলার জন্য অ্যাপ বা সফটওয়্যার বানানো জায়েয হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পর কল্যাণ ও তাক্বওয়ার কাজে সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


প্রশ্ন (৪১) : বর্তমানে কিছু অনলাইন কোম্পানি আছে যারা (ভাউচার বিক্রয় করে অর্ধেক দামে, যেমন -১০,০০০ টাকার ভাউচার কিনতে হলে ৫,০০০ টাকা ব্যয় করতে হবে।) এই ১০,০০০ টাকার ভাউচার দিয়ে ঐ কোম্পানির সাইট থেকে পণ্য কেনা যাবে। এটা কি হালাল হবে? না-কি হারাম?

-ফজলে রাজীব
কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

উত্তর : অর্ধেক দামে ভাউচার কেনা ‘টাকার বিনিময়ে টাকা কেনা’-র শামিল। যা স্পষ্ট সূদ। আবূ সাঈদ খুদরী c থেকে বর্ণিত, রাসূল a বলেছেন, ‘স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবনের বিনিময়ে লবনের লেনদেন সমান সমান এবং হাতে হাতে হতে হবে। যদি কেউ বেশি দেয় বা বেশি চায় তাহলে সে সূদ গ্রহণ করল। এক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতা দুজনেই সমান পাপী’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৮৪; মিশকাত, হা/২৮০৯)। তাই ভাউচারে লিখিত টাকার চেয়ে কম দামে ভাউচার কেনা হলে তা সূদ হবে। কেননা রাসূল a বলেছেন, ‘প্রত্যেক যে ঋণে মুনাফা বা লাভ নিয়ে আসে তাই হলো সূদ’ (সুনানুল কুবরা বায়হাক্বী, ৫/৫৭১)।


প্রশ্ন (৪২) : অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করা হালাল না হারাম?

-শেখ ইসমাইল
পূর্ব বর্ধমান, ভারত।

উত্তর : প্রচলিত অলিম্পিক গেমস, ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি খেলায় অংশগ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ এতে বহু শারঈ নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়। যেমন- খেলোয়াড়দের সতর (আব্রু) খোলা থাকে। নারী খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ থাকে। সেটা আবার সারা বিশ্বে দেখানো হয়। নগ্ন-অর্ধনগ্ন নারী দর্শকের অবাধ অংশগ্রহণ থাকে। খেলার নামে চলে আধুনিক জুয়ার রমরমা ব্যবসা। দেশ-বিদেশ থেকে আগত খেলোয়াড়-দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য চলে মদ ও নারীর দেহ ব্যবসা। তাই এসব খেলা জায়েয হওয়ার কোনো দিকই থাকে না। এটি একটি জুয়া। সুলায়মান ইবনু বুরায়দা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেন, নবী করীম a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নারদাশীর (পাশা বা এমন খেলা যাতে শারিরিক ও শরীয়তের কোন কল্যাণ নেই) খেলবে, সে যেন তার হাতকে শুকরের গোশত ও রক্তে রঞ্জিত করলো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬০; আবূ দাঊদ, হা/৪৯৩৯)।


প্রশ্ন (৪৩) : বর্তমান অনলাইন বিজনেস SPC Express World সম্পর্কে ইসলামি শরীয়ার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই।

-আহসান হাবীব
শ্রীপুর, গাজীপুর।

উত্তর : এস পি সি (SPC World Express Ltd.) মূলত নতুন মোড়কে পূর্বের ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের অনলাইন রূপ। বিভিন্ন কারণে এসব কোম্পানির কার্যক্রম জায়েয নয়। যেমন- ১. এতে এমন সব লোকেরা বিজ্ঞাপনগুলো দেখে থাকেন, যাদের উক্ত পণ্যটি কেনার কোনো ইচ্ছে নেই। বরং ক্রেতার কাছে উক্ত পণ্যটির  চাহিদা দেখানোর জন্য ভিউ বেশি বুঝাতে ক্লিক করে ভিউ বাড়ানো হয়ে থাকে, যা মূলত ক্রেতার সাথে এক প্রকার প্রতারণা; যা জায়েয নয়। ২. এসব বিজ্ঞাপনে নারীদের ছবি প্রদর্শন হয়ে থাকে, যার প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার কারণে চোখের যেনা হয়ে থাকে। ৩. এতে এমএলএম এর মতো নাজায়েয বিষয় শামিল আছে, যা অনেকগুলো কারণে নাজায়েয। যেমন- (ক) এতে কেউ কর্ম ছাড়াই পারিশ্রমিক পায়। (খ) কেউ কর্ম করেও পারিশ্রমিক পায় না। (গ) ধোঁকা ও প্রতারণার সুযোগ আছে। (ঘ) এক চুক্তিতে একাধিক চুক্তি শামিল। মূল কথা এমন ব্যবসায় বিভিন্ন স্তরে প্রতারণা রয়েছে। আর রাসূল a বলেন, (সব ধরনের) প্রতারণা নিষিদ্ধ (মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪০৫)।


প্রশ্ন (৪৪) : আমি একটি ঠিকাদারী কোম্পানিতে সাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত আছি। এই সাইটের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি ডিপার্টমেন্টগুলো দুর্নীতির সাথে জড়িত। একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দুর্নীতিযুক্ত কাজগুলো আমাকে বাস্তবায়ন করতে হয়। আমার উপার্জন হালাল হবে কি?

-মো. সোহানুর রহমান
পুঠিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : ঠিকাদারী কোম্পানিটি যদি মূলে হারাম থেকে মুক্ত হয় এবং দুর্নীতির সাথে জড়িত না হয় অথবা সরকারি ডিপার্টমেন্টগুলো থেকে সুবিধাভোগী না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টগুলোর দুর্নীতির জন্য ঠিকাদারী কোম্পানি দায়ী থাকবে না। কারণ কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবে না (আয-যুমার, ৩৯/৭)। আর সেক্ষেত্রে উক্ত কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত উপার্জন হারাম হবে না। তবে কোম্পানি যদি দুর্নীতির সুবিধাভোগী হয় তাহলে অন্যায় কাজে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘পূণ্য ও আল্লাহভীতির কাজে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো। পাপ ও আল্লাহদ্রোহিতার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)। এমতাবস্থায় সেই উপার্জন হালালও হবে না।


পারিবারিক বিধান


প্রশ্ন (৪৫) : অনলাইনে ইসলামী বই-পুস্তক বিক্রয় করতে করতে একটি মেয়ের সাথে পরিচয় হয় এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা হয়। অবশেষে তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তার পরিবারের সম্মতিতে বিবাহ করি। এই বিবাহ কি বৈধ হবে?

-মোস্তফা শাকিল
চুয়াডাঙ্গা সদর।

উত্তর : যেহেতু অভিভাবকের সম্মতিতে বিবাহ হয়েছে তাই বিবাহ শুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু পূর্বের কাজগুলো গর্হিত অপরাধ। তাই অনুতপ্ত সহকারে কান্না করে সেগুলোর জন্য তাওবা করতে হবে।


প্রশ্ন (৪৬) : সন্তানের আক্বীকা দেওয়ার দায়িত্ব পিতা-মাতার। এখন হবু সন্তানের জন্য আক্বীকার নির্ধারিত পশু সন্তানের নানা-নানী আক্বীকা দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত লালন-পালন করে দেয়। এমন পশু দ্বারা আক্বীকা দিলে আক্বীকা হবে কি? না কি পিতার দায়িত্ব হিসাবে লালন-পালনের বিনিময় দিয়ে দিতে হবে?

-বন্যা খাতুন
গাংনী, মেহেরপুর।

উত্তর : সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে আক্বীকা করতে হয় (আবূ দাঊদ, হা/২৮৩৭; মিশকাত, হা/৪১৫৩)। আর সাধারণভাবে এর দায়িত্ব পিতার উপর বর্তায়। কিন্তু কোনো আত্মীয় যদি স্বেচ্ছায় আক্বীকার পশু লালন-পালন করে দেয়, তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে বাচ্চার নানা-নানীকে পশু পালনের জন্য চাপ দেওয়া হলে তা যৌতুক বলে গণ্য হবে।


প্রশ্ন (৪৭) : সম্প্রতি আমি জানতে পারলাম যে, কেউ কোনো নারীকে বিবাহের পূর্বে নিম্নোক্ত বাক্যগুলো বললে বিবাহের পর উক্ত নারী তালাক হয়ে যাবে। . আমি যাকে বিবাহ করব সে তালাক, ২. বিবাহের পর আমার স্ত্রী অমুক কাজ করলে তালাক, যখন তোমাকে বিবাহ করব তখন তুমি তালাক ইত্যাদী। সঠিক উত্তর দানে বাধিত করবেন

-সুমাইয়া খাতুন
কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : বিবাহের পূর্বে কেউ এ ধরনের বাক্য উচ্চারণ করলে বিবাহের পর তালাক্ব কার্যকর হবে না। কেননা, মালিকানাবিহীন বিষয়ের মধ্যে ক্ষমতা খাটে না। আমর ইবনু শু‘আইব p তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘আদম সন্তান যে সকল জিনিসের মালিক নন সে সকল জিনিসের মানত জায়েয নয়, সে যার মালিক নয় তাকে সে মুক্তি দিতে পারে না এবং তার সাথে যার বিয়ে হয়নি তাকে সে তালাকও দিতে পারে না। (তিরমিযী, হা/১১৮১; মিশকাত, হা/৩২৮২)। মিসওয়ার ইবনু মাখরামা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, বিবাহরে পূর্বে তালাক কার্যকর হবে না এবং মালিকানা সাব্যস্ত হওয়ার পূর্বে গোলাম আযাদ হবে না’ (ইবনু মাজাহ, হা/২০৪৮)।


প্রশ্ন (৪৮) : স্ত্রীকে নগদ মোহরনা প্রদান না করে স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করা বৈধ হবে কি?

-নুরুজ্জামান
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা।

উত্তর :  স্ত্রীকে মোহরানা পরিশোধ করা বিবাহের গুরুত্বপূর্ণ রুকুন। কেউ যদি স্ত্রীকে মোহরানা পরিশোধ না করার ইচ্ছা রাখে তাহলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ হবে না বরং যেনা হবে। উক্ববা ইবনু আমের c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, যেসকল শর্ত তোমাদের পূর্ণ করা উচিত, তন্মধ্যে সর্বোপযোগী শর্ত হলো যা দ্বারা তোমরা লজ্জাস্থানকে হালাল করো অর্থাৎ মোহরানা (ছহীহ বুখারী, হা/২৭২১, ৫১৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১৮; মিশকাত, হা/৩১৪৩)। সুতরাং বিয়ের বৈঠকে মোহরানা প্রদান করুক বা পরে করুক স্বামীকে অবশ্যই স্বীয় স্ত্রীর মোহরানা আদায় করতেই হবে। উল্লেখ্য যে, মোহরানা বিবাহ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করার শর্তে বাকিতে বিবাহ ও সংসার করা জায়েয রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও (আন-নিসা, ৪/২৪)। অত্র আয়াতে সংসার পরবর্তীতে মোহরানা পরিশোধ করা যায় তা বুঝা যায়। এছাড়াও বুখারী, ৫০৩০, ছহীহ মুসলিম, ১৪২৫ হাদীছেও বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।


দুআ/ প্রার্থনা


প্রশ্ন (৪৯) : আমরা জানি সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার সকাল সন্ধায় পড়তে হয়। প্রশ্ন হলো, এখানে সকাল আর সন্ধ্যা বলতে ফজরের আর মাগরিবের পর বুঝানো হয়েছে?

-আরাফাত ইসলাম ওরনাব
ক্যান্টনমেন্ট ঢাকা-১২০৬।

উত্তর : সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার ‍শুধু সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করা খাছ নয়। বরং রাত-দিনের যে কোনো সময় পড়া যেতে পারে। রাসূল a বলেন, যে ব্যক্তি নিবিষ্ট মনে সাইয়্যেদুল ইস্থিগফার দিবসে পাঠ করবে এবং সন্ধ্যার পূর্বে মারা যাবে, সে ব্যক্তি জান্নাতীদরে অন্তর্ভূক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি ইয়াক্বীনের সাথে সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার রাতে পাঠ করবে এবং সকাল হওয়ার আগে মারা যাবে, সেও জান্নাতীদের অন্তর্ভূক্ত হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৩০৬)। অন্য বর্ণনায় বলেছেন, যদি কেউ সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার  সন্ধ্যায় পড়ে মারা যায় তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অনুরুপভবে সকালে পড়ে সে দিনের যে কোনো সময় মারা গেলেও জান্নাতে প্রবেশ করবে (ছহীহ বুখারী, হা/ ৬৩২৩)। আর যেসব হাদীছে সকাল-সন্ধ্যার কথা বলা হয়েছে, সেখানে সকাল দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো-ফজর ছালাত হতে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত এবং সন্ধ্যা দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো- আছরের ছালাত হতে মাগরিব পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে ইবনুল কাইয়্যুম p দলীল

হিসাবে বলেছেন, আল্লাহর বাণী, ‘তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় তাসবীহ পাঠ করো’ (আল-আহযাব, ৩৩/৪২)। ‘তুমি সূর্য উদিত ও অস্ত যাওয়ার পূর্বে তোমার রবের প্রশংসার মাধ্যমে তাসবীহ পাঠ করতে থাকো’ (ক্বফ, ৫০/৩৯)।


প্রশ্ন (৫০) : বৃষ্টির সময় দু‘আ কবুল হয়। এটা কি সত্য?

-সাকিলা জাহান
সাপাহার, নওগাঁ।

উত্তর : জী; বৃষ্টির সময়ে দু‘আ কবুল হয় একথা ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। সাহল ইবনু সা‘দ c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, দুই সময়ের দু‘আ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না অথবা তিনি বলেছেন কমই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১. আযানের সময়ের দু‘আ ২. বৃষ্টি বর্ষণের সময়ের দু‘আ (জামে‘উল আহাদীছ, হা/১১৩২৪; বায়হাক্বী, হা/৬৬৯০; কানযুল উম্মাল, হা/৩৩৩৮; মিশকাত, হা/৬৭২)।