ঈমান-আকীদা


প্রশ্ন (১) : মানুষের মত কি জিনদেরও সংসার জীবন ও হায়াতমউত আছে?

-আনোয়ার হোসেন জসিম
পূর্বধলা, নেত্রকোণা।

উত্তর: কুরআন ও হাদীছের সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা বুঝা যায় যে, জিনদেরও সংসার জীবন আছে। তারাও বিবাহ-শাদী করে, তাদেরও সন্তান-সন্ততি আছে। মহান আল্লাহ জিনদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে বলেন, ‘আর যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর। অতঃপর তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার রবের নির্দেশ অমান্য করল। তোমরা কি তাকে ও তার বংশকে আমার পরিবর্তে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু? সীমালংঘনকারীদের জন্য রয়েছে কত নিকৃষ্ট পরিণতি!’ (আল কাহফ, ১৮/৫০)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তার মধ্যে (জান্নাতে) থাকবে সতীসাধ্বী সংযত-নয়না (কুমারী)রা, পূর্বে যাদেরকে স্পর্শ করেনি কোন মানুষ আর কোন জিন’ (আর রহমান, ৫৫/৫৬)। আর প্রত্যেক প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। তাই জিনদেরও মৃত্যু হবে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রতিটি জীবন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে’ (আলে ইমরান, ৩/১৮৫)। অত্র আয়াতসমূহ প্রমাণ করে যে, জিনদেরও সংসার জীবন ও সন্তান-সন্ততি এবং জীবন-মৃত্যু আছে।


প্রশ্ন (২) : ﴿‌لَا ‌تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ (সূরা আল-আনাম, ৬/১০৩) প্রশ্নটি হলো- আমাদের দৃষ্টি কেন আল্লাহকে দেখতে পারে না?

-সিয়াম
আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর: আল্লাহর সত্তা অসীম আর মানুষের দৃষ্টি সসীম। দুনিয়াতে আল্লাহর দর্শন সহ্য করার শক্তি মানুষের চোখে নেই। সুতরাং মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়ার এই চক্ষু দ্বারা আল্লাহর দর্শন অসম্ভব। আর বিষয়টি কুরআন ও হাদীছের সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত। যেমন: মূসা আ. আল্লাহ তাআলার দর্শনের আশা ব্যক্ত করে বলেন, ﴿‌رَبِّ ‌أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَنْ تَرَانِي﴾ ‘হে আমার রব! তুমি আমাকে দেখা দাও, আমি তোমাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কখনো দেখবে না (আল আরাফ, ৭/১৪৩)। …এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা পাহাড়ের উপর তার নূর প্রকাশ করলেন, তা দেখে মূসা আ. বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন (প্রাগুক্ত)। রাসূল a বলেন, ‘জেনে রাখো! মৃত্যুবরণের আগ পর্যন্ত তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে না’ (সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৭৭১৬; আল জামেউস ছগীর, হা/৪২২৪)। এটিই সালাফে-সালেহীনের আক্বীদা।

উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলে কথিত বক্তাদের মুখে অনেক আল্লাহর ওলী কর্তৃক ৮০, ৯০ ১০০ বার আল্লাহর দর্শনের কাহিনী শোনা যায় যা সবই মিথ্যাচার এবং বানোয়াট।


প্রশ্ন (৩) : যদি কেউ দাবী করে যে, সে কবে মৃত্যুবরণ করবে তা সে জানে। বা কেউ বলে যে, অমুক ব্যক্তি বলতে পারে যে, সে কবে মৃত্যুবরণ করবে। এমন আক্বীদায় বিশ্বাসী ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার জানাযা পড়া যাবে কি?

-সিয়াম
আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর: কোথায় কিভাবে কার ‍মৃত্যু হবে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কেউ জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত’ (লুক্বমান, ৩১/৩৪)। গায়েবের বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সমস্ত গায়বের চাবিকাঠি তাঁর কাছে, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না’ (আল আন’আম, ৬/৫৯)। অন্যত্র বলেন, ‘বল! আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ ছাড়া, আর তারা জানে না কখন তাদেরকে জীবিত করে উঠানো হবে’ (আন নামল, ২৭/৬৫)। অত্র আয়াতগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মৃত্যু একটি গায়েবী জ্ঞানের বিষয় যা একমাত্র আল্লাহই জানেন। সুতরাং কেউ যদি গায়েবের কোনো বিষয় জানে মর্মে দাবী করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। যেমন: মৃত্যু সম্পর্কে অগ্রিম জানে মর্মে দাবী করা। অতএব এমন দাবীদার ব্যক্তির পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে না এবং এদের জানাযা পড়া যাবে না (ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব ‘ইবনু বায’, ১২/১০৩; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ফতওয়া নং ৩০৯০)।


প্রশ্ন () : কোনো পীরকে হুজুর কেবলা বা বাবা বলা যাবে কি?

-মো: সেলিম রেজা
বাগদাদ, ইরাক্ব।

উত্তর: কোনো পীরকে হুজুর কেবলা বা বাবা বলা যাবে না। কেননা এগুলো কুসংস্কার যা আক্বীদা নষ্টকারী ভ্রান্ত লোকদের আবিস্কৃত শব্দ। তারা এসকল শব্দ দ্বারা বিভিন্ন কুফুরি আক্বীদা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে থাকে। কারণ হুজুর কখনো কেবলা হতে পারে না। আর কেবলা বলতে মূলত কাবা ঘরকে বুঝানো হয়। তাই মুসলিম ব্যক্তির উচিত হবে, শুধু কেবলাকেই কেবলা মনে করা এবং অন্যকে কেবলা বলা হতে বিরত থাকা। আনাস ইবনু মালেক c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘যে আমাদের মত ছালাত পড়ে, আমাদের কেবলাকে কেবলা হিসাবে গ্রহণ করে এবং আমাদের যবাইকৃত পশু ভক্ষন করে। সেই হলো প্রকৃত মুসলিম…’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৯১)।


প্রশ্ন () : মারইয়াম বিনতে ইমরান কি জান্নাতে রাসূল (ছা) এর স্ত্রী হবেন?

-সম্রাট হোসেন
গাজীপুর।

উত্তর: শহীদদের উপর আল্লাহ নবীদের মর্যাদা দিবেন এ কথা ঠিক। আর একজন শহীদকে আল্লাহ ৭২ জন স্ত্রী দান করবেন (তিরমিযী, হা/১৬৬৩; ছহীহ আত-তারগীব, হা/১৩৭৪)। তবে, নবীদেরকে কতজন স্ত্রী আল্লাহ দান করবেন তা কোনো ছহীহ হাদীছ দ্বারা জানা যায় না। আর আসিয়া আ., মারইয়াম আ., মুসা আ. -এর বোন কুলছুমের সাথে জান্নাতে রাসূল a-এর সাথে বিবাহ দেওয়া হবে মর্মে কোনো ছহীহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। বরং এ মর্মে যা পাওয়া যায় তার সবই দূর্বল ও ভিত্তিহীন (জামে‘উল আহাদীছ, হা/৬৯২৩; ত্ববারানী, ৮/২৫৮ পৃ. হা/৮০০৬; আল-জামেউস ছগীর, হা/৩১৬০ ‘হাদীছ দূর্বল’)।


পবিত্রতা


প্রশ্ন () : কতটুকু পরিমাণ রক্ত বা পুঁজ শরীর থেকে বের হলে ওযু ভেঙ্গে যাবে?

-শাইখ মাহমুদ
জামালপুর।

উত্তর: শরীরের গুহ্যদ্বার এবং প্রশাবের প্রণালি ব্যতীত অন্য কোনো অঙ্গ দিয়ে কম-বেশি কোনো কিছু বের হলে ওযূ ভঙ্গ হবে না। রক্ত প্রবাহিত হলেও নয়। জাবের c থেকে বর্ণিত, নবী a ‘যাতুর রিকা’ এর যুদ্ধে ছিলেন। সেখানে এক ব্যক্তি তীরবিদ্ধ হলেন এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল, কিন্তু তিনি (সে অবস্থায়ই) রুকু করলেন, সিজদা করলেন এবং ছালাত আদায় করতে থাকলেন।… পরবর্তীতে রাসূল a-কে বিষয়টি অবগত করালে তিনি তার ছালাত হয়নি কিংবা ওযূ ভেঙ্গে গেছে মর্মে কিছুই বলেননি। হাসান p বলেন, মুসলিমগণ সব সময়েই তাঁদের যখম অবস্থায় ছালাত আদায় করতেন এবং তাঊস p, মুহাম্মদ ইবনু ’আলী p, ’আতা p, ও হিজাযবাসীগণ বলেন, রক্তক্ষরণে ওযূ করতে হয় না। ইবনু উমার c একবার একটি ছোট ফোঁড়া টিপ দিলেন, তা থেকে রক্ত বের হল, কিন্তু তিনি ওযূ করলেন না। ইবনু আবূ আওফা c রক্ত মিশ্রিত থুথু ফেললেন কিন্তু তিনি ছালাত আদায় করতে থাকলেন। ইবনু উমার h ও হাসান p বলেন, কেউ শিঙ্গা লাগালে কেবল তার শিঙ্গা লাগানোর স্থানই ধোয়া প্রয়োজন (ছহীহ বুখারী, হা/১/৪৬ পৃ.)।


প্রশ্ন (৭) : আমার স্ত্রী ঋতু থেকে পবিত্র হওয়ার সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। পবিত্র হওয়ার আলামত প্রকাশ পাওয়ার পর আবার দু’একদিন পর অন্য কালারে রক্ত দেখা যায়। এমতাবস্থায় করণীয় কী?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর: ঋতুর স্বাভাবিক সময় পর তা থেকে পবিত্র হওয়ার দু’একদিন পর যদি আবার রক্ত দেখা যায়, তাহলে সেটা রোগজনিত কিংবা অন্য কোনো রক্ত। হায়েযের রক্ত নয়। তাই এই রক্ত ধুয়ে ফেলে ছালাত, ছিয়াম, বায়তুল্লাহর তওয়াফ, স্ত্রী সহবাসসহ সকল কাজ করতে পারবে (লাজনা দায়েমা, ৫/৩৮৮)।


প্রশ্ন (৮) : কোনো মেয়ে ঋতু থেকে এমন সময় পবিত্র হয়েছে যে, সে ঠাণ্ডা জ্বরে আক্রান্ত। এমতাবস্থায় সে তায়াম্মুম করে ছালাত পড়তে পারবে কি? এক্ষেত্রে কি তাকে সুগন্ধি ব্যবহার করতে হবে?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর: পানি না পাওয়া, পানির স্বল্পতা, পানি ব্যবহারে অক্ষমতা অথবা পানি ব্যবহারে রোগ বৃদ্ধি কিংবা জীবননাশের আশঙ্কা থাকলে তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা হাসিল করা যায়। আমর ইবনুল আছ c বলেন, যাতু সালা-সিল যুদ্ধে গিয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডাময় রাত্রিতে আমার স্বপ্নদোষ হয়ে গেল। আমার ভয় হলো যে গোসল করলে আমি বুঝি মারাই যাবো। তাই তায়াম্মুম করে আমার সাথীদের ছালাত পড়িয়ে দিলাম (ইমামতি করলাম)। আমার সঙ্গীরা রাসূল স. এর সামনে বিষয়টি উল্লেখ করলেন। রাসূল স. বললেন, আমর! তুমি জুনুবী অবস্থায় তোমার সাথীদের ইমামতি করেছো? আমি তখন তাকে আমার গোসল না করার কারণ সম্পর্কে বললাম, আপনি আল্লাহকে বলতে শুনেননি, ﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا﴾ ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল’ (আন-নিসা, ৪/২৯)। রাসূল স. এ কথা শুনে হাসতে লাগলেন। কিছু বললেন না (আবূ দাঊদ, হা/৩৩৪)। তাই প্রশ্নোল্লিখিত ক্ষেত্রে তায়াম্মুম করে ছালাত আদায় করতে পারে। আর হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার সময় যেহেতু সুগন্ধি ব্যবহার করতে হয়, তাই এক্ষেত্রেও সুগন্ধি ব্যবহার করতে হবে।


ইবাদত- ছালাত


প্রশ্ন (৯) : তাহাজ্জুদ বা যে কোনো নফল ছালাতে কুরআন দেখে দেখে পড়া যাবে কি?

-মুহাম্মাদ বিল্লাহ
দক্ষিণ মৈশুন্ডী, ওয়ারী, ঢাকা।

উত্তর: নফল ছালাতে ‍কুরআন দেখে পড়ার ব্যাপারে একজন ছাহাবীর আমল পাওয়া যায়। আবূ বকর ইবনু মুলায়কা থেকে বর্ণিত, আয়েশা g তার এক গোলামকে মুদাব্বার (মালিকের মৃত্যুর পর আযাদ হয়ে যাবে এমন দাস) বানাল। সে রামাযান মাসে ‍কুরআন দেখে দেখে পড়ে ইমামতি করতো (মুছান্নাফ ইবনু আবি শায়বা, হা/৭২৯৪)। তবে এটা শুধু ইমামের জন্য, মুক্তাদীর জন্য নয়। মুক্তাদী শুধু ক্বিরাআত শ্রবণ করবে। আর সুন্নাহ হলো মুখস্থ ক্বিরাআত পড়া।


প্রশ্ন (১০) : আবূ দাউদের ৬৬৬ নং হাদীছ দেখিয়ে জনৈক ব্যক্তি বলেন, যে জামাআতে পায়ে পা কাধে কাধ মিলায় না, সেই জামাআতে ছালাত পড়া যাবে না। এছাড়াও তিনি বলেন, কাতার না মিলালে নাকি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়। উক্ত বক্তব্য কতটুকু সঠিক?

-হুসনে মুবারক

উত্তর: ছালাত পড়া যাবে না একথা ঠিক নয়। কেননা অত্র হাদীছে ছালাত হবে না এ কথা বলা হয়নি। তবে, কাতারের ফাঁকা বন্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। আয়েশা g থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যারা কাতারগুলো মিলিয়ে রাখে তাদের প্রতি আল্লাহ এবং তার ফেরেশতাগণ রহমত বর্ষণ করেন। যে ব্যাক্তি কাতারের ফাঁক বন্ধ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি নির্মাণ করে দেন (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৩৮২৪; আল মুজামুল আওসাত্ব, হা/৫৭৯৭)। নু’মান ইবনু বশীর c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী a বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই কাতার সোজা করে নিবে, তা না হলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭১৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩৬)। আর প্রশ্নোল্লিখিত হাদীছের অনুবাদ হলো- আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘তোমরা কাতার সোজা করো, কাঁধের সাথে কাঁধ মিলাও, কাতারের মধ্যকার ফাঁকা যায়গা পূর্ণ করো, ডানা নরম করো (আবূ ঈসা বিআইদি ইখওয়ানিকুম অংশটুকু বলেননি) তোমরা শয়তাদের জন্য ফাঁকা যায়গা রেখে দিয়ো না। ব্যক্তি কাতার মিলাবে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক রাখবে। আর যে ব্যক্তি কাতার মিলাবে না/কাতার বিচ্ছিন্ন করবে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন’ (নাসাঈ, হা/৮২৭)। বর্ণিত হাদীছের আলোকে বলা যেতে পারে যে, যারা কাতার মিলানোর পক্ষে নয় তারা রহমত থেকে বঞ্চিত হবে এবং যারা কাতার মিলনোর পক্ষে কিন্তু মিলাতে পারছে না তারা কাতার মিলানোর নিয়্যত থাকার কারণে রহমত থেকে বঞ্চিত হবে না। উল্লেখ্য যে, জনৈক ব্যক্তির শেষের কথাটুকু গ্রহণযোগ্য যা এই হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।


প্রশ্ন (১১) : যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদ পড়ে না সেই ব্যক্তি যদি এশার পর এক ও তিন রাকআত উভয়ই নিয়মিত বিতর পড়ে তাহলে ঠিক হবে এবং এক ও তিন রাক‘আত বিতর পড়ার পদ্ধতি জানতে চাই?

-গোলাম কিবরিয়া
দিনাজপুর।

উত্তর: না, ঠিক হবে না। কেননা তখন এক রাতে দুইবার বিতর পড়া হয়ে যাবে যা ছহীহ হাদীছ দ্বারা নিষিদ্ধ। আলী c বলেন, আমি রাসূল a–কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, ‘এক রাত্রে দুইবার বিতরের ছালাত আদায় করতে নেই’ (আবূ দাউদ, হা/১৪৩৯; তিরমিযী, হা/৪৭০)। এক রাকআত বিতর পড়ার জন্য শুধু সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা পড়ে রুকু সিজদা করে সালামের মাধ্যমে শেষ করবে। তিন রাকআত বিতর পড়ার পদ্ধতি হলো- তিন, পাঁচ রাকআত বিতর একটানা পড়তে হবে। মাঝে কোনো বৈঠক করা যাবে না (নাসাঈ, হা/১৭১৮; কুবরা বায়হাক্বী, হা/৪৮০৩; ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৭; মিশকাত, হা/১২৫৬)। উল্লেখ্য যে, তিন রাকআত বিতর ছালাত মাগরিবের তিন রাকআত ফরয ছালাতের মতো মর্মে যে হাদীছ মাযহাবীদের পক্ষ থেকে শুনা যায় তা দূর্বল।


প্রশ্ন (১২) : মসজিদের বাচ্চাদের ধমক দেওয়া যাবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম
জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর: কমলমতি শিশুদের সর্বদায় ভালোবাসা আর আদর যত্ন দিয়ে মানুষ করতে হবে। তাদের সাথে কখনো রুষ্ঠ আচরণ করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান করল না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৭৩৩; মিশকাত, হা/৪৯৭০)। রাসূলুল্লাহ a যখন সিজদায় যেতেন, তখন হাসান ও হুসায়ন তাঁর পিঠে চড়তেন। তারা যখন তাদের বাধা দিতে চাইতো, তখন তিনি ইঙ্গিত করতেন, তোমরা তাদের ছেড়ে দাও। যখন তিনি ছালাত শেষ করতেন, তখন তাদের কলে রাখতেন আর বলতেন, যে আমাকে ভালোবাসে সে যেন এদের ভালোবাসে (মুসনাদে ইবনু আবি শায়বা, হা/৩৯৮; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩১২)। রাসূলুল্লাহ a-এর চেয়ে বড় পরহেজগার আর কে আছে। তিনি যদি ছালাতরত অবস্থায় বাচ্চা কলে করে নিয়ে ছালাত আদায় করতে পারেন, তাহলে আমরা কেন আমাদের বাচ্চাদের মসজিদে নিয়ে গেলে ধমক দিব, তাদের নিয়ে ছালাত আদায় করতে পারব না?। তবে, এমনিতে দুষ্টুমি লাফালাফি করে পরিবেশ নষ্ট করলে, পরিবেশ ঠিক করার জন্য সর্তক করতে পারে।


প্রশ্ন (১৩) : ছালাতরত অবস্থায় সূরা বলার সময় মনের ভুলে বিসবিল্লাহ দুইবার হয়ে যায়। এতে কি কোনো অসুবিধা হবে?

-মো. শাহ আলম
বড়াইগ্রাম, নাটোর।

উত্তর: এতে কোনো অসুবিধা হবে না। কেননা একই আয়াত বার বার পড়ার বিষয়টি রাসূল a থেকে প্রমাণিত রয়েছে। আবূ যার c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a একটি আয়াত দ্বারা রাতে নফল ছালাত পড়লেন। পড়তে পড়তে সকাল করে দিলেন। সে আয়াতটি হলো- إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ‘তাদের অপরাধের জন্য ‍তুমি তাদের শাস্তি দিলে দিতে পার। তারা তো তোমারই বান্দা। তুমি যদি তাদের ক্ষমা করে দাও (তা তোমার দয়া), অবশ্যই তুমি বিপুল ক্ষমাশীল প্রজ্ঞাময়’ (আল-মায়েদা, ৫/১১৮)। জুহায়না গোত্রের একজন লোক থেকে বর্ণিত আছে, তিনি নবী করীম a ফজরের উভয় রাকআতে সূরা যিলযাল পড়তে শুনেছেন। তিনি বলেন, আমি জানি না, রাসূলুল্লাহ a ভুল করে পাঠ করেছেন নাকি ইচ্ছা করে পাঠ করেছেন (আবূ দাউদ, হা/৮১৬)। এতে বুঝা যায়, কেউ ভুলবসত বা ইচ্ছাকৃতভাবে ছালাতে দুইবার বিসমিল্লাহ পাঠ করলে তার ছালাতের কোনো ক্ষতি হবে না।


প্রশ্ন (১৪) : ছালাতুল ইসতিখারা, ছালাতুল ইসতিসক্বা, ছালাতুল হাজাত, ছালাতুত তওবা, সূর্য ও চন্দ্র গ্ৰহণের ছালাত, ইশরাক ও চাশতের ছালাত, ছালাতুয যুহা এই ছালাতগুলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, সুন্নাতে গায়ের মুয়াক্কাদা, না-কি নফল ছালাত?

-আব্দু্ল্লাহ
ফতুল্লা, নারায়ণঞ্জ।

উত্তর: ফরজ ছালাত ব্যতীত অন্য সকল ছালাত নফল ছালাত। তবে রাসূলুল্লা a-এর আমল ও বলার ভঙ্গিমা থেকে বুঝা যায়, এগুলোর কোনোটা কোনোটার চেয়ে গুরুত্ব অনেক বেশি রাখে। ত্বালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ c বলেন, নজদ থেকে রাসূলুল্লাহ a-এর দরবারে একজন লোক আসল। তার মাথার চুলগুলো ছিল এলোমেলো। তার বুকের ফিস ফিস আওয়াজ শুনা যাচ্ছিল। সে কি বলছিল বুঝা যাচ্ছিল না। সে রাসূলের নিকটে আসা মাত্রই ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। রাসূলুল্লাহ a বললেন, ‘তুমি দিনে রাতে পাঁচ বার ছালাত আদায় করবে। লোকটি বলল, এছাড়া আমার উপর কোনো করণীয় আছে কি? রাসূলুল্লাহ a বললেন, না। তবে ‍তুমি ইচ্ছা করলে নফল ছালাত আদায় করত পার… (ছহীহ বুখারী, হা/৪৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১)।


প্রশ্ন (১৫) : একাকী ছালাত পড়ার সময় মাগরিব-এশার প্রথম দুই রাকআতে ক্বিরাআত কি উচ্চৈস্বরে, না-কি চুপি চুপি পড়ব?

-নূরুল হুদা
সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর: জাহরী ছালাত একাকী পড়লেও ক্বিরাআত উচ্চৈস্বরে পড়তে হবে। উচ্চৈস্বরে ক্বিরাআত পড়া সুন্নাত। আয়েশা g –কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল- রাসূল a কি রাতে ছালাত আদায় করার সময় উচ্চস্বরে ক্বিরাআত পাঠ করতেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ! তিনি কখনো উচ্চৈস্বরে আবার কখনো নিম্নোস্বরে ক্বিরাআত পাঠ করতেন (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৩৪৪)। এছাড়াও আবূ বকর, উমার h একাকী ছালাত আদায় করার সময় উচ্চৈস্বরে ক্বিরাআত পাঠ করেছেন (আবূ দাউদ, হা/১৩৩০; মিশকাত, হা/১২০৪)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, একাকী জাহরী ছালাত আদায় করলে উচ্চৈস্বরে ক্বিরাআত পাঠ করা যায়।


প্রশ্ন (১) : মসজিদের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে কবর এবং মিম্বরের নিচে কবর আছে, কবরগুলো ৫০ বছরেরও বেশি পুরাতন, এই মসজিদে ছালাত পড়ার বিধান কী?

-মুহাম্মাদ মনিরুল ইসলাম
ফেনী।

উত্তর: এমন মসজিদে ছালাত হবে না। কারণ কবরস্থানের দিকে, মাঝে, উপরে ছালাত আদায় করা হারাম (আবূ দাঊদ, হা/৪৯২; তিরমিযী, হা/৩১৭; মিশকাত, হা/৭৩৭)। আবূ মারছাদ আল-গানাভী c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ a-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা কবরের উপর বসো না এবং কবরকে সামনে করে ছালাত আদায় করো না’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭২৫৫)। আবূ মারছাদ আল-গানাভী c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ a-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা কবরের উপর বসো না এবং কবরকে সামনে করে ছালাত আদায় করো না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭২; মিশকাত, হা/১৬৯৮)। আনাস ইবনু মালেক c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a কবরের মাঝে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৬৯৮, ২৩১৫, ২৩২২ ‘সনদ ছহীহ’)। উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিছগণ বলেন, কবর ক্বিবলার সামনে, পিছনে, ডানে বা বামে যেদিকেই থাক না কেন ছালাত হবে না (আস-সামারুল মুস্তাত্বাবু ফী ফিকহিস্ সুন্নাহ ওয়াল কিতাব, পৃ. ৩৫৭)। তাছাড়া রাসূল a কবরের মাঝে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। আনাস ইবনু মালেক c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a কবরের মাঝে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৬৯৮, ২৩১৫, ২৩২২ ‘সনদ ছহীহ’)।


প্রশ্ন (১) : ১. জান্নাতের চাবি ছালাত? ২. জান্নাতের চাবি লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ? কথা দুটি কি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত?

-মোবারক হোসেন
উত্তরা, ঢাকা।

উত্তর: জান্নাতের চাবি ছালাত মর্মে যে অংশটুকু হাদীছে বর্ণিত হয়েছে তা যঈফ (তিরমিযী, ১/৪; হেদায়াতুর রুয়াত, পৃ. ২৮১)। আর লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ জান্নাতের চাবি মর্মেও যে হাদীছটি বর্ণিত হয়েছে সেটিও যঈফ (আল-কামেল ফিয যুআফা, ৫/৬০; ইসলাম ওয়ায়েব, ফতওয়া নং- ১২৮৪৭১)।


প্রশ্ন (১) : ছালাতরত অবস্থায় সিজদায় মুখে তাসবীহ পাঠ করতে করতে অন্তরে আল্লাহ কবরের আযাব থেকে রক্ষা করো বলা যাবে কি?

-মাজহারুল ইসলাম
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর: মুখে উচ্চারণ না করলে সমস্যা নেই। তবে উচ্চারণ করা যাবে না। কেননা তা কালামুন নাস (ব্যক্তিগত কথা) হিসাবে গণ্য হবে যা ছালাতে সম্পূর্নভাবে নিষিদ্ধ। মু’আবিয়া ইবনু হাকাম c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল a বলেছেন, ‘অবশ্যই ছালাত মানুষের কথা-বার্তা বলার ক্ষেত্র নয়, এটা তো কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন পাঠের জন্যই সুনির্দিষ্ট (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৭)। তাই তা নিজের ভাষা ব্যতিরেকে শরীআত কর্তৃক বর্ণিত দু‘আর মাধ্যমে হতে হবে। (১‌سُبْحَانَ ‌رَبِّيَ الْأَعْلَى (২) ‌سُبْحَانَكَ ‌اللَّهُمَّ ‌رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي (৩) ‌سُبُّوحٌ ‌قُدُّوسٌ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ (৪) اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي ‌كُلَّهُ ‌دِقَّهُ ‌وَجِلَّهُ، وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ، وَعَلَانِيَتَهُ وَسِرَّهُ ইত্যাদি। আরো কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে ছালাত শেষে বা অন্য যেকোনো সময় হাত তুলে দু‘আ করতে পারে। সালমান c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক সম্মানিত ও লজ্জাশীল। যখন কোনো বান্দা তার কাছে দুই হাত উত্তোলন করে তখন তিনি খালি হাত ফেরত দিতে লজ্জাবোধ করেন’ (আবূ দাউদ, হা/১৪৮৮)।


প্রশ্ন (১৯) : প্রতি রফউল ইয়াদায়েনে ১০টি করে নেকি লাভ সংক্রান্ত হাদীছটি কি ছহীহ? সনদসহ বিস্তারিত জানতে চাই।

-মো. রোকনুযযামান
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর: জী, হাদীছটি ছহীহ (সিলসিলা ছহীহা, হা/৩২৮৬)। সনদসহ পুরো হাদীছটি হলো- বিশর ইবনু মূসা ও আব্দুর রহমান ইবনু আল-মুকরী ইবনু লাহীআ‘ হতে, লাহীআ‘ ইবনু হুবাইরা হতে, ইবনু হুবাইরা আবূ মুছআব মিশরাহ ইবনু হাআন আল-মাআফিরী হতে, তিনি উক্ববা ইবনু আমের আল-জুহানীকে বলতে শুনেছেন যে, রাসূল a বলেছেন, ‘মানুষ ছালাতে তার হাত দ্বারা যে ইশারা করে থাকে, (এর বিনিময়ে) তার প্রত্যেক আঙ্গুলে একটি করে নেকি বা মর্যাদা লেখা হয়’ (মু‘জামুল কাবীর, হা/৮১৯)।


মসজিদ সংক্রান্ত বিধান


প্রশ্ন (২০) : মসজিদে হারানো জিনিসের ঘোষণা দেয়া যাবে না তা হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো- হারানো ঘোষণা ছাড়া অন্য ঘোষণা (যেমন আগুন লেগেছে বলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা) দেয়া যাবে কি। হারানো জিনিসের ঘোষণার নিষেধাজ্ঞা এক্ষেত্রে ব্যাপক নাকি সীমাবদ্ধ?

-সজিব হোসেন
সাথিয়া, পাবনা।

উত্তর: হারানো জিনিসের ঘোষণা ব্যতীত আকস্মিক বিপদের ঘোষণা যেমন- হটাৎ আগুন, বন্যা বা ডাকাতের আক্রমণ, প্রবল বৃষ্টি ইত্যাদি তাহলে, উপায়ান্তর না পেলে মসজিদের মাইক দ্বারা করা যায়। আবুল মালিহ থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তারা হুনায়নের যুদ্ধের দিন রাসূল a–এর সাথে অবস্থান করছিলেন। এমতাস্থায় বৃষ্টি হলো। তখন একজন আহ্বানকারী (আযানের মাঝে) ঘোষণা দিলেন, তোমরা তোমাদের বাড়িতে ছালাত আদায় করো (মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৭০২)। নাফে‘ p হতে বর্ণিত, ঠান্ডা এবং প্রবল বাতাসের রাতে ইবনু উমার h আযান শেষে ঘোষণা দিয়ে বললেন, শোনো! বাড়িতে ছালাত পড়, শোনো! বাড়িতে ছালাত পড়, শোনো! বাড়িতে ছালাত পড়, (মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৮০০)। আর মসজিদে যেসকল কর্ম নিষিদ্ধ তা হচ্ছে-আমর ইবনু শু’আইব p হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a মসজিদে বেচা-কেনা করতে, হারানো বস্তু তালাশ করতে এবং কবিতা আবৃত্তি করতে নিষেধ করেছেন’ (আবূ দাউদ, হা/১০৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৬৭৬)। মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করা (ফতহুল কাদীর, ২/১২৮; ফতহুল বারী, ৬/২৮)। অতএব মসজিদে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ ব্যতিরেকে বিপদাপদের ঘোষনা দেওয়াতে শারঈ কোন বাধা নেই। ‘মসজিদে হারানো জিনিসের ঘোষণা নিষিব্ধ’ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি হারানো বস্তুর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ।


পারিবারিক বিধানবিবাহতালাক


প্রশ্ন (২১) : মা-বাবা কি সন্তানকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিবাহ দিতে পারে?

-সালাউদ্দীন
ভাসানটেক, ঢাকা।

উত্তর: মা-বাবা সন্তানকে মিথ্যা পতিশ্রুতি দিয়ে বিবাহ দিতে পারে না। কেননা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া কাবীরা গুনাহ। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, রাসূল a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোকা দেয় সে আমাদের (আদর্শের) অন্তর্ভুক্ত নয় (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১; ইবনু মাজাহ, হা/২২২৫)। আব্দুল্লাহ ইবনু আমের c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, একদিন রাসূলুল্লাহ a আমাদের ঘরে বসা অবস্থায় আমার মা আমাকে ডেকে বললেন, এই যে, এসো! তোমাকে দিবো। রাসূলুল্লাহ a তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা করছো? তিনি বললেন, খেজুর। রাসূলুল্লাহ a তাকে বললেন, ‘যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তাহলে এ কারণে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যার পাপ লিপিবদ্ধ করা হতো’ (আবূ দাউদ, হা/৪৯৯১; সিলসিলা ছহীহা, হা/৭8৮)। অতএব সন্তানকে সবকিছু জানিয়ে তার সম্মতিক্রমে বিবাহ দিতে হবে।


প্রশ্ন (২২) : কাবিন করা বউকে তার বাপের বাড়িতে রাখা কি শরিয়াতসম্মত?

-রাকিব, মিরপুর, ঢাকা।

উত্তর: বিবাহের কাবিননামা সম্পন্ন হওয়ার অর্থ হচ্ছে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। এখন থেকে স্ত্রীর ভরণ-পোষন, বাসস্থান সবকিছুর জিম্মাদারী স্বামীর উপর। অতএব স্বামীর কর্তব্য হচ্ছে, স্ত্রীকে মোহরানা পরিশোধ করে তার নিজ নিবাসে নিয়ে যাওয়া এবং সংসার জীবন আরম্ভ করা। আল্লাহ বলেন, ‘জনকের (স্বামী) উপর দায়িত্ব হল বিহিতভাবে প্রসূতিদের অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করা’ (আল বাকারা, ২/২৩৩)। রাসূল a বলেন, ‌وَلَهُنَّ ‌عَلَيْكُمْ ‌رِزْقُهُنَّ، وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ‘তাদের জন্য তোমাদের উপর বিহিতভাবে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩০৭৪)। সুতরাং বিনা প্রয়োজনে শ্বশুর-শাশুড়ী অসন্তোষ হলে, স্ত্রীকে তার শ্বশুরালয়ে রাখা জায়েয হবে না। তবে, প্রয়োজনে তাদের আপত্তি না থাকলে, সাময়িকভাবে থাকতে পারে বা যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, কনে নাবালিকা হলে শাবালিকা হওয়া পর্যন্ত বাবার বাড়ীতে থাকবে। যেমন: আয়েশা g-এর ৬ বা ৭ বছর বয়সে রাসূল a-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ছিলেন। ৯ বছর বয়সে আল্লাহর রাসূল a–এর সাথে তার শ্বশুরালয়ে মিলন হয়। আয়েশা g হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার সাত বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ a আমাকে বিবাহ করেন। সুলাইমানের বর্ণনায় রয়েছে ছয় বছর। আর তিনি আমার নয় বছর বয়সে আমার সাথে বাসর যাপন করেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৫৮; আবূ দাউদ, হা/২১২১)।


প্রশ্ন (২৩) : যদি কোনো ছেলে-মেয়ে পরস্পর একে অন্যের মা ব্যতীত তৃতীয় কোনো মহিলা থেকে দুজনে দুধ পান করে, তাহলে তাদের মধ্যে বিবাহ জায়েয হবে কি?

-আনিসুল হক
বেইজিং, চীন।

উত্তর: না; তাদের মাঝে বিবাহ বৈধ হবে না। কেননা তারা দুধ ভাই-বোন। আর দুধ ভাই-বোনের মাঝে বিবাহ হারাম। যেমনভাবে বংশীয় কারণে বিবাহ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে… তোমাদের সে সব মাতাকে যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে…’ (আন নিসা, ৪/২৩)। রাসূল a বলেন, ‘জন্মসূত্রে যারা হারাম, দুধ সম্পর্কের কারণেও তারা হারাম’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৪১; ছহীহ ‍মুসলিম, হা/১৪৪৫)। তবে দুই বছর বয়স অতিক্রম হওয়ার পর পান করলে তাতে দুধ ভাই-বোন সাব্যস্ত হবে না। তাই তারা চাইলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ﴾ ‘তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে’ (লুক্বমান, ৩১/১৪)। উকবা ইবনুল হারেস c হতে বর্ণিত, তিনি আবূ ইহাব ইবনু ’আযীয -এর কন্যাকে বিয়ে করেন। অতঃপর জনৈকা মহিলা এসে বলল, আমি ’উকবা এবং তার স্ত্রীকে দুধপান করিয়েছি (তাদের বিবাহ কি বৈধ?)। ’উকবা উক্ত মহিলাটিকে বললেন, আপনি যে আমাকে দুধ পান করিয়েছেন (আমি জানি না) এবং তা কক্ষণো আমাকে বলেননি। অতঃপর তিনি (’উকবা ইবনুল হারেস) তার স্ত্রীর পরিবারের নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন, উত্তরে তারা বলল যে, ঐ মহিলাটি যে আমাদের কন্যাকে দুধ পান করিয়েছে, তা আমরাও জানি না। অতঃপর ’উকবা মদীনায় এসে নবী a-এর নিকট উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলেন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ a বললেন, তোমরা কিভাবে দাম্পত্য জীবন যাপন করবে, যেহেতু একটি কথা (দুধপানের ব্যাপারে) উঠেছে? এটা শুনে ’উকবা তার স্ত্রীকে ত্যাগ করলেন (তালাক দিলেন) এবং ঐ স্ত্রী অন্যত্র অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো (ছহীহ বুখারী, হা/৮৮; মিশকাত, হা/৩১৬৯)।


প্রশ্ন (২৪) : তালাক দেওয়ার সময় কি ‘বায়েন’ শব্দ উল্লেখ করা জরুরি?

-আব্দুল্লাহ, নওগাঁ।

উত্তর: ‘তালাক’ শব্দের সাথে ‘বায়েন’ শব্দ বলা না বলার সাথে তালাকের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং তালাকে বায়েন বলতে বুঝায় যে, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর ৯০দিন অতিক্রম হওয়ার পর স্ত্রী বায়েন হয়ে যায়। এর পূর্বে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলে তা বায়েন হিসাবে গণ্য হয় না। অতএব কেউ যদি স্ত্রীকে সম্বোধন করে শুধু তালাক শব্দ উচ্চারণ করে তাতেই তালাক হয়ে যাবে। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘তিনটি বিষয়ের চুড়ান্তও চুড়ান্ত আর হাসিতামাশাও চুড়ান্ত; (১) বিবাহ, (২) তালাক ও (৩) প্রত্যাহার’ (ইবনু মাজাহ, হা/২০৩৯)। অত্র হাদীছেও প্রমাণিত হয় যে, বায়েন বলা জরুরী নয়। শুধু তালাক বললেই হয়ে যাবে।


প্রশ্ন (২৫) : বিবাহতে বরকে অর্ধেক লাড্ডু বা অর্ধেক শরবত খাওয়ানো বাকি অর্ধেক কনেকে খাওয়ানো কি সুন্নাহ বা মুস্তাহাব কিছু?

-সিয়াম
আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর: বিবাহ অনুষ্ঠানে প্রচলিত যা করা হয় যেমন গেট তৈরি, গান-বাজনা, আলোকসজ্জা, গায়েহলুদ অনুষ্ঠান, যৌতুক গ্রহণ, বৌভাতের অনুষ্ঠান করে চাঁদাবাজি, সবার সামনে বরকে অর্ধেক লাড্ডু বা শরবত খাওয়ানো বাকি অর্ধেক কনেকে এর সবই হারাম। কেননা এসব বিধর্মীদের থেকে আসা কুসংস্কার। যা করলে তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ বা অনুসরণ করা হয়। যা স্পষ্ট হারাম। ইবনু উমার h থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কওমের (সম্প্রদায়ের) অনুসরণ-অনুকরণ করবে, সে তাদের দলভুক্ত হবে (আবূ দাউদ, হা/৪০৩১; বুলূগুল মারাম, হা/১৪৭১)। তবে, নির্লজ্জের মতো মানুষের সামনে না করে স্বামী-স্ত্রী একান্ত নির্জনে একে অপরকে যেভাবে ইচ্ছা খাওয়াতে ও পান করাতে পারে এবং তা সুন্নত। আয়েশা g হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি পানপাত্র থেকে পান করতাম তখন আমি ছিলাম ঋতুমতী। তারপর আমি তা নবী সা. -এর নিকট প্রদান করতাম, তিনি আমার মুখের স্থানে তার মুখ রেখে পান করতেন এবং ঋতুমতী অবস্থায় আমি গোশতযুক্ত হাড় হতে গোশত খেতাম আর তা নবী a-এর হাতে প্রদান করতাম, তিনি আমার মুখ রাখার স্থানে নিজের মুখ রাখতেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০)। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্বাস c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘…আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তুমি যে কোন ব্যয় করো না কেন, তোমাকে তার বিনিময় প্রদান করা হবে। এমনকি যা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দিবে’ (তারও প্রতিদান পাবে) (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬)।


প্রশ্ন (২৬) : আমার ৩ বছর বয়সী একটি ছেলে বাচ্চা আছে আল্লাহর রহমতে চার মাসের একটি মেয়ে বাচ্চাও আছে, স্ত্রী আবারও বাচ্চা কনসিভ করেছে। বর্তমানে দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু সে বাচ্চা নিতে চাচ্ছে নাকারণ দুই বাচ্চাকে লালনপালন করতে তাকে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। বাড়িতে সদস্য সংখ্যা ৮ (আট) জন। বাড়ির সকল কাজকর্ম অনেকাংশেই সে একাই করে। স্বামী হিসেবে এখন আমার করণীয় কী? আল্লাহর কাছে গুনাহগার হতে চাই না।

-হাসান সবুজ
পরশুরাম, ফেনী।

উত্তর: গর্ভে ভ্রুণ আসার পর সামাজিক লজ্জা, কাজকর্মের চাপ, চাকুরির অসুবিধা, সন্তানের দেখভাল করা কষ্টকর ইত্যাদি অজুহাতে তা নষ্ট করা জায়েয নয়। কেননা তা সন্তান হত্যার শামিল। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ﴾ ‘আর যখন জীবন্ত প্রত্থিত শিশুকে জিজ্ঞাসা করা হবে। কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে’ (আত-তাকভীর, ৮১/০৮-০৯)। তাছাড়া গর্ভপাত করার স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও অনেক আছে। পরবর্তীতে গর্ভ ধারণে সমস্যা, মাসিকের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। তাই এই কাজ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।


জানাযামৃত্যু, কাফনদাফন


প্রশ্ন (২৭) : আমাদের এলাকাসহ হানাফী মাযহাবের অনুসারি দাবিদার মুসলিম ভাইয়েরা মৃত ব্যক্তিকে কবরে চিৎ করে দাফন করে, এটি কি সুন্নাহসম্মত?

-সিয়াম
আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর: না; এটি সুন্নাহসম্মত নয়। বরং মৃত ব্যক্তিকে ডান কাতে ক্বিবলা মুখি করে দাফন দিতে হবে। উমায়ের c সূত্রে বর্ণিত, যিনি সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! কোনগুলি কবীরা গুনাহ? তিনি বললেন, এর সংখ্যা নয়টি। ‘…মুসলিম পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া এবং তোমাদের জীবন-মরণে কাবা ঘরকে কেবলা হিসেবে মেনে নেওয়া (আবূ দাউদ, হা/২৮৭৫ ‘হাদীছটি হাসান’)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, মায়্যেতকে ডান পার্শ্বে কিবলা মুখি করে রাখতে হবে। চিৎ করে মুখ কিবলার দিকে ঘুরিয়ে রাখার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।


প্রশ্ন (২৮) : অপবিত্র ব্যক্তি কিংবা ঋতুমতী নারী মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিতে পারবে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম
জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর: ‘অপবিত্র ব্যক্তি কিংবা ঋতুমতী নারী মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিতে পারে। কেননা এ ব্যাপারে নিষেধ প্রমাণিত নয়। আর মুসলিমরা পবিত্র। হুযায়ফা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার সাথে রাসূল a–এর সাক্ষাৎ হল। তখন আমি জুনুবী (অপবিত্র) ছিলাম। তিনি আমার সাথে মুসাফাহা করার ইচ্ছা করলেন। আমি বললাম, আমি অপবিত্র। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় মুমিন ব্যক্তি অপবিত্র হয় না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩৭১; মুসনাদে বাযযার, হা/২৮৯৬)। উল্লেখ্য যে, ঋতুমতী নারী দুটি কাজ করতে পারে না: ১. ছালাত ২. কাবা ঘরের ত্বওয়াব (ছহীহ বুখারী, হা/২৯৮, ১৫৬৭)।


প্রশ্ন (২৯) : কবরের গভীরতার ব্যাপারে শরীআতের কোনো নির্দেশনা আছে কি?

-আক্বীমুল ইসলাম
জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর: কবরকে গভীর করা সুন্নাত। হিশাম ইবনু আমের c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূল a-এর কাছে অভিযোগ করলাম যে, প্রত্যেকের জন্য কবর খনন করাতো কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ‍উত্তরে বললেন, ‘তোমরা (কবরকে) খনন কর, গভীর কর এবং সুন্দর কর’ (নাসাঈ, হা/২০১০)। এছাড়াও রাসূল a কবরের পাশে বসে কবর খননকারীকে বলেছিলেন, ‘‍তুমি মাথা ও উভয় পায়ের দিক প্রসস্থ কর’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৫১২)। কেননা ‍উক্ত হাদীছদ্বয় দ্বারা বুঝা যায় যে, কবরের গভীরতা বেশি করাই ভালো। যার মাধ্যমে তার দূর্গন্ধ ও পশু-পাখীর ক্ষতি হতে লাশ নিরাপদে থাকবে। তবে কবরের গভীরতার নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। চাই তা পুরুষ, মহিলা, ছোট-বড় যার জন্যই হোক না কেন (আশ-শারহুল মুমতে‘, ৫/৩৬০)।


প্রশ্ন (৩০) : মহিলারা কবর যিয়ারত করতে পারবে কি? কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী জানতে চাই।

-ফয়সাল আহমেদ
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর: মহিলারা কবর যিয়ারত করতে পারে। তবে তারা সেখানে গিয়ে বিলাপ করতে পারবে না। যদি বিলাপ করার আশঙ্কা থাকে, তাহলে এমন নারী কবর যিয়ারত করা থেকে বিরত থাকবে। বাড়ি থেকেই কবর বাসীর জন্য দু‘আ করবে। আনাস ইবনু মালেক c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম a কবরের পাশে বিলাপ করে ক্রন্দরত কোনো এক মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তা দেখে তিনি তাকে বললেন, আল্লাহকে ভয় করো, ধৈর্য ধারন করো (ছহীহ বুখারী, হা/১২৫২)। ইবনু বুরায়দা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তার পিতা বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম তোমরা এখন কবর যিয়ারত করতে পার। কেননা তা পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৫৫)।


দানছাদাক্বা


প্রশ্ন (৩১) : মসজিদ নির্মাণ করার জন্য টাকা দান করলে তা নির্মাণ কাজে ব্যয় হবে। আর আবাদী জমি দান করলে তা লিজ রেখে তা থেকে প্রাপ্ত টাকা প্রতি বছর মসজিদ উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনটি উত্তম- জমি দান না-কি জমির সমমূল্যের টাকা দান?

-আব্দুর রউফ
চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর: জমি দান করে দিবে। পরবর্তীতে মসজিদ কতৃপক্ষ চাইলে বিক্রয় করবে চাইলে রেখে দিবে। তবে জমি দান করাই বেশি উত্তম হবে। কেননা জমি দান করলে এর স্থায়িত্ব বেশি হবে এবং টাকা দান করলে এর স্থায়িত্ব কম হবে। দান করা জিনিস থেকে মানুষ যতদিন উপকার লাভ করতে থাকবে ততদিন ব্যক্তি ছওয়াব পেতে থাকবে। এমনকি লোকটি যদি মারা যায় তথাপি ছওয়া পেতে থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর জন্য মসজিদ নির্মাণ করে তারাই যারা আল্লাহ ও পরকাল দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, ছালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, আল্লাহ ছাড়া কেউকে ভয় করে না। অবশ্যই তারা হেদায়াত প্রাপ্তদের অর্ন্তভুক্ত’ (আত-তওবা, ০৯/১৮)। রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মসজিদ আবাদ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ (একটি ঘর) নির্মাণ করবেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৩)। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায় (এবং ছওয়াব বন্ধ হয়ে যায়)। কিন্তু তিনটি আমলের ছওয়াব মরার পর পেতে থাকে। ১. ছাদাক্বায়ে জারিয়া তথা চলমান ছাদাক্বা, ২. বিদ্যা যার দ্বারা মানুষ উপকার লাভ করে, ৩. নেক সন্তান যে তার জন্য দু‘আ করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৬১৩)।


হালালহারাম


প্রশ্ন (৩২) : ইউটিউব থেকে যে ইনকাম হয় তা কি বৈধ?

-সালাউদ্দীন
ভাসানটেক, ঢাকা।

উত্তর: ইউটিউব থেকে ইনকাম করার মাধ্যমই হলো কোনো কোম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা। ভিডিওতে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন ছাড়া ইনকাম করার কোনো রাস্তাই নেই। আবার ইউটিউব কখন কোন বিজ্ঞাপন দেখাবে, তা ইউটিউবারের ইচ্ছার অধীন নয়। বরং সব কিছু ইউটিউব নিয়ন্ত্রণ করে। এতে হারাম পণ্যের বিজ্ঞাপন থাকে। আবার পণ্য হালাল হলেও নগ্ন নারীদের তেলেসমাতি থাকে। যার কারণে ইউটিউব থেকে উপার্জন করা হতে বিরত থাকা কর্তব্য। কেননা এতে অন্যায়ে সহযোগিতার পাশাপাশি হারামে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর দুটি থেকেই বেঁচে থাকা জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর (আল মায়েদা, ৫/২)। রাসূল a বলেন, ‘হালাল স্পষ্ট হারাম স্পষ্ট এর মাঝে যা আছে সবই সন্দেহভাজন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৪৬)।


প্রশ্ন (৩৩) : আমি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার একজন শিক্ষার্থী, বর্তমানে আমাদের রাজ্যের সরকার স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড প্রকল্প শুরু করেছে, এটা কি ইসলামী দৃষ্টিতে বৈধ?

-গাযী আবূ যার
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

উত্তর: সম্প্রতি WEST BENGAL STUDENT CREDIT CARD SCHEME IN BENGALI- WBSCCS সিস্টেম চালু করেছে। যার মাধ্যমে একজন ছাত্রকে স্বল্প সূদে (অর্থাৎ ৪%- ৩%) পড়া-লেখার আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। এ অর্থ তারা শুধুমাত্র পড়া-লেখার ক্ষেত্রে ব্যয় করতে পারে। অন্য কোথাও নয়। এধরণের প্রকাশ্য সূদের ঘোষণাদানকারী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ইসলাম সমর্থন করে না। কেননা সূদ সামান্য হলেও হারাম। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ A লানত করেছেন, সুদ গ্রহীতার উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও উহার সাক্ষীদ্বয়ের উপর এবং বলেছেন এরা সকলেই সমান (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮)। সুতরাং এসব ফাঁদ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।


প্রশ্ন (৩৪) : কোনো ঔষধ কোম্পানীর প্রডাক্ট লিখে দেওয়ার বিনিময়ে কোনো ডাক্তার যদি কোম্পানীর নিকট টাকা নেয়, তাহলে সেই টাকা নেওয়া কি জায়েয হবে? উল্লেখ্য, ডাক্তার রোগীর প্রয়োজন হলেই কেবল ঔষধ লিখে। তবে কোন কোম্পানির প্রডাক্ট লিখবে সেটা ডাক্তার নির্ধারণ করে।

-মাহাবুবুর আলম
পাটগ্রাম, লালমনিরহাট।

উত্তর: কোনো কোম্পানীর ঔষুধ লেখার শর্তে কোম্পানী যদি ডাক্তারকে উপহার কিংবা টাকা দেয়, তাহলে তা সুস্পষ্ট ঘুষ হবে। সেটা গ্রহণ করা জায়েয হবে না। কেননা ডাক্তার যদি সেই কোম্পানীর ঔষুধ না লিখে তাহলে তো কোম্পানী তাকে এক পয়সাও দিবে না। এমনকি কোনো প্রকার শর্ত ছাড়াও যদি উপহার দিতে আসে, তাহলে সেটাও গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কেননা ‘দান মানুষের জবান বন্ধ করে দেয়’। তখন বিবেকে না চাইলেও মনের দিক থেকে ডাক্তার উক্ত কোম্পানীর প্রতি সহানুভূতি দেখাবেন। অথচ ডাক্তারের কর্তব্য হলো, কোম্পানীর ঔষুধের গুণগত মান, কার্যকারিতা ও রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে প্রেসক্রাইব করা। আবূ উমামাহ c সূত্রে বর্ণিত, নবী a বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের জন্য কোনো বিষয়ে সুপারিশ করার কারণে যদি সে তাকে কিছু উপহার দেয় এবং সে তা গ্রহণ করে তাহলে সে সূদের একটি বড় দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো (আবূ দাউদ, হা/৩৫৪১)। আর হ্যাঁ, কোম্পানী যদি খুব উদার, দানশীল ও পরোপকারী হয়, তাহলে ডাক্তারকে ঘুষ না দিয়ে কোম্পানীর উচিত হত-দরিদ্র অচিকিৎসায় কাতরানো হাসপাতালের রোগীদের মাঝে ফ্রি ঔষুধ বিতরণ করা। অথবা হাসপাতালের গেটে ঔষুধের বাক্স নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে প্রেসক্রিপশন দেখে দেখে রোগীদের মাঝে ঔষুধ বিতরণ করা। তাতে কোম্পানীর প্রচারও হবে। আবার ছওয়াবের পাল্লাটাও ভারি হবে।


প্রশ্ন (৩৫) : একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটিতে কাজের সুযোগ রয়েছে। তারা বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশ শাখায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের অনলাইন (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ) ও অফলাইন প্রচারের জন্য তারা আমাকে নিতে চাচ্ছে। মূলত প্রচার কার্যক্রমের সব লেখা, ডকুমেন্ট- এগুলো তৈরি করা, এডিট করা, এসব কাজে নিয়োজিত সদস্যদের পরিচালনা করা, রোহিঙ্গাদের মাঝে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে প্রধান কাজ। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন; যিনি একজন ইহুদি ছিলেন। সংস্থাটির বর্তমান প্রধান ডেভিড মিলিব্যান্ড; তিনিও একজন ইহুদি এবং ইংল্যান্ডের রাজনীতিবিদ। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা জায়েয হবে কি?

-শাহনেওয়াজ খান
পল্লবী, ঢাকা-ক্যান্ট, ঢাকা।

উত্তর: অমুসলিম সাহায্য সংস্থায় কাজ করা কিংবা তাদের সাহায্য গ্রহণ করার বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর ব্যাপার। কেননা তারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কোনো মুসলিমকে সাহায্য করে না। বাহ্যত তারা মুসলিমদের সাহায্য করার কথা বললেও ভিতরে ভিতরে তাদের মিশনারী কার্যক্রম চালিয়ে যায়। সাহায্যের নামে তারা অসহায় গরীর-দুঃখী মুসলিমদের ঈমান হরণ করার ফন্দি আঁটতে থাকে। জনসচেতনতার নামে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতির আকর্ষণসহ নানা রকম ইসলামী বিরোধী চিন্তা মুসলিমদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়। তাছাড়া অসহায় মুসলিমদের ডকুমেন্ট নিয়ে অমুসলিম দেশগুলোতে মুসলিমদের অসহায়ত্ব প্রচার করবে, যা অমুসলিমদের মাঝে ইসলামের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করবে। তাছাড়া সাহায্যের আড়ালে মুসলিমদের ভিতরে তাদের গুপ্তচর ছড়িয়ে দিতে পারে। যারা মুসলিমদের মাঝে ধ্বংসাত্মক কাজ চালানোর চেষ্টা করে। অথবা এই অসহায় লোকগুলোকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কাজ করানোর ধান্ধায় থাকে। তাই এসব সংস্থায় কাজ করা থেকে বিরত থাকাই উচিত। কেননা তারা কখনোই মুসলিমদের বন্ধু নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না’ (আল মায়েদা, ৫/৫১)।


প্রশ্ন (৩৬) : সব ব্যাংকই সূদ দেয়। আমার একটি অ্যাকাউন্ট করা প্রয়োজন এক্ষণে আমার করণীয় কী?

-রিফাত মাহমুদ
ধানমন্ডি, ঢাকা।

উত্তর: সূদ হারাম। আল্লাহর রাসূল a সূদখোর, সূদদাতা, সূদের লেখক এবং তার উপর সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ করেছেন, আর বলেছেন, ‘ওরা সকলেই সমান’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮; তিরমিযী, হা/১২০৬)। অতএব সূদ থেকে বেঁচে থাকা ফরয। তবে, বাধ্যগতভাবে যদি ব্যাংকে টাকা রাখতেই হয় তাহলে, রাখা যায়। সেক্ষেত্রে শুধু মূলধন রেখে বাকি অর্থ ফকীর-মিসকীনদেরকে অথবা জনকল্যাণমূলক কোনো কাজে ছওয়াবের নিয়্যত ছাড়া দিয়ে দিবে। কারণ আল্লাহ নিজে পবিত্র। আর পবিত্র ছাড়া তিনি গ্রহণ করেন না (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ১৪/২৭পৃ.; হবে (মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনু বায, ১৯/২৬৮ পৃ.)। আল্লাহ ভালো জানেন!


বৈধ-অবৈধ


প্রশ্ন (৩৭) : গলায় স্কুলের identy card ঝুলানো যাবে কি? কুরআন-হাদীছের আলোকে জানতে চাই।

-রাফিক হোসেন
কুচবিহার।

উত্তর: গলায় স্কুলের Identy card ঝুলানো জায়েয। কেননা তা শুধু পরিচয়ের জন্য ঝুলানো হয়ে থাকে। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়। তবে, তা ছবি মুক্ত হওয়া উচিত। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে ছবি-মূর্তি অঙ্কনকারীদেরকে (ছহীহ মুসলিম, হা/২১০৯; নাসাঈ, হা/৫৩৬৪)। অন্য হাদীছে তিনি a বলেন, ‘ঐ বাড়িতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না; যে বাড়িতে কুকুর ও ছবি-মূর্তি থাকে (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬০৫)। তবে, যদি ছবি যুক্ত করতে বাধ্য করা হয় তাহলে, উপায়ান্তর না পেলে বাধ্য অবস্থায় ছবি যুক্ত করতে পারে। কেননা বাধ্যগত পরিস্থিতিতে হারাম জিনিস সাময়িকভাবে হালাল হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অথচ আল্লাহ তোমাদের উপর যা কিছু হারাম করেছেন তা তিনি সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন, তবে যদি তোমরা নিরূপায় হও (আল আন‘আম, ৬/১১৯)। (তবে ততটুকু নিষিদ্ধ বস্তু খেতে পার যাতে প্রাণে পাঁচতে পার)। তবে, অবশ্যই ছালাতের সময় তা খুলে লুকিয়ে রাখতে হবে।


সম্পদ বণ্টন নীতিমালা


প্রশ্ন (৩৮) : এক মহিলা পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ এক ছেলেকে দান করে রেজি: করে দিয়েছে। ছেলে সে জমির খতিয়ান খুলে খাজনা আদায় করছে। সে মহিলার আরো ৩ মেয়ে আছে। তাদেরকে বঞ্চিত করায় তার ভিতর আল্লাহর ভয় ঢুকেছে। সে বাকি মেয়েকে সম্পদ দেওয়ার জন্য কোর্টে মামলা করেছে। কোর্ট আজকাল করছে আর ঘুরাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছেদান করা জমি ফেরত নেওয়া যাবে কি?

-গোলাম কাদের
চট্টগ্রাম।

উত্তর: সামাজিকভাবে সম্ভব না হলে মামলা করে হলেও এমন দান ফেরত নিতে হবে। কেননা এর মাঝে অন্যান্য সন্তানদের হক্ব রয়েছে। নু’মান ইবনু বাশীর c–এর পিতা জীবদ্দশায় তাকে একটি দাস দান করলেন এবং সাক্ষী বানানোর জন্য রাসূল a–এর নিকট আসলেন। বললেন, আমি আমার এই সন্তানকে একটি দাস দান করেছি এ ব্যাপারে আপনাকে সাক্ষী বানাতে এসেছি। রাসূল a বললেন, «أَعْطَيْتَ سَائِرَ وَلِدِكَ مِثْلَ هَذَا؟» তোমার সকল সন্তানকে এরূপ দিয়েছো? তার পিতা বলল, না; রাসূল a বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৭; মিশকাত, হা/৩০১৯)। সুতরাং যেহেতু জমি এক সন্তানকে দিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে, তাই সে সন্তান যদি ফেরত দিতে না চাই তাহলে, কোর্টের সহযোগিতায় জমি ফেরত নিয়ে সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করা আবশ্যক। অন্যথায় হক্ব নষ্টের কারণে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। ওয়ারেছদেরকে দান/ওছীয়ত করা জায়েয নয়। রাসূল a বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হক্বদারের ন্যায্য হক্ব প্রদান করেছেন। শোনো! ওয়ারিছদের জন্য কোনো ওছীয়ত বা দান নেই’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৭১৪)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক হক্বদারকে তার হক্ব বুঝিয়ে দাও’ (বায়হাক্বী কুবরা, হা/৮৪১৪)। সুতরাং এই দান ফেরত নেওয়াতে কোনো সমস্যা নেই।


প্রশ্ন (৩৯) : বাবার মৃত্যুর পর বাবার সকল সম্পদ মা দখল করে নিজের মত করে ভোগ করতে পারবে কি?

-সালাউদ্দীন
ভাসানটেক, ঢাকা।

উত্তর: না; বাবার মৃত্যুর পর মা তার সকল সম্পদ দখল করে ভোগ করতে পারে না। বরং ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদ দ্বারা কাফন-দাফন সম্পন্ন করে যে সকল সম্পদ অবশিষ্ট থাকবে তা ওয়ারিছদের মাঝে প্রাপ্য অংশ অনুযায়ী ভাগ করে বুঝিয়ে দিতে হবে। কেননা ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পদের মালিকানা তার ওয়ারিছদের মাঝে অংশানুপাতে বণ্টিত হয়ে যায়। তাই স্ত্রী হিসাবে সে আট ভাগের একভাগ (মৃতের যদি সন্তান থেকে থাকে) বা চারভাগের একভাগ (যদি সন্তান না থাকে) পাবে, বাকি অংশ অন্যান্য ওয়ারিছদের মাঝে বণ্টিত হবে। এক্ষেত্রে মা যদি সকল সম্পদ দখল করে ভোগ করে তাহলে অবশ্যই তা যুলুম হবে। আর যুলুমের শাস্তি ভয়াবহ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও বিশ্বাস ভঙ্গ কর না’ (আল আনফাল, ৮/২৭)। সাঈদ ইবনু যায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফায়েল c হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারো এক বিঘত (অর্ধহাত) জমি জোর দখল করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার গলায় সাত স্তর যমীন বেড়িরূপে পরিয়ে দিবেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬১০; মুসনাদে আবী ইয়ালা, হা/৯৫৯)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘(কিয়ামতের দিন) গাদ্দারের জন্য একটি পতাকা তোলা হবে এবং বলা হবে যে, এ হলো অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার নিদর্শন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬১৭৭)। তিনি আরো বলেন, ‘যুলুম কিয়ামতের দিন বহু অন্ধকারের কারণ হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৩১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৭৯)।


প্রশ্ন (৪০) : নিজের প্রাপ্য অংশ পাওয়ার জন্য ভাই-বোন বা অন্য আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে কি?

-সালাউদ্দীন
ভাসানটেক, ঢাকা।

উত্তর: প্রথমে সামাজিকভাবে নিজের ওয়ারিছ সূত্রে পাওয়া অংশ উদ্ধার করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি ব্যর্থ হয় তাহলে, নিজের অধিকার আদায়ের জন্য আইনি ব্যবস্থা হিসেবে মামলা করতে পারে। কেননা আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দিয়েছেন (আবূ দাউদ, হা/৩৫৬৫; নাসাঈ, হা/৩৬৪১)। এখন কেউ যদি কারো অধিকার খর্ব করে তাহলে, সে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। যেমন সাহাবীগণ নিজের হক্ব আদায়ের জন্য রাসূল a–এর নিকট বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ নিয়ে আসতেন (আবূ দাউদ, হা/৩৬১৬, ৩৬৩১)। তবে, এর মাঝেও আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৮৪; মিশকাত, হা/৪৯২২)।


 দুযিকিরআযকার


প্রশ্ন (৪১) : রিযিকের মধ্যে প্রশস্ততা লাভের উপায় জানতে চাই।

-ফারহাদ হোসেন
সখিপুর, শরিয়তপুর।

উত্তর: রিযিকে প্রশস্ততা লাভের অনেক মাধ্যম কুরআন হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। জ্ঞাতার্থে কয়েকটি উল্লেখ্য করা হলো- . তাক্বওয়ার (আল্লাহভীতি) পথ অবলম্বন করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। আর তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে দান করবেন রিযিক’ (আত-তালাক্ব, ৬৫/২-৩)। ২. পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তোমাদের ধন সম্পদ ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দেবেন’ (নূহ, ৭১/১০-১২)। . আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা। উমার c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর উপর প্রকৃতভাবে ভরসা করতে পারো তাহলে, তিনি তোমাদেরকে পাখির ন্যায় রিযিক দান করবেন। অর্থাৎ পাখি যেমন খালি পেটে সকালে বের হয় সন্ধায় ভর্তি পেটে ফিরে আসে (মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৫; ইবনু মাজাহ, হা/৪১৬৪)। . বেশি বেশি দান করা মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ সূদকে মিটিয়ে দেন এবং দানকে বর্ধিত করেন’ (আল বাকারা, ২/২৭৬)। ৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। আনাস c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি স্বীয় রিযিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘজীবী হতে চাই সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৪০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৫৭)। ৬. বিবাহ করা। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তিন প্রকারের মানুষকে সাহায্য করা নিজের কর্তব্য হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদকারী, মুকাতাব গোলাম- যে চুক্তির অর্থ পরিশোধের ইচ্ছা করে এবং বিবাহে আগ্রহী লোক- যে বিবাহের মাধ্যমে পবিত্র জীবন যাপন করতে চাই (আত তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৯; মুসনাদে বাযযার, হা/৮৫০০)। ৭. ছালাতুয যুহা আদায় করা। আবূ উমামা c বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দিনের শুরভাগে চার রাকআত ছালাত আদায় করো আমি তোমার জন্য দিনের শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হয়ে যাবো’ (আল মুজামুল কাবীর, হা/৭৭৪৬; শারহুস সুন্নাহ লিল বাগাবী, ৪/১৪৪ পৃ.)। ৮. বেশি বেশি দু করা। (ক). اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ ‌مِنَ ‌الْفَقْرِ ‌وَالْقِلَّةِ ‌وَالذِّلَّةِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ (). اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ، وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، ‌رَبَّنَا ‌وَرَبَّ ‌كُلِّ ‌شَيْءٍ، مُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ الْعَظِيمِ، أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ (আবূ দাউদ, হা/১৫৪৪; ইবনু মাজাহ, হা/৩৮৩১)। এছাড়াও হাদীছে বর্ণিত অন্যান্য দু‘আসহ নিজ ভাষায় আল্লাহর নিকট রিযিক চাইতে হবে।


ঋণ আদানপ্রদান


প্রশ্ন (৪২) : ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ দাতাকে খুঁজে না পায় তাহলে কিভাবে ঋণ আদায় করবে?

-সাব্বির আহমাদ
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।

উত্তর: প্রথমে তার ওয়ারিছ খুঁজে বের করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবে। যদি কোনভাবেই না পাওয়া যায় তাহলে উক্ত সম্পদ তার নামে বায়তুল মাল বা অন্য কোন জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দিবে (আশ-শারহুল মুমতে‘ ‘উছায়মীন’, ১০/৩৮৮; আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ, ১১/২২৬; ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ২৯/৩২১)। তবে, পরবর্তীতে যদি কখনো সে ব্যক্তি ফিরে আসে এবং তার পাওনা দাবী করে তাহলে, তাকে তা ফিরিয়ে দিতে হবে (লাজনা দায়েমা, ১৪/৪১)।


পোষাকপরিচ্ছদ


 প্রশ্ন (৪৩) : লোহার তৈরি আংটি ব্যবহার করা যাবে কি?

-নূরুল ইসলাম
ঢাকা।

উত্তর: লোহার আংটি ব্যবহার করাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সাহল c হতে বর্ণিত যে, একজন মহিলা এসে রাসূল a-এর কাছে নিজেকে (বিবাহের জন্য) পেশ করলেন। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে আমার সঙ্গে বিবাহ দিয়ে দিন। তখন নবী a বললেন, ‘তোমার কাছে (মোহরানা স্বরূপ) কী আছে? সে উত্তর দিল, আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূল a বললেন, যাও, তালাশ কর, কোন কিছু পাও কিনা? দেখ যদি একটি লোহার আংটিও পাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৩৩; আল ‍মুজামুল কাবীর, হা/৫৯০৭; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ২৪/৬৪; ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব ‘উছায়মীন’, ১১/৫৭; ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব, ‘ইবনু বায’, ৭/২৮৯; আল মাজমু‘ লিন নববী, ৪/৪৬৫)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, লোহার আংটি পরিধান করা জায়েয। লোহার আংটি ব্যবহার করা যাবে না মর্মে বর্ণিত আবূ দাউদ, তিরমিযীর হাদীছ দুর্বল (আবূ দাউদ, হা/৪২২৩; তিরমিযী, হা/১৭৮৫ ‘দুর্বল’)।


তাক্বলীদের বিধান


প্রশ্ন (৪৪) : তাক্বলীদ করা কী সবার জন্য হারাম? এ ব্যাপারে সালাফদের বক্তব্য জানতে চাই।

-তাজবির উল হক
বাকলিয়া, চট্টগ্রাম।

উত্তর: তাক্বলীদ ও ইত্তেবা দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। তাক্বলীদ হলো- কোন শারঈ বিষয়ে কারো কথাকে বিনা দলীল-প্রমাণে চোখ বুজে গ্রহণ করা (জুরজানী, কিতাবুত তা‘রীফ, ৬৪ পৃ.)। ইত্তেবা হলো- বিশুদ্ধ দলীল অনুযায়ী রাসূল a–এর অনুসরণ করাকে ইত্তেবা বলা হয় (আল ক্বওলুল মুফীদ ‘শাওকানী’, ১৪ পৃ.)। তাক্বলীদ অর্থ অন্ধ অনুসরণ যা সবার জন্য হারাম। হোক না সে আলেম কিংবা সাধারণ কোনো ব্যক্তি। কেননা স্বর্ণ যুগ থেকে ৪র্থ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কোনো মাযহাব ছিল না। তখন সাধারণ মানুষ, আলেম-উলামার কেউ তাক্বলীদ করেনি। চার মাযহাবের আবির্ভাব ঘটেছে তাবে-তাবেঈনদের পরে। শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী p বলেন, হিজরী ৪র্থ শতাব্দীর পূর্বে কোন মুসলিমরা নির্দিষ্টভাবে কোন একজন বিদ্বানের মাযহাবের তাক্বলীদের উপরে সংঘবদ্ধ ছিল না (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ, ১/১৫২-৫৩, ‘চতুর্থ শতাব্দী ও তার পরের লোকদের অবস্থা বর্ণনা’ অনুচ্ছেদ)। অত্র বিবরণে বুঝা যায়, ভারতীয় বিদ্বানদের নিকটেও ৪০০ হিজরীর পূর্বে কোন মাযহাব ছিল না। তাক্বলীদের ব্যাপারে সালাফদের বক্তব্য: ১. ইমাম আবূ হানিফা p বলেন, لا يحل لأحد أن يأخذ بقولنا ما لم يعلم من أين أخذناه ‘আমরা কোথা থেকে গ্রহণ করেছি, তা না জেনে আমাদের কথা গ্রহণ করা কারো জন্য বৈধ নয়’ (হাশিয়া ইবনু আবেদীন, ৬/২৯৩)। ‘যখন ছহীহ হাদীছ পাবে, জেনো সেটাই আমার মাযহাব’ (হাশিয়াহ ইবনে আবেদীন ১/৬৩)। ২. ইমাম শাফেঈ p বলেন, ‘রাসূলুললাহ ছা-এর প্রত্যেকটি হাদীছই আমার কথা, যদিও আমার নিকট থেকে তোমরা তা না শুনে থাক’ (ইবনু আবী হাতেম, পৃ. ৯৩)। ৩. ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল p বলেন, ‘তুমি আমার তাক্বলীদ কর না এবং তাক্বলীদ কর না মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ ও ছাওরীর। বরং তাঁরা যে উৎস হতে গ্রহণ করেছেন, সেখান থেকে তোমরাও গ্রহণ কর’ (ই‘লামুল মুওয়াক্কি‘ঈন, ২/৩০২)। ৪. ইমাম মালেক p বলেন, ‘আমি একজন মানুষ মাত্র। আমি ভুল করি, আবার ঠিকও করি। অতএব আমার সিদ্ধান্তগুলো তোমরা যাচাই কর। যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূলে হবে সেগুলো গ্রহণ কর। আর যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিকূলে হবে তা প্রত্যাখ্যান কর’ (ইমাম ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১৪৯)। এসকল বক্তব্য স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, তাক্বলীদ সালাফদের নিকট একটি গর্হিত কাজ ছিল।


কুসংস্কার


প্রশ্ন (৪৫) : নবজাতক শিশুকে দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোন উপঢৌকন নিয়ে যাওয়া এবং তার আক্বীকার উদ্দেশ্যে খানা-পিনার ব্যাপক আয়োজন করা কি শরী‘আত সম্মত?

উত্তর: এগুলো সামাজিক কুসংস্কার। নবজাতক শিশুর আক্বীকার জন্য খানা-পিনার ব্যাপক আয়োজন করা ও তাকে হাদিয়া দেয়া শরী‘আত সম্মত নয়। তবে আক্বীকার গোশত আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে হাদিয়া স্বরূপ বন্টন করা যায় এবং প্রয়োজনে তা রান্না করে খাওয়ানো যায় (বায়হাক্বী, ৯/৩০২ পৃ.)। অনুরূপ কোন দিন নির্ধারণ ছাড়াই ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার জন্য হাদিয়া দেয়া যেতে পারে। কারণ পরস্পরকে হাদিয়া দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। আয়েশা g বলেন, ‘রাসূল a হাদিয়া কবুল করতেন। কেউ তাঁকে হাদিয়া দিলে তিনিও তাকে হাদিয়া দিয়ে পাঠাতেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৫৮৫; মিশকাত, হা/১৮২৬)।


প্রশ্ন (৪৬) : ফেসবুকে জন্মদিন উইশ (শুভ কামনা জানানো) করা কতটুকু শরীআতসম্মত?

-আব্দুল খালেক
 রাজশাহী।

উত্তর: জন্মদিন পালন করা এবং এ উপলক্ষে উইশ (wish) করা বা শুভকামনা জানানো কিংবা উপহার প্রদান করা জায়েয নয়। কেননা তা অমুসলিমদের সংস্কৃতি। ইসলামে অমুসলিমদের অনুসরণ-অনুকরণ করা কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। হোক তা ইবাদতের ক্ষেত্রে কিংবা আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, রীতি-নীতি বা কৃষ্টি-কালচারের ক্ষেত্রে হোক। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল স. বলেছেন: مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে কেউ অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই দলভুক্ত বলে গণ্য হবে’ (আবূ দাউদ, হা/৪০৩১)। সুতরাং এ উপলক্ষে কাউকে উইশ (wish) করা, শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো, গিফট দেয়া, কেক কাটা, মোমবাতি জ্বালানো বা ফুঁ দিয়ে নিভানো, বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা, জন্ম দিনের পার্টি করা সবই হারাম।


বিবিধ


প্রশ্ন (৪৭) : আমাদেরকে (আহলেহাদীছদের) অন্যান্য লোকেরা ইয়াহুদীদের দালাল বলে, তখন আমার খুব কান্না পাই, আমার সান্ত্বনা কী?

-মো. মহিদুল ইসলাম
বিসমিল্লাহ গোট ফার্ম, যশোর।

উত্তর: একজন মুসলিমের উচিত হবে কোনো মুসলিম ভাইকে বিদ্রুপ করা কিংবা মন্দ নামে ‍ডাকা হতে বিরত থাকা। কারণ তা একটি গর্হিত কাজ। যা কখনো মুমিনের কাজ হতে পারে না। কেউ যদি কোনো মুসলিমকে কাফের কিংবা ইহুদি-খ্রিস্টান বলে সম্বোধন করে তাহলে, সে গালি উল্টা তার উপর কার্যকর হবে। ইবনু উমার h থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘কেউ তার ভাইকে কাফের বলে সম্মোধন করলে উভয়ের একজন কাফের হয়ে যাবে। যাকে কাফের বলা হয়েছে সে কাফের হলে তো হলই নতুবা কথাটি বক্তার উপরই ফিরে আসবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬০; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/২৪৪২)। আল্লাহ তাআলা বলেন,হে ঈমানদারগণ! কোন সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘…তোমরা একে অন্যের নিন্দা করো না, একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর মন্দ নাম কতই না মন্দ! যারা তওবা না করে তারাই যালেম’ (আল-হুযরাত, ৪৯/১১)। অত্র আয়াতে প্রমাণিত হয় যে, কাউকে মন্দ নামে ডাকা যাবে না। অতএব এ ক্ষেত্রে আপনার উচিত হবে ধৈর্য্য ধারণ করা এবং সফলতা ও গুনাহ মাফের আশা করা। রাসূল a বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এ সবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৪১; মিশকাত, হা/১৫৩৭)। এছাড়াও রাসূল a বলেছেন, ‘জেনে রেখো! তোমার অপছন্দনীয় বিষয়ের প্রতি ধৈর্য ধারণ করাতে রয়েছে অনেক কল্যাণ। আর ধৈর্য্যর সাথেই রয়েছে বিজয়’ (মুসনাদে আহমাদ, ৫/১৯)।


প্রশ্ন (৪৮) : হোমিও চিকিৎসা ও ওষুধ তৈরিতে এ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়, এ চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে কি?

উত্তর: হোমিও ওষুধ খাওয়া যাবে। কেননা তাতে যে এ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়, তা মদ হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই (উছায়মীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ১১/২৫৬-২৬০)।


প্রশ্ন (৪): একজন যুবক হিসেবে বাবা-মাকে নছীহা করার উপায় কী?

-আব্দুল্লাহ আস-সা‘দ
মতিহার, রাজশাহী।

উত্তর: পিতামাতা পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানী মানুষ। আল্লাহ তাআলা নিজের পরে পরে তাদেরকে স্থান দিয়েছেন। তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ও আদব-আখলাক, আচার-ব্যবহার ঠিক রেখে তাদেরকে নছীহত করতে হবে। নছীহা করতে গিয়ে নরম স্বরে তাদের সাথে কথা বলতে হবে। কঠোর শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার কাছে বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হয়, তখন বিরক্তিভরে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না। তাদেরকে ধমক দিও না। বরং তাদেরকে কোমল কথা বলো’ (আল ইসরা, ১৭/২৩)। তাদের জন্য বেশি বেশি দু‘আ করতে হবে। প্রয়োজনে সৎ লোকদের কাছে দু‘আ চাইতে হবে। যেমনটি আবূ হুরায়রা c তার মায়ের হেদায়াতের জন্য নবী স.কে দু‘আ করতে বলেছিলেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯১)।


প্রশ্ন (৫০) : ইসলামী ইতিহাস জানার জন্য নির্ভরযোগ্য কিতাবাদী সম্পর্কে জানতে চাই।

-মুহাম্মদ সাজেদুল হক রানা
চট্রগ্রাম।

উত্তর: ইসলামের ইতিহাস জানার জন্য অনেক নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। নিম্নে কিছু উল্লেখ করা হলো- ১. তারীখুত-ত্ববারী ২. আল-বিদায়া ওয়ান-নেহায়া ৩. আর-রাহিক্বুল মাখতুম ৪. আত তারীখুল ইসলামী মাহমুদ শাকের।