প্রশ্ন (১) : শারীরিকভাবে সক্ষম ব্যক্তি কাজ না করে সাহায্য চেয়ে বেড়ালে তাকে সাহায্য করা যাবে কি?

-আবুবকর ছিদ্দীক

আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রাজশাহী।

উত্তর : এমন ব্যক্তিকে সাহায্য করা যায়। তবে সাহায্য প্রার্থনার চেয়ে কর্ম করে জীবন-যাপন করাই যে উত্তম সে বিষয়টি তাকে অবহিত করা যরূরী। ওবায়দুল্লাহ ইবনু আদী ইবনু খিয়ার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে দু’জন (ছাহাবী) এই মর্মে অবহিত করেছেন যে, বিদায় হজ্জের দিন (মক্কায়) তারা উভয়েই নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট গেলেন, যখন তিনি মানুষের মধ্যে যাকাতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন তারা তার নিকট কিছু যাকাত চাইলেন। তারা বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের প্রতি দৃষ্টি উঠালেন, অতঃপর দৃষ্টি নীচু করলেন এবং দেখলেন যে, আমরা কর্মক্ষম। তখন তিনি বললেন, যদি তোমরা চাও আমি তোমাদের দিতে পারি, কিন্তু মনে রেখো, ধনী ব্যক্তি ও কাজ করতে সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য যাকাতের কোন অংশ নেই (আবুদাঊদ, হা/১৬৩৩; নাসাঈ, হা/২৫৯৮; মিশকাত, হা/১৮৩২)।

প্রশ্ন (২) : ‘হিফয করে তা ভুলে গেলে জাহান্নামে যেতে হবে’-এমন কথা কি ঠিক?

-আসমাঊল হুসনা

শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর :  এমন কথার শারঈ কোন ভিত্তি নেই। তবে কুরআন হিফয পর চর্চা না করে ভুলে যাওয়া আদৌ ঠিক নয়। ইবনু মাসঊদ (ছাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, কারও এরূপ বলা কী জঘন্য কথা! যে বলে, আমি কুরআনের অমুক অমুক আয়াত ভুলে গেছি; বরং সে যেন বলে তাকে ভুলানো হয়েছে। সুতরাং তোমরা পুনঃপুনঃ কুরআন স্মরণ করবে। কেননা এটা মানুষের অন্তর হতে চতুষ্পদ জন্তু অপেক্ষাও অধিক পলায়নপর (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৯০; মিশকাত, হা/২১৮৮)। অপর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা কুরআনের প্রতি যত্নশীল হও। আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার জীবন রয়েছে, নিশ্চয়ই কুরআন রশিতে বাঁধা উট অপেক্ষাও অধিক পলায়নপর’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৩৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৯১; মিশকাত, হা/২১৮৭)। তাই হিফয ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। কেননা ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট দু’টি জিনিস বান্দার জন্য সুপারিশ করবে আর আল্লাহও তাদের সুপারিশ

কবুল করবেন। সে দু’টির একটি হচ্ছে কুরআন (বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/১৯৯৪; মিশকাত হা/১৯৬৩)।

 

প্রশ্ন (৩) : তওবা কবুলের শর্ত কী কী?

-মোশাররফ বিন নূরুল ইসলাম

সাঘাটা, গাইবান্ধা।

উত্তর : তওবা কবুলের জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে (১) একমাত্র আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই তওবা হতে হবে। (২) কৃত গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে। (৩) পুনরায় সে গোনাহে জড়িত না হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আর যদি পাপটি বান্দার সাথে যুক্ত হয়, তাহলে উপরের তিনটি শর্ত পূরণের সাথে চতুর্থ শর্ত হিসাবে তাকে বান্দার নিকটে ক্ষমা চাইতে হবে ও তাকে খুশী করতে হবে। নইলে তার তওবা শুদ্ধ হবে না’ (নববী, রিয়াযুছ ছালেহীন, ‘তওবা’ অনুচ্ছেদ)। তওবার জন্য পাঠ করতে হবে ‘আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ুম ওয়া আতূবু ইলাইহে’ (তিরমিযী, হা/৩৫৭৭; আবুদাঊদ, হা/১৫১৭; মিশকাত, হা/২৩৫৩)।

প্রশ্ন (৪) : রুকূর সময় কোন দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে?

-আফীফ

 ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

উত্তর : তাশাহুদের বৈঠক ব্যতীত ছালাতের সর্বাবস্থায় সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখবে। সালেম ইবনু আব্দুল্লাহ (ছাঃ) হতে বর্ণিত। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) কা‘বায় প্রবেশ করার পর থেকে বাহির হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সিজদার স্থান হতে তাঁর দৃষ্টি সরাতেন না’ (মুস্তাদরাক হাকেম, হা/১৭৬১; বায়হাক্বী, সনানুল কুবরা, হা/১০০০৮; ছিফাতু ছালাতিন নবী, পৃঃ ৮৯; সনদ ছহীহ, ইওয়াউল গালীল, হা/৩৫৪-এর আলোচনা দ্রঃ)। বৈঠক চলাকালীন দৃষ্টি থাকবে আঙ্গুলের ইশারার দিকে। নাফে‘ (রহিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) যখন ছালাতে বসতেন, তখন তার দু’হাতকে নিজের দু’রানের উপর রাখতেন। আর শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করতেন এবং তার চোখের দৃষ্টি থাকতো আঙ্গুলের প্রতি। তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘এ শাহাদাত আঙ্গুল শয়তানের কাছে লোহার চেয়ে বেশি শক্ত’ (আহমাদ, হা/৫৯৬৪; আবুদাঊদ, হা/৯৯০; নাসাঈ, হা/১২৭৫; মিশকাত, হা/৯১৭)।

প্রশ্ন (৫) : নামের পূর্বে ‘হাজী’ বা ‘আলহাজ্জ’ বসালে কি পাপ হবে? 

-মনিরুল ইসলাম

পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : নামের পূর্বে ‘হাজী’ বা ‘আলহাজ্জ’ লেখাতে শারঈ কোনো বাধা নেই। তবে এভাবে না বলাই উত্তম। কেননা এতে অহঙ্কার ও রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করার মধ্যে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই হারাম। এর কারণে পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ছহীহ হাদীছে এসেছে, ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তির হিসাব নেওয়া হবে। যাদের একজন আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছিল, আরেকজন কুরআন শিক্ষা করেছিল ও মানুষকে শিক্ষা দিয়েছিল এবং তৃতীয়জন আল্লাহর পথে দান-ছাদাক্বাহ করেছিল। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে শ্রেষ্ঠ হওয়া। যেন তাদেরকে ‘শহীদ, ক্বারী-আলেম ও দানবীর’ বলে ডাকা হয়। আল্লাহ বলবেন, দুনিয়াতে তোমাদেরকে তা বলে ডাকা হয়ে গেছে। অতএব এখানে তোমাদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতঃপর তাদেরকে মুখের ভরে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৫; মিশকাত, হা/২০৫)।  রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও বলেছেন, যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না (ছহীহ মুসলিম, হা/৯১; মিশকাত, হা/৫১০৮)।

প্রশ্ন (৬) : টিকটিকি মারার তাৎপর্য কী?

-নিয়ামুল হাসান নয়ন

শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : টিকটিকি মারার তাৎপর্য সম্পর্কে ইবনু মাজাহর বর্ণনার এসেছে, মা আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে একটি বর্শা ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, বর্শা দিয়ে আপনি কী করেন? তিনি বললেন, এটা দিয়ে টিকটিকি মারি। কারণ রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, অত্যাচারী বাদশা নমরূদ কর্তৃক ইবরাহীম (আঃ)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তখন টিকটিকি ব্যতীত সকল প্রাণী আগুন নিভানোর চেষ্টা করেছিল। আর টিকটিকি আগুনে ফুঁক দিয়ে আগুন শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছিল। এ জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) টিকটিকি হত্যা করতে বলেছেন (ইবনু মাজাহ, হা/৩২৩১; ছহীহ ইবনু মাজাহ, হা/২৬৩৪)। সা‘দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত অপর এক হাদীছে রাসূল (ছাঃ) টিকটিকিকে ক্ষুদ্র ফাসেক্ব বলে অভিহিত করেছেন। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) হতে বর্ণিত, অপর এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) গিরগিটিকে মেরে ফেলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে ক্ষুদ্র ফাসেক্ব বলে অভিহিত করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৩৮; মিশকাত, হা/৪১২০)।

প্রশ্ন (৭) : রোগ থেকে আরোগ্য লাভের আশায় সুলেমানী  পাথর ব্যবহার করা কি জায়েয?

-আব্দুছ ছামা

শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : রোগমুক্তির উদ্দেশ্য সুলেমানী পাথর ব্যবহার করা যাবে না। কেননা আরোগ্য লাভের আশায় যেকোনো জিনিস ঝুালানো বা ব্যবহার করা শিরক। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রক্ষাকবচ ধারণ করবে, তাকে ঐ জিনিসের কাছে সোপর্দ করা হবে’ (আবুদাঊদ, হা/২০৭২; মিশকাত, হা/৪৫৫৬)। অপর বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি তাবিজ লটকালো সে শিরক করল’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৮৮৪)।

প্রশ্ন (৮) : মুসাফির অবস্থায় তাহাজ্জুদ ছালাত আদায় করা যাবে কি? কত রাক‘আত পড়তে হবে?

-আনোয়ার হোসেন

কাশিমপুর, গাজীপুর।

উত্তর : মুসাফির অবস্থায় তাহাজ্জুদ ছালাত আদায় করা যাবে। আমির ইবনু রাবী‘আহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে রাতের বেলা সফরে বাহনের পিঠে বাহনের গতিপথ অভিমুখী হয়ে নফল ছালাত আদায় করতে দেখেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/১১০৪)। অপর এক হাদীছে এসেছে, আল্লাহ তিন ব্যক্তিকে ভালোবাসেন ও তাদের দেখে হাসেন এবং তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। তন্মধ্যে একজন হলো ঐ ব্যক্তি যে সফরে কাফেলার সঙ্গে থাকা অবস্থায় ভালো থাক বা কষ্টে থাক ঘুম থেকে উঠে ছালাত আদায় করে’ (হাকেম, ১/২৫ পৃঃ; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩৪৭৮)।

প্রশ্ন (৯) : এক বছরের শিশু বাচ্চার রোগমুক্তির জন্য গোবর দিয়ে গোসল দিয়েছে। এতে কি তাদের পাপ হবে?

-ইবরাহীম খলীল

 গোলাপপুর, টাঙ্গাঈল।

উত্তর : যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া হালাল সেসব প্রাণীর পেশাব-পায়খানা পবিত্র হলেও রোগমুক্তির আশায় অসুস্থ শিশুকে তা দ্বারা গোসল দেওয়া জায়েয নয়। বরং এটা সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার মাত্র। তবে হালাল প্রাণীর পেশাব দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণ করতে চাইলে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক তা গ্রহণ করা যেতে পারে। নবী করীম (ছাঃ) কিছু অসুস্থ লোককে উটের পেশাব ও দুধ পান করার জন্য আদেশ করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫০-৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১১; আবুদাঊদ, হা/৪৩৬৪; তিরমিযী, হা/৭২; ইবনু মাজাহ, হা/২৫৭৮)।

প্রশ্ন (১০) : বিড়ি বা তামাকের কারখানায় কাজ করলে তার ছালাত কবুল হবে কি?

-জাহিদুল ইসলাম

ময়মনসিংহ।

উত্তর : প্রত্যেক নেশাদার বস্তুই হারাম (আবুদাঊদ, হা/৩৬৮৭; মিশকাত, হা/৩৬৫২)। তামাক নেশাদার বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা হারাম। অতএব তামাক উৎপাদন করা, এর কারখানায় কাজ করা কিংবা ব্যবসা করা সবই হারাম। ফলে তার ছালাত কবুল হবে না। কেননা মহান আল্লাহ নিজে পবিত্র। আর পবিত্র ছাড়া তিনি গ্রহণ করেন না (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)।

প্রশ্ন (১১) : নিকটতম মসজিদের খুৎবা বা কমিটির কার্যকলাপ অপসন্দ হওয়ায় খুৎবা শোনার জন্য অন্য মসজিদে যাওয়া যাবে কি?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : আক্বীদাগত কোনো ত্রুটি না থাকলে বা নছীহতগত কোনো ব্যাপার না থাকলে নিকটতম মসজিদ ছেড়ে অন্য মসজিদে যাওয়া যাবে না। কেননা রাসূল (ছাঃ) তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোনো মসজিদে নেকীর উদ্দেশ্যে সফর করতে নিষেধ করেছেন। মসজিদ তিনটি হলো, মসজিদে হারাম, মসজিদে আক্বছা ও মসজিতে নববী’ (ছহীহ বুখারী, হা/১১৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৯৭; মিশকাত, হা/৬৯৩)। অতএব সামাজিক কোনো সমস্যাকে সামনে রেখে নিকটতম মসজিদ ছেড়ে দূরের মসজিদে যাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন (১২) : অনেক সময় ফরয গোসল করার সময় পা ধোয়ার পূর্বেই শরীরে পানি দিয়ে তা মুছে ফেলি। পরে স্মরণ হলে পা ধুয়ে ফেলি। এভাবে কি গোসল পূর্ণ হবে? না পুনরায় গোসল করতে হবে?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : এক্ষেত্রে পুনরায় গোসল করতে হবে না। কারণ গোসলের ফরযিয়্যাত আদায় হয়ে গেছে। তবে গোসলের পূর্বে করা ওযূতে ছালাত আদায় করা যাবে না। কারণ তখন ওযূ পূর্ণ হয়নি। তাই ছালাত আদায় করতে চাইলে নতুনভাবে ওযূ করতে হবে। কারণ ওযূর নিয়ম হলো এক অঙ্গ শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই আরেক অঙ্গ ধৌত করা (শায়খ উছায়মীন, ফাতাওয়া আরকানিল ইসলাম, পৃঃ ২১৯; ফাতাওয়া শায়খ বিন বায, ১০/১০২-১০৩; ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/৩৮-৩৯ পৃঃ)।

 

 

প্রশ্ন (১৩) : ছালাতের ব্যাপারে স্পষ্ট ছহীহ হাদীছ আছে, তা জানা সত্ত্বেও যদি কেউ দুর্বল হাদীছ অনুযায়ী ছালাত আদায় করে, তাহলে কি তার ছালাত কবুল হবে?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যে পদ্ধতিতে ছালাত আদায় করেছেন সে পদ্ধতিতেই ছালাত আদায় করতে হবে। এমর্মে তিনি বলেন, صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِى أُصَلِّى ‘তোমরা আমাকে যেভাবে ছালাত আদায় করতে দেখেছ সেভাবেই ছালাত আদায় করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৬; মিশকাত, হা/৬৮৩)। আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাতের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ছহীহ-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং তা যে কোনো হাদীছ গ্রন্থের ছালাত অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কাজেই জেনে-শুনে ছহীহ হাদীছকে উপেক্ষা করে যঈফ হাদীছের উপর আমল করলে ছালাত হবে না। তবে না জেনে যদি কেউ আমল করে তাহলে আল্লাহ হয়তো তাকে মাফ করবেন।

প্রশ্ন (১৪) : ব্যাংকে চাকুরী করে এমন ব্যক্তির টাকা থেকে সাহায্য বা ঋণ নেওয়া যাবে কি?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : এমন ব্যক্তি হতে নেওয়া সাহায্য বা ঋণ যদি সূদমুক্ত হয় তাহলে তা গ্রহণে শারঈ কোনো বাধা নেই। কেননা ব্যাংকে চাকুরী করার কারণে বা সূদের হিসাব-নিকাশ করার কারণে কর্মরত ব্যক্তি কাবীরা গুনাহের সাথে জড়িত হবে এবং সে-ই তার পাপের শাস্তি ভোগ করবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮; মিশকাত, হা/২৮০৭)। এ পাপের দায়ভার অন্য কেউ বহন করবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ‘কেউ কারো পাপের বোঝা বহণ করবে না’ (আন‘আম, ১৬৪)। তবে হারামের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের থেকে সাহায্য বা ঋণ গ্রহণ না করাই ভালো (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮০১)।

প্রশ্ন (১৫) : বর্তমানে অনেক ইসলামী সম্মেলনে যাদেরকে অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ করা হয় তারা অধিকাংশই সূদী কিংবা অবৈধ অর্থ-সম্পদের মালিক। তাদেরকে এমন সম্মেলনে অতিথি নির্ধারণ করা যাবে কি

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : ইসলামী জালসা বা সম্মেলনে সভাপতি হিসাবে বিজ্ঞ বা আলেম ব্যক্তিই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। তবে বর্তমানে প্রশ্নোল্লেখিত ব্যক্তিদেরকে প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি পদে আসীন করা হয় কয়েকটি কারণে- প্রথমত, জালসা বা সম্মেলনের অনুমতির ক্ষেত্রে সহায়ক হওয়া। দ্বিতীয়ত, আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া। তৃতীয়ত, জনপ্রতিনিধির দ্বায়িত্বশীল হিসাবে মূল্যায়ন করা ইত্যাদি। মহান আল্লাহ কখনো কখনো মন্দ লোকদের দ্বারাও দ্বীনকে শক্তিশালী করে থাকেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১১১)।

 

 

প্রশ্ন (১৬) : পানি থাকা সত্ত্বেও কি টিস্যু ব্যবহার করা জায়েয?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : পবিত্রতা অর্জনের জন্য পানিই যথেষ্ট। তবে পানি না পাওয়া গেলে ঢেলা বা টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। সূরা তওবার ১০৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কোবাবাসীদের প্রশংসা করেছেন। কেননা তারা শুধু পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা করতেন (ছহীহ আবুদাঊদ, হা/৪৪; বুলূগুল মারাম, হা/১০৫; বিস্তারিত দ্রঃ তাফসীরে ইবনে কাছীর উক্ত আয়াতের ব্যাখ্য)। তবে তারা পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা করার পর ঢেলা ব্যবহার করতেন মর্মে ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে মুসনাদে বায্যারে যে বর্ণনাটি এসেছে তা যঈফ (বুলূগুল মারাম, হা/১০৪)। পানির আগে টিস্যু পেপার বা অন্য কিছু ব্যবহার করা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়ে। অতএব কেবল পানিই যথেষ্ট।

প্রশ্ন (১৭) : কষ্ট করে কুরআন পাঠ করার পরেও ভুল হলে কি নেকী পাওয়া যাবে?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : যারা সুন্দর করে কুরআন পড়তে পারে না বরং পড়তে খুব কষ্ট হয়, ভুল হয়, আটকে যায় তাদের জন্য দ্বিগুণ নেকী রয়েছে। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, কুরআন পাঠে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত লেখক ফেরেশতাদের সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে কিন্তু আটকে যায় এবং কুরআন পড়া তার পক্ষে খুব কষ্টকর হয় তার জন্য দ্বিগুণ নেকী রয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৯৮; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/২১১২)।

প্রশ্ন (১৮) : তাদলীস কী?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : তাদলীসের আভিধানিক অর্থ-كِتْمان عَيْبِ السلعة عن المشتري ‘ক্রেতার কাছে পণ্যের দোষ গোপন করা’। তবে মৌলিকভাবে অভিধানে تدليس শব্দটি دلس ‘দালসুন’ শব্দমূল থেকে উদগত। এর অর্থ- ধোঁকা বা অন্ধকার। আবার কেউ কেউ বলেছেন, اختلاط الظلام ‘অন্ধকারের সংমিশ্রণ’। পরিভাষায় এর অর্থ হলো- هو الحديث الذي أُخفي عيب في إسناده لكي يصبح ظاهره حسنا ‘এমন হাদীছ যার সনদের ক্রটি গোপন করা হয়, যেন বাহ্যিকভাবে তা ছহীহ মনে হয়’। (আসইলাতুস সুন্নিয়্যাহ ‘আলাল মানযুমাতিল বায়ক্বুনিয়্যাহ, ১/২২)। অভিধানের সাথে সঙ্গতি রেখে এভাবে বলা যায়। এ পদ্ধতিতে বর্ণনাকারী লোকদেরকে অন্ধকারে রাখে। এটি দুইভাবে বিভক্ত। (ক) তাদলীসুল ইসনাদ : শিক্ষকের কাছ থেকে শোনা নয়, এমন কোনো হাদীছকে তার নামে বর্ণনা করা। (খ) তাদলীসুশ শুয়ূখ : দুইজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর মাঝে যদি কোন দুর্বল বর্ণনাকারী থাকে, তাহলে সনদটিকে ছহীহ দেখানোর মানসে মাঝ থেকে দুর্বল বর্ণনাকারীকে বিলুপ্ত করে দেওয়া। এই দুই প্রকারের আরও বিশদ ব্যাখ্যা আছে (বিস্তারিত দেখুন, যঈফ হাদীছ কেন বর্জনীয়, পৃঃ ১৬৯-১৭০, অনুবাদ ও সংকলনে কামাল আহমাদ)।

প্রশ্ন (১৯) : আর্থিক অভাব-অনটন ও যুলুম থেকে বাঁচার কোনো দু‘আ আছে কি?

-হাবীবুর রহমান

রহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) দারিদ্র ও যুলুম হতে বাঁচার জন্য নিম্বের দু‘আটি পড়তেন,

اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُبِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ

‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট দারিদ্র, অল্প (রহমত) ও অসম্মানি হতে পানাহ চাচ্ছি এবং আমি তোমার নিকট যুলুম করা হতে আশ্রয় চাচ্ছি’ (আবুদাঊদ, হা/১৫৪৪; তাহক্বীক মিশকাত, হা/২৪৬৭)।

প্রশ্ন (২০) : ‘কাতারের মাঝে ফাঁক বন্ধ করে দাঁড়ালে তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে’ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ?

-আতাউল্লাহ

সাহেব বাজার, রাজশাহী।

উত্তর : হ্যাঁ, এ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি ছহীহ। হাদীছটি হলো,

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ سَدَّ فُرْجَةً فِي صَفٍّ رَفَعَهُ اللهُ بِهَا دَرَجَةً أَوْ بَنَى لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ.

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কাতারের মাঝে ফাঁক বন্ধ করে দাঁড়াবে তার বিনিময়ে মহান আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন অথবা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন (ত্ববারানী, আল মু‘জামুল আওসাত্ব, হা/৫৭৯৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/৩৮২৪, সনদ সহীহ; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৮৯২)।

প্রশ্ন (২১) : স্বামী বা স্ত্রী কি তাদের পরস্পরের শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করতে বাধ্য?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা পুত্রবধুর জন্য অবশ্য কর্তব্য। আবু ক্বাতাদাহ (রাঃ) তার পুত্রবধুর কাছে গেলে তিনি তাকে ওযূ করার জন্য পানি এগিয়ে দিয়েছিলেন (আবুদাঊদ, হা/৭৫; তিরমিযী, হা/৯২; মিশকাত, হা/৪৮২)।

প্রশ্ন (২২) : ‘বানর হতে মানুষ সৃষ্টি’ কথাটির বাস্তবতা আছে কি?

-ইমন

কুষ্টিয়া।

উত্তর : কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং কুরআন মাজীদের সাথে সাংঘর্ষিক। মানুষ সৃষ্টির মূল উপাদান হলো মাটি। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার মূল উপাদান হতে’ (মুমিনূন, ১২)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি তোমাদেরকে প্রথমে মাটি ও পরে বীর্য হতে সৃষ্টি করেছেন’ (মুমিন, ৬৭)। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘ফেরেশতাদেরকে নূর থেকে ও জিন জাতিকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আদম জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই সমস্ত ছিফাত দ্বারা, যে ছিফাতে তোমাদেরকে ভূষিত করা হয়েছে’। অর্থাৎ মানব জাতিকে মাটি ও পানি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৯৬; মিশকাত, হা/৫৭০১)। উল্লেখ্য যে, ডারউইনের বিবর্তনবাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, বানর হতে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের সৃষ্টি। কিন্তু এই মতের স্বপক্ষে অদ্যবধি যারা সমর্থন করে আসছেন তারা গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। তাছাড়া দাঊদ (রহিঃ)-এর সময় নাফরমান ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের যাদের আকৃতি পরিবর্তিত হয়ে বানর-শূকরে পরিণত হয়েছিল (বাক্বারাহ, ৬৫)। ঐ বানর থেকে কোনো বংশ বিস্তার ঘটেনি। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তারা কিছু খেতে পারত না, পান করতে পারত না। তারা মাত্র তিন দিন বেঁচে ছিল (তাফসীরে কুরতুবী, ১/৪৪১)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَنَّ الْمَمْسُوخَ لَا يَنْسِلُ ‘চেহারা বিকৃতরা কোনো বংশ বিস্তার করে না’ (তাফসীরে কুরতুবী, ১/৪৪১)। আল্লাহ এদের সমূলে ধ্বংস করেছিলেন। সুতরাং বানর পূর্বকালে মানুষ ছিল বা মানুষ পূর্বকালে বানর ছিল, কোনটাই ঠিক নয়। বরং বানর আল্লাহ পাকের একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টি।

প্রশ্ন (২৩) : আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে মাছ চাষের উদ্যোগ নিয়েছি। সেখানে মাথাপিছু যে অর্থ ধার্য করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বিধায় আমার এক বন্ধু তার একাউন্টে জমাকৃত টাকা থেকে আমাকে ঋণ দিতে চায় এই শর্তে যে, উক্ত টাকায় যে সূদ আসবে পরবর্তীতে তা আমাকেই পরিশোধ করতে হবে? এটা কি বৈধ হবে?

-আব্দুল করীম মোল্লা

 সোনাতলা, বগুড়া।

উত্তর : না, সূদ লেন-দেনের শর্তে কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রকল্প কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের কাজ করা বৈধ নয়। যেমন ব্যাংক থেকে সূদের মাধ্যমে অর্থ নিয়ে বাড়ী-ঘর নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটানো ইত্যাদি। অনুরূপভাবে সূদের ভিত্তিতে কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়াও বৈধ নয়। কেননা সূদ সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে যে, ‘আল্লাহ তা‘আলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন’ (বাক্বারাহ, ২৭৫)।

প্রশ্ন (২৪) : ছালাত ভঙ্গের কারণগুলো পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আব্দুল কুদ্দুস

চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

উত্তর : ছালাত ভঙ্গের উল্লেখ্যযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, (১) ছালাত অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা। (২) ইচ্ছাকৃতভাবে ‘আমলে কাছীর’ তথা ‘বাহুল্য কাজ’ করা যা দেখে ধারণা হয় যে, সে ছালাতের মধ্যে নয়। (৩) ছালাতের স্বার্থ ব্যতিরেকে অন্য কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলা। (৪) ইচ্ছাকৃত বা বিনা কারণে ছালাতের কোন রুকন শর্ত পরিত্যাগ করা। (৫) ছালাতের মধ্যে অধিক হাসাহাসি করা ইত্যাদি (ফিকহুস সুন্নাহ, ১/২০৫ পৃঃ)।

প্রশ্ন (২৫) : খুৎবার সময় লাঠি ব্যবহার করা কি যরূরী? রাসূল ধ কি বৃদ্ধ বয়সে লাঠি ব্যবহার করেছেন, না-কি সব সময়?  

-জাহিদ হাসান

মহাদেবপুর, নওগাঁ।

উত্তর : হাতে লাঠি নিয়ে জুম‘আর খুৎবা প্রদান করা সুন্নাত। হাকাম ইবনু হাযন (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জুম‘আর দিন হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা দিতে দেখেছি (ছহীহ আবুদাঊদ, সনদ হাসান, হা/১০৯৬; ইরওয়াউল গালীল, হা/৬১৬, ৩/৭৮; বায়হাক্বী, ৩/২০৬, সনদ ছহীহ; বুলূগুল মারাম, হা/৪৬৩)। অনুরূপ ঈদের মাঠে এবং অন্যান্য স্থানেও বক্তব্যের সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাতে লাঠি নিয়েছেন (ছহীহ আবুদাঊদ, হা/১১৪৫, সনদ হাসান; ইরওয়াউল গালীল, হা/৬৩১, ৩/৯৯; আহমাদ, ৩/৩১৪, সনদ ছহীহ)।

উল্লেখ্য, মিম্বর তৈরির পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাতে লাঠি নেননি বলে ইবনুল ক্বাইয়িম (রহিঃ) দাবী করেছেন। কিন্তু উক্ত কথার পক্ষে কোনো দলীল নেই। শায়খ আলবানী (রহিঃ) উক্ত দলীলবিহীন বক্তব্য উল্লেখ করে শুধু জুম‘আর দিনের বিষয়টি সমর্থন করেছেন। তবে ঈদের খুৎবাসহ অন্যান্য বক্তব্যের সময়ে হাতে লাঠি নেওয়া যাবে বলে উল্লেখ করেছেন (আলোচনা দ্রঃ সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৬৪, ২/৩৮০-৩৮৩ পৃঃ)।

মূল কথা হলো, মিম্বর তৈরির পরও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা দিয়েছেন। কারণ মিম্বর তৈরি হয়েছে ৫ম হিজরীতে। আর হাকাম বিন হাযন মক্কা বিজয়ের সময় ৮ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় আগমন করেন এবং জুম‘আর দিনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা দিতে দেখেন (ছহীহ আবুদাঊদ, হা/১০৯৬; ইরওয়াউল গালীল, হা/৬১৬, ৩/৭৮)। দ্বিতীয়ত, হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা দেওয়ার হাদীছটি ব্যাপক। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সব সময় লাঠি নিয়েছেন বলে প্রমাণিত হয়। তৃতীয়ত, মিম্বর তৈরির পর রাসূল (ছাঃ) হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা দেননি- এ কথার কোনো প্রমাণ নেই। চতুর্থত, ছাহাবীদের মধ্যেও মিম্বরে দাঁড়িয়ে হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় (তারীখে বাগদাদ, ১৪/৩৮ পৃঃ)। অতএব, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বর তৈরির পরেও হাতে লাঠি নিয়ে খুৎবা প্রদান করেছেন। উল্লেখ্য, হাকাম বিন হাযন (রাঃ) কত সালে ইসলাম গ্রহণ করেছেন সে ব্যাপারে দু’টি মত পাওয়া গেলেও আল্লামা ছফীঊর রহমান মুবারকপুরী বলেন, ৮ম হিজরীই সঠিক (ইতহাফুল কেরাম, শরহে বুলূগুল মারাম, পৃঃ ১৩২)।

প্রশ্ন (২৬) : মহিলাদের ব্যবহৃত কোনো পোশাক পরিধান করে পুরুষেরা ছালাত আদায় করতে পারে কি?

-আফীফ

 ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

উত্তর : যেমন নারীর নির্দিষ্ট পোশাক কোনো পুরুষ পরিধান করতে পারবে না। তদ্রুপ কোনো পুরুষের নির্দিষ্ট পোশাকও কোনো নারী পরিধান করতে পারবে না। একে অপরের সাদৃশ্য হয়ে যায় এমন পোশাক উভয়ের জন্য পরিধান করা হারাম। চায় তা ছালাতে হোক বা ছালাতের বাইরে হোক। একে অন্যের সাদৃশ্যতা গ্রহণকারীদেরকে রাসূল (ছাঃ) অভিশাপ করেছেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) ঐ সব পুরুষকে লা‘নত করেছেন যারা নারীর বেশ ধরে এবং ঐসব নারীকে যারা পুরুষের বেশ ধরে (ছহীহ বুখারী, হা/৫৪৪৫; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে উছায়মীন, ১২/২৪৭ পঃৃ; ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ, ২৪/৯৫)। তবে কোনো ব্যবস্থা না থাকলে বাড়ীর ভিতরে একে অন্যের পোশাক পরতে পারে। কারণ আল্লাহ সাধ্যের বাইরে মানুষের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেন না (বাক্বারাহ, ২৮৬)।

প্রশ্ন (২৭) : ভাইদের কাছ থেকে বোন যদি তার পিতার সম্পদের ভাগ গ্রহণ না করে তাহলে কি সে গুনাহগার হবে?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর : উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পদটুকু যদি তার নিজস্ব মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের সমান বা তার চেয়ে কম হয়, তাহলে তা ছেড়ে দিতে পারে। এর চেয়ে বেশি হলে সম্পূর্ণ অংশ ছেড়ে দিতে পারবে না। সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ছাড়তে পারে (ছহীহ বুখারী, হা/২৭৪২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৮; মিশকাত, হা/৩০৭১)।

প্রশ্ন (২৮) : আমার পিতা বাংলাদেশ বেতারের ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। আমি তার অসুস্থ সন্তান হিসাবে আজও তার পেনশন ভোগ করছি। এটা কি বৈধ হচ্ছে?

-সৈয়দ মুহাম্মাদ ওয়াসিফ উল্লাহ

আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা।

উত্তর : অবসর ভাতা বা পেনশনের টাকা গ্রহণ করা যায়। কেননা তা সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সম্মানী ভাতা। যা সরকার স্বেচ্ছায় প্রদান করে থাকে। আর স্বেচ্ছায় কোনো জিনিস দিলে তা গ্রহণ করাই উত্তম। ওমর প বলেন, নবী করীম (ছাঃ) তাকে কিছু সম্পদ প্রদান করতে চান তখন আমি বললাম, আমার চেয়ে গরীব যে তাকে প্রদান করুন। তখন নবী (ছাঃ) বললেন, যা দিচ্ছি তা গ্রহণ করো। তা সম্পদ হিসাবে গ্রহণ করো এবং দান করে দাও। যদি তোমার নিকট এমন কোনো সম্পদ আসে যাতে তুমি আগ্রহী নও এবং তা চেয়ে নিচ্ছ না, তাহলে তা গ্রহণ করো। আর যে সম্পদ এমন নয় তার পিছনে নিজেকে লাগাও না (ছহীহ বুখারী, হা/৭১৬৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৪৫; মিশকাত, হা/১৮৪৫)।

উল্লেখ্য যে, প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমানো অর্থ থেকে প্রাপ্ত সূদ ভক্ষণ করা জায়েয নয়। সেখান থেকে শুধু মূলধন গ্রহণ করা বৈধ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৮৪; মিশকাত, হা/২৮০৯)।

প্রশ্ন (২৯) : ছালাত চলাকালীন হাঁচি দিতে শুনলে তার জবাব দেয়া যাবে কি?

-শু‘আইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : ছালাতের মধ্যে হাঁচি দাতা ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বলতে পারবে (তিরমিযী, হা/৪০৪; মিশকাত, হা/৯৯২)। কিন্তু তার জওয়াব দেওয়া যাবে না। বরং তা ‘ছালাতের বাইরের মানুষের কথা’ হিসাবে গণ্য হবে। মুআ‘বিয়া ইবনু হাকাম (রাঃ) বলেন, একদিন আমি রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত আদায় করছিলাম। লোকদের মধ্যে হঠাৎ এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে আমি বললাম, ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’। ছালাত শেষে নবী (ছাঃ) বললেন, নিশ্চয় এটি ছালাত। এর মাঝে মানুষের কথার ন্যায় কোনো কথা চলবে না। নিশ্চয় ছালাত হচ্ছে তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তেলাওয়াতের (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৭; মিশকাত, হা/৯৭৮)।

প্রশ্ন (৩০) : বিয়ের পূর্বে ও পরে অনেকের সাথে যেনা করেছি। তাদের মধ্যে একজনকে বিয়ে করেছি। বর্তমানে ঐ পাপ থেকে মুক্তি লাভের উপায় কী?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর :  যেনা-ব্যভিচার জঘন্য মহাপাপ। তওবা ব্যতীত এ পাপ ক্ষমা হয় না। ব্যভিচারী ব্যক্তি ঐ গর্হিত কর্ম থেকে ফিরে আসার জন্য অনুতপ্ত হয়ে খালেছ অন্তরে তওবা করতে হবে। আল্লাহ চাইলে তার তওবা কবুল করতে পারেন (তওবা, ৮২; ফুরক্বান, ৬৮-৭০)। অন্যথা পরকালে পাপ সমপরিমাণ জাহান্নামের শাস্তি ভোগের পর মুক্তি পাবে।

প্রশ্ন (৩১) : মাহরাম ছাড়া যদি কোনো মহিলা কাফেলার অন্যান্য প্রতিবেশী মহিলাদের সাথে মিলে পূর্ণ পর্দা সহকারে হজ্জ করে তাহলে কি তা জায়েয হবে? না-কি তার হজ্জ আল্লাহ্র কাছে কবুলই হবে না?

-ফারহান ইবনে আমিন

কলাবাগান, ঢাকা।

উত্তর : মাহরাম ব্যতীত মহিলাদের জন্য হজ্জসহ যেকোনো ধরনের সফর করা বৈধ নয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোনো মহিলা মাহরাম ব্যতীত এক দিনের সফর করবে না’ (বুখারী, হা/১৮৬২, ৩০০৬; মুসলিম, হা/৮২৭, ১৩৩৮; মিশকাত, হা/২৫১৫ ও ২৫১৩)। সুতরাং হজ্জের সফরে স্বামী অথবা মাহরাম থাকা যরূরী। মাহরাম ছাড়া হজ্জ ফরয হবে না।

প্রশ্ন (৩২) : মাহরাম নয় এমন কোনো মহিলাকে ব্যক্তিগতভাবে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া কি বৈধ?

-রাজিবুল ইসলাম

 জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : যদি ফিতনা তথা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে মাহরাম নয় এমন মহিলার সাথে ব্যক্তিগতভাবে কোনো ধরনের আলাপ বৈধ নয়। বিশেষ করে যুবক-যুবতী ও সক্ষম নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে তা কোনোভাবে বৈধ নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘সাবধান! কোনো পুরুষ কোনো মহিলার সাথে নির্জনে একত্রিত হলে তাদের তৃতীয়জন থাকে শয়তান’ (তিরমিযী, হা/২১৬৫, সনদ ছহীহ)। তবে বহু সংখ্যক মহিলার উপস্থিতিতে তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া যায় (ছহীহ বুখারী, হা/১০১)। তাছাড়া তার মাহরামের উপস্থিতিতেও দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে (ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪১)।

প্রশ্ন (৩৩) : জিহাদ বলতে কি বুঝায়? সশস্ত্র জিহাদ কখন ও কাদের উপরে ফরয?

-আব্দুল্লাহ আল-মামুন

নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : জিহাদ (جهاد) শব্দটি باب مفاعلة -এর ক্রিয়ামূল। আভিধানিক অর্থ : সংগ্রাম করা, প্রচেষ্টা করা। হাফিয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহিঃ) বলেন, জিহাদের স্তর চারটি। (১) অন্তরের সাথে জিহাদ। (২) শয়তানের সাথে জিহাদ। (৩) কাফিরদের সাথে জিহাদ এবং (৪) মুনাফিক্বদের সাথে জিহাদ।

অন্তরের সাথে জিহাদের স্তর আবার চারটি :

(১) হেদায়াতের বাণী ও সত্য দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা করা। যে দ্বীন শিক্ষা করা ব্যতীত ইহকালে কিংবা পরকালে কোনো কল্যাণ হাছিল করা যায় না। যদি কারও এই দ্বীনের জ্ঞান না থাকে তাহলে সে উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (২) জ্ঞান অর্জন করার পর তার প্রতি আমল করার প্রচেষ্টা করা। কারণ আমল ছাড়া ইলমের কোনো উপকার নেই। (৩) যা জেনেছে তার দিকে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া এবং যারা জানে না তাদেরকে শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। অন্যথা সে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত হেদায়াত ও দলীল গোপনকারী হিসাবে সাব্যস্ত হবে এবং তার আমল কোনো কাজে আসবে না এবং জাহান্নাম থেকেও সে রক্ষা পাবে না। (৪) দাওয়াত দিতে গিয়ে বিপথগামীদের পক্ষ থেকে আসা যুলুম অত্যাচারে ধৈর্যধারণ করা। যদি কারও মধ্যে এই চারটি গুণের সমাবেশ ঘটে, তাহলে সে আল্লাহ ওয়ালা হিসাবে প্রমাণিত হবে।

শয়তানের সাথে জিহাদের স্তর দুটি :

(১) শয়তান ঈমান বিধ্বংসী যে সকল সন্দেহ এবং সংশয়ের মধ্যে ফেলতে চায়, তা প্রতিহত করার জন্য প্রচেষ্টা করা। (২) শয়তান মানুষের সামনে যে সকল ঘৃণ্য ইচ্ছা ও কুপ্রবৃত্তি উপস্থাপন করে, তা প্রতিহত করার জন্য চেষ্টা করা।

কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে শক্তি দিয়ে। মুনাফিক্বদের সাথে জিহাদ করতে হবে জবান দিয়ে। আর অত্যাচারী, বিদ‘আতী এবং পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের সাথে জিহাদের স্তর তিনটি :

(১) সম্ভব হলে শক্তি দিয়ে। (২) শক্তি প্রয়োগ অসম্ভব হলে জবান দিয়ে। (৩) জবান দিয়েও প্রতিবাদ করতে অসমর্থ হলে অন্তর দিয়ে জিহাদ করবে। কোনো ব্যক্তি যদি এই স্তর সমূহের কোনো স্তরেই জিহাদ না করে তাহলে তার পরিণতি সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি মারা যায়, আর জিহাদ না করে এবং অন্তরে জিহাদের কল্পনাও না করে, তাহলে সে মুনাফিক্বের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল (যাদুল মা‘আদ, ৩/০৯-১১ পৃঃ)।

সশস্ত্র জিহাদ করার জন্য পূর্বশর্ত হলো, নিজস্ব ভূখণ্ড থাকা এবং ঘোষিত আমীর থাকা। এই দু’টি শর্তের কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে, কোনো গোষ্ঠী বিশেষের জন্য সশস্ত্র জিহাদ করা জায়েয নয়। রাসূল (ছাঃ) যখন মক্কায় ছিলেন তখন তার সঙ্গী-সাথী ছাহাবায়ে কেরাম ছিলেন। তিনি তাদের আমীর ছিলেন। কিন্তু ঘোষিত আমীর ছিলেন না। মুষ্টিমেয় তার কিছু অনুসারী ছাড়া কেউ তাকে নেতা হিসাবে মেনে নেয়নি। যার কারণে কা‘বা ঘরে মূর্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি সশস্ত্র আক্রমণ করে মূর্তি ভাঙ্গতে যাননি। বরং মদীনায় হিজরত করার পর যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা তার হাতে আসল, তখন তিনি মক্কার সেই কাফিরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেন। রাসূলের এই সুন্নাহ প্রমাণ করে, নিজস্ব ভূখণ্ড এবং ঘোষিত আমীর ব্যতীত সশস্ত্র জিহাদ বৈধ নয়।

প্রশ্ন (৩৪) : খারেজী বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়?

-আব্দুল্লাহ আল-মামুন

নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : মুসলিম নামধারী ভ্রান্ত আক্বীদায় বিশ্বাসী একটি বাতিল ফিরক্বার নাম খারেজী ফিরক্বা। আলী (রাঃ) ও মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর মতানৈক্যের সময় উভয়ের মাঝে যে মীমাংসা বৈঠক বসে, সেই বৈঠককে ‘মানবীয় ফয়ছালা’ আখ্যায়িত করে মুসলিম জামা‘আত থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে বের হয়ে যায়। এজন্য তাদেরকে ‘খারেজী বা দলত্যাগী ’ বলা হয়। এই ভ্রান্ত ফিরক্বার জন্ম হয় রাসূল (ছাঃ)-এর যুগেই। ‘যুল খুওয়াছিরা আত-তামীমী’ ছিল এদের পূর্বসূরী। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) গনীমতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে যুল খুওয়াছিরা আত-তামীমী (কোনো কোনো বর্ণনায় স্বয়ং তারই নাম যুল খুওয়াছিরা বলা হয়েছে) এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ইনছাফ করুন। রাসূল (ছাঃ) বললেন, তুমি ধ্বংস হও! আমি ইনছাফ না করলে আর কে ইনছাফ করবে? ওমর ইবনে খাত্ত্বাব (রাঃ) তখন বললেন, আমাকে অনুমতি দিন! তার গর্দান উড়িয়ে দিই। রাসূল (ছাঃ) বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। তার অনেক সঙ্গী হবে, তোমাদের কেউ নিজের ছালাতকে তাদের ছালাতের তুলনায় এবং নিজের ছিয়ামকে তাদের ছিয়ামের তুলনায় তুচ্ছ মনে করবে। অথচ শিকার থেকে যেভাবে (রক্তবিহীন অবস্থায়) তীর বের হয়ে যায়, সেভাবে তারা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে। …. তাদের আলামত হলো, তাদের একজন লোক থাকবে, তার একটি হাত অথবা একটি স্তন হবে মহিলাদের স্তনের মতো। মানুষ যখন দলে দলে বিভক্ত হয়ে যাবে, তখন তাদের আবির্ভাব ঘটবে (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৩৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৬৪)। তাদের কতিপয় আক্বীদা নি¤œরূপ :

১. কোনো শাসক তাদের মত কিংবা বুঝের বিপক্ষে গেলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ।

২. কাবীরা গুনাহতে লিপ্ত ব্যক্তি কাফির এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী।

৩. কাবীরা গুনাহতে লিপ্ত ব্যক্তিরা শাফা‘আত পাবে না।

৪. ওছমান ও আলী (রাঃ) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

এছাড়াও তাদের আরও কিছু আক্বীদা আছে, যা সম্পূর্ণ কুরআন সুন্নাহর বিপরীত।

প্রশ্ন (৩৫) : কোনো কোনো বইয়ে লেখা আছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত শস্যের ওশর দিতে হবে? কথাটি কি শরী‘আত সম্মত?

-আরাফাত আলী

চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : না, ওশর প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলে শারঈ কোনো বিধান নেই। বরং নিসাব পূর্ণ হলেই ফসল বা শস্যের ওশর দিতে হবে। অর্থাৎ ফসল যদি আকাশের পানি,  ঝর্ণার  পানি  এবং  কূপের  পানি  দ্বারা উৎপাদিত হয় তাহলে তা হতে ওশর বা এক-দশমাংশ যাকাত দিতে হবে। আর যদি সেচ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফসল উৎপাদিত হয় তাহলে ‘নিছফে ওশর’ বা বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৮৩; মিশকাত, হা/১৭৯৭)। উল্লেখ্য, উৎপাদিত ফসল প্রায় ১৮ মণ ৩০ কেজি হলে তার উপর যাকাত ফরয হয়। অর্থাৎ নিছাব পূর্ণ হয়।

প্রশ্ন (৩৬) : মুসলিম মহিলাদের জন্য গাইনী পেশা শরী‘আত অনুমোদিত কি না?

-আনোয়ার হোসেন

দূর্গাপুর, রাজশাহী।

উত্তর : পরিপূর্ণভাবে শারঈ পর্দা রক্ষা করে কাজ করা যায় এমন যে কোন পেশাই শরী‘আতে অনুমোদিত। কোন পেশায় যদি গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে মেলামেশা না হয়, তাহলে সে কাজ করতে শরী‘আতে কোন বাধা নেই। আর গাইনী পেশা নারীদের সেবা প্রদানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পেশা। যদি পর পুরুষের সাথে মেলামেশা না হয় এবং পূর্ণ পর্দা মেনে তা করা যেতে পারে। কিন্তু যদি তাতে পর পুরুষের সাথে মেলামেশা হয় এবং পর্দার ব্যাঘাত ঘটে তাহলে কোন মুসলিম নারীর জন্য সে পেশায় যাওয়া বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তোমরা তাদের কাছে কোন কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে’ (সূরা আহযাব, ৫৩)।

প্রশ্ন (৩৭) : ছালাত আদায়কালে ওযূ নষ্ট হয়ে গেলে কাতারের সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে কি?

-আব্দুর রহমান

লালপুর, নাটোর।

উত্তর : ছালাত আদায়কালে ওযূ নষ্ট হয়ে গেলে ছালাত ছেড়ে বের হয়ে গিয়ে পুনরায় ওযূ করে নতুনভাবে ছালাত শুরু করা কর্তব্য। কারণ ওযূ ব্যতীত ছালাত কবুল হয় না (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৫)। এই অবস্থায় মুছল্লীদের খুশু-খুযূ’তে অপেক্ষাকৃত কম ব্যাঘাত ঘটিয়ে যেভাবে বের হওয়া সহজ হবে, সেভাবেই বের হয়ে যাবে। এতে যদি মুছল্লীদের সামনে দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, যেতে পারে। কোন সমস্যা নেই। কেননা জামা‘আত চলাকালে সকল মুছল্লীর সুতরা হলেন ইমাম। তাই ইমামের সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু ইমামের পিছনে থাকা মুছল্লীদের সামনে দিয়ে যাওয়াতে শারঈ কোন বাধা নেই। কারণ ইমামের সুতরাই মুছল্লীদের সুতরা হিসাবে গণ্য (ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৫০৪; মিশকাত, হা/৭৮০)।

প্রশ্ন (৩৮) : ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ জনগণের করণীয় কী?

-আব্দুর রহমান

সাদুল্ল্যাপুর, গাইবান্ধা।

উত্তর : ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ জনগণের যরূরী কর্তব্য হল, প্রথমে তাওহীদের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা এবং তাওহীদের বিশ্বাসে নিজের জীবনকে পরিচালনা করা। রাসূল (ছাঃ) মু‘আয (রাঃ)-কে ইয়ামানে প্রেরণ করার সময় প্রথমে তাকে তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার আদেশ করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৭২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯) অতঃপর নিজের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করা। অতঃপর পরিবার সকল সদস্যকে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার দাওয়াত দেওয়া (সূরা তাহরীম, ০৬)। অতঃপর সমাজে দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যাওয়া। এইভাবে দেশের প্রতিটি সমাজ যখন পুরোপুরি ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলতে লাগবে, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র পরিবর্তন হতে বাধ্য। একটি গ্রামের সকল মানুষ কিংবা অধিকাংশ মানুষ যখন ডিস লাইন বর্জন করবে, তখন ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ার দরুন কর্তৃপক্ষ সেই গ্রাম থেকে ডিস লাইন তুলে নিতে বাধ্য হবে। কোন গ্রামের সবাই যখন সূদ আদান-প্রদান বন্ধ করে দিবে, তখন সেই গ্রাম থেকে সূদের অফিস উঠে যেতে বাধ্য হবে। এভাবেই সমাজ থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে থানা, থানা থেকে জেলা, জেলা থেকে রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি পৃথিবীতে তাদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন, যেভাবে তাদের পূর্ববতীদেরকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন’ (সূরা নূর, ৫৫)।  আর ব্যক্তি ও সমাজ পরিবর্তন না করে দ্বীন কায়েম করতে গেলে রাষ্ট্র দখল ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ যখনই কোন অনৈসলামিক কার্যকলাপকে বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে, তখন ইসলাম বিমুখ এই সমাজের লোকেরাই তা চালু রাখার জন্য আন্দোলন করবে।

প্রশ্ন (৩৯) : ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সূদের অর্থ মসজিদ নির্মাণের জন্য দান করা যাবে কি?

-আশিক

 মিরপুর, ঢাকা।

উত্তর : হারাম উৎস থেকে প্রাপ্ত সম্পদ মসজিদ নির্মানের কাজে লাগানো যাবে না। কেননা মসজিদ একমাত্র আল্লাহর জন্য (সূরা জিন, ১৮)। আর আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কোন গ্রহণ করেন না (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)। সূদের আদান-প্রদান শরী‘আতে সম্পূর্ণরূপে হারাম (সূরা বাক্বারাহ, ২৭৫)। জেনে-শুনে সূদের একটি টাকা ভক্ষণ করা নিজ মায়ের সাথে ছত্রিশবার যেনা করার চেয়েও বড় পাপ (মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০০৭; মিশকাত, হা/২৮২৫)। তাই ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সূদ ছওয়াবের উদ্দেশ্য ছাড়াই সাধারণভাবে জনকল্যাণমূলক কোন কাজে দান করে দিবে। যেমন রাস্তাঘাট মেরামত করা, পানির উৎস তৈরি করে দেওয়া, শৌচাগার নির্মাণ করে দেওয়া, খাল খনন করে দেওয়া, মাদরাসা নির্মাণ করে দেওয়া ইত্যাদি (আল-মাজমূউ শারহুল মুহাযযাব, ৯/৩৪৮)।

প্রশ্ন (৪০) : যৌতুক নেয়া কি জায়েয?      

-মুস্তাকীম বিল্লাহ

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি হিন্দু সমাজ থেকে আসা কুসংস্কৃতি। হিন্দুরা বিয়ের দিনেই মেয়েকে যা দেওয়ার দিয়ে দেয়। মীরাছ থেকে কোন কিছু দেয় না। এই প্রথা মুসলিমদের মাঝে ঢুকে পড়েছে। এটি কনের পরিবারের উপর জঘন্য অত্যাচার। শরী‘আতে যা সম্পূর্ণ হারাম। জানা আবশ্যক যে, বরের পক্ষ থেকে কনেকে সন্তুষ্টচিত্তে মোহর প্রদান করতে হবে। কনে পক্ষের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা রমণীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে মোহর প্রদান কর’ (নিসা, ৪)। তবে বিয়ের পরে সাংসারিক সুবিধার জন্য কনের পিতা যদি স্বেচ্ছায় তার মেয়েকে কিছু দেয় তাহ’লে সেটি যৌতুক হবে না। অনুরূপভাবে জামাই কৌশল করে কিছু গ্রহণ করলেও তা জায়েয হবে না। রাসূল (ছাঃ) তার মেয়ে ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেছিলেন, ‘আমার সম্পদ থেকে যা খুশি চাও, কিন্তু পরকালে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৭৫৩; মিশকাত, হা/৫৩৭৩)। তাছাড়া ফাতিমা (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে খাদেম চাইতে গিয়েছিলেন। রাসূল (ছাঃ) তখন তাকে বলেননি যে, বাবার পক্ষ থেকে মেয়েকে কিছু দেওয়া জায়েয হবে না (আবুদাঊদ, হা/২৯৮৮)।

প্রশ্ন (৪১) : পানি পানের জন্য নির্দিষ্ট কোন নিয়ম আছে কি? যদি সে নিয়ম অমান্য করা হয় তাহলে কি কোন পাপ হবে?

-মিলন হোসেন

রহিমানপুর, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : পানি বা পানীয় জাতীয় কিছু পান করার সময় নিম্বোক্ত নিয়মগুলো পালনীয় ও লক্ষণীয়। তা হল- (১) ডান হাতে গ্লাস ধরা ও ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পান করা। ওমর ইবনু আবু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার হাত খাওয়ার পাত্রের চতুর্দিকে যাচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ বল, ডান হাতে খাও এবং নিজের সম্মুখ হতে খাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৭৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২০২২; মিশকাত, হা/৪১৫৯)। (২) তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করা ও পাত্রে নিঃশ্বাস না ফেলা। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পানি পান করার সময় তিনবার শ্বাস নিতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/২০২৮; মিশকাত, হা/৪২৬৩)। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পানির পাত্রের মধ্যে শ্বাস ফেলতে কিংবা তাতে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন (আবুদাঊদ, হা/৩৭২৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩২৮৮; মিশকাত, হা/৪২৭৭)। উল্লেখ্য যে, তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করলে কয়েকটি উপকার সাধিত হয়। যেমন, এতে বেশী তৃপ্তি আসে বা পিপাসা নিবারণ হয়, পিপাসার কষ্ট থেকে অথবা কোন ব্যাধি সৃষ্টির হাত থেকে বেশী পরিমাণে বাঁচা যায় এবং হজম, পরিপাক ও দেহের উপকার বেশী হয় (ছহীহ মুসলিম, হা/২০২৮)। (৩) বসে পান করা। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) কাউকে দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২০২৪; মিশকাত, হা/ ৪২৬৬)। (৪) পানি পান শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই ঐ বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন, যে খাওয়ার শেষে ও পানি পান শেষে তার প্রশংসা করে তথা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৩৪; মিশকাত, হা/৪২০০)।

প্রশ্ন (৪২) : ফ্যাশন বোরখা কি নগ্ন পোশাকের মধ্যে গণ্য হবে? এমন পোশাক পরিধানের পরিণাম কী?

-ফাতিমা খাতুন

 কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : ফ্যাশন বোরখা পরিধান করা মূলত পরপুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শনের শামিল। যা শরী‘আতে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং প্রথম জাহেলী যুগের নারীদের মত সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়াবে না’ (সূরা আহযাব, ৩৩)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে’ (নূর, ৩১)। সুতরাং ফ্যাশন বোরখা নগ্ন পোষাকের অন্তর্ভূক্ত হবে কারণ তাতে শরীরের অবয়ব আবৃত হয় না। বরং নারীদেহকে আরও আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে  উপস্থাপন করে। এই ধরনের পোষাক সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘… আর ঐ সকল নারী, যারা কাপড় পরেও নগ্ন, যারা অন্যকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে এবং নিজেরাও অন্যের দিকে আকৃষ্ট হয়, তাদের মাথাগুলো লোমশ বখতী উটের মত, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এমনকি জান্নাতে সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ বহুদূর থেকে পাওয়া যায়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৮; মিশকাত, হা/৩৫২৪)।

প্রশ্ন (৪৩) : ৮০০০০/- টাকা মোহরানা দিবো বলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। কিন্তু পাঁচ বছর অতিক্রম হওয়ার পরেও তা পরিশোধ করতে পারছি না। এখন করণীয় কী?

-আতাউর রহমান

মহাদেবপুর, নওগাঁ।

উত্তর : বিবাহের ক্ষেত্রে মোহরানা অপরিহার্য শর্ত। বরের সাধ্য অনুযায়ী মোহরানা ধার্য করা উচিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহরানা খুশীমনে দিয়ে দাও’ (নিসা, ৪)। সেটা প্রথমেই পরিশোধ করা কর্তব্য। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে অধিক পরিমাণ মোহরানা ধার্য করা এবং পরে স্ত্রীর কাছে মাফ চাওয়া ধোঁকার শামিল। এছাড়া যারা মোহরানা আদায় করে না, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের স্ত্রীদের নিকট দায়বদ্ধ থাকবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘বিবাহের সবচেয়ে বড় শর্ত হ’ল মোহর’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৭২১, ৫১৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১৮; মিশকাত, হা/৩১৪৩)। তবে মোহর বাকী রেখেও বিবাহ জায়েয আছে। কিন্ত অবশ্যই তা পরিশোধ করতে হবে। পরিশোধ করার মানসিকতা থাকলে আল্লাহ তা‘আলা তা সহজ করে দিবেন। (ছহীহ বুখারী, হা/২৩৮৭; মিশকাত, হা/২৯১০)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার কাজগুলোকে সহজ করে দেন’ (সূরা ত্বালাক, ৪)। কাজেই এখনও পরিশোধ করার যথেষ্ট সময় আছে। ধীরে ধীরে পরিশোধ করতে হবে। নিতান্তই সম্ভব না হলে স্ত্রীর পক্ষ থেকে ছাড় থাকা ভাল।

প্রশ্ন (৪৪) : রাতে একাকী থাকলে অনেক সময় জ্বীন-শয়তানের ভয় লাগে। এর থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য কোন দু‘আ আছে কি?

-ফযলে মাহমুদ

আতা নারায়ণপুর, রাজশাহী।

উত্তর : এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ায় জন্য সূরা নাস, ফালাক্ব ও ইখলাছ তিনবার করে পড়ে হাতে ফুঁক দিয়ে মাথা থেকে আরম্ভ করে শরীরের যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিবে (ছহীহ বুখারী, হা/৫০১৭; মিশকাত, হা/২১৩২)। সাথে আয়াতুল কুরসী পড়ে ঘুমালে আল্লাহর পক্ষ হতে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয় এবং শয়তান সকাল হওয়া পর্যন্ত তার নিকটবর্তী হতে পারবে না (ছহীহ বুখারী, হা/২৩১১; তিরমিযী, হা/২৮৮০)।

প্রশ্ন (৪৫) : মৃত্যুর পর যে চল্লিশার আয়োজন করা হয় সেখানে খাওয়া জায়েয হবে কি?

-কামাল

যশোর।

উত্তর : চল্লিশার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা যাবে না। কারণ চল্লিশার অনুষ্ঠান দুই কারণে করা না জায়েয ১. নির্দিষ্ট দিনে পালন করার কারণে শিরকের মধ্যে গণ্য হবে। ২. রাসূল (ছাঃ), ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈদের যুগে ছিল না, বিধায় তা শরী‘আতে নব আবিষ্কৃত বিষয় তথা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার প্রতি আমার নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; আবুদাঊদ, হা/৪৬০৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৪)। এমনকি এ সমস্ত কাজে সহযোগিতা করা, সেখানে খাওয়া-দাওয়াসহ কোন কিছুই করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কল্যাণ ও তাক্বওয়ার কাজে পরষ্পরকে সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে পরষ্পরকে সহযোগিতা কর না’ (মায়েদাহ, ২)।

প্রশ্ন (৪৬) : আমার দুলাভাই ও বোন হজ্জ করতে যাবেন। আমি কি তাদের সাথে হজ্জ করতে যেতে পারি?

-নাবিলা বিনতে মিজানুর রহমান

পবা, রাজশাহী।

উত্তর : দুলাভাই মাহরম নয়। আর মাহরম ব্যতীত অন্য কারো সাথে হজ্জে যাওয়া যাবে না। কাজেই অর্থ থাকলেও এমতাবস্থায় আপনার উপর হজ্জ ফরয নয়। সুতরাং যখন মাহরম পাওয়া যাবে তখন  হজ্জে যাবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোন মহিলা কোন মাহরম ব্যতীত একদিন ও একরাতের পথও সফর করবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/১০৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৯; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/২৫১৫)। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘অবশ্যই কোন মহিলা যেন কখনও আপন কোন মাহরাম ব্যক্তি ছাড়া একাকি ভ্রমণে বের না হয়। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! অমুক যুদ্ধে আমার নাম লেখানো হয়েছে, আর আমার স্ত্রী একা হজ্জে রওয়ানা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জ কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৬, ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪১; তাহ্ক্বীক্ব মিশকাত, হা/২৫১৩)। উল্লেখ্য যে, মাহ্রাম বলা হয় এমন পুরুষকে, উক্ত মহিলার জন্য যাকে বিবাহ করা চিরস্থায়ী ভাবে হারাম। যেমন- ছেলে, বাবা, ভাই, চাচা, মামা, দাদা, নানা ইত্যাদি।

প্রশ্ন (৪৭) : সরকারী খাস জমিকে ঈদগাহ হিসাবে ব্যবহার করা ও সেখানে স্থায়ীভাবে মসজিদ নির্মাণ করা যাবে কি?

মিজানুর রহমান

পবা, রাজশাহী।

উত্তর : ঈদগাহ ও মসজিদ হলো ছালাতের স্থান। যাতে তা উক্ত কাজেই ব্যবহৃত হয়, তার নিশ্চয়তার জন্য ওয়াফক করা আবশ্যক। মসজিদে নববীর জন্য মাটি ক্রয় করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মাতুল গোষ্ঠী বনু নাজ্জার সেটা বিনা পয়সায় আল্লাহর ওয়াস্তে দিয়ে দেন। ওমর (রাঃ) যখন খায়বারের প্রাপ্ত জমি ওয়াক্ফ করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পরামর্শক্রমে বললেন, এটি বিক্রি হবে না, কাউকে দান করা যাবে না এবং এতে কেউ ওয়ারিছ হবে না। এটাই ছিল ইসলামে প্রথম ওয়াক্ফের ঘটনা (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ‘ওয়াক্বফ’ অধ্যায়)। অতএব ভবিষ্যতে ফিৎনার হাত থেকে বাঁচার জন্য মসজিদ বা ঈদগাহের জমি লিখিতভাবে ওয়াক্বফ হওয়াই উত্তম। অন্যের মালিকানাধীন কোন জায়গায় ঈদের ছালাত আদায় করতে চাইলে সরকারি দায়িত্বশীলের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে মৌখিক নয়; বরং লিখিত অনুমতি নেওয়া উত্তম।

 

প্রশ্ন (৪৮) : রাসূল (ছাঃ)-এর কোন ছাহাবী কি জিন ছিল?

-আহসান বিন আযাদ

মহাদেবপুর, নওগাঁ।

উত্তর : জিন জাতির অনেকেই রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবী ছিলেন (সূরা জি¦ন, ০১-০২)। তবে কোন জিন ছাহাবী মানুষের বেশ ধরে রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবীদের মাঝে ঘোরাফেরা করতেন মর্মে কোন বর্ণনা সম্পর্কে আমরা অবগত নই।

প্রশ্ন (৪৯) : টুপি ও পাগড়ী পরিধান করলে বিশেষ কোনো নেকী পাওয়া যাবে কি?

-শুআইব

কাতলাসেন, ময়মনসিংহ।

উত্তর : পাগড়ী পরা ‘সুনানে জাওয়ায়েদ’ বা অভ্যাসগত অতিরিক্ত সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। যা টুপি ছাড়া এবং টুপিসহ দু’ভাবেই পরা যায় (যাদুল মা‘আদ, পৃঃ ১/১৩০)। শরী‘আত নিষিদ্ধ রং ব্যতীত যেকোন রঙের পাগড়ী পরিধান করা যায়। তবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কালো পাগড়ী পরিধান করেছেন। আমর ইবনু হুরাইছ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে কালো পাগড়ী পরিহিত অবস্থায় মিম্বরে দেখেছি। তখন পাগড়ীর উভয় পার্শ্ব তাঁর উভয় কাঁধের উপর ঝুলছিল (ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৫৯; মিশকাত, হা/১৪১০)।

উল্লেখ্য যে, পাগড়ী পরে ছালাত আদায় করলে অধিক নেকী হবে, এমনটি ধারণা করা ঠিক নয়। কারণ পাগড়ী পরার ফযীলত সংক্রান্ত হাদীছ সমূহ জাল। মূলত, এটি যীনাত বা সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বনী আদম! তোমরা প্রত্যেক ছালাতের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও’ (আ‘রাফ, ৩১)। আরো উল্লেখ্য যে, টুপির উপর পাগড়ী পরা বা না পরা সংক্রান্ত তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (যঈফ তিরমিযী, হা/১৭৮৪; মিশকাত, হা/৪৩৪০)।

প্রশ্ন (৫০) : ছহীহ বুখারীর ৭৮০ নং হাদীছে বলা হয়েছে, ‘ইমাম যখন আমীন বলে তখন তোমরা আমীন বল’পক্ষান্তরে আবুদাঊদের ৯৭২ নং হাদীছে বলা হয়েছে, ‘ইমাম যখন গায়রিল মাগযূবে আলাইহিম ওয়ালায যাল্লীন’ বলবেন তখন তোমরা আমীন বল। সুতরাং হাদীছদ্বয়ের সমন্বয় বা সমাধান কী?

-জহুরুল বিন আব্দুস ছাত্তার

নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : ইমামের আমীন বলার সাথে সাথে মুক্তাদীগণ আমীন বললে অতীতের গোনাহ আল্লাহ মাফ করে দিবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যার আমীন বলা ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে আল্লাহ তার অতীতের (ছগীরাহ) গোনাহ মাফ করে দিবেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৮০)। অর্থাৎ ইমামের আমীনের সাথে ফেরেশতারা আমীন বলে। আর তাদের আমীনের সাথে মুক্তাদীদের আমীন মিলে গেলে উক্ত ফযীলত পাবে। মূলত দুই হাদীছের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব বা বৈপরীত্য নেই। কেননা শুধু আবুদাঊদে নয় বরং উল্লেখিত হাদীছ দু’টি বুখারীতেও আছে। তন্মধ্যে বুখারীর ৭৮০ নং হাদীছে বলা হয়েছে ‘যখন ইমাম আমীন বলবে তখন তোমরা আমীন বল’। আর ৭৮২ নং হাদীছে বলা হয়েছে, ‘যখন ইমাম ‘গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালায যাল্লীন’ বলবে তখন তোমরা আমীন বলবে’। ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহিঃ) ফাৎহুল বারীতে ৭৮২ নং হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আমীন বলার হুকুম ‘ইমামের অনুসরণের সাধারণ নির্দেশ’ (তথা ইমাম নির্ধারণ করা হয় মূলত তার অনুসরণের জন্য) এর অন্তর্ভুক্ত। তাই ইমাম ‘গাইরিল মাগযূবি আলাইহিম ওয়ালয যাল্লীন’ বলার পর যখন আমীন বলবে (তার অনুসরণ করে) তখন তোমরা আমীন বলবে। (ইমামের আগে আমীন বলবে না) (ফাৎহুল বারী, ২/৩১১ পৃঃ, ব্যাখ্যা দ্রঃ)। কাজেই ইমামের আমীনের সাথে সাথে আমীন বলবে, তাহলে ফেরেশতাদের আমীনের সাথে আমীন বলা মিলে যাবে। আর  তখন আল্লাহ তা‘আলা অতীতের ছোট ছোট গোনাহসমূহ মাফ করে দিবেন।