প্রশ্ন (১) : সূরা ইখলাছ ‘বিসমিল্লাহ’সহ ২০০ বার পাঠ করলে আল্লাহ তা‘আলা ২০টি পুরস্কার দিবেন। তার মধ্যে দুনিয়াতে কিছু আর আখিরাতে কিছু। এ কথার সত্যতা কতটুকু

নাজনীন পারভীন
আক্কেলপুর, জয়পুরহাট।

উত্তর :  সূরা ইখলাছ পড়ার উল্লেখিত ফযীলত সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তা ছাড়া সূরা ইখলাছ ৫০, ১০০, কিংবা ২০০ বার পাঠ করার ফযীলত সম্পর্কে যে সকল হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তার সবগুলোই যঈফ’ (তিরমিযী, হা/২৮৯৮; সিলসিলা যঈফাহ, হা/৩০০; মিশকাত, হা/২১৫৮-৫৯)। তবে সূরা ইখলাছ পাঠের অনন্য ফযীলত রয়েছে। যেমন- রাসূল (ছা.) বলেন, ‘সূরা ইখলাছ একবার পড়লে এক-তৃতীয়াংশ কুরআন পাঠের সমান ছওয়াব পাওয়া যায়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৮১১; ছহীহ বুখারী, হা/৫০১৩; মিশকাত, হা/২১২৭)। এ ছাড়া যে ব্যক্তি দশবার সূরা ইখলাছ পাঠ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করবেন’ (আহমাদ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৫৮৯; ছহীহুল জামে‘, হা/৬৪৭২)। যে ব্যক্তি সূরা ইখলাছকে পসন্দ করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে’ (তিরমিযী, হা/১৯০১; মিশকাত, হা/২১৩০)। এর তাৎপর্য হলো তাওহীদকে সঠিকভাবে বুঝা ও সে অনুযায়ী আমল করা। উল্লেখ্য যে, সূরা ইখলাছ একবার পড়লে এক খতম কুরআন পড়ার ছওয়াব হবে মর্মে কোনো ছহীহ হাদীছ পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন (২) : গোসলের ফরয কয়টি এবং তার পদ্ধতি কী?

মুহাম্মাদ
 মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : গোসলের ফরয হলো শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ভালোভাবে পানি পৌঁছানো’ (মায়েদাহ, ৬)। গোসলের সুন্নাহ পদ্ধতি হলো : ১. সর্বপ্রথম পবিত্রতার নিয়্যত করা। ২. তারপর বিসমিল্লাহ বলা। ৩. তারপর বাম হাত দ্বারা অপবিত্রতা দূর করা। ৪. তারপর ছালাতের ন্যায় ওযূ করা (তবে পাদ্বয় গোসল শেষে ধৌত করবে)। ৫. তারপর মাথায় তিন অঞ্জলি পানি দেওয়া ও চুলের (পুরুষের ক্ষেত্রে) গোড়ায় পানি পৌঁছানো। ৬. অতঃপর ডান-কাঁধ তারপর বাম-কাঁধে পানি ঢেলে সমস্ত শরীর ভালোভাবে ধৌত করা’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৭৪; আবুদাঊদ, হা/২১০)।

প্রশ্ন (৩) : মুশরিকদের স্থান জাহান্নাম, তাহলে যারা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়েছে, তারা শাস্তি ভোগ করার পরে জান্নাতে যাবে কি?

নূরুল ইসলাম
নীমতলা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর স্বীকৃতি প্রদান করার অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বূদ নেই। সুতরাং এ কথার স্বীকৃতি প্রদানের পরে কেউ শিরক করতে পারে না। তাই কোনো মুশরিক যদি মুখে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়ে কিন্তু ঈমান ও আমলে তা বাস্তবায়ন না করে, তাহলে তাদের আমল বিনষ্ট হবে এবং তাদের স্থান হবে চিরস্থায়ী জাহান্নাম। তারা কখনোই জান্নাতে যেতে পারবে না। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই’ (মায়েদাহ, ৭২)।

উল্লেখ্য যে, সূরা হূদের ১০৭ ও ১০৮ নং আয়াতে জান্নাতবাসী ও জাহান্নামীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, তারা অনন্তকাল সেখানে থাকবে, যে পর্যন্ত আসমান ও যমীন স্থায়ী থাকবে। তবে আল্লাহ অন্য কিছু চাইলে ভিন্ন কথা’। উক্ত আয়াত থেকে অনেকে বুঝেছেন যে, জাহান্নামে কাফের-মুশরিকদের শাস্তি স্থায়ী হবে না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শাস্তি হবে। অর্থাৎ যতদিন আসমান ও যমীন বিদ্যমান থাকবে, ততদিন তাদের শাস্তি হবে। উক্ত ধারণা সঠিক নয়। কারণ আরবদের রীতি ছিল, কোনো জিনিসের স্থায়িত্ব বুঝানোর জন্য তারা বলত هذا دائم دوام السماوات والارض ‘আসমান ও যমীনের ন্যায় এটা চিরস্থায়ী’। আরবদের এই ভাষারীতিই কুরআন মাজীদে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ কাফের-মুশরিকরা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে। এ বিষয়ে কুরআনের বহু আয়াতে বর্ণিত রয়েছে। যেমন সূরা বাক্বারাহ, ১৬১-৬২; আলে ইমরান, ৮৮; তওবা, ৬৮; আহযাব, ৬৪-৬৫; যুমার, ৭২ প্রভৃতি। এ ছাড়া অনেক ছহীহ হাদীছে জাহান্নামীদের চিরস্থায়ী শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যেমন- ‘মৃত্যুকে সাদা-কালো মিশ্রিত রংয়ের একটি দুম্বার আকৃতিতে হাযির করে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে যবেহ করা হবে। অতঃপর বলা হবে, হে জান্নাতবাসীগণ! মৃত্যুহীন স্থায়ী জীবন যাপন করো। হে জাহান্নামীরা! মৃত্যুহীন স্থায়ী জীবন যাপন করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৭৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৪৯)। দ্বিতীয়ত, আসমান ও যমীন থেকে জিনস উদ্দেশ্য। অর্থাৎ দুনিয়ার আসমান ও যমীনের ধ্বংসের পর পরকালে আল্লাহ যে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করবেন, তা হবে চিরস্থায়ী। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আকাশসমূহকে’ (ইবরাহীম, ৪৮)। উক্ত (হূদের ১০৭ ও ১০৮) আয়াতের শেষাংশে ‘আল্লাহ যদি অন্য কিছু চান’ দ্বারা পাপী মুমিনদের বুঝানো হয়েছে। যারা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জাহান্নামে শাস্তি ভোগের পর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে’ (তাফসীর ইবনু কাছীর, হূদ, ১০৭ ও ১০৮ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.)। আরও উল্লেখ্য যে, একটি জাল হাদীছে এসেছে যে, ‘একদিন জাহান্নামের অবস্থা এমন হবে, সেখানে একজন আদম সন্তানও আর অবশিষ্ট থাকবে না’ (ইবনুল জাওযী, কিতাবুল মাওযূ‘আত ৩/২৬৮ ‘জাহান্নাম খালি হয়ে যাওয়া’ অনুচ্ছেদ)। উক্ত জাল হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যাবে না। মোটকথা, কাফের-মুশরিকরা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে। তবে ঈমানদার পাপীরা তাদের পাপের শাস্তি ভোগের পর রাসূল (ছা.)-এর শাফা‘আতক্রমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।

প্রশ্ন (৪) : এম.এল.এম ব্যবসা করা যাবে কি

মানিক সিদ্দী
কুমারখালী, কুষ্টিয়া।

উত্তর : এম.এল.এম বা বহুজাতবিশিষ্ট পণ্য বাজারজাত ব্যবসা পদ্ধতি বর্তমান বাংলাদেশে নতুন একটি ব্যবসা পদ্ধতি হিসাবে ব্যাপকতা লাভ করছে। এটা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ও নেটওয়ার্ক মার্কেটিং নামে পরিচিত। এম.এল.এম এমন একটি ব্যবসা, যাতে ডিস্ট্রিবিউটরদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করার এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাঝে আপলাইন ও ডাউনলাইন নামের বহু স্তরের ডিস্ট্রিবিউটর তৈরি হয়। ডাউনলাইনের কোনো ডিস্ট্রিবিউটর কর্তৃক বিক্রিত পণ্যদ্রব্যের নির্দিষ্ট কমিশন আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটররা অটোমেটিক পেয়ে থাকেন। এ ব্যবসায় পদ্ধতি ইসলামের মূল শ্রমনীতির সাথে দুই দিক হতে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বৈধ নয়। ১. ভিত্তিগত দিক(substantive and theoretical)  : এম.এল.এম এর পদ্ধতি বিভিন্ন সময় ভিন্ন  হলেও ভিত্তিগত দিক সব সময় একই থাকে।তা হলো, নিম্ন লেভেলের ডিস্ট্রিবিউটরের বিক্রিত পণ্যদ্রব্যের একটি কমিশন সর্বোচ্চ লেভেলের ডিস্ট্রিবিউটর পর্যন্ত পায়। অর্থাৎ শ্রমবিহীন লাভ তারা পায়। যা ইসলামের শ্রমনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো মানুষই অপরের বোঝা বহন করবে না। মানুষ ততটুকুই পাবে সে যতটুকু চেষ্টা করে’ (নাজম, ৩৮-৩৯)। আর তা বিবেক বহির্ভূতও বটে। কারণ একজন শ্রম ও সময় ব্যয় করবে আর অপরজন যাকে সে চেনেওনা সে তার শ্রমের কমিশনের অংশ ভোগ করবে, এটা অযৌক্তিক। ২. পদ্ধতিগত দিক : (ক) শ্রমবিহীন বিনিময় এবং বিনিময়বিহীন শ্রম, যা ইসলামী আইন বহির্ভূত। প্রথমত, এতে একজনের শ্রমের লাভ আরেকজন পায়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। দ্বিতীয়ত, বিনিময়বিহীন শ্রম অর্থাৎ একজন ডিস্ট্রিবিউটরের ডান ও বাম উভয় চেইন বা নেট না চললে সে শ্রম দিয়েও পারিশ্রমিক পাবে না, যা ইসলামে হারাম। হাদীছে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তিন শ্রেণির মানুষের সাথে ক্বিয়ামতের দিন ঝগড়া করব। তার একজন হলো, যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করে তার নিকট থেকে কাজ আদায় করার পর মজুরী পরিশোধ করে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/২২২৭; ইবনে মাজাহ, হা/২৪৪২; মিশকাত, হা/২৯৮৪)।

(খ) সূদের সাদৃশ্য ও দৃঢ় সন্দেহ। ইসলাম সন্দেহযুক্ত বিষয়কে সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, সন্দেহযুক্ত বিষয়কে ত্যাগ করো এবং সন্দেহমুক্ত বিষয়ের প্রতি ধাবিত হও’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭২৩; তিরমিযী, হা/২৫১৮; নাসাঈ, হা/৫৭১১; মিশকাত, হা/২৭৭৩)। (গ) জুয়ার সাদৃশ্য : মহান আল্লাহ জুয়াকে হারাম করেছেন’ (মায়েদাহ, ৯০)। (ঘ) বাতিল পন্থায় অন্যের মাল ভক্ষণ করা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ তোমরা পরস্পরের মধ্যে ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (নিসা, ২৯)। (ঙ) প্রতারণা বা ধোঁকা : ব্যবসা বৈধ হওয়ার জন্য ধোঁকা মুক্ত হওয়া শর্ত। রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়’ (ইবনে মাজাহ, হা/২২২৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৮৭১)। (চ) বর্ধিত মূল্যে বিক্রয় : রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বর্র্ধিত মূল্যে বিক্রয়ের জন্য পণ্য আটকে রাখে, সে পাপি’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬০৫; মিশকাত, হা/২৮৯২)। (ছ) একটি চুক্তির জন্য আরেকটিকে শর্ত করা : রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘একই আক্বদের (চুক্তি) জন্য আরেকটিকে শর্ত করা বৈধ নয়’ (তিরমিযী, হা/৩৫০৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৬৭১)। এ ছাড়া আরও বহু কারণ রয়েছে, যেগুলো ইসলামী ব্যবসানীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তাই এই ব্যবসা ইসলামে বৈধ নয়।

প্রশ্ন (৫) : কোনো পুরুষের সাথে অবৈধভাবে মেলামেশার মাধ্যমে কোনো নারী গর্ভবতী হওয়ার পরে যদি তারা বিবাহ করে, তাহলে উক্ত বিবাহ কি বৈধ হবে এবং সেই সন্তান কি পিতার সম্পত্তির ওয়ারিশ হবে

শাকিল হোসাইন
চরগগনপুর, জামালপুর সদর।

উত্তর : তাদের বিবাহ বৈধ হবে। কেননা ব্যভিচারী ব্যভিচারিণীকে বিয়ে করবে এটাই শারঈ বিধান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী ব্যক্তি ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিকা নারী ব্যতীত অন্য কাউকে যেন বিয়ে না করে এবং ব্যভিচারিণীকে ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষ ব্যতীত কেউ যেন বিয়ে না করে, মুমিনদের জন্য এটা হারাম করা হয়েছে’ (নূর, ৪)। রাসূলুল্লাহ (ছা.) এক হাদীছে বলেন, لَ لَا يَنْكِحُ الزَّانِي الْمَجْلُودُ إِلَّا مِثْلَهُ ‘শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যভিচারী তার মতো ব্যভিচারিণীকেই বিয়ে করবে’ (আবুদাঊদ, হা/২০৫২)। এখানে তারা উভয়েই শাস্তি প্রাপ্তদের স্থলাভিষিক্ত। তবে এ মহাপাপের জন্য তাদেরকে তওবা করতে হবে এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। (যেহেতু ইসলামী শরী‘আতের শাস্তির বিধান আমাদের সমাজে নেই)।

অবশ্য তাদের উক্ত সন্তান জারজ সন্তান বলে গণ্য হবে এবং সে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না। তবে মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে’ (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ৩/৩৭২)। রাসুলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি স্বাধীন মহিলার সাথে যেনা করলে এবং অবৈধভাবে সন্তান জন্ম নিলে ঐ সন্তান নিজেও উত্তরাধিকারী  হবে না এবং ঐ সন্তানের সম্পদেও (মা ব্যতীত) অন্য কেউ উত্তরাধিকারী হবে না’ (তিরমিযী, হা/২১১৩; মিশকাত, হা/৩০৫৪)।

প্রশ্ন (৬) : ইমাম সাহেবের ক্বিরাআতে যথেষ্ট ভুল হয়। বিষয়টি সংশোধনের জন্য বলা হলেও তিনি সংশোধনের চেষ্টা করেন না। তিনি জনৈক পীরের খুব ভক্ত। জনসাধারণের অনেকেই তার ইক্তেদা করতে চায় না। তার পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

আরিফুল ইসলাম
 দেবীদার, কুমিল্লা।

উত্তর : ইমামের ক্বিরাআতে ভুল দুই ধরনের হতে পারে। উচ্চারণের অশুদ্ধতা ও আয়াতের বাক্য ও শব্দ ভুলে যাওয়ার কারণে ভুল হওয়া। শব্দ বা বাক্য ভুলে যাওয়ার কারণে তাকে পরিবর্তন করার দরকার নাই। কেননা এটা সে ইচ্ছাকৃতভাবে করে না। উচ্চারণের অশুদ্ধতা আবার দুই ধরনের হতে পারে। উচ্চারণে যদি এমন ভুল হয় যার কারণে অর্থের বিকৃতি হতে পারে, তাহলে ইমামকে পরিবর্তন করাই উচিত। আর যদি এমন ভুল হয়, যার কারণে অর্থের কোনো বিকৃতি হয় না, তাহলে তার ইক্তেদা করা যাবে। উল্লেখ্য যে ইমামের কোনো ভুলের কারণে মুক্তাদীর ছালাতে কোনো সমস্যা হয় না, বরং মুক্তাদীর ছালাত হয়ে যায়। রাসূল (ছা.) বলেন, ‘অনেকেই তোমাদেরকে ছালাত আদায় করায়। তারা যদি ঠিক করে, তাহলে তোমাদের জন্য ছওয়াব রয়েছে। আর তারা যদি ভুল করে, তাতে তোমাদের ছওয়াব হবে আর তাদের গুনাহ হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪; মিশকাত, হা/১১৩৩)। তবে এ ধরনের ইমামের সংশোধনের জন্য বলতে হবে। সংশোধিত না হলে তার চেয়ে ভালো ইমাম আনার চেষ্টা করা যায়। তবে ইমামের ভক্ত পীরের মধ্যে যদি শিরকী আমল-আক্বীদা থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

প্রশ্ন (৭) : টাকা-পয়সা কর্য দেওয়ার পরে যদি গ্রহীতা দাতাকে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত কিছু টাকা দেয় কিংবা গ্রহীতা তা চেয়ে নেয় তাহলে কি তা জায়েয হবে?  

গোলাম রাব্বি
তানোর, রাজশাহী।

উত্তর : না, জায়েয হবে না। কেননা ঋণগ্রহী তা স্বেচ্ছায় কিছু প্রদান করুক কিংবা দাতা কিছু চেয়ে নিক উভয় অবস্থাতেই তা সূদ হবে। আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.)  বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে ধার দেয়, তখন সে যেন তার নিকট থেকে হাদিয়া গ্রহণ না করে’ (নায়লুল আওত্বার মিন আহাদীছি সাইয়িদিল আখইয়ার শারহ মুনতাক্বাল আখবার, ৫/২৮৭ পৃ.; মিশকাত, হা/২৮৩২, সনদ ছহীহ)। আবু বুরদা ইবনে আবু মূসা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি মদীনায় এসে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বললেন, তুমি এমন এলাকায় বাস করো, যেখানে সূদের প্রচলন অনেক বেশি। অতএব কারও উপর যদি তোমার কোনো প্রাপ্য থাকে, আর সে যদি তোমাকে এক বোঝা খড়, এক গাঁটরি যব বা ঘাসের একটি বোঝাও উপঢৌকন দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করো না। কেননা তা সূদ’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৮১৪; মিশকাত, হা/২৮৩৩, সনদ ছহীহ)। সুতরাং এ ধরনের হারাম গ্রহণ করা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

প্রশ্ন (৮) : পায়ে মেহেদী ব্যবহার করা যাবে কি

সারমীন নীলা
নীলফামারী সদর।

উত্তর : পুরুষের খুশবু হলো যার রং গোপন থাকবে এবং সুগন্ধি প্রকাশ পাবে। আর মহিলাদের খুশবু হলো যার রং প্রকাশ পাবে এবং সুগন্ধি গোপন থাকবে’ (তিরমিযী, হা/২৭৮৭; নাসাঈ, হা/৫১১৭-১৮; মিশকাত, হা/৪৪৪৩, সনদ ছহীহ)। যেহেতু মেহেদী দৃশ্যমান বস্তু, সেহেতু তা পুরুষের জন্য হাতে-পায়ে ব্যবহার করা যাবে না’ (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ৫/২১৮)। তবে তারা পাকা চুল ও দাড়িতে তা ব্যবহার করতে পারে’ (তিরমিযী, হা/১৭৫৩; আবুদাঊদ, হা/৪২০৫; মিশকাত, হা/৪৪৫১)। পক্ষান্তরে মেয়েদের জন্য তা হাতে-পায়ে ব্যবহার করা জায়েয। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক মহিলা হাতে চিঠি নিয়ে পর্দার আড়াল হতে হাত বাহির করে রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর দিকে ইশারা করল। নবী করীম (ছা.)  নিজের হাত গুটিয়ে নিলেন এবং বললেন, আমি জানি না! এটা কি কোনো পুরুষের হাত না কোনো নারীর হাত? তখন মহিলাটি বলল, বরং এটা মহিলার হাত। তখন নবী করীম (ছা.) বললেন, ‘যদি তুমি নারী হতে, তাহলে অবশ্যই মেহেদী দ্বারা হাতের নখগুলো পরিবর্তন করতে’ (আবুদাঊদ, হা/৪১৬৬; নাসাঈ, হা/৫০৮৯)। তবে তা পর-পুরুষকে আকৃষ্ট করার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।

প্রশ্ন (৯) : জনৈকা মেয়ের মা ও মামার উপস্থিতিতে কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে তার সাথে আমার বিবাহ সম্পাদন হয়। কিন্তু পরে অবগত হলাম মেয়ের অভিভাবকের বিনা অনুমতিতে ও কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে বিবাহ বৈধ হয় না। তাই পরবর্তীতে কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন নিয়ে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে তার বাবার সম্মতিক্রমে তাকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। তবে সে সময় আর নতুনভাবে কোনো বিবাহ পড়ানো ও কাবিন রেজিস্ট্রি করা হয়নি। এভাবে তার সাথে ঘর-সংসার করা কি বৈধ হচ্ছে?

কাওসার আহমেদ
পুঠিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য অভিভাবক ও দু’জন সাক্ষী একান্ত যরূরী। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেন, ‘অভিভাবক ও দু’জন সাক্ষী ব্যতীত বিবাহ বৈধ নয়’ (ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪০৭৫; সিলসিলা ছহীহা ,৬/২৬১ পৃ., হা/১৮৬৫)। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘কোনো নারী অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করলে তা বাতিল, বাতিল, বাতিল’ (আবুদাঊদ, হা/২০৮৩; মিশকাত, হা/৩১৩১)। যেহেতু প্রশ্নোল্লেখিত অবস্থায় অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন না, সেহেতু সেটি বিবাহ হিসাবে গণ্য হয়নি। পরবর্তীতে অভিভাবকের কাছে অনুমতি নিলেও বিবাহ অগ্রহণযোগ্য থাকবে। অতএব বর্তমান সম্পর্ক অবৈধ। অতি সত্বর অভিভাবক ও দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুনভাবে বিবাহ পড়াতে হবে।

প্রশ্ন (১০) : দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-দুর্দশা থেকে পরিত্রাণের জন্য কোন দু‘আ পড়তে হবে? এমর্মে মিশকাতে বর্ণিত ২৪৫২ নং হাদীছটি কি ছহীহ?

সাদমান রহমান দোহা
ফুলবাড়ী, দিনাজপুর।

উত্তর : মিশকাতে বর্ণিত ২৪৫২ নং হাদীছটি ছহীহ। হাদীছটি হলো- আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, যে বেশি চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সে যেন বলে,

اَللَّهُمَّ إِنِّى عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ أَمَتِكَ نَاصِيَتِى بِيَدِكَ مَاضٍ فِىَّ حُكْمُكَ عَدْلٌ فِىَّ قَضَاؤُكَ أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَداً مِنْ خَلْقِكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِى كِتَابِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِى عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيْعَ قَلْبِىْ وَنُوْرَ صَدْرِىْ وَجَلاَءَ حُزْنِىْ وَذَهَابَ هَمِّىْ.

‘আল্লা-হুম্মা ইন্নী ‘আবদুকা, ওয়াবনু ‘আবদিকা, ওয়াবনু আমাতিকা, ওয়াফী কবযাতিকা, না-সিয়াতী বিয়াদিকা মা-যিন ফী হুকমুকা ‘আদলুন ফি কযা-উকা আসআলুকা বিকুল্লি ইসমিন, হুওয়া লাকা সামমায়তা বিহী নাফসাকা, আও ‘আল্লামতাহূ আহাদাম্ মিন্ খলকিকা, আও আনযালতাহূ ফী কিতা-বিকা, আও আলহামতা ‘ইবা-দাকা, আউইস্তা’সারতা বিহী ফী মাকনূনিল গয়বি ‘ইনদাক আন্ তাজ্‘আলাল কুরআ-না রবী‘আ কলবী ওয়াজালা-আ হাম্মী ওয়া গম্মী’’। অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার বান্দা, তোমার বান্দার পুত্র, তোমার দাসীর পুত্র। আমি তোমার হাতের মুঠে, আমার অদৃষ্ট তোমার হাতে। তোমার হুকুম আমার ওপর কার্যকর, তোমার আদেশ আমার পক্ষে ন্যায়। আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি তোমার সেসব নামের অসীলায়, যাতে তুমি নিজেকে অভিহিত করেছো, অথবা তুমি তোমার সৃষ্টির কাউকেও তা শিক্ষা দিয়েছো, অথবা তুমি তোমার কিতাবে নাযিল করেছো, অথবা তুমি তোমার বান্দাদের ওপর ইলহাম করেছো (অদৃশ্য অবস্থায় থেকে অন্তরে কথা বসিয়ে দেওয়া) অথবা তুমি গায়বের পর্দায় তা তোমার কাছে অদৃশ্য রেখেছো- তুমি কুরআনকে আমার অন্তরের বসন্তকালস্বরূপ চিন্তা-ফিকির দূর করার উপায় স্বরূপ গঠন করো’। যে বান্দা যখনই তা পড়বে আল্লাহ তার চিন্তা-ভাবনা দূর করে দেবেন এবং তার পরিবর্তে মনে নিশ্চিন্ততা (প্রশান্তি) দান করবেন’ (মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী, ১০৩৫২, আল কালিমুত্ব ত্বইয়্যিব, ১২৪, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৮২২)।

তা ছাড়া দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-দুর্দশা থেকে পরিত্রাণের জন্য অনেক দু‘আ রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও প্রসিদ্ধ দু’একটি দু‘আ হলো :

اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ.

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল হাম্মে ওয়াল হাযানে ওয়াল ‘আজঝে ওয়াল কাসালে ওয়াল জুবনে ওয়াল বুখলে ওয়া যালা‘ইদ দায়নে ওয়া গালাবাতির রিজা-লে। অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনা হতে, অক্ষমতা ও অলসতা হতে, ভীরুতা ও কৃপণতা হতে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের যবরদস্তি হতে (ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৬৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭০৬; তাহক্বীক মিশকাত, হা/২৪৫৮)।

প্রশ্ন (১১) : ‘আইয়্যামে বীয’ তথা প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ যে নফল ছিয়াম পালন করা হয় উক্ত সময়ে যদি কোনো মহিলা ঋতুবতী হয় সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে উক্ত ছিয়াম ক্বাযা আদায় করা যাবে কি?

সারমীন সুলতানা
চিচিরবন্দর, দিনাজপুর।

উত্তর : এমতাবস্থায় উক্ত মাসের মধ্যে যেকোনো দিনে ছিয়ামগুলো আদায় করে নিবে। মু‘আযা  আদাভিয়া (রাহি.) হতে বর্ণিত, তিনি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) কি প্রত্যেক মাসের তিনদিন ছিয়াম রাখতেন? আয়েশা (রা.) বললেন, হ্যাঁ। মু‘আযা (রাহি.) বলেন, অতঃপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, মাসের কোন তিনদিনে তিনি ছিয়াম রাখতেন? আয়েশা (রা.) বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.)  মাসের যে কোনো দিনে ছিয়াম রাখতে দ্বিধাবোধ করতেন না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬০; আবুদাঊদ, হা/২৪৫৩; মিশকাত, হা/২০৪৬)।

প্রশ্ন (১২) : গর্ভাবস্থায় থাকায় রামাযান মাসে ছিয়াম থাকতে পারিনি। এখন যদি আমি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার এবং আরবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ নিয়মিত ছিয়াম রাখি, তাহলে কি ঐ ৩০টি ছিয়ামের ক্বাযা বা কাফফারা আদায় হবে? এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

আঞ্জুমান আরা মনি
কানসাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : না; নফল ছিয়াম পালনের দ্বারা ফরয ছিয়ামের ক্বাযা বা কাফফারা আদায় হবে না। নফল ছিয়ামের দিনে ক্বাযা আদায় করতে চাইলে শুধু ক্বাযার নিয়্যতেই আদায় করতে হবে।

ক্বাযার পাশাপাশি নফলের নিয়্যত করা যাবে না। উল্লেখ্য যে, গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারিণী মহিলারা যদি ধারাবাহিকভাবে ৩০টি ছিয়ামের ক্বাযা আদায় করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তারা তাদের সুবিধানুযায়ী ক্বাযা আদায় করবে’ (বাক্বারাহ, ১৮৪; মুগনী, ৪/৩৯৩-৯৪ পৃ.)। আর ক্বাযা করতে পারবে না এমন ভয় থাকলে প্রত্যেক ছিয়ামের বিনিময়ে একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে’ (বাক্বারাহ, ১৮৪)।

প্রশ্ন (১৩) : গীবত বা পরনিন্দা করার প্রতিফল কি জাহান্নাম?

আবুল হাসান
সাপাহার, নওগাঁ ।

উত্তর : গীবত বা পরনিন্দা একটি কাবীরা গুনাহ। যা মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। এটি জাহান্নামের যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَیْلٌ لِّکُلِّ ھُمَزَةٍ لُّمَزَةِ ‘ধ্বংস প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে’ (হুমাযাহ, ১)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কতক ধারণা পাপ। আর কারও গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না। আর তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করা পসন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা ক্ববুলকারী, পরম দয়ালু’ (হুজুরাত, ১২)। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, ‘একদা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-কে প্রশ্ন করা হলো, গীবত কী? তিনি বললেন, ‘তোমার ভাইয়ের ব্যাপারে তোমার এমন কিছু বলা, যা সে অপসন্দ করে’। বলা হলো, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে বর্তমান থাকে? তিনি বললেন, ‘তুমি যা বলো তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলেই তুমি তার গীবত করলে। আর তুমি যা বলো তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তাকে মিথ্যা অপবাদ দিলে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৯; আবুদাঊদ, হা/৪৮৭৬; মিশকাত, হা/৪৮২৮)। অতএব, গীবতের মতো জঘন্যতম অপরাধ থেকে নিজেকে সংযত রাখা যরূরী।

প্রশ্ন (১৪) : যারা ছালাত, ছিয়ামসহ অন্যান্য ভালো কাজ করে কিন্তু প্রতিবেশীর সাথে দুর্ব্যবহার করে তাদের কি শাস্তি হবে?

আব্দুছ ছামাদ
বিরামপুর, দিনাজপুর ।

উত্তর : প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তির নিকট তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৬; মিশকাত, হা/৪৯৬৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তি মুমিন নয় যে ব্যক্তি পেট ভরে খায়। অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে (বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/৫৬৬০, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৪৯৯১)।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট এক ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো, যে অধিক ছালাত, ছিয়াম ও যাকাত আদায় করে। কিন্তু যবান দ্বারা তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, সে জাহান্নামী’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৬৭৫; বায়হাক্বী, হা/৯৫৪৬; মিশকাত, হা/৪৯৯২; ছহীহ আত-তারগীব, হা/২৫৬০; সিলসিলা ছহীহা, হা/১৯০)। রাসূলুল্লাহ (ছা.)  আরও বলেন, আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়; আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়; আল্লাহর কসম! ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়; যার অনিষ্ট হতে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬০১৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৬; মিশকাত হা/৪৯৬২)।

প্রশ্ন (১৫) : মৃত ব্যক্তিকে রাতে দাফন করা যাবে কি?

নূরুল ইসলাম
জয়পুরহাট সদর।

উত্তর : মৃত ব্যক্তিকে যেকোনো সময় দাফন করা যায়। তাছাড়া মৃত ব্যক্তিকে রাতে দাফন করার পক্ষেও স্পষ্ট হাদীছ রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মারা গেল। যার অসুস্থতার সময় আল্লাহর রাসূল (ছা.) খোঁজ-খবর রাখতেন। তার মৃত্যু হয় এবং রাতেই লোকেরা তাকে দাফন করেন। সকাল হলে তারা (এ বিষয়ে) নবী (ছা.)-কে খবর দেন। তিনি বললেন, আমাকে খবর দিতে তোমাদের কিসে বাধা দিল? তারা বলল, তখন ছিল রাত এবং গাঢ় অন্ধকার। তাই আপনাকে কষ্ট দেওয়া আমরা পসন্দ করিনি। তিনি ঐ ব্যক্তির ক্ববরের নিকট গেলেন এবং তার জন্য জানাযার ছালাত আদায় করলেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/১২৪৭)। এই হাদীছে রাতে দাফনকাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে রাসূল (ছা.)-এর চুপ থাকা প্রমাণ করে যে, রাতে দাফন করা জায়েয।

প্রশ্ন (১৬) : ফরয ছালাত আদায়ের স্থানে নফল আদায় করা যাবে কি? এক্ষেত্রে ইমামের জন্যও কি একই হুকুম?

আব্দুল্লাহ
গাবতলী, বগুড়া।

উত্তর : প্রশস্ত জায়গা থাকলে ফরয ছালাত আদায়ের স্থানে নফল ছালাত আদায় না করাই সুন্নাত। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছা.)  বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ কি ফরয ছালাত আদায়ের পর সামনে এগিয়ে বা পিছনে সরে অথবা ডানে বা বামে সরে নফল ছালাত আদায় করতে অপারগ? (অর্থাৎ সরে গিয়ে সুন্নাত ছালাত আদায় করবে) (ছহীছ ইবনু মাজাহ, হা/১৪২৭; ছহীহ আবুদাঊদ, হা/১০০৬, ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘ফরয ছালাত আদায়ের স্থানে নফল ছালাত আদায় প্রসঙ্গে’ অনুচ্ছেদ)। আমর ইবনু ‘আত্বা (রাহি.)  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সায়েব (রা.) বলেছেন, আমি মু‘আবিয় (রা.)-এর সাথে ‘মাক্বছূরা’-তে জুম‘আর ছালাত আদায় করলাম। অতঃপর যখন ইমাম সালাম ফিরালেন, তখন আমি আমার স্থানে দাঁড়িয়েই সুন্নাত ছালাত আদায় করলাম। যখন মু‘আবিয়া (রা.) ঘরে চলে গেলেন, আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, আপনি যা করেছেন, তা আর পুনরায় করবেন না। যখন আপনি জুম‘আর ছালাত আদায় করবেন, তখন কোনো কথা বলা এবং বের হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তার সাথে মিলিয়ে কোনো ছালাত আদায় করবেন না। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.) আমাদেরকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন এক ছালাতকে অপর ছালাতের সাথে মিলিয়ে না আদায় করি, যতক্ষণ কোনো কথা না বলি অথবা সে স্থান হতে সরে না যাই’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৮৩; মিশকাত, হা/১১৮৬; আবুদাঊদ, হা/১১২৯)।

খাছ করে ইমামকেও ফরয ছালাতের স্থানে সুন্নাত ছালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (ছা.)  বলেন, ইমাম যে স্থানে ফরয ছালাত আদায় করেছেন, সে স্থান পরিবর্তন না করে সুন্নাত ছালাত যেন না পড়ে’ (ছহীহ আবুদাঊদ, হা/৬১৬; ‘ইমামের সুন্নাত ছালাত আদায় করা’ অনুচ্ছেদ ১/১৮৪)। তবে সর্বোত্তম হচ্ছে নফল ছালাত বাড়িতে আদায় করা’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৬১; মিশকাত, হা/১২৯৫)।

প্রশ্ন (১৭) : ‘বিবাহের পরে যদি কেউ তার স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত এক বছরের বেশি সময় বিদেশে থাকে, তাহলে তাদের  বিবাহ বাতিল হয়ে যাবে’। এমন কোনো শারঈ বিধান আছে কি?

তাইফ খান
মালয়েশিয়া প্রবাসী।

উত্তর : ‘তাদের  বিবাহ বাতিল হয়ে যাবে’-এমন কোনো শারঈ বিধান নেই। তবে ছয় মাসের বেশি সময় বাহিরে থাকতে চাইলে সেক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি যরূরী। ওমর (রা.) তার মেয়ে হাফছাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, একজন নারী তার স্বামী ছাড়া কতদিন থাকতে পারে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ছয় মাস বা চার মাস। তারপর থেকে তিনি কোনো সৈনিককে ছয় মাসের বেশি বাহিরে থাকতে দিতেন না’ (মারেফাতুস সুনান ওয়াল আছার লিল বায়হাক্বী, ১৪/২৪৯ পৃ.)। এ থেকে বুঝা যায় যে, বিশেষ প্রয়োজনে ছয় মাস স্ত্রী ছাড়া থাকা যায়। এর চেয়ে বেশি থাকলে স্ত্রীর সম্মতির প্রয়োজন আছে। রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেন, ‘তোমাদের উপর তোমাদের নফসের হক্ব আছে, তোমাদের স্ত্রীর হক্ব আছে, তোমরা সবার হক্ব আদায় করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬১৩৯)। তাই একান্ত অসুবিধায় না পড়লে স্ত্রী ও সন্তানদের দেখাশোনা করার যে দায়িত্ব প্রত্যেক স্বামীর রয়েছে, তা পালনার্থে সকলকে নিয়ে একত্রে বসবাস করাই উত্তম। উল্লেখ্য যে, উভয়ের সম্মতিতে স্ত্রীকে ছেড়ে স্বামী যতদিন খুশি বাহিরে থাকতে পারে’ (ইবনে বায, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব, ২১/২৯৮-২৯৯ পৃ.; ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৩/২২৭-২২৮ পৃ.)।

প্রশ্ন (১৮) : ‘ওযূর শুরুতে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি’ বললে যতক্ষণ ওযূ থাকবে ততক্ষণ ফেরেশতারা নেকী লিপিবদ্ধ করতে থাকবে’-মর্মে মাজমাঊয যাওয়ায়েদ, ১ম খ-, ৫১৩ পৃষ্ঠার ১১১২ নং হাদীছটি কি ছহীহ?

রোকনুজ্জামান
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর : এমর্মে বর্ণিত হাদীছটির সনদ দুর্বল (নায়লুল আওতার, ১/১৭১ পৃ.; সুবুলুস সালাম, ১/৭৫ পৃ.)।

প্রশ্ন (১৯) : পূর্বে শিরক-বিদ‘আত মিশ্রিত অনেক আমল করেছি যার হিসাব লেখা রয়েছে। এখন ঐসব পাপ হতে তওবা করতে চাইলে কি পৃথক পৃথকভাবে তওবা করতে হবে এবং তওবা করার পুর্বে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতে হবে? অথবা এথেকে তওবা করার নিয়ম কী?

তামান্না আফরোজা
সাপাহার, নওগাঁ।

উত্তর : পাপ একাধিক হলে প্রত্যেক পাপের জন্য আলাদা করে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতে হবে বিষয়টি এমন নয়, বরং পাপসমূহ হতে মুক্তি লাভের আশায় দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে সকল পাপগুলো স্মরণ করে আল্লাহর নিকট একনিষ্ঠচিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা করো বিশুদ্ধ তওবা; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলোকে মোচন করে দিবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত’ (তাহরীম, ৮)। তিনি অন্যত্র বলেন, ‘বলো, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছো (পাপ করেছো) আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (যুমার, ৫৩)। তবে  তওবা কবুলের জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে (১) একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই তওবা হতে হবে। (২) কৃত গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে। (৩) পুনরায় সে গোনাহে জড়িত না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আর যদি পাপটি বান্দার সাথে যুক্ত থাকে, তাহলে উপরের তিনটি শর্ত পূরণের সাথে চতুর্থ শর্ত হিসাবে তাকে বান্দার নিকটে ক্ষমা চাইতে হবে ও তাকে খুশী করতে হবে। নইলে তার তওবা শুদ্ধ হবে না’ (নববী, রিয়াযুছ ছালেহীন, ‘তওবা’ অনুচ্ছেদ)। তওবার জন্য পাঠ করতে হবে ‘আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ূম ওয়া আতূবু ইলাইহে’ (তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত, হা/২৩৫৩)। সুতরাং, কেউ যত বড় অপরাধীই হোক না কেন একনিষ্ঠচিত্তে আল্লাহর নিকট তওবা করলে নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৩২০৮)।

প্রশ্ন (২০) : বিবাহের সময় কনেকে সাজানোর ক্ষেত্রে কোন কোন মহিলা অংশগ্রহণ করতে পারে?

আরাফাত রহমান
ডাকবাংলা, ঝিনাইদহ।

উত্তর : বিবাহের সময় কনেকে দ্বীনদার যেকোনো নারী সাজাতে পারে। মা আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের সময় মদীনার আনছারী মহিলারা তাকে সাজিয়েছিলেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪২২; ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৭০৯৭)। তবে যে সকল নারীর চরিত্রে অর্ধনগ্নতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা মিশে আছে অথবা নারীদের শারীরিক বৈশিষ্টের কথা স্বামীর সামনে গিয়ে প্রকাশ করার অভ্যাস আছে, তাদের মাধ্যমে নববধুকে সাজানো যাবে না। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘কোনো নারী অপর নারীর শরীর স্পর্শ করে স্বামীর সামনে যেন তা বর্ণনা না করে। কারণ হতে পারে স্বামী উক্ত নারীকে অন্তরের চোখ দিয়ে দেখতে থাকবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৪০; মিশকাত, হা/৩০৯৯)।

প্রশ্ন (২১) : মেয়ের বাবা পূর্বে সূদের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমানে নাই। এমতাবস্থায় উক্ত পরিবারে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে কি

আমিনুল ইসলাম
মনিরামপুর, যশোর।

উত্তর : সূদ অত্যন্ত জঘন্য একটি পাপ। সূদী লেনদেন করা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করার শামিল (বাক্বারাহ, ২৭৯)। জেনেশুনে এক দিরহাম সূদ ভক্ষণ করা ৩৬ বার যেনা করার চেয়ে ভয়াবহ পাপ (মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০০৭; মিশকাত, হা/২৮২৫)। তাই সূদী কারবারের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক না করাই উচিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘চরিত্রহীনা নারীরা চরিত্রহীন পুরুষের জন্য এবং চরিত্রহীন পুরুষেরা চরিত্রহীনা নারীদের জন্য। আবার ‘চরিত্রবান নারীরা চরিত্রবান পুরুষের জন্য এবং চরিত্রবান পুরুষেরা চরিত্রবান নারীদের জন্য’ (নূর, ২৪)। তবে কেউ যদি সূদ ছেড়ে দিয়ে তওবা করে ফিরে আসে তাহলে তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক করাতে শারঈ কোনো বাধা নেই। কারণ আল্লাহ চাইলে খাঁটি তওবার মাধ্যমে পূর্বের অপরাধ মোচন হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো। হয়ত আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহবান… (তাহরীম, ৮)।

প্রশ্ন (২২) : আমার পাশর্^পর্তী গ্রামে জামে মসজিদের কমিটির পদপ্রার্থী নিয়ে দুই দলের মধ্যে কোন্দল হয়। ২য় দলটির মনঃপূত প্রার্থীকে কমিটিতে না নেওয়ায় তারা উক্ত মসজিদ থেকে ১০০ বা ২০০ মিটার দূরে ওয়াক্বফ করা সম্পত্তির উপর জামে মসজিদ তৈরি করে এবং তারা সেখানে জুম‘আ আরম্ভ করেছে। এখন উভয় দলের মুছল্লীগণ নিকটস্থ মসজিদকে উপেক্ষা করে নিজ নিজ দলীয় মসজিদে যাওয়া আবশ্যক করে নিয়েছে? তাদের এই কর্মনীতি শরী‘আত সম্মত হচ্ছে কি

আনোয়ার হোসেন
 পোরশা, নওগাঁ।

উত্তর : শরী‘আতসম্মত কারণ ব্যতীত পুরাতন মসজিদ থেকে আলাদা হয়ে পৃথক কোনো মসজিদ নির্মাণ করা জায়েয নয়। কারণ এতে মুসলিমদের মাঝে ঐক্য নষ্ট হয়ে বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতার সূত্রপাত ঘটে। আর আল্লাহ পরস্পর বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেয়ো না’ (ইমরান, ১০৩)। কুফরীকে প্রতিষ্ঠিত করা, মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং ইসলাম বিদ্বেষীদের সুযোগ দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে মুনাফিক্বরা মদীনায় একটি মসজিদ নির্মাণ করলে আল্লাহ তা‘আলা তার রাসূলকে উক্ত মসজিদে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করে দেন (তওবা, ১০৭-১০৮)। ইমাম ইবনু তায়মিয়া বলেছেন, বিনা প্রয়োজনে মসজিদের পাশে নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হলে সেই মসজিদ ভেঙে ফেলতে হবে (আল-ফুরূ‘, ২/৩৮ পৃ.)।

প্রশ্ন (২৩) : ছালাতের আউয়াল ওয়াক্তের সময়সীমা কতটুকু

জাহাঙ্গীর
আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : ছালাতের আউয়াল ওয়াক্তের পরিমাণ কতটুকু সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে প্রত্যেক ছালাতকে তার নির্ধারিত সময়সীমার প্রথম সময়ে আদায়ের ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে। রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম আমল হলো আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা’ (আবুদাঊদ, হা/৪২৬; তিরমিযী, হা/১৭০; মিশকাত, হা/৬০৭)। রাসূলুল্লাহ (ছা.) সর্বদা গালাস বা ফজরের অন্ধকারে ফজরের ছালাত আদায় করতেন এবং জীবনে একবার মাত্র ইসফার বা চারদিক ফর্সা হওয়ার সময়ে ফজরের ছালাত আদায় করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এটাই তার নিয়মিত অভ্যাস ছিল (আবুদাঊদ, নায়ল, ২/৭৫ পৃ.)। অতএব গালাস ওয়াক্তে অর্থাৎ ভোরের অন্ধকারে ফজরের ছালাত আদায় করাই সুন্নাত। রাফে‘ ইবনু খাদীজ (রা.)বলেন, আমরা রাসূল (ছা.)-এর সাথে আছরের ছালাত আদায় করে উট যবেহ করতাম। তা ১০ ভাগ করা হতো ও রান্না করা হতো। অতঃপর আমরা তা সূর্য ডুবার পূর্বেই খেতাম (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৬২৫; মিশকাত, হা/৬১৫)। কোনো কোনো ছাহাবী আছরের ছালাত আদায় করে চার মাইল দূরে যেতেন, তখনো সূর্য অনেক উপরে থাকত (ছহীহ বুখারী, হা/৫৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/৬২১; মিশকাত, হা/৫৯২)। এ সকল হাদীছের বিবরণে আউয়াল ওয়াক্তের নির্ধারিত সময়সীমা পাওয়া না গেলেও ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর থেকে ২৫/৩০ মিনিট সময় পর্যন্ত আউয়াল ওয়াক্ত হিসাবে গণ্য করা যায়।

প্রশ্ন (২৪) : কুরআন মাজীদ খতম করে পুনরায় সূরা ফাতিহা ও সূরাহ বাক্বারার শুরু অংশ তথা ‘মুফলিহুন’ পর্যন্ত পড়ার বিধান কী? জনৈক ব্যক্তি বলেন, তিরমিযীর ২৯৪৮ নং হাদীছে এ ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে। বিস্তারিত জানাবেন।

মাজহারুল ইসলাম
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

উত্তর : কুরআন পড়া শেষ করে পুনরায় শুরু থেকে কিছু অংশ পড়া কিংবা কোনো সূরা পড়া শেষ করে অন্য সূরার কিছু অংশ পড়া সম্পর্কে সুনানে তিরমিযীর ২৯৪৮ নং হাদীছটি যঈফ বা দুর্বল। তাই এই আমল পরিত্যাজ্য।

প্রশ্ন (২৫) : ছালাত আদায়ের সময় সামনে মোবাইল, ঘড়ি, চশমা ইত্যাদি রেখে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

জাহিদ বিন আনোয়ার
সাঘাটা, গাইবান্ধা।

উত্তর : ছালাতের সময় সামনে এমন কিছু রাখা যাবে না যাতে ছালাতের একাগ্রতা নষ্ট হয়। একদা রাসূল (ছা.) নকশাযুক্ত চাদর গায়ে দিয়ে ছালাত আদায় করেছিলেন। এতে তাঁর ছালাতের একাগ্রতা নষ্ট হয়েছিল। ফলে তিনি ছালাত শেষে আয়েশা (রা.)-কে বলেন, ‘চাদরটি আবু জাহমের কাছে নিয়ে যাও এবং তার আনবিজানিয়্যা বা কারুকার্যবিহীন চাদরটি আমার জন্য নিয়ে এসো’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৬; মিশকাত, হা/৭৫৭)। আনাস (রা.) বলেন, আয়েশা (রা.)-এর একটি পর্দা ছিল, যা দ্বারা তিনি ঘরের একদিক ঢেকে রেখেছিলেন। নবী করীম (ছা.)  বললেন, ‘তোমার এ পর্দা সরিয়ে ফেল। কারণ তার ছবিসমূহ আমার ছালাতের মাঝে আমার চোখে পড়ে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৪; মিশকাত, হা/৭৫৮)। তবে বিশেষ প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় বস্তু ছালাতে সামনে রাখা যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছা.) তার নাতনী উমামা বিনতে যায়নাবকে কাঁধের উপরে নিয়ে ফরয ছালাতের ইমামতি করতেন। যখন তিনি সিজদায় যেতেন, তখন তাকে সামনে নামিয়ে রেখে দিতেন। আবার যখন সিজদা থেকে উঠতেন, তখন কাঁধে উঠিয়ে নিতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৪৩; মিশকাত, আবুদাঊদ, হা/৯১৭)।

প্রশ্ন (২৬) : কাদিয়ানীদের ব্যাপারে শারঈ বিধান কী?

আল-আমিন
 ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

উত্তর : ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে সাম্রজাজ্যবাদী ইংরেজদের পরিকল্পনায় ভারত উপমহাদেশে মুসলিমদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করা এবং জিহাদ থেকে বিমুখ করার লক্ষ্যে কাদিয়ানী ফেরকার উত্থান ঘটে। মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী (১৮৩৯-১৯০৮) ছিল এই জঘন্য মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। পাঞ্জাব প্রদেশের ধর্ম ও দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী ইংরেজদের অনুগত একটি পরিবারে তার বেড়ে উঠা। যার কারণে ইংরেজরা তাকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে মানুষকে জিহাদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসাবে এই মতবাদের জন্ম দেয়। কাদিয়ানীদের কিছু ভ্রান্ত আক্বীদা নিম্নে তুলে ধরা হলো :

১. আল্লাহ সম্পর্কে তার আক্বীদা : মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী লিখেছেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখেছি আমিই আল্লাহ’ (আয়েনায়ে কামালাতে মির্জা, পৃ. ৫৬৪-৫৬৫; কাদিয়ানী মাযহাব, পৃ. ৩২৮)।

স্বপ্ন দেখার জন্য ঘুমাতে হয়। অথচ কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক, তাঁকে তন্দ্রা অথবা নিদ্রা স্পর্শ করে না’ (বাক্বারা, ২৫৫)।

মির্জা কাদিয়ানীর বইতে আছে, ‘আল্লাহ তাকে বলেছেন ‘হে আমার ছেলে, শোনো!’ (গোলাম আল বুশরা, ১/৪৯; ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, পৃ. ৩০৮)।

অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেওয়া হয়নি’ (ইখলাছ, ৩)।

২. রাসূলুল্লাহ (ছা.)  সম্পর্কে তার আক্বীদা : মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজ বইতে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহু (ছা.)  সর্বশেষ নবী নন, বরং গোলাম আহমাদ সর্বশেষ নবী’ (হাক্বীক্বাতুন নবুঅত, পৃ. ৮২)।

অথচ কুরআনে এসেছে ‘মুহাম্মাদ তোমাদের কারও পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ’ (আহযাব, ৪০)।

এক হাদীছে এসেছে, শীঘ্রই আমার উম্মতের মাঝে ৩০ জন মিথ্যুকের আবির্ভাব ঘটবে, তারা প্রত্যেকেই অমূলক দাবি করবে যে, সে আল্লাহর নবী। অথচ আমিই সর্বশেষ নবী, আমার পরে কোনো নবী নেই’ (আবুদাঊদ, হা/৪২৫২; মিশকাত, হা/৫৪০৬)।

কাদিয়ানী সম্প্রদায়ে দ্বিতীয় খলীফা, মির্যা কাদিয়ানীর বড় ছেলে মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমূদ বলেছে, ‘রাসূল (ছা.)-এর পরে একজন কেন, আমার দাবি তাঁর পরে হাজারো নবী আসতে পারে’ (আনোয়ারে খেলাফত, পৃ. ৬২)।

৩. জিহাদের ব্যাপারে কাদিয়ানীদের আক্বীদা : কাদিয়ানীর বইতে আছে ‘জিহাদের হুকুম রহিত হয়ে গেছে’ (হাশিয়ায়ে আরবাঈন, পৃ. ১৫৪, আদইয়ানে বাতেলা, পৃ. ১৩৩)।

অথচ কুরআনে এসেছে ‘তোমরা তাদের (কাফেরদের) বিরুদ্ধে জিহাদ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিতনা (কুফরী কর্মকা-) দূরীভূত না হয়…’ (আনফাল, ৩৯)।

৪. তিনি নিজেকে জুলকারনাইন হওয়ার হাস্যকর দাবি করেছেন (বারাহীনে আহমাদিয়া, পৃ. ৯৭; ইসলামী আক্বীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, পৃ. ৩২৯)।

৫. তিনি নিজেকে হিন্দুদের শ্রী কৃষ্ণ অবতার হওয়ার দাবী করেছেন (কাদিয়ানী মাযহাব, পৃ. ৪৩২; ইসলামী আক্বীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, পৃ. ৩২৮)। (নাঊজুবিল্লাহ)

কোনো ব্যক্তির মাঝে যদি আল্লাহ, তার রাসূল, অন্যান্য নবী, জিহাদ ইত্যাদি বিষয়ে এমন বিশ্বাস থাকে তাহলে তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ থাকে না। তাই কাদিয়ানীরা দ্বীন থেকে বহির্ভূত কাফির। আল্লাহ তা‘আলা এই ভ্রান্তদের সুপথে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন না হয় ধ্বংস করুন।

প্রশ্ন (২৭) : আমার স্বামী আমাকে চাকরি করাতে চান না। আর আমিও চাকরি করি না। কিন্তু এতে আমার পিতা-মাতা অসন্তুষ্ট। আমার কি গুনাহ হবে

সারমীন নীলা
লালপুর, নাটোর।

উত্তর : সংসারের ভরণ-পোষণের দায়-দায়িত্ব স্বামীর (নিসা, ৩৪)। তাই বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে একজন মহিলা পাপের কাজ ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে স্বামীর আনুগত্য করতে বাধ্য। কারণ পাপের কাজে কারও আনুগত্য চলে না (ছহীহুল জামে‘, হা/৭৫২০; মিশকাত, হা/৩৬৯৬)। তাই স্বামী যদি চাকরি করাতে না চায়, তাহলে পরিবারে আর্থিক অস্বচ্ছলতা থাকলেও চাকরি করা যাবে না এবং এক্ষেত্রে পিতা-মাতার কথা অমান্য করার কারণে উক্ত মহিলা গুনাহগার হবে না।

প্রশ্ন (২৮) : সরকার কর্তৃক প্রদত্ত্ব বৈশাখী ভাতা গ্রহণ করা যাবে কি

সাকিবুল হাসান
কানসাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : বৈশাখী ভাতা গ্রহণের পূর্বে ১লা বৈশাখের কর্মকাণ্ড ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া উচিত। সাথে সাথে তা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে যাচাই-বাচাই করে শরী‘আতের অনুকূলে কিনা তা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আমাদের অবগতিতে এটি একটি বিজাতীয় সংষ্কৃতি। যার ভাতা গ্রহণ করা মুসলিমদের জন্য জায়েয মনে করা যায় না।

প্রশ্ন (২৯) : আমি একজন প্রবাসী। কিছু দিন পূর্বে স্ত্রীর সাথে ফোনালাপের এক পর্যায়ে ঝগড়া শুরু হলে রেগে গিয়ে তাকে এক সাথে তিন তালাক দিই। উক্ত তালাক কার্যকর হবে কি

মাহমুদুর রহমান মামুন ও মারুফুর রহমান
 সৌদি আরব।

উত্তর : রাগান্বিত অবস্থায় স্ত্রীকে তিন তালাক দিলেও তালাক গণ্য হবে। তবে তা হবে এক তালাক। কেননা এক বৈঠকে যতবারই তালাকের কথা বলুক তা এক তালাক বলেই গণ্য হবে। ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু রুকানা (রা.) যখন তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন তখন রাসূল (ছা.)  বললেন, ‘তুমি তোমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নাও’। তিনি বললেন, আমি তাকে তিন তালাক দিয়ে দিয়েছি। রাসূল (ছা.)  বললেন, ‘আমি তা জানি, তুমি তাকে ফিরিয়ে নাও’ (আবুদাঊদ, হা/২১৯৬)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু রুকানা (রা.) যখন তাঁর স্ত্রীকে এক সাথে তিন তালাক দেন, তখন তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লে রাসূল (ছা.) তাঁর স্ত্রীকে তাঁর কাছে ফেরৎ দেন এবং বলেন, এটি এক তালাক হিসাবে গণ্য (আহমাদ, হা/২৩৮৭; ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ, ২১/২৭৪)। অপর এক বর্ণনায় আছে একবার জনৈক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে এক সঙ্গে তিন তালাক দিয়েছে জানতে পেরে রাগে উঠে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, ‘আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হচ্ছে? অথচ আমি তোমাদের মাঝে রয়েছি’। তখন একজন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি ওকে হত্যা করব না? (রাওযাতুন নাদিয়াহ, তাহক্বীক্ব আলবানী, ২/৪৭ পৃ.; হেদায়াতুর রুয়াত, হা/৩২২৯, ৩/৩১৩ পৃ.; মুহাল্লা, মাসআলা নং ১৯৪৫)। উক্ত হাদীছসমূহ দ্বারা প্রমাণ হয় যে, মানুষ তার স্ত্রীকে এক বৈঠকে তিন তালাক দিলে ইদ্দতের মধ্যে (অর্থাৎ ৯০ দিনের মধ্যে) ফিরিয়ে নিতে পারে। নতুন করে বিবাহ দিতে হবে না (ইবনু মাজাহ, হা/১৯৩৪, ১৯৩৫, ১৯৩৬)। উল্লেখ্য যে, ওমর (রা.)-এর শাসনামলের শেষ দিকে মানুষের তাড়াহুড়ার কারণে তিনি এক সাথে প্রদত্ত তিন তালাককে ‘তিন তালাক’ হিসাবে গণ্য করেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭২)। এটা ছিল তাঁর সাময়িক ও প্রশাসনিক ফরমান এবং ইজতিহাদ। অতএব আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর দিকেই ফিরে যেতে হবে।

প্রশ্ন (৩০) : মাগরিবের পরে দু’রাক‘আত সুন্নাত আদায়ের পরেও কি দু’রাক‘আত নফল পড়া যাবে

আল-আমিন আকন্দ
 গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।

উত্তর : মাগরিবের পরে দু’রাক‘আত সুন্নাত ব্যতীত অতিরিক্ত যত রাক‘আত ছালাতের বর্ণনা এসেছে তার কোনোটিই ছহীহ নয় (যঈফ তিরমিযী, হা/৪৩৫; সিলসিলা যঈফাহ, হা/৪৬৯; যঈফ ইবনে মাজাহ, হা/১১৬৭; মিশকাত, হা/১১৭৩-, ‘সুন্নাতসমূহ ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ)। সুতরাং মাগরিবের পরে কেবলমাত্র দু’রাক‘আত সুন্নাত আদায় করতে হবে (তিরমিযী, হা/ ৩৮০, ছহীহুল জামে, হা/৬৩৬২)। অন্য কোনো নফল বা সুন্নাত পড়তে হবে না। উল্লেখ্য যে, সুন্নাত ও নফল শব্দের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বরং তা একই ছালাত।

প্রশ্ন (৩১) : মৃত্যুর পরে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করে দেওয়ার জন্য, জীবিত থাকা অবস্থায় চুক্তি করে যাওয়া বৈধ হবে কি

আওয়াল হোসেন
নবাবগঞ্জ-১৩২০, ঢাকা।

উত্তর : অর্থনৈতিক বিনিময়ের শর্তে এ ধরনের চুক্তি কিংবা অছিয়ত শরী‘আতসম্মত নয়। এতে আদম সন্তানের মানের হানি হয়।

যা পাপের অন্তর্ভুক্ত। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছা.)  বলেন, ‘মৃতের হাড় ভাঙা জীবিতদের হাড় ভাঙার মতোই’ (আবুদাঊদ, হা/৩২০৭; মিশকাত, হা/১৭১৪; বুলূগুল মারাম, হা/৫৯৯)। এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, জীবিত মানুষের অঙ্গহানী করলে যেমন পাপ হয়, মৃত মানুষের অঙ্গহানী করলেও তেমন পাপ হয়। তবে মৃত মানুষের অঙ্গ জীবিত মানুষকে দেওয়া যেতে পারে নিম্নোক্ত শর্তানুসারে (১) কোনো প্রকার অর্থনৈতিক বিনিময় থাকা যাবে না। (২) জীবিত লোকটির বাঁচার সম্ভাবনা থাকলে (৩) মৃত ব্যক্তির মরণপূর্ব অনুমতি থাকলে (৪) গ্রহীতা রাযী ও খুশি থাকলে (৫) উক্ত অঙ্গ ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা নেই প্রমাণিত হলে এবং (৬) দক্ষ ডাক্তার এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলে (আল-ফিক্বহুল ইসলাম, পৃ. ১১০; বাক্বারাহ ১৭৩)।

প্রশ্ন (৩২) : বাড়ি ভাড়া বাবদ অগ্রিম টাকা নিয়ে প্রতি মাসে মাসিক ভাড়া বাবদ তা কর্তন করা হলে সূদের অন্তর্ভুক্ত হবে কি

মাহাদী হাসান
চট্টগ্রাম সদর।

উত্তর : এখানে কোনো বর্ধিত পয়সা গ্রহণ করা হয় না এবং কোনো প্রকার যুলুম বা অত্যাচার ও প্রতারণা নেই। সুতরাং উভয়ের সম্মতিতে এমন লেনদেন করলে তা বৈধ হবে। কেননা, এখানে প্রাপ্য অংশই নেওয়া হচ্ছে এবং ভোক্তা পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই (ইবনে মাজাহ, হা/ ২৩৪০, মুসনাদে আহমাদ, হা/২৮৬৭)।

প্রশ্ন (৩৩) : আমার স্ত্রী বেশির ভাগ সময়ই রাগারাগি ও চেঁচামেচি করে। সে আমার কথা শুনে না। এমতাবস্থায় তাকে তালাক দিলে কি পাপ হবে?

ইবাদুল্লাহ মিয়া
মিরপুর, কুষ্টিয়া।

উত্তর : এমতাবস্থায় তাকে বারবার উপদেশ দিতে হবে। তার শয্যা পৃথক করে দিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষামূলক কিছু শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। তবে সর্বপ্রকার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলে বিচ্ছেদের চিন্তা করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা পৃথক করো এবং প্রহার করো। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়, তবে তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করো না’ (নিসা, ৩৪)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছা.)  বলেছেন, ‘মহিলাদের (স্ত্রীদের) প্রতি ভালো উপদেশ দাও। এ কারণে যে, তারা বক্র হাড্ডি হতে সৃষ্টি এবং সবচেয়ে বক্র উপরের পাজরের আস্থি। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও তবে ভেঙে ফেলবে, আর ছেড়ে দিলে সর্বদা বাঁকা থাকবে। অতএব, স্ত্রীদের উপদেশ দিতে থাকবে (বুখারী, হা/৫১৮৬; মুসলিম, হা/১৪৬৮; মিশাকাত, হা/৩২৩৮)।  এই আয়াত ও হাদীছ প্রমাণ করে যে, উল্লিখিত সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা প্রয়োগের পরও যদি স্ত্রী তাতে সংশোধন না হয়, তাহলে শরী‘আতসম্মত পদ্ধতিতে তাকে তালাক দিতে হবে। এতে কোনো পাপ হবে না। উল্লেখ্য, যে কোনো উপায়ে স্বামীকে কষ্ট দেওয়া নিন্দিত ও গর্হিত। এর জন্য জান্নাতের হূররা উক্ত স্ত্রীরর জন্য বদ দু‘আ করেন (তিরমিযী, হা/১১৭৪; ইবনু মাজাহ, হা/২০১৪)। আর অবাধ্য স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূল (ছা.)  কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন (সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৮৮)।

প্রশ্ন (৩৪) : নানার ভাইয়ের মেয়েকে বিবাহ করা যাবে কি

নাজিরুল ইসলাম
কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।

উত্তর : নানার ভাইয়ের মেয়ে তথা মায়ের চাচার মেয়েকে বিবাহ করা যাবে (আহযাব, ৫০)। কেননা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে যাদেরকে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন, নানার ভাইয়ের মেয়ে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় (নিসা, ২৩)।

প্রশ্ন (৩৫) : যায়েদ ইবনু আরক্বাম (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেছেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তাকে শক্ত করে ধরে রাখো তবে আমার পরে তোমরা আর কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তার মধ্যে একটি আরেকটি অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো আল্লাহর কিতাব। তা একটি লম্বা রশি সদৃশ, যা আকাশ হতে যমীন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ। আর দ্বিতীয়টি হলো, আমার আপন আহলে বায়ত। এই বস্তু দু’টি কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না। অবশেষে তারা হাউযে কাউছারে আমার সাথে মিলিত হবে। সুতরাং তোমরা তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করছ তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখবে? (তিরমিযী, হা/৩৭৮৮)। তিরমিযীতে বর্ণিত উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যা কী

আ. হামিদ
গাজীপুর সদর।

উত্তর : ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি যদি তোমরা তা শক্তভাবে ধারণ করো তাহলে পথভ্রষ্ট হবে না’-মর্মে রাসূল (ছা.)  হতে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। এক. কুরআন এবং আমার সুন্নাত। দুই. কুরআন এবং আমার পরিবার বা আহলে বায়ত। প্রথমত, যে সকল হাদীছে আহলে বায়তের কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা তাদের মর্যাদা বুঝানো হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৪০৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯২৮৫; মিশকাত, হা/৬১৩১)। দ্বিতীয়ত, রাসূল (ছা.) যে সকল হাদীছে আহলে বায়তের কথা বলেছেন, সেখানে আহলে বায়ত দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, তারা রাসূল (ছা.)-এর পরিবার, তারা রাসূল (ছা.)-এর আমল সর্ম্পকে বেশি জানেন তাই তারা যে বিষয়ে বলবেন, তা উম্মাতের জন্য গ্রহণ করা যরূরী এবং তাদের কথা প্রাধান্য প্রাপ্ত (রাওযাতুন নাযের, ১/৪৭০ পৃ.)। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহি.)  বলেন, কুরআন এবং রাসূল (ছা.)-এর পরিবার হাউযে কাউছারে মিলিত হওয়ার পূর্বে একটি আরেকটি হতে কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না। সুতরাং আহলে বায়ত কোনো বিষয়ে ঐকমত্য হলে উম্মতের জন্য তা মেনে নেওয়া ভালো। উল্লেখ্য যে, আহলে বায়তের নামে শী‘আ সমাজে যত কথা প্রচলিত আছে তার অধিকাংশই তাদের নামে বানোয়াট মিথ্যা কথা। এ ছাড়া আহলে বায়ত অর্থ শুধু আলী (রা.), ফাতেমা (রা.), হাসান (রা.), হুসাইন (রা.)-কে বুঝায় না; বরং আহলে বায়ত বলা হয়, রাসূল (ছা.)-এর মৃত্যুর পর যাদের উপর ছাদাক্বাহ হারাম ছিল তাদের সকলকেই। আর তারা হচ্ছেন রাসূল (ছা.)-এর সকল স্ত্রী, বানু আব্দিল মুত্তালিব ও বানু হাশেমের সকলেই। তথা আলে আলী, আলে আব্বাস, আলে আক্বীল, আলে জা‘ফরের সকল সদস্য আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তাদেরকে বাদ দিয়ে শুধু চারজনকে আহলে বায়ত হিসাবে গণ্য করা  আহলে বায়তকে অপমানের নামান্তর।

প্রশ্ন (৩৬) : আমি আমেরিকায় থাকাকালীন আমার স্বামীর সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এক মাসের মধ্যেই মোবাইলে তার সাথে আমার বিবাহ হয়। বাবা-মা অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরবর্তীতে তা মেনে নেয় এবং পারিবারিকভাবে আবারও বিয়ে হয়। প্রথম দিকে তার সাথে আমার ভালো কাটলেও বর্তমানে সে আমার সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে, গালি-গালাজ করে, মাঝে-মধ্যে তালাক দেওয়ারও কথা বলে; ‘আর খারাপ ব্যবহার করবে না’ মর্মে ওয়াদা করে কিন্তু দুই দিনও পার না হতে আবারও পূর্বের মতোই দুর্ব্যবহার করে। এভাবে আমি অনেক কষ্ট স্বীকার করে তার সাথে চলছি। এমন পরিস্থিতিতে আমার করণীয় কী?

সোহরা মীম
কালাই, জয়পুরহাট।

উত্তর : এমন পরিস্থিতিতে পারিবারিকভাবে সামাধান করা অধিক উত্তম। অর্থাৎ উভয় পরিবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বসে সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে। যদি সমাধান হয়ে যায় তাহলে সংসার করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তাদের মাঝে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার হতে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার হতে একজন সালিস নিযুক্ত করবে। যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তির ইচ্ছা রাখে, তাহলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে দিবেন’ (নিসা, ৩৫)। আর যদি তার এমন চরিত্র পরিবর্তন না হয়, তাহলে শরী‘আতে স্ত্রীর পক্ষ হতে খোলা তালাকের বিধান রয়েছে। সুতরাং দাম্পত্য জীবন সুখের না হলে স্ত্রী ইচ্ছে করলে খোলা করে চলে যাবে। যেমন ছাবিত ইবনু ক্বায়সের স্ত্রী করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭৩; তাহ্ক্বীক্ব মিশকাত, হা/৩২৭৪)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তাহলে তারা পরস্পর (তালাকের পথ অবলম্বন না করে) কোনো মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোনো গুনাহ নেই। বরং মীমাংসাই অধিক উত্তম’ (নিসা, ১২৮)।

প্রশ্ন (৩৭) : গ্রামীণ ব্যাংকের জনৈক কর্মকর্তা ২০২০ সালে হজ্জে যাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে জানতে পারলেন তার বেতনের টাকা দিয়ে হজ্জ হবে না। তখন তিনি তার বাবার জমি বিক্রি করে রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এখন তিনি চাকরি ছেড়ে দিবেন মর্মে সিদ্ধান্ত নেন। এমতাবস্থায় তিনি যে পেনশন পাবেন সে টাকা তার জন্য বৈধ হবে কি? তা ছাড়া তার উত্তরাধিকারের জন্য তার সম্পদ হালাল হবে কি?

আব্দদুর রউফ মন্ডল
কালাই, জয়পুরহাট।

উত্তর : সুস্পষ্ট সূদী লেনদেনের সাথে জড়িত ব্যাংকে চাকরি করা হারাম। কেননা, রাসূলুল্লাহ (ছা.)  সূদের সাথে জড়িত সকলকে অভিশপ্ত হিসাবে উল্লেখ করেছেন (মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৭২৫; জামেঊল হাদীছ, হা/১৮৩৮৩)। এমন চাকরি হতে উপার্জিত অর্থ, বেতন-ভাতা, পেনশনসহ যাবতীয় জিনিস সম্পূর্নরূপে হারাম। কেননা যে জিনিসের মূল হারাম তার উপার্জিত অর্থও হারাম। আর এটাই শরী‘আতের মূলনীতি। যেমন কুকুর ও বিড়াল হারাম এবং তার মূল্যও হারাম (আবুদাঊদ, হা/৩৪৭৯)। ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর নবী (ছা.) আসমানের দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদের ধ্বংস করুন। তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয়েছে, অথচ তারা তা বিক্রয় করে এবং তার মূল্য ভক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা যখন কোনো বস্তুকে হারাম ঘোষণা করেন, তখন তার মুল্যকেও হারাম করে দেন’ (ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৪৯৩৮)। সুতরাং তার উপার্জিত টাকা যেহেতু হারাম সেহেতু তার পেনশনও হারাম। এসব অর্থ কোনো সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে কোনো ছওয়াবের আশা ব্যতীত ব্যয় করতে হবে। কেননা, এমন সম্পদ দান করলে তা কবুল হবে না (ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৯৩)।

প্রশ্ন (৩৮) : ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাটমিন্টন ইত্যাদি খেলাধুলার সামগ্রী বিক্রি করা জায়েয কি?

সাজ্জাদ শাওন
মিরপুর, ঢাকা।

উত্তর : যে সকল খেলাধুলা সরাসরি হারাম, তার আসবাবপত্র বিক্রয় করাও হারাম। যেমন: তাস, দাবা, কেরামবোর্ড, লুডু, ক্যাসিনোর তাস ইত্যাদি। ক্রিকেট-ফুটবল যেহেতু অনেকক্ষেত্রে সমাজে জুয়া হিসাবেই আয়োজিত হয়ে থাকে সেহেতু তার সামগ্রী বিক্রয় থেকেও বিরত থাকাই ভালো। যে খেলা মানুষকে হারামের দিকে নিয়ে যেতে পারে সে জাতীয় খেলার সামগ্রী বিক্রয় করা সে হারামে সহযোগিতার নামান্তর। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পর নেকী ও তাক্বওয়ার কাজে সহযোগিতা করো অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না’ (মায়েদাহ, ২)।

প্রশ্ন (৩৯) : আহলে বায়তের নামের শেষে ‘(আ.) ’  বলা যাবে কি? কেউ কেউ এর পক্ষে ছহীহ বুখারীর ২০৮৯, ৩৭০৫, ৩৭১১, ৩৭৪৮ ও ৬৩১৮ নং হাদীছ উল্লেখ করেছেন। 

মামুনুর রশীদ
কুষ্টিয়া সদর।

উত্তর : সাধারণত নবীগণের নামের শেষে  عَلَيْهِ السَّلَامُ বলা হয় এবং ছাহাবীগণের নামের শেষে رَضِيَ اللهُ عَنْهُ  বলা হয়। কিন্তু বিভিন্ন হাদীছের পাতায় আলী, ফাতেমা, হুসাইন (রা.)-এর নামের শেষে عَلَيْهِ السَّلَامُ এর ব্যবহার দেখা যায়। এটাক পুঁজি করে অনেকে অনেক বাড়াবাড়ি করে থাকেন। যেমন, শী‘আ সম্প্রদায় ও তাদের অনুসারীরা। অথচ নবীগণ, ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে এযামসহ সকল মুমিনদের ক্ষেত্রে عَلَيْهِ السَّلَامُ বলা যেতে পারে। কেননা এমন কোনো দলীল পাওয়া যায় না যে, নির্দিষ্টভাবে শুধু আহলে বায়তের নামের পরেই عَلَيْهِ السَّلَامُ বলতে হবে। বরং তা সকল মুসলিমের ক্ষেত্রে বলা যাওয়ার পক্ষে দলীল রয়েছে। যেমন ছালাতের তাশাহুদে রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সাথে সাথে সকল মুমিন ও সৎকর্মশীল বান্দার ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে اَلسَّلاَمُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِيْنَ ‘অর্থাৎ আমাদের মুছল্লীদের উপর এবং সকল সৎকর্মশীল বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক’ (ছহীহ বুখারী, হা/৮৩১)। সুতরাং আহলে বায়তের জন্য তা খাছ করা যাবে না। বরং সকল ছাহাবীর ক্ষেত্রেও عَلَيْهِ السَّلَامُ বলা যেতে পারে (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ৬/৩৯৯ পৃ.)।

প্রশ্ন (৪০) : দু‘আ করার সময় বলা হয় যে, মুহাম্মাদ (ছা.)-এর কবর মুবারকে ছওয়াব পৌঁছে দাও। এভাবে বলা বা দু‘আ করা কি ঠিক হবে?

আওলাদ
হাতিবান্ধা, লালমণিরহাট।

উত্তর :  প্রশ্নোল্লেখিত পদ্ধতিতে দু‘আ করার বিষয়টি ভারত উপমহাদেশের বিদ‘আতীদের নবআবিস্কৃত পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ (ছা.) হতে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি মৃত্যুর পরে তাঁর কবরে ছওয়াব পৌঁছানোর ব্যাপারেও তিনি কোনো নির্দেশনা দেননি। ছাহাবীগণও এভাবে কখনো দু‘আ করেছেন মর্মে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং এমন পদ্ধতিতে দু‘আ করা হতে বিরত থাকতে হবে। অন্যথা তা বিদ‘আত হবে; যা পরিত্যাজ্য। রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন আমল করল, যে ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেছেন, مَنْ أَحْدَثَ فِىْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমার এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যাজ্য’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; মিশকাত, হা/১৪০)। উল্লেখ্য যে, দু‘আ হলো এক প্রকার ইবাদত (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৩৭৮; আবুদাঊদ, হা/১৪৭৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩৮২৮; মিশকাত, হা/২২৩০)। অতএব দু‘আ ইবাদত হিসাবে তার পদ্ধতি সুন্নাত মুতাবেক হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছা.)  কোন পদ্ধতিতে দু‘আ করেছেন, আমাদেরকে সে পদ্ধতিতেই দু‘আ করতে হবে। তার রেখে যাওয়া পদ্ধতি ছেড়ে অন্য কোনো পদ্ধতিতে দু‘আ করলে তা কবুল হওয়ার বদলে গোনাহ হবে।

প্রশ্ন (৪১) : জিহাদের ময়দান হতে পালিয়ে যাওয়া কাবীরা গুনাহ। আবার অন্য হাদীছে বলা হয়েছে, প্রতিদিন কেউ ১০০ বার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ হিল্লাযি লা ইলাহা ইল্লাহুয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ূম ওয়া আতূবু ইলায়হি’ পাঠ করলে জিহাদের ময়দান হতে পালিয়ে গেলেও তাকে মাফ করে দেওয়া হবে। এর সমাধান কী?

মুজাহিদ
সাপাহার, নওগাঁ।

উত্তর : এ কথা ঠিক যে, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা কাবীরা গুনাহ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯; মিশকাত, হা/৫২)। তবে অন্য হাদীছে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ হিল্লাযি লা ইলাহা ইল্লাহুয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ূম ওয়া আতুবু ইলায়হি’ পাঠকারীকে জিহাদের ময়দান হতে পলায়নকারীর মতো বড় পাপ ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (তিরমিযী, হা/৩৫৭৭; আবুদাঊদ, হা/১৫১৭; মিশকাত, হা/২৩৫৩)। এর সমাধান হলো, প্রথমোক্ত হাদীছ দ্বারা জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা একটি মারাত্মক বড় পাপ তা বুঝানো হয়েছে। এ ছাড়া উক্ত দু‘আটির ক্ষমতা বুঝানো হয়েছে যে, দু‘আটি প্রতিদিন ১০০ বার পাঠকারীর সকল বড় বড় পাপ আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন। পাপ যত বড়ই হোক না কেন, তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন। সুতরাং দুই হাদীছের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

প্রশ্ন (৪২) : মাসিক আল-ইতিছাম, জানুয়ারি-২০২০ সংখ্যার ৪ পৃষ্ঠায় ইমাম আবু হানীফা (রাহি.) ও অন্যান্য ছাহাবী হ হতে এক রাক‘আত বিতর ছালাত আদায়ের বিপক্ষের বর্ণনাগুলোকে জাল বলা হয়েছে। উক্ত দাবীর পক্ষে দলীলগুলোর তাহক্বীক্ব জানতে চাই?

সিরাজুল ইসলাম
মিরপুর-১, ঢাকা।

উত্তর : ‘এক রাক‘আত বিতর পড়া যাবে না’ মর্মে বর্ণিত সকল হাদীছ দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। সাথে সাথে আল-ইতিছামের জানুয়ারি-২০২০ সংখ্যার দাবীও সঠিক। হেদায়া ২/১৮৪ পৃষ্টায় এমর্মে বর্ণিত হাদীছটি নিতান্তই দুর্বল। ইবনে হাজার আসক্বালী (রাহি.)  ‘আদ-দেরায়া ফী তাখরীজে আহাদীছিল হিদায়া’ নামক গ্রন্থে বলেন, হাদীছের সনদে ওছমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে রাবি‘আ নামক একজন রাবী রয়েছেন, যিনি দুর্বল (আদ-দেরায়া ফী তাখরীজে আহাদীছিল হিদায়া, ১/১৯২, ২০৮ পৃ.)। জামালুদ্দীন আয-যায়লাঈ তার লিখিত কিতাব ‘নাসবুর রায়া’ নামক গ্রন্থে বলেন, ইমাম নববী (রাহি.)  বলেছেন, এক রাক‘আত বিতর পড়া হতে নিষেধ মর্মে বর্ণিত  মুহাম্মাদ ইবনে কা‘ব এর হাদীছ দুর্বল এবং মুরসাল। ছহীহ  সনদে আমি তা পাইনি (নাসবুর রায়া, ২/১৭৩ পৃ.)। মুওয়াত্ত্বা মালেকের মুহাক্কিক্ব তাক্বীউদ্দীন নদবী (রাহি.)  উক্ত হাদীছের তাহক্বীক্বে বলেন, ওছমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে রাবি‘আর হাদীছে ওহাম বা সন্দেহ রয়েছে (মুওয়াত্ত্বা মালেক, ২/১৫ পৃ. টীকা)। তিনি আরও বলেন, এক রাক‘আত বিতর পড়া যাবে না মর্মে বর্ণিত হাদীছে ‘বুতায়রা’ শব্দটি এক রাক‘আত হাদীছ নিষিদ্ধ করে না। বরং বুতায়রা এর অর্থ ভিন্ন যা, ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং ছহীহ হাদীছে বুতায়রা বলতে যা বুঝানো হয়েছে তা এক রাক‘আত নিষিদ্ধ নয় বরং  ছহীহ হাদীছে যে বুতায়রা বুঝানো হয়েছে তা হলো, মানুষ এক রাক‘আত ছালাত সুন্দরভাবে পড়বে এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে খুব তাড়াতাড়ি রুকূ, সিজদা, ক্বিয়াম করবে। আর এটাকেই হাদীছে বুতায়রা বলা হয়েছে (মু‘জামুল কাবীর, হা/৪৯৮৫; মিরআতুল মাফাতিহ, ৪/২৬১ পৃ.)। সুতরাং আরও বুঝা গেল যে, উক্ত হাদীছটি ছহীহ হাদীছের বিরোধী এবং বিকৃত অর্থজ্ঞাপক। ছহীহ হাদীছের বিপরীতে দুর্বল হাদীছ দলীল হতে পারে না। তাই উক্ত হাদীছটি প্রত্যাখ্যাত।

প্রশ্ন (৪৩) : সরকারকে ট্যাক্স না দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা বৈধ হবে কি?

আব্দুর রাকীব
কালাই, জয়পুরহাট।

উত্তর : সরকারের কোনো আইন ইসলামী আইন বিরোধী না হলে এবং জনকল্যাণকর হলে সে আইন মেনে চলাই কর্তব্য (আবুদাঊদ, হা/২৬২৬; তিরমিযী, হা/৩৭০৭)। অতএব, জাতীয় রাজস্ব আয়ের মাধ্যম হিসাবে সরকারীভাবে যে ট্যাক্স ধার্য করা হয়, তা ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা ঠিক হবে না। কেননা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ মানেই জনস্বার্থ। আর জনস্বার্থের ক্ষতি করা ইসলাম অনুমোদন করে না। সাধারণভাবে একজন ঈমানদার ব্যক্তি কখনো অন্যের ক্ষতিসাধন করে আপন স্বার্থ হাছিল করতে পারে না। সুতরাং এ ধরনের অপরাধ করা হতে বিরত থাকতে হবে। তবে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিগ্রস্থ সিস্টেমের কারণে মানুষ সঠিক ট্যাক্স দিতে চাইলেও দিতে পারে না সেক্ষেত্রে এর দায়ভার রাষ্ট্রের উপর বর্তাবে। সাধ্যের বাহিরে কোনো কাজের জন্য মানুষ আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসিত হবে না।

প্রশ্ন (৪৪) : যারা নেশা করে আবার ছালাতও আদায় করে তাদের ছালাত কবুল হবে কি

মুবারক
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : সকল প্রকার নেশাজাত দ্রব্য হারাম। রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেন, كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ ‘সকল নেশাজাত দ্রব্য মদ এবং সকল নেশাজাত দ্রব্য হারাম’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২০০৩; মিশকাত, হা/৩৬৩৯)। তিনি আরও বলেন, مَا أَسْكَرَ كَثِيْرُهُ فَقَلِيْلُهُ حَرَامٌ ‘যা বেশি খেলে মাদকতা আনে, তার কমটাও হারাম’ (তিরমিযী, হা/১৮৬৫; আবুদাঊদ, হা/৩৬৮১; ইবনু মাজাহ, হা/৩৩৯৩; মিশকাত, হা/৩৬৪৫)। এমতাবস্থায় ছালাত আদায় করলে তা কবুল হবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সে ছালাত ছেড়ে দিবে। নেশা করা অবস্থাতেও তাকে ছালাত আদায় করতে হবে। নেশার কারণে ছালাত কবুল নাহলেও সে ছালাত পরিত্যাগ করার গুনাহ থেকে বেচে যাবে। শুধু তাই নয়; এমন ব্যক্তি নিয়মিত ছালাত আদায় করতে থাকলে নেশাসহ যেসব অন্যায় তার মধ্যে আছে মহান আল্লাহ সেগুলো দূর করে দিবেন ইনশাআল্লাহ। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই ছালাত যাবতীয় অশ্লীল ও পাপ কাজ হতে বিরত রাখে’ (আনকাবূত, ৭৫)। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, একজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট এসে বলল, অমুক ব্যক্তি রাতে ছালাত আদায় করে আর সকালে চুরি করে। তিনি বললেন, তুমি যা বলছ অচিরেই তার ছালাত তাকে এ অন্যায় হতে বিরত রাখবে (মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৭৭৭, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/১২৩৭; ইবনে কাছীর, সূরা আনকাবূত ৪৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.)।

প্রশ্ন (৪৫) : অশ্লীল পোশাক তৈরি করা হয় এমন গার্মেন্টসে চাকরি করা যাবে কি

আরীফ সরকার
বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : না, এমন পোশাক কারখানায় চাকরি করা যাবে না। কেননা এতে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হবে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পর নেকী ও তাক্বওয়ার কাজে সহযোগিতা করো অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না’ (মায়েদাহ, ২)।

প্রশ্ন (৪৬) : আমি নিজে কুরআন-হাদীছ সম্পর্কে অভিজ্ঞ নই। কিন্তু যদি নির্ভরযোগ্য কোনো বক্তার বক্তৃতা শুনে কোনো ধর্মীয় তথ্য/মতামত অন্যের নিকটে পেশ করি তাহলে কি পাপ হবে?  

আব্দুছ ছবুর
উপযেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : না, পাপ হবে না। তবে এক্ষেত্রে ছহীহ দলীলসহকারে দাওয়াত দিতে হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তা তদন্ত না করে বর্ণনা করবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫; মিশকাত, হা/১৫৬)। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) বলেন, রাসূল (ছা.)  বলেছেন, ‘একটি আয়াত (কথা) হলেও তোমরা আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও। আর বানী ইসরাঈলদের কাহিনী বর্ণনা করতে পারো তাতে সমস্যা নেই। তবে কেউ যদি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করে, তাহলে সে যেন তার স্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১; মিশকাত, হা/১৯৮)।

প্রশ্ন (৪৭) : দরূদে ইবরাহীম পাঠের পূর্বে কি বিসমিল্লাহ পড়তে হবে?

আব্দুছ ছবুর
 উপযেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : না, দরূদে ইবরাহীম পাঠের পূর্বে বিসমিল্লাহ পড়তে হবে না। কেননা তা রাসূলুল্লাহ (ছা.) থেকে প্রমাণিত নয়। বরং তিনি আমাদেরকে যেভাবে পড়তে বলেছেন সেভাবেই পড়তে হবে। আবু মূসা ইবনে ত্বালহা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ছা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার উপর কীভাবে দরূদ পড়ব? তিনি বললেন, এভাবে পড়বে-

اَللهم صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَّعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ- اَللهم بَارِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَّعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى  إِبْرَاهِيْمَ  وَعَلٰى آلِ  إِبْرَاهِيْمَ  إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ.

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ছাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা ছাল্লায়তা ‘আলা ইবরা-হীমা ওয়া ‘আলা আ-লি ইব্রা-হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লা-হুম্মা বা-রিক ‘আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা বা-রক্তা ‘আলা ইব্রা-হীমা ওয়া ‘আলা আ-লি ইব্রা-হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি রহমত বর্ষণ করুন মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপরে, যেমন আপনি রহমত বর্ষণ করেছেন ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবারের উপরে। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপরে, যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছেন ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবারের উপরে। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত (ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪০৬; মিশকাত, হা/৯১৯)।

প্রশ্ন (৪৮) : পানির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ অসুখ বৃদ্ধির আশঙ্কা হেতু ফরয গোসল করতে না পারে, তাহলে কি ছালাত ক্বাযা করবে, না-কি তায়াম্মুম করে ছালাত আদায় করবে

শহীদুল্লাহ
বংশাল, ঢাকা।

উত্তর : পানি ব্যবহারে রোগ বৃদ্ধির ভয় থাকলে তায়াম্মুম করে ছালাত আদায় করবে। ক্বাযা করার সুযোগ নাই। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কোনো এক সফরে বের হলাম। আমাদের একজনের মাথায় পাথর লেগে মাথা ফেটে যায়। অতঃপর তার স্বপ্নদোষ হয়। সে তার সাথীদের জিজ্ঞেস করে, তয়াম্মুম করতে পারবে কি-না? তারা বলে, না, আপনি তো পানি ব্যবহার করতে সক্ষম। সে গোসল করে নেয় এবং মারা যায়। রাসূল (ছা.) এ খবর শুনতে পেলে বলে উঠে, তারা তাকে হত্যা করেছে। সে তায়াম্মুম করলেই যথেষ্ট হতো’ (আবুদাঊদ, হা/৩৩৫; মিশকাত, হা/৫৩১)। এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয়, গোসলের কারণে রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলে তায়াম্মুম করতে হবে।

প্রশ্ন (৪৯) : রাসূল (ছা.) পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে যাওয়ার পর যোহরের পূর্বে চার রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন। প্রশ্ন হলো উক্ত চার রাক‘আত ছালাত দুই দুই রাক‘আত করে আদায় করতে হবে? না-কি এক সালামেই চার রাক‘আত আদায় করতে হবে?

শামীম হোসেন
বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : যোহরের পূর্বে চার রাক‘আত সুন্নাত এক সালামে পড়া যায়। রাসূল (ছা.) বলেন, ‘যোহরের পূর্বে চার রাক‘আত সুন্নাত, যার মাঝে কোনো সালাম নেই’ (আবুদাঊদ, হা/১২৭০; তিরমিযী, হা/৪৭৮)। তবে উক্ত চার রাক‘আত ছালাত দুই সালামেও পড়া যায় (ইবনু মাজাহ, হা/১১৬১; নাসাঈ, হা/৮৬৪; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৩৭)।

প্রশ্ন (৫০) : রজব ও শা‘বান মাসে নির্দিষ্টভাবে কোনো দু‘আ পড়ার বিধান হাদীছে আছে কি?

মারুফুল ইসলাম
তানোর, রাজশাহী।

উত্তর : রজব ও শা‘বান মাসে নির্দিষ্টভাবে কোনো দু‘আ পড়ার কথা হাদীছের গ্রন্থে বিশুদ্ধ কোনো সূত্রে বর্ণিত হয়নি। তবে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছা.) রজব ও শা‘বান মাস আসলে এই দু‘আ পাঠ করতেন- اَللهم هم بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের রজব ও শা‘বান মাসে বরকত দান করো এবং রামাযান মাসে পৌঁছে দাও’ (শু‘আবুল ঈমান, হ/২৮১৫; যঈফুল জামে‘, হা/৪৩৯৫; মিশকাত, হা/১৩৬৯)। কিন্তু এই হাদীছের সনদে যিয়াদ আন-নুমাইরী নামক একজন রাবী আছেন। ইবনে মাঈন তাকে দুর্বল রাবী বলেছেন। যার কারণে হাদীছটি গ্রহণযোগ্য নয় (তাহযীবুত তাহযীব, ১/৬৫০)।