সত্যিকারের সুপারস্টার কে?

-তৌফিক ইসলাম
ছাত্র, হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,
দিনাজপুর।

ভূমিকা : সুপারস্টার কথাটি শুনলেই আমাদের স্মৃতিতে ভেসে আসে নায়ক-নায়িকা, শিল্পী, খেলোয়াড় ইত্যাদির কথা। কিন্তু আসল সুপারস্টার কে? মানুষের জীবনের ২টি স্তর আছে। একটি হলো ইহকাল বা দুনিয়াবী জীবন, যা খুবই অল্প সময়ের আর অপর জীবনটি হলো আখিরাত বা পরকাল, যা স্থায়ী জীবন। প্রকৃত সুপারস্টার সে, যে অল্প সময়ের জীবনের চেয়ে বা দুনিয়াবী জীবনের চেয়ে চিরস্থায়ী জীবন বা আখিরাতের জীবনকে গুরুত্ব দেয়। আর যারা বেশি স্থায়ী জিনিসের বদলে তুচ্ছ ক্ষণস্থায়ী জিনিসকে মূল্যায়ন করে, তারা যতই নামে শিক্ষিত হোক না কেন, যতই ডিগ্রিধারী হোক না কেন, কোনো মানুষই তাকে চালাক বা সুপারস্টার বলবে না। যেমন- একটি সেগুনকাঠ দ্বারা তৈরি চেয়ার ও আরেকটি আমকাঠ দ্বারা তৈরি চেয়ার আছে। এখন যে ব্যক্তি স্বল্পস্থায়ী আমকাঠের চেয়ারকে দীর্ঘস্থায়ী সেগুনকাঠের চেয়ারের চেয়ে বেশি পসন্দ করবে, সে শিক্ষিত হলেও সত্যিকার বিবেকবান শিক্ষিত বা সুপারস্টার হতে পারে না। তাই সত্যিকারের সুপারস্টার তারাই, যারা কষ্ট হলেও ক্ষণস্থায়ী জীবনের চেয়ে চিরস্থায়ী জীবনকে বেশি গুরত্ব দেন। এখন আমাদের সমাজের মানুষ কাদেরকে সুপারস্টার ভাবে, তা আলোচনা করা যাক।

অনেকের ধারণায় সুপারস্টার হলো নায়ক-নায়িকা : অনেক কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীকে তাদের প্রিয় মানুষ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাদের অধিকাংশই হয়তোবা বলবে কোনো নায়ক-নায়িকার কথা। কিন্তু তারা কি আসলেই সুপারস্টার?

রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘মানুষের দু’চোখের যেনা হলো দেখা, দু’কানের যেনা হলো শোনা, জিহ্বার যেনা হলো কথা বলা, হাতের যেনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের যেনা হলো যেনার পথে চলা, অন্তরের যেনা আকাক্সক্ষা করা। লজ্জাস্থান তার সত্য-মিথ্যা প্রমাণ করে’।[1]   আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا ‘তোমরা যেনার নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ’ (বনী ইসরাঈল, ৩২)।

সুধী পাঠক! বলুন তো, নায়ক-নায়িকারা যারা অভিনয় করে, উপরের হাদীছ অনুযায়ী তারা কি যেনাকারীর অন্তর্ভুক্ত হয় না? আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী অনুযায়ী, যেনা হলো অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ। তাহলে যারা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথে আছে, তারা আপনার সুপারস্টার হয় কী করে? আসুন! আমরা তাদের মতো হতে না চেয়ে বরং সেই সব নায়ক-নায়িকা ভাই-বোনদের জন্য দু‘আ করি, তারা যেন এই অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ থেকে আল্লাহর পথে ফিরে আসে।

অনেকের ধারণায় সুপারস্টার হলো কণ্ঠশিল্পী বা গায়ক-গায়িকা : তথাকথিত আধুনিক ছেলে-মেয়েদের অনেকেই আজ গান-বাজনায় মেতে থাকে। তাদের অনেকেরই মনের মানুষ বিভিন্ন নামকরা কণ্ঠশিল্পী। শুধু ছেলে-মেয়েই নয়, অনেক পিতা-মাতার আফসোস দেখে আমার  খুব লজ্জা ও দুঃখ লাগে, যারা বলে, আমাদের ছেলে-মেয়েটা যদি ঐ শিল্পীর মতো নামকরা শিল্পী হতো? আজ বাবা-মা ছেলে-মেয়েদেরকে ছোট থেকে গান-বাজনা ও নাচের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দিচ্ছে। আবু উমামা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা গায়িকা বা নর্তকীদের বিক্রয় করো না, তাদের ক্রয় করো না, তাদেরকে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র শিখিয়ে দিয়ো না। তাদের উপার্জন হারাম’।[2]  আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ অনুযায়ী গান-বাজনা শেখা হারাম। যারা গান-বাজনা শেখায়, তাদের উপার্জন হারাম। তাহলে কীভাবে আজ সমাজে গায়ক-গায়িকারা সুপারস্টার হতে পারে? সম্মানিত অভিভাবক! বিবেকবান মানুষ হয়ে আপনারা কেন আপনাদের ছেলে-মেয়েকে হারামের পথে ধাবিত হতে সাহায্য করছেন?! আমরা ছেলে-মেয়েরা গান-বাজনা হারাম শোনার পরেও কীভাবে নিজেদেরকে দিন দিন হারামের পথে ধাবিত করছি? বরং ঐসব গায়ক-গায়িকাদের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করি, আল্লাহ তাদেরকে সহ আমাদেরকে যেন সঠিক পথ দেখান।

অনেকের ধারণায় সুপারস্টার হলো খেলোয়াড়েরা :

ছেলে-মেয়েরা বিশেষ করে ছেলেরা আজ খেলোয়াড়দের খুবই ভক্ত। তারা তাদেরকে এতই ভালোবাসে বা সুপারস্টার মনে করে যে, তাদের চুলের স্টাইল, পোশাকের স্টাইলসহ অনেক ব্যাপারেই তাদের অনুকরণ করছে। এমনকি তাদের বাড়ীর ছাদে ঐসব খেলোয়াড়ের দেশের পতাকাও রেখেছে এবং ঘরে তাদের ছবিকেও সাজিয়ে রেখেছে। আমরা বৈধ খেলাধুলাকে নিষেধ বলিনি, কিন্তু এসব আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় কি আসলেই সুপারস্টার? পুরুষদের পোশাক পরার বিধান বা লজ্জাশীলতার অন্তর্ভুক্ত হলো নাভি হতে হাঁটু পর্যন্ত।

এখন ফুটবল খেলোয়াড়দের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তারা হাফপ্যান্ট পরে খেলে, যা হাঁটুর উপরে থাকে। তাহলে একজন মুসলিম ছেলে-মেয়ে হয়ে কীভাবে তাদেরকে আমরা সুপারস্টার বলতে পারি কিংবা তাদের মতো হতে চাই? আর আমার মুসলিম ভাইয়েরা, যারা আজ অনেকে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলোয়াড়কে মনের আসনে বসিয়েছি, তাদের মধ্যে কি ইসলামের একটুও আদর্শ আছে? যারা বিপথগামী আমরা কীভাবে তাদেরকে সুপারস্টার ভেবে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাই?

এবার ক্রিকেটারদের কথা বলি। একজন ক্রিকেটারকে কীভাবে আপনি সুপারস্টার বিবেচনা করতে পারেন, যার মধ্যে ইসলামী আদর্শের লেশমাত্র নেই? টাখনুর নীচে পোষাক পরাই যার স্টাইল, সে আপনার মডেল হয় কী করে?! অথচ হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَنْظُرُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا ‘যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত তার কাপড় টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে রহমতের দৃষ্টি দিবেন না’।[3]

তাছাড়া তাদের এসব খেলা খেলতে গিয়ে অযথা অনেক সময়ের অপচয় হয়। যার ফলে তারা আল্লাহ প্রদত্ত হুকুম ছালাত পড়তে পারে না বা অনেকে সঠিক সময়ে পড়তে পারে না। উপরন্তু এসব খেলাধুলায় জুয়ার ছড়াছড়ি তো আছেই। তাহলে আজকে যারা বিপথগামী আছে, তাদের মতো হওয়ার জন্য আমাদের মন এত ব্যাকুল কেন? আপনিও কী বিপথগামী হয়ে আপনার স্থায়ী পরকালের যিন্দেগী কষ্টে ভোগ করতে চান? আমরা খেলোয়াড়দের জন্য এতটুকু অন্তত দু‘আ করি, আল্লাহ যেন তাদেরকে সঠিক পথ দেখান।

আরও অনেকের ধারণায় অনেক রকমের সুপারস্টার থাকতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, যাদের মধ্যে ইসলামী আদর্শের লেশমাত্র নেই, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ঘৃণা করেন, তাদেরকে বিবেকবান মানুষেরা অনুসরণীয় বা সুপারস্টার ভাবতে পারে না। বরং আমরা তাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করি, যেন তিনি তাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। এবার দেখা যাক, সত্যিকার সুপারস্টার কে?

সত্যিকারের সুপারস্টার হলো সে, আল্লাহ যার উপর সন্তুষ্ট :

সত্যিকারের সুপারস্টার তো সেই, যাকে আল্লাহ তা‘আলা পসন্দ করেন। সত্যিকার মডেল সে, যার মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أحسنَكم أَخْلَاقًا ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বাপেক্ষা উত্তম, যে চরিত্রের দিক দিয়ে উত্তম’।[4]  আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ‘নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে অধিক আল্লাহভীরু’ (আল-হুজুরাত, ১৩)। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন লোকটি সর্বাপেক্ষা সম্মানিত? তিনি বলেন, أَكْرَمُهُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاهُمْ ‘যে লোক আল্লাহকে বেশি ভয় করে বা তাক্বওয়াশীল সেই সর্বাপেক্ষা সম্মানিত।[5]

উপসংহার : উপরের কুরআন ও হাদীছের বাণী হতে স্পষ্টভাবে বলা যায়, যেসব ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং যার চরিত্র ভালো, সে যতই অশিক্ষিত হোক না কেন, সে যতই গরীব হোক না কেন, সে ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট সম্মানিত এবং সে ব্যক্তিই সত্যিকারের সুপারস্টার। তাই আমাদের মনের সুপারস্টার হবে তো সেই, যে আল্লাহকে ভয় করে এবং যার চরিত্র সুন্দর। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সত্যিকারের সুপারস্টার তথা আল্লাহকে ভয় করা এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৭; মিশকাত, হা/৮৬, ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[2]. ইবনে মাজাহ, হা/২১৬৮; মিশকাত, হা/২৭৮০।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৪২; মিশকাত, হা/৪৩১১।

  1. ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৫৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩২১; মিশকাত, হা/৫০৭৫।
  2. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৭৮; মিশকাত, হা/৪৮৯৩।