সন্ত্রাসী কারা?

সাঈদুর রহমান

শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ,
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ |

‘সন্ত্রাসী’ এমন একটি শব্দ, যা শুনলেই মনের মাঝে ভীতি সঞ্চারিত হয়, মনের অজান্তেই গায়ের পশম খাড়া হয়ে যায়। কারণ সাধারণত মানুষ সন্ত্রাসী বলতে এমন ব্যক্তিকে বুঝে থাকে, যার মনে কোনো ধরনের মায়া-মমতা নেই, শুধু আছে হিংস্রতা ও পৈশাচিক আচার-আচরণ। পাশ্চাত্যবাদীরা বর্তমানে এ কুৎসিত শব্দটি মুসলিমদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকে। মুসলিমরা কি আসলেই সন্ত্রাসী? তাদের ধর্ম ও ধর্মীয় গ্রন্থ কি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অনুপ্রাণিত করে? মানুষের জানের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ইসলামের ধর্মীয় গ্রন্থ আল-কুরআন বলছে,

مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا

‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করল অথবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করল, সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে রক্ষা করল, সে যেন সমস্ত মানুষকে রক্ষা করল’ (মায়েদাহ, ৩২)।

দেখুন, যে ধর্মের গ্রন্থ একথা বলতে পারে, সে ধর্মের অনুসারীরা কি সন্ত্রাসী হতে পারে? কখনই না। একথা কল্পনাও করা যায় না। সুধী পাঠক! সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার জন্য ইসলাম যে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেগুলোর প্রতি একটু লক্ষ্য করুন:

(১) ইসলামের নিয়ম হচ্ছে, কেউ যদি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তাহলে শাস্তিস্বরূপ তাকেও যথা নিয়মে হত্যা করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘হে জ্ঞানী সম্প্রদায়! ক্বিছাছ (প্রতিশোধ) গ্রহণে তোমাদের জন্য জীবন আছে যেন তোমরা আল্লাহভীরু হও’ (বাকারাহ, ১৭৯)।

কেউ যদি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তাহলে মুসলিম শাসক তাকেও ‘হদ’স্বরূপ হত্যা করবে। যদি এ শাস্তি কেউ প্রত্যক্ষ করে, তাহলে এই ধরনের জঘন্য কর্মে কখনই কোনো ব্যক্তি করতে সাহস পাবে না। এজন্যই তো আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘হত্যা করাতে জীবন রয়েছে’ (প্রাগুক্ত)।

(২) ইসলাম রাষ্ট্রদ্রোহী, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের সতর্ক করে বলেছে,

إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ

‘যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে যুদ্ধ করবে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, তাদের প্রতিদান হলো তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কর্তন করা হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে’ (মায়েদাহ, ৩৩)।

দেখুন! এখানে আল্লাহ তা‘আলা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধ করার জন্য চারটি শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন:

(এক) যদি কেউ কাউকে হত্যা করার মাধ্যমে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাহলে তাকেও শাস্তিস্বরূপ হত্যা করতে হবে।

(দুই) যদি কেউ কাউকে হত্যা করে ও ঐ ব্যক্তির মাল-সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে তাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করতে হবে।

(তিন) যদি কেউ কাউকে হত্যা করা ব্যতীত শুধু ওই ব্যক্তির মাল-সম্পদ জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে তার শাস্তি হলো বিপরীত দিক থেকে তার হাত-পা কর্তন করতে হবে।

(চার) কেউ যদি কাউকে ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে ওই দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে এত সুন্দর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও যদি কেউ মুসলিমদের সন্ত্রাসী বলে, তাহলে বুঝতে হবে ‘ডাল মেঁ কুচ কালা হ্যায়’। ইসলাম হচ্ছে মায়া-মমতার ধর্ম। মানবাধিকার রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইসলাম, যা অন্য কোনো ধর্ম পালন করেনি। ইসলাম এমন একটি ধর্মের নাম, যেখানে বিড়ালকে কষ্ট দিয়ে হত্যা করার কারণে জাহান্নামে যেতে হয়। তাহলে মানুষকে হত্যা করার তো প্রশ্নই উঠে না! ইসলাম এমন এক ধর্মের নাম যেখানে কুকুরকে পানি পান করিয়ে বেশ্যা জান্নাতে চলে যায়।[1]

ইসলামের নবী (ছাঃ) প্রত্যেক প্রাণীর উপর অনুগ্রহ করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জিনিসের উপর অনুগ্রহ নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যদি তোমরা হত্যা করো, তাহলে হত্যার ক্ষেত্রে অনুগ্রহ করো। আর যদি জবাই করো, তাহলে জবাইয়ের ক্ষেত্রে অনুগ্রহ করো’।[2]   মুসলিমদের নবী (ছাঃ) অধীনস্থদের সাথে সদাচরণ করতে বলেছেন। শুধু তাই নয়; তিনি অসুস্থ অমুসলিম ছেলেকেও দেখতে গেছেন।[3]  তিনি মানবতার ক্ষেত্রে এমন উদার ছিলেন যে, যুদ্ধের ময়দানে শত্রুদের ঘরবাড়ী ভস্মীভূত করতে নিষেধ করতেন, গাছপালা কর্তন করতে নিষেধ করতেন, শিশু ও বৃদ্ধ, নারী ও ধর্মযাজকদের হত্যা করতে নিষেধ করতেন এবং যুদ্ধের ময়দানে শত্রুদের বিকলাঙ্গ করতে নিষেধ করতেন।[4]

আল্লাহ তা‘আলা হিন্দুদের মূর্তি এবং যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করে তাদেরকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন (আন‘আম, ১০৮)। রাসূল (ছাঃ) অমুসলিমদের হত্যা করা সম্বন্ধে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না, যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ ৪০ বছরের দূরত্বের পথ থেকে পাওয়া যায়’।[5]

রাসূল (ছাঃ) কত বড় কথা বলেছেন! কিন্তু আফসোস করে বলতে হয় যে, মুসলিমদেরকে তাদের ধর্মীয় উৎসবে সাধারণ গরু জবাই করার কারণে প্রাণ দিতে হয়। অমুসলিমরা তাদের ধর্ম থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করেছে? তাদের ধর্ম কি মানুষ হত্যা করার জন্য উৎসাহিত করে? তাদের নিকট একজন মানুষের চেয়ে গরুর মর্যাদা কি বেশি?

সুধী পাঠক! দেখুন ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে ইবাদতের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু যারা মুসলিমদের সন্ত্রাসী বলে, তারা তো এ সুযোগ দেয়নি। মুসলিমরা ভুলে যায়নি ১৫ মার্চ, শুক্রবার ২০১৯ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির কথা। সেখানে এক শ্বেতাঙ্গ অমুসলিম কর্তৃক ৫০ জন মুসলিম শহীদ হন এবং ৪০ জন আহত হন, যার নাম ছিল ব্রেন্টন ট্যারান্ট। ওই সন্ত্রাসী মসজিদে প্রকাশ্যে ঢুকে মুছল্লীদের গুলি করে শহীদ করে। ওই ব্যক্তি কি কোনো মুসলিম ছিল? এমনিভাবে ৩ আগস্ট, ২০১৯ শ্বেতাঙ্গ এক বন্দুকধারী কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ওয়ালমার্টের একটি দোকানে ২০ জন লোক প্রাণ হারায় এবং ২৪ জন আহত হয়।[6]  ওই বন্দুকধারী কি কোনো মুসলিম ছিল? বর্তমানে সারা বিশ্বেই অমুসলিমরা মুসলিমদেরকে নির্যাতন করছে, রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করেছে, ফিলিস্তীনীদের নির্দ্বিধায় হত্যা করছে, কাশ্মীরীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। নতুন করে আসামের মুসলিমদের স্বীয় দেশ থেকে বহিষ্কার করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। কোথায় আজ জাতিসংঘ? কিসের জন্য জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে? জাতিসংঘ কার স্বার্থে? আজ যদি এসকল নির্যাতন কোনো অমুসলিমদের উপর করা হতো, তাহলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া হতো। জাতিসংঘ হয়তো সাথে সাথে ওই দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিত, যার জ্বলন্ত প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। এত কিছুর পরও যদি মুসলিমদের সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে  কারা সন্ত্রাসী ও কারা সন্ত্রাসী না তা বোঝার দায়ভার আমরা পাঠকমহলে ছেড়ে দিলাম। আসলে সন্ত্রাসী বুলি আওড়িয়ে তারা শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চায়। মুসলিমরা আজ নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত। তাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। কিন্তু এসকল নিষ্ঠুর-নির্দয় মানুষগুলোর অন্তর ব্যথিত নয় বরং তারা আনন্দিত। মুসলিমদের শুধু একটি কারণেই বর্তমানে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, যা স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন,

 

وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ

‘তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এই (অপরাধের) কারণে যে, তারা সে পরাক্রান্ত প্রশংসাভাজন আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল’ (বুরূজ, ৮)। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে মুসলিমদের উচিত ঐক্যবদ্ধ হওয়া, ইসলামের বিধি-বিধানকে আঁকড়ে ধরা এবং শক্তি সঞ্চয় করা। আল্লাহ সহায় হৌন- আমীন!

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৩।

[2].  ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৫৫।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৫৭।

[4].  ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৫৭।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৩১৬৬।

[6].  নয়াদিগন্ত, ২৪ আগস্ট ২০১৯, শনিবার।