সফলতার সূত্র

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

জীবনে কে না সফল হতে চায়। সকলেই চায় নিজ নিজ জীবনে সফল হতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সফলতার মৌলিক সূত্রগুলো সম্পর্কে তাদের অনেকেই অজ্ঞ। সফলতা নিয়ে বর্তমানে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বা সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সফলতার কোনো আলোচনা হয় না বললেই চলে। বক্ষমান প্রবন্ধে সেই ট্যাবুটা ভাঙতে সফলতার সূত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিতে।

ধর্মীয় পটভূমিকায় সফলতার সূত্র জানার উপায় :

জীবনী অধ্যয়ন : মানুষের সফলতা ব্যর্থতা নির্ধারণকারী সত্তা মহান আল্লাহর রয়েছে এই পৃথিবী পরিচালনায় নিজস্ব নীতি। তিনি সাধারণত তার নীতির পরিবর্তন ঘটান না। মহান আল্লাহ কোন গুণের অধিকারী মানুষদের পৃথিবীতে সফল বানিয়েছেন? কাদেরকে সফল বানানো তার পৃথিবী পরিচালনার নীতির অন্তর্ভুক্ত? সে গুণগুলো সফল ব্যক্তিদের জীবনে কমন। সফল ব্যক্তিদের অত্যধিক জীবনী অধ্যয়নের মাধ্যমে সে গুণগুলোর তালিকা তৈরি করা সম্ভব। সুতরাং যারা সফল হতে চায়, তাদের উচিত অধিকহারে সফল ব্যক্তিদের জীবনী অধ্যয়ন করা। যারা ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতে সফল, তাদের জীবনী বেশি শিক্ষণীয়। সেজন্য নবীদের জীবনী সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন করা উচিত। তারপরে ছাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তীতে আসা মুহাদ্দিছ, মুফাসসির, ফক্বীহসহ অগণিত মুসলিম মনীষীদের জীবন কাহিনী। তাদের মতো মহান মানুষগণের জীবনী পরবর্তীদের জন্য চলার পাথেয়। দিনে পাঁচবার আমরা সূরা ফাতিহায় তাদের রাস্তা পাওয়ার জন্য দু‘আ করি, যাদের উপর মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। মহান আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবনী জানা ছাড়া তাদের রাস্তা অনুসরণ করা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তার নবীগণের জীবনী নিয়ে বহু সূরায় বহু আয়াতে আলোচনা করেছেন। তিনি তার নবীগণের জীবনী দিয়ে মানব জাতিকে শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। সুতরাং সফল হওয়ার সূত্রাবলি শেখার জন্য সফল ব্যক্তিদের জীবনকাহিনী পড়ার বিকল্প নেই। তাইতো মহান আল্লাহ বলেন, فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ ‘অতএব আপনি তাদের কাহিনী শোনান, যাতে করে তারা চিন্তা-ভাবনা করতে পারে’ (আ‘রাফ, ১৭৬)।

আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর বিধি-বিধান :

মানুষ মনে করে ইসলামী বিধি-বিধান হয়তো শুধু জান্নাত পাওয়ার জন্য, দুনিয়াতে এর কোনো উপকার নেই। শুধু তাই নয় অনেক সময় ধর্মকে দুনিয়া উপার্জনের পথে বাধা হিসাবে দেখা হয়। যা মূলত বস্তুবাদী চিন্তা থেকে আমাদের মগজে বাসা বেঁধেছে। ধর্মকে শুধুমাত্র মসজিদের চার দেয়ালে আবদ্ধ করে দেওয়ার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চিন্তার ফসল এই মানসিকতা। অথচ মহান আল্লাহ ওয়াদা করেছেন,

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ

‘যারা ঈমান আনবে ও সৎ আমল করবে, তাদেরকে পূর্ববর্তীদের মতো ক্ষমতা দেওয়া এবং দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার ওয়াদা মহান আল্লাহ করেছেন’ (নূর, ৫৫)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ‘আর যদি শহরের অধিবাসীরা মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে ও তাকে ভয় করে, তাহলে আমরা তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতের সকল দরজা উন্মুক্ত করে দিব’ (আ‘রাফ, ৯৬)।

কেউ যদি দুনিয়াতে সফল হতে চায়, তাহলে তার জন্য সবচেয়ে সহজ রাস্তা হচ্ছে চোখ বন্ধ করে ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান মানা। সে যে পর্যায়েরই দায়িত্বশীল হোক না কেন বা যে পেশারই মানুষ হোক না কেন ইসলামের হুকুম-আহকাম তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে করবে সমৃদ্ধ। তার দুনিয়াকে করবে জান্নাত। সফলতা চুম্বন করবে তার পা।

সফলতার মৌলিক কিছু সূত্র :

সফলতার সূত্র জানার দু’টি কমন রাস্তা বলার পর আমরা এবার মৌলিক কিছু সূত্র নিয়ে আলোচনা করব, যা অধিকাংশ সফল মানুষদের জীবনে পরিলক্ষিত হয় এবং ইসলামের হুকুম-আহকামের যাবতীয় বিধানের সার নির্যাস রয়েছে সেগুলোর মধ্যে।

১. সময়ের মূল্য : মানুষ কোনো জায়গায় বসবাস করে না; মানুষ বসবাস করে সময়ের মধ্যে। আমরা বগুড়া-রাজশাহী বা বাংলাদেশ-সঊদী আরবে বসবাস করি না। মূলত আমাদের জন্মসাল থেকে মৃত্যুসাল পর্যন্ত এই সময়টা হচ্ছে আমাদের বসবাসস্থল। এই সময়ে আমরা পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছা সেখানে থাকতে পারি। পৃথিবীতে যত মানুষ চলে গেছে, তারা সময়ের মধ্যে বসবাস করে গেছে। সময় পার হওয়ার সাথে সাথে তারাও বিদায় নিয়েছে। আবার যাদের সময় হয়েছে, তারা দুনিয়াতে এসেছে। মক্কা এখনো মক্কাই আছে, কা‘বা এখনো কা‘বাই আছে; শুধু যারা মক্কা ও কা‘বা আবাদ  করেছে ইবরাহীম (আ.) থেকে মুহাম্মাদ (ছা.) হয়ে আজ অবধি, তারা সবাই সময়ের মধ্যে এসে সময়ের মধ্যে চলে গেছে। এভাবেই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে মানুষের জীবন গাঁথা। তাই জীবন মূলত সময়ের নাম।

মহান আল্লাহ ধনী-গরীব, মুচি-মেথর নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়ে থাকেন। প্রত্যেক মানুষ তার সময়টা কীভাবে কাজে লাগাল, এটাই তার ভবিষ্যৎ পরিচয় নির্ধারণ করে। তাইতো মহান আল্লাহ বলেন,

وَالْعَصْرِ – إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ – إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ

‘সময়ের কসম! নিশ্চয় সকল মানুষ (সময়ের বিষয়ে) ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছে। একমাত্র তারাই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত নেই, যারা সত্য ও ছবরের বিষয়ে পরস্পরকে উপদেশ দেয়’ (সূরা আছর)।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ – رضى الله عنهما – قَالَ قَالَ النَّبِىُّ – صلى الله عليه وسلم – نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ ، الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ.

ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘দু’টি নে‘মত এমন রয়েছে, যার বিষয়ে মানুষ ধোঁকার মধ্যে নিমজ্জিত থাকে- সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়’।[1]

২. টাইম ম্যানেজমেন্ট : টাইম ম্যানেজমেন্ট শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সময়কে আসলে কোনো দিনই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এখানে নিয়ন্ত্রণ বলতে সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগানোকে বুঝানো হয়েছে। কিছু কৌশল আছে, যেগুলো রপ্ত করলে সময়কে খুব সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়। সেক্যুলার দৃষ্টিকোণ থেকে টাইম ম্যানেজমেন্টের অনেক নতুন নতুন কৌশল শেখানো হচ্ছে। টাইম ম্যানেজমেন্টের জন্য আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন এ্যাপ। মানুষ রীতিমতো গবেষণা পর্যন্ত করছে টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। টাইম ম্যানেজমেন্ট করার কিছু কৌশল নিম্নে পেশ করা হলো-

(ক) প্রতিদিনের কাজের লিস্ট আগের দিন রাতে ঘুমানোর পূর্বে তৈরি করা। যার ফলে রাত্রে সাবকনসাশ মাইন্ড সেই কাজগুলো নিয়ে কল্পনা করে।

(খ) যেসব কাজে বেশি সময় নষ্ট হয়, সেসব কাজের লিস্ট তৈরি করে সেগুলো পরিত্যাগ করা।

(গ) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা।

(ঘ) সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফেসবুক/ইউটিউব ব্যবহার না করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা। সেই সময়ের বাহিরে ব্যবহার না করা।

(ঙ) প্রত্যেক কাজের জন্য নির্দিষ্ট ও আলাদা সময় রাখা।

(চ) যরূরী কোনো কাজের কথা মনে পড়লে সাথে সাথে তা নোট করে নেওয়া।

(ছ) নোট করার জন্য পকেট নোট বা মোবাইলের ‘কিপ নোট’ জাতীয় ভালো কোনো এ্যাপ ব্যবহার করা।

(জ) যে সমস্ত কাজ অন্যকে দিয়ে করানো সম্ভব, সেগুলো নিজে না করে অন্যকে দিয়ে করানোর চেষ্টা করা।

(ঝ) দিনের কাজগুলোকে খুব যরূরী, কম যরূরী, না করলেও হয় এভাবে ভাগ করা এবং যেগুলো খুব যরূরী সে কাজগুলো দিনের শুরুতেই করে ফেলা।

(ঞ) ইম্পর্ট্যান্ট ও আর্জেন্ট এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারা। কাজ যদি ইম্পর্ট্যান্ট না হয়, তাহলে যতই আর্জেন্ট হোক না কেন সে কাজ না করা। যেমন ফোন বাজছে এটা আর্জেন্ট; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই আর্জেন্ট ফোন ধরার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলে সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

টাইম ম্যানেজমেন্টে ছালাত : আমরা শুরুতেই বলেছি ইসলামের বিধি-বিধান আমাদের দুনিয়াবী সফলতার জন্যও সীমাহীন উপকারী। ছালাত হচ্ছে ইসলামের সকল হুকুম-আহকামের সার নির্যাস। কোনো গরীব মানুষের জান্নাতে যাওয়ার জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ও এক মাস ছিয়াম পালনই যথেষ্ট। সে আর কিছু না করলেও এমনকি এক রাক‘আত সুন্নাত-নফল বা এক টাকা দান-ছাদাক্বাহ না করেও সে জান্নাতে চলে যেতে পারে। এই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত একাই তাহলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমন কঠিনও। ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। একদিন পারলেও ২য় দিন সম্ভব হয় না। ২য় দিন সম্ভব হলেও তারপরের দিন সম্ভব হয় না। তাইতো আল্লাহর রাসূল (ছা.) বলেছেন,

مَنْ صَلَّى لِلَّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا فِي جَمَاعَةٍ يُدْرِكُ التَّكْبِيرَةَ الْأُولَى كُتِبَتْ لَهُ بَرَاءَتَانِ بَرَاءَةٌ مِنْ النَّارِ وَبَرَاءَةٌ مِنْ النِّفَاقِ

 ‘যে ব্যক্তি টানা ৪০ দিন তাকবীরে তাহরীমার সাথে জামা‘আতে ছালাত আদায় করল, সে জাহান্নাম ও মুনাফেক্বী থেকে মুক্ত হয়ে গেল’।[2]

আমরা টাইম ম্যানেজমেন্টে যত কৌশলই অবলম্বন করি না কেন, যত বুদ্ধিই আবিষ্কার করি না কেন, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়ের চেয়ে বড় কৌশল কেউ কোনো দিন আবিষ্কার করতে পারবে না। সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগানোর জন্য আসমানের নিচে যমীনের উপরে সবচেয়ে কার্যকরী কৌশল হচ্ছে, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যথা সময়ে আদায় করা। যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত সময় মতো আদায় করতে পারে না, তাদের জীবনটা অনেক অগোছালো। তাদের ঘুম থেকে উঠার কোনো রুটিন থাকে না; কখনো সকাল ৮টায় আবার কখনো ১০টায়, আর ছুটির দিন হলে দুপুরে ঘুম থেকে উঠে। ঘুম থেকে উঠামাত্রই তাদেরকে দৌঁড়াতে হয় কাজের জন্য। নিজের জন্য সকালে তারা কোনো সময় পায় না। এশা ও মাগরিবের ছালাত আদায় না করার কারণে কাজ থেকে ফিরে তাদের অবসর সময়টা কাটে অনেক অগোছালোভাবে। ঘুমানোর কোনো নির্দিষ্ট সময় তাদের থাকে না। এভাবে ছালাতের অনুপস্থিতির কারণে তাদের জীবন থেকে টাইম রিমাইন্ডার তথা সময়কে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো পাঁচটা মাইলস্টোন বা এলার্ম তারা হারিয়ে ফেলে। ফলে সকাল থেকে কীভাবে রাত হয়ে যায় তা তারা টেরই পায় না, দিনকে সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পারে না।

পক্ষান্তরে যারা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করে, তাদের সকল কাজ ছালাতকে ঘিরে আবর্তিত হয়। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যেন তাদের জন্য পাঁচবার এলার্ম। পাঁচবার নতুন করে দিনের কাজ নিয়ে ভাবার সুযোগ। প্রতি ওয়াক্ত ছালাতের পর নতুন উদ্যম নিয়ে পরবর্তী ছালাত পর্যন্ত কাজের নতুন টার্গেট নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার টনিক। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যেন কর্মক্ষম দিনে পাঁচবার ওযূ করে নিজেকে রিফ্রেশ করার সুযোগ। পাঁচবার আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে মনকে প্রশান্তি দেওয়া ও শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ। এককথায় সময়কে খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে একজন প্রডাক্টিভ বা বেশি উৎপাদনে সক্ষম মানুষ তৈরিতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের কোনো বিকল্প নেই।

৩. সকালের জাদু : একজন অমুসলিম লেখক হ্যাল এলরড বই লিখেছেন সকালের জাদু নিয়ে। বর্তমান পৃথিবীর অধিকাংশ সফল মানুষ সকালের জাদুকে কাজে লাগিয়ে সফল হয়েছেন। তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে অমুসলিম হয়েও ফজরের ছালাতের সময় ঘুম থেকে উঠেন। শুধু সকালের জাদুকে কাজে লাগানোর জন্য। যেমন বিল গেটস ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠেন। মার্ক জুকারবার্গ সকাল ছয়টার আগেই ঘুম থেকে উঠেন। সকালে সূর্য উঠে, সকালে ফুল ফোঠে। সূর্যের আলো ফোটার আগে নিজে উঠতে না পারলে নিজের জীবনেও কোনো দিন আলো ফুটবে না। সূর্যের আলো গায়ে মেখেই চিরজীবন মানুষ আলোকিত হয়েছে। যারা সূর্যের আলো দেখে জানালায় পর্দা টেনে, দরজা লাগিয়ে, কম্বল মুড়ি দিয়ে কৃত্রিম অন্ধকার তৈরি করে ঘুমায়, তাদের জীবন চিরদিন অন্ধকারাচ্ছন্নই থাকে।

আরবীতে সকালের যত নাম মহান আল্লাহ দিয়েছেন, তার সবগুলোর অর্থ নিম্নেরূপ :

ফাজর – প্রস্ফুটিত হওয়া।

ইসফার – আলোকিত হওয়া।

ছুব্হ – হেসে উঠা।

তাজাল্লা – জ্বলে উঠা।

তথা যারাই জীবনে আলোকিত হতে চায়, জ্বলে উঠতে চায়, প্রস্ফুটিত হতে চায়, তাদেরকে সকালকে কাজে লাগাতে হবে। এজন্যই তো হাদীছে এসেছে,

عَنْ صَخْرٍ الْغَامِدِيِّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا»، قَالَ: وَكَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً، أَوْ جَيْشًا بَعَثَهُمْ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ، قَالَ: وَكَانَ صَخْرٌ رَجُلًا تَاجِرًا، فَكَانَ يَبْعَثُ تِجَارَتَهُ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ، فَأَثْرَى وَكَثُرَ مَالُهُ.

ছখর আল-গামেদী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের জন্য সকালে বরকত রাখুন! ছখর আল-গামেদী আরও বলেন, রাসূল (ছা.) যখনই কোনো বাহিনী পাঠাতেন, তখন তিনি সকাল বেলা পাঠাতেন। ছখর (রা.) আল্লাহর রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণে নিজের ব্যবসা কাজও সকাল সকাল শুরু করতেন। ফলে তার ব্যবসায় অনেক বরকত হয় এবং ধন-সম্পদ বেড়ে যায়’।[3]

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একদল মুছল্লী ফজর ছালাত পড়ে পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার বিলাসিতায় অভ্যস্ত। প্রথমত, ছালাত আদায় করে পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার এই বিলাসিতার নেশা একটা সময় ফজর ছালাত ছাড়তে বাধ্য করে। দ্বিতীয়ত, সকালের বরকত থেকে বঞ্চিত করে।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১২।

[2]. তিরমিযী, হা/২৪১, সনদ ছহীহ।

[3]. ইবনে মাজাহ, হা/২২৩৬।