اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
শীত মুমিনের বসন্ত


এবার দেশে আগাম শীতের আগমন। হেমন্তের মাঝামাঝি সময়েই চারিদিকে শীতের আমেজ। দেশের কোথাও কোথাও তো রীতিমতো প্রচণ্ড শীত নেমেই গেছে। সম্পাদকীয়টি লেখার সময় তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন ১৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আসলে রাত-দিনের আবর্তন; গ্রীষ্ম-বর্ষা, শরৎ-হেমন্ত, শীত-বসন্তের পরিবর্তন মহান রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে উপদেশ গ্রহণকারী ও চক্ষুষ্মানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন (দ্র: আন-নূর, ২৪/৪৪; আল-ফুরক্বান, ২৫/৬২)। শীতের তীব্রতা ও গরমের প্রখরতা দুনিয়াতে জাহান্নামের নিঃশ্বাস ছাড়ার ফল। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘জাহান্নামের আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলল, হে রব! আমার একাংশ অপর অংশকে খেয়ে ফেলল। তখন তাকে দুটি নিঃশ্বাস ছাড়ার অনুমতি দিলেন: একটি নিঃশ্বাস শীতকালে এবং অপরটি গ্রীষ্মকালে। এ কারণেই তোমরা গ্রীষ্মের প্রখরতা ও ঠাণ্ডার তীব্রতা অনুভব করে থাকো’ (বুখারী, হা/৩২৬০; মুসলিম, হা/১২৭৭)। কেউ ধুম্রজাল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলতে পারে, হাদীছটি অবৈজ্ঞানিক নাকি যঈফ? কারণ বিজ্ঞান বলছে, পৃথিবীর উপর সূর্যের আলো তীর্যক বা খাড়াভাবে পড়ার কারণে শীত ও গ্রীষ্ম হয়। এর সোজাসাপটা জবাব হচ্ছে, সর্বজ্ঞ-প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কুরআন-হাদীছে কোনো অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব বক্তব্য থাকতে পারে না এবং এ হাদীছটি যঈফও নয়; বরং সর্বোচ্চ পর্যায়ের ছহীহ হাদীছ। হাদীছটিতেই তো জাহান্নামকে নিঃশ্বাস ছাড়ার অনুমতি দেওয়ার আগে থেকেই শীত ও গ্রীষ্মকাল সাব্যস্ত হয়েছে। হাদীছে শুধু শীত-গ্রীষ্মের তীব্রতার কারণ হিসাবে জাহান্নামের নিঃশ্বাসকে দেখানো হয়েছে।

যাহোক, শীতকাল মুমিনের বসন্তকাল। কারণ এ মৌসুমে খুব সহজে অনেক ইবাদত করা যায়। দিন খাটো হওয়ায় অনায়াসেই ছিয়াম রাখা যায়। আর রাত লম্বা হওয়ার কারণে ঘুমের চাহিদা মিটিয়েও তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াতসহ আরও অনেক ইবাদত করার সুযোগ থাকে। কষ্ট সত্ত্বেও সুন্দরভাবে ওযূ করলে বান্দার গোনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায় (মুসলিম, হা/৪৮০)। শীতে দুঃস্থ-গরীবদের মাঝে শীতবস্ত্র ও খাদ্য বিতরণের মাধ্যমে অনেক নেকীর ভাগীদার হওয়া যায়। তাছাড়া প্রচণ্ড শীতে লঘু কষ্ট দিয়ে আল্লাহ জাহান্নামের কঠিন শাস্তি লাঘব করে দিতে পারেন। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শীতকালের ছিয়াম সম্পর্কে বলেন, ‘শীতকালের ছওম হচ্ছে বিনাপরিশ্রমে অর্জিত গনীমতের মালের মতো’ (তিরমিযী, হা/৭৯৫, ‘হাসান’)। সেকারণে ছাহাবায়ে কেরাম শীতকালকে সাদর সম্ভাষণ জানাতেন। একে খুব ভালোবাসতেন এবং কাজে লাগাতেন। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘শীত ইবাদতগুযার মানুষদের জন্য গনীমতস্বরূপ’ (আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/৫১)। ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘শীতকে স্বাগতম। এতে বরকত নাযিল হয়। ক্বিয়ামুল লাইলের জন্য এর রাত লম্বা হয় আর ছিয়ামের জন্য দিন খাটো হয়’ (ইবনে রজব, লাত্বাইফুল মাআরেফ, পৃ. ৩২৭)। উবাইদ ইবনে উমাইর (রাহিমাহুল্লাহ) শীত আসলে বলতেন, ‘হে কুরআনের ধারক-বাহকেরা! তেলাওয়াতের জন্য তোমাদের রাত লম্বা হয়েছে। অতএব, তোমরা (কুরআন) তেলাওয়াত করো। আর ছিয়ামের জন্য দিন খাটো হয়েছে। ফলে, তোমরা ছিয়াম রাখো’ (ঐ)

অতএব, শীত মৌসুমে আমাদের করণীয় হচ্ছে, (১) বেশি বেশি নফল ছিয়াম রাখা। ছওমে দাঊদ বা একদিন পর পর ছিয়াম রাখা যায়। সাধারণ নফল ছিয়ামও রাখা যায়। অন্তত সোমবার, বৃহস্পতিবার ও আইয়্যামে বীযের ছিয়ামগুলো রাখা উচিত। (২) ক্বিয়ামুল লাইল করা। রাত অনেক লম্বা হওয়ায় ৫/৬ ঘণ্টা ঘুমিয়েও তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকির-আযকার করা সম্ভব। (৩) দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। উপযুক্ত শীতবস্ত্রের অভাবে বহু মানুষ নিদারুণ কষ্ট ভোগ করে। দিনমজুর মানুষগুলো প্রচণ্ড শীতে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না বলে খাদ্যাভাবে থাকে। এদের পাশে দাঁড়ানো বড় ইবাদত। (৪) জান্নাতীদের কথা স্মরণ করে জান্নাতে যাওয়ার তামান্না করা এবং তদনুযায়ী আমল করা, যাদেরকে ঠাণ্ডা-গরম কোনোটাই স্পর্শ করবে না (আদ-দাহর, ৭৬/১৩)। (৫) জাহান্নামীদের কথা স্মরণ করে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতির প্রাণান্ত চেষ্টা চালানো, যাদেরকে প্রখর আগুন ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা দিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে (ছোয়াদ, ৩৮/৫৭)। (৬) শীত-গ্রীষ্ম কোনো মৌসুমকেই গালি না দেওয়া। কেননা এসবকিছুর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ এবং বিশেষ প্রজ্ঞাকে সামনে রেখেই তিনি এগুলো সৃষ্টি করে থাকেন। সুতরাং এগুলোকে গালি দেওয়ার মানে খোদ মহান আল্লাহকে গালি দেওয়া (বুখারী, হা/৫৭৪৮; মুসলিম, হা/৫৬৭১)

কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ মৌসুমটিকে মূল্যায়ন করতে পারে না। অযথা ঘুরাঘুরি ও সফর করে, গান-বাজনা শুনে, ইন্টারনেট-টিভিতে আজেবাজে অনুষ্ঠান দেখে, রাতে বৈদ্যুতিক আলোয় খেলাধুলায় মত্ত থেকে সময় অপচয় করে এবং পাপের ভাগী হয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ মৌসুমে নানা সুযোগ কাজে লাগিয়ে জান্নাতের পুঁজি সংগ্রহের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!