اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

ভাস্কর্য স্থাপন বন্ধ করুন :


আমাদের সোনার বাংলায় বহু ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে, নির্মাণাধীন রয়েছে এবং নির্মাণের ভবিষ্যত পরিকল্পনাও আছে। এদেশে এগুলো আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে এখন বেশ জোরেসোরে এর আয়োজন চলছে। অনেকে আজ মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে আর নানা খোড়া যুক্তি ও অজুহাত খাড়া করে ভাস্কর্য স্থাপনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। আসলে ইসলামের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ভাস্কর্যের ইংরেজি sculpture (স্কাল্প্চার) আর মূর্তির ইংরেজি statue (স্ট্যাচু)। অথচ Statue of Liberty সহ পৃথিবীর প্রসিদ্ধ ভাস্কর্যগুলোকে Statue (মূর্তি) বলা হয়। এ স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বুঝা যায়, ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুঃখজনক হলো, দ্বীনের ব্যাপারে যারা বিশেষজ্ঞ নন, তারাই এ ব্যাপারে মুখ খুলছেন। এদিকে ‘ভাস্কর্য, ম্যুরাল, প্রতিকৃতি, স্ট্যাচু ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হওয়ায় সে বিষয়ে সচেতনতা গড়তে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতীবকে গণমাধ্যমে প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট’ (বাংলা ট্রিবিউন)। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন দুনিয়ালোভী একশ্রেণির দরবারী মুনশী। সাবধান! দ্বীনের ব্যাপারে মিথ্যা বললে তার পরিণাম জাহান্নাম (বুখারী, হা/১২৯১)

ইসলামে শিরক সবচেয়ে বড় অপরাধ (বুখারী, হা/২৬৫৪), তওবা ছাড়া যা আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করেন না (আন-নিসা, ৪/৪৮ ও ১১৬)। সেকারণে ইসলাম শিরক এবং শিরকের যাবতীয় মাধ্যমের মূলোৎপাটন করেছে। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) শিরক সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কায় বায়আতুর রিযওয়ানের গাছটি পর্যন্ত কেটে ফেলেছিলেন (ফাতহুল বারী, ৭/৪৪৮)। এরই ধারাবাহিকতায় ভাস্কর্য বা মূর্তি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এর ভূরি ভূরি দলীল মিলে। সৃষ্টি করা, আকৃতিদান করা আল্লাহর কাজ (আলে ইমরান, ৩/৬) আর মূর্তি-ভাস্কর্য বানানো মানে আল্লাহর সাথে প্রতিদ্বন্দিতার অপচেষ্টা চালানো (বুখারী, হা/৫৯৫৪)। ভাস্কর্য ও মূর্তি নির্মাতা ও প্রাণীর ছবি অঙ্কনকারী সৃষ্টির নিকৃষ্ট জীব (বুখারী, হা/৪২৭)। ক্বিয়ামতের দিন প্রাণীর ছবি অঙ্কনকারীদের কঠিনতম শাস্তি দেওয়া হবে (বুখারী, হা/৫৯৫০)। ভাস্কর্য নির্মাতার উপর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভিশাপ করেছেন (বুখারী, হা/৫৩৪৭)। যেসব ঘর-বাড়িতে মূর্তি-ভাস্কর্য থাকে, সেখানে ফেরেশতা পর্যন্ত প্রবেশ করেন না (বুখারী, হা/৩২২৫)। সেকারণে ইসলাম ভাস্কর্য ও মূর্তি ভাঙতে বলেছে; গড়তে নয়। নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মূর্তি ভেঙেছেন (আছ-ছফফাত, ৩৭/৯৩)। আমাদের একমাত্র আদর্শ নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজ হাতে মূর্তি ভেঙেছেন (বুখারী, হা/৪২৮৭), ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন (মুসলিম, হা/৯৬৯) এবং ভাঙতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন (বায়হাক্বী, সুনানে কুবরা, হা/১১৪৮৩)

এর বিপরীতে ভাস্কর্যপ্রেমীদেরকে কিছু দলীল পেশ করতে দেখা যাচ্ছে, যেগুলো বিভ্রাট সৃষ্টি ও কুরআন-হাদীছের অপব্যাখ্যা বৈ কিছুই নয়। যেমন- (১) সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর চাহিদা অনুযায়ী ভাস্কর্য নির্মাণের কথা কুরআনে এসেছে (সাবা, ৩৪/১৩)জবাব : এ ভাস্কর্য আসলে কোনো প্রাণীর ছিল না, অথবা তা তাঁর শরীআতে অনুমোদিত থাকলেও আমাদের শরীআতে নিষিদ্ধ (ফাতহুল বারী, ১০/৩৮২)। তাছাড়া এর বিপরীতে কুরআনের বহু আয়াত আছে, যেখানে মূর্তি-ভাস্কর্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে (দ্র. আল-হাজ্জ, ২২/৩০; নূহ, /২৩; আল-আম্বিয়া, ২১/৫২; আছ-ছফফাত, ৩৭/৯৫-৯৬; ঐ, ৩৭/৯১-৯৩)। (২) আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এর ঘরে পুতুল ছিলজবাব : এ পুতুল ছিল ছোট মেয়ের খেলার জন্য। তা তুলা/কাপড়ের তৈরি হওয়ায় পুরোপুরি মানুষের অবয়ব তাতে বিদ্যমান ছিল না। এগুলো সম্মানজনকভাবে স্থাপিত ছিল না। এর বিপরীতে মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  থেকে নিষেধের অনেকগুলো বর্ণনা পাওয়া যায়। তাছাড়া এটাকে পুঁজি করে অন্য কোনো ছাহাবী ভাস্কর্য নির্মাণ করেননি। (৩) ছাহাবীগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) মিশর সহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লেও মূর্তি ভাঙেননিজবাব : মূর্তিগুলো এমন দূরবর্তী স্থানে ছিল, যেখানে ছাহাবায়ে কেরাম পৌঁছতে পারেননি। কারণ মিশর জয় মানে এই নয় যে, মিশরের সব জায়গায় যাওয়া। ঐসব মূর্তি-ভাস্কর্ক ফেরাঊনদের বাসা-বাড়িতে থাকায় ছাহাবীগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) সেখানে প্রবেশ করেননি। কারণ রাসূল গযবের এলাকায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন (বুখারী, হা/৩৩৮১)। ঐসব ভাস্কর্যের অনেকগুলোই মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল, যা পরবর্তীতে উদ্ঘাটিত হয়। বিশালাকৃতির শক্ত মূর্তিগুলো ভাঙার সাধ্য তাদের ছিল না। কারণ বর্তমান যুগে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও এগুলো ভাঙতে কাঠখড়ি পোড়াতে হয়। (৪) এসব ভাস্কর্য হচ্ছে শিল্প ও সৌন্দর্যজবাব : সব শিল্প আমাদেরকে ধরতে হবে এমনটা নয়। বিশেষ করে ইসলাম বিরোধী শিল্প হলে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ফলে আপনি ইসলাম অনুমোদিত শিল্প চর্চা করুন এবং তা দিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করুন। (৫) এসব ভাস্কর্য স্মৃতি হয়ে থাকে এবং চেতনা সৃষ্টি করেজবাব : মানুষ সারা জীবন বেঁচে থাকে তার কর্মের মাধ্যমে; ভাস্কর্য লাগে না। ইসলামের বিখ্যাত সব ব্যক্তি, যাদের কোথাও কোনো ভাস্কর্য নেই, অথচ তারা বেঁচে আছেন প্রতিটি মুমিন হৃদয়ে। তাদের আদর্শ লালন করছেন লক্ষ-কোটি মুসলিম নর-নারী। এর বিপরীতে অনেকের ভাস্কর্য আছে, কিন্তু মানুষ তাদেরকে চিনে না। অনেককে চিনলেও ঘৃণার সাথে চিনে। নূহ (আলাইহিস সালাম) -এর ক্বওম এই চেতনা সৃষ্টি করতে গিয়েই শিরকে জড়িয়ে পড়েছিল। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে এসব ভাস্কর্যকে ঘিরে শিরকের আড্ডা বসবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?! (৬) বিভিন্ন মুসলিম দেশে ভাস্কর্য আছে। তাহলে আমাদের থাকলে দোষ কী? জবাব : কোনো দেশ, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ইসলামের দলীল নয়। দলীল হচ্ছে, কুরআন ও হাদীছ এবং তা হতে হবে সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী। তাছাড়া যেসব দেশের কথা বলা হচ্ছে, সেসব অনেক দেশে তো শারঈ বিধান চালু আছে। তাহলে আপনি সেটা আমদানি করছেন না কেন?

ভাস্কর্যের মাধ্যমে অঢেল অর্থের অপচয় হয়। বিনিময়ে ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত ও অপমাণিত করা হয়। কারণ বছরের হাতে গোনা কয়েকদিন তা ধুয়েমুছে সাফ করে তাতে ফুল দিলে যদি তার সম্মান-শ্রদ্ধা বাড়ে, তাহলে সারা বছর রোদ-ধুলা-ময়লায় পড়ে থাকলে, পাখপাখালি মাথায়, চোখ-মুখে পায়খানা করলে তাতে লাঞ্ছিত হবে না কেন?! ভাস্কর্যের ঘাড়ে-মাথায় ছেলেমেয়েরা চড়লে, বেদিতে কুকুর-শৃগাল পায়খানা করে দিলে ব্যক্তির অসম্মান হবে না কেন?! বিষয়গুলো আবেগ দিয়ে নয়, বিবেক দিয়ে ভাবার অনুরোধ রইল। আল্লাহর কসম! আমাদের অবস্থান স্রেফ ভাস্কর্য ও মূর্তির বিরুদ্ধে; কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয়। ব্যক্তি যে-ই হোক না কেন, তা আমাদের কাছে কোনো বিষয়ই নয়। বরং মনুষ্যজাতির বাইরে অন্য জীব-জানোয়ারের ভাস্কর্য হলেও ইসলামে তা নিষিদ্ধ এবং আমরা তার বিরুদ্ধে। আরেকটি ব্যাপার হলো, ভাস্কর্যকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে এবং এর বিপক্ষে অবস্থানকারীদের স্বাধীনতাবিরোধী ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে! ভুলে গেলে চলবে না, এদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে প্রথম ভাস্কর্য নির্মিত হয় ১৯৭৩ সালে। তাহলে যে ভাস্কর্য নির্মিত হলো মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার ২ বছর পরে, তা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ হয়?! অতএব, স্বচ্ছ পানি যেন ঘোলা করা না হয়।

আসলেই যদি কোনো মৃত ব্যক্তির কল্যাণ কামনা করা হয়, তাহলে তার জন্য কল্যাণকর কাজ করতে হবে। অযথা ভাস্কর্য নির্মাণের পেছনে অর্থ নষ্ট না করে একাজগুলো করুন- (ক) এমন সব জনকল্যাণমূলক কাজ করুন, যার কারণে মানুষ এমনিতেই মন থেকে মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ করবে। আর তিনি এর দ্বারা উপকৃত হবেন (মুসলিম, হা/১৬৩১, ২৭৩৩)। (খ) মৃত ব্যক্তির নামে দান-ছাদাক্বা করুন। তিনি এর নেকী পাবেন (বুখারী, হা/১৩৮৮)। (গ) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ-উমরা করিয়ে নিন। তিনি এর নেকী পেয়ে যাবেন (আবু দাঊদ, হা/১৮১১)। (ঘ) মসজিদ, মাদরাসা, ইয়াতীমখানা, হাসপাতাল ইত্যাদি নির্মাণ করুন। (ঙ) গরীব, মিসকীন, অসহায়, দুস্থদের সেবায় এগিয়ে আসুন।

পরিশেষে নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, ‘হে আমার রব! তুমি এ নগরীকে নিরাপদ করো এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে প্রতিমাপূজা থেকে রক্ষা করো’ (ইবরাহীম, ১৪/৩৫)