اَلْحَمْدُ لِلَّهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

মাহে রামাযান : একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান


মানুষ মানেই ভুল। ভুলের অনিবার্য পরিণতি পাপ। সেই পাপ যখন মানুষের মাথার বোঝা হয়ে আসে, তখন পাপের ভার নামিয়ে দিয়ে মানুষকে পবিত্র করার জন্য রামাযানের আগমন ঘটে। ‘রময’ অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া, পুড়িয়ে দেওয়া (লিসানুল আরাব)। তাই রামাযান! জ্বলে–পুড়ে খাক হওয়া; ক্ষুধায় উদর জ্বলা; পাপ পুড়িয়ে ভস্ম করে সেই ছাই উড়িয়ে অমূল্য রতনের সন্ধান। রামাযান! এতেই নাযিল হয়েছে কুরআন; মানবমণ্ডলীর হেদায়াত ও কল্যাণ, ন্যায়ের বিধান (আল-বাক্বারা, ২/১৮৫)। রামাযান! মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান আহ্বান। স্বীয় ভুল সংশোধন করে প্রতিটি মানুষ যেন সোনার মানুষে পরিণত হয় সেই লক্ষ্যে অতীতকাল থেকে চলে আসা মহা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ছিয়াম মুসলিম জাতির উপর ফরয করা হয় ২য় হিজরীর শা‘বান মাসে (আল-বাক্বারা, ২/১৮৩)

মহান রবের কোনো বিধানই অমূলক নয়। প্রতিটি বিধানের মধ্যে রয়েছে প্রাণীকুলের সার্বিক কল্যাণ। কখনো সেই কল্যাণ আমরা উপলব্ধি করতে পারি, কখনো পারি না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে শারীরিক, আত্মিক ও মনস্তাত্বিক সুস্থতায় ছিয়ামের জুড়ি নেই। ড. লুটজানারের মতে, ‘খাবারের উপাদান থেকে সারাবছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন), চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস (ছিয়াম)’। এছাড়া আরও বহু চিকিৎসাবিজ্ঞানী গবেষণার মাধ্যমে মানবজীবনে ছিয়ামের আবশ্যকতা তুলে ধরেছেন।

শুধু শারীরিক সুস্থতা নয়; বরং আত্মিক ও মনস্তাত্বিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও ছিয়ামের ভূমিকা অপরিসীম। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ছিয়াম পালনকারীর দুটি খুশির মুহূর্ত রয়েছে। তার একটি হলো ইফতারের সময় (বুখারী, হা/১৯০৪; মিশকাত, হা/১৯৫৯)। ইফতার করার মুহূর্তে আল্লাহর হুকুম পালন করতে পারার আনন্দময় অনুভূতি যে কেমন, তা শুধু পালনকারীরাই বুঝতে পারে। ভাষায় তা ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। অপরদিকে ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসলে ছিয়াম পরিত্যাগকারী লোকদের হীনমন্যতা, মানসিক যন্ত্রণা ও অনুশোচনাবোধের সৃষ্টি হয়, তা যে কত বেদনাদায়ক তা ঐ সব লোকেরাই বুঝতে পারে।

রামাযান মাস মানেই নেকী অর্জনের প্রতযোগিতা করার মাস। মহান আল্লাহ শয়তানকে শৃঙ্খলিত রেখে মানবজাতিকে দিয়েছেন পুণ্য সন্ধানের অবারিত সুযোগ। এই মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ থাকে উন্মুক্ত। জাহান্নামের দরজাগুলো থাকে বন্ধ। এজন্যই রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘ওহে কল্যাণের সন্ধানী! অগ্রসর হও। ওহে মন্দের অন্বেষী! পিছিয়ে যাও’ (ইবনু মাজাহ, হা/১৬৪১; মিশকাত, হা/১৯৬০)। উক্ত হাদীছের সত্যিকারের উপলব্ধির দেখা মিলে আরব দেশগুলোতে। রামাযান আসলেই ছায়েমকে ইফতার করিয়ে নেকী অর্জনের মানসে মসজিদে মসজিদে বহুপদের সামগ্রী দিয়ে চলে ইফতারের ফ্রি আয়োজন। রাস্তা-ঘাট, পার্ক-রেস্টুরেন্টে ফ্রি ইফতার সামগ্রী বিতরণের অনুপম দৃশ্য। সাথে হয়ত ইফতারের ব্যবস্থা নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন, রাস্তার পাশের ফিলিং স্টেশন থেকে হাত তুলে আপনাকে থামিয়ে ইফতারের প্যাকেট ধরিয়ে দিচ্ছে। আপনার আর প্যাকেট প্রয়োজন নেই, আপনি ভাবছেন আর ইফতার নিবো না, কিন্তু সামনে কোথাও আবার গাড়ি দাঁড় করিয়ে ইফতারের প্যাকেট ধরিয়ে দিচ্ছে। এ এক মধুর বিড়ম্বনার দেশ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কে ইফতার দিচ্ছে, তার নামটিও অনেক সময় প্রকাশ পায় না। লৌকিকতামুক্ত আমলের এ এক অনুপম দৃষ্টান্ত। অথচ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আয়োজনকারীর চৌদ্দ গোষ্ঠীর নাম ধরে লম্বা দু‘আ না করলে হুজুরের ইমামতি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়।

সারা বছর ধন্য রামাযানের আগমনে। আর রামাযান ধন্য লায়লাতুল ক্বদরের অবদানে। এই রাত্রির মধ্যে রয়েছে এমন এক সুপ্ত সফলতা, যা ৮৩ বছর ৪ মাসের চেয়েও উত্তম সফলতা (আল-ক্বদর, ৯৭/)। হতভাগ্য মানুষেরা এই রাতে ঘুমিয়ে যায়। অথচ শান্তির বার্তা নিয়ে ফজর পর্যন্ত ফেরেশতাকুলকে সাথে নিয়ে জিবরীল আমীন জেগে রয় (আলক্বদর, ৯৭/)। কেউ যদি এ রাতে জেগে থাকে, যদি কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চায়, যদি আল্লাহর ভয়ে সিজদায় পড়ে রয়; তাহলে সেই এক রাতের ইবাদতে ৮৩ বছর ৪ মাসেরও বেশি হায়াতে সমৃদ্ধ হয়ে যায়। জীবনের পবিত্র প্রবৃদ্ধি এর থেকে বেশি আর কীইবা হতে পারে? এজন্যই রামাযানের শেষ দশক আসলে ইবাদত করার জন্য রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জোরালো প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন (বুখারী, হা/২০২৪; মিশকাত, হা/২০৯০)

রামাযান মাস ক্ষমা চাওয়ার মাস, ক্ষমা পাওয়ার মাস। তবুও যারা ক্ষমা পেল না তারা কতই না হতভাগ্য! রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুৎবার মিম্বারে উঠার জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এসে বললেন, যে ব্যক্তি রামাযান পেল, অথচ নিজের পাপ ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না, সে ধ্বংস হোক! রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমীন!’ (ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/১৮৮৮)। এরপরও কতিপয় মুনাফালোভী রামাযান মাসে দিনের বেলা খাবারের হোটেল-রেস্টুরেন্ট খুলে রেখে মানুষকে ছিয়াম তরক করার সুযোগ করে দেয়। আবার সারা বছর ইচ্ছামতো লাভ করার পর গণমানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে রামাযান মাসে যেখানে লাভ একটু কম করার কথা, সেখানে আমাদের এ আজব দেশে প্রায়ই ব্যবসায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির কাজে একে-অন্যকে সহযোগিতা করো। আর পাপকর্ম ও আল্লাহদ্রোহিতার কাজে একে-অন্যকে সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)

আনুগত্যে অবিচল থাকা কিংবা মনের সাথে আপসহীন যুদ্ধ করে পাপকাজ থেকে নিজেকে নিবৃত রাখাসহ ধৈর্যের যত দিক হতে পারে, তার সবগুলোই ছিয়ামের মধ্যে পাওয়া যায়। সকল আমলের মধ্যে লৌকিকতার আবেশ থাকতে পারে। কিন্তু ছিয়াম তার থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এজন্যই রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমলই দশ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ বলেন, শুধু ছিয়াম ছাড়া। তা একমাত্র আমার জন্য। তাই এর প্রতিদানও আমি দিব। কারণ আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই সে প্রবৃত্তিকে দমন করেছে, খাবার থেকে বিরত থেকেছে’ (বুখারী, হা/৭৪৯২; মিশকাত, হা/১৯৫৯)। প্রিয়জনের কাছ থেকে উপহার পাওয়া কত যে আনন্দের, তা কি ভাষায় প্রকাশ করার মতো? আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের তাই করবেন। কল্পনা করুন! সেই মুহূর্তটা কত আনন্দের হবে।

পরিশেষে মহান রবের কাছে দু‘আ করি, তিনি যেন আমাদের রামাযানের সকল শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে যথাযথভাবে ছিয়াম পালন করে তার হাত থেকে উপহার গ্রহণ করার তাওফীক্ব দান করেন- আমীন!