اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

ধ্বংসের পথে বাংলাদেশের নদ-নদী



নদ-নদী মহান আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন, যাতে মানবজাতির জন্য রয়েছে শিক্ষা। এগুলো মহান আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের সাক্ষী, যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মানুষ তার মা‘বূদকে খুঁজে পাবে। তাই তো পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় নদীনালার কথা উল্লেখ করে মানুষকে চিন্তা-গবেষণা করতে বলা হয়েছে। নদ-নদী মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ। পৃথিবীবাসীর নানাবিধ কল্যাণ নিহিত রয়েছে নদীনালায়। মহান আল্লাহ মানুষ, জীবজন্তু, উদ্ভিদ সবার জীবনধারণের নানা উপকরণ ঢেলে দিয়েছেন এসব নদীনালায়। মানবসৃষ্টির সূচনা থেকেই নদীনালা মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আদিকাল থেকে কৃষিকাজে মানুষ এসব নদ-নদীর উপরই নির্ভরশীল। নদীনালার নানা ধরনের মাছ আজও মানুষের প্রিয় খাদ্য এবং পুষ্টির একটা বড় অংশ আসে এ মাছ থেকেই। অনেক সময় শামুক, ঝিনুক, এমনকি মণিমুক্তাও আহরিত হয় নদীনালা থেকে। একটা সময় নদ-নদীর সুপেয় পানি রান্নাবান্না ও পান করার কাজেও ব্যবহৃত হতে দেখা যেত, যা এখন তেমন নজরে পড়ে না। জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য, ভূ-প্রকৃতি রক্ষায় এসব নদ-নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নদীর অপার সৌন্দর্য আমাদের মন জুড়িয়ে দেয়। এছাড়াও এসব নদীনালার রয়েছে আরো অনেক উপকারিতা।

গোটা মানবদেহে যেমন অসংখ্য শিরা-উপশিরা জালের মতো জড়িয়ে ধরে মানুষকে বেঁচে থাকার নানা উপকরণ সরবরাহ করছে প্রতিনিয়ত, ঠিক তেমনি অসংখ্য নদ-নদী প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে আগলে রেখেছে। সারাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য নদীনালা। পদ্মামেঘনাযমুনাব্রহ্মপুত্রকর্ণফুলিশীতলক্ষ্যাগোমতীহ বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি নদী-উপনদী রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কি.মি.। এসব নদ-নদী নিয়ে রচিত হয়েছে কত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস আর নাটক। কবি জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় নদীর রূপ-লাবণ্য তুলে ধরেছেনে একান্ত আপন করে। কাব্যিক ব্যঞ্জনায় নদী পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকও লিখেছেন হৃদয়ের মাধুরী মিশিয়ে। কিন্তু সেসব এখন শুধুই কল্পকাহিনী। পরিসংখ্যান আর কবির বর্ণনার সাথে বাস্তবতার কোনোই মিল নেই। কারণ নাব্যতা হারিয়ে এবং দু’ধার থেকে সঙ্কুচিত হয়ে বেশিরভাগ নদীই আজ বিলীন হয়ে গেছে বা প্রায় বিলীনের পথে। নদীর অস্তিত্ব হচ্ছে তল, ঢাল আর তীর। এসবগুলোই সমানতালে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ‘আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’- কবির ছোট নদীর এ বর্ণনা যেন বড় নদীর ক্ষেত্রেও এখন মিলে যাচ্ছে। বড় বড় নদী আজ মরুভূমির মতো ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। খরার মৌসুমে বুঝাই যায় না যে, এগুলো নদী, না-কি মরুভূমি! ছোট ছোট অনেক নদীতে ধান পর্যন্ত চাষ হতে দেখা যায়। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদীসহ ঢাকার নদীগুলো তো রীতিমতো নর্দমায় পরিণত হয়েছে, যেখানে নাকে রুমাল ধরে ছাড়া যাওয়া কঠিন!

এর কারণ হিসেবে ভারতের বৈরী আচরণ যেমন রয়েছে, তেমনি নদীর সঙ্গে আমাদের অত্যাচারও যুক্ত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের বহু নদী শাসন ও শোষণ করছে। ভারতের ফারাক্কা ও গজলডোবা বাঁধ ছাড়াও উজানে তৈরি করা ৪০টি ড্যাম ও ব্যারেজ পানির গতি পরিবর্তন করায় পানির অভাবে বাংলাদেশের নদ-নদী আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদ-নদীর সাথে আমাদের শত্রুতাও বেড়ে গেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। নদীর তীর ও ঢাল অবৈধভাবে দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বসতবাড়ি, শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কথিত প্রভাবশালীরা জড়িত এসব দখলদারিত্বের সাথে। নদীগুলোকে দূষণযুক্ত করা হচ্ছে কলকারখানার বর্জ্য নিক্ষেপসহ নানা কায়দায়। যত্রতত্র খনন করে তোলা হচ্ছে বালি। ফলে নদী আর নদী থাকছে না। এর পানি ধারণক্ষমতা বহুগুণে হ্রাস পাচ্ছে। আমাদের জন্য তৈরি হচ্ছে উভয় সংকট; খরার সময় আমরা পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আর বর্ষার মৌসুমে বণ্যায় তলিয়ে যাচ্ছি। হারিয়ে যাচ্ছে বহু প্রাণ; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। নদী হারানোয় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে ভূ-প্রকৃতি।

অতএব, এখনই সময় সচেতন হওয়ার ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। এ পদক্ষেপ হতে হবে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে। রাষ্ট্রীয়ভাবে অবৈধ দখলদারি উচ্ছেদ, খনন প্রক্রিয়া ও দূষণমুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ রক্ষা করে নদী-সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সর্বোপরি ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের প্রত্যেককেই সচেতন হয়ে নদী রক্ষায় কাজ করে যেতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন- আমীন!