اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামের বিধি-নিষেধ বাস্তবায়ন করুন

আমাদের দেশে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে পরিচিত শব্দ ‘ধর্ষণ’। একসময় যে শব্দটি উচ্চারণ করতেও মানুষ লজ্জা পেত, তা এখন লজ্জার পর্দা ছিড়ে সবার মুখে মুখে। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত শিরোনাম হচ্ছে শব্দটি। কারণ অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়েই চলেছে ধর্ষণ। মানুষের মন-মানসিকতা ও বিবেক-বুদ্ধি অসুস্থ হয়ে গেছে। তার পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। তার উপর পশুত্বেও স্বভাব ভর করেছে। সেজন্য ছোট-বড় সব বয়সী নারীই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এমনকি ৫/৬ বছরের শিশুও রেহাই পাচ্ছে না নরপিশাচদের হাত থেকে। ধর্ষণের তালিকা লম্বাই হচ্ছে প্রতিদিন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬০১ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১৩৪ জন। ধর্ষণের শিকার হওয়াদের মধ্যে ৪০ জনের বয়স ৬ বছর এবং ১০৩ জনের বয়স ১২ বছরের মধ্যে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৭ জন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ১২৬ জন নারীর উপর। তাদের হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ এক বছরে ধর্ষিতার সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। শুধু বর্তমানের চিত্র নয়, ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখলে আতঙ্কিত হতে হয়। ‘অধিকার’-এর তথ্যানুসারে এই সময়ে মোট ধর্ষণের শিকার ১৩ হাজার ৬৩৮ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ২ হাজার ৫২৯ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৬ হাজার ৯২৭। ধর্ষণ পরবর্তী খুন ১ হাজার ৪৬৭ এবং ধর্ষণ পরবর্তী আত্মহত্যা ১৫৪ জনের। পরিসংখ্যানের বাইরে আরো যে কত ধর্ষণের ঘটনা পর্দার আড়ালে থেকে যায়, তার হিসাব কে রাখে?

এ গেলো ধর্ষণের হিসাব। যেনা-ব্যভিচারের তো কথাই নেই। তথাকথিত প্রগতিবাদীরা তো একে কিছু মনেই করে না। সেজন্য এর কোনো হিসাবও রাখে না, এর জন্য কোনো আইনও করে না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সম্প্রতি বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজার আইন পাশ হলেও ব্যভিচারের ব্যাপারে কিছুই হয়নি। অথচও দু’টোই ঘৃণিত ও জঘন্য অপরাধ এবং একটি আরেকটির দুয়ার খুলে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১২ অক্টোবর ভার্চুয়াল মন্ত্রীসভার বৈঠকে আইনের ৯/১ ধারায় ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ডের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় এবং ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির সইয়ের মাধ্যমে প্রস্তাবটি অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়। কতই-না ভালো হতো, যদি মহান আল্লাহ প্রদত্ত দণ্ডবিধি বাস্তবায়নের আইন পাশ হতো এবং ধর্ষণের সাথে যেনা-ব্যভিচারকেও যোগ করা হতো।

ইসলামের চোখে যেনা-ধর্ষণ দু’টোই কাবীরা গোনাহ এবং এসব বন্ধে কেবলমাত্র ইসলামই উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা অন্য কোনো ধর্ম বা আইন করতে পারেনি। ব্যভিচার ও ধর্ষণের বীজই যাতে অঙ্কুরিত হতে না পারে, তার কার্যকর প্রতিষেধক কেবল ইসলামই দিতে পেরেছে। যেমন- ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে দৃষ্টি অবনত করতে বলেছে (আন-নূর, ২৪/৩০-৩১)। এমনকি কোনো বেগানা নারীর দিকে হঠাৎ চোখ পড়লেও দ্বিতীয়বার তার দিকে তাকানো ইসলামে নিষিদ্ধ (আবূ দাঊদ, হা/২১৪৯; তিরমিযী, হা/২৭৭৭)। যরূরী দরকার ছাড়া নারীদেরকে বাড়িতেই থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে (আল-আহযাব, ৩৩/৩৩)। প্রয়োজনে বের হলে সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে (ঐ)। সুগন্ধি মেখে বের হওয়াও তাদের উপর হারাম (আহমাদ, হা/১৯৭১১)। বরং পরিপূর্ণ পর্দা সহকারে বের হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং এমনটা করলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না বলেও মহান আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন (আল-আহযাব, ৩৩/৫৯)। কোনো নারীর কাছে কোনো বেগানা পুরুষের যাওয়া ইসলামে হারাম (বুখারী, হা/৫২৩২; মুসলিম, হা/২১৭২)। ইসলাম পুরুষকে বেগানা নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করতে নিষেধ করেছে। কারণ এমন অবস্থায় তাদের তৃতীয় সঙ্গী হিসেবে শয়তান যোগ দেয় (বুখারী, হা/৩০০৬; মুসলিম, হা/১৩৪১)। মাহরাম পুরুষের সঙ্গ ছাড়া কোনো নারীর কোথাও সফর করাও ইসলামে হারাম (ঐ)। ইসলাম প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিয়ে করতে বলেছে (বুখারী, হা/৫০৬৫; মুসলিম, হা/১৪০০) এবং বিয়ের বিষয়াদি সহজ করার প্রতি উৎসাহিত করেছে (বুখারী, হা/৫০২৯; মুসলিম, হা/১৪২৫; তিরমিযী, হা/১০৮৪)। কোনো কারণে বিয়ে করতে না পারলে যুবক-যুবতীদের বেশি বেশি ছিয়াম রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কেননা এতে কু-রিপু দমন হয় (বুখারী, হা/১৯০৫; মুসলিম, হা/১৪০০)। ‘যেনা-ধর্ষণের দূত’ হিসেবে খ্যাত গান-বাজনা, নাটক, সিনেমা, মুভি ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে (লুক্বমান, ৩১/৬; আন-নূর, ২৪/১৯; বুখারী, হা/৫৫৯০)। কোনো নারীকে তার স্বীমার কাছে অন্য নারীর শারীরিক গঠন ও সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়েছে (বুখারী, হা/৫২৪০)। ১০ বছর বয়স হলে প্রত্যেক সন্তানের বিছানা আলাদা করে দিতে বলা হয়েছে (আবূ দাঊদ, হা/৪৯৫)। এমনকি পর-পুরুষের সাথে নরম কণ্ঠে কথা বলতেও ইসলাম নিষেধ করেছে (আল-আহযাব, ৩৩/৩২)।

পশ্চিমা কিছু গবেষণাও অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে যে, নির্জনস্থানে মেয়েদের যাতায়াত, কোথাও একাকী অবস্থান, অর্ধনগ্ন পোশাক পরিহিত অবস্থায় বাইরে গমন ইত্যাদি কারণে তারা ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে। সেকারণে ইসলাম এই জায়গাগুলোতেই কাজ করেছে। এগুলোই হচ্ছে ইসলামের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অতএব, এগুলোর যথারীতি বাস্তবায়ন করা গেলে সেই সমাজে যেনা-ব্যভিচার ও ধর্ষণের চারা গজাতেই পারবে না। তারপরও দুয়েকটা চারা গজালে তার মূলোৎপাটনের কার্যকর ব্যবস্থাও ইসলামে রয়েছে, যাকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বলা যায়। ইসলামে যেনা-ব্যভিচারের যে শাস্তি, ধর্ষণেরও সেই শাস্তি। ধর্ষক বিবাহিত হলে রজম বা পাথর মেরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে হবে এবং অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাত করতে হবে। সাথে ১ বছরের জন্য এলাকাছাড়া করতে হবে। আর এই শাস্তি মুমিনদের এক দলের সামনে প্রকাশ্যে হতে হবে (আন-নূর, ২৪/২; বুখারী, হা/৬৮৩০; মুসলিম, হা/১৬৯০)। ধর্ষণের উপর্যুক্ত সাজার সাথে অর্থদণ্ডের কথাও কেউ কেউ বলেছেন (মুওয়াত্ত্বা মালেক, ৪/১০৬৩)। ভুক্তভোগীর করুণ দশা বিবেচনা করেই ইসলাম সাজার এই কঠোর বিধান দিয়েছে। তবে অস্ত্রের মুখে ফেলে ধর্ষণ করলে ধর্ষকের উপর নিম্ন বর্ণিত সাজা প্রযোজ্য হবে- মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে, অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এ হলো তাদের জন্য দুনিয়াতে লাঞ্ছনা। আর তাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে মহাশাস্তি’ (আল-মায়েদাহ, ৫/৩৩)। এগুলোর মধ্যে সরকার যখন যে শাস্তিকে ধর্ষণ বন্ধে ও জনগণের কল্যাণে বেশি কার্যকর মনে করবে, বাস্তবায়ন করবে (মাজাল্লাতুল বুহূছিল ইসলামিয়্যাহ)। তবে ভুক্তভোগীর কোনো শাস্তি হবে না- যদি প্রমাণিত হয় যে, সত্যিই জোরপূর্বক তার সাথে একাজ করা হয়েছে। আর তার চিৎকার-চেঁচামেচি, সাহায্য প্রার্থনা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রমাণিত হবে, জোরপূর্বক তার সাথে একাজ করা হয়েছে কিনা (আল-ইস্তেযকার, ৭/১৪৬)।

যেনা-ব্যভিচার ও ধর্ষণ বন্ধে কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা: ১. সর্বোপরি দ্বীন ও পরকালমুখী হতে হবে। সেজন্য নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, জামা‘আতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করতে হবে। ২. প্রাপ্তবয়স্ক নারীর যথাযথ পর্দা করতে হবে এবং ছোট মেয়েদেরকে ছোটবেলা থেকেই পর্দার চর্চা করাতে হবে। ৩. নারী-পুরুষ উভয়ের দৃষ্টির হেফাযত করতে হবে। ৪. প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের বিয়ে-শাদীর ব্যাপারগুলো সহজ করতে হবে। বিশেষ করে মোহর ও বয়সের ব্যাপারটা। ৫. বিভিন্ন কারণ ও অযুহাতে যেসব যুবক-যুবতী বিয়ে করতে পারছে না, তাদের নিয়মিত ছিয়াম পালনে অভ্যাসী হতে হবে। ৬. সর্বত্র বখাটেশ্রেণির প্রতি সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে এবং তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা যরূরী। ৭. যৌন সুড়সুড়িমূলক সব ধরনের অডিও-ভিডিও, গান-বাজনা, সিনেমা, নাটক ও অন্যান্য মাধ্যম নিষিদ্ধ ও বন্ধ করতে হবে। আর পর্নগ্রাফির ব্যাপারে তো কথাই নেই। ৮. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করতে হবে। ৯. বেগানা যুবক-যুবতীর মধ্যকার সব ধরনের সম্পর্ক নিষিদ্ধ করতে হবে। ১০. সৎসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। ১১. কো-এডুকেশন বা সহশিক্ষা তুলে দিয়ে ছেলে-মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং বালিকা বিদ্যালয়গুলোতে ১০০% নারী শিক্ষক-স্ট্যাফ নিশ্চিত করতে হবে। ১২. সর্বত্র নারী-পুরুষের পৃথক কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৩. সকল পতিতালয় সহ যেখানে যেখানে যেনা-ব্যভিচার হয়, সব বন্ধ করতে হবে। ১৪. ধর্ষক ও ব্যভিচারীর উপর ইসলামের দণ্ডবিধি শতভাগ কার্যকর করতে হবে। ১৫. আলেম-উলামার সহযোগিতায় ‘হাইআতুল আমরি বিলমা‘রূফ ওয়ান-নাহি ‘আনিল মুনকার’ বা ভালোকাজের আদেশ ও মন্দকাজে নিষেধের জন্য পৃথক সংস্থা গঠন করতে হবে, যারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে কাজ করবেন।

ইসলামের এপথেই মানবতার সার্বিক কল্যাণ, নিরাপত্তা ও শান্তি নিহিত। অন্য কোনো তন্ত্রমন্ত্র, আইন আর তথাকথিত সভ্যতায় মুক্তি নেই। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬% নারী কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে এবং ৭% নারী সরাসরি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। উন্নত সভ্যতার দাবীদার খোদ আমেরিকায় প্রতি ৯০ সেকেন্ডে ১ জন নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে পুরনো এক জরিপে উঠে এসেছে এবং সেখানে ধর্ষণের শিকার নারীর পরিসংখ্যান ৯১%। ডেনমার্কে ৮০% ও সুইডেনে ৮১% নারী ধর্ষিত হয়। পুরো ইউরোপে শতকরা ৫০ ভাগের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি ২২ মিনিটে ১টি করে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়। কী অবাক কাণ্ড! এ কোন সভ্যতা! আমাদের দেশের সেকুলার আর প্রগতিবাদীরা আমাদেরকে কোন সভ্যতার ফাঁদে আটকাতে চায়?! আমাদের ছেলে-মেয়েরা কোন সভ্যতায় অবগাহন করতে চায়?!

মহান আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!