ইমান-আক্বীদা


প্রশ্ন (১) : হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, خَلَقَ ‌اللهُ ‌آدَمَ ‌عَلَى ‌صُورَتِهِ আল্লাহ আদমকে তাঁর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। এখানে তার বলতে কি আল্লাহ না-কি আদমকে বুঝানো হয়েছে?

-মাহফুজুর রহমান
রাজশাহী।

উত্তর : আল্লাহ তাআলা আদমকে তার আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। এটি একটি ছহীহ হাদীছ। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী a বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তার অন্য ভাইয়ের সাথে মারামারি করে, তখন সে যেন তার ভাইয়ের মুখমণ্ডলে আঘাত করা হতে বিরত থাকে। কেননা আল্লাহ তাআলা আদম e-কে তার নিজ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬১২)। এটি মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর প্রকৃত অর্থ আল্লাহই ভালো জানে। অন্যে পক্ষে এটি জানা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সালাফদের কারো কারো মতে, এখানে صورة শব্দের অর্থ হলো গুণাবলি। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আদম e-কে তার নিজের গুণাবলিতে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা যেমন শুনেন, দেখেন এবং যখন ইচ্ছা কথা বলেন, ঠিক আদমকেও সেভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। আদম eও দেখেন, শুনেন এবং যখন ইচ্ছা কথা বলেন। আল্লাহ তাআলার মুখমন্ডল আছে, আদম e-এরও মুখমন্ডল আছে। তবে আল্লাহর দেখা, শুনা ও কথা বলার ধরণ আদম e -এর দেখা, শুনা ও কথা বলার মতো নয়। কেননা কোন কিছুই আল্লাহর সদৃশ নয় (আশ-শুরা, ৪২/১১)। বরং আল্লাহর  ‍গুণাবলি তার মর্যাদা ও মহত্বের জন্য যেমনটি মানায় তেমনই।


প্রশ্ন (২) : মসজিদের ইমাম তাবীয দ্বারা চিকিৎসা করলে তার পিছনে ছালাত হবে কি?

-মো. জহিরুল ইসলাম, ঢাকা।

উত্তর : তাবীয ঝুলানো শিরক। উক্ববা ইবনু আমের c হতে বর্ণিত, রাসূল a-এর নিকট (বায়আত করার উদ্দেশ্যে) ১০ জন লোক উপস্থিত হলো। তিনি নয় জনের নিকট থেকে বায়আত নিলেন। আর মাত্র একজন লোকের নিকট হতে বায়আত নিলেন না। ছাহাবীগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আপনি নয় জনের বায়আত গ্রহণ করলেন, কিন্তু এই ব্যক্তির বায়আত গ্রহণ করলেন না কেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, এর শরীরে তাবীয রয়েছে তাই। অতঃপর সে নিজ হাতে তা ছিঁড়ে ফেললো। তারপর রাসূল a তার নিকট থেকেও বায়আত নিলেন এবং বললেন, যে ব্যক্তি তাবীয ঝুলায়, সে ব্যক্তি শিরক করে (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪২২, সিলসিলা ছহীহা, হা/৪৯২)।  রাসুল a বলেছেন, ঝাড়ফুঁক, তাবীয ও জাদুটোনা শিরকী কাজ  (আবূ দাউদ, হা/৩৮৮৩; ইবনু মাজাহ, হা/৩৫৩০; মিশকাত, হা/৪৫৫২)। তিনি a আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাবীয ঝুলালো, সে শিরক করলো’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪২২)। তিনি a আরো বলেছেন, ‘যে লোক কোনকিছু ঝুলিয়ে রাখে. তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়’ (তিরমিযী, হা/২০৭২, মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৭৮৬)। যদি ইমাম সাহেব এমন তাবীয দ্বারা চিকিৎসা করে যাতে শিরকী কথা আছে যেমন আল্লাহ ছাড়া কোন ফিরিশতা, নবী অথবা সৎ ব্যক্তির কাছে দুআ করা তাহলে এমন ইমামের পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে না। এমনকি কুরআন মাজীদের আয়াত দিয়ে তাবীয লিখলেও তার পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে না।


প্রশ্ন (৩) : ‘মুমিনের হৃদয় আল্লাহর আরশ’ এবং ‘অন্তর রবের ঘর’। উক্ত বর্ণনা দুটি কি সঠিক?

উত্তর : বর্ণনাটি মিথ্যা ও উদ্ভট (কাশফুল খাফা, হা/১৮৮৬; ইমাম ছাগানী, আল-মাওযূ‘আত, হা/৭০; আল-মাছনূ ফী মা‘রেফাতিল হাদীছিল মাওযূ‘ হা/২১৭, পৃ. ১৩১)। উক্ত ভিত্তিহীন বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে, আল্লাহ সব মুমিনের অন্তরে বিরাজমান। যেহেতু পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ আরশের উপর আছেন। তাই মুমিনের অন্তরকে আল্লাহর আরশ কল্পনা করা হয়েছে। (নাঊযুবিল্লাহ)

(খ)  অনুরূপ দ্বিতীয় বর্ণনাটিও মিথ্যা ও বাতিল (আল-মাছনূ ফী মা‘রেফাতিল হাদীছিল মাওযূ‘ হা/২১৭, পৃ. ১৩১)। উক্ত বর্ণনা দ্বারা বুঝানো হয় যে, যার অন্তর আছে তার মধ্যেই আল্লাহ আছে। সুতরাং ‘যত কল্লা তত আল্লাহ’ (নাঊযুবিল্লাহ)। এভাবে সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহর অস্তিত্ব ও উপস্থিতি সাব্যস্ত করা হয়েছে। সঠিক আক্বীদা হল, মহান আল্লাহ সপ্তম আকাশের উপরে আরশে সমুন্নত (ত্ব-হা, ৫)। তাঁর ক্ষমতা ও দৃষ্টি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত (ত্ব-হা, ৪৬)।


প্রশ্ন () : আল্লাহর ছিফাতসমূহকে কুদরত বলা এমন ইমামের পিছনে ছালাত আদায় করলে ছালাত হবে কি?

-মো. সামিউল ইসলাম
উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : আল্লাহ তাআলার ছিফাতগুলোকে কুরআন ও সুন্নাহর দলীল ছাড়া খেয়ালখুশি মতো ব্যাখ্যা করা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং এটি হলো ভ্রান্ত আকীদার বহিঃপ্রকাশ। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বৈশিষ্ট্য হলো তারা আল্লাহ তাআলার সকল ছিফাতকে কুরআন ও সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে সেভাবেই সাব্যস্ত করে, কোনটির অপব্যাখ্যা করে না। তবে কোন ব্যক্তি যদি আল্লহর ছিফাতকে অস্বীকার না করে, বরং সংশয় সন্দেহের কারণে কোন কোন ছিফাতের অপব্যাখ্যা করে যেমন আল্লাহর হাত মানে কুদরত ইত্যাদি, তাহলে এর দ্বারা সেই ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে না (মাজমু ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়া, ৭/৫০৭)। আহলে সুন্নাতের কোন ইমাম পাওয়া গেলে আল্লাহর ছিফাতকে অপব্যাখ্যাকারী কোন ব্যক্তিকে নির্ধারিত ইমাম বানানো উচিত নয়। তবে যদি এমন ব্যক্তিই ইমাম নিযুক্ত থাকে আর এর পিছনে ছালাত আদায় করে তবে তার ছালাত ছহীহ হবে ইনশা-আল্লাহ। আর আল্লাহই অধিক অবগত।


বিদআত


প্রশ্ন () :  আমাদের এলাকাতে ঈদগাহে শামিয়ানা টাঙানো হয় এবং ইদগাহ সুন্দরভাবে সাজানো হয়। এটি কি শরীয়তসম্মত?

-মাহফুজুর রহমান
রাজশাহী।

উত্তর : উক্ত কাজটি শরীয়তসম্মত নয়। ঈদের ছালাত ফাঁকা জায়গায় ও উন্মুক্ত স্থানে আদায় করাই সুন্নাত। কেননা মসজিদে নববীর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান যেখানে ছালাত আদায় করলে অন্য মসজিদের চেয়ে এক হাজার গুণ নেকি বেশি হয়। তারপরেও তিনি সেখানে ছালাত আদায় না করে প্রায় ৫০০ গজ দূরে গিয়ে খোলা ময়দানে উন্মুক্ত স্থানে ছালাত আদায় করেন (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬)। এসব হাদীছ স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, রোদ-বৃষ্টির কারণে শামিয়ানা ঈদের মাঠে টাঙানো যাবে না এবং ঈদের মাঠকে সাজানো যাবে না। কেননা এটি একটি নব আবিষ্কৃত বিষয়। আর রাসূল a বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।


প্রশ্ন () : হাদীছ থেকে জানা যায়, রাসূল a সূরা ফালাক্ব ও নাস পড়ে দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীর মাসাহ করতেন। কিন্তু অনেকে বুকে ফুঁ দেয়। এক্ষণে সূরা ফালাক্ব ও নাস পড়ে বুকে ফুঁ দেওয়া যাবে কি?

-মিনহাজ পারভেজ
নাটোর।

উত্তর : সূরা ফালাক্ব ও নাস পড়ে বুকে ফুঁক দেওয়ার বিষয়টি কোন ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাই এই আমল বর্জন করতে হবে। রাসূল a বলেছেন,  ‘কেউ যদি এমন আমল করে যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই তাহলে সেটি প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)। তবে বুকে নয়, রোগ ব্যাধির জন্য সূরা ফালাক্ব ও নাস পড়ে শরীরে ফুঁক দিতে পারে।


প্রশ্ন (৭) : ‘ইমাম আবূ হানিফা p আল্লাহকে ৯৯ বার দেখেছেন’ মর্মে বর্ণিত কাহিনী কি সত্য?  

-মো. তুহিন ইসলাম রাতুল
গাজীপুর।

উত্তর: উক্ত ঘটনাটি বানোয়াট যার কোন বিশুদ্ধ ভিত্তি নেই। সুতরাং একজন সম্মানিত ইমাম সম্পর্কে এধরনের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া কোন মুসলিমের জন্য আদৌ জায়েয নয়। কেননা এই চক্ষু ‍দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখতে পারবে না। আল্লাহ বলেন, ‘দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ব করেন এবং তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত’ (আল-আন‘আম, ৬/১০৩)। মূসা e যখন আল্লাহকে দেখতে চাইলেন, তখন আল্লাহ বললেন, ‘কখনই (দুনিয়াতে) তুমি আমাকে দেখতে পাবে না’ (আল-আরাফ, ৭/১৪৩)। সুতরাং ইমাম আবূ হানীফা সম্পর্কে এই ধরনের মিথ্যা কাহিনী বর্ণনা করা হতে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।


প্রশ্ন () :  ঈদের ছালাত আদায়ের পূর্বে কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে কি?

-আকীমুল ইসলাম
জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।

উত্তর :  না, ঈদের ছালাতের পূর্বে কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না। এমনকি কোনো ক্বিরাআত, গযল, সঙ্গীত কিছুই বলা যাবে না। বরং প্রথমে ছালাত আদায় করতে হবে। অতঃপর খুৎবা দিতে হবে। আবূ সাঈদ খুদরী c বলেন, নবী a ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে ঈদগাহের দিকে বের হতেন এবং সেখানে প্রথমে যা করতেন তা হলো ছালাত। অতঃপর জনতার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন আর জনতা তখন নিজেদের কাতারে বসা থাকত। তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন, নছীহত করতেন এবং নির্দেশ দিতেন। আর যদি কোথাও সৈন্য প্রেরণের ইচ্ছা করতেন তাদেরকে বাছাই করতেন অথবা যদি কাউকে কোনো নির্দেশ দেওয়ার থাকত, নির্দেশ দিতেন। অতঃপর বাড়ি ফিরে যেতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯৪; মিশকাত, হা/১৪২৬)। উল্লেখ্য যে, ঈদের ছালাতের পূর্বে খুৎবা দেওয়ার প্রচলন শুরু করেন মারওয়ান ইবনু হাকাম (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯)। তখন প্রখ্যাত ছাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী a তার সেই কাজের প্রতিবাদ করেছিলেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৫৬)। সুতরাং খুৎবার পূর্বে কোন বক্তব্য দেওয়া চলবে না, বরং আগে ঈদের ছালাত আদায় করতে হবে।


ইবাদত- ছালাত


প্রশ্ন (৯) : কেউ যদি যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার ছালাত যথাসময়ে জামাআতে আদায় করে কিন্তু ফজরের ছালাত নিয়মিত ত্যাগ করে পরবর্তীতে যোহরের আগে অথবা পরে অথবা অন্যকোনো সময়ে আদায় করে নেয় তবে তার বিধান কি হবে?

-মুহাম্মাদ আল ইমরান
সাদুল্লাপুর, গাইবান্ধা।

উত্তর : ছালাতের ব্যাপারে উক্ত কথা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। সকল কাজের আগে ছালাতকে প্রধান্য দিতে হবে। যেকোনো মূল্যে নির্ধারিত সময়েই ছালাত আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে ছালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য’ (আন-নিসা, ৪/১০৩)। আর ছালাত বাদ দিয়ে বা ছালাতকে তুচ্ছ মনে করে অন্য ইবাদত করে কোনো লাভ হবে না। রাসূল a বলেন, ক্বিয়ামতের মাঠে বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেয়া হবে ছালাতের। ছালাতের হিসাব শুদ্ধ হলে তার সমস্ত আমলই শুদ্ধ হবে। আর ছালাতের হিসাব ঠিক না হলে, তার সমস্ত আমল বরবাদ হবে’ (ত্বাবারাণী, আল-মু‘জামুল আওসাত্ব, হা/১৮৫৯, সিলসিলা ছহীহা, হা/১৩৫৮)। সুতরাং নিয়মিতভাবে ফজরের ছালাত ক্বাযা করার এই অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। আর ওয়াক্তমত ফজরের ছালাত আদায়ের জন্য যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এরপরও কোন কারণবশত কোনদিন ঘুম থেকে উঠতে না পারলে যখন জাগ্রত হবে, তখনই আদায় করে নিবে। রাসূল a বলেন, مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهُ أَنْ يُّصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا ‘যদি কেউ কোন ছালাত আদায় করতে ভুলে যায় অথবা আদায় না করে ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে তার কাফফারা হলো, যখনই স্মরণ হবে, তখনই আদায় করে নিবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৪; মিশকাত, হা/৬০৩)।


প্রশ্ন (১০) : জুমআর ছালাত কত রাকা‘আত? আর দুই রাকা‘আত ফরয পরে কত রাকা‘আত সুন্নত আদায় করতে হবে?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
গাজীপুর।

উত্তর : জুমআতে ফরয ছালাতের পরিমাণ হলো দুই রাকা‘আত। জুম‘আর পূর্বে নির্দিষ্ট কোন সুন্নাত ছালাত নেই। সময় পেলে খুৎবার আগ পর্যন্ত যত খুশী দুই রাকা‘আত করে নফল ছালাত আদায় করবে (ছহীহ বুখারী, হা/৮৮৩)। অন্যথায় কেবল তাহিয়্যাতুল মসজিদ হিসেবে দুই রাকা‘আত পড়ে বসবে (ছহীহ বুখারী, হা/১১৬৩)। জুমআর পরে যদি মসজিদে সুন্নাত ছালাত আদায় করতে চায় তাহলে চার রাক‘আত আদায় করবে। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন জুমআর ছালাত আদায় করে, তখন সে যেন তার পরে চার রাকা‘আত (সুন্নাত) ছালাত আদায় করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৮১)। আর যদি বাড়ীতে আদায় করতে চায় তাহলে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করবে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার h হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a জুমু‘আহর দিন নিজের ঘরে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত ছালাত আদায় করতেন না। (ঘরে গিয়ে) তিনি দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৯৩৭, ছহীহ মুসলিম, হা/৮৮২)।


প্রশ্ন (১১) : দাঁড়াতে পারে, রুকূ‘ করতে পারে কিন্তু পা ভাজ করে বসতে পারে না এক্ষেত্রে কিভাবে ছালাত আদায় করা উচিত ৷ আর এমন ব্যক্তি চেয়ারে বসে সম্পূর্ণ ছালাত আদায় করতে পারবে কি-না?

-হারুনুর রশীদ
চাপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : ছালাতের বেশ কিছু রুকন ও ওয়াজিব কাজ আছে যেগুলো কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে ছালাত বাতিল হয়ে যাবে। যেমন. রুকূ‘ করা, সিজদা করা সেই রুকনগুলোরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ছালাতের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী ছালাতের প্রতি এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে’ (আল-বাক্বারা, ২/২৩৮)। ইমরান ইবনু হুসাইন c হতে বৰ্ণিত, তিনি বলেন, আমার অৰ্শরোগ ছিল। তাই রাসূলুল্লাহ a-এর খিদমতে এসে ছালাত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, ‘দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে, তা না পারলে বসে। যদি তাও না পারো তাহলে শুয়ে ছালাত আদায় করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১১১৭, তিরমিযী, হা/৩৭২, আবূ দাউদ, হা/৯৫২)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, মানুষ তার শরীরের গতি অনুযায়ী ছালাত আদায় করবে। সম্ভব হলে দাঁড়িয়ে, না হলে বসে, আর না হলে শুয়ে ছালাত আদায় করবে। তবে একেবারে নিরূপায় হয়ে চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করা যায়।


প্রশ্ন (১২) : প্রাণীর ছবিযুক্ত পোশাক পরে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-রেজাউল হক
দক্ষিন চব্বিশ পরগনা, ভারত।

উত্তর : প্রথমত মানুষ বা যেকোনো প্রাণীর ছবিযুক্ত কোনো পোশাক পরিধান করা জায়েয নেই। ছোট-বড় সকল মুসলিমের জন্য এ ধরনের পোশাক পরিধান করা অবৈধ। আর প্রাণীর ছবিযুক্ত পোশাক পরে ছালাত আদায় করাও জায়েয নয়। কেউ যদি এ ধরনের পোশাক পরে ছালাত আদায় করে, তাহলে তার ছালাত ছহীহ হবে না। কেননা রাসূল a বলেছেন, ‘ঐ ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না যেখানে ছবি বা কুকুর রয়েছে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩২২৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২১০৬)।


প্রশ্ন (১৩) : নিয়মিত যোহর ছালাতের পূর্বের সুন্নাত না পড়লে কোনো সমস্যা হবে কি?

-মো. আব্দুস সামাদ
দিনাজপুর।

উত্তর : সুন্নাত ছালাত আদায়ের ফযীলত অনেক। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উচিত সুন্নাত ও নফল ইবাদতের প্রতি আগ্রহী হওয়া। উম্মু হাবীবা g থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ a-কে বলতে শুনেছি যে, দিন ও রাতে যে ব্যক্তি মোট বারো রাকা‘আত (সুন্নাত) ছালাত আদায় করে তার বিনিময়ে জান্নাতে ঐ ব্যক্তির জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হয়। এ সুন্নাতগুলো হলো- যোহরের (ফরযের) পূর্বে চার রাকা‘আত ও পরে দুই রাকা‘আত, মাগরিবের (ফরযের) পর দুই রাকা‘আত, ইশার (ফরযের) পর দুই রাকা‘আত এবং ফজরের (ফরযের) পূর্বে দুই রাকা‘আত (ছহীহ মুসলিম হা/৭২৮, তিরমিযী, হা/৪১৪)। আবার ক্বিয়ামতের দিন ফরয ইবাদতের ঘাটতি হলে আল্লাহর হুকুমে নফল ইবাদতের নেকি দ্বারা তা পূর্ণ করা হবে (আবূ দাঊদ, হা/৮৬৪; তিরমিযী, হা/৪১৩)। তবে অবজ্ঞা না করে অলসতা বা কোনো কারণবশত সুন্নাত ছেড়ে দিলে সমস্যা নেই। আর কোন ব্যক্তি নফল ছালাত ছাড়ার কারণে গুনাহগার হয় না। তবে অবশ্যই তিনি বড় ধরণের ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবেন।


প্রশ্ন (১৪) : দুই রাকা‘আত বিশিষ্ট ছালাতের শেষ বৈঠকে তাওয়াররুক করে বসা কি সুন্নাত?

-মো. জহিরুল ইসলাম
ঢাকা।

উত্তর : ছালাতের যে বৈঠকে সালাম আছে সেখানেই তাওয়াররুক করে বসবে। আবূ হুমাইদ আস-সায়েদী c রাসূল a-এর ছালাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, সবশেষে তিনি a সালাম ফিরানোর পূর্বের সিজদা শেষ করে বাম পা বাইরের দিকে বের করে বাম পাশের নিতম্বের উপর বসতেন (আবূ দাউদ, হা/৯৬৩, ইবনু মাজাহ, হা/১০৬১)।


প্রশ্ন (১৫) : মহিলা ইমামের পিছনে মহিলারা ঈদের ছালাত আদায় করতে পারবে কি?

-আলাউদ্দীন আলী
ঢাকা।

উত্তর : না, মহিলার ইমামতিতে ঈদ ও জুমআর ছালাত আদায় করা যাবে না। তাছাড়া ঈদের ছালাতে খুৎবা আছে। আর মহিলাদের জন্য খুৎবা দেওয়া জায়েয নয়। শরীয়তে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূল a বলেছেন, ‘যে কেউ এমন কোন আমল করল, যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।


প্রশ্ন (১৬) : তারাবীহ ছালাত জামা‘আতে আদায় করার পর রাতের অনেক সময় বাকি থাকে। প্রশ্ন হলো- রাতে আমরা তারাবীহ ব্যতীত অতিরিক্ত নফল ছালাত আদায় করতে পারবো কি?

-ফজলে রাব্বী
মহিমাগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্দা।

উত্তর : উত্তম হলো তিন রাকা‘আত বিতরসহ মোট এগারো  রাকা‘আত ছালাত আদায় করা। আবূ সালামা ইবনু আব্দুর রাহমান p হতে বর্ণিত, তিনি আয়েশা g-কে জিজ্ঞেস করেন, রামাযান মাসে আল্লাহর রাসূল a-এর ছালাত কেমন ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল a রামাযান মাসে এবং অন্যান্য সময় (রাতে) এগার রাক‘আতের অধিক ছালাত আদায় করতেন না। তিনি চার রাকা‘আত ছালাত আদায় করতেন। তুমি সেই ছালাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর তিনি আরো চার রাকা‘আত ছালাত আদায় করতেন, এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। অতঃপর তিনি তিন রাকা‘আত (বিতর) ছালাত আদায় করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১১৪৭)। উমার ইবনুল খাত্তাব c তামীম আদ-দারী ও উবায় ইবনু কা‘ব h-কে নির্শে দিয়েছিলেন যে, তারা যেন লোকদেরকে নিয়ে এগারো রাকা‘আত ছালাত আদায় করে (মুয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৭৯)।


প্রশ্ন (১৭) : ইমামের সাথে তারাবীহ সম্পন্ন করে বাড়িতে এসে একাকী বিতর ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-ফজলে রাব্বী
মহিমাগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্দা।

উত্তর : হ্যাঁ; যাবে। তারাবীহর ছালাত জামাআতে পড়া যেমন জরুরী নয়, তেমনই বিতর ছালাতও জামাআতে পড়া জরুরী নয়। কোন মুসল্লীর আরো ছালাত আদায়ের জন্য অথবা একাই বিতর ছালাত আদায়ের জন্য তারাবীহর ছালাতের পরে বাড়ি চলে যাওয়া, এমন আমলের কোন প্রমাণ নেই। বরং বিতরসহ তারাবীহ একা পড়াই উত্তম। রাসূল a বলেছেন, হে লোকেরা! তোমরা নিজ নিজ ঘরেও ছালাত আদায় করো। কারণ, মানুষের সবচেয়ে উত্তম ছালাত হল যা সে তার ঘরে আদায় করে, তবে ফরয ছালাত ছাড়া (ছহীহ বুখারী, হা/৭২৯০)।


ইবাদত- ছিয়াম


প্রশ্ন (১৮) : শাওয়ালের ছয়টি ছিয়ামের ফযীলত কি?

-মনিরুল ইসলাম
মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : রামাযানের ছিয়াম পালনের পরে শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম পালন করলে পূর্ণ বছর ছিয়াম পালনের নেকি পাওয়া যায়। আবূ আইয়ূব আনছারী c হতে বর্ণিত, তিনি  বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়াম পালন করল অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম পালন করল, সে যেন পুরো বছরই ছিয়াম পালন করল’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৪; মিশকাত, হা/২০৪৭)।


প্রশ্ন (১৯) : শাওয়াল মাসের ছয়টি ছিয়াম কি একাধারে আদায় করতে হবে, না-কি বিচ্ছিন্নভাবেও আদায় করা যাবে? আর এই দুটির মধ্যে কোনটি করা উত্তম

-ফাতিমা খাতুন
বরিশাল।

উত্তর : শাওয়ালের ছিয়ামগুলো একাধারে আদায় করা শর্ত নয়, বরং আলাদা আলাদাভাবেও আদায় করা যায়। আবূ আইয়ুব আনছারী c থেকে বর্ণিত, রাসূল a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রামাযান মাসের ছিয়াম পালন করার পরে শাওয়াল মাসে ছয়দিন ছিয়াম পালন করে, সে যেন সারা বছরই ছিয়াম পালন করল’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৪)। এখানে একাধারে আদায় করতে হবে এমন কোন শর্ত করা হয়নি। সুতরাং শাওয়াল মাসের যেকোনো দিনে আদায় করা যাবে। তবে যত তাড়াতাড়ি আদায় করা যায় ততই ভালো।  কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাক্বীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে’ (আলে ইমরান, ৩/১৩৩)। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে পালন করার চেয়ে একাধারে শাওয়ালের ছিয়াম পালন করাই বেশি উত্তম।


প্রশ্ন (২০) : রামাযান মাসে আমার হায়েয চলার কারণে আমি কয়েকটি ছিয়াম পালন করতে পারিনি। আমার প্রশ্ন হলো, শাওয়াল মাসের ছয়টি ছিয়াম পালন করার সময় যদি আমি  রামাযানের ক্বাযা করার নিয়াত করি তবে কি সেই ক্বাযা আদায় হবে?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর : রামাযানের ক্বাযা আদায়ের নিয়্যতে শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম পালন করা শরীয়তসম্মত নয়। কেননা রামাযানের ছিয়াম এবং শাওয়ালের ছিয়াম দুটি পৃথক পৃথক ইবাদত যেগুলো সত্ত্বাগতভাবেই উদ্দেশ্য। সুতরাং দুটিকে একত্রিত করা ছহীহ নয় (ফাতাওয়া শাবাকাতুল ইসলামিয়্যা, ৭/১১৮৩)। রামাযানের ক্বাযার নিয়্যতে শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম পালন করলে তাতে শাওয়ালের ছয়টি ছিয়ামের নেকি অর্জিত হবে না। বরং তাতে পৃথকভাবে নিয়্যত করে অন্য দিনে ছিয়াম পালন করবে।


প্রশ্ন (২১) : যারা শুধু রামাযান মাসে ছালাত আদায় করে ও ছিয়াম পালন করে তাদের ইবাদত কবুল হবে কি

উত্তর : এমন মানুষের ইবাদাত কবুল হবে না। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘অনেক ছিয়াম পালনকারী এমন আছে যারা তাদের ছিয়ামের বিনিময়ে ‘ক্ষুধার্ত থাকা ছাড়া’ আর কোন ফল লাভ করতে পারে না। এমন অনেক ক্বিয়ামরত (দন্ডায়মান) ব্যক্তি আছে যাদের রাতের ‘ইবাদাত নিশি জাগরণ ছাড়া আর কোন ফল আনতে পারে না (মুসনাদ আহমাদ, হা/৯৬৮৩; মিশকাত, হা/২০১৪)।  সাথে সাথে রাসূল বলেছেন, ‘যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ছালাত আদায় করে না তারা কাফের’।


প্রশ্ন (২২) : রামাযা মাসে ছুটে যাওয়া ছিয়ামের ক্বাযা আদায় করার আগে যদি শাওয়াল মাসের ছিয়াম পালন করি, তাহলে সেটি কি সঠিক হবে?  

-আতাউর রহমান
রাজশাহী।

উত্তর : হ্যাঁ; রামাযানের ক্বাযা আদায় করার আগে শাওয়ালের ছিয়াম পালন করলে তা সঠিক হবে। কেননা রামাযানের ছিয়াম হলো ফরয, যা ঋতু বা অসুস্থতার কারণে ছুটে গেলে অন্য যেকোনো সময় আদায় করে নিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৫)। আয়েশা g রামাযানের ছুটে যাওয়া ছিয়াম প্রায় দশ মাস পরে শা‘বান মাসে আদায় করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৫০)। আর শাওয়ালের ছিয়াম হলো নফল, যা শাওয়াল মাসেই আদায় করতে হয়। রাসূল a বলেছেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ ‘যে ব্যক্তি রামাযান মাসের ছিয়াম পালন করার পরে শাওয়াল মাসে ছয়দিন ছিয়াম পালন করে, সে যেন সারা বছরই ছিয়াম পালন করল’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৪)। সুতরাং রামাযানের ক্বাযা আদায় করার আগে শাওয়ালের ছিয়াম পালন করলে তা সঠিক হবে।


প্রশ্ন (২৩) : সাহারীর সময় মানুষকে জাগানোর জন্য মাইকে আযান দেওয়া, গজল গাওয়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, বক্তব্য দেওয়া ও সাইরেন বাজানো যাবে কি?

-আব্দুল্লাহ, চট্টগ্রাম।

উত্তর : সাহারীর সময় মানুষকে জাগানোর জন্য আযান দেওয়া সুন্নাত। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘বিলাল c রাত থাকতেই আযান দেয়। কাজেই ইবনু উম্মু মাকতূম c আযান না দেওয়া পর্যন্ত তোমরা খাও এবং পান করো’। আব্দুল্লাহ c বলেন, ইবনু উম্মু মাকতূম c ছিলেন অন্ধ। যতক্ষণ না তাঁকে বলে দেওয়া হতো যে, ‘ভোর হয়েছে, ভোর হয়েছে’ ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আযান দিতেন না (ছহীহ বুখারী, হা/৬১৭, ছহীহ মুসলিম, হা/১০৯২)। আযান দেওয়া ব্যতীত গজল গাওয়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, বক্তব্য এবং সাইরেন বাজানো এগুলোর কোনটিই শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত নয়, বরং এগুলো বিদআত। সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।


প্রশ্ন (২৪) : বিগত রামাযানের বেশ কয়েকটি ছিয়াম বাকি আছে। এ ছিয়াম কি ধারাবাহিকভাবে পালন করতে হবে না-কি বিরতি দিয়ে আদায় করা যাবে?

-জাহাঙ্গীর আলম
উত্তরামপুর, পত্নীতলা, নওগাঁ।

উত্তর : রামাযানের ছুটে যাওয়া ছিয়ামগুলো ধারাবাহিকভাবে পালন না করে বিরতি দিয়েও পালন করা যাবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তারা অন্য দিনগুলোতে পুরণ করবে (আল-বাক্বারা, ২/১৮৪)। এখানে ধারাবাহিকভাবে পালন করার শর্ত করা হয়নি। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, বিরতি দিয়ে রামাযানের ছুটে যাওয়া ছিয়াম পালন করা যাবে। তবে ধারাবাহিকভাবে পালন করাই অধিক উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাক্বীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে’ (আলে ইমরান, ৩/১৩৩)। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে পালন করার চেয়ে একাধারে রামাযানের ছিয়াম পালন করাই বেশি উত্তম।


প্রশ্ন (২৫) : কোনো ব্যক্তি যদি রামাযানে রাত্রিতে স্ত্রী সহবাস করে ঘুমিয়ে যায় এবং অপবিত্র অবস্থায় সাহারী খেয়ে ছিয়াম রাখে, তাহলে উক্ত ছিয়াম শুদ্ধ হবে কি?

-আমাতুল্লাহ, ঢাকা।

উত্তর : যদি ফজর উদিত হওয়ার আগে গোসল না করে, বরং অপবিত্র অবস্থায় সাহারী খেয়ে ছিয়াম থাকে তবুও তার ছিয়াম শুদ্ধ হবে। আবূ বাকর ইবনু ‘আব্দুর রহমান p হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতার সঙ্গে রওয়ানা হয়ে আয়েশা g-এর নিকট পৌঁছলাম। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল a সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি স্বপ্নদোষ ব্যতীতই স্ত্রী সহবাসের কারণে জুনুবী অবস্থায় সকাল পর্যন্ত থেকেছেন এবং এরপর ছিয়াম পালন করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৩১)। আবূ বাকর p থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা মারওয়ান তাকে উম্মু সালামা g-এর নিকট পাঠালেন ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য যার জানাবাতের (অপবিত্র) অবস্থায় ভোর হলো, সে ছিয়াম পালন করতে পারবে কি? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ a-এর স্বপ্নদোষ ব্যতিরেকে স্ত্রী সহবাসের কারণে গোসল ফরয হওয়া অবস্থায় ভোর হত। এরপর তিনি ছিয়াম ভঙ্গও করতেন না এবং ছিয়ামের ক্বাযাও করতেন না (ছহীহ মুসলিম, হা/১১০৯)। তবে রোগ ব্যাধি না থাকলে ফজরের ছালাতের আগে অবশ্যই তাকে গোসল করে ছালাত আদায় করতে হবে।


প্রশ্ন (২৬) : লায়লাতুল ক্বদর কি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে হয়ে থাকে নাকি এক সাথে? যদি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হয়ে থাকে তাহলে, সৌদি আরবে বিজোড় রাত হলে আমাদের দেশে জোড় রাত হয়এক্ষণে আমরা কিভাবে লায়তুল ক্বদর খুঁজব?

-কাজী দ্বীন ইসলাম দিপু
শরীয়তপুর।

উত্তর : ক্বদরের রাত মহান আল্লাহর গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত। আমাদের বিশ্বের ২৪ ঘন্টার সীমাবদ্ধ দিন রাতের যে সময় তা আল্লাহর সৃষ্টি। মহান আল্লাহর গায়েবেও এভাবেই এই সময়েই সবকিছু হয় এটা ভেবে নেওয়া জায়েয নয়। কেননা মহান আল্লাহ তার নিজের সৃষ্টি করা সময়ের উর্ধ্বে (সুবহানাহু তাআলা)। সুতরাং লাইলাতুল ক্বদরকে নিজের হিসাবে তুলনা করে প্রশ্ন উত্থাপন করা মূলত গায়েবের বিষয়ের উপর প্রশ্ন উত্থাপন করা যা মোটেই ঠিক নয়। কেননা মানুষের দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির যেমন সীমা রয়েছে তেমনি মানুষের চিন্তাশক্তিরও সীমা রয়েছে। আর গায়েবের এই বিষয়গুলো মানুষের চিন্তাশক্তির বাহিরে। এটি মহান আল্লাহ নিজেই পরিচালনা করেন। রাসূলুল্লাহ a লায়লাতুল ক্বদর রামাযানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিগুলোতে অন্বেষণ করতে বলেছেন। তাছাড়া কোন তারিখে লায়লাতুল ক্বদর হবে? সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ a নির্দিষ্ট করে কিছু বলে যাননি। বরং তিনি একাধিক হাদীছে বলেছেন, ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকের প্রত্যেক বেজোড় রাত্রিতে ক্বদর তালাশ করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০১৭; মিশকাত, হা/২০৮৩)। সুতরাং এই শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিগুলোতে অন্বেষণ করলেই আশা করা যায় লায়লাতুল ক্বদর পেয়ে যাবে।


প্রশ্ন (২৭) : বিগত দিনের ছুটে যাওয়া ছিয়াম না জানার কারণে ক্বাযা আদায় করা হয়নি। এখন সেই ছিয়ামগুলো সম্পর্কে শারঈ বিধান কী?

-জসিম আলী
মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : বিগত দিনের ছুটে যাওয়া ছিয়ামের সংখ্যা যদি নিশ্চিতভাবে জানা থাকে, তাহলে অবশ্যই সেগুলোতে একটি ছিয়ামের বদলে একটি ক্বাযা করতে হবে। স্বেচ্ছায় ছিয়াম ছেড়ে দিলে একটি ছিয়ামের বদলে একটিই ক্বাযা করতে হয়। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, নবী a বলেছেন, ‘কোনো লোকের ছিয়াম থাকাবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হলে সে লোককে ঐ ছিয়ামের ক্বাযা আদায় করতে হবে না। কিন্তু কোনো লোক ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে তাকে ক্বাযা আদায় করতে হবে (তিরমিযী, হা/৭২০)। তবে বিগত দিনের ছিয়ামের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা না থাকলে তার ক্বাযা আদায় করবে না। এক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে। মানুষ বিনয়ী হয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ বলেন, (হে নবী) ‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (আয-যুমার, ৩৯/৫৩)।


পারিবারিক বিধান- আক্বীক্বা


প্রশ্ন (২৮) : সাতদিন বয়স হওয়ার আগে কোনো বাচ্চা মারা গেলে তার আক্বীক্বা দিতে হবে কি?

-আতাউর রহমান
মোহাম্মাদপুর, ঢাকা-১২০৭।

উত্তর :  না, সাতদিন বয়স হওয়ার আগেই কোনো বাচ্চা মারা গেলে তার আক্বীক্বা দিতে হবে না। সামুরা c হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, সকল শিশুই তার আক্বীক্বার সাথে বন্ধক (দায়বদ্ধ) অবস্থায় থাকে। জন্মগ্রহণ করার সপ্তম দিনে তার পক্ষে যবেহ করতে হবে, তার নাম রাখতে হবে এবং তার মাথা নেড়া করতে হবে (আবূ দাউদ, হা/২৮৩৭; তিরমিযী, হা/১৫২২)। এই হাদীছে আক্বীক্বা করা সপ্তম দিনেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সুতরাং সপ্তম দিনের আগেই বাচ্চা মারা গেলে তার আক্বীক্বা দিতে হবে না (তুহফাতুল আহওয়াযী, ৫/৯৭-৯৮)।


মৃতের বিধান- জানাযা


প্রশ্ন (২৯) : মৃত মহিলাকে গোসল দেওয়ার পর শরীরে আতর, করপুর, সুরমা লাগানো যাবে কি?

-শাহজালাল, নওগাঁ।

উত্তর : মুহরিম ব্যতীত সাধারণভাবে মৃত্যুবরণকারী মায়্যেতের শরীরে বা কাফনের কাপড়ে, গোসলের সময় বা পরে সুগন্ধি জাতীয় জিনিসের ব্যবহার করা জায়েয। জাবের c হতে বর্ণিত, রাসূল a বলেছেন, ‘যদি তোমরা মায়্যেতকে সুগন্ধি লাগাও তাহলে তিনবার লাগাও’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৫৮০)। আসমা’ বিনতু আবূ বকর g মৃত্যুর পূর্বে তার পরিবারের লোকদের অছিয়ত করে বলেন, আমি যখন মারা যাব তখন তোমরা আমাকে সুগন্ধ ধুঁয়া দিবে অতঃপর সুগন্ধি ব্যবহার করবে (সুনানুল কুবরা বায়হাক্বী, হা/৬৯৫১; মুয়াত্বা, হা/৫৩০)। যায়নাব g–এর গোসলের সময় রাসূল a কর্পুর (সুগন্ধি) ব্যবহার করতে আদেশ করেছিলেন (ছহীহ বুখরী, হা/১২৫৩)। ইবনু আব্বাস h থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তির উট তার ঘাড় মটকে দিল। (ফলে সে মারা গেল)। আমরা তখন রাসূলুল্লাহ a-এর সঙ্গে ছিলাম। সে ছিল ইহরাম অবস্থায়। তখন নবী a বললেন, ‘তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দুই কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা আবৃত করো না। কেননা, আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তাকে তালবিয়া পাঠ অবস্থায় উঠিয়ে নিবেন  (ছহীহ বুখারী, হা/১২৬৭)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, ইহরাম অবস্থায় মারা গেছেন এমন মায়্যেত ব্যতীত সকল ময়্যেতকে সুগন্ধি লাগানো যাবে। তবে সুরমা লাগানোর কথা হাদীছে পাওয়া যায় না। তাই এমনটি করা জায়েয নয় (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ৭/৩৪০)।


পারিবারিক বিধান- বিবাহ


প্রশ্ন (৩০) : কাজী অফিসে গিয়ে আমি বিয়ে করি, আমার বিয়ের সাক্ষী থাকে আমার বন্ধু ও তার স্ত্রী। আরো সাথে ছিলেন কাজীর সাথের এক ব্যক্তি। আমার শ্বশুর বেঁচে নেই, তাই আমার স্ত্রী তার মায়ের অনুমতি নিয়ে আমার সাথে বিয়ে বসে আমি জানতে চাই আমাদের বিয়ে কি ইসলাম মোতাবেক হয়েছে?

-মো. তোয়াছিন
চাঁদপুর।

উত্তর : কোনো নারী বিবাহের অভিভাবক হতে পারবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘কোনো নারী অন্য কোনো নারীকে বিবাহ দিতে পারে না এবং কোনো নারী নিজেও বিবাহ করতে পারে না। যে নারী নিজে বিবাহ করে সে ব্যভিচারিণী’ (ইবনু মাজাহ, হা/১৮৮২; মিশকাত,  হা/৩১৩৭)। অভিভাবক ছাড়াই যেহেতু এই বিবাহ হয়েছে তাই এটি শরীয়তসম্মত হয়নি। আবূ মূসা আশআরী c নবী করীম a হতে বর্ণনা করেন যে, অভিভাবক ব্যতীত বিবাহ শুদ্ধ হবে না (তিরমিযী, হা/১১০১; আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৮১, মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৭৪৬; মিশকাত, হা/৩১৩০)। রাসূলুল্লাহ আরো বলেছেন, অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত কোনো নারী বিবাহ করলে তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল (আবূ দাউদ, হা/২০৮৩, তিরমিযী, হা/১১০২)। এক্ষেত্রে মেয়ের দাদা অভিভাবক হবে, দাদা না থাকলে নিজ ভাই এভাবে তার নিকটাত্মীয়গণ অভিভাবক হবে (আশ-শারহুল মুমতে‘, ১২/৮৪ পৃ.)।


প্রশ্ন (৩১) : বিবাহে মেয়েকে কবূল বলানো কি শরীয়তসম্মত?  

-মাহফুজ
রাজশাহী।

উত্তর : কনেকে কবূল বলাতে হবে না। কেননা কনেকে কবূল বলাতে হবে মর্মে কুরআন ও হাদীছে কোন দলীল পাওয়া যায় না। বরং বিবাহের ক্ষেত্রে মেয়ের অভিভাবক তার সম্মতি নিয়ে বিবাহের মজলিশে দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে বরকে বলবে, আমি আমার মেয়েকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে রাজী, তুমি তাকে স্ত্রী হিসেবে কবূল করো। তখন বর বলবে, আমি কবূল করলাম। এতেই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে। বিবাহের মজলিশে খুতবা দেওয়া সুন্নাত। রাসূল a বলেছেন, কোনো বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিবাহ দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দিতে পারবে না। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে? তিনি বললেন, চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৩৬, ৫১৩৭)। সুতরাং সমাজে প্রচলিত কনের কাছে দুই সাক্ষী নিয়ে গিয়ে তাকে কবূল বলানোর প্রথা বর্জন করতে হবে।


প্রশ্ন (৩২) : বিবাহের সময় ছেলে-মেয়েদের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করা যাবে কি?  

-মতিউর, ঢাকা।

উত্তর : না, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করা যাবে না। কেননা এগুলো বিজাতীয়দের থেকে আগত কুসংস্কার। আর বিজাতীয়দের সাদৃশ্য অবলম্বন করা সম্পূর্ণভাবে হারাম। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে ব্যক্তি সেই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে (আবূ দাউদ, হা/৪০৩১)। সুতরাং গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকতে হবে। তবে অনুষ্ঠান ছাড়াই বর-কনে গায়ে হলুদ দিতে পারে যা খালা, ফুফু, দাদী, নানী ও নিজ বোনেরা বাস্তবায়ন করবে। একদা রাসূল a আব্দুর রহমান ইবনু আউফের শরীরে হলুদ চিহ্ন দেখতে পেয়ে বললেন, ‘তুমি কি বিবাহ করেছ’ (আবূ দাউদ হা/২১০৯)। এতে বুঝা যায়, বর-কনে উভয়েই গায়ে হলুদ দিতে পারে। তবে প্রচলিত যুবতী মেয়েদের মাধ্যমে হলুদ মাখার অনুষ্ঠান অবশ্যই বর্জন করতে হবে।


প্রশ্ন (৩৩) : একজন পুরুষের বিবাহ না হলে তার চরিত্র রক্ষা করা কঠিন হচ্ছে। কিন্তু তার পিতামাতা তাকে বিবাহ দিতে চাচ্ছে না তারা চাচ্ছে সে আরো পড়াশোনা করুক, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক। তাদের তেমন ইসলামের জ্ঞান নেই আর তারা তেমন দ্বীনদারও না। এমতাবস্থায় সেই ছেলে কি তার পিতা মাতার ইচ্ছার বাহিরে একা কোথাও বিবাহ করতে পারবে? হাদীছে তো বর্ণিত আছে, পিতা মাতার অবাধ্যতা হারাম।

-নিয়াজ মোরশেদ
কালকিনি, মাদারীপুর।

উত্তর : চরিত্র রক্ষা করার জন্য বিবাহ করা এবং পিতা-মাতার আনুগত্য করা উভয়টিই অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এক্ষেত্রে শরীয়তে বিবাহের গুরুত্বের বিষয়টি পিতা-মাতাকে বুঝাতে হবে এবং যথাসম্ভব তাদেরকে বুঝিয়ে ও রাজী করে তাদের মতে বিবাহ করতে হবে। আর যদি একান্তই তারা বিবাহ দিতে রাজী না হয় তাহলে তাদের প্রতি সদাচরণ এবং তাদেরকে সাধ্যমতো সন্তুষ্ট রেখে ছেলে বিবাহ করে নিজের চরিত্রের সুরক্ষা করবে। আবূ সাঈদ ও ইবনু আব্বাস h হতে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির কোনো সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) জন্মগ্রহণ করে, সে যেন তার উত্তম নাম রাখে। আর (উত্তম) আচার-আচরণ শিক্ষা দেয় এবং যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হয় তখন যেন তার বিয়ে দেয়। বয়ঃপ্রাপ্তির পর যদি বিয়ে না দেয় এবং ঐ সন্তান যদি কোনো পাপ করে, তবে ঐ পাপের বোঝা পিতার ওপর বর্তাবে’ (মিশকাত, হা/৩১৩৮)।


পারিবারিক বিধান- তালাক


প্রশ্ন (৩৪) : এক মহিলার তালাক হওয়ার পর ইদ্দত পালন শেষে যদি পরবর্তিতে আবার বিবাহ করতে চায় তাহলে কি তার জন্য অভিভাবকের অনুমতি লাগবে? না-কি সে নিজেই বিবাহ করতে পারবে?

-শামীম
নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : কুমারী, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তাসহ সকল মহিলার বিবাহে তার অভিভাবক থাকা শর্ত। নবী a বলেছেন, ‘অভিভাবক ব্যতীত বিবাহ শুদ্ধ হবে না’ (তিরমিযী, হা/১১০১; আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; ইবনু মাজাহ, হা/১৮৮১; আহমাদ, হা/১৯৭৪৬; মিশকাত, হা/৩১৩০)। রাসূলুল্লাহ a আরো বলেছেন, ‘কোনো নারী অন্য কোনো নারীকে বিবাহ দিতে পারে না এবং কোনো নারী নিজেও বিবাহ করতে পারে না। যে নারী নিজে বিবাহ করে সে ব্যভিচারিণী’ (ইবনু মাজাহ, হা/১৮৮২; মিশকাত,  হা/৩১৩৭)। সুতরাং তালাকপ্রাপ্তা মহিলাও নিজে নিজের বিবাহ দিতে পারবে না, সুতরাং তার পরের বিবাহতেও অভিভাবকের অনুমতি লাগবে। উল্লেখ্য যে, ছহীহ মুসলিমের ১৪২১ নং হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী বলেছেন, الأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا ‘পূর্ব বিবাহিতা তার নিজের ব্যাপারে অভিভাবকের তুলনায় অধিক হক্বদার’ এই হাদীছের অর্থ হলো, স্বামী পছন্দের ক্ষেত্রে অভিভাবকের চেয়ে সেই মহিলারই বেশি অধিকার রয়েছে। কিন্তু সে অভিভাবকের শর্ত থেকে মুক্ত নয়।


প্রশ্ন (৩৫) : এক আলেম বলেছেন যে, মনে মনে তালাক দিলে হবে না, আর অন্য আলেম বলেছেন যে, তালাক হবে৷ এখন আমরা কোনটা গ্রহন করব?

-নাছিম মিয়া
ফরিদপুর।

উত্তর : মুখে উচ্চারণ না করে যদি মনে মনে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার নিয়্যত করে, তাহলে সেটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। কেননা রাসূল a বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের জন্য তাদের মনের কল্পনাগুলোকে মাফ করে দিয়েছেন যতক্ষণ না তা কথা বা কাজে পরিণত করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৬৯, ছহীহ মুসলিম, হা/১২৭)। আর যদি মুখে উচ্চারণ করে, তাহলে স্ত্রী না জানলেও সেটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে।


প্রশ্ন (৩৬) : এক ব্যক্তি দুই বছর আগে একজন বিবাহিত মহিলাকে বিয়ে করেছে। কিছুদিন আগে জানতে পারে ওই মহিলার আগের স্বামী তাকে তালাক দেয়নি এবং মহিলাও স্বামীর থেকে খোলা করেনি। এখন সেই ব্যক্তির করণীয় কি?

-মোহাম্মাদ আলমগীর
গাজীপুর।

উত্তর : যেহেতু আগের স্বামী থেকে তালাক হয়নি, তাই সেই মহিলা আগের স্বামীর স্ত্রী হিসেবেই আছে। আর কারো স্ত্রী থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করলে সেটি বিবাহ হিসাবে গণ্য হবে না। বরং সহবাস করলে তা ব্যভিচার হিসাবে গণ্য হবে। আল্লাহ বলেন, ‘…সকল বিবাহিতা নারী তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ’ (আন-নিসা ৪/২৪)। আর ব্যভিচার করা কবীরা গুনাহ (আল-ইসরা ১৭/৩২)। সুতরাং এমতাবস্থায় সেই মহিলার সাথে সংসার করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। আর এই পাপের কারণে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।


হালাল-হারাম


প্রশ্ন (৩৭) : গার্মেন্টস থেকে পোশাক চুরি করেছি সেগুলো এখন কি করবো, ফিরিয়ে দিতে গেলে চাকরি থাকবে না এবং মান হানিও হতে পারি। আর এই পোশাক পরে কি আমার ছালাত হবে?

-নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক
ঢাকা।

উত্তর : গামের্ন্টসে চাকরিরত অবস্থায এভাবে কাপড় চুরি করা আত্মসাতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এসব মালামার কর্মচারীর কাছে আমানত হিসেবে থাকে। অতএব এসব কাপড় সম্ভবপর হলে মালিকের কাছে ফেরত দিতে হবে। আর সেটি সম্ভব না হলে অথবা ফেরত দিতে গেলে সমস্যা আশংকা থাকলে সেই পোশাকের সমমূল্য মালিকের নামে অথবা কোম্পানীর নামে ছাদাকাহ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মানহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোন দীনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোনো সৎকর্ম থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট থেকে নেওয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ থেকে নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯)। এই কাজটি করার পরে যদি সেই কাপড়ে ছালাত আদায় করে তাহলে তার সেই ছালাত ছহীহ হবে।


প্রশ্ন (৩৮) : আমি আমার দুই বন্ধুর সাথে কিছু লোকের সম্পদ নষ্ট করেছি। সেই সম্পদ কার আমি জানি না আমি ক্ষতিপূরণ দিতে চাই। এখন কী করলে তার হক্ব আদায় হবে এবং আল্লাহর কাছে থেকে ক্ষমা পাওয়া যাবে?

-রাকিব
চাঁদপুর।

উত্তর : বান্দার হক নষ্ট করার গুণাহ সেই বান্দা ক্ষমা না করলে আল্লাহও ক্ষমা করবেন না। বরং ক্বিয়ামতের দিন নেকি দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মানহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোনো দীনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোনো সৎকর্ম থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট থেকে নেওয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ থেকে নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯)। সম্পদের মালিকের সম্পর্কে  জানা না থাকার কারণে যে পরিমাণ সম্পদ নষ্ট করা হয়েছে সে পরিমাণ সম্পদ তার মালিকের নিয়্যতে আল্লাহর রাস্তায় ছাদাক্বা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। ইনশা-আল্লাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন।


প্রশ্ন (৩৯) : কোনো ঘরে ছবি থাকলে ছালাত হয় না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোনো ব্যক্তি ছালাতে দাঁড়ানোর পরে পকেট থেকে কোনো এমন টাকা বা পয়সা পড়ে গেল যেখানে মানুষের ছবি আছে এবং ছবিটি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কি আমার ছালাত হবে, না-কি ছালাত বাতিল হবে, না-কি মসজিদের সকল মুছল্লীদের ছালাত বাতিল হবে?

-নজরুল ইসলাম
ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : পকেট থেকে যদি টাকা পড়ে যায় যাতে মানুষের ছবি আছে, সেই টাকা পুনরায় পকেটে তুলে নিতে হবে যাতে ছালাতের খুশূ-খুযূ নষ্ট না হয়। কেননা কাপড়ে ছবি থাকলে অথবা খোলা স্থানে টাকা বা ছবি পড়ে থাকলে সেখানে ছালাত আদায় করা উচিত নয়। এর কারণ হলো রাসূল a বলেছেন, ‘যেখানে কুকুর ও ছবি থাকে সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৪৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬; মিশকাত, হা/৪৪৮৯)।


প্রশ্ন (৪০) : বিভিন্ন স্কুল, কলেজে দেখা যায় যে ক্লাসে শিক্ষক আসলে শিক্ষার্থীদেরকে দাঁড়িয়ে তাদেরকে সম্মান জানাতে হয়। এখন আমার প্রশ্ন হলো এভাবে সম্মান জানানো কি শরীয়তসম্মত হবে? আর যদি না হয় তাহলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের করণীয় কী?

-মল্লিকা আক্তার
ময়মনসিংহ।

উত্তর : শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আসলে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানানো যাবে না, যিনি প্রবেশ করবেন তিনিই সালাম দিয়ে প্রবেশ করবেন। এটিই শরীয়তের মূলনীতি। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, যে লোক আনন্দিত হয় যে, মানুষ তার জন্য মূর্তির মতো দাড়িয়ে থাকুক, সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্দিষ্ট করে নেয় (তিরমিযী, হা/২৭৫৫)। আনাস c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছাহাবীদের নিকট রাসূলুল্লাহ a-এর চাইতে বেশি প্রিয় ব্যক্তি আর কেউ ছিলেন না। অথচ তারা তাকে দেখে দাঁড়াতেন না। কেননা তারা জানতেন যে, তিনি এটা পছন্দ করেন না (তিরমিযী, হা/২৭৫৪)। সুতরাং শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আসলেই তাকে সম্মান দেওযার জন্য দাঁড়ানো যাবে না। আর যদি শিক্ষক তার সম্মানে দাঁড়ানোর আদেশ করে তাহলে তার সেই আদেশ মানা যাবে না। কারণ রাসূল a বলেছেন, لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ স্রষ্টার অবাধ্যতা করে সৃষ্টির কোন আনুগত্য নেই (তিরমিযী, ৩/৩২৫)।

 উল্লেখ্য যে, বুখারী (৩৮০৪) ও মুসলিমের (১৭৬৯) এক বর্ণনাতে আছে যে, নবী a বলেছেন,قوموا إلي سيدكم  তোমরা তোমাদের সর্দারের দিকে যাও’ এই বর্ণনা পেশ করে অনেকে দলীল দিতে চেয়েছেন যে, শিক্ষককে দেখে দাড়ানো যায়। কিন্তু আসলে বিষয়টি তেমন নয়। القيام إلي الناس ‘আগন্তুককে সম্মান জানানোর জন্য এগিয়ে যাওয়া’ আর القيام للناس ‘মানুষের সম্মানে দাড়ানো’ এক নয়। রাসূল a মানুষের সম্মানে দাঁড়াতে নিষেধ করেছেন আর মানুষকে স্বাগতম জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে তার দিকে যেতে বলেছেন।


প্রশ্ন (৪১) : ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অর্থাৎ কোনো অনুষ্ঠানে যেমন. বিয়েতে গায়ে হলুদ, সেমিনার, জন্মদিনের ষ্টেজ, লাইটিং, ইত্যাদি সাজানো বা ডেকোরেশন এর ব্যবসা কি হালাল? এই ব্যবসা করা কি উচিত হবে?

-মুনতাসির মিরাজ
যাত্রবাড়ি, ঢাকা।

উত্তর: যে সকল অনুষ্ঠানে শরীয়তবিরোধী কাজ হয় অথবা অনুষ্ঠানগুলোই শরীয়তসম্মত নয় সেই অনুষ্ঠানগুলো সাজানো বা ডেকোরেশন করাও জায়েয নয়। প্রশ্নে উল্লিখিত গায়ে হলুদ, সেমিনার, জন্মদিনের স্টেজ এগুলো একটিও শরীয়তসম্মত নয়। তাই এগুলো ডেকোরেশনের ব্যবসা করাও জায়েয নয়। কেননা এতে অন্যায়কে সহযোগিতা করা হয়। আর আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


প্রশ্ন (৪২) : শায়খ আমরা জানি যে, জন্মদিন পালন করা হারাম সেক্ষেত্রে জন্মদিন উপলক্ষে কেক বিজনেস করা কি হালাল হবে?

-মেহেদী হাসান
নাটোর সদর, নাটোর।

উত্তর : জন্মদিন পালন করা বিজাতীয়দের থেকে আসা একটি অপসংস্কৃতি যা শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত নয়। আর রাসূল a বলেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত’ (আবূ দাউদ, হা/৪০৩১)। সুতরাং জন্মদিন পালন করা জায়েয নয়। আর এই জন্মদিন পালন করার জন্য কোন সহযোগিতা করাও জায়েয নয়। আর তাই জন্মদিন উপলক্ষে কেকের বিজনেস করাও বৈধ নয়। কেননা এর মাধ্যমে বাতিলকে সহযোগিতা করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


প্রশ্ন (৪৩) : জনৈক ছেলের এক মেয়েকে পছন্দ হয়েছে। এখন বিয়ে ঠিক হবে। ছেলেটা যৌতুক নিবে না, কিন্তু মেয়ের বাবা খুশি হয়ে কিছু টাকা দিবেই আর ছেলের বাড়ির সবাই টাকা নিবে। এখন এ টাকা কি নেওয়া যাবে?

-রুবেল ইসলাম
দিনাজপুর।

উত্তর: বিবাহে ছেলের কোন কিছু নেওয়া ইচ্ছা না থাকলেও, মেয়ের পিতা যৌতুক ছাড়াই স্বেচ্ছায় দিতে চাইলেও বর্তমান সমাজে যৌতুকের যে প্রথা রয়েছে তাকে প্রতিহত করার জন্য বিবাহ উপলক্ষে কোন কিছু নেওয়াও যাবে না এবং দেওয়াও যাবে না। কেননা এতে পাপের সহযোগিতা করা হবে। আর আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)। সাথে সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অর্থ দিয়ে বিবাহ করতে বলেছেন, অর্থ নিয়ে নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদেরকে ন্যায়সংগতভাবে তাদের মোহর দিবে’ (আন-নিসা, ৪/২৫)। তবে বিবাহের অনুষ্ঠান ছাড়াই জামাই মেয়ের সাংসারিক জীবনকে লক্ষ্য করে কোন সময় মেয়ের পিতা মেয়েকে কোন কিছু দিতে পারে। আনাস c থেকে বর্ণিত, নবী a এক কৃতদাসকে সঙ্গে নিয়ে ফাতেমা g-এর নিকট এলেন, যে কৃতদাসটি তিনি তাকে দান করেছিলেন। ফাতেমা g-এর পরিধানে এরূপ একটি কাপড় ছিলো যা দিয়ে তিনি মাথা ঢাকলে পা দু’টিতে পৌঁছে না, আর পা ঢাকলে মাথা পর্যন্ত পৌঁছে না। নবী a তার এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘তোমার কোনো পাপ হবে না, কারণ এখানে তো শুধু তোমার পিতা ও তোমার কৃতদাস রয়েছে’ (আবূ-দাউদ, হা/৪১০৬, মিশকাত, হা/৩১২০)।


প্রশ্ন (৪৪) : মেয়েরা কি হাতে বা পায়ে আলতা দিতে পারবে?

-ইনসান হাবীব
হাকিমপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : না, হাতে বা পায়ে কোন মহিলা আলতা ও নেইল পালিশ দিতে পারবে না। কেননা এটি ইহূদী ও খ্রিষ্টানদের পতিতালয়ের মেয়েদের বৈশিষ্ট্য (বিস্তারিত দেখুন, বাসর রাতের আদর্শ, আলবানী)। তবে মেয়েদের হাত ও পায়ের নখে মেহেদী বা মেহেদী জাতীয় জিনিসগুলো দেওয়া জরুরী। কেননা একদিন জনৈকা মহিলা হাতে চিঠি নিয়ে পর্দার আড়াল হতে হাত বের করে রাসূলুল্লাহ a-এর দিকে ইশারা করল। নবী a নিজের হাতটি গুটিয়ে ফেলে বললেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম না, এটা কি কোন পুরুষের হাত না কোন মহিলার হাত’? তখন মহিলাটি বললো, এটা মহিলার হাত। তখন তিনি a বললেন, ‘যদি তুমি নারী হতে তাহলে অবশ্যই মেহেদীর দ্বারা তোমার হাতের নখগুলো পরিবর্তন করে নিতে’ (আবূ দাউদ, হা/৪১৬৬; মিশকাত, হা/৪৪৬৭)।


প্রশ্ন (৪৫) : আমার বয়স ছাব্বিশ বছর। এখনই আমার চুল পেকে গেছে। আমার একটা প্রশ্ন হলো, আমি কি আমার চুল কালো করতে পারি?

-মো. রুমন ইসলাম
বরিশাল।

উত্তর: না, চুল কালো করা যাবে না। কেননা কালো খেযাব ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। জাবের c থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘তোমরা সাদা চুল কালো করা থেকে বেঁচে থাকো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২১০২, মিশকাত, হা/৪৪২৪)। তিনি আরো বলেছেন, ‘শেষ যামানায় এমন কিছু লোক হবে যারা কবুতরের বুকের ন্যায় কালো রঙের খেযাব দিয়ে চুল কালো করবে। তারা জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না’ (আবূ দাঊদ, হা/৪২১২; নাসাঈ, হা/৫০৭৫;  মিশকাত, হা/৪৪৫২)। এমতাবস্থায় মেহেদী দিয়ে খিযাব করবে (তিরমিযী, হা/১৭৫৩)।


প্রশ্ন (৪৬) : মৃত ব্যক্তির নামে ইফতার মাহফিল করা যাবে কি?

-আব্দুর রহমান
গাইবান্ধা।

উত্তর : মৃত পিতা-মাতার নামে আমাদের সমাজে যে ইফতার মাহফিলের প্রথা চালু আছে তা শরীয়তসম্মত নয়। মৃত পিতা-মাতার নামে টাকা-পয়সা দান করতে হবে। আয়েশা g বলেন, এক ব্যক্তি নবী a-কে বলল, আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন। আমার ধারণা যে, তিনি কথা বলার সুযোগ পেলে দান করে যেতেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান করি, তবে কি তিনি নেকি পাবেন? নবী a বললেন, হ্যাঁ’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১০০৪; মিশকাত, হা/১৯৫০)। তবে কেউ যদি মৃত পিতা-মাতার নামে ইফতারির ব্যবস্থা করতেই চান তাহলে তা করবে অসহায় ফকীর-মিসকীনদের জন্য। কেননা মৃত ব্যক্তির নামে যেটা প্রদান করা হয়, তা ছাদাক্বা। আর ছাদাক্বা সবাই খেতে পারে না। রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা তাদের উপর ছাদাক্বা (যাকাত) ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট হতে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৯৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯; মিশকাত, হা/১৭৭২)।


প্রশ্ন (৪৭) : মেয়েরা যখন বাইরে যাবে তখন মাহরামের সাথে যেতে হবে কিন্তু সবার মাহরামরা তো এরকম না। যেসব মেয়েরা পড়াশোনা করে অথবা চাকরি করে তাদের তো বাইরে আসা-যাওয়া করতে হয়। এক্ষেত্রে রিকশায় গেলে রিকশাওয়ালার সাথে একা যাওয়া হলো যাদের গাড়ি আছে তাদের ড্রাইভারের সাথে যেতে হয়। এক্ষেত্রে মাহরাম পুরুষরা তো সবসময় সাথে যান না আর তাদেরও যার যার কাজ থাকে। এভাবে পড়াশোনা করা ও চাকুরী করা কি জায়েয?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
ফরিদপুর।

উত্তর : না। গাড়ি, রিক্সা বা বাইকে এমন কোন পুরুষের সাথে মহিলার একাকিনী যাওয়া বৈধ নয়, যার সাথে কোনও সময় তার বিবাহ বৈধ। বাস, ট্রেন, প্লেন বা জাহাজেও কোনো সফরে যাওয়া বৈধ নয়। এমনকি কোনো ইবাদতের সফরেও নয়। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি যে নারী ঈমান রাখে, এমন নারীর পক্ষে পিতা, সন্তান, স্বামী, ভাই কিংবা মাহরামের সঙ্গ ছাড়া একাকিণী তিনদিনের দূরত্বে সফর করা বৈধ নয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪০; তিরমিযী, হা/১১৬৯)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘নারী কোন মাহরাম ছাড়া যেন একদিন একরাত সফর না করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১০৮৮; মিশকাত, হা/২৫১৫)। উল্লেখ্য, সাময়িক সময়ের জন্য স্থানীয় কোথাও গেলে যদি ফিতনা থেকে মুক্ত হয় এবং অন্য কোন সাবালক ছেলে, পুরুষ বা মহিলা থাকে, তাহলে যাওয়া চলে। কিন্তু সফর হলে সঙ্গে মাহরাম ছাড়া মোটেই যাওয়া বৈধ নয়; যদিও সাথে অন্য মহিলা বা পুরুষ থাকে (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ১৭/৩৩৬)।


প্রশ্ন (৪৮) : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত বিদায় অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এটি কি শরীয়তসম্মত?  

-সালমা, ঢাকা।

উত্তর : ছাত্র-ছাত্রীদের উপদেশ ও পথনির্দেশনা দেওয়া এবং মন্দ কর্ম হতে সতর্ক করার জন্য বিদায় অনুষ্ঠান করাতে কোন বাধা নেই। তবে অনুষ্ঠানটি কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হতে হবে এবং শরীয়ত বহির্ভূত সকল কাজ হতে মুক্ত থাকতে হবে। রাসূল a কোন সৈন্যদল অথবা কোন মেহমানকে বিদায় দানকালে উপদেশ দিতেন এবং তাদের জন্য দু‘আ করতেন (তিরমিযী, হা/৩৪৪৪; আবূ দাঊদ, হা/২৬০১; মিশকাত, হা/২৪৩৫-৩৭)। পক্ষান্তরে এসব অনুষ্ঠানে যদি নাচ-গান, ছাত্র-ছাত্রীদের মালাপ্রদান, ছবি তোলাসহ আরো বিভিন্ন প্রকার শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ হয়ে থাকে, তাহলে তাতে যোগদান করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


মীরাছ বন্টন


প্রশ্ন (৪৯) : আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। আমার দুই ছেলে আছে। কিন্তু বড় ছেলে আমার কোনো খরচ বহন করে না এমনকি আমার সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করে। আমার যাবতীয় খরচ আমার ছোট ছেলে বহন করে থাকে। এখন আমি আমার সম্পত্তি থেকে ছোট ছেলেকে কি বেশি দিতে পারবো?

-আলী, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : না, এক সন্তানকে অন্য সন্তানের থেকে বেশি দেওয়া যাবে না। সন্তানদেরকে দেওয়ার সময় পিতা-মাতার জন্য ইনছাফ করা আবশ্যক। কোন সন্তানকে বেশি দেওয়া, আর অন্য সন্তানকে কম দেওয়া পিতা মাতার জন্য বৈধ নয়। নুমান ইবনু বাশীর h থকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মা বিনতু রাওয়াহা g আমার পিতার নিকট আমার জন্যে তার সম্পদ থেকে কিছু দান করার অনুরোধ করলেন। এক বছর যাবৎ তিনি এ ব্যাপারে গড়িমসি করেন। পরে তা দেয়ার ইচ্ছা জাগলো। বিনতু রাওয়াহা g বললেন, আমার পুত্রকে যা দিবেন তার উপর রাসূলুল্লাহ a-কে সাক্ষী না রাখা পর্যন্ত আমি খুশি হবো না। তখন আমার পিতা আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহ a-এর নিকট আসলেন। সে সময় আমি বালক ছিলাম। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এর মা বিনতু রাওয়াহা চায় যে, আমি তাঁর পুত্রকে যা দান করেছি তাতে আপনাকে সাক্ষী রাখি। রাসূলুল্লাহ a বললেন, হে বাশীর! এ ছাড়া তোমার কি আর কোন পুত্র আছে? বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি কি তাদের সকলকে এরূপ দান করেছো? তিনি বললেন, না। তখন তিনি বললেন, তাহলে আমাকে সাক্ষী রেখো না। কারণ, আমি যুলুমের ব্যাপারে সাক্ষী হই না (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৩)। অন্য বর্ণনাতে আছে, রাসূল a বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মধ্যে ন্যায় বিচার করো। তখন আমার পিতা চলে আসেন এবং সে দান ফিরিয়ে নেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৫৭৮)।


প্রার্থনা


প্রশ্ন (৫০) : হাদীছের মাধ্যমে আমরা জানি যে, শেষরাতে মহান আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে আসেন। তখন কি আমি ওযূ এবং ছালাত আদায় করা ছাড়াই ঘুম থেকে উঠে মহান আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে পারবো?

-রাসেল মাহমুদ
কালিহাতি, টাঙ্গাইল।

উত্তর : হ্যাঁ, শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে ওযূ ও ছালাত আদায় করা ছাড়াই আল্লাহর নিকট দো‘আ করা যাবে। ইবনু ‘আব্বাস h হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মাইমুনা g-এর ঘরে রাত কাটালাম। তখন নবী a তাঁর কাছে ছিলেন। রাতে রাসূলুল্লাহ a-এর ছালাত কেমন হয় তা দেখার জন্য। রাসূলুল্লাহ a তাঁর পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় কথা বললেন এবং ঘুমিয়ে পড়লেন। এরপর যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ কিংবা শেষের কিছু অংশ বাকী থাকল, তিনি উঠে বসলেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে তিলাওয়াত করলেন, আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে…..বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্য- (আলে ইমরান ৩/১৯০)। তারপর তিনি উঠে গিয়ে ওযূ ও মিসওয়াক করলেন। অতঃপর এগারো রাকা‘আত ছালাত আদায় করলেন। বেলাল c (ফজরের) ছালাতের আযান দিলে তিনি দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করলেন। এরপর নবী a বের হয়ে ছাহাবীগণকে নিয়ে ফজরের ছালাত আদায় করলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৫২)।