اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

সালাফী কনফারেন্স: লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

সালাফী শব্দটি আরবী সালাফ (سَلَفَ) থেকে এসেছে। সালাফ শব্দটির শেষে সম্বন্ধসূচক ‘ইয়া’ (ي) যোগ করে সালাফী (سَلَفِيٌّ) বলা হয়। যেমন- বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশী। যারা আগে চলে গেছেন, তাদেরকে সালাফ বলা হয় (মু‘জামু মাক্বায়িসিল লুগাহ, ৩/৯৫)। রাসূল (ছাঃ) মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তার মেয়ে ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন, ‘তুমি মহান আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্য্য ধরো। কেননা আমি তোমার উত্তম সালাফ’ (বুখারী, হা/৬২৮৫)। রাসূল (ছাঃ) ফাতিমা (রাঃ)-এর আগে মারা যাচ্ছেন বলে তিনি নিজেকে ফাতিমা (রাঃ)-এর জন্য ‘সালাফ’ বলেছেন। সুতরাং সালাফ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যারা অতীতে চলে গেছেন। রাসূল (ছাঃ), ছাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনের যুগ- এই তিন যুগের অধিকাংশ মানুষকে ‘সালাফ’ বলা হয়, যারা ‘উত্তম’ হওয়ার ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ) সাক্ষ্য দিয়েছেন। এখানে ‘সালাফ’ পরিভাষাটির সাথে ‘অধিকাংশ’ কথাটি বা ‘ছালেহীন’ বা ‘ছালেহ’ কথাটি যোগ করা একান্তই যরূরী। কারণ, সব সালাফ সৎ ছিলেন না। ছালেহীন (صَالِحِيْنَ) শব্দটি ছালেহ শব্দের বহুবচন। অর্থ সৎবান্দাগণ। মানহাজ শব্দটির অর্থ- চলার পথ, রাস্তা, আদর্শ (Methodology) ইত্যাদি। সুতরাং মানহাজুস-সালাফিছ ছালেহীন দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অতীতে চলে যাওয়া সৎবান্দাগণের রাস্তা, পথ বা আদর্শ। সালাফে ছালেহীন-এর মানহাজের প্রামাণিকতার বহু দলীল কুরআন, হাদীছ, আছার, ইজমা ও সুস্থ বিবেক দ্বারা সাব্যস্ত, যার দুয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের পথে (পরিচালিত করুন), যাদের প্রতি আপনি দয়া করেছেন। তাদের পথ নয়, যারা পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত’ (আল-ফাতিহা, ১/৭)। সূরা ফাতিহার এই দো‘আর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, অতীতে চলে যাওয়া সালাফে ছালেহীন বা নেককার বান্দাদের পথই হচ্ছে ছিরাতে মুস্তাক্বীম। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘আর মুহাজির ও আনছারগণের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী ও প্রথম এবং যারা তাদেরকে যাবতীয় সৎকর্মে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন এমন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহান সফলতা’ (আত-তাওবাহ, ৯/১০০)। আয়াতটিতে স্পষ্টভাবে মুহাজির ও আনছারগণের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী ও প্রথম, যাবতীয় সৎকর্মে তাদের অনুসরণকারীদের প্রশংসা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ কর্তৃক এই প্রশংসাই প্রমাণ করে, সালাফে ছালেহীন ছিলেন বিশুদ্ধ মানহাজের উপর। অতএব, আক্বীদা ও আমল উভয় ক্ষেত্রে তাদের মানহাজ পরবর্তীদের জন্য অনুকরণীয়। আয়াতটিকে ইমাম মালেক (রহিঃ) ছাহাবায়ে কেরামের অনুসরণ ওয়াজিব হওয়ার দলীল হিসাবে পেশ করেছেন (এ‘লামুল মুওয়াক্কেঈন, ৪/৯৪)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তারা যদি তেমন ঈমান আনে, যেমন তোমরা ঈমান এনেছো, তাহলে তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে’ (আল-বাক্বারাহ, ২/১৩৭)। এখানে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণের ঈমানের মত ঈমান আনার সাথে একজন মুমিনের হেদায়াতপ্রাপ্তিকে শর্তযুক্ত করেছেন। আর নিঃসন্দেহে তাদের সেই ঈমান ছিল অহির সঠিক ও সূক্ষ্ম পথে চলার ফল। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ, এরপর তৎপরবর্তী যুগের মানুষ, তারপর তৎপরবর্তীযুগের মানুষ’ (বুখারী, হা/২৬৫২)। এ হাদীছে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে ইযাম ও তাবে‘ তাবেঈনে ইযাম হচ্ছেন এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আর আমাদের উচিত, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষগুলোর আক্বীদা ও আদর্শ অনুযায়ী নিজেদের আক্বীদা ও আদর্শ গড়ে তোলা। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহিঃ) উক্ত হাদীছের পর বলেন, একথার দাবী হচ্ছে, কল্যাণের সবক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে (এ‘লামুল মুওয়াক্কেঈন, ৪/১০৪)। ইবনে ওমর ও ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায়, সে যেন তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, যারা ইতিমধ্যে মারা গেছেন। তারা হচ্ছেন, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর ছাহাবীবর্গ, যারা ছিলেন এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ…’ (হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৩০৫; জামে‘উ বায়ানিল ইলম, ২/৯৪৭)। ইমাম আউযাঈ (রহিঃ) বলেন, ‘সুন্নাতের উপর নিজেকে অবিচল রাখুন, সালাফে ছালেহীন যেখানে থেমেছেন, আপনিও সেখানে থামুন, তারা যা বলেছেন, আপনিও তাই বলুন, তারা যা বলা থেকে বিরত থেকেছেন, আপনিও তা থেকে বিরত থাকুন। আপনি আপনার সালাফে ছালেহীন-এর পথে চলুন’ (হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৬/১৪৩)। আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত ‘ইজমা’ পোষণ করেছেন যে, আক্বীদা, আমল, আখলাক্ব সবক্ষেত্রে সালাফে ছালেহীন সর্বোত্তম মানুষ (মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ, ৪/১৫৭-১৫৮)। এই যাদের অবস্থা, তাদের মানহাজ সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হবে সেটাই সুস্থ বিবেকের দাবী। তাদের মানহাজ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হওয়ার আরো কতগুলো কারণ রয়েছে। যেমন- (১) ঈমান, আমল, তাক্বওয়া, চরিত্র, মর্যাদা সবদিক দিয়ে সালাফে ছালেহীন ছিলেন নবী-রাসূলগণের পরে সর্বোত্তম মানুষ। (২) সালাফে ছালেহীন কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি রাসূল (ছাঃ)-এর কাছ থেকে ইসলাম বুঝেছেন। (৩) তারা অহি নাযিল হতে দেখেছেন, যা তাদেরকে এমন বুঝ এনে দিয়েছে, যা আর কারো ক্ষেত্রে ঘটা সম্ভব নয়। আর এই বুঝ তাদের ছাত্র তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনগণও গ্রহণ করেছেন। (৪) পবিত্র কুরআনের ভাষা উপলব্ধির ক্ষেত্রে তারা ছিলেন সর্বাধিক জ্ঞানী। সর্বোপরি তাদের জ্ঞান ও উপলব্ধিতে ছিল ভিন্ন বরকত (৫) তাদের চিন্তা-চেতনায় বহিরাগত কোন বিভ্রান্ত মতাদর্শ স্পর্শ করতে পারেনি (৬) দ্বীনী ইলম অর্জন, শরী‘আতের বক্তব্য উপলব্ধি এবং অজানা ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ বিষয়াবলী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার ব্যাপারে তাদের ছিল প্রবল আগ্রহ। সেজন্য, তারা ইসলাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখতেন, যে পর্যন্ত পৌঁছা পরবর্তীদের জন্য কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।

সালাফে ছালেহীন-এর মানহাজ অনুযায়ী কুরআন-হাদীছ মানলে যেসব ফায়দা হয়- (১) কুরআন-হাদীছের নানা বক্তব্য থেকে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার একমাত্র পথ হচ্ছে সালাফে ছালেহীন-এর মানহাজ। (২) বিভিন্ন ধরনের বিদ‘আত থেকে বাঁচার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে তাদের মানহাজ। (৩) নিন্দনীয় মতভেদ, বিভ্রাট, বিভেদ ও বিভক্তি থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ এই মানহাজ। (৪) সালাফে ছালেহীন-এর এই মানহাজ ধারণ করলে যে কোন ধরনের পদস্খলন থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব ইনশাআল্লাহ।

উপর্যুক্ত সালাফী মানহাজ ও প্রচলিত সালাফী সংগঠন বা দল এক বিষয় নয়; বরং উভয়ের মধ্যে ঢের পার্থক্য রয়েছে। শায়খ উছাইমীন (রহিঃ) একটি হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, “রাসূল (ছাঃ)-এর বক্তব্য, ‘অচিরেই তোমরা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের উচিত আমার সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা’। যখন উম্মত বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাবে, তখন তোমরা কোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ো না। আগের যুগে খাওয়ারেজ, মু‘তাযিলা, জাহমিয়্যাহ, রাফেযা-শী‘আদের মত কিছু দলের আবির্ভাব হয়েছিলো। অবশেষে আধুনিক যুগে ইখওয়ানী, সালাফী, তাবলীগী ও অনুরূপ আরো বহু দলের আবির্ভাব হয়েছে। তুমি এই সকল দলকে বাম পাশে রাখবে এবং একমাত্র সামনে রাখবে রাসূল (ছাঃ)-এর এই হাদীছ- “তোমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে, আমার সুন্নাত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা”। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সকল মুসলিমের উপর ওয়াজিব হচ্ছে, তাদের মাযহাব হবে সালাফে ছালেহীনের মাযহাব; ‘সালাফী’ নামে নির্দিষ্ট কোনো দলের সাথে তারা সম্পৃক্ত হবে না। …সালাফী দল ও সালাফী পথের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সুতরাং সালাফের অনুসরণই কাম্য। তবে সালাফী ভাইয়েরা সঠিকতার নিকটতম দল। কিন্তু অন্যদের মতো তাদেরও সমস্যা হচ্ছে, তাদের কোনো কোনো দল পরস্পরকে পথভ্রষ্ট, বিদ‘আতী ও ফাসেক্ব মনে করে। তারা হক্বপ্রত্যাশী হলে সেটিকে আমরা অপসন্দ করি না; কিন্তু আমরা বিদ‘আত দূরীকরণের এই পদ্ধতিকে ঘৃণা করি। এসব দলের নেতৃবৃন্দের  উচিত, (সমাধানের জন্য) একসাথে বসা এবং এই ঘোষণা দেয়া, আমাদের মধ্যে ফায়ছালাকারী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও তার রাসূল ধ-এর সুন্নাত। অতএব, এতদুভয়কে আমাদের ফায়ছালাকারী মানা উচিত, কোনো দল-মত বা ব্যক্তিকে নয়’ (শারহুল আরবা‘ঈন আন-নাবাবিয়্যাহ, পৃঃ ২৮২)।

যাবতীয় দল-মত উপেক্ষা করে শুধুমাত্র সালাফে সালেহীনের মানহাজ অনুযায়ী পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ প্রচারের মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ; যার অর্থ সালাফী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নামের সাথে মিল রেখেই ২০১৯ সালের বার্ষিক ইসলামী সম্মেলনে এর নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয় এবং তখনই ইসলামী সম্মেলনের পরিবর্তে নতুন নাম ‘সালাফী কনফারেন্স’ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। সালাফী কনফারেন্স যেমন কোনো দলীয় সম্মেলন নয়, তেমনি তা কোনো দল বা সংগঠনও নয়। বরং দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে শুধুমাত্র মানহাজে সালাফ অনুসরণের আহ্বান নিয়ে আয়োজিত একটি সম্মেলন। আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ কর্তৃপক্ষ সাধ্যমত দল-মত নির্বিশেষে সালাফী মানহাজের আলেম-উলামাকে দাওয়াত দিয়ে থাকেন। উপস্থিত উলামায়ে কেরাম পূর্বনির্ধারিত বিষয় অনুযায়ী কুরআন-সুন্নাহর দলীলভিত্তিক আলোচনা পেশ করে থাকেন। এ কনফারেন্স দলীয় ও সাংগঠনিক গোঁড়ামি ও বাড়াবাড়ি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এর দরজা সকল সালাফী আলেম এবং দল-মত নির্বিশেষে সকল দর্শক-শ্রোতার জন্য উন্মুক্ত। সুতরাং সালাফী কনফারেন্স প্রচলিত অন্যান্য ইসলামী সম্মেলন ও ওয়ায মাহফিল থেকে আলাদা।

সালাফী মানহাজ ভিত্তিক কুরআন-সুন্নাহর বাণী এবং সালাফে ছালেহীনের দাওয়াতী উদারতা এ কনফারেন্সের মাধ্যমে সকলের কর্ণকুহরে পৌঁছে যাক এবং হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিক- এটাই আমাদের একমাত্র কাম্য। মহান আল্লাহ আমাদের যাবতীয় নেক নিয়্যত ও আমল কবুল করুন। আমীন!