সালাফী জামাআত বনাম ভ্রান্ত দলসমূহ
-মাহবূবুর রহমান মাদানী*


সমস্ত প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। সাথে আরও সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো। এতদসত্ত্বেও যারা কুফরী করেছে, তারা তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ দাঁড় করিয়েছে। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল ছাহাবী, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী মুমিনদের উপর।

সালাফ সম্পর্কে কিছু লিখার চেষ্টা করেছি, যাতে করে নিজে তা থেকে উপকার নিতে পারি এবং সম্মানিত পাঠকগণও উপকৃত হতে পারেন।

মানহাজ শব্দের অর্থ হলো- পথ, পন্থা, পদ্ধতি। আর সালাফ শব্দের অর্থ হলো- অতীত, অগ্রগামী, পূর্ববর্তী। সালাফ শব্দের দিকে সম্বন্ধ করে সালাফী বলা হয়। যেমন ইমাম মালেকের দিকে সম্বন্ধ করে মালেকী বলা হয়। সালাফী মানহাজ অর্থ হলো- পূর্ববর্তীদের পথ বা মতাদর্শ। পবিত্র কুরআনের ছয় জায়গায় সালাফ শব্দ এসেছে। যথা- সূরা আল-বাক্বারা, ২/২৭৫; আন-নিসা, ৪/২২, ২৩; আল-মায়েদা, ৫/৯৫; আল-আনফাল, ৮/৩৮ ও আল-যুখরুফ, ৪৩/৫৬। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَثَلًا لِلْآخِرِينَ فَجَعَلْنَاهُمْ سَلَفًا ‘আমি ওদেরকে (ফেরআউন ও তার দলকে) পরবর্তীদের জন্য অতীত নমুনা ও দৃষ্টান্ত করে রাখলাম (আয-যুখরুফ, ৪৩/৫৬)। স্বয়ং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাফ শব্দ ব্যবহার করেছেন। একদা তিনি তাঁর মেয়ে ফাতেমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলেছিলেন, فَإِنِّى نِعْمَ السَّلَفُ أَنَا لَكَ ‘আমি তোমার জন্য উত্তম অগ্রগামী’।[1] অর্থাৎ আমি তোমার পূর্বে গমনকারী, তুমি পরে আমার কাছে আগমন করবে।

পরিভাষিক অর্থে,

أَنَّ مَفْهُوْمَ السَّلَفِ عِنْدَ الْإِطْلاَقِ يُرَادُ بِهِ الصَّحَابَةُ الْكِرَامُ وَالتَّابِعُوْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ وَأَتْبَاعِ التَّابِعِيْنَ مِنْ أَهْلِ الْقُرُوْنِ الثَّلاَثَة

‘পরিভাষায় সালাফ বলতে সাধারণভাবে তিন সোনালি যুগের ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈনকে বুঝায়’।[2] যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

‘আর মুহাজির ও আনছারদের মধ্যে যারা প্রথম সারির অগ্রগামী আর যারা তাদেরকে যাবতীয় সৎকর্মে (কথায়, কাজে ও আক্বীদায় একনিষ্ঠভাবে) অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের জন্য তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো মহান সফলতা’ (আত-তাওবা, ৯/১০০)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ يَجِيءُ أَقْوَامٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِينَهُ، وَيَمِينُهُ شَهَادَتَهُ

‘সর্বোত্তম মানুষ হলো আমার যুগের মানুষ। অতঃপর তার পরের যুগের। অতঃপর তার পরের যুগের। অতঃপর তাদের পর এমন সম্প্রদায়ের আগমন ঘটবে, যাদের এক জনের শপথের আগে সাক্ষ্য হবে, আবার সাক্ষ্যের আগে শপথ হবে’।[3]

উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীছ থেকে জানা গেল যে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছাহাবীগণ, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনকে প্রকৃতপক্ষে সালাফ বা অগ্রগামী দল বলা হয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে তারাই ছিলেন উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। এজন্য তাদেরকে বলা হয়, ‘আস-সালাফুছ ছালেহ’ বা নেক্কার অগ্রবর্তী দল। এর মাধ্যমে ‘আস-সালাফুত্ব ত্বলেহ’ তথা খারাপ অগ্রবর্তী দল বের হয়ে যায়। সালাফদের পথ হলো সর্বাধিক নিরাপদ, সর্বাধিক জ্ঞানসম্পন্ন, অত্যধিক সুস্পষ্ট এবং অধিক সুদৃঢ়, শক্ত ও মযবূত।

বর্তমান সালাফী কারা : বর্তমান সালাফী বলতে যারা কুরআন-হাদীছ বুঝার ক্ষেত্রে তা আক্বীদার বিষয় হোক বা আমলের বিষয় হোক সোনালি তিন যুগের লোকদের কর্মপদ্ধতি ও মতাদর্শের অনুসারী হবে, তারাই সালাফী বা আহলুস সালাফ নামে অবহিত হবেন। আহল অর্থ ধারক-বাহক ও অনুসারী অর্থাৎ যারা সালাফদের মতাদর্শ ধারণ ও অনুসরণ করেন, তারাই আহলুস সালাফ।

কেন আমরা সালাফী পরিচয় দিব? : যখন পৃথিবীতে রয়েছে বিভিন্ন বিদআতী দলের ছড়াছড়ি। যেমন খারেজী, শীআ-রাফেযী, জাহমিয়্যা, মুতাযিলী, আশআরী, মাতুরিদী, ক্বাদারিয়্যা, জাবরিয়্যা, নকশাবান্দীয়া, দেওবান্দী, ব্রেলভী, ছূফী, পীর-মুরিদী আর তাদের সকলের দাবীই হলো সে মুসলিম। তখন সঠিক মতাদর্শের তথা তিন সোনালি যুগের লোকদের মানহাজের উপর প্রতিষ্ঠিত মুসলিমের একটা সতন্ত্র পরিচয় থাকাটা একান্ত জরুরী। যাতে উক্ত সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত দলকে সকলের মাধ্যে সহজে চেনা যায়।

আহলুস সালাফ-এর সমার্থক নামসমূহ : অর্থের দিক দিয়ে এ সকল নামের মর্মার্থ এক ও অভিন্ন।

(১) আল-জামাআতুস সালাফিয়্যাহ : যেহেতু তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সালাফদের মানহাজকে অনুসরণ করেন, তাই তারা উক্ত নামে অভিহিত। মহান আল্লাহ বলেন, وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ‘তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধরো এবং দলাদলি করো না’ (আলে-ইমরান, ৩/১০৩)। জামাআতুস সালাফিয়্যাহ নাম আরব দেশসমূহে বেশি পরিচিত। জামাআত বলা হয় মানুষের ঐক্যবদ্ধ একটি দলকে। মূলত জামাআত বলতে হক্বের উপর ঐক্যবদ্ধ লোকদেরকে বুঝায়, সংখ্যা কম হোক বা বেশি হোক। যেমন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন একাই একটি উম্মাত বা জামাআতের সমান (আন-নাহল, ১৬/১২০)। সংখ্যা বেশি হলেও যারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত থেকে দূরে থাকে, তাদেরকে শরীআতের পরিভাষায় জামাআত বলা হয় না। এজন্য রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামাআতের সংজ্ঞায় বলেন, ‘আমি ও আমার ছাহাবীগণ যার উপর আছি, তার উপর যারা থাকবে তারাই জামাআত’।[4]

(২) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত : ইমাম ইবনে তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত হলো পুরনো মাযহাব, যা ইমাম আবূ হানীফা, মালেক, শাফেঈ ও আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করার পূর্বেই পরিচিত ছিল।[5] তিনি আরও বলেন, বিদআত যেমন বিচ্ছিন্নতার সাথে সংযুক্ত, তেমনি সুন্নাহ হলো জামাআতের সাথে সংযুক্ত।[6] রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর ছাহাবীগণ যার উপর ছিলেন তার উপর যারা আক্বীদায়, কথায় ও আমলে থাকবেন তারাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত।

(৩) আহলুল হাদীছ : যারা কুরআন ও সুন্নাহকে সালাফদের বুঝ অনুযায়ী বুঝেন, তারাই আহলুল হাদীছ। আল্লাহ তাআলা কুরআনকেও হাদীছ বলেছেন, অপরপক্ষে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা, কর্ম ও সমর্থনকেও হাদীছ বলা হয়। আল্লাহ বলেন, اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ ‘আল্লাহ উত্তম হাদীছ অবতীর্ণ করেছেন’ (আয-যুমার, ৩৯/২৩; মুরসালাত, ৭৭/৫০)। ফলে উভয় অর্থ তাদের মধ্যে পাওয়ার কারণে তাদেরকে আহলুল হাদীছ বলা হয়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ، لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ ‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি, যতক্ষণ ওই দুটি আঁকড়ে ধরে রাখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিভ্রান্ত বা পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত’।[7] আহলুল হাদীছ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপ ও ইন্ডিয়াতে পরিচিত।[8]

(৪) আল-জামইয়্যিতুল মুহাম্মাদিয়্যাহ : যারা একমাত্র মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথাকে সবার উপরে প্রাধান্য দেয়, নির্দিষ্ট কোনো মাযহাব মানে না এবং বিদআতকে প্রশ্রয় দেয় না। উক্ত নাম পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, নেপাল, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশে বেশি পরিচিত।[9]

(৫) আহলুল আছার : আছার অর্থ হাদীছ আবার ছাহাবীদের কথা ও কাজকেও আছার বলা হয়। যেহেতু তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতকে ও ছাহাবীদের পথকে আঁকড়ে ধরেন, তাই তারা উক্ত নামে পরিচিত। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي، وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ

‘তোমরা আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে’।[10]

(৬) জামাআতু আনছারিস সুন্নাহ বা সুন্নাহর সাহায্যকারী দল : যারা একনিষ্ঠ তাওহীদ ও ছহীহ সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত। উক্ত জামাআত মিসর, সিরিয়া, সুদান, মরক্কো, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড ও লাইবেরিয়াতে পরিচিত।[11]

(৭) আত-ত্বয়িফাহ আল-মানছূরাহ বা সাহায্যপ্রাপ্ত দল : রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي مَنْصُورِينَ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ ‘আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল চিরকাল সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে থাকবে। যারা তাদের (বিরোধিতা) অপমানিত করতে চায়, তারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না’।[12]

(৮) আল-গুরাবা : গুরাবা শব্দটি গরীব শব্দের বহুবচন। গরীব আরবী শব্দের অর্থ হলো অপরিচিত (মুসাফির) মানুষ। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

إِنَّ الإِسْلَامَ بَدَأَ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا كَمَا بَدَأَ، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ

‘দ্বীন ইসলাম নিঃসঙ্গ অপরিচিত মুসাফিরের ন্যায় অল্প সংখ্যক লোক দ্বারা যাত্রা শুরু করেছিল, আবার সেভাবেই প্রত্যাবর্তন করবে, যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। অতএব সেসকল অল্প সংখ্যক মুসাফির লোকদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে’।[13] অর্থাৎ প্রাথমিক যুগে ইসলামের জয়যাত্রা অল্প সংখ্যক লোক নিয়ে মদীনা থেকে শুরু হয়েছিল। ক্বিয়ামতের পূর্বে আবার একই অবস্থায় মদীনায় ফিরে যাবে।

(৯) আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল : রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ افْتَرَقَتْ عَلَى إِحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَإِنَّ أُمَّتِي سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، كُلُّهَا فِي النَّارِ، إِلَّا وَاحِدَةً وَهِيَ: الْجَمَاعَةُ

‘বনী ইসরাঈলরা (মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জাতিকে বনী ইসরাঈল বলা হয়) ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। এক দল ব্যতীত সকল দলই জাহান্নামে যাবে। ছাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে দল কোনটি (যারা জান্নাতে যাবে)? তিনি বললেন, আমি ও আমার ছাহাবীগণ যার উপর আছি তার উপর যারা থাকবে’।[14] তারা হলো মুক্তিপ্রাপ্ত দল, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত।

সালাফী মানহাজের বা মতাদর্শের বিরোধী প্রধান কয়েকটি দলের পরিচয় : প্রত্যেক দলের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে আলোচনা করা হলো।

খারেজী সম্প্রদায় : তাদেরকে হারূরীও বলা হয়। হারূরা নামক স্থানের দিকে সম্বন্ধ করে তাদেরকে হারূরী বলা হয়। হারূরা ইরাকের একটি গ্রামের নাম। এদের আরো নাম রয়েছে। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষ ত্যাগ করে তারা উক্ত গ্রামে একত্রিত হয়েছিল। তারা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু), উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং তাদের সাথে যারা সম্পর্ক রাখে, তাদেরকে কাফের বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছে ও তাদের জান-মাল হালাল করে নিয়েছে। তারা আব্দুল্লাহ ইবনে খাব্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে হত্যা করেছিল। তারা সাধারণ গুনাহকারী মুসলিমকে কাফের বলে। আর কাবীরা গুনাহকারী যদি তওবা না করে মারা যায়, তাহলে তারা তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলে মত দেয়। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাদের সাথে লড়াই করেছেন।

শীআ ও রাফেযী দল : শীআ অর্থ- দল, সম্প্রদায় ও ভক্তবৃন্দ। শীআরা নিজেরা দাবী করে যে, তারা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর অনুসারীবৃন্দ। রফয আরবী শব্দ, অর্থ হলো বর্জন করা, পরিত্যাগ করা। শীআদেরকে রাফেযী বলা হয়। কারণ তারা যায়েদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)কে বলল, আপনি আবূ বকর ও উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) -এর নাম উচ্চারণের পর ‘রাযিয়াল্লাহু আনহু’ বলা পরিত্যাগ করুন। তখন তিনি বললেন, এরূপ করা থেকে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। এতে তারা তাকে বর্জন করল। সেখান থেকেই তাদেরকে রাফেযী বা পরিত্যাগকারী দল বলা হয়। তারা আলী ইবনে আবূ তালেব এবং আহলে বায়তের ফযীলতের ব্যাপারে অত্যধিক বাড়াবাড়ি করেছে এবং তাদেরকে অন্যান্য ছাহাবীদের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এমনকি বাকী সব ছাহাবীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। তারা তিন খলীফা আবূ বকর, উমার, উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) -এর খেলাফতকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদেরকে শত্রু মনে করে ও গালি দেয়। পাঁচ জন ছাহাবী যেমন আলী, মিক্বদাদ, আবূ যার, সালমান ফারেসী ও আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)  বাদে সবাইকে কাফের মনে করে। শীআরা কুরআনের প্রতি বিশ্বাস করে না। তারা হাদীছের কিতাবকে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের ধারণা মতে এর রাবীগণ কাফের।

মুতাযিলা দল : ওয়াছিল ইবনে আতার অনুসারীদেরকে মুতাযিলা বলা হয়। মুসলিমদের কেউ কাবীরা গুনাহতে পতিত হলে তার বিধান কী হবে, উক্ত বিষয়ে তার মাঝে এবং তাবেঈ হাসান বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মধ্যে মতভেদ হওয়ার কারণে ওয়াছিল ইবনে আতা হাসান বাছরীর মজলিস ত্যাগ করেছিল। অতঃপর ওয়াছিলের অনুসারীরাও হাসান বাছরীর দারস ত্যাগ করে তার সাথে যোগ দেয়। এতে হাসান বাছরী বলেছিলেন, ওয়াছিল আমাদেরকে পরিত্যাগ করেছে। এ থেকে তাদেরকে মুতাযিলা বলা হয়। ই‘তিযাল থেকে মুতাযিলা অর্থ হলো পরিত্যাগ করা। তারা কাবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি সম্পর্কে বলে যে, সে উক্ত গুনাহ করার কারণে ঈমান থেকে বাহির হয়ে গেছে এবং কুফরীতে প্রবেশ করেনি, বরং সে দুয়ের মাঝে অবস্থান করছে। তবে তারা তাকে ফাসেক্ব বলেছে। তাদের নিকট ফাসেক্বের ব্যাখ্যা হলো, দুয়ের মাঝের অবস্থান। তারা আল্লাহর সকল ছিফাত বা গুণকে অস্বীকার করে। তারা কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে বিশ্বাস করে না; বরং তারা কুরআনকে আল্লাহর সৃষ্টি বলে।

জাহমিয়্যা দল : তাদের ইমাম জাহম ইবেন ছফওয়ানের দিকে সম্বন্ধ করে জাহমিয়্যা সম্প্রদায়ের নামকরণ করা হয়েছে। তাকে উমাইয়া খলীফার শেষ যুগে খুরাসানের আমীর সালামা বা সালাম ইবনে আহওয়ায হত্যা করেন। তারা আল্লাহর নাম ও তার গুণাগুণকে পবিত্র করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা করেছে। তারা বলে, আল্লাহর নাম ও তাঁর গুণাগুণকে সাব্যস্ত করা হলে সৃষ্টির সাথে আল্লাহর সাদৃশ্য হয়ে যায়। তাই তারা আল্লাহর সমস্ত নাম ও গুণাগুণকে বাতিল ও অস্বীকার করে। এ কারণে তাদেরকে মু‘আত্তিলা বা আল্লাহর নাম ও ছিফাতকে বাতিলকারী দলও বলা হয়। তারা বলে, পরকালে আল্লাহ তাআলাকে দেখা যাবে না এবং তিনি বান্দার সাথে কথাও বলবেন না। অন্যদিকে মুশাব্বিহা সম্প্রদায় আল্লাহর গুণাগুণকে সাব্যস্ত করতে গিয়ে অধিক বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করেছে। তারা আল্লাহর গুণাগুণকে মানুষের গুণের সাথে তুলনা করেছে। এজন্য তাদেরকে মুশাব্বিহা বা সাদৃশ্য প্রদানকারী দল বলা হয়।

জাবরিয়্যা দল : জাবর শব্দের দিকে সম্বন্ধ করে তাদের জাবরিয়্যা নাম রাখা হয়েছে। তারা বলে, বান্দা তার কর্মের উপর বাধ্য। তার কোনো স্বাধীনতা নেই। তাদের ধারণায় আল্লাহ তাআলাই একমাত্র কর্তা এবং বান্দার কর্মও আল্লাহই করেন (নাযুবিল্লাহ)। বান্দার কর্মগুলো বান্দার দিকে রূপক অর্থেই সম্বন্ধ করা হয়।

ক্বাদারিয়্যা দল : ক্বদর শব্দের দিকে সস্বন্ধ করে তাদেরকে ক্বাদারিয়্যা বলা হয়। তারা তাক্বদীরকে অস্বীকার করে। তারা জাহমিয়্যা সম্প্রদায়ের বিপরীত। তারা বলে যে, বান্দাই তার নিজের কর্মের স্রষ্টা। তাদের ধারণায় বান্দাদের কর্মসমূহ আল্লাহর ইচ্ছাধীন নয়। বরং বান্দারা নিজেদের ইচ্ছামতোই তাদের কর্মসমূহ সম্পাদন করে। তারা আল্লাহর ইলম বা জ্ঞানকে অস্বীকার করে। তারা বলে, আল্লাহ তাঁর বান্দার কর্ম সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তা জানেন না; বরং উক্ত কর্ম সম্পাদনের পর জানেন (নাযুবিল্লাহ)। 

মুরজিআ দল : ইরজা শব্দের দিকে সম্বন্ধ করে তাদেরকে মুরজিআ বলা হয়। ইরজা আরবী শব্দ, অর্থ হলো পিছিয়ে দেওয়া বা বের করে দেওয়া। তাদের নিকট অন্তরে শুধু বিশ্বাস করার নাম ঈমান। তারা আমলকে ঈমান থেকে বের করে দেয় এবং আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। তাই তাদেরকে মুরজিআ বলা হয়। তারা মনে করে, কাবীরা বা বড় গুনাহর কাজে লিপ্ত ব্যক্তি ফাসেক্ব নয়। কাফের অবস্থায় সৎকাজ করলে তা যেমন কোনো উপকারে আসে না, তদ্রুপ ঈমান ঠিক থাকলে গুনাহর কাজে পতিত হলে তা ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না। ফলে তাদের নিকট কাবীরা গুনাহের কর্মে লিপ্ত ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার। এমনকি সে শাস্তিরও সম্মুখীন হবে না। তাদের মতে আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বড়ে না এবং পাপাচারের মাধ্যমে কমে না।

উল্লিখিত সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হলো, খারেজী-রাফেযী ও জাহমিয়্যা। তবে মুরজিআ দল তাদের তুলনায় কম ক্ষতিকর। আশাআরিয়া ও মাতুরিদিয়্যারা মুরজিআ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তারা ঈমানের সংজ্ঞা থেকে যবানের দ্বারা স্বীকারোক্তি, অন্তরের আমল ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে বাহির করে দিয়েছে। শুধু অন্তরে স্বীকৃতি দেওয়াকে ঈমান বলে।

[উল্লিখিত ভ্রান্ত দলগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন : শারহুল আক্বীদাতিল ওয়াসিতিয়্যা, শায়খ ছালেহ আল-ফাওযান, পৃ. ৯৪-৯৬।]

উল্লিখিত বিদআতী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আহলুস সালাফদের অবস্থান : আহলুস সালাফদের অবস্থান হচ্ছে মধ্যমপন্থা। (১) তারা আল্লাহর নাম ও গুণকে সাব্যস্ত করেন এবং সৃষ্টির সাথে তুলনা করেন না (২) আল্লাহর আরশের উপর অবস্থানকে স্বীকার করেন (৩) তারা কোনো মুসলিমকে তার কোনো কাবীরা গুনাহের কারণে কাফের বলেন না; বরং তারা বলেন যে, সে অপরাধী ও শাস্তির হক্বদার। তওবা না করে মারা গেলে পরকালে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীনে থাকবে। (৪) তাদের নিকট ঈমান হলো অন্তরে বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি ও অঙ্গ-পত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল এবং আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বাড়ে ও খারাপ কর্মের দ্বারা ঈমান কমে। (৫) তারা সকল ছাহাবীকে ভালোবাসেন এবং মনে করেন যে, ছাহাবীরা এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। (৬) তারা কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে বিশ্বাস করেন। (৭) তারা কুরআন ও সুন্নাহকে তিন সোনালি যুগের লোকের বুঝ অনুযায়ী বুঝেন এবং (৮) তারা দলাদলি ও মতভেদের সময় কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরেন। এজন্য তাদেরকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত বলা হয়।

পরিশেষে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা এই যে, তিনি যেন আমাদের সকলকে হক্বের পথে পরিচালিত করেন এবং বিদআতী সম্প্রদায় থেকে রক্ষা করেন- আমীন!


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৮৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৫০; মিশকাত, হা/৬১২৯।

[2]. মাওসূ‘আতুল ফিরাকিল মুনতাসিবাতি লিল ইসলাম, ১/১০২।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩৩; মিশকাত, হা/৩৭৬৭।

[4]. তিরমিযী, হা/২৬৪১; সিলসিলা ছহীহা, হা/১৩৪৮।

[5]. মাজমূআ ফতওয়া, ৪/৯৫।

[6]. আল-ইস্তিক্বামাহ, ১/৪২।

[7]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩।

[8]. আল-মাওসূ‘আতুল মুইয়াসসারাহ ফিল আদয়ান, ১/১৬৯।

[9]. আল-মাওসূ‘আতুল মুইয়াসসারাহ ফিল আদয়ান, ১/১৮২।

[10]. ইবনু মাজাহ, হা/৪২; তিরমিযী, হা/২৮৯১।

[11]. আল-মাওসূ‘আতুল মুইয়াসসারাহ ফিল আদয়ান, ১/১৮২।

[12]. তিরমিযী, হা/২১৯২।

[13]. তিরমিযী, হা/২৬২৯; মিশকাত, হা/১৬২।

[14]. ইবনু মাজাহ, হা/৩৯৯৩; তিরমিযী, হা/১৫৪০; মিশকাত, হা/১৬৩।