সালামের ফযীলত ও তার বিধি-বিধান

-মুহাম্মাদ আরিফ হুসাইন

শিক্ষক, মাদরাসা দারুল হাদীছ সালাফিয়্যাহ
পাঁচরুখী, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ।

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সালাম দেওয়ার পদ্ধতি :

যে আগে সালাম দিবে, সে নিম্বোক্ত বাক্যে সালাম দিবে, السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ ‘আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ’ অর্থাৎ ‘তোমাদের উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক’।[1]

আর সালামের উত্তরে বলবে, وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُه ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ’ অর্থাৎ ‘তোমাদের উপরও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক’।

অনুপস্থিত ব্যক্তির সালামের উত্তরে এভাবে বলবে :

عَلَيْكَ وَعَلَيْهِ السَّلاَمُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ

‘আলাইকা ওয়া আলাইহিস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘তোমার এবং তার উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক’।[2]  অথবা শুধু বলবে, وَعَلَيْهِ السَّلاَمُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُه ‘ওয়া আলাইহিস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ’।[3] আর وَمَغْفِرَتُهُ)) ‘ওয়া মাগফিরাতুহু’ বা অন্যান্য শব্দযোগে যে হাদীছগুলোর বর্ণনা[4]  পাওয়া যায়, সেগুলোকে ইবনুল ক্বাইয়িম, ইবনে হাজার ও শায়খ আলবানী (রহিঃ) সহ অনেকেই নিতান্ত দুর্বল হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।

সালামের আদব বা নীতিমালা :

সালাম দেওয়া এবং উত্তর দেওয়ার কিছু আদব বা নীতিমালা রয়েছে, যেগুলো ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।

সালাম দেয়ার ক্ষেত্রে :

(১) সমাজে সালামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে : এটা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর  আদেশ।  তিনি বলেন, ‘হে লোকসকল! তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করো, অভুক্তকে আহার করাও এবং রাতেরবেলা মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সালাত আদায় করো। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে’।[5]

(২) সালাম দেওয়া সুন্নাত আর না দেওয়া সবচেয়ে বড় কৃপণতা : হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: أَبْخَلُ النَّاسِ الَّذِي يَبْخَلُ بِالسَّلَامِ، وَإِنَّ أَعْجَزَ النَّاسِ مَنْ عَجَزَ بِالدُّعَاءِ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি সালাম দিতে কার্পণ্য করে, সে সবচাইতে বড় কৃপণ। যে ব্যক্তি দু‘আ করার ব্যাপারে অক্ষম, সে সবচেয়ে বড় অক্ষম’।[6]

(৩) পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম প্রদান করতে হবে : আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামে কোন জিনিসটি উত্তম? তিনি উত্তরে বললেন, ‘তুমি খাদ্য খাওয়াবে ও চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দিবে’।[7]

(৪) সালামের ক্ষেত্রে সুন্নাত হচ্ছে- ছোট বড়কে, আরোহী পদচারীকে, পদচারী উপবিষ্টকে এবং অল্প সংখ্যক অধিক সংখ্যককে সালাম দিবে : আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى الْمَاشِي، وَالْمَاشِي عَلَى الْقَاعِدِ، وَاالقَلِيلُ عَلَى الْكَثِيرِ

‘আরোহী পদচারীকে, পদচারী উপবিষ্টকে এবং অল্প সংখ্যক অধিক সংখ্যককে সালাম দিবে।[8]

(৫) অনুপস্থিত ব্যক্তিকে অন্যের মাধ্যমে সালাম পৌঁছানো যাবে : আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা নবী (ছাঃ) তাকে বললেন,

عَائِشَةُ، هَذَا جِبْرِيلُ يَقْرَأُ عَلَيْكِ السَّلاَمَ‏ فَقَالَتْ وَعَلَيْهِ السَّلاَمُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ‏.‏ تَرَى مَا لاَ أَرَى‏.‏ تُرِيدُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم‏.‏

‘হে আয়েশা! এই যে জিবরীল (আঃ) তোমাকে সালাম দিচ্ছেন’। তখন তিনি বললেন, তাঁর প্রতি সালাম, আল্লাহর রহমত এবং বরকত বর্ষিত হোক। আপনি এমন কিছু দেখেন যা আমি দেখতে পাই না। এর দ্বারা তিনি নবী (ছাঃ)-কে বুঝিয়েছেন।[9]

(৬) ছোট বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়াও সুন্নাত : হাদীছে এসেছে,

عن أنس – رضي الله عنه – : أنَّهُ مَرَّ عَلَى صِبْيَانٍ ، فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ، وقال : كَانَ رسول الله – صلى الله عليه وسلم – يَفْعَلُهُ

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি একদিন বাচ্চাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন এবং তিনি তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, রাসূল (ছাঃ) বাচ্চাদের সালাম দিতেন।[10]

(৭) বৈঠক ত্যাগ করার সময় সালাম দেওয়া সুন্নাত : আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَجْلِسِ فَلْيُسَلِّمْ فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ فَلْيُسَلِّمْ فَلَيْسَتِ الأُولَى بِأَحَقَّ مِنَ الآخِرَةِ

‘তোমাদের কেউ মজলিসে উপস্থিত হলে যেন সালাম দেয় এবং মজলিস হতে বিদায়ের সময়ও যেন সালাম দেয়। প্রথম সালাম শেষের সালাম থেকে অধিক গুরুত্ব বহন করে না’।[11]

(৮) যদি কোনো ব্যক্তি ঘুমে থাকে, তখন সেখানে এমনভাবে সালাম দেওয়া, যাতে জাগ্রত লোকজন শুনতে পায় এবং ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুমের কোনো ক্ষতি না হয় : মিক্বদাদ (রাঃ)-এর স্বীয় বর্ণনায় বর্ণিত, দীর্ঘ হাদীছটিতে তিনি বলেন,

كُنَّا نَرْفَعُ للنَّبيِّ – صلى الله عليه وسلم – نَصِيبَهُ مِنَ اللَّبَنِ ، فَيَجِيءُ مِنَ اللَّيْلِ ، فَيُسَلِّمُ تَسْلِيماً لاَ يُوقِظُ نَائِماً ، وَيُسْمِعُ اليَقْظَانَ ، فَجَاءَ النَّبِيُّ – صلى الله عليه وسلم – فَسَلَّمَ كَمَا كَانَ يُسَلِّمُ .

‘আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য তাঁর দুধের ভাগটি তুলে রাখতাম। তিনি রাতে এসে এমনভাবে সালাম দিতেন, যাতে কোনো ঘুমন্ত ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত না হয়, তবে যারা জাগ্রত তারা তার সালাম শুনতে পেত। একদিন রাসূল (ছাঃ) আমাদের মাঝে আসলেন এবং তিনি এসে যেভাবে সালাম দেওয়ার সেভাবে সালাম দিলেন’।[12]

সালামের উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে :

(১) সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব : আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

خَمْسٌ تَجِبُ لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ رَدُّ السَّلاَمِ وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ

‘পাঁচটি বিষয় একজন মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের ব্যাপারে ওয়াজিব: (১) সালামের উত্তর দেওয়া (২) হাঁচি দাতাকে (তার ‘আল-হামদু লিল্লাহ’ বলার উত্তরে) ‘ইয়ারহামুকুল্লাহ’ বলে দু’আ করা (৩) দাওয়াত কবুল করা (৪) অসুস্থকে দেখতে যাওয়া এবং (৫) জানাযার সঙ্গে শরীক হওয়া’।[13]

(২) সালাম প্রদানকারীর চেয়ে উত্তম বাক্যে বা তার মতোই দিতে হবে : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا

‘আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হবে, তখন তোমরা  উত্তম সালাম দেবে অথবা জবাবে তাই দেবে’ (নিসা,  ৮৬)।

(৩) সালামের উত্তর সশব্দে প্রদান করা : মোল্লা আলী ক্বারী (রহিঃ) বলেছেন, প্রদানকারী সালামের উত্তর না শুনা পর্যন্ত সেটা উত্তর হিসাবে গণ্য হবে না। তবে যদি সে বধির হয় সে ক্ষেত্রে ইশারা করা যাবে।[14]

(৪) ছালাতরত অবস্থায় সালামের উত্তর : ছালাতরত অবস্থায় সালামের উত্তর হাতের ইশারায় গ্রহণ করবে। যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেছেন,

دَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَسْجِدَ قُبَاءَ لِيُصَلِّيَ فِيهِ، فَدَخَلَ عَلَيْهِ رِجَالٌ يُسَلِّمُونَ عَلَيْهِ، فَسَأَلْتُ صُهَيْبًا وَكَانَ مَعَهُ: كَيْفَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْنَعُ إِذَا سُلِّمَ عَلَيْهِ؟ قَالَ: كَانَ يُشِيرُ بِيَدِهِ

নবী (ছাঃ) ছালাত আদায় করার জন্য একদা মসজিদে কুবায় প্রবেশ করলেন। এরপর কয়েকজন ছাহাবী তাঁকে সালাম করার জন্য তাঁর কাছে আসলেন। ছুহায়েব (রাঃ)ও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, যখন নবী (ছাঃ)-কে সালাম করা হলো, তখন তিনি কী করলেন? তিনি বললেন, তিনি হাত দ্বারা ইশারা করলেন।[15]

কখন সালাম দেওয়া নিষিদ্ধ এবং অপসন্দনীয় :

সালাম দেওয়ার কিছু নিষিদ্ধ এবং অপসন্দনীয় দিক রয়েছে যেগুলো ছহীহ হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত, সেগুলো হলো-

(১) ইয়াহূদী, খ্রীস্টান ও কোনো কাফেরকে প্রথমে সালাম দেওয়া নিষিদ্ধ : যদি তারা সালাম দেয়, তাদের সালামের উত্তরে- وَعَلَيْكُمُ (ওয়া আলাইকুম) বা وَعَلَيْكَ (ওয়া আলাইকা) ‘তুমি ও তোমার উপর’ শুধু এ কথা বলবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

لاَ تَبْدَءُوا الْيَهُودَ وَلاَ النَّصَارَى بِالسَّلاَمِ فَإِذَا لَقِيتُمْ أَحَدَهُمْ فِي طَرِيقٍ فَاضْطَرُّوهُ إِلَى أَضْيَقِهِ

‏‘ইয়াহূদী ও নাছারাদের আগ বাড়িয়ে সালাম করো না এবং তাদের কাউকে রাস্তায় দেখলে তাকে রাস্তার পাশে চলতে বাধ্য করো।[16]  ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

إ إِنَّ الْيَهُودَ إِذَا سَلَّمُوا عَلَيْكُمْ يَقُولُ أَحَدُهُمُ السَّامُ عَلَيْكُمْ فَقُلْ عَلَيْكَ‏

‘ইয়াহূদীরা যে সময় তোমাদের প্রতি সালাম দেয়, সে সময় তাদের কেউ বলে ‘আস-সামু আলাইকুম’ (তোমাদের মরণ হোক)। তখন তুমি বলবে, ‘ওয়া আলাইকা’ (তোমারও হোক)’। [17]

(২) সালাম দেওয়ার সময় عَلَيْكَ السَّلاَمُ (আলাইকাস সালাম) বলা নিষিদ্ধ : আবু জুরাই আল-হুজায়মী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أَت أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقُلْتُ عَلَيْكَ السَّلاَمُ يَا رَسُولَ اللَّهِ.قَالَ لاَ تَقُلْ عَلَيْكَ السَّلاَمُ فَإِنَّ عَلَيْكَ السَّلاَمُ تَحِيَّةُ الْمَوْتَى.

‏একদা আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললাম, ‘আলাইকাস সালামু ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘আলাইকাস সালাম বলো না। কারণ এটা হলো মুর্দার প্রতি সালাম’।[18]

(৩) ইশারা-ইঙ্গিত করে সালাম দেওয়া নিষিদ্ধ : আমর ইবনে শু‘আইব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لاَ تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلاَ بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بِالأَصَابِعِ وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفِّ. قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ إِسْنَادُهُ ضَعِيفٌ. وَرَوَى ابْنُ الْمُبَارَكِ هَذَا الْحَدِيثَ عَنِ ابْنِ لَهِيعَةَ فَلَمْ يَرْفَعْهُ.

‏‘বিজাতির অনুকরণকারী ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী-নাছারাদের অনুকরণ করো না। কেননা ইয়াহূদীরা আঙ্গুলের ইশারায় এবং নাছারারা হাতের ইশারায় সালাম দেয়’।[19] তবে দূরে থাকার কারণে বা অন্য কোনো প্রয়োজনের তাগিদে হাত উঠিয়ে ইশারা-ইঙ্গিতে সালাম  দেওয়া যাবে, কিন্তু সালাম মুখে সশব্দে উচ্চারণ করতে হবে।[20]

(৪) যারা গুনাহে লিপ্ত, গুনাহ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের সালাম দেওয়া যাবে না। তবে যদি মনে করে যে, সালামের কারণে তার গুনাহ কমবে, গুনাহ থেকে ফিরে আসবে বা নছীহত করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সালাম দেওয়া যাবে : রাসূল (ছাঃ) কা‘ব ইবনে মালেক (রাঃ) এবং তার সাথীদের সাথে ৫০ দিন পর্যন্ত সম্পর্ক ছিন্ন রাখেন এবং সালামের উত্তর দেননি। আল্লাহ তাদের তওবা কবুল না করা পর্যন্ত রাসূল (ছাঃ) তাদের সাথে কোনো কথাবার্তা বলেননি।[21]  হাফেয ইবনে হাজার (রহিঃ) ফাতহুল বারীতে বলেন, অধিকাংশের মতে ফাসেক্ব ব্যক্তিকে সালাম দেওয়া যাবে না এবং বিদ‘আতীকে সালাম দেওয়া যাবে না।

(৫) ইসতিঞ্জারত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া অপসন্দনীয় : হাদীছে এসেছে,

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ رَجُلاً، مَرَّ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يَبُولُ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ إِذَا رَأَيْتَنِي عَلَى مِثْلِ هَذِهِ الْحَالَةِ فَلاَ تُسَلِّمْ عَلَىَّ فَإِنَّكَ إِنْ فَعَلْتَ ذَلِكَ لَمْ أَرُدَّ عَلَيْكَ.

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী (ছাঃ)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন পেশাবরত ছিলেন। তিনি তাকে সালাম করলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বলেন, ‘তুমি আমাকে এ অবস্থায় দেখতে পেলে আমাকে সালাম করবে না। কারণ তুমি তা করলে আমি তোমার সালামের উত্তর দিতে পারব না’।[22]

(৬) খুৎবারত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশকালে সালাম দেওয়া অপসন্দনীয় : খুৎবা চলাকালীন মুছল্লীদের পারস্পরিক কথা বলা হারাম, নয়তো তার জুম‘আ বাতিল হয়ে যাবে।[23]  এজন্য ওলামায়ে কেরাম একমত পোষণ করেছেন যে, খুৎবারত অবস্থায় সালাম না দিয়ে তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করবে আর কেউ সালাম দিলে ইশারার মাধ্যমে উত্তর নিবে।[24]

(৭) আযানরত অবস্থায় মুআযযিনকে সালাম দেওয়া অপসন্দনীয়, তবে কেউ সালাম দিলে তাকে আযানের মাঝেই উত্তর দিতে হবে।[25]

(৮) কুরআন তিলওয়াতকারীকে এবং আহারকারীকে সালাম দেওয়া নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো পাওয়া যায় এগুলো প্রত্যেকটিই নিতান্ত দুর্বল।

উপসংহার :

পরিশেষে বলব, সালাম বিনিময়ের প্রচলন এজন্যই যে, সালামের মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি দয়া-মায়া, আন্তরিকতা, ভালোবাসা, মমত্ববোধ, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার ভাব বৃদ্ধি পায়। আর এসব গুণ যখন একজন মানুষের অন্তরে জাগ্রত হয়, তখন মানব মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা অহঙ্কার, বড়ত্বভাব, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ ইত্যাদি অনৈসলামিক ও দূষণীয় চিন্তাধারা দূরীভূত হয় এবং তার ঈমান মযবূত হয়, অন্তর নরম হয়। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় হয়। রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ সেই বান্দার প্রতিও সদয় হন। ফলে তার প্রতি মহান আল্লাহ তা‘আলার রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়। ইহকালীন জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে তথা শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত করার নিমিত্তে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর বিশেষ সুন্নাহ সালামের ব্যাপক প্রচলনের কোনো বিকল্প নেই। সালামের ব্যাপক প্রচলন করার জন্য রাসূলে করীম (ছাঃ) যেভাবে সালাম দেওয়ার বিধান আমাদের জন্য রেখে গেছেন, তা অনুসরণ ও অনুকরণ করা অতীব যরূরী।

এক মুসলিম আরেক মুসলিমের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলে সালাম দিবে এবং অপরজন তার উত্তর দিবে। এ নিয়ম যে কত সুন্দর নিয়ম তা ব্যাখ্যা করে শেষ করা যাবে না। সালামের মধ্যে শান্তির দু‘আ করা হয়। আস-সালামু আলাইকুমের অর্থ হলো- আপনাদের শান্তি হোক, আল্লাহ আপনাদের শান্তি দান করুন, রহমত দান করুন। সালামের মাধ্যমে শান্তির দু‘আ করা হয়। এর চেয়ে ভালো দু‘আ আর কী হতে পারে? শান্তির চেয়ে বড় কিছু মানুষের কাম্য নয়। আমরা সবকিছুতে শান্তি চাই, জীবনের সবক্ষেত্রে চাই। দুনিয়াতেও চাই, আখেরাতেও চাই। প্রত্যেকটা পদে পদে শান্তি চাই। সালামের মধ্যে এরই দু‘আ করা হয়। তাই এর চেয়ে উত্তম দু‘আ আর হতে পারে না। কোনো মুসলিম যখন সালামের অর্থ বুঝে অন্তর থেকে সালাম দিবেন আর যিনি সালাম গ্রহণ করবেন, তিনি অর্থ বুঝে সালাম গ্রহণ করবেন। তখন উভয়ের মধ্যে মহব্বত সৃষ্টি হবে। এভাবেই সমাজ নিরাপদ, শান্তিময় এবং কলুষমুক্ত সমাজে রূপলাভ করবে। আল্লাহ কবুল করুন-আমীন!

[1]. তিরমিযী, হা/২৭২১।

[2]. শরহে রিয়াদুছ ছলিহীন,  ৪/৪০১ পৃঃ, হা/৮৫৩।

[3].  ছহীহ বুখারী, হা/৩২২৭।

[4]. আবুদাউদ, হা/৫১৯৬; যাদুল মা‘আদ, ২/৪১৮।

[5].  তিরমিযী, হা/২৪৮৫; দারেমী, হা/১৪৬০; ইবনে মাজাহ, হা/৩২৫১; ইরওয়াহ, হা/২৩৯; ছহীহ তারগীব, হা/৬১২; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৫৬৯।

[6]. আদাবুল মুফরাদ, হা/১০৫২।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১২, ২৮, ৬২৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৪২।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৩৯।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২২৭।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৬৮।

[11]. আবুদাঊদ, হা/৫২০৮।

[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫২৫৭।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৪৩।

[14]. ছহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল কারী।

[15]. নাসাঈ, হা/১১৮৭।

[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৫৪।

[17]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫৪৭।

[18]. আবুদাঊদ, হা/৫২০৯।

[19]. তিরমিযী, হা/২৬৯৫।

[20]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী।

[21]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪১৮।

[22].  ইবনে মাজাহ হা/৩৫২।

[23].  আবুদাঊদ, হা/১০৫১।

[24]. ফতওয়া ইসলাম ওয়েব, ফতওয়া-২৭১৫৮।

[25]. আল-আযকার লিন নাবাবী।