সালামের ফযীলত ও তার বিধি-বিধান

-মুহাম্মাদ আরিফ হুসাইন

লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব,
শিক্ষক, মাদরাসা দারুল হাদীছ সালাফিইয়াহ, পাঁচরুখী, আড়াইহাজার, নারায়নগঞ্জ।

ভূমিকা :

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের এমন  কোনো দিক নেই, যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ইসলাম দেয়নি। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডডসহ সবক্ষেত্রেই মেনে চলার জন্য ইসলাম দিয়েছে বিস্তারিত ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান। পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ মানবজীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তাই মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই আল্লাহ তা‘আলা একে অপরের প্রতি সম্ভাষণ করার পদ্ধতি নবী-রাসূলদের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। সর্বপ্রথম তিনি  আদম (আঃ)-কে সালামের শিক্ষা দেন। আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফেরেশতাদের সালাম দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সালাম দিলে ফেরেশতারাও সালামের উত্তর দেন।

প্রাক-ইসলামী যুগে আরব সমাজে ‘আন‘আমাল্লাহু বিকা আইনান’ অর্থাৎ ‘আপনার দ্বারা আল্লাহ আপনার প্রিয়জনের চক্ষু শীতল করুন’ এবং ‘আন‘আমা ছবাহান’ অর্থাৎ ‘আপনার সকাল সুন্দর-সমৃদ্ধ হোক’ বা ‘সুপ্রভাত’ ইত্যাদি শব্দের প্রচলন ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর বিশ্বনবী মুহাম্মদ (ছাঃ) প্রাক-ইসলামী যুগের ব্যবহৃত শব্দগুলো পরিহার করে পরস্পরকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে অভিবাদন জানাতে নির্দেশ দেন।

একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় যে বাক্য দ্বারা পারস্পরিক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, শান্তি-নিরাপত্তা, কল্যাণ ও দু‘আ কামনা করে তারই নাম সালাম। সালাম ইসলামের চিরন্তন অভিবাদন, মুসলিম উম্মাহর সম্ভাষণ, সালামের মাধ্যমে পরস্পরের জন্য শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়। কোনো মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাকে চিনি বা না চিনি প্রথমে সালাম দেয়া রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত। আর সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব।

কুরআন ও ছহীহ হাদীছে সালাম প্রচার-প্রসারের গুরুত্ব :

সালাম আরবী শব্দ। এর অর্থ শান্তি, নিরাপত্তা, অভিবাদন, ইত্যাদি। ‘সালাম’ আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে সালাম প্রচার-প্রসারের জন্য বিভিন্নভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং এর নিয়ম-নীতি, ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ মুসলিমদের মধ্যে সালামের প্রচার-প্রসার ইসলামের একটি মহান ঐতিহ্য ও বিশেষ সৌন্দর্য আর পরস্পর সালাম বিনিময় করা একজন মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের অধিকার ও দায়িত্ব।

এটি স্বয়ং আল্লাহর সম্ভাষণ :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, سَلاَمٌ قَوْلاً مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ  ‘অনন্ত শান্তি পরম দয়ালু প্রভুর পক্ষ থেকে সম্ভাষণ’ (ইয়াসিন, ৫৮)। এটি নবী-রাসূলগণের সুন্নাত, খাঁটি মুমিনদের বৈশিষ্ট্য। যা আদম (আঃ) থেকে শুরু করে ক্বিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-কে সালামের শিক্ষা  দেন। আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফেরেশতাদের সালাম দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সালাম দিলে ফেরেশতারাও এর উত্তর দেন। এ বিষয়ে নবী‎ করীম (ছাঃ) বলেন,

خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ وَطُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا، ثُمَّ قَالَ: اذْهَبْ فَسَلِّمْ عَلَى أُولَئِكَ مِنَ المَلاَئِكَةِ، فَاسْتَمِعْ مَا يُحَيُّونَكَ، تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ، فَقَالَ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ، فَقَالُوا: السَّلاَمُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ ، فَزَادُوهُ: وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ، فَلَمْ يَزَلِ الخَلْقُ يَنْقُصُ حَتَّى الآنَ

‘আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। তাঁর দেহের দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাঁকে (আদমকে) বললেন, যাও, ঐ ফেরেশতা দলের প্রতি সালাম করো এবং তাঁরা তোমার সালামের জবাব কীভাবে দেয় তা মনোযোগ দিয়ে শোনো। কারণ সেটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের রীতি। অতঃপর আদম (আঃ) (ফেরেশতাদের) বললেন, ‘আস-সালামু আলাইকুম’। ফেরেশতাম-লী তার উত্তরে ‘আস-সালামু আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বললেন। ফেরেশতারা সালামের জবাবে ‘ওয়া রহমাতুল্লাহ’ শব্দটি বাড়িয়ে বললেন। যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তারা আদম (আঃ)-এর আকৃতিবিশিষ্ট হবেন। তবে আদম সন্তানের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বদা কমতে কমতে বর্তমান পরিমাপে এসেছে’।[1]

এই সালামই হবে জান্নাতবাসীদের শুভেচ্ছা :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  تَحِيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ وَأَعَدَّ لَهُمْ أَجْرًا كَرِيمًا ‘যেদিন তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন সম্মানজনক প্রতিদান’ (আহযাব, ৪৪)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,  لَا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا تَأْثِيمًا – إِلَّا قِيلًا سَلَامًا سَلَامًا ‘তারা সেখানে (জান্নাতে) শুনতে পাবে না কোনো বেহুদা কথা এবং না পাপের কথা; শুধু এই বাণী ছাড়া, সালাম, সালাম’ (ওয়াক্বি‘আ, ২৫-২৬)।

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে সালাম প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেন,يَا أَ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্য কারও গৃহে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম দিবে’ (নূর, ২৭)।

সালামের উত্তর সালাম প্রদানকারীর চেয়ে উত্তম বাক্যে বা তার মতোই দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا ‘আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হবে, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে অথবা জবাবে তাই দেবে’ (নিসা, ৮৬)।

শুধু তাই নয়, আল্লাহ তা‘আলা সালামকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও বরকতের প্রতীক হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন,  এমনকি নিজ ঘরে প্রবেশকালেও সালাম দিতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন, فَإِذَا دَخَلْتُمْ بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ ‘তবে তোমরা যখন কোনো ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা নিজেদের উপর সালাম করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতপূর্ণ ও পবিত্র অভিবাদনস্বরূপ’ (নূর, ৬১)।

রাসূল (ছাঃ) মদীনায় হিজরত করে প্রথম ভাষণেই তিনি সালাম প্রসারের আদেশ করেছেন। কারণ একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে পরস্পর সম্প্রীতি, ভালোবাসা প্রতিষ্ঠায় সালামের ভূমিকা অতুলনীয়। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ انْجَفَلَ النَّاسُ إِلَيْهِ.وَقِيلَ قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ فَجِئْتُ فِي النَّاسِ لأَنْظُرَ إِلَيْهِ فَلَمَّا اسْتَبَنْتُ وَجْهَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَرَفْتُ أَنَّ وَجْهَهُ لَيْسَ بِوَجْهِ كَذَّابٍ فَكَانَ أَوَّلَ شَىْءٍ تَكَلَّمَ بِهِ أَنْ قَالَ ‏ “‏ يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلاَمَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ ‏”‏.‏

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় পদার্পণ করলে লোকেরা তাঁকে দেখার জন্যে ভিড় জমায় এবং বলাবলি হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসেছেন। আমিও লোকদের সাথে তাঁকে দেখতে গেলাম। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম যে, এ চেহারা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। তখন তিনি সর্বপ্রথম যে কথা বললেন তা হলো, হে লোকসকল! তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করো, অভুক্তকে আহার করাও এবং রাতেরবেলা মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন ছালাত আদায় করো। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।[2]

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا بُنَيَّ إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ يَكُنْ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ. قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ

রাসূল (ছাঃ) আমাকে বলেছেন, ‘হে বৎস! তুমি যখন তোমার পরিবারের নিকট প্রবেশ করবে, তখন তাদেরকে সালাম দিবে। তা তোমার জন্য এবং তোমার পরিবারের জন্য বরকত বয়ে আনবে’।[3]

ক্বাতাদাহ (রাঃ) বলেন, তুমি যখন তোমার পরিবারের নিকট প্রবেশ করবে, তখন তাদেরকে সালাম দিবে আর বাড়ীতে কেউ না থাকলে, তুমি বলবে, السَّلاَمُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ‏ (আস-সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লা-হিছ ছলিহীন) অর্থাৎ ‘সালাম আমাদের ও আল্লাহর নেক বান্দাদের উপর বর্ষিত হোক’।[4]

সালাম প্রচার-প্রসার করার ফীযলত ও উপকারিতা :

সালাম দেওয়া এবং প্রচার-প্রসার করার ব্যাপারে অনেক ফযীলত ও উপকারিতা রয়েছে, যেগুলো ছহীহ হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত।

(১) সালাম দেয়া সর্বোত্তম ইসলামী কাজ : হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رضى الله عنهما أَنَّ رَجُلاً، سَأَلَ النَّبِيَّr   أىُّ الإِسْلاَمِ خَيْرٌ قَالَ ‏تُطْعِمُ الطَّعَامَ، وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামে কোন জিনিসটি উত্তম? তিনি বললেন, ‘তুমি খাদ্য খাওয়াবে ও চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দিবে’।[5]

(২) সালামের প্রসার জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম মাধ্যম : হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلاَمَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ.‏

‘হে লোকসকল! তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করো, অভুক্তকে আহার করাও এবং রাতেরবেলা মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন ছালাত আদায় করো। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে’।[6]

এ ছাড়াও সালাম জান্নাতে প্রবেশকে আবশ্যক করে। আবু শুরাইহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ يُوجِبُ الْجَنَّةَ، قَالَ: طِيبُ الْكَلَامِ، وَبَذْلُ السَّلَامِ، وَإِطْعَامُ الطَّعَامِ

‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে এমন আমল বলে দিন, যা জান্নাতে প্রবেশকে আবশ্যক করে। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘মিষ্টি কথা, সালামের প্রসার এবং মানুষকে খানা খাওয়ানো’। [7]

(৩) সালামের মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি, অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধি পায় : আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ) বলেছেন,

لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ

‘ঈমানদার ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদেরকে তা বলে দিব না, কী করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে’।[8]

(৪) সালামের প্রতি বাক্যে ১০টি ছওয়াব বরাদ্দ রয়েছে : ইমরান ইবনু হুছাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ.فَرَدَّ عَلَيْهِ السَّلاَمَ ثُمَّ جَلَسَ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم‏ عَشْرٌ.ثُمَّ جَاءَ آخَرُ فَقَالَ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ.فَرَدَّ عَلَيْهِ فَجَلَسَ فَقَالَ ‏”‏عِشْرُونَ”‏.ثُمَّ جَاءَ آخَرُ فَقَالَ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ.فَرَدَّ عَلَيْهِ فَجَلَسَ فَقَالَ ‏”‏ثَلاَثُونَ”‏‏.

এক লোক নবী (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, আস-সালামু আলাইকুম। তিনি তার জবাব দিলেন। লোকটি বসে পড়লেন। তিনি বললেন, ‘১০ নেকী’। এরপর আরেকজন এসে বললেন, আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। নবী (ছাঃ) অনুরূপ জবাব দিলেন। লোকটি বসলেন। তিনি বললেন, ‘২০ নেকী’ অতঃপর আরেকজন এসে বললেন, আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। নবী (ছাঃ) তারও জবাব দিলেন। লোকটি বসলেন। তিনি বললেন, ‘৩০ নেকী’।[9]

(৫) আগে সালাম দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক উত্তম ব্যক্তি এবং অহংকারমুক্ত হওয়া যায় : আবু উমামা প থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِاللَّهِ مَنْ بَدَأَهُمْ بِالسَّلاَمِ  ‘মানুষের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক উত্তম ঐ ব্যক্তি যে আগে সালাম দেয়’।[10]

আবু আইয়ূব আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لاَ يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثِ لَيَالٍ، يَلْتَقِيَانِ فَيُعْرِضُ هَذَا وَيُعْرِضُ هَذَا، وَخَيْرُهُمَا الَّذِي يَبْدَأُ بِالسَّلاَمِ ‘কোনো লোকের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের অধিক এমনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে যে, দু’জনে দেখা হলেও একজন এদিকে আরেকজন ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখবে। তাদের মধ্যে যে আগে সালাম দিবে, সেই উত্তম লোক’। [11]

(৬) সালামের উত্তর দিলে মুসলিমের হক্ব আদায় করা হয় : আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ رَدُّ السَّلاَمِ، وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ.

‘এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের হক্ব পাঁচটি- (১) সালামের জবাব দেওয়া (২) অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া  (৩) জানাযার পশ্চাদানুসরণ করা (৪) দাওয়াত কবুল করা এবং (৫) হাঁচিদাতাকে খুশি করা তথা ‘আল-হামদুলিল্লাহ’র জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা’। [12]

(৭) সালামের পর মুছাফাহা করলে ছাগীরা গুনাহ তথা ছোট ছোট গুনাহ মাফ হয়ে যায় : আল-বারাআ‘ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,  مَا مِنْ مُسْلِمَيْنِ يَلْتَقِيَانِ فَيَتَصَافَحَانِ إِلاَّ غُفِرَ لَهُمَا قَبْلَ أَنْ يَفْتَرِقَا ‘দু’জন মুসলিম পরস্পর মিলিত হয়ে মুছাফাহা করলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বেই তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়’। [13] এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতকে বারবার সালামের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন, এমনকি একই ব্যক্তির সাথে ক্ষণেক পরপর দেখা হলেও তাকে সালাম দিতে বলেছেন।

আবু হুরায়রা (ছাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, إِذَا لَقِيَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ فَإِنْ حَالَتْ بَيْنَهُمَا شَجَرَةٌ أَوْ جِدَارٌ أَوْ حَجَرٌ ثُمَّ لَقِيَهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ أَيْضًا ‘তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন সে যেন তাকে সালাম দেয়। অতঃপর দু’জনের মাঝে যদি গাছ, দেয়াল বা পাথর আড়াল হয়ে যায় এবং তারপর আবার সাক্ষাৎ হয়, তাহলেও যেন তাকে সালাম দেয়’।[14]

(৮) সালাম আদান-প্রদানের জন্য ছাহাবীগণ লোক সমাগমে, এমনকি বাজারে পর্যন্ত চলে যেতেন : হাদীছে এসেছে,

عَنْ إِسْحَقَ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ أَنَّ الطُّفَيْلَ بْنَ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ أَخْبَرَهُ  : أَنَّهُ كَانَ يَأْتِي عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ فَيَغْدُو مَعَهُ إِلَى السُّوقِ قَالَ فَإِذَا غَدَوْنَا إِلَى السُّوقِ لَمْ يَمُرَّ عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ عَلَى سَقَاطٍ وَلَا صَاحِبِ بِيعَةٍ وَلَا مِسْكِينٍ وَلَا أَحَدٍ إِلَّا سَلَّمَ عَلَيْهِ قَالَ الطُّفَيْلُ فَجِئْتُ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ يَوْمًا فَاسْتَتْبَعَنِي إِلَى السُّوقِ فَقُلْتُ لَهُ وَمَا تَصْنَعُ فِي السُّوقِ وَأَنْتَ لَا تَقِفُ عَلَى الْبَيِّعِ وَلَا تَسْأَلُ عَنْ السِّلَعِ وَلَا تَسُومُ بِهَا وَلَا تَجْلِسُ فِي مَجَالِسِ السُّوقِ قَالَ وَأَقُولُ اجْلِسْ بِنَا هَاهُنَا نَتَحَدَّثُ قَالَ فَقَالَ لِي عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ يَا أَبَا بَطْنٍ وَكَانَ الطُّفَيْلُ ذَا بَطْنٍ إِنَّمَا نَغْدُو مِنْ أَجْلِ السَّلَامِ نُسَلِّمُ عَلَى مَنْ لَقِيَنَا

ইসহাক্ব ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবু তালহা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তুফাইল ইবনে উবাই ইবনে কা‘ব (রাঃ) সকাল সকালে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এর নিকট আসতেন এবং তাঁর সঙ্গে বাজারে গমন করতেন। তুফাইল (রাঃ) বলেন, আমরা বাজারে পৌঁছলে ইবনে ওমর (রাঃ) যেকোনো মামুলী জিনিস বিক্রেতাকে, যেকোনো দোকানদারকে, যেকোনো মিসকীনকে, এমনকি প্রত্যেককে সালাম দিতেন। তুফাইল (রাঃ) বলেন, একদা আমি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এর নিকট গেলাম। পরে তিনি আমাকে বাজারে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমি বললাম, আপনি বাজারে যেয়ে কী করবেন? বেঁচা-কেনার নিকটে আপনি যান না, কোনো বস্তু সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস করেন না, কোনো জিনিসের দামও জিজ্ঞেস করেন না কিংবা বাজারের কোনো মজলিসেও বসেন না। এর চাইতে এখানে বসে থাকুন এবং আমরা পরস্পর আলাপ-আলোচনা করি। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বললেন, হে ভুঁড়িওয়ালা! (তুফাইলের পেট মোটা ছিল বলে এই রকম বললেন) আমি সালাম করার জন্যই বাজারে যাই, যার সাথে সাক্ষাৎ হয় তাকে সালাম করি।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

[1]. . ছহীহ বুখারী, হা/৩৩২৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৪১।

[2].  তিরমিযী, হা/২৪৮৫; ইবনে মাজাহ, হা/৩২৫১; ইরওয়াহ, হা/২৩৯; ছহীহ তারগীব, হা/৬১২; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৫৬৯।

[3]. তিরমিযী, হা/২৬৯৮, হাসান-ছহীহ।

[4]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/৮৪৫৭।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১২, ২৮, ৬২৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৪২।

[6].  তিরমিযী, হা/২৪৮৫; ইবনে মাজাহ, হা/৩২৫১; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৫৬৯।

[7].  ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৫০৪।

[8].  ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮।

[9].  আবুদাঊদ, হা/৫১৯৫।

[10]. আবুদাঊদ, হা/৫১৯৭।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৭৭, ৬২৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬০; আহমাদ, হা/২৩৬৫৪ (আধুনিক প্রকাশনী, হা/৫৬৩৯, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, হা/৫৫৩৫)।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৪০।|

[13]. আবুদাঊদ, হা/৫২১২।

[14]. আবুদাঊদ, হা/৫২০০।