সূরা আন-নাবা : মানবজাতির জন্য হাদিয়া


হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী*


(নভেম্বর’২১ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(পর্ব-৫)

(৪) মহান আল্লাহ দিন ও রাত্রি সৃষ্টি করেছেন : রাতে ও দিনে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে হবে। মায়ের পেট থেকে দুনিয়াতে আসা আবার বড় হওয়া অথবা শিশু থাকা অবস্থা অথবা বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ- এসবই মহান আল্লাহর নিদর্শন। মানুষ দুনিয়ায় আসছে আবার চলে যাচ্ছে। কেউ আসছে আবার কেউ মৃত্যুবরণ করছে। এভাবেই দিন আসছে, রাত চলে যাচ্ছে আর রাত আসছে, দিন চলে যাচ্ছে। এক যুগ চলে যাচ্ছে আর এক যুগ আসছে। এসবের পরিবর্তন মানুষকে স্মরণ করাচ্ছে মৃত্যু, আল্লাহর একত্ব, সকল ইবাদত তার জন্যই করা, তার হুকুমে দিন-রাতের পরিবর্তন ও তারই আদেশে সবকিছু চলমান হওয়ার কথা। বিধায় চোখ-কান খুলে নিজের কল্যাণের দিকে অগ্রসর হতে হবে। রাত ও দিনের পরিবর্তনে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রামের মাধ্যম। আর রাত্রিকে করেছি আবরণ এবং দিবসকে করেছি জীবিকা আহরণের জন্য উপযোগী’ (আন-নাবা, ৭৮/৯-১১)। মানবজাতি দিনের বেলায় কাজ-কর্মে ব্যস্ত থেকে ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন তার আরাম-আয়েশের প্রয়োজন হয়। তাই তিনি রাতে নিদ্রার ব্যবস্থা করেছেন যাতে মানুষ ঘুমিয়ে তার ক্লান্তি দূর করতে পারে। তিনি রাত্রিকে অন্ধকার করেছেন যাতে তারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হতে পারে, আরাম-আয়েশ করতে পারে। আবার দিনের বেলায় সূর্য দিয়েছেন যাতে তাদের কাজ-কর্ম করতে সুবিধা হয়। যমীনে ফসল ফলানোর জন্য তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। এসবই মানবজাতির কল্যাণে মহান আল্লাহর দান। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, একজন স্রষ্টা রয়েছে। তারই জন্য সকল ইবাদত করতে হবে, তার কাছেই সকল চাওয়া-পাওয়া আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বলো, হে রাজ্যধিপতি আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা, রাজত্ব দান করেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা, রাজত্ব ছিনিয়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, আপনারই হাতে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। আপনি রজনীকে দিবসের ভিতরে প্রবেশ করান এবং দিবসকে রজনীর ভিতর প্রবেশ করান এবং মৃত হতে জীবিতকে নির্গত করেন এবং জীবিত হতে মৃত্যুকে বহির্গত করেন এবং আপনি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করে থাকেন (আলে ইমরান, ৩/২৬-২৭)। কল্যাণ-অকল্যাণ, সম্মান দেওয়া ও লাঞ্ছিত করা, রাজত্ব দেওয়া ও রাজত্ব ছিনিয়ে নেওয়া ও দিনের পর রাত, রাতের পর দিন আসাতে কারো কোনো ক্ষমতা নেই, আল্লাহর ক্ষমতা ছাড়া। আবার কোনো সময় দিন বড় হয়, রাত ছোট হয়। এর বিপরীতে শীতকালে রাত বড় হয় আর দিন ছোট হয়। এসবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। আর স্বামী-স্ত্রীর শুক্রকীট ও ডিম্বানু থেকে মহান আল্লাহ সন্তানসন্ততি সৃষ্টি করেন। এ শুক্রবিন্দুকেই মৃত্যু থেকে জীবিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এভাবেই মহান আল্লাহ শিশুদের জন্ম দান করেন।[1]

আয়াতগুলো থেকে তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ বুঝা যায়। তিনি সকলের সৃষ্টিকর্তা, হায়াতদাতা, মৃত্যুদাতা, পালনকর্তা, রাজত্ব দেওয়ার মালিক, নেওয়ার মালিক, রাতকে রাত, দিনকে দিন করার মালিক, কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। বিধায় তারই জন্য সকল ইবাদত-বন্দিগী করতে হবে, উত্তম নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে তার অসীলা তালাশ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী তুমি বলো! কে তোমাদের আসমান ও যমীন হতে রিযিক্ব পৌছিঁয়ে থাকেন? অথবা কে কর্ণ ও চক্ষুসমূহের উপর পূর্ণ অধিকার রাখেন? আর কে জীবন্তকে প্রাণহীন হতে বের করেন, আর প্রাণহীনকে জীবন্ত হতে বের করেন? আর কে সমস্ত কাজ পরিচালনা করেন? তখন অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ। অতএব তুমি বলো, তবে কেন তোমরা ভয় কর না? (ইউনুস, ১০/৩১)। আয়াতটি থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, মক্কার কাফের ও মুশরিকরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করত, তাওহীদে রুবূবিয়্যার প্রতি বিশ্বাস করত, কিন্ত তারা ইবাদতে আল্লাহর সাথে শরীক করত, মূর্তিপূজা করত।[2]

আর কুফফারে কুরাইশ ও মুশরিকগণ বিপদে পড়লে খালেছ অন্তরে আল্লাহকেই ডাকত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তরঙ্গ তাদেরকে আচ্ছন্ন করে মেঘমালার মতো, তখন তারা বিশুদ্ধ চিত্তে আল্লাহকে ডাকত। কিন্তু যখন তিনি তাদের উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছান, তখন তাদের কেউ কেউ মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করে। আর বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই তাঁর নিদর্শনাবলি অস্বীকার করে (লোক্বমান, ৩১/৩২)। বর্তমানে নামধারী মুসলিম বিপদে পড়লে পীর সাহেবকে ডাকে। মুরীদরা সুখ-দুখ, ভালো-মন্দ উভয় অবস্থায় পীরের নিকট প্রার্থনা করে। কিন্তু মক্কার কাফেররা বিপদে পড়লে খালেছ অন্তরে আল্লাহকে ডাকত। আর ভালো থাকলে মূর্তিপূজা করত। এটাই হলো বর্তমান কবর পূজারী এবং কুফফারে কুরাইশদের মাঝে পার্থক্য। সুতরাং মুসলিমজাতির উচিত হবে, কবরপূজা ছেড়ে শুধু আল্লাহর নিকটেই জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা, তাঁর উপর ভরসা করা ও তাকে ভয় করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই মৃত হতে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটান এবং তিনিই জীবন্ত হতে মৃত্যুরও আবির্ভাব ঘটান এবং ভূমির মৃত্যের পর তাকে পুনর্জীবিত করেন। এভাবেই তোমরা উত্থিত হবে’ (আর-রূম, ৩০/১৯)। তিনি আরো বলেন, আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, রাত্রিতে ও দিবাভাগে তোমাদের নিদ্রা এবং তোমাদের তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করা। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে প্রদর্শন করেন বিদ্যুৎ ভয় ও ভরসা সঞ্চারকরূপে এবং তিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন ও তার দ্বারা ভূমিকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন, এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্যে। তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তারই আদেশে আকাশ ও পৃথিবী স্থিতিশীল। অতঃপর আল্লাহ যখন তোমাদেরকে মৃত্তিকা হতে উঠবার জন্যে একবার আহ্বান করবেন, তখন তোমরা উঠে আসবে। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা তাঁরই। সবকিছু তারই অনুগত’ (আর-রূম, ৩০/২৩-২৬)

(৫) আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ : মহান আল্লাহ আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে মানুষ শস্য-ফসল বপন করতে পারে এবং রূযী-রোযগার করতে পারে। জমি চাষাবাদ করার জন্য মহান আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণ করেন। পানি ছাড়া মানবজীবন অচল। অনুরূপভাবে পশু-পাখি, জীব-জন্তুসহ সকলেরই পানির প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহ সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন একমাত্র মানুষেরই কল্যাণের জন্য। সেই অনুগ্রহের অন্যতম হলো বৃষ্টি বর্ষণ। মহান আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত। তিনি বলেন, ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى﴾ ‘দয়াময় (আল্লাহ) আরশের উপর সমুন্নত’ (ত্ব-হা, ২০/৫)। মহান আল্লাহ বলেন,﴿أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الأرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ – أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرِ﴾ ‘তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকেসহ ভূমিকে ধ্বসিয়ে দিবেন না? আর ওটা আকস্মিকভাবে থরথর করে কাঁপতে থাকবে। অথবা তোমার কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, আকাশে যিনি রয়েছেন, তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণকারী বাতাস প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা জানতে পারবে কীরূপ ছিল আমার সতর্কবাণী’ (আল-মুলক, ৬৭/১৬-১৭)। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَبَنَيْنَا فَوْقَكُمْ سَبْعًا شِدَادًا – وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَّاجًا – وَأَنْزَلْنَا مِنَ الْمُعْصِرَاتِ مَاءً ثَجَّاجًا – لِنُخْرِجَ بِهِ حَبًّا وَنَبَاتًا – وَجَنَّاتٍ أَلْفَافًا﴾ ‘আর আমি নির্মাণ করেছি তোমাদের উপর সুদৃঢ় সাত আকাশ এবং সৃষ্টি করেছি একটি অতিউজ্জ্বল প্রদীপ (সূর্য)। আর বর্ষণ করেছি মেঘমালা হতে প্রচুর বৃষ্টি, এর দ্বারা আমি শস্য ও উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি এবং আরো উৎপন্ন করেছি নিবিড় ও ঘন বাগানসমূহ (আন-নাবা, ৭৮/১২-১৬)। মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ যে, তিনি বৃষ্টি দিয়ে মানুষের বহু কল্যাণ সাধিত করেন। কিন্তু মানুষ সে নেয়ামতকে নিয়ে একবারও চিন্তা করে না। যখন বৃষ্টি হয় না তখনই এর মর্যাদা বুঝা যায়। যখন মানুষ খেতে বসে গলায় ভাত বা অন্য কিছু আটকে যায় বা পিপাসা লাগে তখনই বুঝা যায় যে, মানুষের জীবনে পানির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? সুতরাং হে মানবজাতি! একবার চিন্তা করো, হতে পারে এ চিন্তাই তোমার হেদায়াত লাভের কারণ হবে। যিনি এসব সৃষ্টি করেছেন, তিনি তোমাকেও সৃষ্টি করেছেন, এটি চিন্তা করো।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই আল্লাহ যিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন। তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্যে ফলমূল উৎপাদন করেন, নৌযানকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তাঁর হুকুমে সেগুলো সমুদ্রে বিচরণ করে এবং নদীসমূহকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে, যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী এবং তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি ও দিবসকে। আর তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তোমরা তাঁর নিকট যা কিছু চেয়েছো তা হতে, তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করলে এর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না; মানুষ অব্যশই অতিমাত্রায় যালেম, অকৃতজ্ঞ, (ইবরাহীম, ১৪/৩২-৩৪)। মানুষ আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আঙুর, কলা, আনারস, পেঁপে, মাছ, গোশত, ডিম, ভাত, রুটিসহ আরো অনেক খাবার খায়। এগুলো কোথায় পায়? সবই আল্লাহর নেয়ামত। বিভিন্ন ধরনের সবজি খায় এই সবগুলো একমাত্র মহান আল্লাহ বৃষ্টির দ্বারা উৎপন্ন করেন, কিন্তু মানুষ তা একবারও চিন্তা করে না। পানি ছাড়া কোনোকিছুই উৎপন্ন হওয়া সম্ভব নয়। বিধায় আল্লাহর নেয়ামত ভক্ষণ করে যদি তাঁর ইবাদত না কর, তাঁকে না মান, তাহলে তোমার ধ্বংস অনিবার্য।

(চলবে)

 

* পি.এইচ.ডি গবেষক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া।

[1]. তাফসীর আত-তবারী, ৬/৩০৫।

[2]. ইবনু কাছীর, ৪/২৬৬।