সূরা আন-নাবা : মানবজাতির জন্য হাদিয়া


হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী*
(পর্ব-৬)


(৬) নির্ধারিত বিচার দিবস : প্রত্যেকটি বিষয় নির্ধারিত। মানুষকে নির্ধারিত সময় ছালাত আদায় করতে হয়, নির্ধারিত পরিমাণ মাল হতে যাকাত দিতে হয়, হজ্জ ফরয হলে নির্ধারিত সময়ে হজ্জ আদায় করতে হয়, নির্ধারিত সময়ে ছিয়াম পালন করতে হয়, নির্ধারিত সময়ে মানুষের মৃত্যু হয়; একটু আগেও না, পরেও না। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿لِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ إِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَلا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلا يَسْتَقْدِمُون﴾

‘প্রত্যেক জাতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সুতরাং যখন সেই নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হবে তখন তা এক মুহূর্ত আগেও হবে না এবং পরেও হবে না’ (ইউনুস, ১০/৪৯)। মানুষ এভাবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দুনিয়াতে আসে। তার সময়সীমা শেষ হলে তাকে দুনিয়া ছেড়ে পরকালে চলে যেতে হয় এবং নির্ধারিত সময়ে বিচার ফয়সালা হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ كَانَ مِيقَاتًا﴾ ‘নিশ্চয়ই বিচারদিবস সুনির্ধারিত রয়েছে’ (আন-নাবা, ৭৮/১৭)। মহান আল্লাহ বিচার-ফয়সালা করবেন। যারা পরকালকে অবিশ্বাস করত, তাদেরসহ সকল সৃষ্টির ভালো-মন্দের ফয়সালা করা হবে। এদিন খুব কঠিন ও জটিল। মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে রক্ষা করেন- আমীন!

সুতরাং মানবজাতির শিক্ষার শুরু হলো— তুমি আল্লাহর নামে পড়ো। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾

‘তুমি পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। পড়ো তোমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের নামে, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষাদান করেছেন। তিনি শিক্ষাদান করেছেন মানুষকে (এমন জ্ঞান), যা সে জানত না’ (আল-আলাক্ব, ৯৬/১-৫)

মানবজাতি যদি তার জীবনটা আল্লাহমুখী করত, তাহলে আদর্শবান হয়ে সমাজের খেদমত করতে পারত। নৈতিক শিক্ষাই হচ্ছে প্রথমে আল্লাহর সম্পর্কে জানা। মানুষ যত আল্লাহকে চিনবে, তত বেশি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে। এজন্যই সর্বপ্রথম সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। আল্লাহর কালাম নিজে পড়ুন, আপনার সন্তানসন্ততিকে পড়ান। ছালাত নিজে পড়ুন, আপনার সন্তানসন্ততিকেও ছালাত পড়ান। ভালো কাজ নিজে করুন, আপনার সন্তানসন্ততিকে করান। তাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে শিক্ষা দিন এবং আরো শিক্ষা দিন যে, কোনোকিছুতেই আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না। সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই করতে হবে। এভাবেই কল্যাণ হবে ইনশাআল্লাহ। মা-বোন নিজে পর্দা করবে এবং মেয়েদের পর্দা করা শিক্ষা দিবে। হালাল-হারাম ও অন্যায় অপকর্ম বিষয়ে তাদেরকে ধারণা দিবে, যাতে তা থেকে তারা দূরে থাকতে পারে। মৃত্যুর পর বিচারদিবসে আপনাকে আবার বলা হবে, পড়ো। আপনার জীবনে যা করেছেন সব লিপিবদ্ধ রয়েছে; অস্বীকার করার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا – اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا﴾

‘প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্ম আমি তার গলায় লাগিয়ে দিয়েছি এবং ক্বিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে উম্মুক্ত পাবে। (আমি বলব) তুমি তোমার আমলনামা পাঠ করো, আজ তুমিই তোমার নিজের হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট’ (বানু ইসরাঈল, ১৭/১৩-১৪)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(স্মরণ করো, সেদিনের কথা) যেদিন আমি পর্বতকে সঞ্চালিত করব আর তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর, সেদিন তাদেরকে (মানুষকে) আমি একত্রিত করব এবং তাদের কাউকে অব্যাহতি দিব না। আর তাদেরকে তোমার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত করা হবে সারিবদ্ধভাবে এবং বলা হবে, তোমাদেরকে প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হয়েছ। অথচ তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত সময় আমি উপস্থিত করব না? আর সেদিন উপস্থিত করা হবে আমলনামা আর তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে, তার কারণে তুমি অপরাধীদের দেখবে আতঙ্কগ্রস্ত এবং তারা বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! ওটা তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি এবং ওটা সমস্ত হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারো প্রতি যুলুম করে না’ (আল-কাহফ, ১৮/৪৭-৪৯)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হতো। আর আমি যদি আমার হিসাব কী, তা না জানতাম। হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো! আমার ধনসম্পদ আমার কোনো কাজে আসলো না। আমার ক্ষমতাও বিনাশ হয়েছে। (বলা হবে), তাকে ধরো। অতঃপর তার গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। পুনরায় তাকে বেঁধে ফেলো এমন শিকল দ্বারা, যার মাপ ৭০ হাত লম্বা। নিশ্চয় সে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করত না এবং অভাবগ্রস্তদের খাদ্য দানে উৎসাহিত করত না। অতএব, এই দিন সেখানে তার কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকবে না এবং কোনো খাদ্য থাকবে না রক্ত ও পুঁজ ব্যতীত। যা শুধু অপরাধীরাই ভক্ষণ করবে’ (আল-হাক্কাহ, ৬৯/২৫-৩৭)। সেদিন মানুষ তার ভালোমন্দ সবই দেখতে পাবে। মহান আল্লাহ বলেন,﴿فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ – وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴾ ‘যে কেউ অণু পরিমাণ সৎ আমল করবে, তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করে, তাও দেখবে’ (আল-যিলযাল, ৯৯/৭-৮)

হে নাস্তিক! হে বস্তুবাদী! হে অহংকারী! যারা পরকালে অবিশ্বাস কর, বিচার দিবসকে অবিশ্বাস কর, নেতা হয়েছ বলে মানুষকে পথভ্রষ্ট কর, ভালো করে শোনো, হে পীর সাহেব ও ‍মুরিদান ভালো করে শোনো, মহান আল্লাহ বলেন, ‘(কাফেররা বলে) আমরা যখন মারা যাব এবং মাটি ও হাড্ডিতে পরিণত হব, তখনো কি আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে এবং আমাদের পূর্বপুরষদেরও? বলো, হ্যাঁ এবং তোমরা লাঞ্ছিত হবে। ওটা একটি মাত্র প্রচণ্ড শব্দ, আর তখনই তারা প্রত্যক্ষ করবে এবং তারা বলবে, হায়! দুর্ভোগ আমাদের! এটাই তো কর্মফল দিবস। এটাই ফয়সালার দিন, যা তোমরা অস্বীকার করতে’। (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) একত্রিত করো যালেম ও তাদের সহচরদেরকে এবং তাদেরকে, যাদের তারা ইবাদত করত। আল্লাহর পরিবর্তে এবং তাদের হাঁকিয়ে নিয়ে যাও জাহান্নামের পথে। অতঃপর তাদেরকে থামাও, কারণ তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, তোমাদের কী হলো যে, তোমরা একে অন্যের সাহায্য করছ না? বস্তুত সেদিন তারা আত্মসমর্পণ করবে। আর তারা একে অপরের সামনাসামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, তোমরা তো (শক্তি প্রয়োগ করে পথভ্রষ্ট করতে) ডান দিক থেকে আমাদের নিকট আসতে। তারা বলবে, তোমরা তো বিশ্বাসীই ছিলে না। আর তোমাদের উপর আমাদের তো কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। বস্তুত তোমরা ছিলে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। আমাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিপালকের কথা সত্য হয়েছে, আমাদেরকে অবশ্যই শাস্তি আস্বাদন করতে হবে। আমরা তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলাম, কারণ আমরা নিজেরাও বিভ্রান্ত ছিলাম। তারা সবাই সেই দিন আযাবে শরীক হবে। অপরাধীদের প্রতি আমি এরূপই করে থাকি’ (আছ-ছফফাত, ৩৭/১৬-৩৪)

হে মানবজাতি! যারা কবরপূজা, মানুষের অন্ধ অনুসরণ, বিদআত, অন্যায় অপকর্ম নিয়ে ব্যস্ত, শয়তানের সহচর, কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিমুখ, তারা শুনো আল্লাহর কথা। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ – وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ -حَتَّى إِذَا جَاءَنَا قَالَ يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمَشْرِقَيْنِ فَبِئْسَ الْقَرِينُ – وَلَنْ يَنْفَعَكُمُ الْيَوْمَ إِذْ ظَلَمْتُمْ أَنَّكُمْ فِي الْعَذَابِ مُشْتَرِكُونَ﴾

‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমরা তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সেই হয় তার সহচর। তারাই (শয়তানরাই) মানুষকে সৎপথ হতে বিরত রাখে, অথচ মানুষ মনে করে যে, তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত। অবশেষে যখন সে আমাদের নিকটে উপস্থিত হবে, তখন সে (শয়তানকে) বলবে, হায়! আমার ও তোমার মধ্যে যদি পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধান থাকত! কতই না নিকৃষ্ট সহচর সে। আর আজ এ অনুতাপ তোমাদের কোনোই উপকারে আসবে না, যেহেতু তোমরা যুলুম করেছিলে। তোমরা তো সবাই শাস্তিতে শরীক হবেই’ (আল-যুখরুফ, ৪৩/৩৬-৩৯)। হে মানবজাতি! বিচারের মাঠ খুবই ভয়াবহ, কেউ সেখান থেকে রেহাই পাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন আল্লাহর শত্রুদেরকে জাহান্নাম অভিমুখে সমবেত করা হবে, সেদিন তাদেরকে বিন্যস্ত করা হবে বিভিন্ন দলে। পরিশেষে যখন তারা জাহান্নামের সন্নিকটে পৌঁছবে, তখন তাদের কর্ণ, চক্ষু ও চামড়া তাদের বিরূদ্ধে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিবে। জাহান্নামীরা তাদের ত্বককে জিজ্ঞেস করবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? উত্তরে তারা বলবে, আল্লাহ, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন, তিনি আমাদেরকেও বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যবর্তিত হবে। তোমরা কিছু গোপন করতে না এ বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না। উপরন্তু তোমরা মনে করতে যে, তোমরা যা করতে, তার অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন না। তোমাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে তোমাদের এই ধারণাই তোমাদের ধ্বংস এনেছে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ’ (হা-মীম আস-সাজদাহ, ৪১/১৯-২৩)

হে মানবজাতি! আজ তোমার কর্ম করার সময়, আগামীকাল কিয়ামত, সেদিন কোনো কর্ম করার সুযোগ নেই, এটা পরীক্ষার স্থান। তাই এই পরীক্ষাতে কৃতকার্য হয়ে নাজাতের নৌকাতে আরোহন করার চেষ্টা করো। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে ধ্বংসের নৌকায় আরোহন করতে হবে। সেদিন কোনো পথ থাকবে না। খুব ভালো করে শোনো! মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন তারা (কবর হতে) বের হয়ে পড়বে, সে দিন আল্লাহর নিকট তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। (আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন) আজ কর্তৃত্ব কার? এক পরাক্রমশালী আল্লাহরই। আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্মের বিনিময় দেওয়া হবে। আজ কারো প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। ওদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দিন, যখন দুঃখে-কষ্টে ওদের হৃদয় কণ্ঠাগত হবে। আর যালেমদের জন্য কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং সুপারিশকারীও নেই, যার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। চক্ষুর অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। একমাত্র ইনছাফের সাথে আল্লাহই ফয়সালা করবেন, আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, তারা কোনোকিছুর ফয়সালা করতে সক্ষম নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (আল-মুমিন, ৪০/১৬-২০)

(চলবে)


* পি.এইচ.ডি গবেষক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া।